ই-পেপার

নিউজ স্ক্রল

সোনার বাংলা গড়ার এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় রাষ্ট্র গঠনের প্রত্যয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা-র সরকার অব্যাহতভাবে উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করে যাচ্ছে। রুপকল্প ২০২১ এর লক্ষ্য মাত্রা অর্জন করার পর ২০৪১ এর লক্ষ্য অর্জনের জন্য সরকার স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার ঘোষণা করে। সরকার ঘোষিত অঙ্গীকার এবং চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে একটি সুখী, সমৃদ্ধ ও উন্নত দেশ গড়ার জন্য আধুনিক ও স্মার্ট পুলিশ বাহিনী গড়ে তোলা অপরিহার্য। এছাড়া বৈশ্বিক সন্ত্রাসবাদ, জঙ্গিবাদ, সাইবার অপরাধ, অর্থনৈতিক অপরাধ, অস্ত্র ও মাদক চোরাচলানসহ অন্যান্য আন্তঃদেশীয় অপরাধ মোকাবেলা করার জন্য প্রচলিত যে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চালু রয়েছে সেটি সময়ের চাহিদা পূরণে অপ্রতুল বিধায়- পুলিশের প্রশিক্ষণ ব্যবস্থায় আধুনিকায়ন জরুরী হয়ে পড়ে।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঐকান্তিক প্রচেষ্টা ও আগ্রহে উচ্চতর পুলিশিং শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ২০০০ সালের ৩০ নভেম্বর পুলিশ স্টাফ কলেজের যাত্রা শুরু হয়। প্রতিষ্ঠার পর থেকে হালনাগাদ পুলিশ স্টাফ কলেজের কার্যক্রম নিয়ে ডিটেকটিভ-এর এবারের প্রচ্ছদ প্রতিবেদন। তৈরি করেছেন মোহাম্মদ শাহজাহান, পিএইডি, পরিচালক, পুলিশ স্টাফ কলেজ। 

ঔপনিবেশিক পুলিশের উত্তরাধিকার

বাংলাদেশ পুলিশ ১৮৬১ সালের পুলিশ আইনের আওতায় গঠিত ঔপনিবেশিক পুলিশের উত্তরাধিকার। ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগ হয়ে শুধু ঔপনিবেশিক শাসকের বদল ঘটে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এর প্রাজ্ঞ নেতৃত্বের হাত ধরে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্ম হয়। রক্ত দিয়ে কেনা স্বাধীনতা অর্জনের পর এ দেশের মানুষের মধ্যে নতুন স্বপ্ন জাগে সোনার বাংলা গড়ার। পাক হানাদারদের ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞের পর মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত বাংলাদেশের প্রতিটি সেক্টর নাজুক অবস্থার মধ্য দিয়ে পথ চলা শুরু করে। যার ব্যতিক্রম হয়নি পুলিশের ক্ষেত্রেও।

মহান মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা উত্তর পরিস্থিতি

পাকিস্তানী বর্বর হানাদারদের আক্রমণে মুক্তিযুদ্ধে ভেঙ্গেপড়া অবকাঠামো, নাজুক আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি, এক শ্রেণির দুষ্কৃতকারী ও স্বাধীনতা বিরোধীদের হাতে অস্ত্র চলে যাওয়া তথাকথিত রাজনীতির নামে, অস্ত্র লুট, অগ্নি সংযোগ, ডাকাতি, নারী নির্যাতন, প্রতিবিপ্লবের নামে আন্ডারগ্রাউন্ড রাজনীতি এবং মানুষ খুন, শ্রেণি শত্রু খতমের নামে প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের হত্যা ইত্যাদি অবস্থা সামাল দিতে ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বাধীন সরকার পুলিশ বাহিনীর জনবল বৃদ্ধি করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। তৎকালীন আইন-শৃঙ্খলা জনিত পরিস্থিতিতে জরুরী ভিত্তিতে পুলিশ বাহিনীর সদস্য সংখ্যা বৃদ্ধি করা ছাড়া বিকল্প ছিলনা। সময়ের দাবীর প্রেক্ষিতে দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণ ছাড়াই অফিসার এবং সদস্যদেরকে দায়িত্বে নিয়োজিত করতে হয়। ফলে সদ্য স্বাধীন দেশে গণতান্ত্রিক সমাজ বিনির্মানে জনগণের প্রত্যাশার পুলিশ হিসেবে বাংলাদেশ পুলিশ যাত্রালগ্নেই চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়। ১৯৭৩-৭৫ সময়ে পুলিশ সদস্যগণ আইনী দায়বদ্ধতার মধ্য থেকে অপরাধ প্রতিরোধ, জননিরাপত্তা জোরদার, সংঘঠিত অপরাধের তদন্ত পরিচালনা, অপরাধী সনাক্ত করা, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য আইন ও বিধির আওতায় দায়িত্ব পালন অব্যাহত রাখে। ১৯৭৫ সালের ১৫ জানুয়ারি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রথম পুলিশ সপ্তাহের ভাষণে বর্ণিত প্রেক্ষাপট বর্ণনা করে জনগণের প্রত্যাশিত সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠার প্রত্যয়ে পুলিশ বাহিনীর সদস্যদেরকে দিক নির্দেশনা প্রদান করেন।

