ই-পেপার

SITE UNDER CONSTRUCTION
বাংলাদেশ পুলিশের মুখপত্র
অব্যাহত প্রকাশনার ৬৩ বছর

মোছাঃ ফরিদা ইয়াসমিন

পূর্ব প্রকাশের পর…

দোষী শিশুর সাথে সাক্ষাতে পুলিশের ভূমিকা

তদন্তে উদ্ঘাটিত ঘটনাবলী ও পূর্ববর্তী ঘটনা সংশ্লিষ্ট প্রেক্ষাপট ঘটনাগুলো সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা নিতে হবে, শিশুটি কেন সন্দেহভাজন তা জানতে হবে। কোন্ সাক্ষ্য প্রমাণ শিশুটিকে অপরাধের সঙ্গে সম্পৃক্ত করেছে এবং সেটি কতটুকু যৌক্তিক তা জানতে হবে। শিশুটি পূর্বে কখনও পুলিশের সংস্পর্শে এসেছে কি না; পূর্বে যদি শিশুটি পুলিশের সংস্পর্শে এসে থাকে তাহলে সন্ধান করতে হবে কেন এসেছে এবং সেই ক্ষেত্রে কোন পুলিশ সংশ্লিষ্ট ছিলেন ও সাক্ষাৎকারের আলোচ্য বিষয়গুলো তালিকাভুক্ত করতে হবে। শিশুদের কাছে পড়ে শোনানোর জন্য অধিকারের তালিকা থাকা ও পিতা মাতার ভূমিকার বিষয় বিবেচনা করা প্রয়োজন। সাক্ষাৎকারটি লিপিবদ্ধ করতে কি পদ্ধতি অবলম্বন করবেন তা সন্দেহভাজন শিশুটির কাছে ব্যাখ্যা করে বুঝিয়ে দিতে হবে। সাক্ষাৎকার গ্রহণকালে উপস্থিত ব্যক্তিবর্গের নাম লিপিবদ্ধ করতে হবে। উপস্থিত ব্যক্তিবর্গের প্রতি সংবেদনশীল ও ন্যায়-নিষ্ঠা মনোভাব প্রদর্শন, শিশুটির বিশ্বাসও সম্মান অর্জন, সব সময় ইতিবাচক মনোভাব অবলম্বন, বন্ধুসুলভ আচরণ, শিশুটির বুদ্ধি, যুক্তি ও ন্যায়বোধের ধারণা বিবেচনা, মুক্ত প্রশ্ন করতে হবে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে নিদিষ্ট উত্তর পাওয়ার লক্ষ্যে পুলিশের উত্তর সংবলিত প্রশ্ন করার প্রয়োজন হতে পারে, সম্পূর্ণরূপে বুঝতে না পারলে আন্তরিকতার সাথে তাকে বারংবার প্রশ্ন করা, শিশুটিকে তার কাজ অথবা আচরণের কারণ বা উদ্দেশ্য সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা। তবে এটিও মনে রাখতে হবে যে সে শিশু, তার কাছ থেকে পূর্ণবয়স্ক ব্যক্তির মতো চিন্তা বা বুঝার ক্ষমতা আশা করা যাবে না।

মহামান্য আদালতের নির্দেশনা

আইনের সহিত সংঘাতে জড়িত শিশু কর্তৃক সংঘটিত যে কোনো অপরাধের বিচার করার জন্য প্রত্যেক জেলা সদরে ও মহা নগরে শিশু আদালত নামে এক বা একাধিক আদালত থাকবে। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ (২০০০ সনের ৮ নং আইন) এর অধীন গঠিত প্রত্যেক নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল স্বীয় অধিক্ষেত্রে উপ-ধারা (১) এ উল্লিখিত শিশু আদালত হিসেবে গণ্য হবে:

১) শিশু আদালত বিধি দ্বারা নির্ধারিত স্থান, দিন এবং পদ্ধতিতে উহার অধিবেশন অনুষ্ঠান করবে।

২) দায়রা আদালত যেই সকল ক্ষমতা প্রয়োগ ও কার্যাবলি সম্পাদন করতে পারে শিশু আদালত ও সেই সকল ক্ষমতা প্রয়োগ ও কার্যাবলি সম্পাদন করতে পারবে।

৩) শিশু আদালতের পরিবেশ ও সুবিধাসমূহ সম্পর্কে বিশেষ নজরের ব্যবস্থা করা।

৪) বিচার প্রক্রিয়ার সকল স্তরে ব্যক্তিগতভাবে অংশগ্রহণ করা সংশ্লিষ্ট শিশুর অধিকার হিসেবে বিবেচিত হবে।

