ই-পেপার

SITE UNDER CONSTRUCTION
বাংলাদেশ পুলিশের মুখপত্র
অব্যাহত প্রকাশনার ৬৩ বছর

ইরানী বিশ্বাস

গেট খুলে এক পাশে দাঁড়িয়ে রয়েছে পাচু। কালো গাড়িটি সাই করে গেট টপকে ভেতরে প্রবেশ করে। পাচু গেট বন্ধ করে দাঁড়িয়ে আছে। মনে মনে সিদ্ধান্ত নেয়, খাবার শেষ করতে সাদেক আলীর রুমে প্রবেশ করবে, নাকি সদ্য প্রবেশ করা গাড়িটির কাছে গিয়ে দাঁড়াবে। ভাবতে ভাবতে গাড়ির দরজা খুলে বেরিয়ে আসে মোহিনী। হাতের ইসারায় কাছে ডাকে পাচুকে। আবছা আলোয় মোহিনীকে সত্যি অতুলনীয় লাগছে। গুটি গুটি পায়ে কাছে গিয়ে মাথা নীচু করে দাঁড়ায় পাচু। মোহিনীর গলায় প্রশ্নবোধক সুর মেখে বলেন,

– তুমি গেট খুলতে এসেছো, দারোয়ান কোথায়?

– ম্যাডাম, বেয়াদপি মাফ করবেন। তিনি ভাত খাচ্ছেন। সামনের ভাত রাইখা উইঠা আসা ঠিক না। আল্লাহপাক বেজার হবেন।

– চুপ করবে? বেশি কথা বলো।

– জ্বী ম্যাডাম।

– দারোয়ান খাচ্ছে, তাহলে তুমি কি করছিলে?

– জ্বী ম্যাডাম। আমি আগেই খাওয়া শ্যাষ কইরা বইসা ছিলাম।

– ঠিক আছে এখন যাও। সাদেকের খাওয়া শেষ হলে ওর সঙ্গে আজ রাতে ঘুমাবে। কাল সকালে ভেতরে এসো।

– জ্বী ম্যাডাম।

কথা শেষ করে মোহিনী হিল তোলা জুতায় খট খট শব্দ তুলে ভেতরে চলে যায়। কালো গাড়িটি আবার গেট দিয়ে বাইরে চলে যায়।

সাদেক তখনো খাবার সামনে নিয়ে বসে আছে। মনে মনে সংশয় এই বুঝি চাকরি যায়। পাচু রুমে ঢুকতেই সাদেক ব্যস্ত হয়ে পড়ে। তড়িঘড়ি করে জিজ্ঞেস করে,

– কোন ঝামেলা হয়েছে?

– ঝামেলা! ঝামেলা হইতে যাইবো ক্যান?

– না মানে হইতাছে গিয়া, তোমারে গেইট খুলতে দ্যাখছে। আমার কথা কিছু জিগাইল? চোখে মুখে কোন আভাস পাইলা? মানে তখন রাগী ভাব ছিল?

– তুমি খালি খালি চিন্তা করতাছো। তেমন কিছুই হয় নাই।

সাদেক আলী একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ছেড়ে ভাতের থালায় হাত দেয়। তারপর বাকি খাবার শেষ করে, প্লেট-গ্লাস পরিস্কার করে, বিছানায় এসে বসে। পাচুকে চিন্তিত দেখে সাদেক তাকিয়ে থাকে তার দিকে। তারপর ঘর পরিস্কার করা ঝাড়– ভেঙ্গে দাঁত খোঁচাতে থাকে আর জিজ্ঞেস করে,

– কি ভাবতাছো?

– না কিছু না।

– বাড়ির কথা মনে পড়ছে। আম্মার কথা?

– হ তাতো পড়বোই। ভাবতাছি কাল ম্যাডামের সামনে গেলে কি কইবো। আমার চাকরিডা হইবো তো?

