ই-পেপার

SITE UNDER CONSTRUCTION
বাংলাদেশ পুলিশের মুখপত্র
অব্যাহত প্রকাশনার ৬৩ বছর

মোঃ আলমগীর কবীর (পিপিএম-সেবা)

দিগন্ত বিস্তৃত পাহাড়, মেঘমালা ও জলরাশির অপূর্ব এক মিতালী। চোখজুড়ানো, চোখ ধাঁধানো অপার সৌন্দর্যের লীলা ভূমি রাঙ্গামাটি জেলার ভূপ্রকৃতি। রাঙ্গামাটিতেই রয়েছে মানবসৃষ্ট কৃত্রিম লেক ‘কাপ্তাই লেক’। ১৯৬০ সালে এই লেক সৃষ্টির সময় অজস্র মানুষের বাস্তুভিটা হারানোর বেদনাশ্রুকে বুকে ধারণ করেও, মানুষকে দিয়েছে অপার সৌন্দর্য অবলোকনের পাশাপাশি জীবিকার বিচিত্র উপকরণ।

পর্যটন নগরী রাঙ্গামাটির জিরো পয়েন্ট বা ডিসি বাংলো রোডের ঠিক শেষ প্রান্তের কাছাকাছি পলওয়েল পার্ক অ্যান্ড কটেজ অবস্থিত। শুরুতেই এই পার্কের গোড়াপত্তনের কিছু ইতিহাস বলে নেওয়া যাক। ১৯৬২ সালে কাপ্তাই বাঁধের নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার পর বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু করলে রাঙ্গামাটি শহর, পুলিশ লাইন্স, পুলিশ অফিস, কাপ্তাই লেকে নিমজ্জিত হয়। ফলে সব স্থাপনা স্থানান্তরিত হয়। পুলিশ অফিসটি রাঙ্গাপানি মৌজাস্থ ডিসি বাংলো রোডের (বর্তমান পলওয়েল পার্ক) এর পাশে স্থানান্তরিত হয়। পরবর্তীতে পুলিশ অফিসের জন্য অন্যত্র স্থান পাওয়া গেলে পুরাতন অফিসটিকে অতিরিক্ত পুলিশ সুপারের বাসভবন হিসেবে ব্যবহার করা হয়। ওই বাসভবন সংলগ্ন দক্ষিণ ও দক্ষিণ পশ্চিমের জায়গাটিতে ১৯৯৫ সালে তৎকালীন পুলিশ সুপার জনাব মোঃ নুরুল আনোয়ার-এর প্রচেষ্টায় খুবই ছোট পরিসরে পলওয়েল পার্কের গোড়াপত্তন করা হয়। পরবর্তীতে ২০১৭ সালে রাঙ্গামাটি শহরে ব্যাপক ভূমি ধসের কারণে পার্কের একটি বড় অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। উল্লেখ্য, রাঙ্গামাটি একটি পর্যটন শহর। কিন্তু এখানে পর্যটকদের বিনোদনের জন্য মানসম্মত বিনোদনকেন্দ্র খুবই অপ্রতুল। ২০১৮ সালের জুন মাসে তৎকালীন পুলিশ সুপার পর্যটকদের চাহিদার সঙ্গে সংগতি রেখে পার্কটির ব্যাপক উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। রাঙ্গামাটি জেলার সব পদ-মর্যাদার পুলিশ সদস্য এই পার্ক ও কটেজের নির্মাণে তাদের প্রত্যক্ষ অবদান রেখেছেন। রাঙ্গামাটি পলওয়েল পার্ক এন্ড কটেজ বর্তমানে বাংলাদেশ পুলিশ কল্যাণ ট্রাস্ট এর আওতাভুক্ত একটি প্রতিষ্ঠান। অ্যামিউজমেন্টের জন্য আলাদা এলাকা ও কটেজের জন্য আলাদা এলাকা নিয়ে এই পার্ক ও কটেজ নবরূপে নির্মাণ করা হয়। পার্কে প্রবেশের জন্য একটি সুদৃশ্য ভৌতিক অবকাঠামো তৈরি করা হয়। প্রবেশের পরই