ই-পেপার

মিলন সব্যসাচী

বিপ্লবী চেতনার অগ্নিপুরুষ, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। পরাধীনতার শৃঙ্খলাবদ্ধ বাঙালি জাতিকে যিনি দিয়েছেন- ভাষারাষ্ট্র  ও জাতিরাষ্ট্রের শীর্ষবিন্দু স্পর্শী সম্মান। বঙ্গবন্ধু শুধু বাঙালির নয় প্রতিটি বাংলাভাষীর প্রাণের প্রিয়মানুষ। ২১ ফেব্রুয়ারি কেন্দ্রিক আন্দোলন ও স্বাধীনতা সংগ্রামের আপোষহীন সংগ্রামী নেতা মুজিবের দূরদৃষ্টি শক্তি ছিল অসাধারণ। নন্দিত-নেতৃত্বে, সাহসী-সংগ্রামে, মেধা-মননে, মিছিলে-মিটিংয়ে, মহামুক্তির ভাষণে ও বারবার কারাবরণে তিনিই তাঁর তুলনা। তিনি ১৯৪৭ সাল থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত বহুবার কারাবরণ করেছেন। তাঁর সাহসী পদক্ষেপের সফল কীর্তি, অসাম্প্রদায়িক চেতনা, ধর্মনিরেপেক্ষমূখি গৌরবগাথা ও মহান স্বাধীনতার সমুজ্জ্বল ইতিহাস প্রজন্ম থেকে প্রজন্মের প্রেরণাশক্তি। সারা বিশ্বের সব বাংলা ভাষীর একান্ত আত্মজন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি সংগ্রামী, দৃঢ়চেতা মহান নেতা সর্বকালের শ্রেষ্ঠ বাঙালি। স্বাধীনতার স্বপ্ন বাস্তবায়নের রূপকার। আন্তর্জাতিক স্তরে বাঙালির জাতিগত, ভাষাগত, স্বাধীন সার্বভৌম ভূখন্ডের  স্বীকৃতি অর্জন। তাঁর অসীম আকাশের মত বুকে বিস্তৃত স্বপ্নের সবটুকু জুড়ে ছিল বাঙালি জাতিকে স্বাধীন ভূখন্ডের স্বায়ত্বশাসন ফিরিয়ে দেওয়ার প্রয়াস এবং প্রতিজ্ঞা। সমষ্টিগত স্বপ্ন বাস্তবায়নে সর্বাগ্রে তিনি মাতৃভাষার গুরুত্ব এবং সম্মান অনুভব করেছিলেন। এমন মর্মস্পর্শী অনুভবের অতলান্তিক গভীর থেকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছিলেন ‘রাষ্ট্রিক কাজের সুবিধা করা চাই বই কি, কিন্তু তার চেয়ে বড় কাজ দেশের চিত্তকে সরল সফল ও সমুজ্জ্বল করা।’ সে কাজ আপন ভাষা নইলে হয় না। দেউড়িতে একটা সরকারি প্রদীপ জ্বালানো চলে, কিন্তু একমাত্র তার তেল যোগাবার খাতিরে ঘরে ঘরে প্রদীপ নিভানো চলে না। মানুষের মনের গহীনে প্রবেশের জন্য যে আকুতি অনিবার্য হয়ে ওঠে সেই আকুলতার নির্ভরশীল বিনিময় তার হৃদয়স্পর্শী মাতৃভাষা ব্যতিত অন্য কিছুতেই সম্ভব নয়। অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং তাৎপর্যপূর্ণ এ প্রয়োজন তিনি উপলব্ধি করেছিলেন।

১৯৪৭ সালে ১৪ আগস্ট মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর দ্বি-জাতিতত্বের ভিত্তিতে পাকিস্তানের জন্ম। ওই বছরেই পাকিস্তান রাষ্ট্রের করাচিতে পাকিস্তানের শিক্ষা অধিবেশন আহ্বান করেন তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী ফজলুর রহমান। দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে ইসলামের আদর্শে ঢেলে সাজানোর অপ্রয়াসে অধিবেশন আহুত হয়। অধিবেশনে গৃহীত একটি প্রস্তাবে এই মর্মে উল্লেখ ছিল যে, ‘উর্দুই হবে পকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা। একতরফা এই প্রস্তাবের পরিণামে বহুমাত্রিক দ্বিধা-দ্বন্দ ও সংঘাতের সৃষ্টি হয়। কারণ উর্দু পাকিস্তানের প্রথম ভাষা হিসাবে স্বীকৃত নয়। পশ্চিম পাকিস্তানের মুসলিম সম্প্রদায়ও উর্দুকে প্রথম ভাষার স্থানে মেনে নিতে পারেনি। তখন বাংলাভাষাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদাদানের জন্য তমুদ্দিন মজলিসের বেশ কয়েকজন বুদ্ধিজীবী সোচ্চার হয়ে ওঠেন। তাদের অকুন্ঠ সমর্থন দিতে বহু বামপন্থী বুদ্ধিজীবী ও পাশে দাঁড়ান। সরকারি সব কাগজপত্র, মুদ্রা, মানি অর্ডার ফর্ম ও ডাকটিকেটে ইংরেজী ও উর্দুভাষা মুদ্রণের কারণে জনগণের সমস্যা ও হয়রানি চক্রবৃদ্ধি হারে বেড়ে যাচ্ছিল। অথচ বৃটিশ ভারতের শাসন আমলে জনসাধারণকে এ ধরণের সমস্যার সম্মুখিন হতে হয়নি। এক সময় এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে পাবলিক সার্ভিস কমিশন কর্তৃক জানানো হয় ‘সরকারি প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় উত্তরপত্রে লেখার মাধ্যম হিসেবে উর্দু, হিন্দি, ফার্সি ও আরবি ভাষা ব্যবহার করতে হবে। বাংলা ব্যবহার করা চলবে না। বিবেচনাহীন এই ঘৃণ্য কর্মকান্ডে ছাত্রসমাজ আক্রোশে ফেটে পড়ে। ফলে চারিদিকে উল্কার গতিতে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। তখন বাঙালি ছাত্রসমাজের নেতৃস্থানীয় নেতারা বুঝতে পারলেন বাঙালি ছাত্রদের চাকুরির প্রবেশদ্বার চিরতরে বন্ধ করতেই এ অপচেষ্টা চলছে। শেখ মুজিবুর রহমান তখনই ‘ইস্ট পাকিস্তান মুসলিম স্টুডেন্টস লীগ’ নামে একটি ছাত্র সংগঠন গঠন করেন।

