ই-পেপার

SITE UNDER CONSTRUCTION
বাংলাদেশ পুলিশের মুখপত্র
অব্যাহত প্রকাশনার ৬৩ বছর

মোছাঃ ফরিদা ইয়াসমিন

দোষী শিশু ও কৈশোরকালীন সংকট

শারীরিক পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে আচরণ, চিন্তা, মনো-ভাবনার জগতের আমূল পরিবর্তন হতে থাকে। যেহেতু শারীরিক পরিবর্তন হতে থাকে তাই নিজেদেরকে তারা ‘বড় হয়ে গিয়েছি’ মনে করে। বড়দের মতো করে আচরণ করে যেমন-নিজের মতামত দৃঢ়ভাবে প্রকাশ করতে চাওয়া, নিজের ইচ্ছা-অনিচ্ছা, পছন্দ-অপছন্দ-এর কথা প্রকাশ করা, ছেলেদের দেরি করে বাসায় ফেরা, মেয়েরা বড়দের মতো করে সাজগোজ করে, নিজের প্রতি খুব যত্নশীল হয়, নতুন কিছু করতে চায়। এ সময় বুদ্ধিমান কিশোর-কিশোরীরা তাদের কল্পনাশক্তি দ্বারা হঠাৎ ভালো কিছু আবিষ্কার করে ফেলে। তাদের চিন্তার ক্ষেত্রেও পরিবর্তন হতে থাকে- আমি বড় হয়ে গেছি, আমি বুঝি কি করতে হবে কি করতে হবেনা, ‘আমি কি করব সেটার সিদ্ধান্ত আমি নিজেই নিতে পারি’ইত্যাদি।

শারীরিক পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে চিন্তা ও মনোভাবের পরিবর্তন, পরিমার্জন, পরিবর্ধন ও পরিশীলনের সঙ্গেআবেগের পরিবর্তন-এ বোঝা যায় তার কৈশোরকালীন চঞ্চলতা, যা কোনো কোনো সময় অদম্য।এই সময়ে হাসি, কান্না, আনন্দ, বিরক্ত ইত্যাদি আবেগে প্রকাশভঙ্গির পরিবর্তন হতে থাকে। শিশু বয়সে যেখানে রাগ হলে বা কষ্ট পেলে চিৎকার করে কান্নাকাটি করত এই সময়ে কাঁদতে হলে আড়ালে কাঁদে। এই সময়ে তার শরীরের হরমোনজনিত আপ-ডাউনের জন্য বিপরীত লিঙ্গের প্রতি আকৃষ্ট হওয়ার প্রবণতা থাকে এবং তাদের প্রেম-ভালোবাসা-বন্ধুত্ব এসব বিষয়ে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা বেশি।এই সময় আবেগের দোলাচালের জন্য তাদেরকে মানসিক-শারীরিক কষ্ট দিলে সহজে তা মেনে নিতে পারে না। কোন ভুল-ত্রুটি করে ফেললে এবং তার জন্য দায়ী করলে বা তাদের কাছে পুনঃ পুনঃ তা ব্যক্ত করলে সেটা তাদের জন্য হয় মহাবিরক্তিকর এবং এর জন্য তারা হীতে বিপরীত কাজ করে ফেলে। যেমন: উঠতি বয়সী ছেলে-মেয়েরা আবেগের বশবর্তী হয়ে প্রেম-ভালোবাসায় জড়িয়ে গেলে তা নিয়ে কঠোর হলে তারা দুজনে পালিয়ে যায়। আবেগের বশবর্তীতে কোনো মানসিক সাপোর্ট না পেলে কেউ কেউ একাকীত্বে ভোগে ও হতাশ হয়ে যায়; হীনমন্যতা কাজ করে এবং হঠাৎ চরম সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলতে পারে। তাই তাদেরকে বকাঝকা বা শারীরিক শাসন না করে সময় নিয়ে ধৈর্যের সঙ্গে বন্ধু হয়ে বুঝাতে হবে। তার আবেগের স্বাধীনতা আছে। আমরা দেখেছি অনেক উচ্চবিত্ত ও শিক্ষিত পরিবারের উঠতি বয়সী সন্তান বা কিশোর-কিশোরীরা কিছু ভুল কাজের জন্য নিগৃহীত-নিপীড়িত হয়ে আবেগের বশবর্তী হয়েসামাজিক বা পারিবারিক লজ্জা থেকে বাঁচার জন্য আত্মহননের পথে বেছে নিয়েছিল; এমনকি পরীক্ষায় ভালো করতে না পারার দরুনসামান্য বকুনী খেয়ে আত্মহনন করেছিল; এমনকি বাবা-মার কাছে শখের কোন কিছু চেয়ে না পেয়ে অনেক কিশোর-কিশোরী আত্মহত্যা করেছে। আবেগের বশবর্তী হয়ে অনেকে বাড়ি থেকে বের হয়ে যায় কিংবা বিপথগামী হয়ে যায়।

