ই-পেপার

SITE UNDER CONSTRUCTION
বাংলাদেশ পুলিশের মুখপত্র
অব্যাহত প্রকাশনার ৬৩ বছর

বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. গোলাম কিবরিয়া ভূঁইয়া

বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনী প্রতিটি ভালো কাজ এক একটি গৌরবের প্রতীক। আমি এই বাহিনীর একজন সদস্য হিসেবে গর্ব বোধ করি। আমার চাকরি জীবনে অনেক সাহসী ভালো কাজ করেছি যা বাংলাদেশ পুলিশ তথা বাংলাদেশের উন্নয়নের জন্য করেছি। একটি জাতিকে বিশ্বের কাছে উন্নত জাতি হিসেবে দাঁড় করতে চাইলে প্রয়োজন শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নতি করা। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান অন্যান্য উন্নয়নের সাথে শিক্ষা ব্যবস্থাকে উন্নয়নের জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করেছেন। বিশ্বের কাছে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবার জন্য বার বার শিক্ষা ব্যবস্থাকে উন্নত করার জন্য জাতিকে সর্তক করেছেন জাতির জনক। অনেক সতর্কতার পরেও প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিষয়টি কোনোভাবেই সুরাহা করা যাচ্ছিল না। এরই এক পর্যায়ে ১৯৯৮ সালের মার্চ মাসে মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিষয়ে তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী জনাব এফ এ এইচ কে সাদেক এর এক বন্ধু ফাঁসকৃত প্রশ্ন নিয়ে আসেন এবং এ বিষয়ে তাঁকে অবগত করেন। তখন মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী মহোদয় মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট পরীক্ষা সংক্রান্তে দায়িত্বরত একজন সহকারী সচিবকে বিষয়টি জানান। সহকারী সচিব মাননীয় শিক্ষামন্ত্রীকে বলেন ১৯৭২ সাল থেকে ১৯৯৭ পর্যন্ত যে সকল প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে এ সংক্রান্ত ফাইলসমূহ মন্ত্রণালয়ের নিদিষ্ট স্থানে সংরক্ষিত আছে। তিনি আরোও বলেন প্রশ্নপত্র ফাঁস সংক্রান্ত বিষয়ে সিআইডি প্রতিবছর মামলা দায়ের করে থাকেন এবং পরবর্তীতে কোনোপ্রকার সূত্র না পেয়ে প্রতিবছর ফাইনাল রিপোর্ট প্রদান করেন।

মাননীয় মন্ত্রী মহোদয় তৎকালীন আইজি এবং স্বরাষ্ট্র সচিব মহোদয়কে এবিষয়ে বিকেলে তাঁর দপ্তরে চা এর আমন্ত্রণ জানান। তাঁরা সার্বিক বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন এবং বলেন এ পর্যন্ত যত প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে তার কোনো তথ্য উদ্ঘাটন করা যায়নি। তবে এ বছর যে করেই হোক এর রহস্য উদ্ঘাটন করতে হবে। এ রহস্য উদ্ঘাটন করার জন্য সৎ ও সাহসী বিশেষ পুলিশ সুপার, স্পেশাল ব্রাঞ্চ  জনাব মো: গোলাম কিবরিয়া ভূঁইয়াকে দায়িত্ব দেয়ার প্রস্তাব দেন। প্রস্তাবমতে, পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস সম্পর্কিত তথ্য উদ্ঘাটনের জন্য আমাকে আহ্বায়ক করে ৫ সদস্য বিশিষ্ট একটি কমিটি গঠন করা হয়। 

পরীক্ষার প্রশ্নপত্র চট্টগ্রাম থেকে ফাঁস হয়েছে এ তথ্যের ভিত্তিতে আমরা চট্টগ্রামে গিয়ে জেলা প্রশাসক চট্টগ্রাম এর মালখানা পরিদর্শন করি এবং মালখানায় প্রশ্নপত্র সুরক্ষিত অবস্থায় পাওয়া যায়। তারপর আমরা চট্টগ্রাম শিক্ষাবোর্ডের তৎকালীন চেয়ারম্যান এবং অন্যান্য অফিসারদের সাথে আলোচনা করে প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিষয়ে কোনো কিছু জানা যায়নি। তার ৩ দিন পর রাত ১০ টার দিকে মিরসরাইয়ের এক ব্যক্তি আমাকে ফোন করে জানান, জনৈক প্রাইমারি স্কুলের প্রধান শিক্ষকের বাড়িতে তার মেয়ের তোষকের নিচে মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট পরীক্ষার প্রশ্নপত্র এবং খাতা আছে। সে বছর প্রধান শিক্ষকের মেয়েও মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট পরীক্ষার্থী ছিলেন। গোপন তথ্যের ভিত্তিতে সে দিন রাত ২ টার দিকে আমার টিম নিয়ে প্রধান শিক্ষকের বাড়ি তল্লাশি করে তথ্যমতে আমরা মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ও খাতা উদ্ধার করি। প্রধান শিক্ষকের মেয়েকে প্রশ্নপত্র ফাঁসের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করা হলে বলেন তার বাবার মামাত ভাই বিজি প্রেসে চাকরি করেন এবং তার মাধ্যমে প্রশ্নপত্র সংগ্রহ করে অন্যদের নিকট বিক্রি করা হয়। মেয়েকে তার বাবার কথা জিজ্ঞাসা করা হলে সে বলে প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিষয়ে তদন্ত চলছে জানতে পেরে তার বাবা দু’দিন ধরে বাড়িতে নেই।  তাৎক্ষণিকভাবে আমি ঢাকায় যোগাযোগ করে আমার অফিসারদের মাধ্যমে বিজি প্রেসের স্টাফ কোয়ার্টার থেকে প্রশ্ন ফাঁসের প্রধান হোতাকে আটক করি। তার তথ্যের ভিত্তিতে ঢাকায় আরো ৩ জনকে আটক করে তাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে ৩ মাসের ডিটেনশন দেয়া হয়। পরবর্তীতে দোষী ব্যক্তিদের প্রত্যেককে ৬ বছর করে সাজা দেয়া হয়। এ রকম দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদানের পর ১৯৯৯ ইং থেকে এ পর্যন্ত আর প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়নি। তাছাড়া বিজি প্রেসের যে জায়গায় প্রশ্নপত্র রাখা হয় তা পরিদর্শন করে আমরা তাদের এ ব্যাপারে বিভিন্ন পরামর্শ দেই।

এ কৃতিত্বপূর্ণ কাজের জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত মোতাবেক বাংলাদেশের সকল শিক্ষা বোর্ডের পক্ষ থেকে আমাকে ২০০০ ইং ২০,০০০/- (বিশ হাজার) টাকা পুরস্কার প্রদান করা হয় এবং তৎকালীন ইন্সপেক্টর জেনারেল, বাংলাদেশ পুলিশ, মহোদয় আমাকে ধন্যবাদ জানান। আমার চাকরি জীবনে বিভিন্ন ঘটনার মধ্যে এটি একটি অন্যতম ঘটনা।

লেখক : এডিশনাল ডিআইজি (অব.), বাংলাদেশ পুলিশ,

বর্তমানে পরিচালক (প্রকল্প ও উন্নয়ন), বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতি

ভালো লাগলে শেয়ার করে দিন :)

0 Comments

Leave a Reply

Avatar placeholder

Your email address will not be published. Required fields are marked *