ই-পেপার

SITE UNDER CONSTRUCTION
বাংলাদেশ পুলিশের মুখপত্র
অব্যাহত প্রকাশনার ৬৩ বছর

ড. রাশিদ আসকারী

মহানেতাদের কারাবাস

গণমানুষের মুক্তির আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে নেতৃত্ব দেয়ার কারণে পৃথিবীতে যে কজন হাতে গোনা মানুষ কায়েমি শোষকদের অধীনে দীর্ঘ কারাভোগ করেছেন, তাঁদের অন্যতম প্রধান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। আমরা নেলসন ম্যান্ডেলার কথা জানি। আফ্রিকার কালো মানুষের নেতা দক্ষিণ আফ্রিকার কেপটাউনের রোবিন দ্বীপে এবং পলসমুর জেলে দীর্ঘ ২৭ বছর অন্তরীণ থেকেছেন এবং কালো মানুষের অধিকার আদায় করে নিয়েছেন। হয়ে উঠেছেন বর্ণবাদের বিরুদ্ধে এক মূর্তিমান প্রতিবাদ। বলেছেন, ‘No power on earth can stop an oppressed people determined to win their freedom.’ জওহরলাল নেহরু প্রায় এক দশক কাটিয়েছেন লৌহগরাদের অভ্যন্তরে। বৃটিশ শাসিত ভারতে ১৯২১ সালে ওয়েলসের রাজকুমারের ভারত সফর বয়কট করার কারণে কারাভোগ থেকে শুরু করে গান্ধিজীর সিভিল ডিসঅবিডিয়েন্স আন্দোলনে যুক্ত থাকার কারণে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন মেয়াদে জেল খেটেছেন। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, নেহরু তাঁর কারাজীবনকে পরমানন্দ (তাঁর ভাষায় The Greatest Pleasure) হিসেবে বর্ণনা করেছেন, কারণ এই কারাভোগকে ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে তাঁর প্রতিবাদের এক বহিঃপ্রকাশ হিসেবে তিনি বিবেচনা করেছেন। মহাত্মা গান্ধীও কারাভোগ করেছেন। ১৯২২ সালে খিলাফাত আন্দোলনের পর তাঁর ছয় বছরের জেল হয় কিন্তু দুই বছর পর মুক্তি পান। পরে ১৯৪২ সালে ‘ভারত ছাড়’ আন্দোলনের ডাক দেয়ায় কারাভোগ করেন। নেতাজী সুভাষ বোসও জেল খেটেছেন অনেকবার। চেকোশ্লোভাকিয়ার রাষ্ট্রনায়ক, লেখক এবং মখমল বিপ্লবের (The Velvet Revolution) বিপ্লবী নেতা বাকলাভ হেবল তাঁর রাজনৈতিক কর্মকান্ডের জন্য সিক্রেট পুলিশের নজরদারিতে থাকতেন এবং দীর্ঘকাল ভিন্ন ভিন্ন মেয়াদে কারাভোগ করেছেন। চিলির প্রথম নারী রাষ্ট্রপতি মিচেল ব্যাচেলেও নিদারুণ কারাভোগ করেছেন। ১৯৭৩ সালে সালভেদর আলেন্দের সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করে অগাস্টো পিনোশেট ক্ষমতাদখল করলে খাদ্য বিতরণের দায়িত্বে থাকা ব্যাচেলের বাবাকে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগে আটক ও নির্যাতন করা হয় এবং তিনি মৃত্যুবরণ করেন। বাবার রাজনৈতিক কর্মকা- চালিয়ে যাওয়ার অভিযোগে ব্যাচেলে বারবার কারারুদ্ধ এবং নির্যাতিত হন।

বঙ্গবন্ধুর কারাজীবন

বঙ্গবন্ধুও জেলখানায় ছিলেন। পাথরের দেয়াল এবং লোহার গরাদ অতিক্রম করে একটি স্বাধীন দেশ স্থাপন করেছেন

