ই-পেপার

SITE UNDER CONSTRUCTION
বাংলাদেশ পুলিশের মুখপত্র
অব্যাহত প্রকাশনার ৬৩ বছর

মোহাম্মদ আমজাদ হোসাইন

২৬ মার্চ, ২০২১ আমরা বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপন করেছি। সুর্বণজয়ন্তীর মাসের ০২ দিন পূর্বে ২৬ ফেব্রুয়ারি স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের চূড়ান্ত সুপারিশও পেল বাংলাদেশ। সবকিছু ঠিক থাকলে পাঁচ বছর পর ২০২৬ সালে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে আনুষ্ঠানিকভাবে চূড়ান্ত স্বীকৃতি মিলবে। স্বল্পোন্নত দেশ থেকে বেরিয়ে আসার শেষ ধাপের এই স্বীকৃতি দেশের জন্য বিশাল অর্জন। এতে করে শুধু দেশেই নয়, বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশের গ্রহণযোগ্যতা ও মর্যাদা অনেকগুণ বাড়বে। দেশে ব্যবসা ও বিনিয়োগে নতুন মেরুকরণ হবে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদ ও সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকরা। তবে এই অর্জন সমুন্নত রাখতে অনেক চ্যালেঞ্জও রয়েছে। জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাউন্সিলের (ইকোসোক) উন্নয়ন নীতিমালা বিষয়ক কমিটির (সিডিপি) ৫ দিনের ভার্চুয়াল বৈঠকের শেষ দিন ২৬ ফেব্রুয়ারি এই স্বীকৃতির সুপারিশ মেলে। ২২ ফেব্রুয়ারি বৈঠকটি শুরু হয়। সাধারণত সিডিপির সুপারিশের তিন বছরের মধ্যেই এটি হওয়ার কথা। কিন্তু গত ১৫ জানুয়ারি সিডিপির সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশ দুই বছর সময় বাড়ানোর আবেদন করায় এটি পিছিয়ে যায়। অর্থনীতিবিদরা আরও বলেছেন, বাংলাদেশের এলডিসি থেকে উত্তরণ ঘটলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে নতুন মেরুকরণ ঘটবে। বর্তমানে এলডিসিভুক্ত হওয়ায় ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ও যুক্তরাজ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাচ্ছে বাংলাদেশ। দেশের মোট রপ্তানির ৬০-৬৪ শতাংশ ইউরোপের বাজারে। কিন্তু এলডিসি থেকে উত্তরণ ঘটার পর এসব দেশ ক্রমান্বয়ে বাংলাদেশের বিদ্যমান সুবিধা তুলে নেবে। সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশ উত্তরণ-পরবর্তী সর্বোচ্চ তিন বছর শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে।

নয় মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটির বলতে গেলে কিছুই ছিল না। রাস্তাঘাট, ঘরবাড়ি, যোগাযোগ ব্যবস্থা কার্যত ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয়েছিল। বিশ্বব্যাংকের এক পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘যেন পারমাণবিক বোমায় আক্রান্তের পর সকাল।’ প্রাকৃতিক দুর্যোগে প্রতিনিয়ত ক্ষতিগ্রস্ত দেশের প্রকৃতিও ছিল না অনুকূলে। বিশ্বব্যাংকের হিসাব মতে, যাত্রার শুরুতে ১৯৭২ সালে ১৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি, বিশেষ করে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের উচ্চ মূল্যস্ফীতি, খাদ্যাভাব, বৈদেশিক ভান্ডার শূন্য, বিদেশি বিনিয়োগ ছিল না বললেই চলে। অর্থনৈতিক উন্নয়নের যত নেতিবাচক ধারণা, তা যেন সবই ছিল বাংলাদেশের শুরুতে। এমন অবস্থায় হিমালয়ের মতো দৃঢ়চেতা মহান নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতি পুনর্গঠনে মনোনিবেশ করেন এবং ক্ষুধা, দারিদ্র্য ও নিপীড়নমুক্ত এবং ন্যায়ভিত্তিক সমাজ সুখী-সমৃদ্ধশালী সোনার বাংলা গড়তে উদ্যোগী হন।

