ই-পেপার

SITE UNDER CONSTRUCTION
বাংলাদেশ পুলিশের মুখপত্র
অব্যাহত প্রকাশনার ৬৩ বছর

কাজল বন্দ্যোপাধ্যায়

আমাদের উপমহাদেশের উপনিবেশবাদবিরোধী সংগ্রামের অনেক ত্রুটি-দুর্বলতা এখন কমবেশি স্বীকৃত। এখানে ধর্মীয় পরিচয়ের এবং স্বার্থের বোধ নিজের মতো করেই প্রবল ছিল। ঔপনিবেশিক এবং স্থানীয় শোষকশ্রেণি তাকে উস্কে দেয়। বৃটিশবিরোধী সংগ্রামে অংশীদারদের মধ্যেও তাদের প্রতিনিধিত্ব ছিল। ফলে, স্বাধীনতার জন্য জনগণের মিলিত এবং ঐক্যবদ্ধ সংগ্রাম অগ্রসর হতে পারেনি। ধর্মসাম্প্রদায়িক বিভাজন ঘটে এবং দুটো নতুন রাষ্ট্রের পত্তন হয়।

তবে, মানবজীবন ও সভ্যতা যে বহু-বহু উপকরণ-উপাদানে গঠিত আমরা কেউ কিছু সময়ের জন্যে তা বিস্মৃত হতে পারি। ভাবতে পারি যে একক কোনো নিয়ামকই চিরদিন সব কিছুকে চালনা করবে। কিন্তু কোনো সঙ্কীর্ণ এবং উগ্র ঝোঁককেই দীর্ঘকাল চাঙ্গা রাখা যায় না। আর, নতুন রাষ্ট্র পাকিস্তানের, বিশেষত এর পূর্ব অংশের ঘটনাবলী এসব সত্যের প্রমাণ উপস্থিত করেছিল বিস্ময়কর দ্রুততায়। ধর্মের ভিত্তিতে বিশাল দূরত্বের দুটো ভূখন্ড পাকিস্তান রাষ্ট্র্রে শামিল হয়েছিল। কিন্তু, রাষ্ট্রের ভাষার তথা ইহলৌকিক জীবন পরিচালনার প্রশ্ন ’৪৭ এর আগষ্টের  পূর্বেই মাথা তুলেছিল। এই ইস্যুটিকে সামাল দেওয়ার জন্যই বোধ করি আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. জিয়াউদ্দিন ’৪৭-এর জুলাই মাসে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উর্দুর পক্ষে সুপারিশ করেছিলেন এবং তাতে তিনি ধর্মগ্রন্থের ভাষাটির হরফে রচিত আর একটি ভাষাকে অর্থাৎ উর্দুকে গ্রহণ করার কথা বলেছিলেন। পাকিস্তান রাষ্ট্র পরিচালনায় প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক কর্তৃত্বের আসনে অধিষ্ঠিত মোহাজের সম্প্রদায়ের ‘আপন ভাষা’ হওয়ার সুবিধেও উর্দুর ছিল। এইভাবে আধ্যাত্মিক এবং ইহলৌকিক উভয় বিবেচনায় পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ভাষা বাংলা সম্পূর্ণ অবহেলার বস্তুতে পরিণত হতে চলেছিল। প্রকৃতপক্ষে, পাকিস্তানের প্রভুদের ইহলৌকিক স্বার্থকে রক্ষা করার  জন্যেই তখন আধ্যাত্মিকতার অস্ত্রটিকে ব্যবহার করা হয়েছিল।

