ই-পেপার

SITE UNDER CONSTRUCTION
বাংলাদেশ পুলিশের মুখপত্র
অব্যাহত প্রকাশনার ৬৩ বছর

মোছাঃ ফরিদা ইয়াসমিন

পূর্ব প্রকাশের পর…

বাংলাদেশে শিশুর বয়সের সাথে সম্পর্কিত আইনসমূহ

১৯৭৪ সালের শিশু আইন অনুযায়ী শিশুর বয়স ১৬ বছর। ১৯৯৪ সনের জাতীয় শিশুনীতি অনুযায়ী শিশুর বয়স ১৪ বছর পূর্ণ না হলে কোনো ধরনের শ্রমের সাথে যুক্ত করা যাবে না। কারখানা আইন ও শিশু নিয়োগ আইন অনুযায়ী ১৬ বছর পূর্ণ না হলে কোনো ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমের সাথে যুক্ত করা যাবে না। প্রস্তাবিত শিশু আইন ২০১৩ অনুযায়ী ১৮ বছরের নিচের সবাই শিশু। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০ (সংশোধিত) ২০০৩, বর্তমান অধ্যাদেশ ২০২০ অনুযায়ী শিশুর বয়সকে দেখানো হয়েছে ১৬ বছর। শ্রম আইন ২০০৬ অনুযায়ী ১৪ বছর। সাবালকত্ব আইন অনুযায়ী ১৮ বছরের নিচে সব বয়সীরাই শিশু। মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন ২০১২ অনুযায়ী ১৮ বছর পূর্ণ হয় নাই এমন কোনো ব্যক্তি শিশু। পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধ ও সুরক্ষা আইন ২০১০ অনুযায়ী ১৮ বছর পূর্ণ হয় নাই এমন কোনো ব্যক্তি শিশু। ১২ থেকে ১৬ বছরের শিশুরা যদি অপরাধের জন্য দায়ী বিবেচিত হয়, তাহলে শিশু আইন ১৯৭৪ অনুযায়ী তাদের বিচার হওয়া উচিত। বাল্য বিবাহ নিরোধ আইনে মেয়েদের ১৮ এবং ছেলেদের ২১ বছর বয়স নির্ধারণ করা হয়েছে। ভোটাধিকার ও চাকরির ক্ষেত্রে ১৮ বছর হতে হবে। বাংলাদেশ দন্ডবিধির ৮২ ধারা (সংশোধিত) অনুযায়ী ৯ বছর পর্যন্ত শিশুরা কোনো অপরাধের জন্য দায়ী নয়।

অপরাধের দায়ভার বহনের বয়স

নয় বছরের কম বয়স্ক শিশু কর্তৃক সংঘটিত কোনো কিছুই অপরাধ নহে (ধারা-৮২/দন্ডবিধি ১৮৬০)। নয় বছরের অধিক ও ১২ বছরের কম বয়স্ক এমনশিশু কর্তৃক কৃত কোনো কিছুই অপরাধ নহে উক্ত অপরাধের ব্যপারে যে শিশুর বোধশক্তি এতদূর পরিপক্বতা লাভ করে নাই যে সে স্বীয় আচরণের প্রকৃতি ও পরিণতি বিচার করিতে পারে। এক্ষেত্রে আদালত সিদ্ধান্ত নেবে। দন্ডবিধির ৮৩ ধারা অনুযায়ী ৯ থেকে ১২ বছর বয়েসের শিশুরা অপরাধের জন্য দায়ী নয় যদি না দেখানো যায় যে নিজেদের আচরণের প্রকৃতি ও পরিণতি বোঝার মতো তারা যথেষ্ট পরিপক্বতা প্রাপ্ত হয়েছিল। ১৬ বছরের কম বয়সী শিশুর মামলা কিশোর আদালতে পরিচালিত হতে হবে। অপরাধের দায় বহনের বয়স এবং এ নিয়মের মধ্যে পার্থক্য আছে। উদাহরণস্বরূপ ৯ বছরের কম বয়সী শিশুর উপর কিশোর আদালতের এখতিয়ার থাকলেও ৯ বছরের কম বয়সী শিশুকে কোনো অবস্থাতেই আদালতে হাজির করা যাবে না কারণ সেটা অপরাধের দায়ভার বহনের বয়সের নিচে।