– ম্যাডাম তোমারে কি কইছে কওতো?

– ম্যাডাম আমারে কইছে আইজ রাতডা তোমার কাছে থাকতে। তারপর সকাল হইলে ভেতরে যাইতে।

– তাইলে কোন চিন্তা নাই। তোমার চাকরি হইবোই।

– সত্য কইতাছো? আল্লাহ তুমি এই গরীবের ফরিয়াদ কবুল করো।

– জানি নারে ভাই, মাঝে মইধ্যে কি মনে হয় জানো, মনে হয় আল্লাহ গরীব মানষের দিকে চাওনের সময় পায় না। সারাক্ষণ খালি বড়লোকগো দিকে চাইয়া থাকে।

– কি যে কও সাদেক ভাই। নিজের কর্ম দোষ আল্লাহর উপর দিলে চলবো। নেও রাইত হইছে ঘুমাও। সকালে আবার উঠতে হইব তো।

সাদেক নাক ডেকে বিভোর হয়ে ঘুমাচ্ছে। সকালের সুর্যটা তখনো ভাল করে উঁকি দেয় নাই। চারিদিকে অন্ধকার সরে যেতে যেতে আলো ছড়িয়ে পড়ছে চারিদিকে। সারারাত দুচোখের পাতা এক করতে পারেনি পাচু। কি এক উৎকন্ঠা নিয়ে সময় পার করছে। বাইরের আবছা আলোতে একবার সাদেকের দিকে তাকায়। তারপর পা টিপে টিপে বাইরে আসে পাচু। বাড়ির চারিদিকে একবার ঘুরে আসে। বাড়িটা বেশ বড় নয়। তাই ঘুরতে বেশি সময় লাগেনি।

সাদেক ঘুম ভাঙ্গতেই দেখে পাচু ঘরে নাই। বুকের মধ্যে ধক্ করে ওঠে। কি জানি রাতের অন্ধকারে চুরি করে পালিয়ে গেল কি না। নিজের পরিনতির কথা ভেবে ভয়ে বুক শুকিয়ে আসছে। তাড়াতাড়ি বিছানা ছেড়ে ঘরের বাইরে আসে। এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখে

কোথাও পাচুকে দেখা যাচ্ছে না। এবার সত্যি সত্যি বিপদের আশংকায় হার্টবিট বেড়ে চলছে। গেটের দিকে তাকিয়ে দেখে ঠিক ঠাক। গেটে তেমনই তালামারা রয়েছে। তবুও নিজেকে বিশ্বাস করাতে পারছে না। গেটের কাছে গিয়ে একবার নিজেই পরীক্ষা করে দেখে। না সব ঠিক আছে। তাহলে গেল কোথায় পাচু।

একটা আধাপাকা পেয়ারা হাতে সাদেকের সামনে এসে দাঁড়ায় পাচু। অবাক হয়ে সাদেক তার আদ্যপান্ত দেখে। তারপর ধমকের সুরে বলে,

– কোই গেছিলা এত সকালে?

– কোনহানে না। বাড়িডা একটু ঘুইরা দেখতে গেছিলাম।

– হাতে ওইডা কি?

– পেয়ারা।

– তুমি এত সকালে উইঠা পেয়ারা পাড়তে গেছো?

– না না। পেয়ারা পাড়বো ক্যান। আমি দেখলাম পেয়ারা এমনেই পইড়া রইছে। তাই হাতে কইরা লইয়া আসলাম। ভাবলাম এত দামী ফল ফালাই দিবো ক্যান।

– ভাল করছো। পানি দিয়া ধুইয়া খাইয়া ফালাও।

– না না। আমি তো ছোডবেলা

থেইকা পেয়ারা খাই না। এইডা আমি তোমার জন্য আনছি। নাও ধরো।

কাচাপাকা পেয়ারাটা সাদেকের হাতে তুলে দেয় পাচু। ভ্রাতৃত্বে¡র মমতায় মনটা হু হু করে ওঠে। মনে হলো গ্রামের ফেলে রেখে আসা সেই কত্তোবছর আগের ছোট ভাই যেন ফিরে এসেছে তার কাছে। অনেক আটকানোর পরও সাদেকের চোখ ভিজে ওঠে। নিজের দুর্বলতা লুকাতে সাদেক বলে,

– তুমি না কইলা সকালে ম্যাডামের কাছে যাইবা?