তবে, আমরা লক্ষ্য করতে এবং জোর দিতে চাই  এই ঐতিহাসিক পরিস্থিতির ওপর যে আধ্যাত্মিকতা তথা ধর্মীয় ভ্রাতৃত্বের ভিত্তিতে পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ও পরিচালনার যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, লক্ষ্যার্জনের জন্য তা ছিল অত্যন্ত অপর্যাপ্ত এবং সঙ্কীর্ণ। আর, জনজীবন তথা বাস্তব জীবনের সাথে যুক্ত ভাষার প্রশ্ন যখন এলো তখনই এই দুর্বলতা ধরা পড়ে গেল। পাকিস্তানের গণপরিষদ পরিচালনার ভাষার প্রশ্নে এর সদস্য ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত যে সংশোধনী প্রস্তাব করেছিলেন এবং তার পক্ষে যে চক্ষুরুণ্মীলক ভাষণ তিনি দেন ১৯৪৮ এর ২৫ তারিখে, তার গুরুত্বও সেখানেই। খাঁটি দেশপ্রেমিক ছিলেন বলেই এবং এমনকি জিন্নাহর ‘সেক্যুলার’ পাকিস্তানের চেতনার স্থানে দাঁড়িয়েই কংগ্রেস-সদস্য ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত সেদিন “or Bengali” শব্দবন্ধ যোগ করার যুগপৎ সাহস ও উদারতার প্রমাণ দেন। তাঁর চোখ যেমন ছিল না ধর্মান্ধতায় অন্ধ, তেমনি দেশপ্রেম ও মানবপ্রেমের আলোয় তিনি দেখতে পেয়েছিলেন কেন পাকিস্তান রাষ্ট্র পরিচালনায় বাংলাভাষার ব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ ছিল। হাটের-মাঠের তথা প্রকৃত জনজীবনের পরিস্থিতি উল্লেখ করে তিনি যে বক্তৃতা করেন তার যুক্তি এবং ন্যায্যতাকে অস্বীকার করার কোনও উপায়ই যখন কারো ছিল না, তখন লিয়াকত আলী খান এবং অন্যান্য মুসলিম লীগ দলীয় বক্তা ধীরেন্দ্রনাথকে তাদের স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে পাকিস্তানের ‘দুশমন’ সাব্যস্ত করার প্রয়াস পেয়েছিলেন। বিস্ময়কর যে পূর্ব-পাকিস্তানের মুসলিম লীগ দলীয় সদস্যগণও এর কিছুমাত্র ব্যতিক্রম ছিলেন না। বিপরীতে ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত শুধু যে ধর্মান্ধতামুক্ত ছিলেন, তা নয়; ছিলেন তিনি যুক্তিবাদী, বাস্তবতালগ্ন এবং জনকল্যাণকামী। ভাষা আন্দোলনের কিংবা ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের সংগ্রামের যে জয় শেষ পর্যন্ত ঘটে, তাকেও প্রকৃতপক্ষে চিহ্নিত করা দরকার ভাষার সঙ্গে যুক্ত জনজীবনের এবং মানুষের সংগ্রামী সত্তার জয় হিসেবে। ভাষা ধর্মনিরপেক্ষ, ভাষা সার্বজনীন এবং ইহজাগতিক।  ’৫২ সনে এবং ’৭১-এ এরূপ সবকিছুই জয়যুক্ত হয়েছিল। তবে তার  আগে আমরা ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের ভাষণের মধ্যে উপস্থিত যুক্তি, বাস্তববাদিতা, ব্যাপক-জনজীবন-সম্পর্কিত জ্ঞান ইত্যাদির দৃষ্টান্ত দিতে চাই, গণপরিষদে তিনি বলেছিলেন :

Sir, in moving this–the motion that stands in my name–I can assure the House that I do so not in a spirit of narrow provincialism….I know, Sir,  that Bengalee is a  provincial language, but so far our state is concerned–it is the language of the majority of the people of the state… Out of six crores and ninety lakhs of people inhabiting this state, 4 corers and 40 lakhs of people speak the Banglalee language. So, Sir, what should be the state language of the state? (উদ্ধৃত: মিনার মনসুর : পৃ: ৩৭)

ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের ভাষণে এর পরে ছিল ভাষার ক্ষেত্রে পূর্ব পাকিস্তানে উদ্ভূত পরিস্থিতির ব্যাপক ও প্রত্যন্ত অংশের বিবরণ। কিন্তু আমাদের উদ্ধৃতিতেই দেখা যাচ্ছে যে গণপরিষদ পরিচালনার ভাষার সূত্র ধরে শুরু করে তিনি কিন্তু চলে গিয়েছিলেন পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষার প্রশ্নে বলেছিলন, “The state language of the state should be the which is used by the majority of the people of the state, for that, Sir, I consider that Bengalee is a lingua franca of our state.” (উদ্ধৃত: মিনার মনসুর : পৃ: ৩৭-৩৮) এও লক্ষণীয় যে ধীরেন্দ্রনাথ এখানে একবারও কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠতার যুক্তিতে বাংলাকে পাকিস্তানের এক নম্বর বা একক রাষ্ট্রভাষা করার দাবি করেননি।