ঢাকার মিল ব্যারাক পুলিশ ট্রেনিং সেন্টার থেকে রাজশাহীতে বাংলাদেশ পুলিশ একাডেমী

ঢাকার মিল ব্যারাক পুলিশ ট্রেনিং সেন্টার থেকে রাজশাহীতে বাংলাদেশ পুলিশ একাডেমীর জন্ম। জাতির পিতার স্বপ্নের আন্তর্জাতিক পুলিশিংসহ পেশাদার প্রশিক্ষণ প্রদান করার প্রয়োজনীতা বিদ্যমান পুলিশ প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানগুলো পূরণ করতে না পারায়- চাহিদা পূরণের যে শুন্যতা সৃষ্টি হয়, তা মিটানোর জন্য বাংলাদেশে একটি অত্যাধুনিক শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান স্থাপনের প্রয়োজনীয়তা গভীরভাবে অনুভূত হয়। বৃটিশ থেকে পাকিস্তান আমল পর্যন্ত পুলিশ একাডেমী নানা পদবির ফোর্সের সঙ্গে অফিসারগণের প্রশিক্ষণ পরিচালনা করে আসছিল। বাংলাদেশ আমলে ফোর্স ও কর্মকর্তার সংখ্যা বৃদ্ধি, অবকাঠামোর স্বল্পতা, প্রশিক্ষকের অপ্রতুলতা দেখে জাতির পিতা ৪ টি আঞ্চলিক পুলিশ প্রশিক্ষণ সেন্টার চালু করেন। তারপরও ক্রমবর্ধমান ফোর্সের চাহিদা পূরণ করে অফিসারদের ইনসার্ভিস প্রশিক্ষণ প্রদান করার ক্ষেত্রে শুণ্যতা থেকেই যায়। সময়ের বিবর্তনে সমাজের ও সংস্কৃতির এবং রাজনীতির পরিবেশে পরিবর্তন ঘটে যায়। এ ঘটে যাওয়া পরিবর্তনের সঙ্গে কার্যকরভাবে খাপখাওয়ানোর জন্য নতুন ধারণা, উপলব্দি, চিন্তা, পর্যবেক্ষণ, দর্শন, অনুভব ইত্যাদি পুলিশ কমিউনিটির জন্য চ্যালেঞ্জিং হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষ করে স্বাধীনতা উত্তর গণতান্ত্রিক দেশের আইন-শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ, মানবাধিকার সমুন্নত রাখা এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় পুলিশ কর্মকর্তাদের কর্মদক্ষতার উন্নয়ন ইত্যাদির জন্য যে ধরণের উচ্চতর শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও গবেষণার প্রয়োজন অনুভূত হয়, তা পূরণ করার জন্য নতুন একটি উচ্চতর পুলিশ প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করার বিষয়টি সামনে চলে আসে। এ বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে পুলিশের উচ্চস্তরের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য ১৯৭৭ সালে গঠিত পুলিশ ট্রেনিং কমিশন বেশ কিছু সুপারিশ প্রদান করলেও তৎকালীন সামরিক সরকার তা বাস্তবায়ন করেনি।