– হ কইছিলাম তো। তয় অহনই যাইবা? ম্যাডামের ঘুম ভাঙ্গে কখন?

– তুমি ঠিক কথাই কইছো। এত্তসকালে ম্যাডাম তো ঘুম থাইকা ওডে না। থাক তাইলে আরেকটু বেলা হোক। তারপর তোমারে লইয়া যাইবো।

পাচু অস্থির হয়ে পায়চারি করতে থাকে। আজ অনেকদিন পর এমন অস্থির লাগছে তার। সময় যেন কাটছে না।

গত রাতে তাহিরের সঙ্গে কোন কথা বলেনি সীমা। হতে পারে এ কারণে সীমার চোখে ঘুম আসছে না। বার বার এপাশ ওপাশ করে কাটিয়ে দিয়েছে। অনেক ভোরে বিছানা ছেড়ে ড্রইং রুমে এসে লো সাউন্ড দিয়ে টিভি দেখছে। সীমার মা প্রতিদিন ভোরে ওঠে ফজরের নামাজ পড়তে। তারপর আর ঘুমায় না। নিজের রুমে বিছানায় বসে কোরান তেলাওয়াত করেন। হঠাৎ টেলিভিশনের শব্দ কানে ভেসে আসতেই উকি দিয়ে দেখার চেষ্টা করে। অনেক অনুসন্ধানের পর বুঝতে পারে শব্দটা আসলে তারই ড্রইং রুম থেকে আসছে। কোরান পড়া শেষ করে উঠে আসে ড্রইং রুমে। মা বুঝতে পারে, সীমার মনের অবস্থা। ধরে নিয়েছে জামাইয়ের সাথে তার কোন ঝামেলা হয়েছে। তাই পরম মমতায় হাত রাখে মেয়ের মাথায়। তারপর কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করে,

– কি হয়েছে মা, এত সকালে তুই এখানে কি করছিস?

– তেমন কিছু না মা। হঠাৎ ঘুম ভেঙ্গে গেল, তাই উঠে এসেছি।

– চা করবো, খাবি?

– হ্যা একটু চা করো।

মা বুঝতে পারে, তাহিরকে দুরে রেখে সীমা কিছুতেই ভাল নেই। ওদের একটা সন্তান প্রয়োজন। তাছাড়া তাহির কোথায় গেছে, কেন গেছে কিছুই বলে যায়নি। এমনকি কোন ল্যাগেজও নিয়ে যায় নি। অফিস থেকে হঠাৎই ফোন করে জানিয়ে দিয়েছে, আজ আসতে পারবে না। এ নিয়ে সীমা শুধু রাগ বা অভিমান নয়। সে মনে মনে বিপদের সংশয় করছে। কোন এক অজানা বিপদের পদধ্বনি শুনতে পাচ্ছে। তাইতো রাতে দুচোখে ঘুম আসছে না। যতবার তাহির কল করেছে, ততবার দাঁতে দাঁত চেপে রয়েছে। তবু একবারও কল রিসিভ করে নাই। রাগটা বইরে যতটা ভেতরে ততটা ভালবাসায় ভরপুর।

আদা চা খেতে পছন্দ করে সীমা। তাই মা আজ আদা-দারুচিনি দিয়ে দুই কাপ চা বানিয়ে নিয়ে আসে ড্রইং রুমে। টোস্ট বিস্কিট দিয়ে আদা চা খাওয়া অনেক দিনের অভ্যাস এ পরিবারের। বিস্কিটে কামড় দিতে দিতে মেয়ের দিকে তাকিয়ে বলে,

