ই-পেপার

SITE UNDER CONSTRUCTION
বাংলাদেশ পুলিশের মুখপত্র
অব্যাহত প্রকাশনার ৬৩ বছর

মোছাঃ ফরিদা ইয়াসমিন

॥৩॥

(পূর্বে প্রকাশের পর)

আজকে নারী শিশুর প্রতি যৌন নৃশংসতার যে ঘটনাগুলো আমরা জানতে পারি তার জন্য সামাজিক, সাংস্কৃতিক, প্রাতিষ্ঠানিক ও গণমাধ্যমে এ ধরণের ঘটনা কেন ঘটছে, তার প্রতিকার কি কি হতে পারে; এর জন্য ব্যক্তি, পরিবার, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে কি কি  ভূমিকা রাখলে ঘটনা ঘটবে না, ঘটনা ঘটার আগেই কি কি প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া যায়; ঘটনা ঘটবার পর কি কি উপায়ে শাস্তি নিশ্চিত করা যায় তা নিয়ে বিস্তর আলোচনা, পর্যালোচনা হয়ে থাকে। পরিশেষে সবাই আইনের যথাযথ প্রয়োগের মাধ্যমে নিপীড়নকারীর শাস্তি নিশ্চিতের মাধ্যমে ঘটনার শিকার নারী বা শিশুটির প্রতি সহানুভূতি দেখিয়ে সহমর্মিতায় আক্ষেপ করে।

আমরা দেখেছি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী ধর্ষণের ঘটনার পর সর্ব শ্রেণী-পেশার নারী-পুরুষ-শিশু সোচ্চার হয়েছিল ধর্ষকের মৃত্যুদন্ড দিয়ে শাস্তি নিশ্চিত করার জন্য। আমরা জানি রিশা, তনু, রূপা, নুসরাত, ভারতের নির্ভয়ার প্রতি কি ধরণের নৃশংসতা ঘটেছিল। মাঝে মাঝে সামাজিক পরিবেশে আলোর চেয়ে অন্ধকারের দাপটটি বেশী দেখা যায়। মুষ্টিমেয় কিছু দুষ্টু ব্যক্তির দ্বারা সভ্যতার বাতাসে বিষবাষ্প ঢুকে যায়। এমনিও দেখেছি- আলোচিত একটি ধর্ষণের মামলায় তথাকথিত চিহ্নিত ধর্ষককে যখন জিজ্ঞেস করি-তুমি যে এসব করে বেড়াও, জানো আইনে এর শাস্তি কি হতে পারে! সে সাথে সাথে উত্তর দিয়েছিল, এই রকম করলে আবার  শাস্তি হয় নাকি। ধর্ষণের মতো জঘন্য ঘটনার জন্য যে এত কঠোর একটি আইন আছে, সেই আইনের জন্য ধর্ষণকারীর মৃত্যুদন্ড হতে পারে তা তথাকথিত আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত বিত্ত-বৈভবে আছন্ন মানুষরূপী জন্তুটি তা মানতে পারে না। পারলে তারা ক্রিমিনাল জাস্টিস সিস্টেমকে টাকার বিনিময়ে বশ করতে চেয়েছিল। তাদের কাছে টাকা বা দামী খাদ্যের বিনিময়ে নারীদের সাথে বন্ধুত্বের নামে যৌন নির্যাতন বা ধর্ষণ মামুলি ব্যাপার। বুঝতে বাকি নাই-নারীটি কোন পর্যায়ে এসে পুলিশের সহায়তা নিয়েছিল এবং নানা প্রলোভন উপেক্ষা  করে দৃঢ়চিত্তে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়েছিল। ধর্ষণ বা নারীর প্রতি নৃশংসতা সমাজে কতটা নিয়মতান্ত্রিক বা থিতু হয়ে গেছে প্রতিদিনের ঘটনায় তা জানা যায়।