পুলিশ ট্রেনিং কমিশনের সুপারিশ ও পুলিশ স্টাফ কলেজ প্রতিষ্ঠা

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় এসে পুলিশ ট্রেনিং কমিশন এর রিপোর্ট এর ভিত্তিতে পেশাদার প্রশিক্ষণ কার্যক্রম বিকাশের জন্য একটি আন্তর্জাতিক মানের উচ্চ পর্যায়ের প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান স্থাপনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। যে প্রতিষ্ঠান কালের বিবর্তনে ঔপনিবেশিক আমলের পুলিশিং এর সঙ্গে আজকের তথ্য-প্রযুক্তি নির্ভর বিশ্ব ব্যবস্থার পুলিশিং এর ব্যাপক পার্থক্য গড়ে দিয়েছে। পুলিশিং কর্মকা-ের প্রতিটি পদক্ষেপ উন্নয়নশীল কিংবা উন্নত দেশে প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হচ্ছে। ফোর্সকেন্দ্রিক বৈশিষ্ট্য থেকে বেরিয়ে সেবা প্রদান কেন্দ্রিক ফোর্স গড়ে তোলার জন্য উচ্চমানের প্রশিক্ষণ প্রদানের প্রয়োজন অনস্বীকার্য। কিন্তু এ প্রয়োজনীয়তা পূরণ করে এগিয়ে যাওয়ার জন্য সাংগঠনিক ব্যবস্থাপনা, দক্ষ ও পেশাদার নেতৃত্ব এবং আভিযানিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য জনবলের অপ্রতুলতা প্রভৃতি এ ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হয়। কর্মক্ষমতা ও দক্ষতার উন্নয়ন, নেতৃত্বের গুণাবলী ও আচরণের উন্নয়ন এবং ভবিষ্যত নেতৃত্বের জন্য অগ্রাধিকার ভিত্তিক প্রয়োজন চিহ্নিত করা আবশ্যক হয়ে পড়ে।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর একান্ত আগ্রহ ও ইচ্ছায় এবং বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করার জন্য ১৯৯৮ সালে পুলিশ স্টাফ কলেজের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপিত হয় এবং ২০০০ সালের ৩০ নভেম্বর মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আনুষ্ঠানিকভাবে পুলিশ স্টাফ কলেজের উদ্বোধন ঘোষণা করেন। সেই থেকে পুলিশ স্টাফ কলেজের আনুষ্ঠানিক পথ চলা শুরু। এরই ধারাবাহিকতায় ২০০২ সালে পুলিশ স্টাফ কলেজের জন্য স্বতন্ত্র আইন জাতীয় সংসদে পাশ হয় এবং অতিরিক্ত আইজিপি মো: নূরুল আলমের নেতৃত্বে একটি মাত্র প্রশিক্ষণ কোর্সের মাধ্যমে কলেজের কার্যক্রম শুরু করলেও ২৫ বছরের নাতিদীর্ঘ যাত্রায় এটি এখন সমগ্র জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে পরিচিত একটি শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান হিসেবে  স্বীকৃতি পেয়েছে।

