ই-পেপার

SITE UNDER CONSTRUCTION
বাংলাদেশ পুলিশের মুখপত্র
অব্যাহত প্রকাশনার ৬৩ বছর

শামীমা বেগম পিপিএম

কিছু কথা

কালের ইতিহাসের পাতায় পাতায় লুকিয়ে থাকে মানুষের নিরন্তর জীবনগাথা। সময়ের মহাগর্ভে বিলীন হয়ে যায় মানুষ, থেকে যায় তার যাপিত জীবনের গল্পগাথা। চোখের নিভৃত কোণে জেগে ওঠে অতীতের কল্পনার সরব চিত্রকথা। ভরা জোৎস্নার রাতে তাই এ মহেড়া জমিদার বাড়ির প্রাঙ্গণ হয়ে ওঠে অদ্ভুত স্বর্গোদ্যান। গাছ গাছালির নিভৃত ছায়ায় অসংখ্য পাখিদের  কলকাকলি, বিশাখা সাগর, রাণী পুকুর আর পাশরা পুকুরে জল ও জ্যোৎস্নার অবগাহনে জেগে ওঠে তখন জমিদার বাড়ি। ঝমঝম নূপুরের আওয়াজে স্মৃতির কপাট খুলে অতীতের মানুষগুলোর পদচারণায় মুখরিত হয় চারপাশ। আর যখন আকাশ অন্ধকার করে মেঘগুলো হাওয়ার প্রচন্ড দাপটে নেমে আসে জমিদার বাড়ির আঙিনা জুড়ে, তখন অজান্তেই মন উদাসী বাউল হয়ে উঠে। মহেড়া জমিদার বাড়িই আজকের পুলিশ ট্রেনিং সেন্টার।

অবস্থান ও সংক্ষিপ্ত বিবরণ

ঢাকা-টাঙ্গাইল হাইওয়ের সাথে সংযুক্ত নাটিয়াপাড়া-ফতেপুর রাস্তা ধরে পূর্বদিকে তিন কিলোমিটার পথ পেরোলেই মহেড়া জমিদার বাড়ির অবস্থান। টাঙ্গাইল জেলাধীন মির্জাপুর উপজেলার মহেড়া ইউনিয়নে অবস্থিত হওয়ার কারণে এটি মহেড়া জমিদার বাড়ি হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। মহেড়া জমিদার বাড়িটি মূলত চারটি ভবনে বেষ্টিত, যথা- মহারাজ লজ, আনন্দ লজ, চৌধুরী লজ এবং কালীচরণ লজ। জমিদার বাড়িটি বর্তমানে মোট আয়তন প্রায় ৪৭.৬৮ একর। এখানে বাসভবন ছাড়াও কাছারি ভবন, পুকুর, মাঠসহ নানাবিধ দৃষ্টিনন্দন ও ঐতিহ্যমন্ডিত স্থাপনাগুলো দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত রয়েছে। এছাড়া বেশ কয়েকটি পিকনিক স্পট ও সভা/সেমিনার করার উপযোগী একটি সুপরিসর (৪০০০ বর্গফুট) মাল্টিপারপাস হল রয়েছে। আগ্রহী দর্শনার্থীদের ব্যবহারের জন্য মহারাজ লজে (জমিদার বাড়ির সর্ববৃহৎ স্থাপনা) আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সংবলিত বেশ কয়েকটি অতিথি কক্ষ রয়েছে।

পুলিশ ট্রেনিং সেন্টার হিসেবে প্রতিষ্ঠা

১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের পর ১৯৭২ সালে জমিদার বাড়িটি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়-এর নির্দেশে জোনাল পুলিশ ট্রেনিং স্কুল হিসেবে প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এ মহতী কাজটি করেন বঙ্গবন্ধুর অনুমোদন নিয়ে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জনাব আব্দুল মান্নান। ১৯৯০ সালে জোনাল পুলিশ ট্রেনিং স্কুলকে পুলিশ ট্রেনিং সেন্টারে উন্নীত করা হয়। ট্রেনিং পরিচালনার জন্য ভৌত অবকাঠামো নির্মাণের কাজ অব্যাহত আছে। এটি মূলত আঞ্চলিক ইনসার্ভিস ট্রেনিং সেন্টার।

জমিদার বাড়ির ইতিহাস

যেখানে নীলাকাশ, হাজারো পাখির কলরব, ছোট করে ছেঁটে রাখা সবুজ ঘাসের কার্পেট, শতাধিক বর্ষের সহস্রাধিক স্মৃতি বিজড়িত সুরম্য ভবনসমূহ সৌন্দর্যের ডালি সাজিয়ে দর্শনার্থীর অপেক্ষায় থাকে, যা জমিদার বাড়ির পূর্বপুরুষদের ঐতিহ্যের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। টাঙ্গাইলে অনেকগুলো জমিদার বাড়ির মধ্যে মহেড়া জমিদার বাড়ি অন্যতম। জমিদার বাড়ির অপূর্ব কারুকাজ ও নির্মাণশৈলী দর্শনাথীদেরকে মুগ্ধ করে দেয়। বিশাল এলাকার জুড়ে মহেড়া জমিদার বাড়িটি অবস্থিত। হঠাৎ দেখলে মনে হবে কালের সাক্ষী হয়ে সবুজ ঘাসের চাদরে যেন ফুটে আছে বিশাল  শ্বেতপদ্ম! স্পেনের করডোভা নগরীর আদলে নির্মিত ভবনগুলোর নির্মাণশৈলি রোমান, মোঘল, সিন্দু খেকুদের সাথে মিল রয়েছে।

