ই-পেপার

SITE UNDER CONSTRUCTION
বাংলাদেশ পুলিশের মুখপত্র
অব্যাহত প্রকাশনার ৬৩ বছর

শেখ হাসিনা

মহান মুক্তি সংগ্রামের অভীষ্ট লক্ষ্য মুক্তিযুদ্ধের বিজয়। সে বিজয় বাঙালি অর্জন করেছে ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে। কিন্তু বিজয়ের সে আনন্দ কি পূর্ণতা পেয়েছে, পায় নাই। আনন্দ বেদনায় ভরা বিজয়ের উৎসব যেন অপূর্ণ রয়েছে একটি আকাক্সক্ষায় কোথায় আমাদের বিজয়ের মহানায়ক তাঁকে ছাড়া কি এ উৎসব পূর্ণতা পাবে?

প্রতীক্ষার প্রহর প্রলম্বিত হচ্ছে। তিনি কোথায়? তিনি কি বেঁচে আছেন? তাঁকে কি বাংলাদেশের মানুষ ফিরে পাবে? বিশ্ব নেতৃবৃন্দ উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। বিশ্ব জনমত জোর চাপ দিচ্ছে তাঁর মুক্তির জন্য। বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিয়ে চলেছে বিভিন্ন রাষ্ট্র। দাবি জানিয়েছে বাঙালির স্বাধীনতার মহান স্থপতির মুক্তি দাবি করে।

১৬ ডিসেম্বর থেকে ৮ জানুয়ারি একটা বড় সময়। ১৬ ডিসেম্বর বিকালে বাংলাদেশের মাটিতে দখলদার পাক-হানাদার বাহিনীর সৈন্যরা মিত্র শক্তি ভারত ও বাংলাদেশের মুক্তিবাহিনীর কাছে অস্ত্রসহ আত্মসমর্পণ করে। দীর্ঘ ২৩ বছরের সংগ্রাম সফল হয়েছে। নয় মাসের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধ করে বিজয় অর্জিত হয়েছে। কিন্তু আমরা কয়েকটি প্রাণী বন্দিখানায় তখনও অবরুদ্ধ। ধানমন্ডি আবাসিক এলাকার ১৮ নম্বর রোডের একতলা বাড়িটিতে বন্দি অবস্থায় ছটফট করছি। চারদিকে জয় বাংলা ধ্বনি বিজয়ের বার্তা বয়ে আনছে। কখনও আনন্দে আত্মহারা কখনও চোখের পানিতে ভাসছি। আমার মা, রেহানা, রাসেল, খোকা কাকা, আমি ও জয় তখনও বন্দি অবস্থায়। আমরা কি মুক্তি পাব? ১৭ ডিসেম্বর ভারতীয় সেনাবাহিনীর মেজর অশোক তারা আমাদের মুক্ত করলেন। এই বাড়িতে পাহাড়ারত পাকিস্তানি সৈন্যদের আত্মসমর্পণে বাধ্য করলেন। আমরা মুক্ত হলাম। সে এক অশ্রু-বেদনা-আনন্দের অভূতপূর্ব দৃশ্য।

মুক্তিযুদ্ধ শেষে বিজয়ের বেশে কামাল, জামাল ফিরে এল। স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রী পরিষদ ফিরে এলেন। কিন্তু তারপর কখন ফিরে পাব আমরা। আমাদের পিতাকে? কোথায় আছেন কেমন আছেন তিনি, কবে ফিরে পাবো তাকে আমরা।

৮ জানুয়ারি বড় কাক্সিক্ষত দিন। আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা ঘোষণা করল বহু আকাক্সিক্ষত বার্তাটি। শেখ মুজিব পাকিস্তান কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে লন্ডন পৌছেছেন। রাতে টেলিফোনে আমাদের সাথে কথা বললেন। আমরা তো কেউই কথা বলতে পারলাম না; চোখের পানিতে কান্নাজড়ানো কণ্ঠে শুধু ‘আব্বা’ বলে ডাকতে পেরেছিলাম। আমার মা শুধু বললেন, ‘তাড়াতাড়ি দেশে চলে এসো। আর এক মুহূর্ত দেরি না।’ আমার মায়ের মনের অবস্থা আমি বুঝি। আমার বৃদ্ধ দাদা ও দাদি সন্তান ফিরে পাওয়ার যে কি আনন্দ তা তাদের চোখের অশ্রু থেকেই উপলব্ধি করা যায়।

এরপর এল সেই বহু প্রতীক্ষিত দিন ১০ জানুয়ারি। ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি প্রিয় মাতৃভূমিতে ফিরে এলেন আমাদের পিতা। ১০ জানুয়ারি বাঙালির প্রত্যাশা পূরণের দিন। বিজয়ের স্বাদ পূর্ণ হয় এই দিনে। আমার মনে পড়ে সেই দিনটির কথা। ধানমন্ডি ১৮ নং রোডের ছোট দুই কামরার বাসায় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী আমাদের বন্দি করে রেখেছিল। বন্দি দশা থেকে মুক্তি পাবার পরও মা ঐ বাসায়ই ছিলেন।

