ই-পেপার

SITE UNDER CONSTRUCTION
বাংলাদেশ পুলিশের মুখপত্র
অব্যাহত প্রকাশনার ৬৩ বছর

খালেক বিন জয়েনউদ্দীন

তেসরা নভেম্বর পনেরোই আগস্টের ধারাবাহিকতার কালিমামাখা একটি দিন। ঊনিশ শ’ পঁচাত্তর খ্রিস্টাব্দের পনেরোই আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, পরিবার পরিজন এবং তাঁর নিকট আত্মীয়-স্বজনদের হত্যার পর মাত্র তিন মাসের মাথায় তেসরা নভেম্বর তাঁর সহচরদের বঙ্গবন্ধুর খুনিরাই হত্যা করে। এই হত্যাকান্ড পুরনো কেন্দ্রীয় কারাগারের অভ্যন্তরে সংঘটিত করে সেই চিহ্নিত খুনিরা। এতে মৃত্যুবরণ করেন মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রথম অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রী পরিষদের সদস্য। এঁরা হলেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী ও এ এইচ এম কামারুজ্জামান।

পনেরোই আগস্টের মতো তেসরা নভেম্বর তাই একটি কালিমামাখা দিন। এদিন স্বাধীনতাকামী জনগণ ঘৃণাভরে খুনিদের ধিক্কার জানায় এবং গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে আমাদের মুজিবনগর সরকারের কর্মবীরদের। বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাসে বঙ্গবন্ধুর প্রিয়ভাজন ও প্রিয় সহচর এবং মুক্তিযুদ্ধের প্রধান প্রধান সংগঠকদের অবদান ও কর্মকা- অবিস্মরণীয়। জেল হত্যা দিবসে আমরা তাই প্রতিবছর তাদের গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি।

মূলত পঁচাত্তরের পনেরোই আগস্টের নির্মম হত্যাকান্ডের মধ্য দিয়ে শুরু হয় বাংলাদেশ অভ্যুদয়ের সফল বিজয় নস্যাৎ করার প্রক্রিয়া। একাত্তরের দুটি পরাশক্তি ও পাকিস্তানি ঘাগুসেনাদের পরাজিত করে বাঙালি জনগোষ্ঠির বিজয় সফল হয়েছিলো। এ বিজয় মেনে নেয়নি দখলদার পাকিবাহিনীর দোসর ও পর্দার আড়ালে লুকিয়ে থাকা মীরজাফররা।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন সাতচল্লিশের স্বাধীনতার পর থেকেই। সাতচল্লিশের স্বাধীনতা পূর্ববাংলার জনগণকে কিছুই দেয়নি। উপরন্ত শোষণ ও নির্যাতনের পাশাপাশি মাতৃজবানকে বিলোপ করার জন্য রাষ্ট্রভাষার প্রশ্ন টেনে আনে। এক পর্যায়ে পাকি কর্তৃপক্ষ বাঙালিদের ওপর গুলি চালায়। এভাবেই তারা পূর্ববাংলা তথা পাকিস্তানের জনগণের অধিকার হরণ করার জন্য সর্বপ্রকার শোষণ শুরু করে। অর্থনৈতিকভাবে কাবু করে রাখে এ অঞ্চলের মানুষকে। আমাদের পাট, চামড়া ও চায়ের টাকায় গড়া হয় ইসলামবাদ ও রাওয়ালপিন্ডি শহর। শুধু তাই নয়, চুয়ান্নর নির্বাচনে বিজিত বাঙালির আঞ্চলিক ও কেন্দ্রের সরকারকেও অপসারিত করা হয় ইস্কান্দার মির্জা ও আইউবের সামরিক শাসনের জাঁতাকালে। অধিকারহারা বাঙালি তখন দিশেহারা। দ্বিজাতিতত্ত্বে স্বাধীনতার সুখ তখন উবে গেল।