– কি রে সীমা, তাহির কোথায় গেছে? আগে থেকে বললোও তো না। প্রত্যেকবার যাবার আগে নিজে এসে তোকে এ বাড়িতে রেখে যায়।

– জানি না।

সীমার কথায় অভিযোগের সুর। মা বুঝতে পারে, দুজনের মধ্যে কোন কিছু হয়েছে। পরিবেশটাকে হালকা করতে আবার তিনি বলেন,

– তাহির এবার আসলে ওকে বলিস ভাল মেয়ের খোঁজ করতে। আর দেরি করা ঠিক হবে না। শুভর বিয়েটা দিয়ে দেওয়াই ভাল হবে।

মায়ের মুখের কথা কেড়ে নিয়ে সীমা বলে,

– এখনই বিয়ে দিবা? মাত্রই তো এত বড় একটা প্রবলেম হয়ে গেল। এটা কাটিয়ে ওঠার সময় দাও।

– সময় দেওয়ার কি আছে? বিয়ে দিলে, অন্যমনস্ক হয়ে দেখবি ঠিকই সব ভুলে যাবে।

– কি জানি, দেখো বিয়ে দিয়ে। কি হয়।

টেবিল ঘড়িতে এ্যালার্ম বাজে। অফিসের টাইম মতো শুভ উঠে আসে বিছানা ছেড়ে। ড্রইং রুমে মা-বোনকে কথা বলতে দেখে কাছে এসে দাড়ায়। তারপর মুখোমুখি সোফায় বসে ওদের কথায় যোগ দিয়ে বলে,

– কি নিয়ে তোমরা এত সকালে আলোচনায় বসেছো?

ভাইয়ের কথার রেশ ধরে সীমা বলে,

– কি আবার, তোর বিয়ে নিয়ে কথা বলছিলাম।

– আমার বিয়ে !

– নয়তো কি? ছেলে বড় হলে মায়ের দায়িত্ব তাকে বিয়ে দেওয়া। আমারও সেই দায়িত্ব এখন তোকে ভাল মেয়ে দেখে বিয়ে দেওয়া।

নিজের বিয়ের কথা শুনে এতটুকুও বিচলিত হয়নি। আগে হলে হয়তো লজ্জা পেয়ে মুখটা লাল হয়ে উঠতো। অথবা প্রতিবাদ করে বলতো, এত তাড়ার কি আছে, কিছুদিন ব্যাচেলর লাইফ এনজয় করতে দাও। কিন্তু না সে সবের কিছুই বলেনি শুভ। বরং মাথাটা নীচু করে কি যেন ভাবতে লাগলো। মা বুঝতে পারে, ছেলে হয়তো সেই বিভিষিকাময় দিনটির কথা মনে করার চেষ্টা করছে। তাই মুহুর্তটাকে উপভোগ করতে বললেন,

– কি রে কেমন মেয়ে দেখবো?

তখনো কোন কথা বলছে না শুভ। সেই একই ভাবে চুপচাপ বসে আছে। সীমা, মায়ের কথার সঙ্গে তাল মিলিয়ে বলে,

– কোন পছন্দ থাকলে বলতে পারিস। আমরা কোন আপত্তি করবো না। একেবারে আাংটি পরিয়ে আসবো।

এবার অস্ফুট স্বরে শুভ মুখ খোলে,

– পছন্দ তো ছিলই। হলো

কোথায়। সব পছন্দ নিজের হয় না।

সীমা বুঝতে পারে শুভ আর কিছু না, রাইসার কথা বলার চেষ্টা করছে। তাই সে একটু দুষ্টামী মেখে স্বাভাবিক সুরে বলে,

– তোর স্বপ্নের রাজকন্যা চলে গেছে বলে অভিমান করছিস?