আব্বা যেদিন ফিরে আসেন সেদিন গোটা বাংলাদেশের চিত্রই ছিল ভিন্ন। গ্রাম-গঞ্জ-শহর থেকে মানুষ ঢাকায় ছুটে আসছে। ঢাকা তখন একমাত্র আকর্ষণীয় স্থান। ছুটছে নারী পুরুষ, যুবক, মুক্তিযোদ্ধারা। গন্তব্য স্থান কোথায়, ঢাকায়! এক নজর দেখবে প্রিয় নেতাকে। কত মা-বোন রোজা রেখেছে, নামাজ পড়েছে, মানত করেছে। অন্যান্য ধর্মাবলম্বীরা তাদের নিজ নিজ ধর্মে প্রার্থনা করেছে বঙ্গবন্ধুর মুক্তি চেয়ে। তাঁর জীবনটা ভিক্ষা চেয়েছে সৃষ্টিকর্তার কাছে। সকলের দোয়া শুনেছে আল্লাহ রাব্বুল আল-আমীন। তাই ফিরিয়ে দিয়েছে প্রিয় নেতাকে প্রিয় মানুষের কাছে।

ঢাকায় তখন তেজগাঁও এয়ারপোর্ট ছিল। ঐ এয়ারপোর্ট থেকে রেসকোর্স ময়দান পর্যন্ত সকল রাস্তা লোকে লোকারণ্য। তিল ধারণের জায়গা নাই। মুখে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান। ‘জয় বাংলা’, ‘জয় বঙ্গবন্ধু’ স্লোগানে স্লোগানে মুখরিত বাংলার আকাশ বাতাস। স্বাধীনতা প্রাপ্তি পূর্ণ হবার দিন হল ১০ জানুয়ারি। জাতির পিতার ঐতিহাসিক স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের দিন।

দীর্ঘ কারাবাসের চিহ্ন শরীরে। শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছেন। এই দীর্ঘ কারাবাস ছিল সম্পূর্ণ নির্জন কারাবাস। সম্পূর্ণ একাকীত্ব। এমনকি পড়ার মতো বই বা খবরের কাগজও নিষিদ্ধ ছিল। কোনো খবর যাতে তিনি না পান সে ব্যবস্থাই তারা করেছিল। দেশদ্রোহী মামলা শুরু করে ইয়াহিয়া খান। আইনজীবীও তারা ঠিক করে দেয়। কিন্তু আইনজীবীর সাথে কথা বলারও সুযোগ ছিল না।

আমরা দীর্ঘ নয় মাস জানতে পারি নাই কোথায় রেখেছে, ঢাকায় না পাকিস্তানে। কিভাবে আছেন, বেঁচে আছেন না মেরে ফেলেছে। কারো পক্ষেই জানার উপায় নাই। আমরাও তো বন্দি। কাজেই আমাদেরও জানার উপায় ছিল না। ঠিক একই অবস্থা আব্বার। তিনিও জানেন না আমাদের ভাগ্যে কি ঘটেছে। আমরা কি বেঁচে আছি না মেরে ফেলেছে।

২৫ মার্চ সারাদিন মিছিল, সভা সমাবেশ হচ্ছে। এরই মধ্যে গেরিলা যুদ্ধের প্রস্তুতিও চলছে। দুপুর আড়াইটার দিকে একটা বেবিট্যাক্সিওয়ালা এক টুকরা কাগজ নিয়ে আসে। গেটে এসে কাগজটা আব্বার হাতে দিতে অনুরোধ করে। খবরের কাগজের উপরের অংশের ছেঁড়া একটা কাগজের টুকরোয় লেখা ছিল যে আজ রাতেই পাকিস্তানি সেনাবাহিনী আক্রমণ করবে। এই খবরটা বেবি ট্যাক্সিওয়ালাকে ক্যান্টনমেন্ট থেকে একজন দিয়েছে। সে বাঙালি, ক্যান্টনমেন্টে চাকরি করে। মেসে অফিসাররা খাবার সময় আলোচনা করছিল। সেই আলোচনা সে শুনেছে। যখন খাবার দাবার পরিবেশন করছিল, তখন তাদের আলাপের মধ্যদিয়ে এই কথা বেরিয়ে আসে। তাই সে কাগজে লিখে একটা বেবি ট্যাক্সিওয়ালাকে অনুরোধ করে ধানমন্ডি ৩২ নং সড়কে বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে খবরটা পৌঁছে দেবার জন্য। জীবনের ঝুকি নিয়ে ঐ ব্যক্তি দেশ ও জাতির প্রতি কত বড় দায়িত্ব সেদিন পালন করেছিল। যদিও তার নাম ও পরিচয় জানতে পারি নাই। বেঁচে আছে না মারা গেছে তাও জানি না। কিন্তু তার এ অবদান কোনোদিন ভুলব না। প্রতিটি জায়গায় দেশপ্রেমিক মানুষের সাহসী ভূমিকায় তো আমরা আমাদের বিজয় অর্জন করতে পেরেছি।

২৬ মার্চ রাতের প্রথম প্রহরে যখন আব্বাকে গ্রেফতার করে নিয়ে যায় তখন জামাল, রাসেল মায়ের সাথে বাসায় ছিল।

এ প্রসঙ্গে ডেভিড ফ্রস্টকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন,

“ডেভিড ফ্রস্ট : সে রাতের কথা আপনি বলুন। সেই রাত, যে রাতে একদিকে আপনার সঙ্গে যখন চলছিল আলোচনা এবং যখন সেই আলোচনার আড়ালে পশ্চিম পাকিস্তানের সামরিকবাহিনী আক্রমণে ঝাঁপিয়ে পড়ার উদ্যোগ নিচ্ছিল, সেই রাতের কথা বলুন। সেই ২৫ মার্চ, রাত আটটা। আপনি আপনার বাড়িতে ছিলেন। সেই বাড়িতেই পাকিস্তানিবাহিনী আপনাকে গ্রেফতার করেছিল। আমরা শুনেছিলাম, টেলিফোনে আপনাকে সাবধান করা হয়েছিল, সামরিকবাহিনী অগ্রসর হতে শুরু করেছে। কিন্তু তবু আপনি আপনার বাড়ি পরিত্যাগ করলেন না। আপনি গ্রেফতার হলেন। কেন আপনি নিজের বাড়ি ছেড়ে অপর কোথাও গেলেন না এবং গ্রেফতার বরণ করলেন? কেন এই সিদ্ধান্ত? তার কথা বলুন।