আর তখনই বঙ্গবন্ধু বঞ্চিত শোষিত বাঙালির অধিকার তথা স্ব-শাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ’৬৬ তে ছয় দফা দাবি উত্থাপন করেন। কিন্তু বাঙালির দুর্ভাগ্য। এ জন্য তাঁকে এবং স্বাধীনতাকামী কিছু বাঙালিকে পাকিস্তান ভাঙার জন্য জেলে যেতে হলো। রুজু হলো আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা। এরপর বাঙালি জনগণের গণ-অভ্যুত্থান, সত্তরের নির্বাচনে বাঙালির নিরস্কুশ বিজয় ও অসহযোগ আন্দোলন। আবার ষড়যন্ত্র। আইউবের বিদায়ের পর সামরিক শাসন। ইয়াহিয়া কোনোভাবেই বিজিত বাঙালির হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে রাজি নয়। বঙ্গবন্ধু এ অবস্থার প্রেক্ষিতে ৭ই মার্চ ঐতিহাসিক ভাষণে দিকনির্দেশনা দিলেন। ২৬ শে মার্চ স্বাধীনতা ঘোষণা করলেন। গণহত্যা শুরু করলো পাকি সৈন্যরা পূর্ববাংলার সর্বত্র। শুরু হলো প্রতিরোধ, একপর্যায়ে সত্তরের নির্বাচনে সংসদ সদস্যদের নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের সরকার গঠন। এই সরকারের নেতৃত্ব দিলেন বঙ্গবন্ধুর অনুগামী সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী ও কামারুজ্জামান। ৯টি মাস মুক্তিযুদ্ধ চললো। অবশেষে ’৭১-এর ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশের অভুদ্যয় ঘটলো।

বাংলাদেশের এই অভ্যুদয়ে দুটি পরাশক্তি আমেরিকা, চীন এবং পাকিস্তানি ও দেশীয় কিছু মীরজাফর খুশি হতে পারেনি। তাদের মধ্যে ‘খোন্দকার’ মোশতাক মুজিবনগরে থাকতেই তৎপর ছিলেন। আর বিজয়ের মুহূর্তে পালিয়ে গোলাম আযম লন্ডন বসে পূর্ব পাকিস্তান পুনরুদ্ধার কমিটি গঠন করে গভীর ষড়যন্ত্রের জাল বোনে। এক পর্যায়ে তারা সেনাবাহিনীর কিছু কর্মকর্তা, যাদের মধ্যে কজন বরখাস্ত ছিলো, তাদের এবং একজন পদস্ত কর্মকর্তাকে পক্ষে নিয়ে আগস্টের হত্যাকা- ঘটায় এবং তাদের নীলনকশা পরিপূর্ণ হয় তেসরা আগস্টের জেলহত্যার মধ্য দিয়ে। মূলত ১৫ আগস্ট ও ৩রা নভেম্বরের হত্যাকান্ড কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। একই গ্রন্থিতে বাঁধা। বাংলাদেশের অস্তিত্বকে চিরকালের জন্য মুছে ফেলার এক ঘৃণ্য অপচেষ্টা। পঁচাত্তরের পর থেকে ছিয়ানব্বই পর্যন্ত আমরা সেসব খুনি ও দোসদের কর্মকান্ডে লক্ষ করেছি। কীভাবে সংবিধানকে টুকরো টুকরো করা হয়েছে এবং খুনিদের বাঁচিয়ে সংসদেও নির্বাচিত করা হয়েছে। আর দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে একাত্তরের পরাজিত শক্তির দোসরদের।

জেলখানায় ৩রা নভেম্বর জাতীয় চার নেতাকে কীভাবে হত্যা করা হয়, তার প্রকৃত চিত্র খুঁজে পাওয়া যায় বিচারাধীন জেল হত্যা মামলার চার্জশিটে। এই চার্জশিটটি ১৯৯৮ সালের ১৬ অক্টোবর দৈনিক জনকণ্ঠে প্রকাশিত হয়, চার্জশিটের বিবরণে বলা হয়-