উপরোক্ত পরিবর্তনগুলো সঙ্গে সামাজিক (peer group)/অভিযোজন বা আত্মীকরণকালীনশিশু-কিশোরদের উপর সমবয়ষ্ক দলের গভীর প্রভাব পড়ে, বন্ধুদের মতো করে সবাই চলার চেষ্টা করে। শিশু বয়সে ছেলে-মেয়েরা একসঙ্গে খেলাধুলা করত। কিন্তুএই সময়ে তারা নিজেদের পছন্দ, মূল্যবোধ, সামাজিক অবস্থান ইত্যাদির ভিত্তিতে বন্ধু তৈরি করে; খুব সহজে অন্যের অনুরক্ত হয়। কৈশোরকালীন সংকটের এই সময়ে কোন বদনেতা, পাড়ার কোনো বড় ভাই তাকে দিয়ে কোনো গোপন কাজ করিয়ে বিপদে ফেলতে পারে। উদাহরণস্বরূপ কিশোর গ্যাং মূলত এই অভিযোজনেরই ফল। Disco boys, Night Star, টিকটক, নয়নবন্ড ইত্যাদি গ্রুপ একই ধরনের হেয়ারস্টাইল, কালার, অলংকার, Tattu, ড্রেসআপসহ বিভিন্ন টাইটেল নাম ধারণ করে দলে দলে ঘোরাফেরা করে। কেউ কেউ সিগারেট, বিয়ার বোতল নিয়ে সাইকেল, হোন্ডা বা প্রাইভেট কার নিয়ে রেস করে। পারিবারিক-সামাজিক-আইনগত বাধা না পেলে এভাবেই তারা অপরাধ কর্মকান্ডে দিকে ধাবিত হয়।

কৈশোরকালে শারীরিক, আবেগীয়, চিন্তাভাবনা ইত্যাদির পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গেব্যক্তিত্বের আমূল পরিবর্তন হয়। ফলে স্বাভাবিকভাবে তাদের মধ্যে বিরাট পরিবর্তন দেখা করা যায়। ব্যক্তি নিজের স্বাধীনতা, নিজের মতো করে কাজ করতে পছন্দ করে। নিজের কথা প্রতিষ্ঠিত করতে পছন্দ করে। ব্যক্তি নিজের সম্মানবোধের প্রতি সচেতন হয়। সে চায় সবাই তাকে সম্মান দিয়ে কথা বলুক। কেউ খোঁচা দিয়ে কথা বললে অনেকে সঙ্গে সঙ্গে প্রতিক্রিয়া দেখায় অথবা রেগে যায়। কেউ কেউ তর্ক করে। সর্বোপরি যে শিশু তার প্রথম শৈশবে যে আচরণ ও ব্যবহার দেখে ও শিখে এসেছে তা তার ব্যক্তিত্বে প্রতিফলিত করে থাকে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই। এই বয়সে অনেকেই আদর্শনীয় ব্যক্তিত্বের সন্ধান পেলে তাকে অনুকরণ-অনুসরণ করে; আর না ফেলে সংকটের মধ্যে পড়ে। কাছাকাছি যাদের কর্মকান্ড দেখে, তা তার জন্য ভালো হোক বা মন্দ হোক-তা অনুসরণ করার চেষ্টা করে। ফলে খুব সহজেই শিশু-কিশোররা তাদের জন্য উপযোগী কিছু না পেয়ে বিভিন্নমুখী মেলামেশার কারণে দোষী শিশু হিসেবে অন্তর্ভূক্ত হয়।