অভিশপ্ত ধর্ষণের শিকার নারী বা শিশুদের যে ধরণের মানসিক সংকটের মধ্যে দিনানি পাত করে তার জন্য পরিবারের লোকজন-আপনজনকে এগিয়ে আসতে হবে। আপনজনের অজ্ঞতার জন্য কত নারী ও শিশু যে বিকলাঙ্গ তার উদাহরণ দিয়ে একটি নাম-বিহীন একটি ঘটনা তুলে ধরছিÑঢাকা শহরের নামকরা স্কুলের ৫ম শ্রেণিতে পড়ুয়া একছাত্রী তার বান্ধবীর সাথে ওর বাসায় গিয়েছিল বান্ধবীর নানার সাথে। নানার বয়স প্রায় ৬৫ ঊর্ধ্বে এবং তিনি ছোট একটা সমবায় সমিতির পদাধিকারী। স্কুলগেটে উক্ত নানাকে দীর্ঘদিন অন্যান্য শিশুদেরও চকলেট বিনিময় করতে দেখেছিল। একদিন ছুটির পর বাবা-মার অগোচরে বান্ধবীর বাসায় যায়। নানা তাকে আদর-আপ্যায়ন করে। বান্ধবীকে অন্যরুমে কিছু খেতে ও টিভি ছেড়ে দিয়ে – উক্ত শিশুটিকে পাশের ঘরে নিয়ে মুখ বেঁধে গিয়ে চাকুর ভয় দেখিয়ে ধর্ষণ করে এবং বলে দেয় এই কথা কাউকে বললে মেরে ফেলবে। মৃত্যু ভয়ে শিশুটি বাসায় কাউকে বলেনি। মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে চেপে গিয়ে নানা শারীরিক সমস্যার কথা বলতো। তার জ্বর হয়েছিল, শরীরে ব্যথা ছিল; ঘুমের ঘোরে উঠে চিৎকার করতো; মাথায় প্রচন্ড ব্যথা ছিল; অসংলগ্ন কথাসহ অস্বাভাবিক আচরণ করতো। অন্ধকার ঘরে লুকিয়ে থাকতো। কারো সম্মুখে বের হতো না, প্রয়োজনের অতিরিক্ত কথা বলতো না। যে কোন পুরুষকে দেখলে আতঙ্কে থাকতো, এমনকি তার বাবাকেও দেখলে চিৎকার করে মাকে জড়িয়ে ধরতো। সবসময় বিলাপ করে কি যেন বলতো। বাবাকে এড়িয়ে চলতো। নানা উছিলায় স্কুলে যেত না। শিক্ষিত মা (সরকারী একটি অফিসে চাকুরী করতেন) আদরের কন্যার এসব আচরণে ডাক্তার দেখিয়ে সমস্ত শরীর চেকআপ করায়। শিশুটি সিটিস্ক্যানসহ নানা পরীক্ষায় তার কোন শারীরিক অসুস্থতার লক্ষণ খুঁজে পাওয়া যায় না। তারপর হাতুড়ে কবিরাজের শরনাপন্ন হন। কবিরাজ প্রায় ৬মাস ভেষজ ঔষধ, ঝাড়-ফুঁক, তাবিজ-কবজ নিয়ে জ্বীন-ভূত তাড়ানোর নামে আরো ভয়ংকর ক্ষতি করে তার। শিশুটির কথা মতে, ‘কবিরাজকে দেখলে তার আতঙ্ক লাগতো, সে ভয়ংকরভাবে রাগান্বিত স্বরে জোরে দরজা বদ্ধ করে মন্ত্র-সুরা বলে জ¦ীন-ভূত নামানোর চেষ্টা করতো। এই নিয়ে শিশুটি কতবার অচেতন হয়েও গিয়েছিল। প্রায় প্রতিদিন এসে কবিরাজ শিশুটির চিকিৎসা করতো এবং অচেতন বা বিকারগ্রস্থ অবস্থায়ও শিশুটির চিকিৎসা চলতো।