১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি সংগঠনটি প্রতিষ্ঠা লাভ করেছিল মাত্র চৌদ্দ সদস্য বিশিষ্ট সংগঠনের কমিটিতে শেখ মুজিবও ছিলেন। নাজিমুদ্দিন এই কমিটির আহ্বায়ক নির্বাচিত হয়েছিলেন। নেতৃস্থানীয় অন্যতম ‘সংগঠক অলি আহাদ ও মোহাম্মদ তোহা সংগঠনের নামকরণ থেকে ‘মুসলিম’ শব্দটি বাদ দেওয়ার জন্য জোরালো দাবি তোলেন। ঘটনার প্রেক্ষাপটে দূরদৃষ্টি সম্পন্ন শেখ মুজিব তাদের বুঝালেন যে, সরকারের দৃষ্টি এড়ানোর জন্য মুসলিম শব্দটি এখন প্রয়োজন।’ যদিও পরবর্তী সময়ে ২১ শের ভাষা-আন্দোলনে ‘স্টুডেন্টস লীগ’ সংগঠনটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। সংগঠনের মাত্র চারদিন অতিবাহিত হওয়ার পরেই একটি ছাত্রপ্রতিনিধি দল পাকিস্তানের মূখ্যমন্ত্রী নাজিমুদ্দিনের সাথে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সাক্ষাৎকারে মিলিত হয়। সেখানে আলোচনায় ভাষা বিষয়ক সমস্যাকেই প্রাধান্য দেওয়া হয়। দীর্ঘ আলোচনার এক পর্যায় মূখ্যমন্ত্রী মহোদয় প্রতিনিধি দলের কাছে পূর্ব বাংলার রাষ্ট্রভাষা বাংলা করার প্রতিশ্রতি দিলেও তিনি তা বাস্তবায়ন করে নি। ১৯৪৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে পরিষদ সদস্য জননেতা ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত গণপরিষদে রাষ্ট্রভাষা বিষয়ক প্রস্তাবে সংশোধনী এনে বলেন ‘বাংলাকেও সরকারি ভাষা হিসেবে গণ্য করতে হবে। ইংরেজী ও উর্দুর সঙ্গে বাংলাকেও সরকারি ভাষা করা হোক। ২৩ শে ফেব্রুয়ারি অধিবেশনের উদ্বোধনী পর্যায়ে তিনি এই দৃষ্টি আকর্ষনী প্রস্তাব রাখেন। যে কারণে প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী ও মুখ্যমন্ত্রী নাজিমুদ্দিনের সঙ্গে তাঁর সুসম্পর্কের মারাত্মক অবনতি ঘটে। নন্দিতনেতা শেখ মুজিবুর রহমান ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের এই প্রস্তাবের সমর্থনে সর্বস্তরে জনমত গঠনে কার্যকর ভূমিকা রাখেন। মুজিবের প্রচেষ্টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তখন ধীরেন্দ্রনাথ দত্তকে গণসংবর্ধনা দেওয়া হয়েছিল। তখনই ভাষা-আন্দোলন কমিটি গঠন করা হয়। ভাষা আন্দোলন কমিটির আহ্বানে ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ পূর্ববাংলায় ধর্মঘট ডাকা হয়। ধর্মঘটের সংবাদ পেয়ে মুজিব গোপালগঞ্জ থেকে ঢাকায় ছুটে আসেন। তিনি ১০ মার্চে এ্যাকশন কমিটির সভায় যোগদান করে ভাষা-আন্দোলনে সোচ্চার ভূমিকা নেওয়ার জন্য সকলকে উদাত্ত আহ্বান জানান। ১১ মার্চে এ্যাকশন কমিটির সভায় যোগ দিয়ে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখার জন্য শেখ মুজিবসহ ২০০ শত জন সত্যাগ্রহীকে কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি করে রাখা হয়। মুজিব কারাগারের অভ্যন্তরে বাঙালি অবাঙালিদের দ্বন্দ্ব অনুভব করেন। একজন অবাঙালি জেলা প্রশাসকের অস্বাভাবিক আচরণ ও দুর্বব্যহারে অতিষ্ঠ মুজিব প্রতিবাদী হয়ে ওঠেন। ঘটনাটি ক্রমাগত বিরূপ আকারে রূপান্তরিত হয়। কারাবন্দিদের অনেকইে মুজিবকে আগে কখনও দেখেনি। কিন্তু মুজিবের দৃঢ় নেতৃত্বের প্রতি তাদের নিখাদ আনুগত্য ও গভীর শ্রদ্ধাবোধ ছিল। হঠাৎ একজন বাঙালি কারারক্ষী এসেই ঘটনার স্রোত অন্যধারায় প্রবাহিত করেন। এ ঘটনা ঘটার পরবর্তী পর্যায় ১৬ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এর ফজলুল হক হলে এক ছাত্রসভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় মুজিব উপস্থিত হয়ে আসনে বসেই সভার কার্যক্রম পরিচালনায় বিন্দুমাত্র কাল বিলম্ব করেননি। অথচ ওই সভাস্থলে মুজিবের সভাপতিত্ব করার বিষয় পূর্ব নির্ধারিত ছিল না। মুজিব তাৎক্ষণিকভাবে ভাবলেন এই সংকটময় মূহুর্তে হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রীষ্টান বাংলাভাষী  মানুষের ঐক্য রক্ষার মধ্য দিয়ে সর্বস্তরের মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় ভাষা আন্দোলনকে আরো তীব্রতর করে তুলতে হবে। নইলে সিংহভাগ মানুষের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বৃহত্তর আন্দোলন বিফল হবে। সভাপতি যদি সভা নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হয় তা হলে ব্যাপক বিপত্তি ঘটবে। অনাগত দিনের আন্দোলন থমকে যাবে। দূরদর্শী মুজিব ওই সভায় বিস্তৃত আলোচনায় বিরতী দিয়ে রাষ্ট্রের সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। পূর্ব বাংলার ভবিষ্যতের পরিণতি ও রাষ্ট্রনায়কের আক্রোশের প্রসঙ্গ তুলে ধরে বিশদ আলোচনার মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। সেই সভায় তিনটি প্রস্তাব গৃহীত হয়। (১) ঢাকা এবং অন্যান্য জেলায় পুলিশি অত্যাচারের বাড়াবাড়ি খতিয়ে দেখতে একটি অনুসন্ধান কমিটি গঠন করা। (২) পূর্ববাংলার ব্যবস্থা পরিষদে বাংলাভাষাকে অন্যতম একটি রাষ্ট্রভাষা হিসেবে মর্যাদা দেওয়ার সুপারিশ করা। (৩) যদি পরিষদ প্রস্তাব দু’টিকে কার্যকর করতে ব্যর্থ হয় তাহলে পূর্ববঙ্গ সরকারের মন্ত্রীসভায় সকল সদস্যকে একযোগে পদত্যাগ করতে হবে। প্রস্তাব গ্রহণের পরেই মুজিব, ‘সবাই বিধান সভায় চলুন’ বলে সভার সমাপ্তি টানেন। উপস্থিত সবাই  মুজিবের সাহসী পদক্ষেপ ও যুক্তিপূর্ণ সিদ্ধান্ত মেনে নেন এবং তাকে অনুসরণ করেন। সরকারের স্বৈরাচারি মনোভাবের বিরুদ্ধে এবং বাংলাভাষার মর্যাদা রক্ষার দাবিতে স্লোগান দিতে দিতে প্রতিবাদ মুখর মিছিল এগিয়ে চলে। ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিবাদী মানুষের মিছিল যত এগিয়ে যেতে থাকে পথে পথে ততই বাড়তে থাকে সংগ্রামী মানুষের অংশগ্রহণ। ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ, মেডিকেল কলেজ ও বিধানসভার মোড়ে পুলিশি হামলায় মিছিল ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা করলে খন্ডযুদ্ধ হয়। আইয়ুব খানের সক্রিয় সহায়তায় নাজিমুদ্দিন পালিয়ে যান। তিনি ছাত্রদের মুখোমুখি হতে সাহস পাননি। তার ধারণা ছিল শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে যুক্তিতর্কে তিনি নিশ্চিত হেরে যাবেন। এমনকি তাঁর কাছে তার কোনো অজুহাতই ধোপে টিকবে না।

