ই-পেপার

SITE UNDER CONSTRUCTION
বাংলাদেশ পুলিশের মুখপত্র
অব্যাহত প্রকাশনার ৬৩ বছর

প্রযুক্তির অগ্রযাত্রায় দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলেছে বিশ্ব। অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার হচ্ছে বিশ্বের বিভিন্ন পুলিশ বাহিনীতেও। এসব প্রযুক্তির ব্যবহারে বিশ্বকে তারা যেমন নিরাপদ রাখছে, তেমনি যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তিতে নিজেদের দক্ষতা দেখিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন। বিশ্বজুড়ে সম্প্রতি গ্রেপ্তার হওয়া ৮ শতাধিক সন্দেহভাজন অপরাধীর বিষয়টিকেই উদাহরণ হিসেবে দেখা যায়।

অপরাধীচক্রে জড়িতদের গোপন অ্যাপ হ্যাক করে বিশ্বজুড়ে ৮ শতাধিক সন্দেহভাজন অপরাধীকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। অস্ট্রেলিয়া ও মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআই এনক্রিপ্টেড মেসেজ পড়ে অপরাধীদের ধরে। অপারেশন ট্রোজান শিল্ড নামে অভিযানটি পরিচালনা করে মার্কিন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআই। এর মাধ্যমেই সামনে আসে অ্যানোম নামের একটি বিশেষ অ্যাপ।

অ্যানোম অ্যাপ

অ্যানোম অ্যাপের মাধ্যমে তথ্য জেনে পরে এমন সন্দেহভাজন অপরাধীদের ১৮টি দেশ থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। অভিযানে ১৪ কোটি ৮০ লাখ ডলার জব্দ ও কয়েক টন মাদকদ্রব্য উদ্ধার করা হয়। বৈশ্বিক মাদক-বাণিজ্যে জড়িত অস্ট্রেলিয়া, এশিয়া, দক্ষিণ আমেরিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের অপরাধীদের ধরছে অস্ট্রেলীয় পুলিশ ও যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা (এফবিআই)। সমন্বিত এই বৈশ্বিক অভিযানকে সাম্প্রতিক সময়ে অন্যতম বড় পরিসরের অভিযান বলে ধারণা করা হয়। তিন বছর ধরে অপারেশনটি চালু ছিল। গোপনে ‘এএনওএম’ নামের একটি ডিভাইস অপরাধীদের মধ্যে বিতরণ করা হয়। ডিভাইসে থাকা অ্যাপের মাধ্যমে গোপনে মাদক বিক্রি, অস্ত্র চোরাচালানের মতো কর্মকাণ্ডের তথ্য তাদের কাছে পৌঁছায়। এফবিআই, ইউরোপীয় ইউনিয়নের পুলিশ সংস্থা ইউরোপোল ও অন্যান্য দেশের পুলিশ সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, অপারেশন থেকে প্রাপ্ত প্রমাণের ফলে অন্তত ১০০টি হত্যাকা- রোধ করা গেছে। এ ছাড়া বেশ কয়েকটি বড় আকারের মাদক চোরাচালান ঠেকানো সম্ভব হয়। নিউজিল্যান্ডের পুলিশ বাহিনীও নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করে অপারেশনে যুক্ত ছিল। দীর্ঘমেয়াদি এই অভিযানের অংশ হিসেবে দুই বছর ধরে অপরাধীচক্রের ব্যবহার করা দুটি এনক্রিপটেড ফোন নেটওয়ার্ক এনক্রোচ্যাট ও স্কাইগ্লোবালে বিঘ্ন ঘটানো হয়। নিউজিল্যান্ডের পুলিশ জানায়, এ দুটি এনক্রিপটেড যোগাযোগ প্ল্যাটফর্ম বন্ধ করে দেওয়ার ফলে এনক্রিপটেড যোগাযোগের বাজারে একটি বড় শূন্যতা তৈরি হয়। এ শূন্যতা দূর করতে এফবিআই নিজস্ব এনক্রিপটেড ডিভাইস কোম্পানি এএনওএম চালু করে। এএনওএম চালু করার পরই অপরাধীচক্রের ওপর নজরদারি করার সুযোগ তৈরি হয়। যে ডিভাইস সরবরাহ করা হয়, তাতে কোনো ই-মেইল, ফোনকল বা জিপিএস-সেবা ছিল না। এতে কেবল অন্য এএনওএম ডিভাইসে বার্তা পাঠানোর সুবিধা রয়েছে। এই ডিভাইস ব্যবহার করতে বর্তমানে কোনো ব্যবহারকারীর কোড প্রয়োজন হয়।