পৃথিবীর মানচিত্রে। তাঁর ৫৫ বছরের জীবনে এক-চতুর্থাংশই তিনি কাটিয়েছেন জেলে, প্রায় তেরো বছর যা দিনের হিসাব করলে চার হজার ৬৮২ দিন। সেই স্কুলজীবনে স্থানীয় হিন্দু-মুসলিম সম্প্রদায়গত বিরোধের জের হিসেবে সাত দিনের জেলখাটা থেকে শুরু হয় তাঁর কারাজীবন। তবে প্রথমবারের মতো রাজনৈতিক কারণে কারাভোগ শুরু হয় তাঁর ১১ মার্চ ১৯৪৮ সালে পশ্চিম পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা উর্দু করার ছাত্র-প্রতিবাদে নেতৃত্ব দেয়ার কারণে। অক্টোবর ১৯৪৯-এ বেশকিছু কালের জন্য জেলে যান পূর্ব পাকিস্তান সরকার বিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়ার জন্যে এবং সেই কারাভোগ বিনা বিচারে ১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারির শেষ পর্যন্ত চলে। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট সরকারের বিলুপ্তির পর আবারো ছয় মাসের জেল খাটেন। অক্টোবর ১৯৫৮-তে আইয়ুব খান পাকিস্তানে মার্শাল ল জারি করলে বঙ্গবন্ধু ১৪ মাসের জন্য কারারুদ্ধ হন। ১৯৬২ সালের ফেব্রুয়ারিতে আবারও তাঁর জেল হয়। ১৯৬৪ সালে আইয়ুব খানের সামরিক শাসন বৈধ করতে আয়োজিত নির্বাচনের মাত্র দু সপ্তাহ আগে বঙ্গবন্ধুকে আবারো কারারুদ্ধ করা হয় চৌদ্দ দিনের জন্য। ১৯৬৫ সালেও একবার জেল খাটেন। ১৯৬৬ সালে ঐতিহাসিক ছয় দফা দাবি পেশ করলে মিথ্যে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় দুই বছরেরও অধিককাল কারাভোগ করেন। ১৯৬৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি জনমত সংঘটিত করে ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ভূমিধস বিজয় নিশ্চিত করেন। তারপরেও ক্ষমতারোহণের পরিবর্তে তাঁকে আবারো ষড়যন্ত্র করে জেলে নেয়া হয় ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ। দীর্ঘ ৯ মাস তিনি পাকিস্তানের মিয়ানওয়ালি কারাগারের নির্জন প্রকোষ্ঠে কাল কাটান সীমাহীন দুর্ভোগে। অবশেষে ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীন হলে ৮ জানুয়ারি ১৯৭২ সালে তাঁর কারাজীবনের চিরসমাপ্তি ঘটে। বঙ্গবন্ধুর কারাজীবনের এই দীর্ঘ সময় যে কেবল ঢাকা এবং পাঞ্জাবে কেটেছে, তা নয়। জন্মস্থান গোপালগঞ্জ, ফরিদপুর এমনকি খুলনার জেলেও তিনি থেকেছেন।

কারা সাহিত্য –কারা দর্শন

বঙ্গবন্ধুর কারাজীবন কাহিনী তাঁর বিচিত্র জীবনের এক অতীব গুরুত্বপূর্ণ দিক। মানুষ ও রাজনীতিবিদ শেখ মুজিবকে গভীরভাবে উপলব্ধি করতে হলে তাঁর কারাজীবন অধ্যয়ন করা প্রয়োজন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রকৃত ইতিহাস বুঝতে গেলেও তাঁর কারাজীবন সম্পর্কে জানা প্রয়োজন। বঙ্গবন্ধুর দীর্ঘ কারাজীবনের মধ্য দিয়ে প্রকাশিত হয়েছে বহুমাত্রিক জ্যোতির্ময় বঙ্গবন্ধুর নানাবিধ সত্তা, যেমন মানুষ বঙ্গবন্ধু, রাজনীতিবিদ বঙ্গবন্ধু, লেখক বঙ্গবন্ধু ইত্যাদি। বঙ্গবন্ধুর বৈচিত্র্যময় কণ্টকাকীর্ণ জীবনের এক দুর্যোগপূর্ণ অধ্যায় তাঁর কারাজীবন, সমকালীন ইতিহাসের আলোয় তার বয়ান এবং আত্মজীবনীদ্বয়ের আলোয় তার অন্তর্বয়ান বঙ্গবন্ধু অধ্যয়নে নতুন আলো ফেলবে।

