ই-পেপার

SITE UNDER CONSTRUCTION
বাংলাদেশ পুলিশের মুখপত্র
অব্যাহত প্রকাশনার ৬৩ বছর

লিটন কুমার সাহা পিপিএম (বার)

পুলিশী জীবনের প্রতিটি দিনই ঘটনাবহুল, উত্তেজনায় ভরা। একদিনের ঘটনা নিয়েই একটি বই হতে পারে। তবে সকল ঘটনাই মনে স্থায়ী দাগ কাটতে পারে না। কিছু স্মৃতি রয়ে যায় জীবনভর। এমন একটি ঘটনা নিয়ে এই লেখা।

১৩ই এপ্রিল। নববর্ষের ঠিক আগের দিন অফিসে কাজ করছি। মন কিছুটা বিক্ষিপ্ত। বাইরে চৈত্রের তীব্র দাবদাহ। নিস্তব্ধ, বিষন্ন প্রকৃতি। পহেলা বৈশাখের কোনো উদযাপন নাই। প্রিয়-অপ্রিয় চেনামুখ, শুভাকাঙ্খী, প্রিয়জনেরা অফিসে আসা প্রায় ছেড়ে দিয়েছে। সাহায্যপ্রার্থীরাও আগের মতো আসে না। করোনা নামক ক্ষুদ্র এক অনুজীবের ভয়ে গোটা পৃথিবী যেন থমকে গেছে।

জেলার আইনশৃঙ্খলা ভালো। কোথাও বড় ধরনের কোনো জটিলতা/বিশৃঙ্খলা নেই। তারপরও গত দুই মাসেরও বেশি সময় ধরে একটা অস্বস্তি মনের উপর চেপে বসে আছে। চাপটা দিন দিন বাড়ছে। বহু চেষ্টা করেও বাগাতিপাড়া থানার তমালতলা বাজারের গণডাকাতি মামলার কোনো কূলকিনারা করা যাচ্ছে না। অপরাধীর পিছনে ছোটা আমার নেশা। রহস্যের সমাধান না করা পর্যন্ত শান্তি পাই না। যোগদানের পর থেকে জেলায় ডাকাতি, হত্যাসহ চাঞ্চল্যকর যত অপরাধ সংঘটিত হয়েছে প্রত্যেকটির রহস্য উদঘাটিত হয়েছে। সম্ভব হয়েছে অপরাধীদেরকে সাক্ষ্য-প্রমাণসহ আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো। অথচ আড়াই মাস হয়ে গেল, এই মামলাটির কোনো ক্লু-ই পাওয়া যাচ্ছে না।

২ টার বেশি বাজে। একজন সাক্ষাৎপ্রার্থী এসেছে। আমার অফিসে যে কেউ যে কোন সময় আসতে পারে, দেখা করতে পারে। এজন্য কোনো নির্দিষ্ট দিন বা ঘন্টা নেই। জনগণের অফিস জনগণের জন্য সবসময় খোলা। নেহাতি গ্রাম্য চেহারার মধ্যবয়সি মানুষটি। “স্যার চিনতে পেরেছেন? জেল থেকে বেরিয়ে সোজা আপনার কাছে এসেছি। ভালো খবর আছে। আপনাকে ছাড়া আর কাউকে বলতে চাই না।”

ইউরেকা! তার কথা শুনে শরীরে একটা শিহরণ বয়ে গেল। এত আনন্দ আমি অনেকদিন পাইনি। লটারিতে ৪০ লক্ষ টাকা পেলেও এত খুশি হতাম না বোধহয়। বাগাতিপাড়ার তমালতলা বাজার। নিছক একটি বর্ধিষ্ণু গ্রাম্যবাজার। অথচ এই বাজারেই হলো কিনা গণডাকাতি! তিনজন নৈশপ্রহরীকে বেঁধে রেখে গুনে গুনে ১১টি দোকানের তালা ভেঙে নগদ টাকা নিয়ে যায় ডাকাতরা। চলে যায় ট্রাকে করে। এই ঘটনায় এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্য তৈরি হয়। আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে মানুষের মধ্যে। এই ধরনের গ্রাম্য বাজারে গণডাকাতি, ডাকাতদের ট্রাকে করে চলে যাওয়া-সকলকে ভাবিয়ে তোলে। এ ব্যাপারে বাজারের ব্যবসায়ী বায়েজিদ বোস্তামী ওই দিনই বাগাতিপাড়া থানায় একটি ডাকাতি মামলা দায়ের করেন (মামলা নম্বর-৯, তারিখ-২১/০১/২০২১, ধারা-৩৯৫/৩৯৭ পেনাল কোড)। ঊর্ধ্বতন