সামাজিক জীবনের কোনো না কোনো পর্যায়ে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই শিশু-কিশোররা বড়দের কথা ও আচরণের প্রতি অমনোযোগী বা কখনো কখনো অমান্যকারী হয়ে থাকে। স্থান-কাল-পাত্রের উপর নির্ভর করে তাদের কোন আচরণ শোভন বা অশোভন- এসব কিছু ক্ষেত্রবিশেষে বস্তিবাসী, ছিন্নমূল, মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত শিশু-কিশোর-তরুনদের আচরণে ভিন্নভাবে প্রকাশ পায়। এটা বড় হওয়ার প্রক্রিয়ার অংশ। এসবের মাধ্যমে শিশু বড়দের প্রত্যাশা ও আগ্রহের বিষয়ে সচেতন হয়ে উঠে। সমাজে বড়রা অনেকসময় অনেক ভুল করেন, এমনকি অনুচিত কাজও করেন যেগুলো শিশু-কিশোরদের চোখে ধরা পড়ে। সেই ভুল শুধরে দেওয়া ও অনুচিত কাজের প্রতিবাদ করার সাহস অনেক শিশু-কিশোরেরই থাকতে পারে। আবার সমাজের বা পরিবারের কোনো অসঙ্গতি দেখলে ফুঁসে ওঠে, প্রতিবাদ করে। কিশোর বয়সটা বিদ্রোহের বয়স। এ সময় তারা বড়দের মূল্যবোধ নিয়ে প্রশ্ন তুলে, অন্যদিকে নিজেদের মূল্যবোধও পুরোপুরি বিকশিত হয়নি। এই বয়সে তারা আবেগে ভাসতে থাকে। কিন্তু মস্তিষ্কের আবেগ নিয়ন্ত্রণের বিকাশটি তখনও পূর্ণঙ্গতা পায়নি। তাদের চিন্তা ক্ষমতা ও বিবেচনাবোধও কম থাকে। ফলে বড়দের সঙ্গে খুব লাগতে থাকে। এজন্য অনেক শিশু-কিশোরকে প্রতিবাদিতার জন্য পারিবারিক ও সামাজিকভাবে বড়দের আক্রোশের বলি হতে হয়েছিল, যা আমরা বিভিন্ন গণমাধ্যমে জেনেছি।যেমন: এ সময় কোনো আপনজনের বিবাহ-বহির্ভূত অন্তরঙ্গ সম্পর্ক দেখে ফেললে বা বড়দের কোনো অনৈতিক কাজের সাক্ষী হলে ওই শিশুকে বিভিন্ন কৌশলে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছিল। সে তার নিজস্ব সত্তা সম্পর্কে ধারণা পায়। সে প্রশ্ন করে, কেন একটি কাজ তাকে করতেই হবে তা জানতে চায়, এই অভিজ্ঞতাগুলোর মাধ্যমে ধীরে ধীরে তার ব্যক্তিত্ব গড়ে উঠে। বেশ কিছু বিষয় সে বড়দের থেকেও নেয়।সঙ্গে সঙ্গে গড়ে উঠে তার নিজস্ব সত্তা। সে ব্যক্তিস্বাতন্ত্রের এবং একধরনের স্বাধীনতার স্বাদ পায়। যখনই তারা তাদের অভিভাবকদের সঙ্গে কোনো দ্বন্দ্বে জড়ায়, তখনই তারা তাদের অভিভাবকদের নিয়ম-নীতির সীমা এবং তাদের নিজেদের আত্মনিয়ন্ত্রণের সীমা সম্পর্কে ধারণা পায়। শিশু যদি বাবা-মায়ের সব কথা অক্ষরে অক্ষরে বিনা প্রশ্নে মেনে নিত তবে সে হয়ে উঠতো বাবা-মায়ের ব্যক্তিত্বের কপি, যা মোটেই কাম্য নয়। মানব প্রজাতির বিকাশে বৈচিত্রের কোনো বিকল্প নেই। ব্যক্তিত্বের কার্বন কপি দরকার নেই। দরকার নতুন ধরণের মানুষ। যেমন: কোনো বাবা-মা অন্যের সঙ্গে নিজের সন্তানের তুলনা করলে বর্তমানের বুদ্ধিদীপ্ত শিশু-কিশোরা তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে উত্তর দিয়ে ফেলে, কেন আমাকে তাদের মতো হতে হবে। সেজন্য বলা যায়, শিশুরা জাতির ভবিষ্যত নয়। শিশুকালীন শিশুদের তাদের মতো থাকতে দিতে হবে। ঐ সময়ে তাদেরকে জাতির ভবিষ্যৎ না ভেবে প্রথমে সুস্থভাবে বাচার অধিকারভুক্ত করতে হবে। তারা বড় হয়ে তাদের ভবিষ্যৎ তারাই নির্ধারণ করবে। কেননা আমরা দেখেছি, পাবলিক পরীক্ষার সময় অনেক বাবা-মা-ই অজ্ঞানতাবশত সন্তানদের হাতে নকল প্রশ্নপত্র ধরিয়ে দিয়ে ভালো রেজাল্ট করার দুঃসাহস দেখিয়ে তাদের নৈতিকতা বিনষ্ট করে! আবার অনেক অভিভাবক পরীক্ষায় ভালো করার জন্য তাদের যথাযথ বিশ্রাম নিতে দেয় না। রাত জেগে বাচ্চাদের উপর পড়ালেখা নিয়ে একপ্রকার জুলুম করে। স্বাভাবিকভাবে প্রত্যেকটা শিশু-কিশোরীই আলাদা বা তাদের ব্যক্তিত্বের গঠন; ধী-শক্তি, ধারণ করার মানদ- যে আলাদা, তা অনেকেই বুঝতে পারে না।