কারাগারে লেখক সত্তার উন্মেষ কিংবা অনুশীলন অনেক বিশ্ববরেণ্য রাজনীতিকের মধ্যে লক্ষ্য করা গেছে। কারাস্মৃতি নিয়ে রচিত হয়েছে মূল্যবান গ্রন্থ। মহাত্মা গান্ধীর আত্মজীবনী The Story of my Experiments with Truth (1948)-এর ভূমিকায় তিনি স্বীকার করেছেন কীভাবে ইয়ারবাদা সেন্ট্রাল জেলে তাঁর সহ-কারাবন্দি জেরামদাশের পীড়াপীড়িতে তিনি আত্মজীবনী রচনায় হাত দিয়েছেলেন। গান্ধী আত্মজীবনী রচনাকে পশ্চিমা চর্চা মনে করতেন এবং স্বীয় আত্মজীবনীতে রাজনৈতিক নিরীক্ষণের বদলে নৈতিক এবং আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতার বিবরণই বেশি উল্লেখ করেছেন। বইটির নামকরণেই তাঁর বিষয়বস্তুর একটা আভাস মেলে। Long Walk to Freedom (1994) আফ্রিকার কিংবদন্তি বর্ণবাদ বিরোধী নেতা পরবর্তীতে দক্ষিণ আফ্রিকার প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ প্রেসিডেন্ট নেলসন ম্যান্ডেলার আত্মজীবনী। বইটিতে ম্যান্ডেলার শৈশব, কৈশোর, যৌবন এবং রোবিন দ্বীপ ও পলসমুর কারাগারে ২৭ বছরের কারাজীবনের কথা বিধৃত হয়েছে। ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর আত্মজীবনী গ্রন্থ Toward Freedom (1936)-এর পুরোটাই ১৯৩৪ থেকে ১৯৩৫-এর মধ্যে কারাগারে বসে লেখা। এছাড়াও তিনি ১৯৩০ থেকে ১৯৩৩ এর মধ্যে ব্রিটিশ ভারতের বিভিন্ন কারাগারে বসে কন্যা ইন্দিরার কাছে বিশ্ব ইতিহাস প্রসঙ্গে ১৯৬টি পত্র লেখেন যা পরবর্তীতে সংকলিত হয়ে ১৯৩৪ সালে Glimpses of World History নামে প্রকাশিত হয়। বইটি খ্রিস্টপূর্ব ৬০০০ অব্দ থেকে রচনাকাল পর্যন্ত মানবজাতির ইতিহাস ধারণ করে। কারাগারে বসে এই সুবিশাল সৃষ্টিকর্ম সম্পাদনের সুযোগ পাওয়ার কারণেই সম্ভবত নেহরু তাঁর কারাবাসকে ‘আনন্দময়’ বলে অভিহিত করেছেন।

ইতালীয় মার্কসবাদী এন্টোনি গ্রামসি ইতালির ফ্যাসিস্ট কারাগারে ১৯৩৫ থেকে ১৯৩৯ সাল পর্যন্ত ৩০টি নোটবইয়ে ৩০০০ পৃষ্ঠা লেখেন, যা বিশ শতকের রাজনৈতিক তত্ত্বের ভুবনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। মারটিন লুথার কিং জুনিয়র-এর বারমিংহাম জেল থেকে টয়লেট পেপারে এবং সংবাদপত্রের মার্জিনে লেখা সাত হাজার শব্দের সেই দুর্দান্ত চিঠি (যেখানে justice anywhere is a threat to justice everywhere-এর মতো কনসেপ্ট রয়েছে)। কিংবা প্রখ্যাত ভিনসীয় পর্যটক মারকো পোলোর চীন ভ্রমণ বৃত্তান্ত সম্বলিত ট্রাভেলস অফ মারকো পোলো জেল সাহিত্যের উৎকৃষ্ট দৃষ্টান্ত।