কর্তৃপক্ষ, মিডিয়া, সিভিল সোসাইটি, জনপ্রতিনিধি-সকলের পক্ষ থেকে একটা প্রবল চাপ তৈরি হয় পুলিশের উপর।

পুলিশের পক্ষ থেকেও বিষয়টি চ্যালেঞ্জ হিসেবে নেওয়া হয়। আমি নিজেও দফায় দফায় ঘটনাস্থল পরিদর্শন করি। বিগত সময়ের ডাকাতি মামলার তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ, সক্রিয় ও নিষ্ক্রিয় ডাকাতদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ, সন্দেহভাজনদের গ্রেপ্তার করে জিজ্ঞাসাবাদ, ঘটনাস্থল থেকে আলামত সংগ্রহের চেষ্টা, তথ্য প্রযুক্তির ব্যবহার-কোনো কিছুই বাদ রাখিনি। কিন্তু ফলাফল শূন্য। কোনো কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। অফিসারদের মধ্যে এক ধরনের হতাশা ভর করেছে। টানেলের শেষে কোনো আলোর রেখা দেখতে পাচ্ছে না কেউ।

জেলার অভিজ্ঞ অফিসারদের ডাকলাম। কি করা যায়! হঠাৎ মাথায় এলো আগের দিনের বহুল ব্যবহৃত একটি সহজ পদ্ধতির কথা। এক সময় এসব সঙ্ঘবদ্ধ অপরাধের তথ্য সংগ্রহের জন্য জেলের ভিতর সোর্স পাঠানো হতো। তথ্য সংগ্রহ করতে পারে এমন ব্যক্তিকে ছোটখাটো অপরাধে গ্রেপ্তার দেখিয়ে জেলে পাঠানো হতো। জেলখানার অভ্যন্তরে অপরাধীরা সাধারণত দিল দরিয়া থাকে। কখনো সরল মনে, কখনো নিজেকে জাহির করার জন্য নিজের অনেক অপরাধের কথা সে ফাঁস করে দেয় অসতর্ক মুহূর্তে। সিদ্ধান্ত হলো এই পথে চেষ্টা করে দেখা যাক। কিন্তু কাকে পাঠানো হবে? কোনো নিরপরাধ লোককে জেলখানায় পাঠানো ঠিক হবে না। সে রাজিও হবে না। এছাড়া মিডিয়া, মানবাধিকার সংস্থাগুলো তো রয়েছেই। অনেক খোঁজাখুঁজির পর বাগাতিপাড়ায়ই একজনকে পাওয়া গেল। তার বিরুদ্ধে একটি সিআর মামলার ওয়ারেন্ট আছে। জেলে গেলে দশ পনের দিনের মধ্যেই জামিন হয়ে যাবে। একসময় ছোটখাটো চুরি-চামারী করত। এখন আর করে না, বরং পুলিশকে মাঝেমধ্যে অপরাধীদের তথ্য দিয়ে সহায়তা করে। সহজেই রাজী হল। কিছু পুরস্কারের লোভও দেখানো হলো। সবকিছু বুঝিয়ে আদালতের মাধ্যমে তাকে জেলে পাঠানো হলো। প্রচেষ্টা সফল! গুরুত্বপূর্ণ খবর সে নিয়ে এসেছে। জেলে থাকা এক ডাকাতের কাছ থেকে সে জানতে পেরেছে প্রকৃত ঘটনা। একজনের নাম-ঠিকানাও পেয়েছে।