পাকিস্তান আমলে গণতন্ত্রের কন্ঠরোধ করে মানুষের মৌলিক অধিকার হরণ করা হয়েছিল এবং পুলিশ সত্যিকারের পেশাদার সংস্থা হিসেবে গড়ে উঠতে পারেনি। ঔপনিবেশিক ধারায় চলতে থাকে পুলিশের কার্যক্রম। ফলে সংগঠন হিসেবে মানুষের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হয়, গণতান্ত্রিক সমাজের পুলিশের যেসব বৈশিষ্ট্য সেগুলো বিকশিত হয়নি। পুলিশের চরিত্রে ব্যবস্থাপনা, মানব সম্পদ উন্নয়ন, পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধির বিষয়গুলো হতে থাকে উপেক্ষিত। পুলিশ পরিচিত হতে থাকে পেটুয়া বাহিনী হিসেবে। পাকিস্তানী পুলিশ কর্মকর্তাগণ বিদেশী প্রশিক্ষণ ও উচ্চ শিক্ষার সুযোগ পায় আর বাঙালি অফিসারগণ উপেক্ষিত ও লাঞ্ছিত এবং অবহেলিত হয়। স্বাধীনতা পরবর্তীকালে বাংলাদেশের জান্তা শাসকগণ একই ধারা অনুসরণ করায় সংগঠন হিসেবে পুলিশের বিকাশ হয়নি। ১৯৭৭ সালের ট্রেনিং কমিশন রিপোর্টে সুপারিশ আকারে এলেও বাস্তবায়ন হয়নি। ১৯৮৮-৮৯ সালে গঠিত পুলিশ কমিশন রিপোর্টে পুনরায় তা অন্তর্ভূক্ত হলেও বাস্তবায়ন হয়নি। ১৯৯৪ সালে পুলিশ স্টাফ কলেজ প্রতিষ্ঠার জন্য আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব সরকারের নিকট প্রেরণ করা হলেও তা বাস্তবায়নে সাড়া পাওয়া যায়নি। অবশেষে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের আমলে ১৯৯৮ সালে ১৪ ডিসেম্বর সরকারের অনুমোদন পাওয়া যায়। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্বাধীন গণতান্ত্রিক দেশের উপযোগী পুলিশ বাহিনী গড়ার লক্ষ্যে পুলিশ কমিশন রিপোর্ট বাস্তবায়নে উদ্যোগী হন এবং উচ্চতর শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান হিসেবে পুলিশ স্টাফ কলেজ প্রতিষ্ঠার পদক্ষেপ গ্রহণ করেন।

স্টাফ কলেজের প্রশাসন পরিচালনা ও কার্যক্রম

মিরপুর ১৪ নম্বরের বিশাল রাস্তার পাশে ছায়াঘেরা মনোরম একটি সবুজ পরিবেশে পুকুর, মাঠ আর নান্দনিক স্থাপত্যের  অবকাঠামোগুলোই পুলিশ স্টাফ কলেজ হিসেবে পরিচিত। মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন একটি শক্তিশালী পরিচালনা বোর্ডের সার্বিক তত্ত্বাবধানে একজন অতিরিক্ত আইজিপি’র (রেক্টর) অধীনে কলেজের কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়ে থাকে। কলেজের প্রথম রেক্টর ছিলেন মো: নূরুল আলম এবং বর্তমান রেক্টরের দায়িত্ব পালন করছেন ড. মল্লিক ফখরুল ইসলাম, বিপিএম, পিপিএম।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের পাবলিক অর্ডার ম্যানেজমেন্ট বিভাগ ও কাফরুল থানার পশ্চিম পাশে ১৯.৫ একর জমির উপর প্রতিষ্ঠিত। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে উর্ধ্বতন পুলিশ সদস্যদের বিচক্ষণতা, উদ্ভাবন, সেবার মানসে প্রস্তুতি, কমিটমেন্ট, টিমওয়ার্ক, মনোভাব ও আচরণ, দক্ষতা, জ্ঞান ও প্রজ্ঞা এ বৈশিষ্ট্যগুলোর বিকাশ করার মূলমন্ত্রকে ধারণ করে পুলিশ স্টাফ কলেজের শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও গবেষণা কার্যক্রম পরিচালিত হয়। আইনের জরিসপ্রুডেন্স, সাংবিধানিক আইন, অপরাধ আইন, উচ্চতর তদন্ত পদ্ধতি, মানবাধিকার, অপরাধ বিজ্ঞান, সমাজ বিজ্ঞান, মনোবিজ্ঞান, নৃতত্ত্ব, ইতিহাস, অর্থনীতি, তথ্য-প্রযুক্তিসহ আধুনিক জ্ঞানের প্রতিটি শাখা বিষয়ে নিজস্ব ও বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথিত যশা অধ্যাপক, গবেষক, সামরিক-বেসামরিক কর্মকর্তা, উন্নয়ন কর্মী, আইনবিদ ও তথ্য-প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞগণ পাঠদান করে থাকেন।