বিশ্ব অর্থনীতি নিয়ে যারাই নাড়াচাড়া করেন তারাই আলোচনা করেন ‘বাংলাদেশ প্যারাডক্স’ নিয়ে। সারা বিশ্বের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অর্থনীতির ছাত্ররাই পরিচিত এ শব্দটির সঙ্গে। তলাবিহীন ঝুড়ির তকমা ঝেড়ে বাংলাদেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রের অগ্রযাত্রার রহস্য বুঝতে চান সবাই। এ আগ্রহ দিন দিন বেড়েই চলেছে। বিশ্বের সবচেয়ে নামকরা অর্থনীতিবিদরাও স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে গবেষণা করছেন বাংলাদেশ নিয়ে। কারণ বাংলাদেশ ঈর্ষণীয় সাফল্য দেখিয়েছে বিভিন্ন ক্ষেত্রে। কিছু ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সাফল্য বিশ্বকে চমকে দেওয়ার মতোই। জানা যায়, বিশ্বের বিভিন্ন ক্ষেত্রের র‌্যাংকিংয়ে বাংলাদেশ শীর্ষে স্থান করে নিয়েছে। এর মধ্যে বাংলাদেশ পাট রপ্তানিতে বিশ্বে প্রথম এবং উৎপাদনে দ্বিতীয়, ইলিশ উৎপাদনে প্রথম, তৈরি পোশাক রপ্তানিতে দ্বিতীয়, সবজি উৎপাদনে তৃতীয়, জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জনে তৃতীয়, মাছ উৎপাদনে চতুর্থ, ছাগল উৎপাদনে চতুর্থ, চাল উৎপাদনে চতুর্থ, আলু উৎপাদনে ষষ্ঠ, ক্রিকেটে সপ্তম, আম উৎপাদনে সপ্তম, জনশক্তিতে অষ্টম, বাইসাইকেল রপ্তানিতে অষ্টম, আউটসোর্র্সিংয়ে অষ্টম, বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের ক্ষেত্রে অষ্টম, পেয়ারা উৎপাদনে অষ্টম, মৌসুমি ফল উৎপাদনে দশম স্থানে রয়েছে। বর্তমান বিশ্বের এখনকার সবচেয়ে আলোচ্য বিষয় করোনাভাইরাস মহামারি। সেখানেও বাংলাদেশের মিলেছে সাফল্যের স্বীকৃতি। নানা অব্যবস্থাপনা ও ঘাটতির পরও মহামারি মোকাবিলায় সফল দেশের তালিকায় বাংলাদেশ বিশ্বে ২০তম স্থান পেয়েছে একটি র‌্যাংকিংয়ে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রখ্যাত ডাটা মিডিয়া বলুমবার্গ বাংলাদেশকে বিশ্বব্যাপী ২০তম ও দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম স্থানের স্বীকৃতি দিয়েছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দাবি, ব্লুমবার্র্গের স্বীকৃতিকে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। কারণ ব্লুমবার্গ কেবল দেশের অর্থনৈতিক সফলতা দেখেই রিপোর্টটি করেনি, প্রতিষ্ঠানটি করোনাভাইরাস মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় জনবল, অবকাঠামো, টিকাদান সক্ষমতা, চলাফেরা নিয়ন্ত্রণের মতো গুরুত্বপূর্ণ অন্তত ১০টি সূচক বিবেচনা করে এ ফল ঘোষণা করেছে।

মহামারির ধাক্কায় বিশ্ব অর্থনীতি যখন পর্যুদস্ত-তখন বড় ধরনের কোনো সংকট ছাড়াই পরিস্থিতি মোকাবিলা করেছে বাংলাদেশ। প্রাথমিক ধাক্কা সামলে ঘুরে দাঁড়িয়েছে প্রবাসী আয়, কৃষি উৎপাদন ও রপ্তানি বাণিজ্য। পরিকল্পনামন্ত্রীর মতে, ‘মহামারি পরিস্থিতিতে বিশ্বের অন্যান্য দেশের সঙ্গে আমাদের অর্থনীতির তুলনা করলে দেখা যাবে আমরা পাশের দেশগুলোর তুলনায় ভালো করেছি। বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ ও এডিবির মতো উন্নয়নসহযোগী সংস্থাসমূহও বিদায়ী বছরে বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রশংসা করেছে। চলতি অর্থবছর শেষে আমাদের প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশের কম হবে না। তা হলে এটা হবে আমাদের জন্য বড় অর্জন।’