– না না আপু। অভিমান নয়। সত্যি ঘটনাটা আমি এখনো জানতে পারিনি। তবে খুব ইচ্ছে হয়। ওকে যদি জীবনে কোন একদিন পাই তাহলে জিজ্ঞেস করবো সে কেন আমার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করলো। কি এমন ক্ষতি আমি করেছি।

– সব ভুলে যা ভাই। জীবনে কতো দুর্ঘটনা ঘটে। ধরে নে, রাইসার সাথে তোর দেখা, বা পরিচয় সবই ছিল ওই রকম একটা দুর্ঘটনা।

সীমার কথা শুনে কোন প্রতিউত্তর না দিয়ে উঠে যায়। মা মেয়ে নিজেদের মধ্যে মুখ চাওয়া-চায়ি করে।

বেলা বাড়ার সাথে সাথে পাচু অস্থির হয়ে আছে। গেটের সামনে দাড়িয়ে ডিউটি করছে সাদেক আলী। গেট বরাবর খোলা জায়গায় পায়চারি করছে পাচু। কখন দেখা হবে ম্যাডামের সঙ্গে। এরই মধ্যে দরজার ওপাশে একটি শব্দ। সাদেক সাথে সাথে গেট খুলে দিলে মাঝ বয়সী এক মহিলা গেট দিয়ে ভতরে প্রবেশ করে। সাদেক তাকে ডেকে বলে,

– বুয়া তুমি একটা কাজ করো।

বুয়া ফিরে তাকায়। তারপর অপেক্ষা করে সাদেকের কথা শোনার।

– এইযে লোকটাকে দেখছো, ওর নাম পাচু। আমার গ্রামের থেইকা আইছে।

– ভাল কথা। তয় তারে দিয়া আমি কি করুম।

– তোমার কিছু করতে হইবো না। তারে তোমার লগে ভিতরে লয়ে যাও।

– আমি এ কাম করতে পারুম না। ম্যাডাম যদি শোনে তয় আমার চাকরি থাকবো না।

– আরে না না। তোমার কোন দোষ নাই। ম্যাডাম তারে আইজ সকালে বাড়ির ভিতরে লইয়া যাইতে কইছে।

– তাইলে তুমি যাও তারে লইয়া।

– আমি তো যাইতে চাইছিলাম। গেইট রাইখা গেলে যদি আবার কেউ আইসা দাঁড়ায়ে থাকে। সেই ডরে যাইতাছি না।

– বুইঝ কইলাম। আমার কিন্তু কোন দোষ নাই। আমি লইয়া যাইতে পারি। তয় কিছু যদি হয়, তোমার কথা কইয়া দিমু।

– আইচ্ছা কইস। এহন লইয়া যা।

গেটের সামনে অস্থির হয়ে পায়চারি করা পাচুকে ডেকে কাছে আনে সাদেক আলী। তারপর বুয়াকে দেখিয়ে বলে,

– পাচু তুমি বুয়ার সাথে ভিতরে যাও। দেখে ম্যাডাম উঠছে কিনা। যদি উঠে তয় সামনে গিয়ে দাড়াইলেই হইবো।

বুয়া একবার ভাল করে তাকায় পাচুর দিকে। তারপর কেমন তাচ্ছিল্যের সাথে মুখ বাকিয়ে বলে,

– এই ব্যাডা নাকি কাম করবো। দেইখা তো মনে হয় না কোন কাম-কাইজ জানে।

বুয়ার কথা শুনে মনে মনে হাসে পাচু। তারপর বলে, তোমার দৃষ্টি শক্তি সত্যি প্রশংসার দাবিদার। তুমি এক দেখাতেই বলতে পেরেছো, কে কাজ জানে আর কে জানে না। বুয়ার কোন কথার প্রতিবাদ করে না পাচু। মুখ বুজে সব সহ্য করে। উত্তর দেয় সাদেক। তিনি বলেন,