নেটওয়ার্ক প্রযুক্তি

যুক্তরাষ্ট্রের পুলিশ বলছে, প্রচলিত অনেক অপরাধ এখন সাইবার অপরাধের দিকেই ছুটছে। পুলিশও কি পিছিয়ে? তারাও এসব দুর্বৃত্তকে ধরতে আধুনিক প্রযুক্তি ও বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করছে। এতে মানুষের আস্থা বাড়ছে পুলিশের ওপর। গত মার্চে বেলজিয়ামে একটি শিপিং কনটেইনারে অভিযান চালিয়ে পুলিশ ২৮ টন কোকেন, নগদ অর্থ, অস্ত্র, পুলিশের ইউনিফর্ম ও টর্চার চেম্বারের খোঁজ পায়। ওই অপরাধীরা স্কাই ইসিসি নামের এনক্রিপটেড ফোন নেটওয়ার্ক ব্যবহার করত। কানাডার একটি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে এ প্রযুক্তি নিয়েছিল তারা। এতে ফোনে অপরাধীদের সব কার্যক্রম লুকানো যেত। এতে এন্ড টু এন্ড এনক্রিপশন, মেসেজ স্বয়ংক্রিয় বার্তাসুবিধা ছিল। তবে এতে জিপিএস ডেটা ছিল না। এর সাবস্ক্রিপশন বিটকয়েনে পরিশোধ করতে হয়। এতে তারা পরিচয় গোপনের ব্যাপক সুবিধা পায়। তবে ইউরোপিয়ান পুলিশ ওই অপরাধীদের ওপর নজরদারি করতে তাদের ফোনে ম্যালওয়্যার প্রবেশ করাতে সক্ষম হয়। এ জন্য তারা ব্যবহার করে অত্যাধুনিক নেটওয়ার্কিং প্রযুক্তি। তাদের উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারের কারণে ধরা পড়ে পুরো গ্যাং।

ফেসিয়াল রিকগনিশন

ঘটনাটি গত বছরের যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার। পুলিশ এক অপরাধীকে তাড়া করে। তার গাড়ির চাকা পাংচার করে দেয়। পরে তাকে ধরে ফেলে। কিন্তু সমস্যা হয়ে দাঁড়ায় তার পরিচয় শনাক্ত করার বিষয়টি। তার কোনো আইডি কার্ড ছিল না। তার ফিঙ্গারপ্রিন্টও মেলে না। তদন্তকারীরা তখন দেশটির সবচেয়ে বৃহত্তম ফেসিয়াল রিকগনিশন সিস্টেমের আশ্রয় নিলেন। প্রায় দুই দশক আগে যুক্তরাষ্ট্র এ কর্মসূচি শুরু করে। এখন তাদের হাতে বিশ্বের বৃহত্তম ফেসিয়াল রিকগনিশন ডেটাবেইস রয়েছে। ওই ডেটাবেইসে গাড়িচালকের ছবি খোঁজ করে জানা গেল তার পরিচয় ও অতীত অপরাধের রেকর্ড। যুক্তরাষ্ট্রের পুলিশ বাহিনীর এই অত্যাধুনিক ফেসিয়াল রিকগনিশন প্রযুক্তিতে এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাও যুক্ত হয়েছে। ফলে, এটা তাদের আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের অত্যন্ত সফল উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

মেশিন লার্নিং ও এআই

রোবট মানুষকে সুরক্ষা দেবে বা সেবা করবে, সে পর্যায়ে যেতে অনেকটা পথ পাড়ি দিতে হবে। কিন্তু বিশ্বের বিভিন্ন দেশের পুলিশ ইতিমধ্যে এআইভিত্তিক টুল তৈরি করে অপরাধ দমনে কাজে লাগাচ্ছে। তৈরি করছে বিশাল ডেটাবেইস। এআইয়ের সাহায্য নিয়ে বিভিন্ন ডেটাবেইসে সংযোগ ঘটাচ্ছে। এ ছাড়া নিজস্ব অভিজ্ঞতা ও তদন্তের বিষয়গুলো নিয়ে নতুন অ্যালগরিদম তৈরি করছে, যাতে তাদের তদন্তকাজও সহজ হচ্ছে।

বিগ ডেটা ও শটস্পটার

অপরাধ দমনের সেরা উপায় হলো তা ঘটতেই না দেওয়া। এ ক্ষেত্রে সাহায্য করছে প্রযুক্তি। অপরাধ ঘটার আগেই পূর্বাভাস দিতে পারে প্রযুক্তি। এআই টুল ও প্রেডিকটিভ অ্যানালিটিকস বিগ ডেটা ব্যবহার করে এ কাজ করা যেতে পারে। ইতিমধ্যে এর ব্যবহার শুরু হয়েছে। তবে এর বাইরে আরও অনেক প্রযুক্তি আছে, যা অপরাধ ঘটার আগেই জানিয়ে দিতে পারে। শিকাগোতে পুলিশ কর্মকর্তারা শটস্পটার নামে একধরনের প্রযুক্তি ব্যবহার করছেন, যাতে গুলির শব্দের এলাকার নিখুঁত তথ্য শনাক্ত করা যায়। এর সঙ্গে লাইসেন্স প্লেট শনাক্তকরণ প্রযুক্তি মিলিয়ে পুলিশের জন্য কোন এলাকায় অভিযান চালাতে হবে বা টহল দিতে হবে, তা বের করা সহজ হয়ে যায়।