অন্যদিকে ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে ২১ মার্চ সমাবেশে এবং ২৪ মার্চে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলে আয়োজিত সমাবর্তন অনুষ্ঠানে জিন্নাহ সাহেব বললেন ‘আমি আপনাদের সকলের কাছে স্পষ্ট করে বলতে চাই, রাষ্ট্রভাষা হিসেবে আমাদের দেশে একমাত্র উর্দুই চলবে, অন্য কোনো ভাষা নয়। যে কেউ এ নিয়ে আপনাদের ভুলপথে পরিচালিত করবে, তারা পাকিস্তানের শত্রু।’ জিন্নাহ কিন্তু এই ভাষণটি পূর্ণ ইংরেজি ভাষায় দিয়েছেন। কারণ তিনিও ভালো উর্দুভাষা বলতে পারতেন না। নির্ভীক ভাষাসৈনিক মুজিব শুধু ভাষা-আন্দোলনেই নয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও কর্মীদের উন্নত বেতন কাঠামো এবং নিয়োগসহ অন্যান্য ক্ষেত্রে অমুসলিমদের সম্মান ও সমমর্যাদা সুযোগ সুবিধা প্রদানের দাবি নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় কতৃপক্ষের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করলে ছাত্রসমাজসহ শিক্ষক এবং অন্যান্য মহলেও মুজিবের মূল্যায়ন বহুগুণ বেড়ে যায়। কর্তৃপক্ষ কতৃক গৃহীত চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত অমান্য করায় শেখ মুজিবুর রহমানসহ বেশ কয়েকজন সহকর্মীকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করা হয়। বহিষ্কৃতদের অনেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কতৃপক্ষের কাছে বন্ড দিয়ে শাস্তি মকুব করায়। চিরউন্নত শির শেখ মুজিব শর্ত স্বাক্ষরের মাধ্যমে কখনও কারো কাছে করুণা চাননি। তিনি তখন ভাষা-আন্দোলনকে আরো গতিশীল করার জন্য আন্দোলনের যাবতীয় কার্যক্রম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চত্ত্বরের বাইরে থেকে পরিচালনা করেন। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠির রোষানলে পুড়ে মুজিবকে আবার কারাবরণ করতে হয়। এ কারণে দীর্ঘদিন তিনি ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি ছিলেন।

১৯৪৯ সালে আরমানিটোলা মাঠে আওয়ামী লীগ আয়োজিত সভা হয়। উক্ত সভায় সভাপতিত্ব করেন লীগের সভাপতি মওলানা ভাসানী। বিরাজমান দূর্ভিক্ষ এবং খাদ্য সংকটের প্রতিবাদে আহুত সভায় মওলানা ভাসানী ছাড়াও বক্তব্য প্রদান করেন শেখ মুজিবসহ আরো অনেক নেতৃবৃন্দ। একদিকে ভাষা-আন্দোলন, অন্যদিকে ক্ষুধার আগুনে দগ্ধ দারিদ্র অবস্থার অবসান ঘটাতে আন্দোলন আরো তীব্র থেকে তীব্রতর হয়ে ওঠে। সভা সমাবেশের শেষে মিছিল নিয়ে বের হওয়ার কারণে মিছিলের অগ্রভাগে থাকা সভাপতি মওলানা ভাসানী, সহ-সভাপতি শেখ মুজিবুর রহমান ও সাধারণ সম্পাদক শামসুল হকসহ আরো কয়েকজনকে পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে গ্রেফতার করে।

১৯৫২ সালের ২৭ শে ফেব্রুয়ারি ফরিদপুর কারাগার থেকে শেখ মুজিব মুক্তি পান। তৎকালীন পূর্ববাংলার সার্বিক পরিস্থিতিতে মুজিব বাইরে থাকলে ভাষা-আন্দোলনকে ক্রমাগত তীব্রতর করে তুলবে, তাতে সরকারের সমস্যা আরও বাড়বে এমন চিন্তা-ভাবনায় মুজিবকে গ্রেফতার করে। তারপর জনসাধারণের প্রচন্ড চাপের মুখে তাকে মুক্তি দিতেও বাধ্য হয়। ৫২’র ভাষা-আন্দোলনের জাগ্রত চেতনা বুকে ধরে দৃপ্ত পদক্ষেপে মুজিব ক্রমশ সামনে এগিয়ে চলেন। তাঁর সুযোগ্য নেতৃত্বে ৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ হয় এবং বাংলাদেশ নামে একটি জাতিরাষ্ট্রের জন্ম হয়। ৫২ থেকে ৭১। অতঃপর ৭৫ পর্যন্ত শেখ মুজিবুর রহমানের সংগ্রামী জীবনের বহুমাত্রিক কর্মকান্ড বাঙালি জাতির অমূল্য সম্পদ। এমন কী জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রেসকোর্স ময়দানে ৭ মার্চে যে ঐতিহাসিক ভাষণ দিয়েছেন সে ভাষণ এখন বিশ্বপ্রামান্য দলিল হিসেবে জাতিসংঘের ইউনেস্কো কর্তৃক স্বীকৃত।