শেখ মুজিবুর রহমান : হ্যাঁ, সে এক কাহিনি। তাও বলা প্রয়োজন। সে সন্ধায় আমার বাড়ি পাকিস্তান সামরিক জান্তার কমান্ডো বাহিনী ঘেরাও করেছিল। ওরা আমাকে হত্যা করতে চেয়েছিল। প্রথমে ওরা ভেবেছিল, আমি বাড়ি থেকে বেরিয়ে এলে ওরা আমায় হত্যা করবে এবং প্রচার করে দেবে যে, তারা যখন আমার সঙ্গে রাজনৈতিক আপসের আলোচনা করছিল, তখন বাংলাদেশের চরমপন্থিরাই আমাকে হত্যা করেছে। আমি বাড়ি থেকে বেরুনো না বেরুনো নিয়ে চিন্তা করলাম। আমি জানতাম, পাকিস্তানবাহিনী এক বর্বরবাহিনী। আমি জানতাম, আমি আত্মগোপন করলে, ওরা দেশের সমস্ত মানুষকেই হত্যা করবে। এই হত্যাযজ্ঞ ওরা সমাধা করবে। আমি স্থির করলাম, আমি মরি, তাও ভালো, তবু আমার প্রিয় দেশবাসী রক্ষা পাক।

ফ্রস্ট : আপনি হয়ত কলকাতা চলে যেতে পারতেন।

শেখ মুজিব : আমি ইচ্ছা করলে যেকোনো জায়গায় যেতে পারতাম। কিন্তু আমার দেশবাসীকে পরিত্যাগ করে আমি কেমন করে যাব? আমি তাদের নেতা। আমি সংগ্রাম করব। মৃত্যুবরণ করব। পালিয়ে কেন যাব? দেশবাসীর কাছে আমার আহ্বান ছিল, তোমরা প্রতিরোধ গড়ে তোল।”

জাকির খান (হারুন) সাহেব রাত সাড়ে ১০ টায় আমাদের বাসায় আসেন। আব্বার নির্দেশেই তিনি কিছু কাজ করতেন। তিনিই খবর নিয়ে আসেন। স্বাধীনতা সংগ্রামে অনেক কাজ করতে হতো। বিভিন্ন মানুষকে বিভিন্ন দায়িত্ব দেয়া ছিল। সন্ধ্যার মধ্যেই আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দকে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যাবার নির্দেশ দেন।

জাকির খান (হারুন) যখন বাসায় আসেন আমাকে দেখে সঙ্গে সঙ্গে বললেন, “তোমরা বাসায় থাকবে না। “আব্বা ও মাকে বলেন যে মেয়েদের এখনই অন্যত্র সরিয়ে দেন। ড. ওয়াজেদ বাসা ভাড়া নিয়েছিল ধানমন্ডি ১৫ নং রোডে। মালপত্র কিছু সেখানে রাখা ছিল। কিন্তু বাসায় আর ওঠা হয় নাই। রেহানা, জেলী ও আমাকে এক রকম জোর করে তিনি বাসা থেকে বের করে দেন। আমরা ১৫ নং রোডের সেই বাড়িতে গিয়ে উঠি। তার একটাই কথা ছিল যে এ বাড়ি আক্রমণ হবে। মেয়েদের ওরা নির্যাতন করবে। কাজেই আমরা যেন কিছুতেই না থাকি। যাহোক আমরা যখন যাই তখন রাস্তায় রাস্তায় ব্যারিকেড তৈরি হচ্ছে। এরই মধ্যে গোলাগুলিও শুরু হয়ে গেছে। কামালের এক বন্ধু রাত্রে এসে আমাদের খবর দিল যে আব্বাকে গ্রেফতার করে নিয়ে গেছে। কামালও বন্ধুদের নিয়ে সন্ধ্যা থেকেই ধানমন্ডি ১৯ নং রোড থেকে সাতমসজিদ রোডে ব্যারিকেড তৈরির কাজে ব্যস্ত ছিল।

এরপর কারফিউ ঘোষণা করা হয়েছে। যে বাসায় আমরা ছিলাম সেটা পিলখানার খুব কাছেই। সব থেকে আশ্চর্যের বিষয় ছিল যে, পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী তাদের উর্দু উচ্চারণে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিয়ে আক্রমণ চালাচ্ছিল। ২৩ মার্চ থেকে প্রতিটি বাড়িতে স্বাধীন বাংলার পতাকা উড়ছিল, সেই বাড়িগুলোতে গুলি চালাচ্ছিল। মানুষকে নির্দেশ দিচ্ছিল যেন পতাকা নামিয়ে ফেলে। আমরা যখনই জানালার কাছে যাচ্ছিলাম দেখতে, তখনই ওয়াজেদ সাহেব বকা দিচ্ছিলেন।

