ই-পেপার

SITE UNDER CONSTRUCTION
বাংলাদেশ পুলিশের মুখপত্র
অব্যাহত প্রকাশনার ৬৩ বছর

মো. শরীফ মাহমুদ অপু

ডিসেম্বর মাস বাঙালিদের কাছে বিজয়ের মাস। ডিসেম্বর মাসে বাঙালিদের মন বিজয়ের আনন্দে উদ্বেলিত থাকে। এ বছরটি আমরা মুজিববর্ষ হিসেবে পালন করছি। কোভিড-১৯ মহামারির কারণে বিশ্ব আজ পর্যুদস্ত। এজন্য খুব বেশি আনুষ্ঠানিকতা না থাকলেও মুজিববর্ষ যেন বাঙালিদের মনে প্রোথিত। বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীর দিন ১৭ মার্চ ২০২০ থেকে ১৭ মার্চ ২০২১ পর্যন্ত মুজিববর্ষ হিসেবে আমরা পালন করছি। চলতি বছর স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পালন করছে বাংলাদেশ।

বাংলাদেশের লোকজন তাদের দেশের প্রতিষ্ঠাতার জন্মশতবার্ষিকী পালন করছে; যাঁর নেতৃত্বে তারা পেয়েছিল একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশের মানচিত্র। পেয়েছিল একটি পতাকা ও পবিত্র সংবিধান। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সৃষ্টির পরই তাদের শোষণ নীতির কারণে বঙ্গবন্ধু বুঝতে পেরেছিলেন স্বাধীনতার কোনো বিকল্প নেই। নিয়মতান্ত্রিক ও ধারাবাহিক আন্দোলনের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু জনগণকে সঙ্গে নিয়ে স্বাধীনতার লক্ষে এগিয়ে গেছেন। বায়ান্নের ভাষা আন্দোলন, ৫৪ এর যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ৬২ এর শিক্ষা আন্দোলন, ৬৬ এর ছয় দফা আন্দোলন ছিল মূলত পরোক্ষভাবে স্বাধীনতা অর্জনের ইঙ্গিত। ৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান, ৭০ এর নির্বাচনে বিজয় লাভের মধ্যে দিয়ে বাঙালি চূড়ান্ত বিজয়ের লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত হতে থাকে।

১৯৪৭ সালে পূর্ব পাকিস্তান নামে একটি ডেড চাইল্ড আমরা পেয়েছিলাম। এ ডেড চাইল্ডটিকে দাফন-কাফন করে স্বাধীন বাংলাদেশ পেতে আমাদের ২৩ বছর লেগেছিলো। স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্ন সামনে নিয়ে দীর্ঘ ২৩টি বছর জাতীয় মুক্তি সংগ্রাম পরিচালনা করে, নিজের জীবন উৎসর্গ করে ধাপে ধাপে স্বাধীনতার পথে অগ্রসর হয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা অর্জনের মধ্য দিয়ে প্রমাণ করেছিলেন যে, শুধু ধর্মের দোহাই দিয়ে প্রায় ১২ শত মাইল দূরত্বের ভিন্ন সংস্কৃতির, ভিন্ন ভাবধারার দুটি ভূখন্ডকে এক করে নিষ্পেষণ করে এক দেশ করে রাখা যায়না।

’৭০ এর সাধারণ নির্বাচনে বিজয় অর্জন স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়কে ত্বরান্বিত করে। পাকিস্তানিরা আলোচনার নাম করে পূর্ব পাকিস্তানে সৈন্য সংখ্যা বৃদ্ধি করতে থাকে। বঙ্গবন্ধু বুঝতে পারেন যে কি হতে যাচ্ছে। বঙ্গবন্ধু ’৭১ এর ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে মূলত স্বাধীনতারই ডাক দেন। ইউনেস্কো কর্তৃক স্বীকৃত তাঁর এ ভাষণটি বিশে^র শ্রেষ্ঠ ভাষণের মধ্যে অন্যতম। তিনি এ ভাষণে জাতিকে দিক নির্দেশনা দিয়ে দেন যে বাঙালিদের কখন কি করতে হবে। এই ভাষণে অনুপ্রাণিত হয়ে বাঙালিরা মুক্তি সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ে। স্বাধীনতা সংগ্রাম ব্যতীত বাঙালিদের আর কিছুই করার ছিল না।

বঙ্গবন্ধু সিস্টেম্যাটিক আন্দোলনের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের দিকে এগিয়ে গেছেন। তিনি নিয়মতান্ত্রিকভাবে বিশ্ব ও বাংলাদেশের জনগণের কাছে মুক্তি সংগ্রামের পটভূমি তুলে ধরেছিলেন।

বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে এবং ৩০ লাখ শহীদের রক্ত, দুই লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে ১৬ ডিসেম্বর অর্জিত হয় বাঙালির চূড়ান্ত বিজয়, সর্বশ্রেষ্ঠ অর্জন ‘স্বাধীনতা’। ১৬ ডিসেম্বর রেসকোর্স ময়দানে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী মাথা নত করে প্রায় ১ লক্ষ সৈন্য নিয়ে আত্মসমর্পণ করে। ঐদিন সারাদেশের মানুষ আনন্দে জয় বাংলা স্লোগানে একে অপরকে জড়িয়ে ধরেছিলো। 

বাংলাদেশে ১৯৭৫ সালের পর থেকে ইতিহাস বিকৃতির অনেক রকম চেষ্টা করা হয়েছে। এ স্বাধীনতা অর্জনের জন্য ৩০ লাখ মানুষ শহীদ হয়েছে; ২ লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রমহানি হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে দেশের মানুষ ৯ মাস পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সাথে যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছে।

মুক্তিযোদ্ধারা কিন্তু দেশপ্রেমের জন্য বঙ্গবন্ধুর ডাকেই সব কিছু ফেলে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলো। ১৬ ডিসেম্বর বিজয় আসলেও জনগণ বিজয় উদযাপন করতে পারছিলো না। মুক্তিযোদ্ধা তথা আপামর জনসাধারণ অপেক্ষা করতে ছিলো বঙ্গবন্ধু কবে দেশে ফিরে আসবে। এদেশের জনগণ তখন গভীর আগ্রহ ও উৎকন্ঠা নিয়ে বঙ্গবন্ধুকে পাওয়ার জন্য দিনক্ষণ গুণছিলো। ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু দেশে ফিরে আসেন।

বঙ্গবন্ধু ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। ২৬শে মার্চের প্রথম প্রহরে পিলখানা থেকে তৎকালীন ইপিআরের সদস্য জাতির পিতার স্বাধীনতার ঘোষণা ওয়ারলেসযোগে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে পৌঁছে দিয়েছিলেন। ওই দিনই বঙ্গবন্ধুকে হানাদার বাহিনী গ্রেফতার করে।

বঙ্গবন্ধুকে ধানমন্ডি ৩২ নং বাড়ি থেকে গ্রেফতার করে পাকিস্তানের করাচিতে নিয়ে যাওয়া হয়। করাচি থেকে কালবিলম্ব না করে কঠোর গোপনীয়তায় বঙ্গবন্ধুকে নেয়া হয় লাহোর থেকে ৮০ মাইল দূরে অবস্থিত পাকিস্তানের সবচেয়ে উষ্মতম স্থান লায়ালপুর (বর্তমান ফয়সালাবাদ) কারাগারে।

একাধিক কেন্দ্রীয় কারাগার থাকা সত্ত্বেও বঙ্গবন্ধুকে দূরবর্তী জেলা শহরের কারাগারে আটক করার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল তাঁকে মানসিকভাবে পিষ্ট করা। গ্রীষ্মে লায়ালপুরের তাপমাত্রা চরম পর্যায়ে বাড়ে। বন্দিদের জীবন হয়ে ওঠে অতিষ্ঠ, দুর্বিষহ। তদুপরি বঙ্গবন্ধুকে আটক রাখা হয় নি:সঙ্গ সেলে, গরমে তেতে উঠা সেই কারাগারে কোনো পাখার ব্যবস্থাও রাখা হয়নি। কিন্তু বঙ্গবন্ধু ছিলেন মানসিকভাবে অত্যন্ত দৃঢ়।

পাকিস্তানের ২৩ বছরের শাসনকালে বঙ্গবন্ধু মোট তিন হাজার তিপ্পান্ন দিন (৩০৫৩ দিন) জেলে কাটিয়েছেন। মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েছিলেন ২ (দুই-বার)। বঙ্গবন্ধুকে পকিস্তান সরকার জেলে প্রচ- মানসিক নির্যাতন করতেন। তাঁকে পাগলা গারদের নিকট কোনো কক্ষে রাখা হত। বঙ্গবন্ধু তাঁর সমগ্র জীবন বাংলাদেশ ও বাংলাদেশের জনগণের জন্য উৎসর্গ করে গেছেন।