ভাষা-আন্দোলনে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক অবদানের

পর্যায়ক্রমিক তথ্য তুলে ধরা হলো।

১৯৪৭ সালের ৬ ও ৭ সেপ্টেম্বর ঢাকায় অনুষ্ঠিত পূর্ব পাকিস্তানের কর্মী সম্মেলনে গণতান্ত্রিক যুবলীগ গঠিত হয়। উক্ত সম্মেলনে ভাষাবিষয়ক কিছু প্রস্তাব গৃহীত হয়। এ প্রসঙ্গে গাজীউল হক বলেন, ‘সম্মেলনের কমিটিতে গৃহীত প্রস্তাবগুলো পাঠ করলেন সেদিনের ছাত্রনেতা শেখ মুজিবুর রহমান। ভাষা সম্পর্কিত প্রস্তাব উত্থাপন করে তিনি বললেন, ‘পূর্ব পাকিস্তান কর্মী সম্মেলন প্রস্তাব করিতেছে যে, বাংলা ভাষাকে পূর্ব পাকিস্তানের লেখার বাহন ও আইন আদালতের ভাষা করা হউক। সমগ্র পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা কি হইবে তৎসম্পর্কে আলাপ-আলোচনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ভার জনসাধারণের ওপর ছাড়িয়া দেওয়া হউক। এবং জনগণের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলিয়া গৃহীত হউক।’ এভাবেই ভাষার দাবি প্রথমে উচ্চারিত হয়েছিল। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ভারত থেকে তৎকালীন পূর্ব বাংলায় প্রত্যাবর্তন করার পর সরাসরি ভাষা আন্দোলনে শরীক হন। ভাষা আন্দোলনের শুরুতে তমুদ্দুন মজলিসের রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন সংক্রান্ত কার্যক্রমে তিনি অংশগ্রহণ করেন। বঙ্গবন্ধুর প্রথম জীবনীকার অধ্যাপক ড. মযহারুল ইসলাম এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘শেখ মুজিবুর রহমান এই মজলিসকে রাষ্ট্রভাষা সংক্রান্ত বহুকাজে সাহায্য ও সমর্থন করেন’।  তিনি ১৯৪৭ সালে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের সঙ্গে বাংলা ভাষার দাবির সপক্ষে স্বাক্ষর সংগ্রহ অভিযানে অংশগ্রহণ করেন এবং বিভিন্ন মিটিং মিছিলে অংশগ্রহণ করেন। ১৯৪৭ সালের ৫ ডিসেম্বর খাজা নাজিমুদ্দিনের বাসভবনে মুসলিম লীগ ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠকে চলাকালে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে অনুষ্ঠিত মিছিলে অংশগ্রহণ করেন এবং নেতৃত্বদান করেন। ১৯৪৭ সালের ডিসেম্বর মাসে সমকালীন রাজনীতিবিদসহ ১৪ জন ভাষাবীর সর্বপ্রথম ভাষা-আন্দোলনসহ অন্যান্য দাবি সংবলিত ২১ দফা দাবি নিয়ে একটি ইস্তেহার প্রণয়ন করেছিলেন। ওই ইস্তেহারে ২১ দফা দাবির মধ্যে দ্বিতীয় দাবিটি ছিল রাষ্ট্রভাষা সংক্রান্ত। ঐতিহাসিক এই ইস্তেহারটি একটি ছোট পুস্তিকা আকারে প্রকাশিত হয়েছিল যার নাম ‘রাষ্ট্রভাষা-২১ দফা ইস্তেহার- ঐতিহাসিক দলিল।’ উক্ত পুস্তিকাটি ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে একটি ঐতিহাসিক প্রামাণ্য দলিল হিসেবে স্বীকৃত। এই ইস্তেহার প্রণয়নে শেখ মুজিবুর রহমানের অবদান ছিল অনস্বীকার্য এবং তিনি ছিলেন অন্যতম স্বাক্ষরদাতা। ১৫০নং মোগলটুলীর ‘ওয়ার্কাস ক্যাম্প’ ছিল সে সময়ের প্রগতিশীল ছাত্র-যুবক ও রাজনৈতিক কর্মীদের মিলন কেন্দ্র। ওয়ার্কাস ক্যাম্পের কর্মীরা বাংলা ভাষাসহ পাকিস্তানের অন্যান্য বৈষম্যমূলক দিকগুলো জাতির সামনে তুলে ধরেন। ভাষা-আন্দোলনের সপক্ষের কর্মীবাহিনী এখানে নিয়মিত জমায়েত হত এবং বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার নানা কর্ম পরিকল্পনা এখানেই নেয়া হতো। শেখ মুজিব, শওকত আলী, কামরুদ্দিন আহমদ প্রমুখ নেতৃবৃন্দ ছিলেন এই ক্যাম্পের প্রাণশক্তি।

১৯৪৮ সালের ১৬ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায় ভাষা আন্দোলনকে বেগবান করার লক্ষ্যে এক সাধারণ ছাত্রসভা অনুষ্ঠিত হয়। সভা শেষে পূর্ববাংলা আইন পরিষদ ভবন অভিমুখে এক মিছিল বের হয়। ওই সভায় সভাপতিত্ব করেন সদ্য কারামুক্ত নেতা শেখ মুজিবুর রহমান। ১৯৫২ সালে ভাষা-আন্দোলনের বিস্ফোরণ পর্বে শেখ মুজিব কারাবন্দি ছিলেন। ব্যক্তিগতভাবে রাজনৈতিক ময়দানে অনুপস্থিত থাকলেও জেলে বসেও নিয়মিত আন্দোলনকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন এবং প্রয়োজনীয় নির্দেশ প্রদান করতেন। এ প্রসঙ্গে ভাষাসৈনিক গাজীউল হক তাঁর স্মৃতিকথায় লিখেছেন- ‘১৯৪৯ সালের অক্টোবর মাসে গ্রেপ্তার হওয়ার পর জনাব শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বিভিন্ন  জেলে আটক ছিলেন। ফলে স্বাভাবিক কারণেই ’৫২ সালে ভাষা আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করা জনাব শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে সম্ভব ছিল না। তবে জেলে থেকেই তিনি আন্দোলনের নেতৃবৃন্দের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলতেন এবং বিভিন্ন বিষয়ে পরামর্শ দিতেন।’  ভাষাসৈনিক, প্রখ্যাত সাংবাদিক আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী ‘একুশকে নিয়ে কিছু স্মৃতি, কিছু কথা’ প্রবন্ধে লিখেছেন :  ‘শেখ মুজিব ১৯৫২ সালের  ফেব্রুয়ারি মাসের ১৬ তারিখ ফরিদপুর  জেলে যাওয়ার আগে ও পরে ছাত্রলীগের একাধিক  নেতার কাছে চিরকুট পাঠিয়েছেন।’