যাহোক আব্বাকে নিয়ে ওরা প্রথমে কিছুক্ষণ নির্মীয়মাণ সংসদ ভবনের সিঁড়িতে বসিয়ে রাখে। তারপর আদমজী ক্যান্টনমেন্ট স্কুলে। সেখান থেকে তেজগাঁও এয়ারপোর্টে নিয়ে প্লেনে তুলে দেয় এবং পাকিস্তানে নিয়ে যায়। মিয়ানওয়ালি জেলে বন্দি করে রাখে। দীর্ঘ নয় মাসই বন্দি। বার বার চাপ দিয়েছে যেন পাকিস্তানের পক্ষে কথা বলে, অনেক সময় মিথ্যা তথ্য দিয়ে বিভ্রান্ত করতে চেয়েছে কিন্তু পারে নাই। জেনারেল ইয়াহিয়ার পতনের সময় ভুট্টোকে সে বলে যায় যেন ফাঁসি কার্যকর করে। কিন্তু জেলখানা থেকে জেল সুপার তার বাড়িতে নিয়ে রাখেন, ইয়াহিয়ার পতনের পর ভুট্টো রাষ্ট্রপতি হয়।

সেই বাড়ি থেকে আব্বাকে নিয়ে আর একটা বাড়িতে রাখা হয়। সেখানে একটা রেডিও দেয়া হয়েছিল। ড. কামালকেও নিয়ে একই বাড়িতে রাখে। একদিন ড. কামালকে আব্বা বলেছিলেন, “আমার বড় মেয়ে সন্তান সম্ভবা দেখে এসেছিলাম। কিন্তু জানি না ওরা কোথায় আছে, কিভাবে আছে। আর বেঁচে আছে কিনা। ওদের কোনো খবরই জানতে পারি নাই।”

এই কথা বলছিলেন আর রেডিওর নব ঘুরাচ্ছিলেন। হঠাৎ শোনেন আমার গলা। কোনো একটা রেডিও স্টেশন আমার ইন্টারভিউ নিয়েছিল, তখন সেটা চালাচ্ছিল। আমি তখন বলছি “আমার আব্বা কোথায় আছেন, কিভাবে আছেন, বেঁচে আছেন কিনা আমরা সে খবর কিছুই জানি না।” ঐ ইন্টারভিউতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী বাংলাদেশের মানুষের উপর কিভাবে অত্যাচার করেছে, মেয়েদের ক্যাম্পে ধরে নিয়ে অত্যাচার করেছে। গণহত্যা চালিয়েছে। আমাদের নিজেদের গ্রামের বাড়ি, আত্মীয় স্বজনদের বাড়িসহ বাংলাদেশের মানুষের ঘরবাড়ি জ¦ালিয়েছে। কেমন করে বস্তিতে আগুন লাগিয়েছে, আর যখনই মানুষ বাঁচার জন্য ঘর থেকে বেড়িয়ে আসতে চেয়েছে তাদের গুলি করে হত্যা করেছে। ছোট ছোট মেয়ে, বারো তেরো বছরের মেয়ে থেকে শুরু করে কত মেয়েকে ধরে নিয়ে গেছে। দিনের পর দিন নির্যাতন করেছে। তরুণ বা যুবক দেখলেই গুলি করে হত্যা করেছে, তার বিস্তারিত বর্ণনা আমি সেই সাক্ষাৎকারে দিয়েছিলাম। আমার ছেলে হয়েছে বন্দিখানায়। আব্বার দেয়া নাম ‘জয়’ রেখেছি। আমি ঠিক ঐকথাই বলছিলাম যে আব্বা বলেছিলেন, আমার ছেলে হবে। আমার ছেলে হয়েছে কিন্তু আব্বা তো জানতেও পারলেন না আমি ওর নাম জয় রেখেছি।

ঠিক যে কথাগুলো তাঁর মুখ থেকে বের হচ্ছিল সেই কথাগুলো আমি বলছিলাম, আর তখনই প্রথম জানতে পারলেন যে আমরা বেঁচে আছি। কিন্তু কামাল, জামাল কেমন আছে বা দাদা ও দাদি বেঁচে আছেন কিনা তা কিছুই জানতে পারেন নাই। দীর্ঘ নয় মাসের নির্জন কারাবাস, যেখানে প্রতি মুহূর্তে মৃত্যুর ঝুঁকি, সেখানে কি অসীম সাহসের সাথে দৃঢ় মনোবল ও আত্মবিশ্বাস নিয়ে তিনি বেঁচে ছিলেন।

বন্দিখানা থেকে মুক্তি পেয়ে তাঁকে লন্ডন পাঠানো হয়। সেখানে তিনি প্রেস কনফারেন্স করে এক বিবৃতিতে বলেন,

“বাংলার মুক্তি সংগ্রামে আজ আমি স্বাধীনতার অপরিসীম ও অনাবিল আনন্দ অনুভব করছি। এই মুক্তি সংগ্রামের চূড়ান্ত লক্ষ্য ছিল স্বাধীন সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ। আমার জনগণ যখন আমাকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি ‘হিসাবে ঘোষণা করেছে, তখন আমি রাষ্ট্রদ্রোহ’- এর দায়ে মৃত্যুদ-প্রাপ্ত আসামি হিসাবে একটি নির্জন ও পরিত্যক্ত সেলে বন্দি জীবন কাটাচ্ছি।… সাবেক প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান বিচারের নামে প্রহসন অনুষ্ঠান করে আমাকে ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলানোর ফন্দি এটেছিলেন। কিন্তু ভুট্টো এই মৃত্যুদ- কার্যকরী করতে অস্বীকার করেন।…