সমসাময়িককালে কৈশোরকালীন পরিবর্তিত কিছু বিষয় চোখে পড়ার মত। অনেক সময় দেখা যায় এই স্বাভাবিক পরিবর্তনগুলো সম্পর্কে অভিভাবকরা যেমন সচেতন নন তেমনি ছেলে-মেয়েরাও সচেতন নয়। ফলে ‘পল্লব’-এর বয়সী কিশোর-কিশোরীদের পরিচালনা করতে বাবা-মার বা অভিভাবকদের প্রায়ই সমস্যায় পড়তে হয়। বাবা-মায়েরা এই বয়সী ছেলে-মেয়েদের বুঝতে চায় না আবার এই বয়সী ছেলে-মেয়েরাও বাবা-মাকে বুঝতে চায় না, ফলে সমস্যার সৃষ্টি হয়। বর্তমানে সার্বিক অস্থিরতা বা হলাহলের সময়ে আকাশ সংস্কৃতির অবাধ হাতছানি, মাদক ও বিভিন্নমুখী নেতিবাচক সংবেদনশীলতার জন্য অনেক বাবা-মা উঠতি বয়সী সন্তানের চোখে ভিলেন বনে যান। তার উদাহরণ- পল্লব-এর বয়সী ছেলে-মেয়েদের বাবা-মায়েরা তাদের ছেলে-মেয়েদের সম্পর্কে বিভিন্ন রকম অভিযোগ করে থাকেন। যেমন-আমাদের কথামত চলে না, রাগ করে, ভাংচুর করে, বড়দের সঙ্গে তর্ক করে, সবসময় বন্ধুদের সঙ্গে নিজের তুলনা করে, কাউকে ভয় পায় না, নিজেকে বড় মনে করে ইত্যাদি।

এই বয়সী ছেলে-মেয়েরা তাদের বাবা-মা সম্পর্কে বিভিন্ন রকম অভিযোগ করে থাকে। যেমন-বাবা-মায়েরা কোনো রকম স্বাধীনতা দিতে চায় না, বেশি বেশি খোঁজ-খবর করে, বিশ্বাসহীনতায় ভুগে, তাদের প্রত্যেকটা সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেয়, তাদের যত্ন করে না, বেশি শাসন করে ইত্যাদি। তাছাড়া এ-ও দেখা যায় বেশিরভাগ বাবা-মা তাদের নিজের শৈশব ও কৈশোরকালীন সময়টাও ভুলে যান। তারা আশা করেন-তাদের উঠতি বয়সী সন্তানরা তাদের মতোই আচরণ করুক। অনেকেই আবার তাদের অপ্রাপ্তি বা অতৃপ্তিগুলো সন্তানের উপর চাপিয়ে দিয়ে জুলুম করে, যাতে তাদের অবাস্তবায়িত স্বপ্নগুলো প্রতিফলিত হয়। এজন্য সন্তানের সঙ্গে বাবা-মায়ের একটা দূরত্ব তৈরি হয়।কিশোর বয়সে, বাবা-মায়ের সাথে ছেলে-মেয়েদের বিভিন্ন বিষয়ে দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়। ছেলে-মেয়েরা কাদের সাথে মিশবে বা কাদের সঙ্গে মিশবে না, কী ধরনের কাপড় পরবে বা পরবে না, কোথায় যাবে বা কোথায় যাবে না ইত্যাদি নানা বিষয়ে দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হতে দেখা যায়। এই সময়ে ছেলে-মেয়েদের স্বাভাবিক পরিবর্তনগুলোর সঙ্গে খাপ খাইয়ে যদি পরিচালনা করা না যায় ,তবে পরবর্তীতে সমস্যা আরো জটিল আকার ধারণ করতে পারে। যেমন-বিষণ্নতা, মাত্রাতিরিক্ত রাগ, সমাজ বিরোধী কাজ এমনকি মাদকাসক্তেও জড়িয়ে পড়তে পারে।