ধীরেন্দ্রনাথ স্মারক গ্রন্থের প্রবন্ধে ড. মুস্তাফা নূর উল ইসলাম লিখেছেন, “পাকিস্তান আন্দোলনের কেন্দ্রীয় হাইকমান্ডে যাদের অবস্থান ছিল তাদের প্রায় সবারই আপন ভাষা উর্দু।” (ধীরেন্দ্রনাথ স্মারকগ্রন্থ, পৃ: ১২৩) এখানে তিনি পাকিস্তানে তখনকার উর্দুপন্থীদের পরিচয় এবং তাদের প্রাধান্যের রহস্যকে ব্যাখ্যা করেছেন। বিপরীত এক রহস্য এই যে গণপরিষদের ভাষণে ধীরেন্দ্রনাথ চলে গিয়েছিলেন পূর্ব পাকিস্তানের প্রত্যন্ত এলাকা এবং আম-মানুষের সমস্যা সম্পর্কে বলতে। অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম বিষয়টি লক্ষ্য করেছেন, এবং ভাষণের সংশ্লিষ্ট অংশ সম্পর্কে লিখেছেন :

তিনি পূর্ব পাকিস্তানের কোটি কোটি মানুষের অনুভূতির কথা তুলে ধরে বলেন সেখানে যখন একজন সাধারণ মানুষ পোষ্ট অফিসে যায় এবং একটি মনি-অর্ডার ফর্ম নেয় তখন দেখতে পায় যে তা উর্দু বা ইংরেজি ভাষায় ছাপা, বাংলা ভাষায় নয়। গ্রামের একজন গরিব কৃষক যখন তার পুত্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ছাত্রকে টাকা পাঠাতে চায় তখন তা ইংরেজি ও উর্দূ ভাষায় ছাপা বলে তাকে দূরবর্তী শহরে যেতে এবং ঐ মনি-অর্ডার অনুবাদ করিয়ে টাকা পাঠাতে হয়। যখন কোনো গরীব কৃষক একখন্ড জমি কেনাবেচা করতে চায়  এবং স্ট্যাম্প ভেন্ডার এর কাছে যায় তখন বুঝতে পারে না যে এ স্ট্যাম্প ন্যায্যমূল্য অনুযায়ী কি না কারণ, ঐ স্ট্যাম্পের মূল্য বাংলায় ছাপা নেই, রয়েছে ইংরেজি বা উর্দুতে। (ধীরেন্দ্রনাথ স্মারকগ্রন্থ, পৃ: ১৫৫)।

ভাষার সাথে ব্যাপক জনজীবন, উৎপাদন, জীবিকা, ইত্যাদির সম্পর্ক যদি আমরা মনে রাখি তাহলে আমাদের দেশের সুনির্দিষ্ট ঐতিহাসিক পরিস্থিতিতে ভাষার প্রশ্নটির বিস্ময়কর এক চেতনাসঞ্চারী ভূমিকাকে আমরা বুঝে নিতে পারবো। ধর্মের সাহায্যে যেমন নেশা তৈরি করা সম্ভব হয়েছিল, ভাষা আমাদের সেই ঘুম টুটিয়ে দিয়েছিল। আমার বিনীত ধারণা হলো, তখনকার ঘটনাবলীর গভীরতর ব্যাখ্যা আমাদের নিয়ে যেতে পারে বাঙালিত্বের চেয়েও সত্যতর কিছু পরিচয় উপলব্ধিতে, যার টানে এগিয়ে গিয়ে ধীরেন্দ্রনাথ দেখিয়েছিলেন মাতৃভাষা ব্যবহারের সুযোগের অভাবে এ ভূখন্ডের গোটা জনগোষ্ঠীই কী সমূহ ধ্বংসের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছিল। অর্থাৎ, সেক্যুলার জাতীয়তাবাদও কোনো থেমে পড়ার স্থান নয়–যদিও একটা সময় পর্যন্ত-এর ভিত্তিতে বাঙালি পরিচয় প্রতিষ্ঠাই আমাদের জন্যে ছিল এক অত্যন্ত দুরূহ সংগ্রাম। সেই বাঙালি পরিচয়কে পেরিয়ে এগিয়ে যেতেও কোনো মানসিক বাধা বোধ করেননি ধীরেন্দ্রনাথ।