নিম্নোক্ত উপায়ে শিশুরা আইনের সংস্পর্শে এবং সংঘাতে আসে

কোন অপরাধে অভিযুক্ত, শিকার ও অপরাধের সাক্ষী হয়ে। মা-বাবা বা পরিবারের নিয়ন্ত্রণ বহির্ভূত হয়ে অথবা হারিয়ে যাওয়া শিশু। রাজনৈতিক কারণে অপব্যবহার ও অপরাধের সহযোগিতা করে। কিশোর বয়সের আবেগহীন বা হঠাৎ আবেগপ্রবণ হয়ে ওঠার কারণে। মাতা পিতার স্নেহমায়া, মমতা ভালোবাসা ও উপযুক্ত তত্ত্বাবধানের অভাবে শিশু দিশেহারা হয়ে আইনের আশ্রয়ে আসে। শিশুদের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, নিরপরাধ কোনো শিশুকে অযথা অপরাধের শাস্তি প্রদান, পারিবারিক বিশৃঙ্খলা, সংঘাত ও প্রতিকূল পারিবারিক পরিবেশের কারণে শিশুরা আইনের সংস্পর্শে এবং সংঘাতে আসে। দরিদ্রতা, সমাজে শিশুর তিরস্কারের শিকার হওয়া, পিতৃ পরিচয় না থাকা, সমাজে বয়স্কদের দায়িত্বহীনতা, অসৎ সঙ্গে মেলামেশা, পারিপার্শ্বিক পরিবেশের খারাপ প্রভাব, আবাসিক সমস্যা হিসেবে বস্তি জীবনের প্রভাব, শিক্ষার অভাব, উপযুক্ত চিত্তবিনোদনমূলক ব্যবস্থার অভাব, অবহেলা ও অভিভাবক না

থাকা, বেকারত্ব ও উপযুক্ত কর্মসংস্থানের অভাব, ভগ্নপরিবার এর শিশুর হতাশা, পিতা মাতার অপরাধ কর্মকান্ডে সম্পৃক্ততার প্রভাব, প্রলোভনের শিকার, অপরাধ কর্মকান্ডে শিশুদের ব্যবহার ইত্যাদি।

আইনের সংস্পর্শে ও সংঘাতে আসা শিশুরা যেসব সমস্যার সম্মুখীন হয়

  • কিশোর বিচার ব্যবস্থার সংস্পর্শে আসা শিশুদের নিয়ে কাজ করার জন্য অথবা আইনের সংঘাতে আসা শিশু-কিশোরদের বিচারের জন্য কোনো একক কিশোর বিচারব্যবস্থা নেই। বহু আইন, অধ্যাদেশ এবং বিধির প্রাসঙ্গিকতা বিদ্যমান। শিশুদের জন্য কোনো একক আইনের অভাব বিভ্রান্তি এবং ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি করে এবং আইনের সংঘাতে আসা শিশু-কিশোরদের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলে।
  • শিশু সংক্রান্ত আইনের বিধানসমূহ ও প্রচলিত ব্যবস্থাবলী পর্যালোচনা করে এ তথ্যই উন্মোচিত হয় যে কিশোর বিচারব্যবস্থার সংস্পর্শে আসা শিশু কিশোরদের প্রায় সব সমস্যার পরিণতি জেল নয়তো সংশোধনী বা কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্রে পাঠানোর মাধ্যমে সমাধান করা হয়। কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্রে যদি স্থানাভাব ঘটে কর্তৃপক্ষের উচিত হবে শিশু কিশোরদের সেক্ষেত্রে কারাগারে অবরুদ্ধ না রেখে জামিনে মুক্তি দেওয়া। শিশু সম্পর্কিত প্রত্যেকটি বিধানই বলে যে, একটি শিশুকে কখনই জেলে রাখা যেতে পারে না। তবে, ইদানিং কিছু কিছু বিচারক করোনাকালীন ও অন্যান্য কারণে শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থ বিবেচনা করে জামিনে মুক্তি দিয়েছে প্রবেশন কর্মকর্তা ও পরিবারের দায়িত্বে।
  • মেয়ে শিশুর প্রতি বৈষম্য প্রকটভাবে বিদ্যমান রয়েছে। বাংলাদেশে কিশোর বিচার ব্যবস্থার সংস্পর্শে আসা ছেলে ও মেয়েদের প্রতি সমান আচরণ করা হয় না।
  • স্টেকহোল্ডারদের মধ্যে অপর্যাপ্ত সমন্বয়। কিশোর বিচারব্যবস্থার সংস্পর্শে আসা শিশুদের সঙ্গে সক্রিয় এবং কার্যকর আচরণ নিশ্চিত করতে হলে স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায় সকল স্টেকহোল্ডারদের সমন্বিত প্রয়াস অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
  • অপর্যাপ্ত পরিবীক্ষণ বা মনিটরিং। আইনের সংঘাতে আসা শিশু-কিশোরদের সেবাদানের উন্নতি করার লক্ষ্যে এই সব ব্যবস্থার কার্যকর পরিবীক্ষণ অপরিহার্য। শিশুর ক্ষেত্রে অত্যন্ত জরুরি বিশেষ করে গ্রেফতার হলে, তদন্তকালীন, বিচারাধীন, আটকাবস্থায়, রায় প্রাপ্তিতে এবং বিকল্প কর্মসূচির ক্ষেত্রে।
  • শিশুর বয়স নির্ধারণের সমস্যায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যেন শিশুর সর্বোচ্চ সম্ভাব্য বয়স নির্ধারণের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেন যাতে সেই নির্দিষ্ট কার্যপ্রণালী এবং আচরণ এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব হয়। যার ফলশ্রুতিতে শিশুরা অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়। শিশুর বয়স নির্ধারণের জন্য কোনো স্বীকৃত কৌশল ব্যবহার করা হয় না।
  • বয়স নির্ধারণের মেডিকোলিগাল বা ফরেনসিক বিষয়েও ঘাটতি আছে। সরকারী হাসপাতালগুলো দুপুর ০২ ঘটিকায় বন্ধ হয়ে যায় যা বয়স নির্ধারণে সময়ক্ষেপণ করে।