৫০ বছরে নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে আজকের বাংলাদেশ- উন্নয়নের বিস্ময় এক বাংলাদেশ। ১৯৭৫-পরবর্তী সময় থেকে ডিসেম্বর ১৯৯০ পর্যন্ত ১৪ বছর সামরিক শাসনের কারণে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের গতি ছিল খুব মন্থর এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে কার্যত স্থবির। যেমন সরকারি কারখানাগুলোর জাতীয়করণ থেকে বেসরকারিকরণ করলেও সেগুলো ছিল অসংগঠিত, পুঁজি সঞ্চয়নে ধীরগতি। বৈদেশিক বাণিজ্য উদারীকরণের পর ১৯৯০-এর পরবর্তী সময় থেকে অর্থনীতির গতিধারা দ্রুত বদলাতে শুরু করে এবং ২০০৯-এর পর থেকে আরো গতিশীল হয়। তারই ফলে বাংলাদেশ বিশ্বব্যাংকের মানদ- অনুযায়ী ২০১৫ সালের নিম্ন আয়ের দেশ থেকে নিম্নমধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হয়। প্রথম প্রেক্ষিত পরিকল্পনার লক্ষ্য ছিল ডিজিটাল বাংলাদেশ গঠন এবং ২০২১ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হওয়া। সে লক্ষ্য ২০১৫ সালেই অর্জিত হয়ে যায়। এর মধ্যে বাংলাদেশ ২০১৮ সালের জাতিসংঘের মানদন্ডে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের শর্ত পূরণ করেছে এবং ২০২১ সালে দ্বিতীয়বারের মতো শর্তগুলো পূরণ করলে ২০২৪ সালে উন্নয়নশীল দেশে পরিণত হবে। সহস্তাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ প্রভূত সাফল্য অর্জন করে। বিশেষত মাতৃমৃত্যুর হার, দারিদ্র্যের হার, শিশুমৃত্যুর হার কমানোসহ নারীর ক্ষমতায়নে বাংলাদেশ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক পুরস্কারে ভূষিত হয়।