শিশুদের বিনোদনের জন্য বিভিন্ন ছোট-বড় রাইডস, ৯ডি মুভি হল, গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী ঢেঁকি ঘর, কলসী ঝরণা, বিভিন্ন প্রাণীর ভাস্কর্য স্থাপন করা হয়েছে। পার্কের উঁচু টিলাটি সুন্দরভাবে নিরাপত্তা বেষ্টনী দিয়ে ঘেরা যাতে সব বয়সের পর্যটক বিস্তৃত কাপ্তাই লেকের সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারেন সেই সঙ্গে বসে ফুচকা, চটপটি, কফি উপভোগ করতে পারেন। হয়তবা প্রথম দৃষ্টিতে কোনো ফুচকা, চটপটি কর্ণার দেখা যাবেনা; তবে একটি সুদৃশ্য (সিমেন্ট, বালি, রড নির্মিত) মিষ্টি কুমড়ার মধ্য থেকে ওই খাবার সরবরাহ করা হয়। টিলার উপরে কালের সাক্ষী অনেক বড় বড় ছাতিম গাছ এর সারি দেখা যাবে। টিলা থেকে নেমে যেতেই পাওয়া যাবে ক্যান্টিন। সেখানে ক্লান্তি দূর করার সব উপকরণ সহজেই পাওয়া যাবে। ক্যান্টিন পার হয়ে যেতেই চোখে পড়বে সুদৃশ্য রেস্টুরেন্ট। চারিদিকে খোলামেলা ও নয়নাভিরাম দৃশ্য চোখে পড়বে এখানে বসলে। অর্ডার করলেই দ্রুত সময়ে মিলবে পছন্দের খাবার। রাঙ্গামাটি জেলার ঐতিহ্যবাহী খাবার এখানে সহজলভ্য। রেস্টুরেন্টের দক্ষিণ দিকে বিস্তৃত কাপ্তাই লেক। রেস্টুরেন্টের দক্ষিণ পশ্চিমে একটি ঝুলন্ত ব্রিজ যে কাউকে আকৃষ্ট করবে। শীতকালে ব্রিজের নিচ দিয়ে হেঁটে যাওয়া গেলেও বর্ষাকালে লাভ পয়েন্ট-এ যেতে ঝুলন্ত সেতু ব্যবহার করতে হবে। ভরা বর্ষাকালে লাভ পয়েন্টের চারদিকে পানি বেষ্টিত থাকে। মনোমুগ্ধকর এই লাভ পয়েন্টে একটি অ্যামিউজমেন্ট শেড (বিভিন্ন অনুষ্ঠান করার জন্য), মৎস, ঝরনা, কফি কর্ণার, লেকের সৌন্দর্য উপভোগ করার জন্য সারি সারি বসার বেঞ্চ, পশ্চিম দিকে তিনটি কটেজ আছে। তেষ্টা পেলে কফি ও শুকনা খাবারের ব্যবস্থা এখানে আছে। দৃষ্টিনন্দন একটি ক্যাপসিকাম-এর মধ্য থেকে চাহিদামতো তেষ্টানিবারক রসনা এখানে পাবেন। লাভ পয়েন্ট দ্বীপের অন্যতম আকর্ষণ লাভ ‘রিং’। কথিত আছে ২০১৬ সালে আমেরিকা প্রবাসী জনৈক নবদম্পতি আলাউদ্দিন ও লিমা হানিমুনে এসে কাপ্তাই লেক ভ্রমণকালে আকস্মিক দুর্যোগে নৌকা ডুবি হয়ে মারা যান। ওই দম্পতির লাশ নৌকাডুবির দুই দিন পরে বর্তমান লাভরিং-এর সন্নিকটে বড় রেইনট্রি গাছের কাছে ভাসা অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। তাদের স্মৃতির প্রতি সম্মান রেখে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড একটি লাভরিং স্থাপন করে দেন। ঝুলন্ত ব্রিজের পশ্চিম মাথায় নামলে ডান সাইডে পাওয়া যাবে কায়াকবোট, পেডেল বোট সহ অন্যান্য ওয়াটার রাইডস।