জাতীয় নেতা শহীদ  সোহরাওয়ার্দী ১৯৫২ সালের ভাষা-আন্দোলনে বিপক্ষে অবদান নিয়েছিল। তিনি উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে বিবৃতি  দেন।  সোহরাওয়ার্দী এই অবস্থানে দৃঢ় থাকলে ভাষা-আন্দোলনে অনেক ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারত। কিন্তু  শেখ মুজিবুর রহমান  সোহরাওয়ার্দীর এই মত পরিবর্তনে সহায়ক ভূমিকা পালন করেন এবং বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে তাঁর সমর্থন আদায় করেন। এই প্রসঙ্গে তিনি নিজেই বলেন, ‘ সে সময় শহীদ সোহরাওয়ার্দীর ভাষা সংক্রান্ত বিবৃতি প্রকাশিত হওয়ার পর আমরা  বেশ অসুবিধায় পড়ি। তাই ঐ বছর জুন মাসে আমি তার সঙ্গে  দেখা করার জন্য করাচি যাই এবং তার কাছে পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে বাংলার দাবির সমর্থনে তাকে একটি বিবৃতি দিতে বলি।

১৯৫৩ সালে একুশের প্রথম বার্ষিকী পালনেও বঙ্গবন্ধুর যথেষ্ট ভূমিকা ছিল।  সে দিন সব আন্দোলন, মিছিল এবং নেতৃত্বের পুরোভাগে ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। আরমানিটোলা ময়দানে অনুষ্ঠিত জনসভায় তিনি সেদিন একুশে  ফেব্রুয়ারিকে শহীদ দিবস হিসেবে  ঘোষণা  দেয়ার আহ্বান জানান এবং অবিলম্বে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি জানান। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট সরকারের একজন মন্ত্রী হিসেবে শেখ সাহেব সমকালীন রাজনীতি এবং বাংলা ভাষার উন্নয়নে অবদান রাখেন। পরবর্তীকালেও শেখ মুজিব বাংলাভাষা ও তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিদের অধিকারের সেই একই দাবি ও কথাগুলো আরো বর্ধিত উচ্চারণে জাতির সামনে তুলে ধরতে সক্ষম হন। ১৯৭৪ সালের ২৫  সেপ্টেম্বর জাতিসংঘে বাংলাভাষায় ভাষণ দিয়ে  যে ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছেন, তা ইতিহাসের পাতায় চিরদিন অমলিন হয়ে থাকবে। বিশ্বসভায় বাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার এটাই ছিল প্রথম সফল উদ্যোগ। ১৯৫৬ সালের ১৭ জানুয়ারি মাসে অনুষ্ঠিত আইন পরিষদের অধিবেশনে বঙ্গবন্ধু সংসদের দৈনন্দিন কার্যসূচি বাংলা ভাষায় মুদ্রণ করার দাবি জানান। একই সালের ৭  ফেব্রুয়ারির অধিবেশনে তিনি খসড়া শাসনতন্ত্রের অন্তর্গত জাতীয় ভাষা সংক্রান্ত প্রশ্নে তিনি বলেছিলেন, ‘পূর্ববঙ্গে আমরা সরকারি ভাষা বলতে রাষ্ট্রীয় ভাষা বুঝি না। কাজেই খসড়া শাসনতন্ত্রে রাষ্ট্রের ভাষা সম্পর্কে যে সব শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে তা হুকুম তলবে করা হয়েছে। পাকিস্তানের জনগণের শতকরা ৫৬ ভাগ লোকই বাংলা ভাষায় কথা বলে, এ কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, রাষ্ট্রীয় ভাষার প্রশ্নে  কোনো  ধোঁকাবাজি করা যাবে না। পূর্ববঙ্গের জনগণের দাবি এই  যে, বাংলাও রাষ্ট্রীয় ভাষা হোক। ১৬  ফেব্রুয়ারি তারিখের আইন সভার অধিবেশনেও তিনি বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি জানান। ১৯৭৫ সালের ১২ মার্চ রাষ্ট্রপতি থাকাকালীন বঙ্গবন্ধু  শেষ মুজিবুর রহমান অফিসের কাজে বাংলাভাষা প্রচলনের প্রথম সরকারি নির্দেশ জারি করেন। রাষ্ট্রপতি  শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক জারিকৃত এক আদেশে বলা হয়, “গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের রাষ্ট্রভাষা বাংলা। বাংলা আমাদের জাতীয় ভাষা। তবুও অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে লক্ষ্য করছি  যে, স্বাধীনতার তিন বছর পরও অধিকাংশ অফিস আদালতে মাতৃভাষার পরিবর্তে বিজাতীয় ইংরেজি ভাষায় নথিপত্র  লেখা হচ্ছে। মাতৃভাষার প্রতি যার ভালোবাসা  নেই,  দেশের প্রতি  যে তাঁর ভালোবাসা আছে এ কথা বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়। দীর্ঘ তিন বছর অপেক্ষার পরও বাংলাদেশের বাঙালি কর্মচারীরা ইংরেজি ভাষায় নথি লিখবেন সেটা অসহনীয়। এ সম্পর্কে আমার পূর্ববর্তী নির্দেশ সত্ত্বেও এ ধরনের অনিয়ম চলছে। আর এ উচ্ছঙ্খলতা চলতে  দেয়া  যেতে পারে না।