আমি এও বলবো যে, বাংলা ব্যবহারের বিষয়টি যতো মোক্ষম ছিল তখন পূর্ব পাকিস্তানের আমমানুষের সার্বিক বিকাশের পক্ষে, তাতেও কেটে গিয়েছিল অনেক বাধা। বক্তৃতায় ধীরেন্দ্রনাথ তাই পাঁচ বার উল্লেখ করেছেন “Common man” শব্দবন্ধটি, দু’বার উল্লেখ করেছেন “Poor cultivator” শব্দবদ্ধ। ইতিহাসে জাতীয় সঙ্কটের পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের কিংবা শ্রমিক-কৃষকের দারস্থ হওয়াটা প্রচলিত বুর্জোয়া রীতি হতে পারে। তবে, ব্যক্তি ধীরেন্দ্রনাথ দত্তকে দেখা যায় নিজের পূর্বপুরুষদেকে ‘কাঠুরিয়া’ এবং ‘মানুষ’ হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিতে, জমিদার পরিচয়ের বাইরে এসে দাঁড়াতে। এটা ব্যক্তিপর্যায়ে শ্রেণিচ্যুত হওয়ার মতো প্রয়াস। সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জীর অনুসারী আবদুল্লাহ রসুলকে ধীরেন্দ্রনাথ চিরদিন নিজের ‘রাজনৈতিক গুরু’ মেনেছিলেন। এখানে দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে লিয়াকত আলী খান গং যখন পাকিস্তানকে মুসলিম রাষ্ট্র  ঘোষণা করে মুসলিম জনগোষ্ঠীর ভাষা হিসেবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হওয়ার উপযুক্ত ঘোষণা করেছেন উর্দুকে, ধীরেন্দ্রনাথ তাঁর বক্তৃতায় কখনো ধর্মসম্প্রদায়িক পরিচয়ের প্রশ্নটি তোলেননি। বিপর্যয় থেকে বাঁচার জন্যে হলেও জনগণের অর্থাৎ সকল সম্প্রদায়ের মিলিত সংগ্রামের অবস্থানটি এভাবে তখন গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠেছিল। ধীরেন্দ্রনাথ অত্যন্ত অনায়াসে তাকে গ্রহণ করে পরবর্তী সময় এবং বাদবাকি দেশবাসীর জন্যে তাকেই অনুসরণীয় করে তুলেছিলেন। এই যে পড়সসড়হ সধহ, সরকারি কাগজপত্রে বাংলা ব্যবহৃত না হওয়াতে যাঁদের সমস্যা হচ্ছিল বলে ধীরেন্দ্রনাথ তাঁর বক্তৃতায় বলেছেন, তাঁরা কিংবা তাঁদের ভোগান্তি কি অলীক? মিথ্যে? তা যে নয়, ৫২-র ভাষা আন্দোলনের ব্যাপকতাই তার প্রমাণ। গণপরিষদে পূর্ব পাকিস্তানের মুসলিম লীগ দলীয় সদস্যরা ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের প্রস্তাবের বিপক্ষে ভোট দিয়ে বরং এদেশে নিজেদের রাজনৈতিক কবর রচনা করেছিলেন; ’৫৪-র নির্বাচনে তাদের ভরাডুবি হয়। বদরুদ্দিন উমর লিখেছেন নিম্নরূপ :