২০২০ সালে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের হিসাবে স্থির মূল্যের সমতায় জিডিপির আকার ৩০তম এবং চলতি ডলার মূল্যে অবস্থান ৩৯তম। সেন্টার ফর ইকোনমিকস অ্যান্ড বিজনেস রিসার্চের (সিইবিআর) প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালেই বাংলাদেশ নামিক জিডিপি আকারে ৩০তম বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ হবে। আর হংকং সাংহাই ব্যাংকিং করপোরেশনের হিসাবে, ২০৩০ সালের মধ্যে ২৬তম বৃহৎ অর্থনীতিতে এবং সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বহুজাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান ইউবিএসের মতে, বাংলাদেশ ২০৫০ সালে ১২তম বৃহৎ অর্থনীতিতে পরিণত হবে। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২০ সালের ডিসেম্বরে মাথাপিছু জাতীয় উৎপাদনে ভারতকে ছাড়িয়ে যাবে বাংলাদেশ। অথচ এক দশক আগেও বাংলাদেশের মাথাপিছু জাতীয় আয় ছিল ভারতের অর্ধেক। এভাবে বাংলাদেশ এশিয়ার একটি সফলতার গল্প হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। অনেকে বাংলাদেশকে ‘এশিয়ান টাইগার’ নামেও অভিহিত করছে। আজ আমরা খাদ্যশস্য উৎপাদনে প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণ। আমরা স্বাধীনতার পর থেকে সাড়ে তিন গুণের বেশি চাল উৎপাদন করতে সক্ষম হয়েছি। বাংলাদেশের এই রূপান্তরের পেছনে যে চালিকাশক্তিগুলো কাজ করেছে, সেগুলো হলো সরকারের উন্নয়ন নীতি, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, গ্রামাঞ্চলে সড়ক যোগাযোগের বিস্তৃতি, সামাজিক পরিবর্তন, নারীর ক্ষমতায়ন, অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তিকরণ, তৈরি পোশাক শিল্প এবং অন্যান্য সামাজিক সূচকে (প্রত্যাশিত গড় আয়ু, শিক্ষা ও জেন্ডার সমতায়, জনসংখ্যা বৃদ্ধি কমানো) উন্নতি। এবার অর্থনীতির মূল সূচকগুলোর দিকে একটু দৃষ্টি দেওয়া যাক, তাহলে গত পাঁচ দশকে রূপান্তরের গভীরতা আরো পরিষ্কার হবে। গত দশকে আন্তর্জাতিক পরিম-লে বাংলাদেশের যে বিষয়টি আলোচিত হয়েছে বা নজর কেড়েছে সেটি হলো, ধারাবাহিক জিডিপি প্রবৃদ্ধি। ২০০৯ সালের পর থেকে বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার সাড়ে তিন গুণের বেশি বেড়েছে। গত ৫০ বছরের মধ্যে গত দশকে গড় প্রবৃদ্ধির হার সবচেয়ে বেশি ছিল (৬.৭৬ শতাংশ)। বাংলাদেশ ধারাবাহিকভাবে প্রতি দশকে ১ শতাংশ পয়েন্ট প্রবৃদ্ধি বাড়াতে সক্ষম হয়েছে। এটি একটি অনন্য অর্জন। যদিও প্রথম প্রেক্ষিত পরিকল্পনায় ২০২১ সালে প্রবৃদ্ধি ১০ শতাংশ ধরা হয়েছিল। প্রবৃদ্ধির গতিশীলতা অব্যাহত থাকবে এবং ২০৩০ সাল নাগাদ তা ৯ শতাংশ ছাড়িয়ে ২০৪১ সময় পর্যন্ত ১০ শতাংশ হবে বলে আশা করা যায়। প্রথমত, বিনিয়োগের জন্য দরকার ভৌত অবকাঠামো সৃষ্টি। গত দশকে সরকারের সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার খাত ছিল অবকাঠামো। এজন্য যে মেগা প্রকল্পগুলো হাতে নেওয়া হয়েছে, যার ফলে জিডিপির প্রবৃদ্ধি ১-২ শতাংশ ত্বরান্বিত হতে পারে। দ্বিতীয়ত, সরকার ব্যবসার পরিবেশ উন্নতকরণে বেশকিছু সংস্কার কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। ফলে গত বছর বিশ্বব্যাংকের ব্যবসা সহজীকরণ সূচকে আট ধাপ উন্নীত হয়েছে। ব্যবসার জন্য ‘ওয়ান স্টপ সার্ভিস’ চালু হওয়ায় আরো উন্নতি লাভ করবে। তৃতীয়ত, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, যা অর্থনীতি রূপান্তরের অন্যতম শর্ত। গত দশকে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ছিল। এ ধারা অব্যাহত থাকলে প্রবৃদ্ধির গতির ধারাবাহিকতা থাকবে। চতুর্থত, সরকারের ব্যবসাবান্ধব নীতি। সরকার ব্যবসায়ীদের প্রণোদনা ও নীতি সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে।

বর্তমান সরকার ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে সুদূরপ্রসারী উদ্যোগ গ্রহণ করে। তার মধ্যে একটি হলো মেগা প্রকল্প হাতে নেওয়া। মেগা প্রকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে পদ্মা বহুমুখী সেতু, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র, ঢাকা মেট্রো রেল, পায়রা গভীর সমুদ্রবন্দর, পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্প, মহেশখালী মাতারবাড়ী সমন্বিত অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প, মহেশখালী এলএনজি টার্মিনাল। সব মেগা প্রকল্পের সম্ভাব্য খরচ ৩০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের কাছাকাছি, যা অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনাকালে সুফল পাওয়া শুরু হবে।