মহেড়ার জমিদাররা ছিলেন সাহা বংশের। বংশীয়ভাবে বনেদী ব্যবসায়ী। ১৮৯০ সালে চার ভাই মিলে জমিদারি পত্তন করেন। তাঁদের নাম বুদাই সাহা, বুদ্ধু সাহা, হরেন্দ সাহা এবং কালীচরণ সাহা। তবে তাঁদের পরবর্তী প্রজন্ম সবাই রায় চৌধুরী পদবী গ্রহণ করেন। জমিদার বাড়ির সামনেই রয়েছে ‘বিশাখা সাগর’ নামে এক দীঘি। বাড়িতে প্রবেশের জন্য রয়েছে ২টি সুরম্য গেট। ভবনের পিছনে রয়েছে পাসরা পুকুর এবং রানী পুকুর। বৃটিশ সরকার জমিদার প্রথা চালু করলে কালীচরণ সাহা ও আনন্দ সাহার পুত্ররা করটিয়ার ২৪ পরগনার জমিদারদের নিকট থেকে একটি অংশ বিপুল অর্থের বিনিময়ে ক্রয় করে নেন। শুরু হয় জমিদারী শাসন ও শোষণ। কালীচরণ সাহা ও আনন্দমোহন সাহার উত্তরাধীকারী রাজেন্দ্র রায় চৌধুরী পর্যায়ক্রমে জমিদারী পরিচালনা করেন। এসব শাসকগণ এলাকায় বিদ্যালয় ও রাস্তা-ঘাট নির্মাণ এবং পানির ব্যবস্থাসহ অনেক জনকল্যাণমূলক কাজ করেন। বৃটিশ শাসনের শেষের দিকে জমিদার শাসন লুপ্ত হয় এবং পরবর্তীতে ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর ১৯৪৭ এ পরবর্তীতে মূল জমিদারদের  একটি অংশ ভারতে পাড়ি জমায়।

মহেড়া জমিদার বাড়ি ও মুক্তিযুদ্ধ 

মুক্তিযুদ্ধে পাকবাহিনীর নিমর্ম নির্যাতনের সাক্ষী ও মহেড়া জমিদার বাড়ি। ১৯৭১ সালের ১৪ই মে বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় পাকবাহিনী মহেড়া জমিদার বাড়িতে হামলা করে। জমিদার কূলবধূ যোগমায়া রায় চৌধুরীসহ পাঁচজন গ্রামবাসীকে চৌধুরী লজের মন্দিরের পেছনে একত্রে দাঁড় করিয়ে নির্মমভাবে গুলি করে হত্যা করা হয়। নিহতদের মধ্যে ছিলেন স্থানীয় প্রাইমারি স্কুলের পন্ডিত বিমল কুমার সরকার, মনিন্দ্র কুমার চক্রবর্তী, অতুল চন্দ্র সাহা এবং নোয়াই বণিক। এরপর  জমিদার পরিবারের অবশিষ্ট সদস্যগণ জমিদার বাড়ি ত্যাগ করেন।

সাধারণের জন্য জমিদারবাড়ি দর্শন পদ্ধতি

নিরাপত্তা সংক্রান্ত কিছুটা বিধিনিষেধ সাপেক্ষে দর্শনার্থীরা নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে জমিদার বাড়ির বিভিন্ন স্থাপনা ঘুরে দেখতে পারেন ও ছবি তুলতে পারেন। বিভিন্ন বয়সী দর্শনার্থীদের বিনোদনের জন্য জমিদার বাড়ির অভ্যন্তরে একটি মিনি চিড়িয়াখানা (বিভিন্ন জাতের পাখি, ময়ূর , হরিণ, খরগোশ ইত্যাদি), শিশু পার্ক,  ফুলের বাগান, দোলনা, বিশাখা সাগরে নৌকা ভ্রমণ ইত্যাদির ব্যবস্থা রয়েছে। সূর্যাস্ত পর্যন্ত দর্শনাথীরা জমিদার বাড়িতে অবস্থান করতে পারেন।

মহেড়া জমিদার বাড়ি সভ্যতার আর ঐতিহ্যের এক অমূল্য নিদর্শন। পুরোনো হাজারো স্মৃতি, সুখ-দুঃখের কীর্তি লেপে আছে এই বাড়ির প্রতিটি পরতে। তবে ইতিহাস খোঁজা মানুষের কাছে মহেড়া এক হাসি-কান্না আর আর্তনাদের ইতিহাস।