১৯৭১ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন আওয়ামী লীগ সভাপতি বঙ্গবন্ধু  শেখ মুজিবুর রহমান বাংলা একাডেমিতে একটি সভায় বক্তৃতা দিতে গিয়ে বলেন, ‘ভাষা-আন্দোলনের শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করে আমি  ঘোষণা করছি, আমার দল ক্ষমতা গ্রহণের দিন  থেকেই সকল সরকারি অফিস আদালত ও জাতীয় জীবনের অন্যান্য ক্ষেত্রে বাংলা চালু হবে। এ ব্যাপারে আমরা পরিভাষা সৃষ্টির জন্য অপেক্ষা করব না। কারণ তাহলে সর্বক্ষেত্রে  কোনোদিনই বাংলা চালু করা সম্ভবপর হবে না। এ অবস্থায় হয়তো কিছু কিছু ভুল হবে কিন্তু তাতে কিছু যায় আসে না, এভাবেই অগ্রসর হতে হবে। ১৯৭২ সালের সংবিধানে তিনি বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে গ্রহণ করেন। এটাই ছিল পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথম বাংলা ভাষায় প্রণীত সংবিধান। বাংলাদেশের স্বাধীনতা লাভের মূল নায়ক ও স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেছেন, ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব ভাষা-আন্দোলনেরই সুদুর প্রসারী ফলশ্রুতি” (দৈনিক সংবাদ, ২১ ফেব্রুয়ারি, ১৯৭৫)। এটা ঐতিহাসিক সত্য  যে, বাংলা ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার এই ধারাবাহিক আন্দোলনের পথ ধরেই এসেছে আমাদের প্রাণপ্রিয় স্বাধীনতা। আন্দোলনের শুরু থেকে  শেষ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু  শেখ মুজিবুর রহমান মহান স্থপতির ভূমিকা পালন করে আমাদের একটি স্বাধীন জাতি হিসেবে পৃথিবীর বুকে আত্মপ্রকাশের সুযোগ করে দিয়েছেন। ‘বাংলাদেশ’ নামের এ ভূখন্ডের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে বঙ্গবন্ধুর অবদানকে ঐতিহাসিক প্রয়োজনেই স্বীকার করতে হবে।

বঙ্গবন্ধু কীভাবে ভাষা-আন্দোলনের সাথে সম্পৃক্ত হয়েছেন, এ প্রসঙ্গে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক গবেষক মুনতাসীর মামুন রচিত ‘বঙ্গবন্ধু কীভাবে আমাদের স্বাধীনতা এনেছিলেন’ গ্রন্থ পাঠে জানা যায়। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধুর আমন্ত্রণে আরও অনেকের সাথে অন্নদাশঙ্কর রায় ঢাকা আসেন। কথা হয় বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে। অন্নদাশঙ্কর রায় লেখেন: ‘ শেখ সাহেবকে আমরা প্রশ্ন করি, ‘বাংলাদেশের আইডিয়াটি প্রথম কবে আপনার মাথায় এল?’ ‘শুনবেন?’ তিনি (বঙ্গবন্ধু) মুচকি  হেসে বললেন, ‘ সেই ১৯৪৭ সালে। আমি সুহরাবর্দী (সোহরাওয়ার্দী) সাহেবের দলে। তিনি ও শরৎচন্দ্র বসু চান যুক্তবঙ্গ। আমিও চাই সব বাঙালীর এক দেশ।… দিল্লী  থেকে খালি হাতে ফিরে এলেন সুহরাবর্দী ও শরৎ বোস। কংগ্রেস বা মুসলিমলীগ  কেউ রাজী নয় তাঁদের প্রস্তাবে।… তখনকার মতো পাকিস্তান  মেনে নিই। কিন্তু আমার স্বপ্ন  সোনার বাংলা।… হঠাৎ একদিন রব উঠল, আমরা চাই বাংলাভাষা। আমিও ভিড়ে যাই ভাষা আন্দোলনে। ভাষাভিত্তিক আন্দোলনকেই একটু একটু করে রূপ দিই  দেশভিত্তিক আন্দোলনে। পরে এমন একদিন আসে  যেদিন আমি আমার দলের  লোকদের জিজ্ঞেস করি, আমাদের  দেশের নাম কী হবে?  কেউ বলে, পাক বাংলা। কেউ বলে, পূর্ব বাংলা। আমি বলি, না বাংলাদেশ। তারপর আমি  শ্লোগান দিই, ‘জয়বাংলা’।… ‘জয় বাংলা’ বলতে আমি  বোঝাতে  চেয়েছিলুম বাংলা ভাষা, বাংলাদেশ ও বাঙালী জাতির জয় যা সাম্প্রদায়িতকার উর্ধ্বে।

৪ মার্চ ঢাকা  জেলা  গোয়েন্দা তথ্যে বলা হয়, ‘ শেখ মুজিবুর রহমানসহ যারা মুসলিম ছাত্রলীগ গঠনে কাজ করেছে তারাই বাংলাকে পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে লিফলেট ছড়াচ্ছে।’ [ভলিউম-১, পৃষ্ঠা ৭]

৩ মার্চ  গোপালগঞ্জে  শেখ মুজিবুর রহমান ও অন্যান্য নেতৃবৃন্দ ছাত্রদের সম্মেলনে বাংলা ভাষার অধিকার নিয়ে কথা বলেন। গোপন নথিতে এ সম্পর্কে বলা হচ্ছে: Sheikh Mujibur Rahman & other leaders delivered speeches in a meeting of the students over the Language Movement, which was held at the premises of the court mosque, Gopalganj on 3.3.1948. [ভলিউম-১, পৃ ৩৪০]

[DIO, IBEB, Dacca submitted a report containing the particulars of the members of the provisional organizing committee of EPMSL including the name of Sheikh Mujibur Rahman, who was one of the signatories of the leaflet which advocated Bengali to be the State Language of Pakistan. (Secret Documents of Intelligence Branch (IB) on Father of the Nation Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman, V-1, page-7)]

১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে সর্বাত্মক সাধারণ ধর্মঘট পালিত হয়। এই ধর্মঘট সফল করতে ১ মার্চ, ১৯৪৮ তারিখে প্রচার মাধ্যমে একটি বিবৃতি প্রকাশিত হয়েছিল। বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেন অধ্যাপক আবুল কাসেম, সম্পাদক তমদ্দুন মজলিস, শেখ মুজিবুর রহমান, কাউন্সিলের সদস্য, পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম লীগ, নঈমুদ্দীন আহমদ আহ্বায়ক, পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ, এবং আবদুর রহমান চৌধুরী দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া যুব সম্মেলনে পাকিস্তানি প্রতিনিধিদলের নেতা জাতীয় রাজনীতি ও রাষ্ট্রভাষা-আন্দোলনের ইতিহাসে এ বিবৃতির গুরুত্ব অপরিসীম। এই ধর্মঘট পালনের আগের রাতে অর্থাৎ ১০ মার্চ রাতে ফজলুল হক হলে দিনটির কর্মসূচি নিয়ে একসভা বসে। পাকিস্তানি  গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে:

Secret information was received on 12.3.48 that the subject (Sheikh Mujibur Rahman) along with others took part in the discussions held at Fazlul Haq Hall on 10.3.48 and gave opinion in favour of violating section 144 cr.p.c. on 11.3.48.