৫) ফৌজদারি কার্যবিধি বা আপাততঃ বলবৎ অন্য কোন আইনে ভিন্নতর যা কিছুই থাকুক না কেন, শিশু আদালত উক্ত আদালতে শিশুর প্রথম উপস্থিত হবার তারিখ হতে ৩৬০ দিনের মধ্যে বিচারকার্য সম্পন্ন করবে। বিচারকার্য সম্পন্নের সময়সীমা আরও ৬০ (ষাট) দিন বর্ধিত করতে পারবে এবং বিশেষ ক্ষেত্রে একাধিক্রমে কার্যক্রম প্রত্যেক কার্যদিবসে বিনা বিরতিতে চলতে থাকবে। শিশু-আদালতের বিবেচনায় তাহার বিরুদ্ধে আনীত লঘুমাত্রার অভিযোগ হতে অব্যাহতি পাবে এবং একই অপরাধের জন্য তার বিরুদ্ধে অন্য কোন বিচার প্রক্রিয়া গ্রহণ করা যাবে না।

৬) শিশু আদালত সার্বক্ষণিক আদালত হিসেবে গণ্য হবে। অবকাশকালীন, সরকারি ছুটি বা অন্যকোনও বন্ধের দিন সংশ্লিষ্ট জেলা ও দায়রা জজ অথবা মহানগর দায়রা জজ, অতিরিক্ত দায়রা জজ পদমর্যাদার একজন বিচারক শিশু আদালতের দায়িত্ব পালনে নিয়োজিত থাকবেন।

৭) পাশাপাশি একই মামলায় শিশু ও প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তিকে আসামি করা হলে, সেক্ষেত্রে শিশু আদালতেই শিশুদের বিচার করতে হবে।

৮) বিচার কাজ শুরুর আগে তদন্তকালে শিশুবিষয়ক পুলিশ কর্মকর্তা প্রাথমিকভাবে শিশু ও প্রাপ্তবয়স্কের জন্য আলাদা দুটি নথি খুলবেন। প্রাপ্ত বয়স্কের নথি সংশ্লিষ্ট আদালতে এবং শিশু সংশ্লিষ্ট নথি শিশু আদালতে দাখিল করতে হবে। জন্ম সময়ের হাসপাতালের ছাড়পত্র, টিকা গ্রহণের কার্ড, পাবলিক পরীক্ষার নিবন্ধন সনদ, পাসপোর্ট ইত্যাদি পর্যালোচনা করা হচ্ছে কি না, সে বিষয়ে লক্ষ্য রাখতে হবে।

৯) এ সময়ের মধ্যে কোনও কারণে তদন্ত শেষ না হলে পরবর্তী সময়ে আরও ৩০ দিন সময় পাবেন তদন্ত কর্মকর্তা। আর ১২০ দিনের মধ্যে তদন্ত শেষ না হলে শিশু আদালত অভিযুক্ত শিশুকে জামিন দিতে পারবেন।

১০) পাশাপাশি শিশু আইন, বিশেষ ক্ষমতা আইন, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ও ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের সাথে অসঙ্গতিপূর্ণ, সাংঘর্ষিক ধারা যথাযথ সংশোধন ও স্পষ্ট না করা পর্যন্ত জটিলতা এড়াতে ৭ দফা নির্দেশনা অনুসরণ করতে হবে।

১১) শিশু আইনে সাংঘর্ষিক অবস্থা, বিদ্যমান অসঙ্গতি, অস্পষ্টতা ও বিভ্রান্তি অবিলম্বে দূর করতে হবে। আদালত এটাও প্রত্যাশা করেছেন যে, এ লক্ষ্যে সরকার দ্রুততার সঙ্গে স্বল্পতম সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। সরকার কর্তৃক শিশু আইন সংশোধন অথবা শিশু আইন ২০১৩-এর ধারা ৯৭ এর বিধান মূলে গেজেটে প্রজ্ঞাপন দ্বারা অস্পষ্টতা ও অসঙ্গতি দূর করতে হবে।

মহামান্য আদালতের ৭ দফা

১. সংশ্লিষ্ট ম্যাজিস্ট্রেট কেবলমাত্র মামলার তদন্ত কার্যক্রম তদারকি করবেন এবং এ সংক্রান্ত নিত্য নৈমিত্তিক প্রয়োজনীয় আদেশ ও নির্দেশনা দেবেন।

২. রিমান্ড সংক্রান্ত আদেশ শিশু আদালতেই নিষ্পত্তি হওয়া বাঞ্ছনীয়। তবে, আইনের সংস্পর্শে আসা শিশু (ভিকটিম এবং সাক্ষী) বা আইনের সঙ্গে সংঘাতে জড়িত শিশুর জবানবন্দি সংশ্লিষ্ট ম্যাজিস্ট্রেট লিপিবদ্ধ করতে পারবেন।