প্রশিক্ষণ কোর্সসমূহ

এ ছাড়াও টর্ট কোর্স, বেসিক কম্পিউটার প্রশিক্ষণসহ সময় উপযোগী প্রশিক্ষণ কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত হয়ে থাকে।

বর্তমানে ডিপার্টমেন্টাল ক্যাডেট (ডিসি) এবং টিআরসি মিলে প্রায় ২৫০০ প্রশিক্ষণার্থী অবস্থান করছেন।

প্রশিক্ষণের লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য

১.         অপরাধ বিচার প্রশাসন এবং অপরাধীর মনস্তাত্ত্বিক পরিকাঠামো ও চিন্তার প্রকৃতি বিষয়ে ধারণা অর্জন;

২.         মামলা রুজুর প্রক্রিয়া ও মামলা তদন্তের আবশ্যকীয় ধাপসমূহ ও প্রক্রিয়া সম্পর্কে প্রাথমিক জ্ঞান অর্জন;

৩.         তদন্ত প্রক্রিয়ায় প্রযুক্তির ব্যবহার ও ক্রাইমসিন সংরক্ষণ এবং ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে ধারণা অর্জন;

৪.         গ্রেফতার, তল্লাশি, জব্দ তালিকা প্রণয়ন, ক্রোকি পরোয়ানা জারি, এসকর্ট, নিরাপত্তা প্রদান, পুলিশ রিপোর্ট লিখন প্রভৃতি বিষয়ে হাতেকলমে অভিজ্ঞতা অর্জন;

৫.         মানবাধিকার, মৌলিক অধিকার এবং নারী, শিশুসহ সমাজের সুবিধা বঞ্চিত জনগণের প্রতি পুলিশী সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে অধিকতর মানবিকতা প্রদর্শনে উদ্যোগী হওয়া;

৬.        শৃঙ্খলা ও শারীরিক সক্ষমতা অর্জনে উদ্যোগী হওয়ার প্রয়াস;

৭.         গণতান্ত্রিক পরিকাঠামোতে সেবাধর্মী মননের বিকাশ ঘটিয়ে পুলিশি দায়িত্ব পালনের অনুষঙ্গগুলোর সাথে বিকাশ ও সেবাপ্রদান;

সংস্কৃতি চর্চা

সম্প্রতি পিটিসির কমান্ড্যান্টের উদ্যোগে পিটিসি’তে মুক্তিযোদ্ধা ভিত্তিক মঞ্চ নাটক ‘রাজারবাগ ৭১’ বাংলাদেশ সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক পরিষদ এর নাট্যদলের পরিবেশনায় মঞ্চায়ন অনুষ্ঠিত হয়েছে। উক্ত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশ্বাস আফজাল হোসেন, এনডিসি, অ্যাডিশনাল আইজি (এইচআরএম) বাংলাদেশ পুলিশ, পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স, ঢাকা। নাটকটি দুই পর্বে উপভোগ করছেন পুলিশের ঊর্ধ্বতন অফিসার, সদস্য, প্রশিক্ষণার্থী, ও আমন্ত্রিত অতিথিসহ প্রায় ৩,০০০ (তিন হাজার) দর্শক। 

এ পরিবেশনার মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধে রাজারবাগের প্রথম প্রতিরোধের ইতিহাস ও দেশপ্রমের ত্যাগের দৃষ্টান্ত, বর্তমান প্রজন্ম, নবীন ও প্রবীণ পুলিশ সদস্যদের মাঝে তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে।

উপসংহার

পিটিসি মহেড়া হতে জনবান্ধব, সেবামুখী, মানবিক পুলিশিং-এর প্রয়াসে; প্রতিটি পর্যায়ের প্রশিক্ষণার্থী উৎকর্ষতার মানদন্ডে উত্তীর্ণ হয়ে দেশ ও জনগণের সেবার নিয়োজিত হবে এই লক্ষ্যে পিটিসিতে কর্মরত প্রতিটি সদস্য স্ব স্ব দায়িত্বে অবিচল নিরন্তর। বাংলাদেশ পুলিশের অন্যতম ঐতিহ্য ও ইতিহাসের ধারক এ প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানটি দেশপ্রেম, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় সময় উপযোগী ও জনবান্ধব পুলিশিং এর সেবায় প্রত্যয়ী এক অন্যতম গৌরবময় প্রতিষ্ঠান ।

লেখক : ডেপুটি কমান্ড্যান্ট (অ্যাডিঃ ডিআইজি), পুলিশ ট্রেনিং সেন্টার, মহেড়া, টাঙ্গাইল।

ভালো লাগলে শেয়ার করে দিন :)

0 Comments

Leave a Reply

Avatar placeholder

Your email address will not be published. Required fields are marked *