দেশের বিভিন্ন অবস্থান হতে আগত দর্শণার্থীদের বিনোদনের সর্বোৎকৃষ্ট জায়গা বর্তমানে রাঙ্গামাটি পলওয়েল পার্ক। পার্কে আগত দর্শনার্থীদের চাহিদার প্রেক্ষিতে ২০১৯ সালে নির্মিত হয় পলওয়েল কটেজ। সুন্দর একটি প্রবেশ পথ দিয়ে অভ্যর্থনাতে পৌঁছালে পাওয়া যাবে সংশ্লিষ্ট কর্মচারীদের সাদর সম্ভাষণ। আনুষ্ঠানিকতা সেরে কটেজে যেতেই দক্ষিণ দিকে পড়বে নয়নাভিরাম সুইমিং পুল। সুইমিং-এর সঙ্গে সঙ্গে কাপ্তাই লেকের অপার সৌন্দর্য সহজেই চোখে পড়বে। সেই সঙ্গে পছন্দমতো মিউজিক। সাঁতার দিতে দিতে ক্লান্ত হয়ে পড়লে চাইলেই হাতের কাছেই পৌঁছাবে টাটকা দেশী ফলের জুস। পুল সাইড কফিকর্নারের সঙ্গে সুদৃশ্য একটি সেড আছে, এখানে বসলে মনে হবে পুরো সুইমিং কমপ্লেক্স কাপ্তাই লেকে ভাসছে।

কটেজ এরিয়াতে প্রবেশের সময়ে মনে হবে কোনো গুহার মধ্যে দিয়ে প্রবেশ করা হচ্ছে। প্রত্যেকটি কটেজের জন্য আলাদা আলাদা প্রবেশ পথ আছে। সিংগেল, ডাবল সবধরনের কটেজ এখানে আছে। বৈচিত্রময় গঠন শৈলিতে নির্মিত প্রত্যেকটি কটেজে আছে লেক সাইড বারান্দা, যা পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণ এর বিষয়। শীতকালে লেক-এর শান্ত ও স্নিগ্ধ পরিবেশ যেমন মনোমুগ্ধকর তেমনি বর্ষাকালে বড় বড় ঢেউ সমুদ্র দর্শনের অনুভূতির মতো। লাভ পয়েন্টের নিচে বালুময় বিচ কক্সবাজার-এর সমুদ্র বিচের অনুরূপ।

প্রবেশ রাস্তাটির দুই সাইডের দেয়ালের গায়ে কারুকাজ করা আছে। খাড়া পাহাড়ের গা ঘেঁষে কটেজগুলো নির্মিত। আকর্ষণীয় এই কটেজগুলোতে যারা রাতযাপন করেন সবাই সুন্দর ও ব্যতিক্রমধর্মী একটি অনুভূতি নিয়ে ফেরেন। ড্রাইভার ও অন্য সাহায্যকারীদের রাতবাস বা বিশ্রামের কথা বিবেচনায় রেখে রেস্টুরেন্টের ঠিক নিচে রয়েছে স্বল্প মূল্যের ডরমেটরি। পর্যটকদের নিরাপত্তার বিষয়টিও এখানে প্রাধান্য দেওয়া হয়। কাপ্তাই লেক ভ্রমণের প্যাকেজও  এখানে সহজলভ্য। সকালে সৌজন্য নাস্তা, ফ্রি ওয়াইফাই, ফ্রি পার্কিং ও পার্ক দর্শন, ফ্রি সুইমিং পলওয়েল কটেজের প্যাকেজের অন্তর্ভুক্ত।

ওয়েব সাইটে গেলে আপনি সহজেই রুমের দৃশ্য, পার্কের দৃশ্য, সুবিধাদিও, বুকিং বিবরণ পাবেন।

কটেজ বুকিং- ০১৮৩৭-৩৩৫৫৯৫, ০১৮৭৭-৭২৫৫৪০

ক্যাফেটেরিয়া- ০১৮৭৭-৭২৫৫৪৭, ইভেন্ট বুকিং- ০১৮৪৫-৮৭৫৪৯৭

ওয়েবসাইট- polwelcottagermt@gmail.com

লেখক : এআইজি (ওয়েলফেয়ার ট্রাস্ট প্রজেক্ট)

ভালো লাগলে শেয়ার করে দিন :)

0 Comments

Leave a Reply

Avatar placeholder

Your email address will not be published. Required fields are marked *