ই-পেপার

SITE UNDER CONSTRUCTION
বাংলাদেশ পুলিশের মুখপত্র
অব্যাহত প্রকাশনার ৬৩ বছর

ডিটেকটিভ রিপোর্ট

অপরাধ দমনে আস্থা ও বিশ্বাস অর্জনের মধ্য দিয়ে জনগণের বাহিনী হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করতে পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেছেন, জনগণের কাঙ্খিত সেবা নিশ্চিত করার জন্য বাংলাদেশ পুলিশকে আধুনিক ও জনবান্ধব হিসেবে গড়ে তুলতে তাঁর সরকার বিভিন্ন সময়োপযোগী পদক্ষেপ নিয়েছে।

৫ জানুয়ারি রবিবার সকালে রাজধানীর রাজারবাগ পুলিশ লাইনস্ প্যারেড গ্রাউন্ডে ‘পুলিশ সপ্তাহ-২০২০’ উদযাপন উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।

শেখ হাসিনা পুলিশ সদস্যদের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘পুলিশ বাহিনীকে জনগণের পুলিশ হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করতে হবে। জনগণের আস্থা, বিশ্বাস অর্জনের মধ্য দিয়ে যেকোনো ধরনের অপরাধ দমন করা সহজ এবং সেই দৃষ্টিকোণ থেকে আপনারা কাজ করবেন, সেটাই আমি আশা করি। আমরা চাই, আমাদের পুলিশ বাহিনী জনবান্ধব হবে।’

শোষিত-বঞ্চিত মানুষের অধিকার আদায় করতে গিয়ে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আজীবন সংগ্রামের কথা তুলে ধরে তাঁর কন্যা বলেন, জাতির পিতাকে হত্যার পর স্বাধীনতাবিরোধীরা ক্ষমতায় এসেছিল। দেশে তারা লুটপাটের রাজত্ব করেছিল। সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদ, অস্ত্রধারী, মানি লন্ডারিং-নানা ধরনের কাজ তারা করে গিয়েছিল। কিন্তু দেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনে কোনো কাজ করেনি।

২০১৩ থেকে ২০১৫ সালে বিএনপি-জামায়াতের আন্দোলনের নামে অগ্নিসন্ত্রাসের সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘তাদের সেই আন্দোলনের নামে মানুষ পুড়িয়ে পুড়িয়ে হত্যা করা। আমাদের পুলিশ বাহিনীর ২৯ জন সদস্যকে তারা নির্মমভাবে হত্যা করেছিল। যাঁরা শাহাদাত বরণ করেছেন তাঁদের আমি শ্রদ্ধা জানাচ্ছি।’ প্রধানমন্ত্রী বলেন, সেই সময় প্রতিটি পুলিশ সদস্য নিজের জীবনকে বাজি রেখে দেশের মানুষ এবং জাতীয় সম্পদকে রক্ষা করেছেন। তিনি এজন্য পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের ধন্যবাদ এবং অভিনন্দন জানান। সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ, মাদক এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে তার সরকারের ‘জিরো টলারেন্স নীতির কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের সরকার দৃঢ়ভাবে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ যে, বাংলাদেশ থেকে আমরা সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ, মাদক এবং দুর্নীতি দূর করব এবং এসবের বিরুদ্ধে আমরা অভিযান চালিয়ে যাচ্ছি।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘একদিকে যেমন জনসচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে তেমনি সড়কে শৃঙ্খলাও ফিরিয়ে আনতে হবে। এক্ষেত্রে পুলিশ বাহিনী যথেষ্ট সুশৃঙ্খল ভূমিকা রাখছে।’ তিনি বলেন, বাংলাদেশ পুলিশের সার্বিক ব্যবস্থাপনায় জাতীয় জরুরি সেবা-‘৯৯৯’ এরই মধ্যেই ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে। জনগণ ‘৯৯৯’ ব্যবহার করে এখন খুব সহজেই ফায়ার সার্ভিস, অ্যাম্বুলেন্স ও পুলিশের সেবা পাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী এ সময় সোশ্যাল মিডিয়াসহ অন্যান্য প্রযুক্তির অপব্যবহার করে দেশে গুজব রটনাকারীদের আইনের আওতায় নিয়ে আসতেও পুলিশ বাহিনীর ভূমিকার প্রশংসা করেন।