এক মুহূর্ত দেরি করার সময় নাই। লোকটির হাতে পুরস্কারের কিছু অর্থ তুলে দিয়ে বিদায় করলাম। বড়াইগ্রাম সার্কেলের অ্যাডিশনাল এসপি মোঃ খাইরুল আলমসহ অন্যান্য অফিসারদের দ্রুত অফিসে ডেকে পাঠালাম। গঠিত হলো চারটি টিম। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার খাইরুলের নেতৃত্বে একটি টিম রওনা করলো নওগাঁ। সদরের শিকারপুর ইউপির শুকুরের মোড় থেকে রাত ১২টায় গ্রেফতার হলো ডাকাত আব্দুর রহমান (৩৮)। গাড়িতে তোলার সাথে সাথে সে স্বীকার করল ডাকাতির কথা। তার তথ্য অনুযায়ী একই এলাকা থেকে এক ঘণ্টার মধ্যে গ্রেপ্তার হলো দলনেতা শাহজাহান। সে নিশ্চিন্তে বাড়িতে ঘুমাচ্ছিল। আড়াই মাস পরে পুলিশ যে তার টিকিটি খুঁজে পাবে, সে ধারণাই করতে পারেনি। সেও স্বীকার করে পুরো ঘটনা।

পরদিন আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ দেয় আব্দুর রহমান। কিন্তু ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে গিয়ে বেঁকে বসে শাহজাহান। রিমান্ডের আবেদন করে তাকে জেলে পাঠানো হয়। আব্দুর রহমানের জবানবন্দিতে ঘটনার সাথে জড়িত অন্যান্য ডাকাতদের নামসহ ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ উঠে আসে। অফিসারদের উৎসাহ ভীষণভাবে বেড়ে যায়। অপরাপর ডাকাতদের গ্রেপ্তার, ডাকাতির আলামত ও মালামাল উদ্ধারের জন্য তারা বিরামহীন অভিযান চালাতে থাকে রাজশাহী, নওগাঁ ও বগুড়া জেলার বিভিন্ন এলাকায়। দেখা যায়, ডাকাত দলের আরেকজন সদস্য রাজশাহীর সেলিম (২২) অন্য মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে রাজশাহী কারাগারে আছে। তাকেও এই মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়।

কথায় আছে, পরিশ্রমই সৌভাগ্যের প্রসূতি। ভালো কাজে যে চেষ্টা করে, সৃষ্টিকর্তাও তাকে সাহায্য করেন। অফিসারদের নিরন্তর চেষ্টায় রহস্যের জট খুলতে থাকে। ২ মে রাত দুইটায় রাজশাহী শহরের পঞ্চপট্টি থেকে গ্রেপ্তার হয় আর এক ডাকাত সদস্য নাসের (৫৫)। কিন্তু বিশ্রামের সুযোগ কই? ওই টিম নাসেরকে নিয়ে রওনা দেয় নওগাঁর রাণীনগরে। মিঠাপুকুর বাজার থেকে সকাল ৯টায় গ্রেপ্তার করা হয় শাহিন আলম (২৭)কে। এই শাহীনই ট্রাকটিকে চালিয়ে নিয়ে এসেছিল। তার হেল্পার ছিল নাসের। শাহিনকে গ্রেপ্তারের পর পাওয়া যায় ট্রাকের সন্ধান। সকাল ১১টায় একই থানার হাতিমারা বিল এলাকা থেকে উদ্ধার করা হয় ডাকাতিতে ব্যবহার করা সেই ট্রাকটি (চট্ট মেট্রো ড-১১-২৯২২)। পরিশ্রম সার্থক। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে টিমের পুলিশ সদস্যরা। হতাশার কিনারা থেকে ঘুরে দাঁড়িয়ে প্রায় ক্লুলেস ডাকাতি মামলার রহস্য উদঘাটিত হয়।