বিশ্ববরেণ্য রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের কারাগারে বসে লেখা কিংবা কারাজীবনের অভিজ্ঞতা নিয়ে রচিত গ্রন্থসারণীর সম্ভারকে সমৃদ্ধ করছে আরো দুটো কারাগ্রন্থ, যার রচয়িতা বাঙালির প্রাণপুরুষ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। প্রথমটির নাম অসমাপ্ত আত্মজীবনী, যা ১৯৬৬ থেকে ১৯৬৯-এর মধ্যে খুব সম্ভব ১৯৬৭-এর দ্বিতীয়ার্ধে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে কারাবাসের সময় রচিত। বঙ্গবন্ধুর দ্বিতীয় আত্মজীবনী গ্রন্থ কারাগারের রোজনামচা ১৯৫৮ থেকে ১৯৬৯ সালের মধ্যে ইংরেজিতে লিখিত পাঁচটি নোট বইয়ের ওপর ভিত্তি করে রচিত। বঙ্গবন্ধুসহ বিশ্ববরেণ্য রাজনীতিবিদদের কারাগারের স্মৃতি বিজড়িত রচনাগুলোকে জেল সাহিত্য (Prison Literature) হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা যেতে পারে। সে বিচারে অসমাপ্ত আত্মজীবনী এবং কারাগারের রোজনামচা বাংলা তথা বিশ্ব জেল সাহিত্যের অন্যতম কৃতি হিসেবে বিবেচ্য।

বঙ্গবন্ধুর কারাজীবন এবং বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের প্রসববেদনা

শেখ মুজিবের কারাজীবনের সূচনার সঙ্গে ভাষা আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে বাঙালির জাতীয়তাবাদী মুক্তি সংগ্রামের সূচনার এবং তাঁর কারাজীবনের জীবনের পরিসমাপ্তির সঙ্গে মুক্তি সংগ্রামের চূড়ান্ত বিজয়ের এক বিস্ময়কর সংযোগ। এটি সত্যিই এক অভাবনীয় অ্যানালজি। জাতিরাষ্ট্র বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাসের সঙ্গে তার স্রষ্টা বঙ্গবন্ধুর জীবনালেখ্যের এই পরস্পর সংলগ্নতা এক ব্যক্তি সত্তার সঙ্গে একটি জাতি সত্তার অবিচ্ছেদ্যতার এক অনুপম দৃষ্টান্ত। বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ একে অপরের পরিপূরক।