এবার আসা যাক মাথাপিছু জাতীয় আয় প্রসঙ্গে। মাথাপিছু জাতীয় আয়কে একটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের মাপকাঠি ধরা হয়। গত দশকে বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় দ্বিগুণের বেশি বেড়েছে। ১৯৯০ সাল পর্যন্ত মাথাপিছু জাতীয় আয় খুব বেশি বাড়েনি। ১৯৯০-এর দশক থেকে তা গতিশীল হতে শুরু করে এবং চলতি দশকে বৃদ্ধি ছিল সবচেয়ে বেশি। দ্বিতীয় প্রেক্ষিত পরিকল্পনার মূল দুটি অভীষ্ট হচ্ছে, ২০৩১ সালের মধ্যে নিম্নমধ্যম আয় থেকে উচ্চমধ্যম আয়ের দেশ এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উচ্চ আয়ের দেশে পরিণত হওয়া। বিশ্বব্যাংকের শ্রেণিবিন্যাস অনুযায়ী, ২০২০-২১ সালে নিম্নমধ্যম আয় থেকে উচ্চমধ্যম আয়ে উন্নীত হওয়ার সীমা হলো মাথাপিছু আয় ৪ হাজার ৪৫ মার্কিন ডলার (এটলাস পদ্ধতিতে)। জিডিপি প্রবৃদ্ধি বাড়লে মাথাপিছু আয়ও বাড়বে, যদি জনসংখ্যা সে অনুপাতে বৃদ্ধি না পায়। সে কারণে আমাদের উন্নয়ন নীতিতে প্রবৃদ্ধি গুরুত্বপূর্ণ। প্রবৃদ্ধি বাড়লে মানুষের চাহিদা বাড়বে। চাহিদা বাড়লে অর্থনৈতিক কর্মকা- গতিশীল হবে এবং বিনিয়োগ বাড়বে। ফলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং মানুষের আয় বাড়বে। ২০৩০ সালের মধ্যে সরকারের ১০০ বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল বাস্তবায়িত হলে নিশ্চিত বলা যায় পুরো বাংলাদেশের চেহারা বদলে যাবে।

বাংলাদেশ একসময় কৃষিপ্রধান দেশ ছিল। মোট দেশজ উৎপাদনের অর্ধেকের বেশি আসত কৃষি থেকে আর কৃষির ওপর নির্ভরশীল ছিল ৭০ শতাংশের বেশি মানুষ। জিডিপিতে শিল্পের অবদান ছিল ১২-১৩ শতাংশের মতো। ধীরে ধীরে কৃষির অবদান কমে শিল্প ও সেবা খাতের পরিধি বাড়তে থাকে। বিশেষ করে নব্বইয়ের দশক থেকে শিল্প খাতের অবদান বাড়তে শুরু করে প্রধানত তৈরি পোশাক শিল্পের প্রসারের কারণে। এখন সেবা খাতের অবদানও কমে যাচ্ছে। তার স্থান নিচ্ছে শিল্প। সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী জিডিপিতে কৃষি খাতের অবদান মাত্র ১৩ শতাংশ, যদিও কৃষি খাতের ওপর নির্ভরশীল শ্রমশক্তি ৩৮ শতাংশ। অন্যদিকে শিল্প খাতের অবদান ৩৫ শতাংশ। রূপকল্প ২০৪১ প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, ২০৩১ সালের মধ্যে শিল্প খাতের অবদান ৪০ শতাংশ হবে, যদিও ধীরে ধীরে তা কমে ২০৪১-এ আবার ৩৫ শতাংশে নেমে আসবে এবং সেবা খাত সম্প্রসারিত হবে। তখন কৃষির অবদান থাকবে মাত্র ৫ শতাংশ।

বাংলাদেশ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম চালিকাশক্তি বলে ধরা হয় প্রবাসী আয় ও রফতানিকে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে আমাদের এক কোটির ওপর প্রবাসী থাকে। প্রবাসী আয় আমাদের অভ্যন্তরীণ চাহিদার অন্যতম উৎস। মূলত গত ২০ বছরে প্রবাসী আয় ০৯ নয় গুণ বেড়েছে।

করোনার কারণে বহুপক্ষীয় সংস্থা থেকে শুরু করে অনেক অর্থনীতিবিদ অনুমান করেছিলেন করোনার সময়ে বাংলাদেশের প্রবাসী আয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাবে। সব অনুমান ভুল প্রমাণিত করে প্রবাসী আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাচ্ছে। গত জুলাইয়ে সর্বকালের সবচেয়ে বেশি প্রবাসী আয় (২.৫৯ বিলিয়ন ইউএস ডলার) এসেছে। চলতি অর্থবছরে গড়ে মাসে ২ বিলিয়ন ডলারের ওপর আসছে প্রবাসী আয়। তৈরি পোশাক শিল্পের আগে একসময় পাট ছিল অন্যতম রফতানি পণ্য। আশির দশকে সরকারের সরাসরি পৃষ্ঠপোষকতায় এবং দেশের তুলনামূলক সুবিধা ও সস্তা শ্রমের সুবাদে তৈরি পোশাক শিল্প দ্রুত বিকাশ লাভ করে। বিশেষ করে গত দুই দশকে পোশাক শিল্পের প্রসারের ফলে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম তৈরি পোশাক রফতানির দেশে পরিণত হয়েছে বাংলাদেশ। বর্তমানে মোট রফতানির ৮৪ শতাংশ ওপর আয় আসে তৈরি পোশাক থেকে। তৈরি পোশাক শিল্পে কর্মরত ৪ মিলিয়ন শ্রমিক, যার ৮০ শতাংশই নারী। স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তিতে রফতানি আয় ২০২১ সালে ৫০ বিলিয়ন ডলারের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে।