সামাজিক লোকলজ্জার ভয়ে-মানসিক বিকারগ্রস্থ বা জ্বীন-ভূতে আছন্ন শিশুটির ভবিষ্যৎ কি হবে-এ নিয়ে আপনজন বা শিক্ষিত মামা-চাচার সাথে পরামর্শ করা হয়নি। তারপর হঠাৎ একদিন আমার নম্বরে ফোন করেন শিশুটির পরম আপনজন সংক্ষেপে একটু ধারণা আমার সামনে তুলে ধরেন যে, এই অবস্থায় শিশুটির জন্য কী করা যায়। সাথে সাথে তাকে আমরা নিয়ে আসতে বলি এবং সঠিকভাবে সেবাদানের নিশ্চয়তা দেই। চমৎকার সুন্দর ফুটফুটে একটি ফুলের মতো শিশু বাবা-মার সাথে এসেছিল। বাবাকে বের করে দিয়ে তার প্রাথমিক কথাগুলো মনোযোগ দিয়ে শুনি। তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে rapport buildup করে তার কথা আন্তরিকতার সাথে শুনে অবাক হয়ে যাই। দীর্ঘ প্রায় ১ বৎসর শিশুটির উপর দিয়ে যে ঝড়-ঝঞ্ঝা চলেছিল অবুঝ বাবা-মা তার কিছুই বুঝেন নি। তারা শুধু শিশুটির শারীরিক চিকিৎসা করিয়েছেন। উঠতি বয়সী সন্তানের শারীরিক গঠন, মনো-দৈহিক অবস্থা, প্রজনন স্বাস্থ্য, তার প্রতিবেশ-পরিবেশ, বন্ধু গ্রুপ সম্পর্কে অজ্ঞ ছিলেন। তারা দু’জনেই জীবিকার তাগিদে ব্যস্ত ছিলেন, সন্তানের ভালো-মন্দ শোনার বা বোঝার জন্য মতো বোধ ছিল না। তারা বাহ্যিক সব চাহিদা পূরণ করেছেন-মনের চাহিদার কাছে প্রবেশ করতে পারেন নি। আমাদের নিকট বেশ কয়েকদিন যাওয়া-আসায় সে মানসিকভাবে সুস্থবোধ করে। আমাদের সাথে সখ্যতা করে তার আশা-আকাঙ্খা ব্যক্ত করেছিল যে, বড় হয়ে সে পুলিশ অফিসার হবে। তারপর আমি একজন পেশাদার শিশু মনো-বিশেষজ্ঞের কাছে মানসিক সেবা নেবার পরামর্শ দেই। কিছুদিন তাদের সাথে যোগাযোগ হয়েছিল। আশা করছি এখন সে সুস্থ ও স্বাভাবিক আছে।

আমি পূর্ববর্তী লেখায় বলেছিলাম-কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া ছোট কোমলমতি শিশুরা পরিচিতজন বা আপনজন যেমন: নানা, দাদা-মামা, চাচা-ফুফা, খালু, সৎ বাবা (এমনকি আপন বাবা), দারোয়ান, দোকানদার, প্রতিবেশী আঙ্কেল দ্বারা কোন কিছুর প্রলোভনে যৌন নির্যাতনের শিকার হয়। থানা পুলিশের বিভিন্ন মামলায় আমরা দেখি চকলেট-বিস্কুট, লালফিতা, চূড়ি, লিপস্টিক অথবা খেলনার বিনিময়ে বিকৃত ব্যক্তিরা শিশুদের প্রলোভনে ফেলে যৌন নির্যাতনসহ ধর্ষণ করে থাকে। এমনকি বিকেলের নির্জনতায় বান্ধবীর মামা একা লিফটে পেয়ে ছাদে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণ করে হত্যা করেছে। এমনও তথ্য উপাত্ত আছে ফুটফুটে সন্তান নিয়ে মায়ের দ্বিতীয় বা তৃতীয় বিবাহের পর স্বামী নামক নরপশুটির দৃষ্টি থাকে কোমলমতি শিশুটির প্রতি। সন্তানরূপী শিশুটিকে ন্যাপী চেঞ্জ, ফিডার খাওয়ানো, গোসল করানোর পরও তার কু-দৃষ্টি থেকে শিশুটি রক্ষা পায়নি। মাকে স্বামী নামক প্রাণীটিকে ডিভোর্স দিয়ে সন্তানকে বাঁচাতে হয়েছিল। তারপরও নাছোড় বান্দা তালাকপ্রাপ্ত স্বামীটি উক্ত উঠতি বয়সী শিশুটিকে বিবাহ নামক বন্ধনে আবদ্ধ করে তার রক্ষক হতে চেয়েছিল। পরে আমরা বিকৃত লোকটিকে গ্রেফতার পূর্বক আইনের দ্বারস্থ করতে বাধ্য হই।