বঙ্গবন্ধুর কারাজীবনের ইতিহাসের সূত্রপাত দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত পাকিস্তানের প্রতি তাঁর রাজনৈতিক মোহমুক্তির ইতিহাসের সমানুপাতিক। ব্রিটিশ রাজের শেষ দিকে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আন্দোলন যখন তুঙ্গে, তখন তরুণ মুজিব তাঁর রাজনৈতিক গুরু হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে সক্রিয়ভাবে পাকিস্তান নামক এই নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছিলেন। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলেও সত্য যে তাদের কাক্সিক্ষত পাকিস্তান সৃষ্টির মাত্র সাত মাসের মাথায় তাঁকে জেলে যেতে হয়েছিলো। এরপর পুরো পাকিস্তান আমলে নানা অজুহাতে বারবার তাঁকে জেলে যেতে হয়। পাকিস্তান রাষ্ট্রের প্রতি মুজিবের মোহমুক্তির বিষয়টি আরো জোরালো হয় তার প্রিয় নেতা সোহ্রাওয়ার্দীর অবমূল্যায়ন শুরু হলে। পূর্ব বাংলায় পাকিস্তান আন্দোলন বেগবান করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে কার্যকর ভূমিকা রেখেছিলেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। পাকিস্তান সৃষ্টির পরপরই দেখা গেল, সে দেশের কেন্দ্রীয় সরকার তো দূরের কথা পূর্ব বাংলার প্রাদেশিক সরকারেও সোহ্রাওয়ার্দীর কোনো ঠাঁই নেই। বিভিন্ন ষড়যন্ত্র আর মুসলিম লীগ নেতাদের প্রতিক্রিয়াশীল স্বার্থান্ধতার শিকার হয়ে সোহ্রাওয়ার্দী পূর্ব বাংলার রাজনীতির একেবারে বাইরে নিক্ষিপ্ত হন। কলকাতা থেকে পূর্ববঙ্গে ফিরে আসা শেখ মুজিবের জন্য এছিলো এক বেদনাদায়ক অভিজ্ঞতা। অধিকন্তু খোদ রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করে বাংলার স্থলে উর্দু চাপানোর চেষ্টা করা হলে পাকিস্তান রাষ্ট্রের প্রতি বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নভঙ্গের সূচনা হয়।

উপমহাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে মুজিবের এই স্বপ্নভঙ্গ একটি টার্নিং পয়েন্ট। মোহান্ধ মুসলিম লীগ ভেঙে আওয়ামী মুসলিম লীগ এবং আওয়ামী মুসলিম লীগ থেকে সম্প্রদায়িকতার শেষ আবরণ ছিন্ন করে অসাম্প্রদায়িক আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠার বীজ মুজিবের রাজনৈতিক স্বপ্নভঙ্গের ভেতরেই নিহিত ছিলো বললে এতটুকুও বাড়িয়ে বলা হয় না। এবং সেই স্বপ্নভঙ্গই পরবর্তীতে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার স্বপ্নের বীজ বোনে।

কারাগারের সুখ-দুঃখ

বঙ্গবন্ধুর দীর্ঘ বৈচিত্র্যপূর্ণ কারাজীবন সহকারাবন্দিদের সঙ্গে তাঁর রকমারি অম্লমধুর অভিজ্ঞতায় পূর্ণ। মওলানা ভাসানীর দীর্ঘ আলাপচারিতা ও খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে প্রশ্নকরণ, সদ্য-বিবাহিত শামসুল হকের স্ত্রী বিরহ-ব্যথা, প্রলম্বিত প্রার্থনা, মধ্যরাতে উচ্চকণ্ঠ জিকির, কয়েদিদের নিদ্রাভঙ্গ, চোর-ডাকাতসহ বিচিত্রস্বভাবের কয়েদিদের সঙ্গে পরিচয়, বঙ্গবন্ধুর গোপালগঞ্জের বাড়ি থেকে শতভরি স্বর্ণ-চুরি-করা কয়েদি রহিম চোরের সঙ্গে সাক্ষাৎ এবং তার সরল স্বীকারোক্তি, ফরিদপুর জেলের ঘানিটানা কয়েদির আহাজারি প্রভৃতি বঙ্গবন্ধুকে জেলজীবনের বৈচিত্র্যময় অভিজ্ঞতা দিয়েছে। আশার আনন্দ ও নিরাশার বেদনার কথা বঙ্গবন্ধুর কারাজীবনের আরেক অভিজ্ঞতা। এক মেয়াদের কারাভোগ শেষ করে মুক্তির আনন্দে যখন প্রিয়জনদের সান্নিধ্যে যাওয়ার জন্য ব্যাকুল হয়ে জোগাড়যন্ত্র করছেন, নেতা-কর্মীরা বিপুল আগ্রহে ঘিরে রেখেছে তাদের প্রিয় নেতাকে, যখন বাবা-মা পথ চেয়ে আছে তাদের খোকা আসছে, তখন গোয়েন্দা পুলিশেরা নতুন পরওয়ানা নিয়ে হাজির হয়েছে। পরওয়ানায় বলা হয়েছে : ‘নিরাপত্তা আইনে শেখ মুজিবুর রহমানকে আবার গ্রেফতার করতে হবে।’