সেন্সর প্রযুক্তি

ইউএস বর্ডার পেট্রোল এজেন্টরা একধরনের সেন্সর প্রযুক্তি ব্যবহার করছে, যাতে কোনো ব্যক্তির শারীরিক ও মানসিক আচরণ মূল্যায়ন করা সম্ভব। কোনো ব্যক্তি কী উদ্দেশ্যে যাচ্ছে, তা বের করতে এই সেন্সর প্রযুক্তি কাজে লাগানো হয়।

স্টিংরে

এটি মূলত একধরনের ডিভাইস। এখান থেকে শক্তিশালী সংকেত নির্গত হয়, যা সেলফোন টাওয়ারের অনুকরণ করতে পারে। কোনো অপরাধীর সেলফোন নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে ট্র্যাকিং করতে ও এর নেটওয়ার্কে ঢুকে পড়তে এ ডিভাইস দারুণ কার্যকর। একবার যুক্ত হতে পারলে পুলিশ স্টিংরে ব্যবহার করে ফোনের অবস্থান ও এর ইউনিক আইডি নম্বর বের করে ফেলতে পারে। অস্ট্রেলিয়ায় ২৭টি স্টেটে ৭৫টি পুলিশ ডিপার্টমেন্ট এটি ব্যবহার করে থাকে। এ ছাড়া এফবিআই, আইআরএস, কাস্টমস ও ইমিগ্রেশনেও এর ব্যবহার দেখা যায়।

অত্যাধুনিক ড্রোন

কোনো এলাকায় পরিস্থিতি লাইভ দেখতে বা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে ড্রোনের ব্যবহার অনেক আগেই শুরু করেছে বিভিন্ন দেশ। অত্যাধুনিক ড্রোন প্রযুক্তি কাজে লাগিয়ে ক্যামেরার একটি নেটওয়ার্ক তৈরি করে তা কাজে লাগানো হচ্ছে এখন। ট্রাফিক পরিস্থিতি দেখতে, অপরাধীকে তাড়া করতে কিংবা ক্রাইম সিন পর্যবেক্ষণেও দারুণভাবে ড্রোন কাজে লাগাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন।

বায়োমেট্রিকস

শনাক্তকরণে ফিঙ্গারপ্রিন্ট ব্যবহার বহু পুরোনো। এর সঙ্গে ডিএনএ, ফেস শনাক্তকরণ প্রযুক্তিও এসে গেছে। এর বাইরে আচরণ শনাক্ত করার প্রযুক্তিও হাতের নাগালে। এর মধ্যে কণ্ঠস্বর শনাক্ত করা, হাতের তালু, কবজির শিরা, চোখের মনি, এমনকি হার্টবিটও এখন শনাক্ত করা যায়। এফবিআই নেক্সট জেনারেশন আইডেনটিফিকেশন (এনজিআই) নামের ডেটাবেইস তৈরি করেছে, যা বিশ্বের বৃহত্তম ইলেকট্রনিক বায়োমেট্রিক ও ক্রিমিনাল হিস্টোরি ইনফরমেশন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। লন্ডনের পুলিশও এখন আইডেনটিটি নট নন (আইএনকে) নামের বিশেষ বায়োমেট্রিক ডিভাইস ব্যবহার করে সন্দেহভাজনের ফিঙ্গারপ্রিন্ট বায়োমেট্রিক শনাক্তকরণে কাজে লাগাচ্ছে।

রোবট

পুলিশের হাতে এখন রোবট প্রযুক্তিও রয়েছে। পরবর্তী প্রজন্মের রোবটিক ক্যামেরা তাদের ভিডিও ও অডিও সার্ভিল্যান্সে কাজে লাগছে। অনেক রোবট পুলিশের হয়ে বিপজ্জনক কাজ করছে। এ রকম থ্রোয়েবল রোবট এখন হাতের নাগালে। পুলিশের ব্যবহারের জন্য স্বয়ংক্রিয় গাড়ির প্রযুক্তিও চলে এসেছে। এসব গাড়ি স্বচালিত। তবে এ নিয়ে আরও পরীক্ষা চলছে। চীনে অ্যানবট নামের একধরনের রোবট ব্যবহার করা হচ্ছে, যা ব্যাংক, এয়ারপোর্ট ও স্কুলে নিরাপত্তায় কাজ করছে। দুবাইয়ে পুলিশ অফিসারের কাজ করে দিচ্ছে একটি টাচস্ক্রিন রোবট।

ডিটেকটিভ ডেস্ক

ভালো লাগলে শেয়ার করে দিন :)

0 Comments

Leave a Reply

Avatar placeholder

Your email address will not be published. Required fields are marked *