১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে পালিত এই ধর্মঘটটি ছিল ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে প্রথম সফল ধর্মঘট। এই ধর্মঘটে বঙ্গবন্ধু নেতৃত্ব প্রদান করেন এবং পুলিশি নির্যাতনের শিকার হয়ে গ্রেপ্তার হন। পাকিস্তানি  গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে:

[IB report on Sheikh Mujinur Rahman, who was arrested on 11.3.1948… This subject (Sheikh Mujibur Rahman) was arrested on 11.3.48 for violating the orders…He took very active part in the agitation for adopting Bengali as the State language of Pakistan, and made the propaganda at Dacca for general strike on 11.3.48 on this issue. (Secret Documents of Intelligence Branch (IB) on Father of the Nation Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman, V-1, page-7)]

দিনটি নিয়ে ‘কারাগারের রোজনামচা’য় বঙ্গবন্ধু বলেন: ‘প্রথম ভাষা আন্দোলন শুরু হয় ১১ই মার্চ ১৯৪৮ সালে। পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ (এখন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ) ও তমদ্দুন মজলিসের  নেতৃত্বে। ঐদিন ১০ টায় আমি, জনাব শাসমুল হক সাহেবসহ প্রায় ৭৫ জন ছাত্র  গ্রেপ্তার হই এবং আবদুল ওয়াদুদ-সহ অনেকেই ভীষণভাবে আহত হয়ে  গ্রেপ্তার হয়।’ [কারাগারের  রোজনামচা, বাংলা একাডেমি, পৃষ্ঠা ২০৬]

ভাষাসৈনিক অলি আহাদ তাঁর ‘জাতীয় রাজনীতি ১৯৪৫ থেকে ১৯৭৫’ গ্রন্থে লিখেছেন: ‘আন্দোলনে অংশগ্রহণ করার নিমিত্তে শেখ মুজিবুর রহমান  গোপালগঞ্জ হতে ১০ মার্চ ঢাকায় আসেন।’ ১১ মার্চের হরতাল কর্মসূচিতে যুবক  শেখ মুজিব এতটাই উৎসাহিত হয়েছিলেন  যে, এ হরতাল ও কর্মসূচি তার জীবনের গতিধারা নতুনভাবে প্রবাহিত করে। মোনায়েম সরকার সম্পাদিত বাংলা একাডেমি কর্তৃক প্রকাশিত ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান : জীবন ও রাজনীতি’ শীর্ষক গ্রন্থে লিখেছেন, ‘স্বাধীন পাকিস্তানের রাজনীতিতে এটিই তাঁর প্রথম  গ্রেপ্তার।’ শেখ মুজিবুর রহমানের  গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে ১৬ এপ্রিল গোপালগঞ্জে সর্বাত্মক হরতাল ডাকা হয়। এ নিয়ে ৩ এপ্রিল  গোয়েন্দাদের  দেওয়া এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৫ মার্চ  গোপালগঞ্জে প্রায় চারশ ছাত্র বিক্ষোভ করে। তারা  সেই বিক্ষোভ  থেকে ১৬ তারিখে শহরে দিনব্যাপী হরতাল ডাকে। তারা  শেখ মুজিবুরের মুক্তির দাবিতে এবং বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে  স্লোগান  দেয়। [ভলিউম-১, পৃ ৮-৯]

[Extract from WCR of SP office, Faridpur, where it was mentioned that a complete hartal was announced at Gopalganj town on 16.3.1948 as a mark of protest against the arrest of Sheikh Mujibur Rahman. (Secret Documents of Intelligence Branch (IB) on Father of the Nation Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman, V-1, page-8)]

এই অংশে বিবৃতির নিচে ‘সাইড  নোট’ লিখে  ফের বলা হচ্ছে: Was Muzibar Rahman arrested in Dacca city in connection with the language controversy? Why did the Gopalganj students take up his cause? Ask Faridpur to clarify the latter point., Sd. S.K.G, 16/17.4.38

১৯৪৮ সালের ১৬ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায় ভাষা আন্দোলনকে বেগবান করার লক্ষ্যে এক সাধারণ ছাত্রসভা অনুষ্ঠিত হয়। সভা শেষে পূর্ব-বাংলা আইন পরিষদ ভবন অভিমুখে এক মিছিল বের হয়। ওই সভায় সভাপতিত্ব করেন সদ্য কারামুক্ত নেতা শেখ মুজিবুর রহমান। এ প্রসঙ্গে তাজউদ্দীন আহমদ লিখেছেন: ‘বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে  বেলা  দেড়টায় সভা শুরু হলো। মুজিবুর রহমান সভাপতিত্ব করলেন। সংশোধনীগুলি গৃহীত হলো এবং অলি আহাদের মাধ্যমে তা প্রধানমন্ত্রীর কাছে পাঠানো হলো। [তাজউদ্দীন আহমদের ডায়েরি ১৯৪৭-১৯৪৮, প্রথম খন্ড, পৃষ্ঠা ২৩০]

বঙ্গবন্ধুর ‘কারাগারের  রোজনামচা’  গ্রন্থ পাঠে জানা যায় ‘১৬ ই মার্চ আবার বিশ্ববিদ্যালয় আমতলায় সভা হয়, আমি সেই সভায় সভাপতিত্ব করি। আবার বিকালে আইনসভার সামনে লাঠিচার্জ হয় ও কাঁদানে গ্যাস  ছোঁড়া হয়। প্রতিবাদের বিষয় ছিল, ‘নাজিমুদ্দীন সাহেবের তদন্ত চাই না, জুডিশিয়াল তদন্ত করতে হবে।’ [কারাগারের  রোজনামচা, পৃষ্ঠা ২০৬] ১৯৪৮ সালের ১৭ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায় পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের আহ্বানে নঈমুদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে একসভা অনুষ্ঠিত হয়।  সে সভায়  শেখ মুজিব অংশগ্রহণ করেন। ১৯৪৫  থেকে ১৯৭৫ অলি আহাদ। ‘১৭ তারিখ এ  দেশব্যাপী শিক্ষায়তনে ধর্মঘটের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয় এবং  সেই ধর্মঘট অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করে। ১৭ মার্চ সন্ধ্যার পর ফজলুল হক হলে ‘রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’র সভা অনুষ্ঠিত হয়, এই সভায়  শেখ মুজিবুর রহমান  যোগদান করেন। ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তে তিনি এ সভার উল্লেখ করেছেন।