কারাভোগের পুরস্কার

তথাকথিত আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় (রাষ্ট্র বনাম শেখ মুজিবুর রহমান ও অন্যান্য) বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার দেখিয়ে কারাগারে নেয়া হয়। বাইরের পৃথিবী থেকে এই সময় তাঁকে বিচ্ছিন্ন রাখা হয়, চালানো হয় মানসিক নির্যাতন। এমনকি আইনি পরামর্শ গ্রহণের অধিকার থেকে তাঁকে বঞ্চিত রাখা হয়েছিলো। এই ঘটনার বিরুদ্ধে ১৯৬৯ সালের ৫ জানুয়ারি তোফায়েল আহমেদকে আহ্বায়ক করে ছাত্র-সংগ্রাম পরিষদ গঠন করা হয় যা ১৪ জানুয়ারি ১১ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করে। শুরু হয়ে যায় গণঅভ্যুত্থান। আন্দোলনে ভীত হয়ে বঙ্গবন্ধুকে প্যারোলে মুক্তি দেয়ার বিষয়ে আলোচনায় বসার আহ্বান জানান আইয়ুব খান। স্ত্রী ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের বাধায় শর্তাধীন মুক্তির এই প্রস্তাবকে নাকোচ করে দেন শেখ মুজিব। আন্দোলনে স্লোগানে উত্তাল হয়ে উঠে দেশ- ‘জেলের তালা ভাঙ্গবো শেখ মুজিবকে আনব।’ বাধ্য হয়ে ২২ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯ তাঁকে মুক্তি দেয় সরকার। ২৩ ফেব্রুয়ারি পল্টনে ১০ লাখ মানুষের উপস্থিতিতে তাঁকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি দেয়া হয় । এই উপাধি একদিকে যেমন শেখ মুজিবের বাঙালি জাতির প্রতি আস্থা ও নির্ভরতার প্রতীক অন্যদিকে তেমনি তাঁর আপসহীন দীর্ঘ কারাভোগের এক স্বীকৃতি। পাকিস্তানের আত্মসমর্পণের পরেও মুজিবকে কারাগারে রাখা হয়েছিল। তাঁকে নিয়ে ভুট্টোর শেষ ষড়যন্ত্র, রাজনৈতিক দাবা খেলা, কূটচাল, স্নায়ুয়ুদ্ধ– সবকিছুকে অগ্রাহ্য করে বঙ্গবন্ধুর পাকিস্তানকে গুডবাই জানান। দফারফা করেন শত্রুর সঙ্গে।