১৯৭৫ সালের ৩রা নভেম্বর রাত ৪টা-৫টা ৩৫ মিনিটের মধ্যে হত্যাকা-টি ঘটে। এ সময় হত্যাকারীরা দু’বার কারা অভ্যন্তরে প্রবেশ করে। তারা গুলি করে ও বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করে চার নেতাকে! ১৯৭৫ সালের ২রা নভেম্বর দিবাগত রাত পৌনে ২টার সময় ঢাকার কেন্দ্রীয় কারাগারের সামনে জলপাই রঙের একটি জিপ এসে থামে। জিপ থেকে নেমে আসে সেনাবাহিনীর সশস্ত্র চার সদস্য। এদের একজন রিসালদার মোসলেম জিপ থেকে নেমে এসে কারাগারের জেলারকে জানান ফারুক-রশিদ তাদের পাঠিয়েছে। তারা জাতীয় চার নেতা- তাজউদ্দীন আহমদ, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, এম মনসুর আলী ও কামারুজ্জামানকে নিয়ে যেতে চায়। ডিআইজি প্রিজন কাজী আবদুল আওয়াল এতে খুব ভয় পেয়ে যান। তিনি এটা জেল কোডের পরিপন্থি বলে উল্লেখ করেন। কিন্তু রিসালদার মোসলেম নাছোড়। তিনি বঙ্গভবনে ফোন করেন। কর্নেল রশিদ ফোন ধরে মোশতাককে দেন। মোশতাক ডিআইজিকে কর্নেল রশিদের কথামতো কাজ করার হুকুম দেন। এই হুকুমের ফলে কারাগারে প্রবেশের অধিকার পেয়ে যায় চার ঘাতক। তাজউদ্দীন ও সৈয়দ নজরুল ছিলেন জেলের (কেন্দ্রীয় কারাগার-এর) ১-নম্বর সেলে। পরবর্তী সেলে ছিলেন মনসুর আলী ও কামারুজ্জামান। তাদের সবাইকে জড়ো করা হয় তাজউদ্দীনের সেলে। এরপর খুব কাছ থেকে তাদের গুলি করে হত্যা করা হয়। এতে ঘটনাস্থলে তিনজন মারা যান। তাজউদ্দীনের পেটে ও হাঁটুতে গুলি লাগে। প্রচন্ড রক্তক্ষরণেও তিনি দীর্ঘ সময় বেঁচে থাকেন। তাজউদ্দীন বেঁচে আছেন বিষয়টি এক কারাবন্দি দেখতে পায় এবং ঘাতকদের একথা বলে। ঘাতকরা একথা শোনার পর সেলের মধ্যে আবার প্রবেশ করে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে চার নেতার হত্যা নিশ্চিত করে চলে যায়। তারা কারাগারে প্রবেশ করে ৪টায় আর বের হয় ৫টা ৩৫ মিনিটে। এই দীর্ঘ সময়ে ঘটানো হয় হত্যাকা-টি। নির্বিঘেœ হত্যাকা- ঘটিয়ে কারাগার থেকে বের হয়ে যায় ঘাতক দল। রাতে কারা অভ্যন্তরে এ নৃশংস হত্যাকা- ঘটালে বাইরের পৃথিবীর কেউ তা জানবে না। তাই হত্যাকান্ডের জন্য রাতকে বেছে নেয়া হয়। এমনকি সেলের মধ্যেই সকাল ১০টা পর্যন্ত লাশগুলো তালাবদ্ধ করে রাখা হয়। সকাল ১০টার পর কেন্দ্রীয় কারাগারের চিকিৎসকরা সেলে প্রবেশ করে। সেলের মধ্যেই লাশের সুরতহাল রিপোর্ট করেন ম্যাজিস্ট্রেট আজমল হোসেন চৌধুরী ও মিজানুর রহমান। এরপর ময়না তদন্ত সম্পন্ন করেন সিভিল সার্জন ডা. ফয়েজউদ্দীন মিয়া ও কারা ডাক্তার রফিক উদ্দিন। তাঁদের ময়না তদন্ত ও সুরতহাল রিপোর্টে বলা হয়, গুলিবর্ষণ করে ও বেয়নেট দিয়ে হত্যা করা হয়েছে।’