– তোমার এত কথার কি দরকার? তোমারে যা কইছি তাই করো। তুমি কি জানো, গত কাইল রাইতে ম্যাডাম নিজে পাচুরে কাজ দেবে কইয়া রাখছে।

– আমার কি? আমি তো আর ট্যাকা পয়সা দিবো না। আর আমার কাজও করবে না।

– তাইলে মুখটা বন্ধ কইরা ভিতরে যাও।

বুয়াকে অনুসরণ করে পাঁচু হাটতে থাকে। ভিতরে ইংলিশ মিউজিক চলছে। শব্দ কানে আসতেই বুয়া নিজে থেকেই বলতে আরম্ভ করে,

– এ বাড়িতে থাকতে হলে, চোখ খোলা রাখবা। কান আর মুখ বন্ধ রাখবা।

– ক্যান। কথা কওন যাইবো না?

– এক্কেবারে না। খালি দেখবা। এই যে গান শুনতাছো, এইডা হইল যাইয়া ম্যাডামের নাচের গান। মানে হইতাছে যাইয়া ঘুম ভাঙ্গার পর এই গানের সাথে নাচানাচি করো। হের পর উইঠা ফলের রস খাইবো।

– আচ্ছা ঠিক আছে।

সুবোধ বালকের মতো মাথা নাড়ে পাচু। তারপর আরো এগিয়ে যায় ভেতরে। যাবার সময় চারিদিকে ভাল করে দেখে। বুয়া নিজেকে অনেক জ্ঞানী এবং গাইড হিসাবে প্রদর্শন করে পাচুর কাছে। এ বাড়ির পুরানো নিয়ম-কানুন, ম্যাডামের মর্জি-ইচ্ছার কথা সব খুলে বলতে থাকে। বুয়া বাড়ির দরজা খুলে ভেতরে প্রবেশ করে। ঝাড়– হাতে নিয়ে এদিক সেদিক পরিস্কার করতে থাকে। তারপর রান্না ঘর থেকে গরম পানি এনে গ্লাসে ঢেলে রাখে। ফ্রিজ খুলে লেবু কেটে তার রস চিপড়ে দেয় সেই পানির মধ্যে। একটি পরিস্কার চামচে মধু ঢেলে তা সেই গরম পানির মধ্যে মিশিয়ে নাড়তে থাকে।

হঠাৎ মিউজিক বন্ধ হয়ে যায়। বুয়া তাড়াতাড়ি লেবু-মধু মিশ্রিত পানি নিয়ে পা বাড়ায়। পাচু বুয়ার সামনে গিয়ে দাড়ায়। তারপর বলে, ওটা আমার হাতে দাও। আমি দিয়ে আসি। বুয়া একটু রেগে যায়। তারপর মনে পড়ে যায় সাদেক আলীর কথা। সে বলেছে, গত রাতে ম্যাডাম নিজেই এই পাচুকে চাকরি দেবার কথা বলে রেখেছে। সুতরাং তাকেই পাঠানো উচিত। বুয়া নিজের হাতের গ্লাস পাচুর হাতে দিয়ে দেয়। পাচু এগিয়ে যায় সামনে।

দরজাটা তখনো ভেজানো রয়েছে। এক হাতে গ্লাস, অন্য হাতে দরজা খুলতেই মিষ্টি একটি গন্ধ নাকে ভেসে এসেছে। পর্দার ফাকে একজোড়া অপরিচিত পুরুষের পা দেখে চমকে যায় মোহিনী। এরই মধ্যে একটি পুরুষ কন্ঠ ভেসে আসে,

– ম্যাডাম আসবো?

– কে? কে ওখানে?

(চলবে)

লেখক : সাংবাদিক, সাহিত্যিক, নাট্যকার ও নাট্যপরিচালক।

ভালো লাগলে শেয়ার করে দিন :)

0 Comments

Leave a Reply

Avatar placeholder

Your email address will not be published. Required fields are marked *