কারাজীবনের শিক্ষা

বঙ্গবন্ধু তাঁর দীর্ঘ কারাজীবনকে খুব স্বাভাবিকভাবেই গ্রহণ করেছিলেন, যা সব বিশ্ববরেণ্য রাজনীতিবিদদের ক্ষেত্রে দেখা গেছে। তিনি কখনো ভীত-সন্ত্রস্ত কিংবা বিচলিত হতেন না। বরং তাঁর সহকারাবন্দিদের নিয়ে আনন্দে থাকতে চাইতেন। তাদের সঙ্গে মানিয়ে চলতেন। তাদের বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করতেন। বাগান করতেন। সংবাদপত্র পড়তেন এবং দর্শনার্থীদের সঙ্গে কথা বলে চারদেয়ালের বাইরে রাজনীতির গতি-প্রকৃতি সম্পর্কে খোঁজ-খবর নিতেন। সবার সঙ্গে অমায়িক আচরণ করতেন। ১৯৫০ সালে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গার অভিযোগে ধৃত মুসলমান কারাবন্দিদের পরম মমতায় বোঝাবার চেষ্টা করেছিলেন যে, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা কোনোমতেই সমর্থযোগ্য নয়। নিরীহ মানুষ হত্যা কোনো অবস্থাতেই গ্রহণযোগ্য নয়। একজন ধার্মিক মুসলমান মানুষ হত্যা করতে পারে না। মহানবী কখনো হত্যাকা-কে সমর্থন দেন নি। সহ-কারাবন্দিদের ওপর বঙ্গবন্ধুর প্রভাব এতটাই প্রবল হতে থাকে যে, ক্ষমতাসীনেরা তাঁকে বিচ্ছিন্ন করার জন্য আলাদা সেলে রাখতে শুরু করে। পাকিস্তানের মিয়ানওয়ালি কারাগারে বন্দি (এপ্রিল ১৭৯১-জানুয়ারি ১৯৭২) বঙ্গবন্ধুর নজরদারি করার দায়িত্বে নিযুক্ত পাকিস্তানি গোয়েন্দা কর্মকর্তা রাজা আনার খান এক টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে বিখ্যাত পাকিস্তানি মিডিয়া ব্যক্তিত্ব মুজিবুর রহমান স্বামীকে কারারুদ্ধ বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে অনেক চাঞ্চল্যকর তথ্য দেন। খানকে মিয়ানওয়ালি কারাগারে একজন কারাবন্দির ছদ্মবেশে বঙ্গবন্ধুর ওপর গোপন নজরদারির জন্য রাখা হয়। খানের সূত্রে জানা যায় যে, বঙ্গবন্ধুকে বহির্বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন রাখার জন্যে রেডিও, টেলিভিশন কিংবা সংবাদপত্র পর্যন্ত দেয়া হয়নি। বঙ্গবন্ধু তাঁর করাভোগের কারণ জানতে চাইলে তিনি মিথ্যে করে বলেন যে, নারী অপহরণের অভিযোগে তাঁকে কারারুদ্ধ করা হয়। কিন্তু খান বুঝতে পেরেছিলেন যে বিচক্ষণ বঙ্গবন্ধু তার কথা বিশ্বাস করেননি।

১৯৭১-এ ইয়াহিয়া জান্তা কর্তৃক কারাবন্দি বঙ্গবন্ধুর কারাজীবনের অনেক তথ্যই খানের ভাষ্যে জানা যায়। ইয়াহিয়া শাসনের অধীনে বঙ্গবন্ধুর বিচারের জন্য গোপন সামরিক ট্রাইব্যুনাল গঠিত হলে বঙ্গবন্ধু তাকে স্বীকৃতি দেননি এবং সেখানে যেতে অস্বীকার করেছিলেন। আনার খানের সাক্ষাৎকার ভাষ্যে আরো জানা যায় ১৯৭১-এর ডিসেম্বরের শুরুতে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ শুরু হলে জান্তা সরকার মুজিবকে ফয়সালাবাদ থেকে মিয়ানওয়ালিতে স্থানান্তর করে। সাহিওয়াল জেলে বঙ্গবন্ধু নিয়মিত ডায়েরি লিখতেন বলেও খান অবহিত করেন। ১৬ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় ঢাকায় পাকিস্তানি সেনাবাহিনী আত্মসমর্পনের পর খাজা তোফাইল নামের এক সিনিয়র কারা কর্মকর্তা মিয়ানওয়ালি কারাগারে বঙ্গবন্ধুর সেলমুখী করিডোরের দরজায় সশব্দে আঘাত করেন। ঢাকার খবরে বঙ্গবন্ধুর ক্ষতির আশঙ্কায় খান দরজা খুলতে অস্বীকার করেন। কিন্তু তোফাইলের পীড়াপীড়িতে অবশেষে দরজা খোলেন। মধ্যরাতে এভাবে ডেকে তোলায় বঙ্গবন্ধুর ধারণা হয় যে তাঁকে সম্ভবত ফাঁসিকাষ্ঠে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। তিনি খান এবং তোফাইলকে জিজ্ঞেস করেন। উত্তরে তারা জানান যে কারাগারে তার জীবন আর নিরাপদ নয় এবং যথাশীঘ্র সম্ভব তাঁকে বাইরে নেয়া হচ্ছে। তাদের কাছে তথ্য আছে যে, ঢাকায় পাকবাহিনীর আত্মসমর্পণের প্রতিবাদে কারাগারে মুজিবকে আক্রমণ এবং হত্যার উস্কানি জান্তা সরকার দিচ্ছে। দ্রুতগামী একটি মোটরগাড়িতে করে মুজিবকে শহরের একটি বাড়িতেআনা হয়।