আধুনিক যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে যেন পুলিশ বাহিনী চলতে পারে সে ব্যবস্থাও তার সরকার নিচ্ছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আগামীতে নারী পুলিশের জন্য একটি স্বতন্ত্র ট্রেনিং সেন্টার স্থাপনের পরিকল্পনাও সরকারের রয়েছে। এছাড়া পুলিশ কল্যাণ ট্রাস্ট প্রতিষ্ঠা, এর আওতায় কমিউনিটি ব্যাংকিং কার্যক্রম চালু এবং পুলিশ সদস্যদের জন্য একই ধরনের রেশনিং ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নিয়েছে বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘মহান মুক্তিযুদ্ধে শহিদ সকল পুলিশ সদস্যকে আমি গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি।’ প্রধানমন্ত্রী জাতির পিতার ভাষণের উদ্ধৃতি দিয়ে পুলিশ সদস্যদের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘আপনারা স্বাধীন দেশের পুলিশ। আপনারা বিদেশি শোষকদের পুলিশ নন- জনগণের পুলিশ।’ বঙ্গবন্ধুর এই আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি জনগণের সমস্যাকে আন্তরিক ও মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখারও আহ্বান জানান। ২০২০ সালকে দেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সময় আখ্যায়িত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘১৭ মার্চ জাতির পিতা জন্মগ্রহণ করেছেন। আর ২০২১ সালের ২৬ মার্চ আমাদের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী। আমরা ২০২০ সালের ১৭ মার্চ থেকে ২০২১ সালের ২৬ মার্চ পর্যন্ত সময়কে মুজিববর্ষ ঘোষণা করেছি।’

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান এবং বাংলাদেশ পুলিশের ইন্সপেক্টর জেনারেল (আইজিপি) ড. মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী বিপিএম (বার) ও অতিরিক্ত আইজিপি (প্রশাসন) ড. মো: মইনুর রহমান চৌধুরী বিপিএম (বার) এ সময় উপস্থিত ছিলেন। মন্ত্রিপরিষদ সদস্যবৃন্দ, সংসদ সদস্যবৃন্দ, ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তাবৃন্দ, বিভিন্ন পেশাজীবী সংস্থা ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, সিনিয়র পুলিশ সদস্য এবং তাদের পরিবারের সদস্যসহ আমন্ত্রিত অতিথিবৃন্দ অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেন। ‘মুজিববর্ষের অঙ্গীকার পুলিশ হবে জনতার’ এ প্রতিপাদ্য নিয়ে প্রতিবারের মতো এবারও বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনা এবং আনন্দমুখর পরিবেশে পুলিশ সপ্তাহ-২০২০ উদযাপিত হয়।

পুলিশ বাহিনীর উন্নয়নে আওয়ামী লীগ সরকারের নেওয়া পদক্ষেপ ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘একদিকে যেমন গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখা, অপরদিকে দেশকে উন্নত, সমৃদ্ধ করা। সেই লক্ষ্য নিয়ে আমরা কাজ করেছি। প্রতিটি কাজে আমাদের পুলিশ বাহিনী বিশেষ করে আমাদের গণতন্ত্র ও উন্নয়নের অগ্রযাত্রায় পুলিশ বাহিনী যথাযথ ভূমিকা রেখেছে। তাদের প্রত্যেকটা পদক্ষেপে অত্যন্ত দক্ষতা, সাহসিকতা এবং পেশাদারির দায়িত্বশীল ভূমিকা দেখেছি।’

তিনি বলেন, ‘আইন-শৃঙ্খলা খাতে বরাদ্দকৃত অর্থকে আমরা আর্থিক ব্যয় হিসেবে নিই না। আমরা মনে করি, জনগণের স্বার্থে, জনগণের কল্যাণে এটা আমাদের এক ধরনের বিনিয়োগ। কাজেই সেদিকে লক্ষ রেখেই আমরা এই পুলিশ বাহিনীকে আধুনিক সাজে সজ্জিত করে এবং আধুনিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে এবং জনগণের সেবা যাতে নিশ্চিত করতে পারে তার জন্য যথাযথ পদক্ষেপ আমরা নিয়ে যাচ্ছি।’

কোনো ধরনের দুর্নীতির অভিযোগ ছাড়া ১০ হাজার কনস্টেবল নিয়োগের জন্য সংশ্লিষ্টদের ধন্যবাদ জানিয়ে সরকার প্রধান বলেন, ‘আমি মনে করি, আপনারা একটা অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।’

প্রধানমন্ত্রী ১১ লাখ বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাকে পুনর্বাসনে পুলিশ সদস্যদের ভূমিকার প্রশংসা করেন। সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার জন্য আন্তরিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালনে পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের নির্দেশনা প্রদান করে তিনি এ বিষয়ে জনগণের সচেতনতা সৃষ্টির ওপর গুরুত্বারোপ করেন। অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী স্কুল পর্যায় থেকে ট্রাফিক আইন শিক্ষা দেয়ার ওপর জোর দেন।