গ্রুপটি দুর্ধর্ষ একটি আন্তঃজেলা ডাকাত দল। দলের প্রায় প্রত্যেক সদস্যের বিরুদ্ধে বিভিন্ন জেলায় একাধিক ডাকাতি মামলা রয়েছে। রাজশাহী, নাটোর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, বগুড়া এমনকি সিরাজগঞ্জেও তারা ডাকাতি করে থাকে। ডাকাতির পুরো সময়টিতে তারা সচেতনভাবেই মোবাইল ব্যবহার করেনি। এ কারণে তথ্যপ্রযুক্তি দিয়ে তাদেরকে শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। ঘটনার দিন তারা রাজশাহী থেকে ট্রাকটি নিয়ে রওনা দেয়। নওগাঁ ও বগুড়ার আদমদীঘি থেকে সদস্যদেরকে তুলে নিয়ে রাত নয়টার দিকে তমালতলা বাজারের কাছাকাছি পৌঁছায়। বাজারের একটু দূরে ট্রাক নিয়ে অপেক্ষা করতে থাকে। রাত বারোটায় পায়ে হেঁটে বাজারে আসে। তিনজন নৈশ প্রহরী তখন আগুন পোহাচ্ছিল। পিছন দিক থেকে একযোগে তাদের মুখ বেঁধে ফেলে। ঘাড়ের কাছে দেশীয় অস্ত্র ধরে পাশের আমবাগানে নিয়ে যায় এবং সেখানে হাত-পা-মুখ বেঁধে ফেলে রাখে। পাহারায় থাকে দুজন। অন্যরা শাটারের তালা ভেঙে একে একে ১১টি দোকান থেকে নগদ চার লক্ষ চল্লিশ হাজার টাকা নিয়ে নেয়। একটি দোকান থেকে ২০প্যাকেট সিগারেটও নেয়। তারপর ট্রাকে করে চলে যায় নওগাঁ। সেখানে টাকাপয়সা ভাগাভাগির পর যে যার মত বাড়ি চলে যায়। মামলায় এ পর্যন্ত ৫জন ডাকাত গ্রেপ্তার হয়েছে। তার মধ্যে তিনজন বিস্তারিত স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। উদ্ধার করা হয়েছে ডাকাতিতে ব্যবহৃত ট্রাক। দলের বাকি সকল সদস্যকে শনাক্ত করা হয়েছে। খুব দ্রুতই তারা ধরা পড়বে।

ক্লুলেস এই গণডাকাতি মামলাটি জেলা পুলিশের জন্য ছিল বিরাট একটি চ্যালেঞ্জ। সাধারণ মানুষের আতঙ্ক দূর করা এবং আস্থা ফিরিয়ে আনার জন্য এটি ছিল অত্যন্ত জরুরী। অন্যান্য তদন্তকারী ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোও ছায়া তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছিল।কোনো সংস্থা এই ঘটনার রহস্য আগে উদঘাটন করতে পারবে তা নিয়ে একটি অলিখিত প্রতিযোগিতাও হয়তো ছিল। জেলা পুলিশ তার নিরলস, আন্তরিক এবং ঐকান্তিক প্রচেষ্টা ও উদ্ভাবনী শক্তি দ্বারা মামলাটি শনাক্ত করতে পেরেছে। সাধারণ মানুষ ও মিডিয়ার প্রশংসা কুড়ানোর পাশাপাশি পুলিশের সকল সদস্যের মনোবলও বৃদ্ধি পেয়েছে।

কথায় আছে পুরনো চাল ভাতে বাড়ে। ইদানিং অপরাধী শনাক্ত ও গ্রেফতারের জন্য আমরা প্রযুক্তির উপর অতিমাত্রায় নির্ভর হয়ে পড়েছি। কিন্তু আমাদের চিরায়ত পদ্ধতি গুলো যে এখনো সমান কার্যকর, এই ঘটনায় তা আবারো প্রমাণ হলো। পুলিশের আন্তরিকতা ও সক্ষমতার প্রমাণ আরেকবার দেখল নাটোরবাসী।

  লেখক : পুলিশ সুপার, নাটোর

ভালো লাগলে শেয়ার করে দিন :)

0 Comments

Leave a Reply

Avatar placeholder

Your email address will not be published. Required fields are marked *