একসময় বাংলাদেশে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ খুব কম ছিল। ডলারের ওপর কড়াকড়ি ছিল। সে সময় এখন অতীত। প্রবাসী আয় ও রফতানি আয়ের ফলে রিজার্ভ গত দুই দশকে খুব দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০০০ সালের পর থেকে দৃশ্যপট পরিবর্তন হয়ে যায়, ফলে এ শতাব্দীর প্রথম দশকে পাঁচ গুণ এবং দ্বিতীয় দশকে তিন তিন গুণ রিজার্ভ বৃদ্ধি পায়।

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন যতটা আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় নজর কেড়েছে, তার চেয়ে বেশি আকর্ষণীয় হয়েছে সামাজিক সূচকগুলোর অগ্রগতি। বিশেষ করে প্রতিবেশী ভারত ও পাকিস্তানের তুলনায় গত দুই দশকে বাংলাদেশ মাথাপিছু আয় কম হওয়া সত্ত্বেও কীভাবে এগিয়েছে, তা বিস্ময় সৃষ্টি করেছে।

নারীর ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বিশ্বে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। বাংলাদেশ জেন্ডার সমতায় সবচেয়ে ভালো অবস্থানে রয়েছে। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের হিসাবে গ্লোবাল জেন্ডার গ্যাপ সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ৫০তম। পৃথিবীতে বাংলাদেশই একমাত্র দেশ, যেখানে গত ৫০ বছরে পুরুষের চেয়ে নারীরা অধিক সময় শাসন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ছিলেন। কমনওয়েলথভুক্ত দেশগুলোর জন্য অনুপ্রেরণাদায়ী নারী নেতাদের তালিকায় এসেছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নাম। করোনাভাইরাস মহামারি সাফল্যের সঙ্গে মোকাবিলার স্বীকৃতি হিসেবে নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডা আরডার্ন এবং বারবাডোজের প্রধানমন্ত্রী মিয়া আমোর মোতলির সঙ্গে ওঠে এসেছে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নাম। ৫৪ দেশের জোট কমনওয়েলথের প্রধান প্যাট্রেসিয়া আন্তর্জাতিক নারী দিবস সামনে রেখে গত ০৭ মার্চ নিজের  টুইটারে একটি ভিডিও বার্তা প্রকাশ করেন। আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষ্যে কমনওয়েলথের একটি বিশেষ ঘোষণায় এই তিন নারী প্রধানমন্ত্রীকে তাদের সাফল্যের স্বীকৃতি দেন। কমনওয়েলথ মহাসচিব বলেন, “আমি সবসময়ই অনেক নারী ও মেয়েদের দেখে অনুপ্রাণিত হই, আর এবার আমাদের কমনওয়েলথে তিন জন অসাধারণ নেতার নাম নিতে চাই, নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডা আরডার্ন, বারবাডোজের প্রধানমন্ত্রী মিয়া আমোর মোতলি এবং বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, নিজ নিজ দেশে কোভিড-১৯ মহামারির সময় তাদের নেতৃত্বের জন্য।” “আরও অনেক নারীর মতো এই তিন নেতাও তাকে আশার আলো দেখান এমন একটি পৃথিবীর জন্য যা নারী-পুরুষ সবার সম্মিলিত সুন্দর ভবিষ্যৎ এবং স্বার্থ নিশ্চিত করতে পারে।”