১৯৪৯ সালের ৯ জানুয়ারি  গোপন দলিলের ২৭ নাম্বার ভুক্তিতে  দেখা যায়  শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক কার্যক্রমের কয়েকটি চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।  সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে, আদালতের ভাষা হিসেবে বাংলাকে গ্রহণ ও চালু করার বিষয়ে  শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর একাধিক ভাষণে  জোর দিয়েছেন।

[Addenda to the Brief history of Sheikh Mujibur Rahman, sent from SP, DIB Khulna to IBEB, Dacca, where a number of political activities of Sheikh Mujibur Rahman were mentioned. It was also reported that he delivered speeches demanding to adopt Bengali as court language…(Secret Documents of Intelligence Branch (IB) on Father of the Nation Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman, V-1, page-66)]

গোপন দলিলের ৪০ নাম্বার ভুক্তিতে উল্লেখ আছে, ১৯৪৯ সালের ১২ মার্চ সদরঘাট  থেকে প্রায় দুইশজন ছাত্রের অংশগ্রহণে একটি মিছিলের  নেতৃত্ব দিয়ে  শেখ মুজিবুর রহমান, দবিরুল ইসলাম ও কল্যাণ দাস গুপ্ত নওয়াবপুর  রোড হয়ে দুপুর ১২ টার সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক হলে আসেন। তার এক ঘণ্টা পরেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ছাত্র-ছাত্রীরা জমায়েত হয়।

গোপন নথিতে প্রতিবেদনটির শিরোনাম দেওয়া হয়েছে এভাবে: Report of a procession brought out Sheikh Mujibur Rahman at Nowabpur road & Sadarghat area on 12.3.1949. A meeting of students held at Dacca University ground. Nadira Begum & other student leaders spoke in the meeting. All of them delivered their speeches in support of Bengali as state Language… …[Secret Documents of Intelligence Branch (IB) on Father of the Nation Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman, V-1, page-101]

গোপন নথির ১৫৪ নাম্বার ভুক্তিতে ১৯৪৯ সালের ১০ ডিসেম্বর  শেখ মুজিবুর রহমানের সার্বিক রাজনৈতিক কর্মকান্ডের ওপর  গোয়েন্দা নজরদারির সারবস্তু তুলে ধরা হয়।  সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে: ‘He (Sheikh Mujibur Rahman) took a very active part in the agitation for adopting Bengali as the State language of Pakistan, and made propaganda at Dacca for general strike on 11.3.48. on this issue. On 11.3.48 the subject was arrested for violating orders under section 144 Cr. P.C. [Secret Documents of Intelligence Branch (IB) on Father of the Nation Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman, V-1, page-319]

বিংশ শতকের চল্লিশের দশকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার ‘সভ্যতার সংকট’ প্রবন্ধে লিখেছিলেন, ‘আজও আশা করে আছি পরিত্রাণ কর্তা আসবে সভ্যতার দৈববাণী নিয়ে, চরম আশ্বাসের কথা  শোনাবে পূর্ব দিগন্ত থেকেই।’ বাঙালির ভাগ্যাকাশে  সেই ত্রাণকর্তা হয়ে আবির্ভূত হয়েছিলেন হাজার বছরের  শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্র সৃষ্টির পর পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠী সচেতনভাবে বাঙালির কাছ  থেকে ভাষার অধিকার হরণ করতে  চেয়েছিল। তারা চেয়েছিল সংখ্যালঘু জনগণের ভাষা উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে চাপিয়ে দিতে। কিন্তু তাদের  সেই অপতৎপরতার বিরুদ্ধে গর্জে উঠেছিলেন বাঙালির স্বপ্নদ্রাষ্টা বঙ্গবন্ধু  শেখ মুজিবুর রহমান। এই মহাকালের মহামানব স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে তিনি বাংলা ভাষাকে বিশ্ব দরবারে তুলে ধরেছেন। লাখো শহিদের রক্তে রঞ্জিত ৫২,৭১,৭৫ এর মহানায়ক জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ইতিহাস বিকৃতির মহোৎসবের মাধ্যমে মুজিবকে আড়াল করার ব্যর্থ প্রচেষ্টা বহুবার ব্যর্থ প্রমানিত হয়েছে। স্বাধীনতার শীর্ষবিন্দু স্পর্শী বহুমাত্রিক বঙ্গবন্ধু অমর অক্ষয় কীর্তিতে, সুমধুর স্মৃতিতে, রক্তসিক্ত ইতিহাসে বাঙালির হৃদয়াসনে ছিলেন, আছেন এবং থাকবেন জন্মশতবর্ষের বিন¤্র শ্রদ্ধায় পুষ্পিত ভালোবাসায়। তিনি স্মরণীয় বরণীয়। বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ দীর্ঘজীবী হউক। ‘জয় বাংলা’

তথ্যসুত্র:

১. আবুল মোমেন, কালোত্তীর্ণ ভাষণ: ‘প্রস্তুতি ও প্রভাব’ শীর্ষক ঐতিহাসিক ৭ই মার্চ উপলক্ষে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেমোরিয়াল ট্রাস্ট কর্তৃক আয়োজিত সেমিনারে উপস্থাপিত প্রবন্ধ, ২০১৬

২. শামসুজ্জামান খান, বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ: একটি অনুপুঙ্খ পাঠ, বাংলা একাডেমি, ২০১৪-১৫, পৃষ্ঠা- ২২

৩. অজয় রায়, বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ, আমার অনিয়মিত ভাবনা (প্রবন্ধ) শামসুজ্জামান খান (সম্পাদিত), বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ বহুমাত্রিক বিশ্লেষণ’ বাংলা একাডেমি ২০১৪-১৫ পৃষ্ঠা ৩৪৫

৪. নির্মলেন্দু গুণ ‘স্বাধীনতা এই শব্দটি কীভাবে আমাদের হলো’ চাষাভূষার কাব্য (১৯৮১) (সংকলিত) কাকলী প্রকাশনী, ঢাকা ২০০০।

৫. শেখ মুজিবুর রহমান , অসমাপ্ত আত্মজীবনী, দি ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড, ঢাকা ২০১২: পৃষ্ঠা  ৮

৬. ১৯৭১ সালে ঐতিহাসিক ৭ই মার্চে রেসকোর্স ময়দানে  (সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) বঙ্গবন্ধুর প্রদত্ত ভাষণ

৭. Jacob F, fied. We shall fight on the Beaches. The speeches that Inspired Hitory. Michael O’mara Books Limited, London . 2013.

লেখক : কবি, প্রাবন্ধিক, শিশুসাহিত্যিক ও বঙ্গবন্ধু গবেষক।

ভালো লাগলে শেয়ার করে দিন :)

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x