পরদিন পাকিস্তানের নয়া প্রেসিডেন্ট জুলফিকার আলী ভুট্টো রাওয়ালপিন্ডির বাইরে সিহালা রেস্ট হাউসে বঙ্গবন্ধুকে দেখতে আসেন। আনার খান পর্দার আড়ালে লুকিয়ে দুই নেতার কথপোকথন শোনেন। ভুট্টোর আগমনে মুজিব আশ্চার্যান্বিত ও রুষ্ট হন বিশেষ করে ভুট্টো যখন ধারণা দেন যে ক্ষমতা সংখ্যাগরিষ্ঠের নেতাকে নয় সংখ্যালগিষ্ঠের নেতাকে দেয়া হয়েছে। বলা বাহুল্য, ভুট্টো মুজিবকে অবহিত করেননি যে, পূর্ব পাকিস্তান বাংলাদেশ হয়েছে। ৫ জানুয়ারি ১৯৭২ যখন বঙ্গবন্ধু স্বাধীন বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তনের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, রাজা আনার খান, যিনি বঙ্গবন্ধুকে ‘বাবা’ বলে সম্বোধন করতেন, বঙ্গবন্ধুর কাছে বিদায়ী উপহার চাইলেন। বঙ্গবন্ধুর কাছে দস্তয়ভস্কির Crime and Punishment-এর একটি কপি ছিলো। তাতে খানের জন্য একটি অটোগ্রাফ দিলেন, In the long war between the falsehood and the truth, falsehood wins the first battle and truth the last” দুদিন পর বঙ্গবন্ধু স্বদেশে ফেরেন।

অন্ধকারে আলোর অন্বেষা

বিশ্বের রাজনৈতিক ইতিহাসে দীর্ঘতম কারাভোগকারী জাতীয়তাবাদী নেতাদের অন্যতম প্রধান হলেন বঙ্গবন্ধু। তাঁর দীর্ঘ কারাজীবন বাঙালি জাতির দীর্ঘ অমানিশার অন্ধকারের সমার্থক। আর তাঁর চূড়ান্ত কারামুক্তি বাঙালি জাতির চূড়ান্ত মুক্তির- অর্থাৎ আলোর সমার্থক। পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে ১০ জানুয়ারি ১৯৭২ সালে তিনি যখন স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করেন- কেবল সেই লগ্নেই বিজয়ের অর্থ পূর্ণতা পায়।

বঙ্গবন্ধুর জীবনী বাঙালির সবচাইতে বড় রাজনৈতিক ঐতিহ্য। শ্রেষ্ঠ উত্তরাধিকার। সেই উত্তরাধিকার সংরক্ষণের প্রয়োজন রয়েছে। আর সেজন্যে প্রয়োজন যতœশীল বৌদ্ধিক প্রয়াস। তাঁর কারাজীবনের প্রতিদিনের প্রতিটি ঘটনার কার্যকারণ নির্ণয়ের মধ্যে দিয়ে বাঙালির স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস অনেক বেশি সুরক্ষিত এবং সত্যায়িত হতে পারে। বাঙালির রাজনৈতিক ঐতিহ্য সংরক্ষিত হতে পারে।

লেখক : কলামিস্ট, মিডিয়া ব্যক্তিত্ব এবং প্রাক্তন উপাচার্য, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া, বাংলাদেশ।

ভালো লাগলে শেয়ার করে দিন :)

0 Comments

Leave a Reply

Avatar placeholder

Your email address will not be published. Required fields are marked *