৩. তদন্ত চলাকালে আইনের সঙ্গে সংঘাতে জড়িত শিশুকে মামলার ধার্য তারিখে ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজিরা থেকে অব্যাহতি দেয়া যেতে পারে।

৪. তদন্ত চলাকালে আইনের সঙ্গে সংঘাতে জড়িত শিশুর রিমান্ড, জামিন, বয়স নির্ধারণসহ অন্তবর্তী যে কোনো বিষয় শিশু আদালত নিষ্পত্তি করবে এবং এ সংক্রান্ত যেকোনো আবেদন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে দাখিল হলে সংশ্লিষ্ট ম্যাজিস্ট্রেট নথিসহ ওই দরখাস্ত সংশ্লিষ্ট শিশু আদালতে পাঠাবেন এবং সংশ্লিষ্ট শিশু আদালত ওই বিষয়গুলো নিষ্পত্তি করবে।

৫.  অপরাধ আমলে নেয়ার আগে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল শিশু আইনের অধীনে কোনো আদেশ দেয়ার ক্ষেত্রে শিশু আদালত হিসেবে আদেশ দেবেন এবং এ ক্ষেত্রে বিচারক শিশু আদালতের বিচারক হিসেবে কাজ পরিচালনা করবেন এবং শিশু আদালতের নাম ও সিল ব্যবহার করবেন।

৬. আইনের সুপ্রতিষ্ঠিত নীতি হলো, আইন মন্দ বা কঠোর হলেও তা অনুসরণ করতে হবে, যতক্ষণ পর্যন্ত তা সংশোধন বা বাতিল না হয়। সে কারণে নালিশি মামলার ক্ষেত্রে শিশু কর্তৃক বিশেষ আইনগুলোর অধীনে সংঘটিত অপরাধ সংশ্লিষ্ট বিশেষ আদালত বা ক্ষেত্র মতো, ট্রাইব্যুনাল শিশু আইনের বিধান ও এ রায়ের পর্যবেক্ষণের আলোকে অভিযোগ গ্রহণের পর প্রয়োজনীয় আইনি কার্যক্রম গ্রহণ শেষে অপরাধ আমলে নেয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্তের নথি সংশ্লিষ্ট ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে পাঠাবে। ম্যাজিস্ট্রেট অপরাধ আমলে নেয়ার বিষয়ে প্রয়োজনীয় আদেশ প্রদান এবং অপরাধ আমলে নিলে পরবর্তীতে কাগজাদি বিচারের জন্য শিশু আদালতে পাঠাবেন।

৭.  শিশু আইনের প্রাধান্য তার কারণে বিশেষ আইনগুলোর অধীনে জিআর মামলার ক্ষেত্রে শিশু কর্তৃক সংঘটিত অপরাধের জন্য পৃথক পুলিশ রিপোর্ট দেয়ার বিধান থাকায় সংশ্লিষ্ট ম্যাজিস্ট্রেট পুলিশ রিপোর্টের উপর ভিত্তি করে অপরাধ আমলে নেবেন এবং তা করতে হবে শিশুদের (আসামি, ভিকটিম ও সাক্ষী) সর্বোত্তম স্বার্থ সংরক্ষণ করে। আদালতে শিশু বান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।

শিশু বান্ধব আইন সহায়তা নিশ্চিতকরণের

ক্ষেত্রে আদালতের ভূমিকা

  • সংবেদনশীল কোর্ট ও শিশু মামলাগুলো দ্রুত বিচার আইনে পরিচালনা করা।
  • শিশুর প্রতি বিশ্বাস স্থাপনে নিশ্চয়তা ও শিশু বান্ধব আদালত প্রাঙ্গন নিশ্চিতকরণ।
  • মামলার বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে শিশুদের অবগতকরণ।
  • সংবেদনশীল বিচারক ও পাবলিক প্রসিকিউটর নির্ধারণ করা।
  • মানবাধিকার ও শিশু বান্ধব আইনজীবী নিশ্চিত করা এবং ক্যামেরা ট্রায়ালের ব্যবস্থা করা।
  • শিশু ও তার পরিবারের সুরক্ষার জন্য তাদের গোপনীয়তা বজায় রাখা।

(চলবে)

 লেখক : উপ-পুলিশ কমিশনার

 (প্রফেশনাল স্ট্যান্ডার্ড অ্যান্ড ইন্টারনাল ইনভেস্টিগেশন ডিভিশন)

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ, ঢাকা

ভালো লাগলে শেয়ার করে দিন :)

0 Comments

Leave a Reply

Avatar placeholder

Your email address will not be published. Required fields are marked *