বাংলাদেশে করোনা শনাক্তের এক মাস পরেই গত বছরের এপ্রিল মাসে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক অর্থ-বাণিজ্য বিষয়ক সাময়িকী ‘ফোর্বস’- এ প্রকাশিত এক নিবন্ধে করোনাভাইরাস মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পদক্ষেপের প্রশংসাও ওঠে এসেছে। এছাড়া চলতি বছরের জানুয়ারিতে বাংলাদেশে করোনাভাইরাসে সংক্রমণ সফলভাবে নিয়ন্ত্রণ করায়, প্রশংসা করে চিঠি দিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। যেখানে এই অতিমারী মোকাবিলায় নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভূমিকাকে বিশেষভাবে সাধুবাদ জানানো হয়েছে। করোনা সংক্রমণ প্রতিরোধের মতো ভ্যাকসিন দেওয়ার কর্মসূচিতেও বাংলাদেশ ভালো করবে বলে আশাবাদ জানিয়ে সার্বিক সহযোগিতা করবে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল সংস্থাটি।

অবশ্য বাংলাদেশের সাফল্যের অগ্রযাত্রা সামনে যে আরও উজ্জ্বল হবে সে ইঙ্গিতও দিচ্ছে নামকরা গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো। ব্রিটেনের অর্থনৈতিক গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর ইকোনমিকস অ্যান্ড বিজনেস রিসার্চ বলছে, বাংলাদেশ এখন যে ধরনের অর্থনৈতিক বিকাশের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে তা অব্যাহত থাকলে ২০৩৫ সাল নাগাদ দেশটি হবে বিশ্বের ২৫তম বৃহৎ অর্থনীতি। আগামী ১৫ বছরে বিশ্বের কোন দেশের অর্থনীতি কী হারে বাড়বে, তারই পূর্বাভাস দিয়ে প্রকাশিত ‘ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক লিগ টেবল ২০২১’ নামের এ প্রতিবেদনে ১৯৩টি দেশের অর্থনীতি নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। সিইবিআর বলছে, ২০২০ থেকে ২০৩৫ সালের মধ্যে বিশ্ব অর্থনীতির সূচকে বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য উন্নতি হবে। এখন বাংলাদেশের অর্থনীতি আছে ৪১ নম্বরে। ২০৩৫ সালে বাংলাদেশ হবে ২৫তম অর্থনৈতিক শক্তি। সিইবিআরের পূর্বাভাসে বলা হচ্ছে, ২০২১ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি ঘটবে গড়ে ৬ দশমিক ৮ শতাংশ হারে। লন্ডনের প্রভাবশালী সাময়িকী দি ইকোনমিস্ট বাংলাদেশের অনেক বিষয়ে কঠোর মন্তব্য করলেও তারা সাফল্যযাত্রা বুঝতে ভুল করেনি। তাই তো প্রায় এক যুগ আগে ‘আউট অব দ্য বাস্কেট’ নিবন্ধে ইকোনমিস্ট বলেছে, ‘কী করা যায়, তা দেখিয়ে দেওয়ার মডেলে পরিণত হয়েছে বাংলাদেশ। কী করে উন্নয়নের মডেলে পরিণত হওয়া যায়, তাও দেখিয়ে দিয়েছে বাংলাদেশ।’

আর ‘বাংলাদেশ প্যারাডক্স’ নিয়ে গবেষণা করা বিশ্বের নামকরা অর্থনীতিবিদের একজন বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ কৌশিক বসুও বাংলাদেশের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ দেখছেন। ‘হোয়াই ইজ বাংলাদেশ বুমিং’ শীর্ষক লেখায় কৌশিক বসু বলেছেন, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা উজ্জ্বল। তবে কিছু ঝুঁকির বিষয়ে বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের সচেতনতা দরকার। কারণ যখন কোনো দেশের অর্থনীতি ভালো করতে থাকে, তখন  যে কোনো অশুভ আশঙ্কাকে যদি রাশ টেনে ধরা না যায়, তা সমৃদ্ধির গতি থামিয়ে দিতে পারে। তবে এর চেয়েও বড় ঝুঁকি হলো কট্টর ধর্মীয় ও সামাজিক রক্ষণশীল শক্তি। এরা প্রগতিশীল বাংলাদেশের সামাজিক অগ্রগতির বিপক্ষে। 

  প্রতিবেদক : এআইজি

  (প্ল্যানিং অ্যান্ড রিসার্চ-১)

  বাংলাদেশ পুলিশ

ভালো লাগলে শেয়ার করে দিন :)

0 Comments

Leave a Reply

Avatar placeholder

Your email address will not be published. Required fields are marked *