কৈশোরকালীন সংকটে শিশু-কিশোররা যথাযথভাবে যত্ন, ভালোবাসা, সহযোগিতা, সহমর্মিতা না পেলে তার শরীর-মনের অপরিপক্বতার দরুন সহজে বিপদগামী আচরণ করতে পারে। অনেকে নিজেকে আঘাত করে ও মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে। যেমন-তাদের মধ্যে শরীরে স্বল্প বা স্থায়ী আঘাত চিহ্ন, দৈহিক বিকৃতি, স্নায়বিক বৈকল্য, ইন্দ্রিয়ের বৈকল্য, শারীরিক বৃদ্ধিতে স্থবিরতা ইত্যাদির মত অবস্থা দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলতে পারে। ঠিক এইকভাবে রাসায়নিক দিক থেকেও শিশু-কিশোর বয়সীরা সারাজীবনের জন্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে যেতে পারে। যেমন-দোষী শিশুর মধ্যে নিজের সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হতে পারে, ভাষাগত ও বুদ্ধিবৃত্তীয় বিকাশে সমস্যা দেখা দিতে পারে, স্বাভাবিক আবেগ প্রকাশেও বিভিন্ন রকম বিঘ্ন সৃষ্টি করতে পারে। আর এসব সমস্যার কারণে শিশু-কিশোর কিশোরীটি সারাজীবনের জন্য বিভিন্ন ধরনের মানসিক রোগে আক্রান্ত হতে পারে বা হওয়ার আশংকা থাকে। গ্রামে-গঞ্জে বা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর উঠতি বয়সী সন্তানেরা বংশগত বা মনো-দৈহিক-সামাজিকভাবে হয়তো অপ্রকৃতিস্থ হয়েছে। অথবা শৈশবকালীন অপুষ্টি, অসুস্থতা বা শ্লীলতাহানিকর অবমাননা তার মনো-দৈহিকজগতকে ভারসাম্যহীন করেছে। অভিভাবকগণ তা না বুঝে জীন-পরী-ভূতপ্রেতের আছর বলে চালিয়ে তাবিজ, ফকির, ওঝা, কবিরাজ দিয়ে চিকিৎসা করে। এ ধরনের অপচিকিৎসা অনেক উঠতি বয়সী কিশোর-কিশোরীর জীবন বিপন্ন হয়েছে। এসব ঘটনার জন্য তারাবিভিন্ন ধরনের মানসিক সমস্যা যেমন-বিষণ্নতা, উদ্বেগ, আত্মহত্যাপ্রবণ, বিদ্যালয়ের বা স্বাভাবিক কাজকর্মে অনাগ্রহ বা অসাফল্য, বিছানা ভেজানো ইত্যাদি ঘটে থাকে, শিশু বা কিশোর-কিশোরীরা শ্লীলতাহানি ও আবেগীয় নিপীড়নের শিকার হলে তাদের মধ্যে অন্যদের বিশ্বাস করার ক্ষমতাটি নষ্ট হয়ে যায়। প্রাপ্তবয়ষ্কে বা বৈবাহিক জীবনে তারা স্বাভাবিকভাবে তার অন্তরঙ্গ সম্পর্ক স্থাপনে ঔদাসীন্য হয়। মেয়ে শিশু বা কিশোরীরা হয় সন্তানের প্রতি অধিক কর্তৃত্বকারী বা নিয়ন্ত্রণকারী বা একেবারেই খেয়াল করে না। যেমন: EarlyI middle childhood এ যে শিশু বেশি বেশি নৃশংসতা দেখে এসেছে, পারিবারিক পারস্পরিক সম্মান-ভালোবাসা পায়নি বা দেখেনি পরবর্তীতে তারা হীনমন্যতায় ভোগে ও নির্যাতনকারী হিসেবে বেড়ে উঠার আশঙ্কা থাকে।

লেখক : উপ-পুলিশ কমিশনার

(প্রফেশনাল স্ট্যান্ডার্ড অ্যান্ড ইন্টারনাল ইনভেস্টিগেশন

ডিভিশন), ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ, ঢাকা।

ভালো লাগলে শেয়ার করে দিন :)

0 Comments

Leave a Reply

Avatar placeholder

Your email address will not be published. Required fields are marked *