সাধারণভাবে কোমলমতি শিশুরা অপরিচিত ব্যক্তির সাথে সহজে মেশে না। আমাদের অভিজ্ঞতায় দেখেছি-১৪ বা তার নীচের বয়সী কত শিশু যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে তার প্রায় সবাই পরিচিতজন বা আপনজন বয়স্ক লোকের দ্বারা অথবা মাদকসেবী কোন নরপশু দ্বারা। উদাহরণ স্বরূপ ৭ম শ্রেণিতে পড়ুয়া প্রিয় বান্ধবীকে বাসায় নিয়ে গিয়ে রাতে একসাথে ঘুমিয়ে ছিল। গভীররাতে বান্ধবীর বাবা ‘তাকে’ অন্য রুমে নিয়ে ধর্ষণ করে। তাই বাবা-মাকে তার শিশুটির নিরাপত্তার কথা ভাবতে হবে ও নিরাপদ আবাসনে রাখতে হবে। শিশুটির খেলতে যাওয়া, মেলামেশা, ঘুমানোর জায়গা, কারো বাসায় গমনাগমনের ব্যাপারে যত্নবান হতে হবে। এ ব্যাপারে ছেলে ও মেয়ে উভয় সন্তানের প্রতি তীক্ষ্ন দৃষ্টি রাখতে হবে। প্রযুক্তির এই হলাহলের যুগে যে কোন শিশু খারাপ কিছুর প্রতি আসক্ত হয়ে পর্ণগ্রাফির শিকার হতে পারে। পর্ণগ্রাফির অবাধ বিচরণের ফলে ভার্চুয়াল জগতের লালসায় আসক্ত হয়ে মানুষের বিকৃত মনোভাব তৈরি হয়েছে। এই বিকৃতির শিকার আপনার ঘরের ভালোবাসার মানুষটির দ্বারাও আপনার প্রিয় সন্তানটির জীবন বিপর্যস্ত হতে পারে।

ধর্ষণের মতো ন্যাক্কারজনক ঘটনার শিকার হলে ভিকটিম বা তা থেকে আশ্রয়প্রার্থীর প্রতি সবার যা করণীয় তা বিভিন্ন বিশেষজ্ঞ বা পেশাজীবির ভাষ্যমতে-যেকোনো ধরণের যৌন নির্যাতনের তাৎক্ষণিক আর দীর্ঘমেয়াদি মানসিক সমস্যা দেখা দিতে পারে। যৌন নিপীড়নের শিকার হওয়ার প্রথম ২৪ ঘণ্টার মধ্যে নারী বা শিশুর দুশ্চিন্তা, উৎকণ্ঠা ও আতঙ্ক দেখা দেয়। নির্যাতনের পরপরই তীব্র মানসিক চাপজনিত সমস্যা বা একিউট স্ট্রেস রিঅ্যাকশনের মতো মানসিক সমস্যা দেখা দিতে পারে। কিংকর্তব্যবিমূঢ়, অপলক তাকিয়ে থাকা, বিষয়টিকে স্বপ্ন মনে করে অবিশ্বাস করা, অস্থিরতা, দ্বিধাগ্রস্থতা, রাগ করা, আক্রমণাত্মক হয়ে যাওয়া, কান্নাকাটি করা

অথবা নিজেকে গুটিয়ে ফেলার মতো ঘটনা ঘটে। অপরাধবোধে ভোগা, নিজেকে শেষ করে ফেলার চিন্তা করা, কখনো কখনো কষ্ট আর দুঃখের বিপরীত আচরণ অর্থাৎ অতি উৎফুল্লতা প্রকাশের চেষ্টাও করে।

নির্যাতনের ঘটনা ঘটার কয়েক দিন পর থেকে কয়েক সপ্তাহের মধ্যে প্রতিক্রিয়াগুলো একটু পাল্টাতে থাকে। ভীতসন্ত্রস্ত, অতি সতর্ক ভাব, বিরক্তি, রাগান্বিত ভাব এবং ঘুম কমে যেতে থাকে। নির্যাতনের স্মৃতি বারবার মনে পড়া, কান্নাকাটি করা, নেশাদ্রব্য গ্রহণ বা আত্মহত্যার চেষ্টা করে অনেকে। নির্যাতনের দীর্ঘ সময় পরে পোস্টট্রোম্যাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার, বিষন্নতা, আর ব্যক্তিত্বের সমস্যা (personality disorder) দেখা দিতে পারে। এ পর্যায়ে নির্যাতনের দুঃসহ স্মৃতি বারবার মনে পড়া, নির্যাতন সংশ্লিষ্ট উদ্দীপক (স্থান, সময়, ছবি, ঘটনার বিবরণ) এড়িয়ে চলা, নিজের ক্ষতি করার প্রবণতা, আত্মবিশ্বাস কমে যাওয়া, সব কাজে উৎসাহ হারিয়ে ফেলে। মেয়েশিশুরা পুরুষ দেখলে ভয় পাওয়া, কোথাও যেতে না চাওয়া, হঠাৎ বিছানায় প্রস্রাব করা শুরু করতে পারে।

(চলবে)

লেখক : উপ-পুলিশ কমিশনার

(প্রফেশনাল স্ট্যান্ডার্ড এন্ড ইন্টারনাল ইনভেস্টিগেশন ডিভিশন)

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ, ঢাকা।

ভালো লাগলে শেয়ার করে দিন :)

0 Comments

Leave a Reply

Avatar placeholder

Your email address will not be published. Required fields are marked *