গ্রেফতারকৃত শিশুকে নিম্নোক্ত অধিকারসমূহ সম্পর্কে অবগত করা প্রয়োজন

  • নিরুত্তর থাকার অধিকার (তুমি যা বলবে তা আদালতে তোমার বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হবে)।
  • মৌনতা সম্মতি হিসাবে ব্যাখ্যা না হওয়ার অধিকার।
  • প্রবেশন অফিসারের সাথে যোগাযোগ করার অধিকার।
  • আইনজীবীর সঙ্গে যোগাযোগ করার অধিকার।
  • আইনজীবীর সঙ্গে পরামর্শ করার অধিকার (সংগতি না থাকলে, রাষ্ট্রীয় আইনগত সহায়তা কার্যক্রমের সহযোগিতা নিতে পারে।)
  • পিতা মাতা অথবা অভিভাবকের সঙ্গে যোগাযোগ ও সহযোগিতা লাভ করার অধিকার।
  • পিতা মাতা অথবা অভিভাবকের অথবা আইনজীবীর উপস্থিতিতে জেরার সম্মুখীন হওয়ার অধিকার।

শিশুবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিতকরণে পুলিশের ভূমিকা

  • বন্ধু সুলভ আচরণ করা ও তার কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা। তাকে গুরুত্ব দেওয়া।
  • বয়স্কদের থেকে আলাদা করে রাখা ও  শিশু উপযোগী পরিবেশ রাখা।
  • শিশুর সাক্ষাৎ গ্রহণের সময় ভয়ভীতি না দেখানো যেন শিশুটি মানসিক ভারসাম্য না হারায়। তাদেরকে বকাঝকা না করা, করলে ভয়ে কান্না করে-ফলে সঠিক তথ্য দিতে পারে না।
  • শিশুকে গ্রেফতারের সময় কোনো প্রকার বল প্রয়োগ করা যাবে না। শিশুকে গ্রেফতারের সময় হাতকড়া বা এই জাতীয় কোনো প্রকার উপকরণ ব্যবহার করা যাবে না।
  • গ্রেফতারের পর পুলিশ কর্মকর্তা শিশুটির বয়স নির্ধারণ করবেন ও তা নথিতে লিপিবদ্ধ করবেন।
  • গ্রেফতারের পর পুলিশ কর্মকর্তা শিশুর পিতামাতা ও আইনানুগ অভিভাবককে উক্ত গ্রেফতার সম্পর্কে অভিহিত করবেন।
  • ভারপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তা শিশুদের মামলার জন্য একটি পৃথক রেজিষ্টার সংরক্ষণ করবে।
  • পুলিশ প্রবেশন কর্মকর্তাকে উক্ত গ্রেফতার সম্পর্কে অভিহিত করবেন। পুলিশ প্রবেশন কর্মকর্তা/সমাজকর্মীর উপস্থিতিতে শিশুর জবানবন্দি গ্রহণ করবে;
  • পুলিশ প্রয়োজনে শিশু অধিকার বিষয়ক কোনো বেসরকারি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাকে অবহিত করবেন;
  • শিশুকে গ্রেফতারের কারণ সম্পর্কে ধারণার অভাব থাকার দরুন অযৌক্তিক প্রশ্ন করা থেকে বিরত থাকতে হবে;
  • শিশুদের সঙ্গে সুসস্পর্ক বজায় রাখার জন্য বিভিন্ন উপায় বের করতে হবে। পুলিশ শিশুর পিতা মাতাকে আশ^স্ত করবে যে থানায় আসলে তারা কোনো প্রকার বিপদের সম্মুখীন হবে না;
  • গ্রেফতার হওয়ার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ভারপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তা শিশুটিকে শিশু আদালতে হাজির করবেন;
  • পুলিশের সহযোগিতার মনোভাব থাকতে হবে;
  • গ্রেফতার হওয়া শিশুর জন্য আলাদা চার্জশিট তৈরি করতে হবে। চার্জশিটে উল্লেখ থাকতে হবে শিশুটির বিচার যেন শিশু আদালতে হয়;
  • যদি শিশুটিকে আদালতে হাজির করা না হয় থাহলে তাকে নিরাপদ হেফাজতে রাখার ব্যবস্থা করতে হবে;
  • শিশু সাক্ষীর ক্ষেত্রে বিশেষ যত্ন নিতে হবে;

(চলবে)

লেখক : উপ-পুলিশ কমিশনার (প্রফেশনাল স্ট্যান্ডার্ড অ্যান্ড ইন্টারনাল ইনভেস্টিগেশন ডিভিশন), ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ, ঢাকা

ভালো লাগলে শেয়ার করে দিন :)

0 Comments

Leave a Reply

Avatar placeholder

Your email address will not be published. Required fields are marked *