কলেজের শিক্ষা কার্যক্রম

মাস্টার অব এ্যাপলাইড ক্রিমিনোলোজি এন্ড পুলিশ ম্যানেজমেন্ট (এমএসিপিএম)

পুলিশ স্টাফ কলেজ আইন ২০০২ এর ধারা ৪(ঘ) এর আওতায় এমএসিপিএম মার্স্টার্স প্রোগ্রাম ২০১৫-১৬ শিক্ষা বর্ষ থেকে চালু হয়েছে। এটি সম্পূর্ণ পেশাগত একটি শিক্ষা কার্যক্রম। এ প্রোগ্রামের আসন সংখ্যা ৫০টি। পুলিশ কর্মকর্তা ও বিভিন্ন পেশাজীবি, উন্নয়নকর্মী এবং সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তাগণ এতে নির্ধারিত শর্ত সাপেক্ষে ভর্তি হওয়ার যোগ্য। নিজস্ব অনুষদ সদস্যের বাইরেও দেশের প্রথিতযশা শিক্ষাবিদ, পেশাজীবি, সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তাগণ এডজাংক্ট অনুষদ হিসেবে পাঠদানে অংশগ্রহণ করে থাকে। সময় উপযোগি কারিকুলাম অনুসরণ করে এ শিক্ষা কার্যক্রম চলমান রয়েছে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভূক্ত প্রতিষ্ঠান হিসেবে এটি সুনামের সাথে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করছে। বর্তমানে সপ্তম কোর্স এর শিক্ষা কার্যক্রম চলমান আছে।

পরিসংখ্যানের আলোকে নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, এ শিক্ষা কার্যক্রমটি ক্রমেই জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। প্রথম ব্যাচে ১৪ জন পুলিশ কর্মকর্তার সমন্বয়ে প্রোগ্রামটি আরম্ভ হলেও পরবর্তী ব্যাচগুলোতে এ সংখ্যা ক্রমবর্ধমান যথা ১৪, ১৯, ২৪, ১৬, ২৮, ৩৩ এবং সর্বশেষ সপ্তম ব্যাচে ৫০ জন।

বোর্ড সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সাইবার সিকিউরিটি এবং সিকিউরিটি ম্যানেজম্যান্ট শিরোনামে আরো দু’টি পোস্ট গ্র্যাজুয়েট ডিগ্রি (পিজিডি) চালু করার সকল কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছে। খুব শীঘ্রই কোর্স দুটি আনুষ্ঠানিকভাবে চালু করা হবে।

প্রশিক্ষণ কার্যক্রম

পিএসসি’র প্রশিক্ষণ কার্যক্রম মূলত: পাঁচ ক্যাটাগরিতে বিন্যাস করা যায় যথা-বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণ, পার্টনারশীপ প্রশিক্ষণ, বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ, সেমিনার ও ওয়ার্কশপ। প্রশিক্ষণার্থীদেরকে পেশাদার হিসেবে গড়ে তোলার জন্য তাদের উদ্ভাবনী চিন্তা, পুলিশিং এবং উচ্চতর প্রশিক্ষণের প্রয়োজনীয়তা, প্রশিক্ষণের মাঠ পর্যায়ে বাস্তবায়ন, দক্ষতা, মনোভাব ও আচরণের উন্নয়ন, সেবা প্রার্থীদের কাজে সাড়া দানের তৎপরতা, বৈশ্বিক বেস্ট প্র্যাকটিস চর্চা ইত্যাদি বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার প্রদান করা হয়। প্রশিক্ষণের উন্নয়নগতমান বজায় রাখার জন্য নিজস্ব প্রশিক্ষকের বাইরে পুলিশিং, জনপ্রশাসন,মানবাধিকার, ব্যবস্থা, আইন, সাংবাদিকতা, মনোবিদ্যা প্রভৃতি ক্ষেত্রের অভিজ্ঞ ও দক্ষ প্রশিক্ষকদেরকে প্রশিক্ষণ প্রদানের জন্য নিয়োজিত করা হয়।  প্রতিষ্ঠার পর হতে ২০২২ সাল পর্যন্ত ২২৪টি প্রশিক্ষণ কোর্সে ৫০১৭ জন, ৭৬টি ওয়ার্কশপে ২০৭০ জন এবং ১৫টি সেমিনারে ৫২৪ জন কর্মকর্তাকে প্রশিক্ষণ প্রদান করেছে। কোভিড-১৯ সময়ে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম হ্রাস পেলেও কোভিড-১৯ উত্তর পরিস্থিতিতে পূর্ণ উদ্যোগে প্রশিক্ষণ চলমান রয়েছে। প্রচলিত প্রশিক্ষণের পাশাপাশি মানবাধিকার, কম্পারেটিভ পুলিশিং, সন্ত্রাসবাদ, সাইবার অপরাধ, অর্থনৈতিক অপরাধ এবং অস্ত্র ও মাদকের মতো আন্ত:দেশীয় অপরাধ বিষয়গুলোকে গুরুত্বসহকারে প্রশিক্ষণ কারিকুলামে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