জেলখানায় আমাকে এক নিঃসঙ্গ ও নিকৃষ্টতম কামরায় বন্দি করে রাখা হয়েছিল। যেখানে আমাকে তারা কোনো রেডিও, কোনো চিঠিপত্র দেয় নাই। এমনকি

বিশ্বের কোথায় কি ঘটছে, তা জানতে দেয়া হয় নাই। স্বাধীনতা সংগ্রামে বাংলাদেশের জনগণের মতো এত উচ্চমূল্য, এত ভয়াবহ ও বিভীষিকাময় জীবন ও দুর্ভোগ আর কোনো দেশের মানুষকে ভোগ করতে হয় নাই। বাংলাদেশে নির্মম হত্যাকা- ঘটানোর জন্য পাকিস্তানি সৈন্যরা দায়ী। হিটলার যদি আজ বেঁচে থাকতো, বাংলাদেশের হত্যাকা-ে সেও লজ্জা পেত।”

দেশের মানুষ যেন আনন্দে আত্মহারা, যারা মুক্তিযুদ্ধে স্বজন হারাবার বেদনায় ব্যথিত হৃদয় নিয়ে অশ্রু ঝরাচ্ছেন, তাদেরও মুখে একটু হাসির ছোঁয়া অতি প্রিয় মানুষটির ফিরে আসার খবরে। এ এক অদ্ভুত অনুভূতি।

 লাখো মানুষের ঢল রাস্তায়। সারা দেশ থেকে মানুষ ঢাকায় আসছে। ঢাকার রাজপথে গণ মানুষের ঢল। এয়ারপোর্ট লোকে লোকারণ্য, রেসকোর্স ময়দান (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) যেখানে ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ তিনি ডাক দিয়েছিলেন-

“এবারের সংগ্রাম-আমাদের মুক্তির সংগ্রাম

এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।”

এই রেসকোর্স থেকেই তিনি মুক্তিকামী মানুষকে গেরিলা যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে নির্দেশ দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, “ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোল, যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে।” তাঁর অসহযোগ আন্দোলনের ডাকে সাড়া দিয়েছিল এদেশের মুক্তিকামী মানুষ।

যে মুহূর্তে ইয়াহিয়া খান জাতীয় সংসদের অধিবেশন বন্ধ করে দেয় সে মুহূর্তেই বাংলাদেশের মানুষ বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। সর্বত্র প্রতিবাদ মিছিল শুরু হয়। বঙ্গবন্ধু অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেন। এই অসহযোগ আন্দোলন এমন ছিল যে ধানমন্ডি ৩২ নং সড়ক (বর্তমান ১১) বঙ্গবন্ধুর বাসভবন থেকে যে নির্দেশ দেয়া হত তাই মানুষ মেনে চলত। ৭ মার্চ ভাষণের মধ্য দিয়ে অসহযোগ আন্দোলন ও গেরিলা যুদ্ধের নির্দেশ জনগণ অক্ষরে অক্ষরে পালন করে। পৃথিবীতে এ ধরনের ঘটনা নজিরবিহীন। কারণ একজন নেতাকে মানুষ কত ভালোবাসে ও নেতৃত্ব মেনে এটাই ছিল লক্ষণীয়। যে মানুষ মুক্তির জন্য যে কোনো ত্যাগ স্বীকার করতে প্রস্তুত। মূলত তখন পাকিস্তানি সামরিক শাসক ইয়াহিয়ার শাসন ক্ষমতা এ অঞ্চলে সম্পূর্ণভাবে অকার্যকর হয়ে যায়। এমনকি বাংলাদেশ থেকে কোনো টাকা পয়সাও লেনদেন হত না। ইংল্যান্ডের একটি পত্রিকা বঙ্গবন্ধুর বাসভবনকে লন্ডনের ১০ নং ডাউনিং স্ট্রিটের(বৃটিশ প্রধানমন্ত্রীর বাসবভন) সাথে তুলনা করে প্রতিবেদন ছাপায়। এরই একটা পর্যায়ে আলোচনার জন্য ইয়াহিয়া খান ঢাকায় আসে। তাদের ক্ষমতা কেমল ক্যান্টনমেন্টে সীমাবদ্ধ হয়ে যায়। ঢাকায় প্রেসিডেন্ট হাউজে (বর্তমান হেয়ার রোডে অবস্থিত ‘সুগন্ধা’ বাড়িটি) বাঙালি বাবুর্চি রান্না বন্ধ করে দিয়েছে। কারণ অসহযোগ আন্দোলন তাই পাকিস্তানিদের জন্য রান্না করবে না। রান্না করা গরম খাবার পাওয়া কঠিন হয়ে পড়লে প্রেসিডেন্ট হাউজ থেকে ধানমন্ডিতে বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে ফোন আসে। অনুরোধ করা হয় সেখানে কর্মচারী বিশেষ করে বাবুর্চিদের বলে দেয়া হয় তারা যেন রান্না করে। কারণ প্রেসিডেন্ট রান্না করা খাবার পাচ্ছেন না। আর বঙ্গবন্ধুর নির্দেশ ছাড়া তারা রান্নাও করবে না। যখন এই ফোন আসে তখন সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমেদ, মনসুর আলীসহ সকলেই উপস্থিত ছিলেন বঙ্গবন্ধুর কাছে। যাহোক বাঙালি অতিথিপরায়ণ তাই বলে দেয়া হয় যে রান্না করতে পারে। তখনই তারা রান্না করে। অর্থাৎ অসহযোগ আন্দোলনের মধ্য দিয়ে সামরিক শাসকদের সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে বাঙালি অদম্য সাহসের পরিচয় দিয়েছিল। শুধু একজনের নির্দেশই মানত যাকে ভোট দিয়ে নির্বাচিত করেছিল, এর বাইরে কাউকে মানতে প্রস্তুত নয়।