এভাবেই পঁচাত্তরের ১৫ই আগস্টের খুনিদের অসমাপ্ত কাজ সমাপ্ত হয়েছে। কিন্তু সেই খুনিরা কে কোথায়? কেউ কেউ ফাঁসির দন্ড পেয়েছে, কেউ কেউ বিদেশে মারা গেছে। মাহবুব আলম চাষী চলন্ত গাড়িতে সেই মরুময় সৌদিতে মারা গেছে। ঠাকুর যে কবে মারা গেল তা কেউ জানে না। প্রকৃতির বিধান কেউ খন্ডাতে পারে না। সময় ও ইতিহাস কাউকে ক্ষমা করে না। তারাই বিনাশ হয়েছে বিধাতার বিচারে। বাংলার মানুষ একদিন অঝোরে কেঁদেছিল। এ বিচারে দেশ ও জাতির কিছুটা হলেও কলঙ্কমুক্ত হয়েছে।

আজ আমরা জোর গলায় বলতে পারি- বাঙালি হাজার বছরের সংগ্রাম ও আন্দোলনের ফসল স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ। আর এই সংগ্রাম-আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্বটি নেতৃত্ব দিয়েছেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং তাঁর সহযোদ্ধা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী ও এইচ এম কামারুজ্জামান। তাঁদের আত্মত্যাগের ফলেই আমাদের শ্রেষ্ঠ অর্জন ও মাতৃভূমির স্বাধীনতা।

মুক্তিযুদ্ধের কর্মবীর আমাদের এই জাতীয় চার নেতার স্মরণের মণিকোঠায় চিরকাল জ্বলজ্বল করবে। তাঁদের আত্মত্যাগ বঙ্গবন্ধুর আত্মত্যাগের কথাই মনে করিয়ে দেয়। তারা বঙ্গবন্ধু, বাংলাদেশ ও বাংলাদেশের জনগণের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেননি। তাঁরা বাংলা মায়ের সূর্যসন্তান। এদেশের স্বাধীনতাকামী মানুষ তাঁদের শ্রদ্ধা জানাবে ও ভালোবাসা জানাবে। তাঁদের খুঁনিরা পঁচাত্তরে ভেবেছিলো শেখ মুজিব ও তাঁর সহচরদের হত্যা করলেই বাংলাদেশ সমূলে উৎপাটিত হবে। কিন্তু কোনো শক্তিই সত্য ইতিহাসকে উৎপাটন করতে পারে না।

আমরা সবাই জানি বর্তমান সরকার প্রথমবার ক্ষমতায় এসে নাজিমুদ্দিন রোডের কারাগারে জাতীয় চার নেতার স্মরণে তাজউদ্দীন আহমেদের সেই কক্ষটি ‘শহীদ স্মৃতিকক্ষ’ হিসেবে সংরক্ষণ করে এবং সেখানে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করে। বেশ কিছুদিন আগে কারাগারটি ঢাকা জেলার কেরানীগঞ্জের অদূরে রাজেন্দ্রপুর স্থানান্তর করা হয়েছে। আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস জেলহত্যার সেই সংরক্ষিত কক্ষ ও স্মৃতিস্তম্ভ যথাযথ মর্যাদা সহকারে যথাস্থানে সংরক্ষণ থাকবে।

লেখক : বঙ্গবন্ধু গবেষক ও বাংলা একাডেমির ফেলো।

ভালো লাগলে শেয়ার করে দিন :)

0 Comments

Leave a Reply

Avatar placeholder

Your email address will not be published. Required fields are marked *