পুলিশ স্টাফ কলেজে পুলিশ বিভাগের সদস্যগণ ছাড়াও অন্যান্য মন্ত্রণালয় ও বিভাগের কর্মকর্তাগণ পুলিশ স্টাফ কলেজে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কোর্সে অংশগ্রহণ করেছেন। তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিজিবি, এসএসএফ, আনসার ও পিডিপি, কোস্টগার্ড, সশস্ত্র বাহিনী, ডিজিএফআই, এনএসআই, ফায়ার সার্ভিস, ইমিগ্রেশন এন্ড পাসপোর্ট, এসিসি, পিডব্লিওডি, এটর্নি সার্ভিস/এডভোকেট, বাংলাদেশ ব্যাংক, কাস্টমস, ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট, প্রাইভেট হাসপাতাল ও ক্লিনিক।

দেশীয় ও আন্তর্জাতিক উন্নয়ন অংশীদারগণের সঙ্গে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম

পুলিশ স্টাফ কলেজ দেশীয় অংশীদারগণের বাইরে ৩৪টি আন্তর্জাতিক উন্নয়ন অংশীদারগণের সঙ্গে প্রশিক্ষণ ও গবেষণা  কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে। প্রতিষ্ঠার পর থেকে ২০২২ পর্যন্ত বিদেশী সংস্থা ও উন্নয়ন অংশীদারগণ ৩২৭টি প্রশিক্ষণ কোর্স ৭০৯০ জন প্রশিক্ষণার্থীকে প্রশিক্ষণ প্রদান করেছে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো বিগত ২০২২ সালে ঢাকায় অনুষ্ঠিত ইন্টারন্যাশনাল এসোসিয়েশন ফর একাডেমিজ (INTERPA) এর ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে রেক্টর পুলিশ স্টাফ কলেজ নির্বাচিত হয়েছে। (INTERPA) এর সদর দপ্তর তার্কি-তে। এর সদস্য সংখ্যা ৬৩ দেশের ৮০টি পুলিশ প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান। যেসব বিদেশী উন্নয়ণ অংশীদারগণ পুলিশ স্টাফ কলেজের সাথে সম্পৃক্ত তাদের উল্লেখযোগ্য কয়েকটি সংস্থার নাম পাশের ছকে উল্লেখ করা হলো।

কলেজের গবেষণা ও প্রকাশনা কার্যক্রম

পুলিশ স্টাফ কলেজ আইন অনুযায়ী কলেজের গবেষণা প্রকাশনা কার্যক্রম পরিচালিত হয়। মূলত পুলিশিং, ক্রিমিনোলজি, জননিরাপত্তা, সন্ত্রাসবাদ, মানবাধিকার এবং সমসাময়িক পুলিশিং ইস্যু নিয়ে কলেজের গবেষণা কার্যক্রম আবর্তিত হয়। গবেষণার ফলাফল বাস্তবায়নের নিমিত্ত গবেষণাপ্রাপ্ত সুপারিশসমূহ পুলিশ হেডকোয়ার্টাসে প্রেরণ করা হয় এবং গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা আর্টিক্যাল প্রকাশ করা হয়। এ শাখা থেকে বৎসরে ২টি জার্নাল, ৩টি নিউজলেটার ও ১টি বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশসহ কলেজের প্রশিক্ষণ ম্যানুয়াল, কোর্স ব্রসিউর ইত্যাদি প্রকাশ করা হয়ে থাকে।