৭ মার্চের ভাষণেও যে যে নির্দেশ দিয়েছিলেন সেই সেই নির্দেশই তারা মানত। প্রতিদিন ৩২ নং সড়কের বাড়ি থেকে একটা নির্দেশনামা দেয়া হত। সেগুলো সাইক্লোস্টাইল মেশিনে (তখন কম্পিউটার বা ফটোকপি মেশিন ছিল না) কপি করে সব জায়গায় বিলি করা হত। এই মেশিন চালান বেশ কষ্ট ছিল। স্টেনসিল পেপারে টাইপ করে বা হাতে লিখে মেশিনে সেট করা হতো। স্টেনসিল পেপারের সাথে কাগজ দিয়ে হ্যান্ডেল ঘুরালে ছাপা হয়ে বের হত। আব্বার লাইব্রেরি কামরার পাশে বাথরুমের সাথে যে ড্রেসিং রুম ছিল সেখানে এই মেশিনটা বসান ছিল। আমরা যে যখন সুযোগ পেতাম ঐ মেশিন চালাতাম। পার্টি কর্মীরা মূলত চালাত। ২৫ শে মার্চ পর্যন্ত বাংলাদেশে ইয়াহিয়ার শাসন সম্পূর্ণ অচল হয়ে যায়। বঙ্গবন্ধু হয়ে ওঠেন বাঙালি জাতির অভিন্ন সত্তা এবং বাংলার অবিসংবাদিত নেতা। যে জাতি এই ধরনের অসহযোগ আন্দোলনের দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে তাঁকে কে হারাতে পারবে?

একদিকে গেরিলা যুদ্ধের প্রস্তুতি অপরদিকে অসহযোগ আন্দোলন সফল করে পাকিস্তানি মিলিটারি শাসকদের বুঝিয়ে দিয়েছিলেন বাঙালি জাতিকে আর কোনোদিন ‘দাবায়ে রাখতে পারবা না।’ পারে নাই, বাঙালি নেতার এই ভবিষ্যৎ বাণীকে বাংলার মানুষ সত্য বলে প্রমাণ করেছে, বিজয় ছিনিয়ে এনেছে। আর এই ময়দানেই ১৬ ডিসেম্বর বিকালে হানাদার পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়েছে।

বিজয়ের বেশে তিনি আসবেন এই ঐতিহাসিক ময়দানে স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের প্রথম রাষ্ট্রপতি হিসেবে। বাঙালির প্রাণের প্রিয় নেতা হিসেবে ভাষণ দেবেন। এক একটি মুহূর্ত যেন শতবর্ষ পার করছে। আমার দাদা এয়ারপোর্ট চলে গেছেন ছেলেকে আনতে, দাদি তসবিহ হাতে বিছানায় বসে দোয়া পড়ছেন। আমার মা যেন পাথরের মূর্তির মতো মোড়া পেতে রেডিও খুলে বসে আছেন, একেবারে স্তব্ধ। নাওয়া নেই খাওয়া নেই শুধু অপেক্ষা আর অপেক্ষা। অবশেষে এল সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। বাংলার মাটি ছুঁয়ে থামল ব্রিটিশ রয়েল এয়ারফোর্সের বিশেষ প্লেন। স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি প্রথম উপ-রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমেদসহ মন্ত্রিসভার সদস্যবৃন্দ, সশস্ত্র বাহিনী, মুক্তিবাহিনী ও মুজিববাহিনীর সংগঠক ও নেতৃবৃন্দ সকলে প্লেনের সিঁড়ির উপরে গিয়ে স্বাগত জানালেন এবং ট্রাকের উপর নিয়ে এলেন যেখানে লাখো জনতা অপেক্ষায়। এয়ারপোর্ট থেকে সোজা গেলেন তার প্রিয় মানুষের কাছে রেসকোর্স ময়দানে।

তিনি উদাত্ত কণ্ঠের ভাষণে বলেন, “গত ৭ মার্চ এই ঘোড়দৌড় ময়দানে আমি আপনাদের বলেছিলাম, ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তুলুন, এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। আপনারা বাংলাদেশের মানুষ সেই স্বাধীনতা এনেছেন। আজ আবার বলছি, আপনারা সবাই একতা বজায় রাখুন। ষড়যন্ত্র এখনও শেষ হয়নি। আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছি। একজন বাঙালিও প্রাণ থাকতে এই স্বাধীনতা নষ্ট হতে দেবে না। বাংলাদেশ ইতিহাসে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসাবেই টিকে থাকবে। বাংলাকে দাবিয়ে রাখতে পারে এমন কোনো শক্তি নেই।

আপনারা আরও জানেন যে, আমার ফাঁসির হুকুম হয়েছিল। আমার সেলের পাশে আমার জন্যে কবরও খোঁড়া হয়েছিল। আমি মুসলমান। আমি জানি, মুসলমান মাত্র একবারই মরে। তাই আমি ঠিক করেছিলাম, আমি তাদের নিকট নতি স্বীকার করব না। ফাঁসির মঞ্চে যাওয়ার সময় আমি বলব, আমি বাঙালি, বাংলা আমার দেশ, বাংলা আমার ভাষা। জয় বাংলা।”