পাকিস্তান গণপরিষদে ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের উপর্যুক্ত ভাষাবিষয়ক প্রস্তাব এবং এর ওপর সরকারি পক্ষের বিভিন্ন মতামত, বিশেষত খাজা নাজিমুদ্দীনের বক্তব্য পূর্ব বাংলায় তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। সে পর্যন্ত ভাষার দাবি মোটামুটিভাবে ছাত্র-শিক্ষক-বৃদ্ধিজীবীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও এর পরই ভাষা আন্দোলন দ্রুত পরিগ্রহ করে রাজনৈতিক চরিত্র। একটি রাজনৈতিক আন্দোলন হিসেবে ভাষা আন্দোলন পূর্ব বাংলার সর্বত্র সংগঠিত হতে শুরু করে এবং তার পর ১৯৪৮-এর ১১ই মার্চ সারা পূর্ব বাংলায় প্রতিরোধ দিবস হিসেবে ধর্মঘট ও বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়। এই বিক্ষোভে শুধু ছাত্ররাই নয়, শ্রমিক এবং সরকারি কর্মচারীও অংশগ্রহণ করেন। এ দিক দিয়ে ধীরেন্দ নাথদত্ত ভাষা আন্দোলনের সূচনাপর্বে পালন করেন এক অতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। (ধীরেন্দ্রনাথ স্মারকগ্রন্থ, পৃ: ১৩১-৩২)।

ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত যা-যা পরবর্তী সময়ের ঘটনাস্রোতকে নির্ধারণ করেছে, ১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ তারিখে ঢাকায় প্রদত্ত মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর ভাষণও তার অন্তর্ভুক্ত, যেখানে জিন্নাহ বলেছিলেন… “Let me make it very clear to you that the state language of Pakistan is going to be Urdu and no other language. Any one who tries to mislead you is really the enemy of Pakistan” (উদ্ধৃত: মিনার মনসুর : পৃ: ৪৩) বলা হয়েছে যে জিন্নাহর এই বিস্ফোরক এবং উস্কানিমূলক ভাষণও ছিল গণপরিষদে ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের সংশোধনী প্রস্তাবের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া। তবে, ধীরেন্দ্রনাথও জিন্নাহর এই বক্তৃতার একরূপ জবাব না দিয়ে ছাড়েননি। ১৯৪৮-এর ৬ এপ্রিল পূর্ববঙ্গ ব্যবস্থাপক সভায় গণপরিষদে উত্থাপিত সংশোধনী সম্পর্কে তিনি নিম্নরূপ বক্তৃতা দেন; সেখানে তার দেওয়া ব্যাখ্যাটি দেশপ্রেম, আত্মবিশ্বাস এবং দেশবাসীর কল্যাণকামনায় পূর্ণ:

এই সংশোধনী প্রস্তাব প্রকৃতপক্ষে জনগণের নিজেদের: আমি প্রতিনিধি মাত্র। এই প্রস্তাব অনুসারে কাজ করলে জনসাধারণের যথেষ্ট কষ্ট ও অসুবিধা লাঘব হতে পারত। এই সব প্রশ্ন উত্থাপন করলে উজিরে আজম ও মন্ত্রীবর্গ নানা কথা বলে থাকেন। আমি আপনাদের কাছে  জানাতে চাই এটা সমর্থন করুন বা না করুন, এটাই জনগণের দাবি। আমি পাকিস্তানের অধিবাসী হিসেবে এবং পাকিস্তানের প্রতি আমার আনুগত্য আছে বলে এই অসুবিধার কথা পাকিস্তান গণপরিষদে পেশ করেছিলাম। আমার এর ভিতর কোনো উদ্দেশ্য ছিল না। (উদ্ধৃত: মিনার মনসুর : পৃ: ৪৩)