Bangabandhu’s Vision of Law Enforcement:

Policing in Bangladesh শীর্ষক গবেষণা কার্যক্রম

গবেষণা শাখার ২০১২ সালে প্রথম গবেষণা কার্যক্রম শুরু করে ২৯টি গবেষণা কার্যক্রম সম্পাদন করে। মুজিববর্ষ উপলক্ষে কলেজের পক্ষ থেকে Bangabandhu’s Vision of Law Enforcement: Policing in Bangladesh শীর্ষক গবেষণা কার্যক্রম সম্পাদন করা হয়। এ গবেষণার উল্লেখযোগ্য দিক হলো জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পুলিশ সম্পর্কিত ভাবনা ও পুলিশিং বিষয়ে দর্শন উদঘাটনের চেষ্টা। এছাড়াও তিনি পুলিশের জন্য যেসব কার্যক্রম গ্রহণের উদ্যোগ নিয়েছিলেন তাও উদঘাটন করা হয়েছে। এজন্য বঙ্গবন্ধুর ভাষণ, বঙ্গবন্ধু কর্তৃক লিখিত পুস্তক, সিক্রেট ডক্যুমেন্ট, বঙ্গবন্ধু বিশেষজ্ঞ, সিভিল সোসাইটির সদস্য, রাজনীতিবিদ এবং তাঁর সময়কালে যেসব পুলিশ কর্মকর্তা নিয়োজিত ছিলেন তাদের নিকট থেকে কোয়ালেটিটিভ ও কোয়ানটিটেটিভ পদ্ধতিতে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করা হয়েছে।

বঙ্গবন্ধু সেন্টার ফর রিসার্চ এন্ড ডেভলপমেন্ট

সরকার ঘোষিত রূপকল্প ২০৪১ এর সাথে সামঞ্জস্য রেখে স্মার্ট বাংলাদেশের দর্শনকে বাস্তবায়ন করার জন্য শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও গবেষণা কার্যক্রমে পুলিশকে আন্তর্জাতিক মান সম্পন্ন হিসাবে গড়ে তোলার জন্য বিগত ২০২২ সালে অনুষ্ঠিত পরিচালনা বোর্ডের সভায় বঙ্গবন্ধু সেন্টার ফর রিসার্চ এন্ড ডেভলপমেন্ট স্থাপনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এ সেন্টারের মাধ্যমে পুলিশ ও শিক্ষাবিদগণের সমন্বয়ে গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে। প্রস্তাবটি যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে জননিরাপত্তা বিভাগ, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করা হয়েছে। সেন্টারটি প্রতিষ্ঠিত হলে পুলিশের সাংগঠনিক কাঠামো সংস্কার, আইনি সংস্কার, উচ্চতর শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ, মানবাধিকার, সন্ত্রাসবাদ, সাইবার ক্রাইম, সমসাময়িক পুলিশ ইস্যু এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সহযোগীতা বৃদ্ধির কার্যক্রমে গতিশীলতা আসবে। এর ফলে পুলিশ স্টাফ কলেজের শিক্ষা ও গবেষণা কার্যক্রম শাণিত হবে।

পরিশেষে একথা নিঃসন্দেহে বলা যায়, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একান্ত আগ্রহে প্রতিষ্ঠিত পুলিশ স্টাফ কলেজ সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে চলেছে। আগামী দিনে উন্নত ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশের জন্য পেশাদার পুলিশ তথা স্মার্ট পুলিশ তৈরির প্রতিষ্ঠান হিসাবে পুলিশ স্টাফ কলেজ অগ্রণী ভূমিকা পালন করবে। সকল অংশীদারগণের সার্বিক সহযোগীতায় পুলিশ স্টাফ কলেজ এগিয়ে যাবে এ দৃঢ় প্রত্যয় আমাদের রয়েছে।

ভালো লাগলে শেয়ার করে দিন :)