জনতার নেতা জনতার মাঝেই গেলেন সর্ব প্রথম। সেখানেই তিনি স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি হিসেবে ভাষণ দিলেন। লাখো শহীদের রক্তে ভেজা মাটিতে ফিরে এসে শ্রদ্ধা জানালেন শহীদদের প্রতি, মা-বোনদের প্রতি, মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ আর্থ-সামাজিক কর্মসূচি তিনি ঘোষণা দিলেন। নীতি আদর্শ নিয়ে দিক নির্দেশনা দিলেন। দীর্ঘ নীতিনির্ধারণী ভাষণ দিয়ে বাংলাদেশ ভবিষ্যতে কিভাবে চলবে, অর্থনৈতিক নীতি কি হবে, সামাজিক নীতি কি হবে, রাজনৈতিক দিক নির্দেশনা দেন। কিভাবে একটা মানুষ পারে যদি না তাঁর মাঝে কোনো ঐশ্বরিক শক্তি থাকে। কি দুর্ভাগা দেশ আমাদের কেমন জাতি আমরা যে এমন নেতাকে পেয়েও হারালাম। শুধু হারালামই না, দেশ কত পিছিয়ে গেল। চল্লিশ বছরেও দারিদ্র্যের হাত থেকে দেশ মুক্ত হল না। আমাদের পরে যে সকল দেশ স্বাধীনতা অর্জন করেছে তারা এগিয়ে গেছে, উন্নত হয়েছে। আমরা কেবল পিছিয়েই যাচ্ছি। কি দুর্ভাগ্য এদেশের মানুষের। দরিদ্র মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন করতে গেলেই তাদের উপর আঘাত আসে। সাধারণ মানুষ কখনও ভুল করে না কিন্তু মীর জাফররা খন্দকার মোস্তাকের মতো বেঈমান মোনাফেকরা যুগ যুগ ধরে জন্মায় ও মানুষের সর্বনাশ করে।

বক্তৃতা দিতে গিয়ে বার বার কান্নায় ভেঙে পড়েছেন বাংলার মানুষের কষ্টের কথা স্মরণ করে। তিনি যে নির্দেশ দিয়ে গিয়েছিলেন বাংলার মানুষ যে তা অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছে সে কথা বার বার উল্লেখ করেছেন। পাকিস্তানি মিলিটারি শাসক ইয়াহিয়া খান তাঁকে ফাঁসি দিতে চেয়েছিল। মৃত্যু পরোয়ানা জারিও করেছিল। জেলখানায় সেলের পাশেই কবরও খোঁড়া হয়েছিল কিন্তু আল্লাহর রহমতে ফাঁসির আদেশ কার্যকর করার মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগেই জেল সুপার ও কর্তৃপক্ষ তাঁকে সেখান থেকে সরিয়ে নিজের বাড়িতে নিয়ে যান। পরে অন্য এক জায়গায় নিয়ে রাখেন। বাংলার লাখো মানুষের দোয়ায় তিনি বেঁচে আসেন। ভুট্টো যখন পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি হয়েছে ইয়াহিয়ার পতন হবার পর। ভুট্টো তার কাছে এসে অনেক কাকুতি মিনতি করেছিল যেন কোনোমতে দুই পাকিস্তান এক রাখা যায়। কিন্তু তিনি সে কথায় কান দেন নাই। তিনি জানতেন বাংলাদেশে কি ঘটেছে। আর কেনইবা ভুট্টো তাকে মুক্ত করছেন। যাহোক সে সব ইতিহাস এখানে উল্লেখ করে আমি আমার লেখা ভারাক্রান্ত করব না, ইতিহাসবিদরা সেটা লিখবেন।

আমি ১০ জানুয়ারি আমাদের অনুভূতি, আমার দেখা ঘটনাই এখানে উল্লেখ করতে চাই। আমি বড় সন্তান হিসেবে দেখেছি কি অদম্য সাহস ও আত্মবিশ্বাস নিয়ে আব্বা বাংলার মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রাম করে গেছেন। জীবনে। কোনো লোভ লালসা কোনো ভয় ভীতি তাকে দমাতে পারে নাই। এর একটাই কারণ হল বাংলার মানুষকে তিনি গভীরভাবে ভালোবাসতেন। আর এই ভালোবাসাই তাঁকে ত্যাগের প্রেরণা দিয়েছে। আমি জানি না পৃথিবীর ইতিহাসে দেশের মানুষের প্রতি যে মমত্ব ও ভালবাসা আর ত্যাগের মহিমা তিনি রেখে গেছেন তা আর কোনো নেতা দেখাতে পারবেন কিনা।

মানুষের অধিকারের প্রশ্নে কখনওই তিনি মাথা নত করেন নাই। তাই তো ৭ মার্চের ভাষণে বলেছিলেন, “আমি যদি হুকুম দেবার নাও পারি তোমাদের ওপর আমার অনুরোধ রইলো, ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোল। যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে। …”