আন্তর্জাতিক চাপের কাছে নতি স্বীকার করে ৮ জানুয়ারি, ১৯৭২ পাকিস্তান সরকার বঙ্গবন্ধুকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। বঙ্গবন্ধু ৯ জানুয়ারি পাকিস্তান থেকে সরাসরি বাংলাদেশে না এসে লন্ডন যান। তৎকালীন বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হিথ বঙ্গবন্ধুকে রাষ্ট্রপ্রধানের মর্যাদা দেন এবং দুই নেতা বাংলাদেশ পরিস্থিতি নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা করেন।

লন্ডন থেকে ঢাকা আসার পথে বঙ্গবন্ধু দিল্লিতে যাত্রা বিরতি করলে দিল্লিতে তাঁকে বিপুল সংবর্ধনা দেয়া হয়। ভারতের রাষ্ট্রপতি ভি ভি গিরি ও প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী তাকে দিল্লি বিমানবন্দরে স্বাগত জানান। দিল্লিতে তাঁকে গার্ড অব অনার প্রদান করা হয়। সেখানে বঙ্গবন্ধু বিশাল এক জনসভায় বাংলায় বক্তব্য দেন। বঙ্গবন্ধু দূরদর্শী নেতা ছিলেন বলেই মুক্তিযুদ্ধে ভারতের সর্বাধিক সহযোগিতার জন্য তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রী, বিভিন্ন দলের নেতা ও ভারতের জনগণকে

কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনের পাশাপাশি সেই সঙ্গে ভারতীয় সৈন্য ফেরত নেয়ার বিষয়েও কথা বলে আসেন।

১০ জানুয়ারি সকালে দিল্লি থেকে বিশেষ বিমানে বঙ্গবন্ধু ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হন। সকালেই  তেজগাঁও বিমানবন্দরে লাখো মানুষ জমায়েত হয়। এদিকে রেসকোর্স ময়দান (সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) ভরে যায় লাখো মানুষে। বিমান বন্দরে নেমেই তিনি রেসকোর্স ময়দানে আসেন।

রেসকোর্স ময়দানে নেমেই সমবেত জনতার উদ্দেশ্যে ভাষণ দেন, যেটি তাঁর ৭ মার্চের ভাষণের মতোই মূল্যবান। তিনি চোখ মুছে বলেন, “আমার বাংলাদেশ আজ স্বাধীন হয়েছে আমার জীবনের স্বাধ আজ পূর্ণ হয়েছে। আমার বাংলার মানুষ আজ মুক্ত হয়েছে”।

“বাংলার ছেলেরা, বাংলার মায়েরা, বাংলার কৃষক, বাংলার শ্রমিক, বাংলার বুদ্ধিজীবী যেভাবে সংগ্রাম করেছে; আমি কারাগারে বন্দি ছিলাম ফাঁসির কাষ্ঠে যাবার জন্য প্রস্তুত ছিলাম কিন্তু আমি জানতাম আমার বাঙালিকে কেউ দাবায় রাখতে পারবে না।

ভাষণে তিনি দৃঢ় কন্ঠে বলেন, “বাংলাদেশ স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র; বাংলাদেশ স্বাধীন থাকবে, বাংলাদেশকে কেউ দাবাতে পারবে না”।

মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত স্বাধীন বাংলাদেশে আসার মাধ্যমে বাংলাদেশের বিজয়ের পূর্ণতা লাভ করে। স্বদেশের মাটি স্পর্শ করে আনন্দ-বেদনার অশ্রুধারা নামলো বাংলাদেশের ইতিহাসের নির্মাতার চোখ বেয়ে।

প্রিয় নেতাকে ফিরে পেয়ে সেদিন সাড়ে সাত কোটি বাঙালি আনন্দাশ্রুতে সিক্ত হয়ে জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু স্লোগান দিয়ে প্রকম্পিত করে তোলে বাংলার আকাশ বাতাস। মূলত বঙ্গবন্ধুর প্রত্যাবর্তনের দিন থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব সংহত হয়।

জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমান আমাদের একটি মানচিত্র দিয়েছেন, দিয়েছেন স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। তাঁর উপহার দেয়া বাংলাদেশ আজ তার যোগ্যকন্যা বিশ্বনেত্রী শেখ হাসিনার হাত ধরে বিশ্ব আজ উন্নয়নের রোল মডেল হিসেবে পরিচিত। বঙ্গবন্ধু কন্যার নেতৃত্বে বিশ্বে বাংলাদেশ হবে উন্নত সমৃদ্ধ রাষ্ট্র।

লেখক : তথ্য ও জনসংযোগ কর্মকর্তা, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়

ভালো লাগলে শেয়ার করে দিন :)

0 Comments

Leave a Reply

Avatar placeholder

Your email address will not be published. Required fields are marked *