নিজের সম্পর্কে এই যে ‘প্র্রতিনিধি’র মনোভাব, আমি এর প্রতিই সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই। আর, পরবর্তী ঘটনাবলীর আলোতে দেখলে এটা স্পষ্ট যে পূর্ব পাকিস্তানের যে আমমানুষের কষ্ট ও অসুবিধা দূর করার চেষ্টা ধীরেন্দ্রনাথের উত্থাপিত সংশোধনীতে ছিল, তারা ঠিকই ৫২-র ভাষা আন্দোলনে শরীক হয়েছিলেন, এবং তাদেরই কেউ কেউ রফিক, সালাম, বরকত, জব্বার, যারা ২১ ফেব্রুয়ারি তারিখে ঢাকার রাজপথে শহীদ হয়েছিলেন। অন্য কোনোভাবে তাঁদের আত্মদান এবং তখনকার বৃহৎ গণআন্দোলনকে ব্যাখ্যা করা যায় না। এবং সেদিক থেকে বিবেচনা করলে ২৫ ফেব্রুয়ারি তারিখে করাচিতে প্রদত্ত ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের ভাষণাটিতে শুধু একপ্রকার দূরদৃষ্টিই ছিল না, প্রকৃত জনঘনিষ্ঠ রাজনীতির দীর্ঘ অভিজ্ঞতার শক্তিতে তিনি সেদিন একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত বাঙালির জাতীয় মুক্তি সংগ্রামের পথ ছকে দিয়েছিলেন। আমমানুষের স্বার্থরক্ষার শিক্ষা সেখান থেকে সংশ্লিষ্ট সকলকে পরবর্তী সময়ের জন্যে সঠিক পথটি দেখিয়েছে। মানুষের মিলিত সংগ্রামের শিক্ষা, সাবর্জনীন রাজনীতির শিক্ষা এবং অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির। ধীরেন্দ্রনাথের দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের অর্জন ছিল এসব। এবং সকলেই এটা লক্ষ্য করেছেন এবং স্বীকার করেছেন। আজ তাকাতে হবে ব্যক্তি ধীরেন্দ্রনাথের অন্য কোনো পরিচয়ের দিকে নয়, তাঁর যে বিশিষ্ট জীবনপথ, তাঁর যে উদার অসাম্প্রদায়িকতা, জনঘনিষ্ঠতা, দৃষ্টির প্রসার ও প্রখরতা, সাহস, ইত্যাদির দিকে। সেখানে তার রাজনৈতিক দল জাতীয় কংগ্রেস সম্পর্কিত ধারণাদির সাহায্যেও সব কিছু ব্যাখ্যা করা যাবে না। বদরুদ্দিন উমরের একটি চিঠির জবাবে ধীরেন্দ্রনাথ জানিয়েছিলেন যে গণপরিষদে প্রদত্ত তার বক্তৃতাটি পূর্বাহ্নে কংগ্রেস সংসদীয় দলে আলোচিত বা গৃহীত কিছু ছিল না। কিন্তু, শুধু কংগ্রেস দলীয় সদস্যরা নয়, পরবর্তী গোটা সময় ও গোটা স্বদেশ সে বক্তৃতাকে, তার সত্য ও শিক্ষাকে সমর্থন করেছে, প্রমাণ ও অনুমোদন করেছে। ঐ এক বক্তৃতায় বিধৃত ছিল ধীরেন্দ্রনাথের সত্য ও গভীর জীবনসংগ্রামের নির্যাস, এবং তা শুধু বাঙালির নয়, বিশ্বব্যাপী এবং সর্বকালের মানবের শুধু আত্মপরিচয় নয়, তাবৎ সত্য সন্ধানের রূপরেখা। ব্যক্তি সেখানে, আবারও বলি, বাস্তবতাকে এবং মানবতাকে ধারণ করে ব্যক্তির সকল সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করতে সক্ষম। অসাধারণ গুণাবলী এবং ঐতিহাসিক ভূমিকাগুলোর জন্যেই আমরা ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের উচ্চমূল্য দেখবো, যেখানে তিনি সরাসরি মিশেছেন রফিক, সালাম, বরকত, জব্বারের সঙ্গে এবং ৭১-এর মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে। আর, সরাসরি না হলেও, আদর্শ আর মূল্যবোধে যুক্ত হয়েছেন তিনি পৃথিবীর সকল কালের সকল মুক্তিসংগ্রামীর সঙ্গে।