তিনি জানতেন যে মুহূর্তে স্বাধীনতার ঘোষণা প্রচার হবে সে মুহূর্তেই তার উপর আঘাত আসবে। তিনি তাঁর স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের সকল প্রস্তুতি পর্বে একটি বিষয়ে সব সময় খেয়াল রেখেছেন যে, তার এই স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং মুক্তিযুদ্ধ যেন বিচ্ছিন্নতাবাদী হিসেবে গণ্য না হয়। কারণ বিচ্ছিন্নতাবাদী হলে আন্তর্জাতিক সমর্থন পাওয়া যাবে না। গেরিলা যুদ্ধের জন্য সহায়তা পাওয়া যাবে না। শরণার্থীরা আশ্রয় পাবে না। আর তাই নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তিনি অপেক্ষা করেছেন, ভিতরে ভিতরে প্রস্তুতি নিয়েছেন। যুদ্ধ পরিচালনা করার জন্য অস্ত্র প্রাপ্তি, মুক্তিযোদ্ধাদের ট্রেনিং, শরণার্থীদের আশ্রয় সকল আয়োজনই করে রেখেছিলেন। তাইতো তিনি নিশ্চিত ছিলেন যুদ্ধে বাঙালি জয়ী হবেই। সব রকম প্রস্তুতি সম্পন্ন করেই অপেক্ষায় ছিলেন কে আক্রমণকারী হবে। রণকৌশল হিসেবে একদিকে আলোচনা করেছেন অন্যদিকে গেরিলা যুদ্ধের প্রস্তুতিও নিয়েছেন এবং আওয়ামী লীগের সকল নেতা-কর্মীকে প্রয়োজনীয় নির্দেশও দিয়েছেন। যুদ্ধের এই পরিকল্পনায় ইয়াহিয়া বাহিনী পরাস্ত হয় তার যুদ্ধের রণকৌশলের কাছে। হানাদার বাহিনী যে মুহূর্তে আক্রমণ করে নিরস্ত্র বাঙালির উপর সে মুহূর্তে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীনতা ঘোষণা দিয়ে শত্রুকে বাংলার মাটি থেকে নিশ্চিহ্ন করার নির্দেশ দেন, যুদ্ধ চালিয়ে যেতে বললেন। আর যে মুহূর্তে তিনি এই নির্দেশ সমগ্র বাংলাদেশে পাঠালেন ইপিআর (বর্তমান বিডিআর) হেডকোয়ার্টারে পিলখানার ওয়ারলেস, টেলিগ্রাম, টেলিপ্রিন্টারের মাধ্যমে তা ছড়িয়ে যায় বাংলাদেশে, সাথে সাথেই তা ধরা পরে ইয়াহিয়ার বাহিনীর কাছে। তারা ৩২ নং সড়কের বাড়ি আক্রমণ করে এবং জাতির পিতাকে গ্রেফতার করে নিয়ে যায়।

বাঙালির মুক্তিযুদ্ধকে ইয়াহিয়া খান যতই বিচ্ছিন্নতাবাদী বলার চেষ্টা করুক বিশ্ববাসীর কাছে তা প্রমাণ করতে পারে নাই। বরং আক্রমণকারী হিসেবেই ইয়াহিয়া খান চিহ্নিত হয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধ স্বীকৃতি পায়, সমর্থন পায় বিশ্বের মানুষের কাছে। নিজের জীবনকে বিপন্ন করেও দেশের মানুষের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা। এই যুদ্ধ কৌশলের শুভ ফলই মুক্তিকামী মানুষ পেয়েছিল এবং সব ধরনের সহযোগিতা বিশ্ববাসীর কাছ থেকে পেয়েছিল বলেই মাত্র নয় মাসের মধ্যে বিজয় অর্জন করা সম্ভব হয়েছিল।

লন্ডন থেকে রওয়ানা হয়ে প্রথমে কয়েক ঘণ্টা দিল্লিতে অবস্থান করেন। তাঁকে বিশাল সংবর্ধনা সেখানে দেয়া হয়। ভারতের রাষ্ট্রপতি ভি ভি গিরি, প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীসহ ভারতবাসী বিপুল সংবর্ধনা জ্ঞাপন করেন। তিনিও ভারতের সরকার ও জনগণের প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেন আমাদের শরণার্থীদের আশ্রয় দেয়ার জন্য, যুদ্ধে ট্রেনিং ও সহযোগিতা করার জন্য।

১০ জানুয়ারি রেসকোর্সে দেয়া ভাষণেও তিনি ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন,

কৃতজ্ঞতা জানান যারা আমাদের সহযোগিতা করেছে বিজয় অর্জনে তাদের প্রতি।

জনতার নেতা প্রথমে ছুটে যান তাঁর প্রিয় জনতার কাছে তারপর ফিরে আসেন পরিবারে, আমাদের কাছে। ছোট বাড়ি। সেখানে পা দিয়েই প্রথমেই দাদা-দাদিকে সালাম করেন তারপর গেলেন আমার মায়ের কাছে। আবেগে জড়িয়ে ধরেন দুজন দুজনকে। এ মুহূর্তটা আমি কোনোদিন ভুলতে পারব না। এ আলিঙ্গন যেন কোনোদিন বিচ্ছিন্ন হবার নয়। কি ধৈর্য, কি মহান ত্যাগ কি দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর এ মহামিলন।

সত্যিই আর বিচ্ছিন্ন হন নাই। মৃত্যুতেও দুজন একই সঙ্গে ঘাতকের নির্মম বুলেটের আঘাতে চিরদিনের জন্য চলে গেলেন এ পৃথিবী ছেড়ে।

০৮ জানুয়ারি ২০১১

লেখক : মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, বঙ্গবন্ধু কন্যা,

জননেত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনা

সূত্র : শেখ হাসিনা রচনা সমগ্র থেকে সংকলিত ও পূণমুদ্রিত

ভালো লাগলে শেয়ার করে দিন :)

0 Comments

Leave a Reply

Avatar placeholder

Your email address will not be published. Required fields are marked *