পুলিশকে আধুনিক ও জনবান্ধব করে গড়ে তোলার লক্ষ্যে সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমরা পুলিশ কর্মকর্তাদের পদোন্নতি প্রাপ্তির জটিলতা নিরসনে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছি। পুলিশ বাহিনীতে গ্রেড-১ ও গ্রেড-২ পদের সংখ্যা বৃদ্ধি করা হয়েছে। পুলিশের সাংগঠনিক কাঠামোতে বিশেষায়িত ইউনিট- পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই), ট্যুরিস্ট পুলিশ, নৌ পুলিশ, স্পেশাল সিকিউরিটি অ্যান্ড প্রটেকশন ব্যাটালিয়ন ও ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশ গঠন করা হয়েছে।’

এ সময় তিনি জঙ্গি ও সন্ত্রাসবাদ নির্মূলে পুলিশ এন্টি টেরোরিজম ইউনিট (এটিইউ) এবং কাউন্টার টেরোরিজম এন্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিট (সিটিটিসি) গঠন, পুলিশ স্টাফ কলেজ ও বাংলাদেশ পুলিশ একাডেমিসহ পুলিশ ট্রেনিং সেন্টারগুলোতে আধুনিক প্রশিক্ষণ প্রদানের উদ্যোগ, সাইবার পুলিশ সেন্টার, ডিএনএ ল্যাব, আধুনিক ফরেনসিক ল্যাব এবং হাসপাতাল স্থাপনের কথা উল্লেখ করেন।

আধুনিক যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে যেন পুলিশ বাহিনী চলতে পারে সে ব্যবস্থা সরকার নিচ্ছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আগামীতে নারী পুলিশের জন্য একটি স্বতন্ত্র ট্রেনিং সেন্টার স্থাপনের পরিকল্পনাও সরকারের রয়েছে। এছাড়া পুলিশ কল্যাণ ট্রাস্ট প্রতিষ্ঠা, এর আওতায় কমিউনিটি ব্যাংকিং কার্যক্রম চালু এবং পুলিশ সদস্যদের জন্য একই ধরনের রেশনিং ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ সদস্যদের জন্য আজীবন রেশন প্রদানের বিষয়টিও আমাদের সক্রিয় বিবেচনায় রয়েছে। আমরা সেটারও ব্যবস্থা করে দেব।’

প্রধানমন্ত্রী মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রথম প্রহরে রাজারবাগ পুলিশ লাইনসে তৎকালীন পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের দুর্বার প্রতিরোধ এবং মুক্তিযুদ্ধে পুলিশ বাহিনীর আত্মত্যাগ শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেন। তিনি বলেন, ‘১৯৭১ সালের ২৫-এ মার্চ কালরাতে পাক হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন রাজারবাগ পুলিশ লাইনসে দেশপ্রেমিক পুলিশ সদস্যরা।’

প্রধানমন্ত্রী অনুষ্ঠানে পুলিশ সদস্যদের কুচকাওয়াজ উপভোগ করেন। তিনি অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ পুলিশ পদক ও পুলিশ পদক সেবা, রাষ্ট্রপতি পুলিশ পদক ও রাষ্ট্রপতি পুলিশ পদক সেবায় ভূষিত ১১৮ জন পুলিশ সদস্যের মাঝে পদক বিতরণ করেন। পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের অসীম সাহসিকতা ও বীরত্বপূর্ণ কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৪ জনকে ‘বাংলাদেশ পুলিশ পদক (বিপিএম)’, ২০ জনকে ‘রাষ্ট্রপতির পুলিশ পদক (পিপিএম)’ এবং গুরুত্বপূর্ণ মামলার রহস্য উদ্ঘাটন, অপরাধ নিয়ন্ত্রণ, দক্ষতা, কর্তব্যনিষ্ঠা, সততা ও শৃঙ্খলামূলক আচরণের মাধ্যমে প্রশংসনীয় অবদানের জন্য ২৮ জনকে ‘বাংলাদেশ পুলিশ পদক (বিপিএম)-সেবা’ এবং ৫৬ জনকে ‘রাষ্ট্রপতির পুলিশ পদক (পিপিএম)-সেবা’ প্রদান করা হয়। বিপিএম মরহুম মো. আকতার হোসেনের (মরণোত্তর) পক্ষে তাঁর সহধর্মিণী এবং দায়িত্ব পালনকালে দুর্বৃত্তদের গুলিতে আহত এএসআই নান্নু মিয়া হুইলচেয়ারে বসে প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে পদক গ্রহণ করেন।

ভালো লাগলে শেয়ার করে দিন :)

0 Comments

Leave a Reply

Avatar placeholder

Your email address will not be published. Required fields are marked *