দেশবাসীর মিলিত ও ঐক্যবদ্ধ জীবনের প্রকাশ তাদের ভাষায়, এক বা একাধিক। ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে স্বাধীন হয়েছিল বাংলাদেশ। একটি পর্যায়ান্তরণের আশা ছিল তখন, সম্ভাবনা। কিন্তু নির্বিশেষ জনগণের ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামের ফল বাংলাদেশ রাষ্ট্রকে দ্রুতই নানা গোষ্ঠী-চিন্তায় পেয়ে বসে। ’৭৫-এ বঙ্গবন্ধুর হত্যাকান্ডে মধ্য দিয়ে চক্রান্ত-ষড়যন্ত্রের শক্তি দ্রুতই কামিয়াব হয়। সাম্প্রদায়িকতাবাদী এবং সাম্রাজ্যবাদীদের যোগসাজশে বিভাজন ও দমন-নিপীড়নের শক্তি রাষ্ট্রক্ষমতায় চেপে বসে। পাকিস্তান-সময়ের যাবতীয় সঙ্কীর্ণ চিন্তাভাবনা, পরিকল্পনা, ব্যবস্থা আবার কার্যকর হতে শুরু করে। সংবিধান এবং রাজনীতির ধর্মায়ন শুরু হয়ে যায়।

ধীরেন্দ্রনাথ, সালাম, বরকত, জব্বারসহ অসংখ্য শহীদের মিলিত আত্মদানের ফল যে বাংলাদেশ রাষ্ট, তার ইতিহাসে যেমন ব্যর্থতা এবং বিশ্বাসঘাতকতার অনেক পর্যায় রয়েছে, আবার পুনরুদ্ধার এবং পুনর্জাগরণেরও। রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতার হত্যাকারীদের বিচারের রায় কার্যকর করার ধারায় আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। আরো অনেক সব দায় মেটানোর পথে। ভিন্ন ফলের বাস্তবতা ইতোমধ্যেই আমাদের এক যাত্রার কিংবা মিলিত সংগ্রামের দাবিকে উপহাস করছে; স্বপ্নভঙ্গ-আশাভঙ্গের কারণ হয়ে উঠেছে।

আমার ব্যক্তিগত ও বিনীত অভিমত হচ্ছে একটি সমাজে কতোগুলো অপরিহার্য আদর্শিক লড়াই থাকে। তাকে পাশ কাটিয়ে এবং প্রয়োজনীয় মূল্য না দিয়ে স্থায়ী কোনো পরিবর্তন আশা করা যায় না। জনসেবার প্রতিযোগিতায় প্রতিপক্ষকে হারানোর পথে না গিয়ে আমরা কি রাজনীতির ধর্মায়নের প্রতিযোগিতায় নামবো?

নি:স্বার্থ ও জনসেবার রাজনীতির পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে না পারলে ধর্মব্যবসায়ীদের রাজনীতির সাথে মুক্তিযুদ্ধের পতাকাবাহীদের বাস্তব ভূমিকায় তেমন কোনো পার্থক্য থাকে না। দেশপ্রেম এবং অসাম্প্রদায়িকতার মতো সব আদর্শ অনুসরণের মৌখিক দাবিকে কার্যকর ও বাস্তব পদক্ষেপের সাহায্যে সার্থক করে তুলতে হবে। আমাদের অন্য অনেক স্বপ্ন এবং অঙ্গিকারের বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার জন্যে প্রয়োজনে ধীরেন্দ্রনাথ-সালাম-বরকত-জব্বারের মতো মিলিতভাবে জীবন দিতে হবে। কিছুদিন পূর্বে চোখ বুজেছেন আমাদের দেশের এ-কালের লালন, বাউল শাহ্ আবদুল করিম, তাঁর আকুল-করা গান, “একদিন কি সুন্দর দিন কাটাইতাম” বাংলাদেশের মানুষের মিলিত জীবন, সংগ্রাম ও সংস্কৃতির গীত–শুধু হায়-আফসোসের নয়; এ-গান স্বপ্নের, জাগরণের।

উদ্ধৃত গ্রন্থাদি

আনিসুজ্জামান সম্পাদিত ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত স্মারকগ্রন্থ, ঢাকা,

মিনার মনসুর, ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত, বাংলা একাডেমি, ঢাকা, ১৯৯৬।

লেখক : কথাসাহিত্যিক

ভালো লাগলে শেয়ার করে দিন :)

0 Comments

Leave a Reply

Avatar placeholder

Your email address will not be published. Required fields are marked *