ই-পেপার

SITE UNDER CONSTRUCTION
বাংলাদেশ পুলিশের মুখপত্র
অব্যাহত প্রকাশনার ৬৩ বছর

শাফিকুর রাহী

জন্মলগ্নেই যিনি গভীর অন্ধকারের ভেতর আলোর অন্বেষায়

দুঃসহ দুর্গম পথ অতিক্রমের অঙ্গীকার ঘোষণা করেন

জীবন সংগ্রামের অভিযাত্রায় এক অবিস্মরণীয় অপরিসীম ত্যাগের মহিমায়

মহাকাব্যের আয়োজন করলেন মহিমান্বিত আলোকবর্তিকায়।

এক অনন্যসাধারণ মহাকালের মহামানবের শুভ আগমনে শ্যামলিমা বঙ্গজননীর ছায়াঘেরা মায়াময় পল্লীর অজপাড়া গ্রামে বৃক্ষের ডালে বাতাসের নৃত্য আর পাখির কলকাকলিতে স্বাগত জানায়। মেঘলাকাশে হঠাৎ চন্দ্রিমা প্রভায়  জ্যোৎস্নার প্লাবনে আনন্দের সুরধারা বয়। পূর্ণিমার জোয়ারে বাংলা মায়ের দীর্ঘকালের দুঃখরা পালিয়ে যাওয়ার আয়োজনে ব্যস্ত-ভীষণ! ভয়ঙ্কর অন্ধকার যুগের অবসানের দারুণ মানবিক লাভায় বিস্ফারিত খোকা নামের এক মানবিক শিশু বেড়ে ওঠে জগৎজয়ের স্বপ্নও সম্ভাবনায়। ত্রিশের দশকে ব্রিটিশ আমলে এ উপমহাদেশীয় অঞ্চলে বাল্যবিয়ের রেওয়াজ ছিলো জায়েজ। শিশু-কিশোরের চড়–ইবাতি খেলার  আনন্দ আসরে নেচে ওঠার সময় আরেক মানবীয় শিশু-রেণুকে সঙ্গে পেয়েছিলেন কিশোর খোকা। অবুঝ মনে হেসে-খেলে বেড়ে ওঠার সে সুবর্ণ কালকে কেউ কি কখনো বুলতে পারে! না, মোটেও না । দু’জন মহৎপ্রাণ মানুষের নির্বিরোধ-সুখ-স্বপ্নে বেড়ে ওঠার মানবিক জীবনগাথা নিয়ে আজো কোনো মহাকাব্য রচিত হয়নি, নির্মিত হয়নি কোনো চলচ্চিত্রও। ভবিষ্যতে হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।  সে শুভ  আলামত লক্ষণীয় বর্তমান প্রজন্মের মেধাবি বীর তারুণ্যের সৃজনশীল কর্মপ্রয়াসে।

আগামী প্রজন্মের মননশীল তারুণ্য সত্যকে আবিষ্কারের মনোউদ্দীপনায় কিংবা নিজেকে জানার আগ্রহ সৃষ্টি আমাকে প্রাণিত করে। বঙ্গমাতার অদমনীয় অদ্ভুত- কর্মপ্রায়াসে লক্ষ্য করা যায় তিনি কতোটা বিচক্ষণও সুদূরপ্রসারি উপদেশ দিয়েছেন বঙ্গবন্ধুকে। বঙ্গবন্ধুর মহান আদর্শে বীর বাঙালি আবার ঐক্যবদ্ধভাবে জেগে উঠলে ব্যাপক বৈষম্য দুর্নীতি দুর্বৃত্তয়ানের পথ রুদ্ধ হবে বলে আমার ধারণা। মানবসভ্যতার আদিকাল কিংবা মধ্যযুগের বিবর্তনের ইতিহাস পাঠে জানা যায় কীভাবে মানুষ ধীরে ধীরে প্রাগৈতিহাসিক অন্ধকার  যুগের শেকল ভেঙে প্রাগরসর হওয়ার দৃঢ় সংকল্পে প্রতীজ্ঞাবন্ধ হলেন। মানুষ ক্রমাগত জ্ঞান অর্জনের মধ্যদিয়ে নিজেকে আবিষ্কারে ব্রতি গ্রহণ করলেন। সে রেনেসাঁ যুগের আলোর দিশারীদের পথচলায় জানা যায় মানুষের কোনো বাধা মানা না মানার প্রগতিশীল চিন্তা-চেতনায় শুভ বুদ্ধির গভীর অন্বেষণে নিজেকে নিয়োজিত  রেখে এগিয়ে চলা। মানুষের চিন্তাশক্তিধারা প্রবর্তিত হয় আঁধার ভেঙে আলোর অভিযাত্রী হওয়ার বিপুল সম্ভাবনা তো মানুষই তৈরি করেছে। মানুষ জ্ঞান অর্জনের ভেতর দিয়ে বিকশিত জীবন-জীবিকার তাগিতে দুঃসহ অভিযানের গৌরব রচনার ইতিহাস অনেকেরই জানা। সে নবদিগন্ত উন্মোচনে দূরদৃষ্টিসম্পূর্ণ কালজয়ী মানুষের আগমনে সুচিত হয়েছে নতুন দিনের  সোনালি ভোর।

আজকের লেখার বিষয় ‘বঙ্গবন্ধু-বঙ্গমাতা বাংলাদেশ’ মহীয়সী নারী বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেসা মুজিবের অসামান্য কীর্তিগাথা এ জাতিরাষ্ট্রের লোকজনদের আজো সেভাবে জানার সুযোগ হয়নি।  কিংবা অনেকেই হয়তো জানার চেষ্টাও করেন না । বঙ্গবন্ধু এখন বিশ্বমানবতার অমূল্য সম্পদ এমনটি ভাবতেই আনন্দে গর্বে মনভরে ওঠে। আর বঙ্গবন্ধুর ইহ-পরকালের সবচে বিশ্বস্ত ও পরম আপনজন তাঁরই সহধর্মিণী বেগম ফজিলাতুন্নেসা মুজিব আজো বিশ্বব্যাপী সেভাবে আলোচিত আলোড়ন সৃষ্টি করতে পারেনি।  পারেনি শব্দটি এখানে যথার্থ নয় বিধায় বলবো সেটি আমাদের অজ্ঞতা, অদক্ষতা তার জন্য সবচে বেশি দায়ী। বঙ্গমাতার ডাক নাম রেণু। রেণু যে কতো বড় এক মানবিক মানুষ ছিলেন, আমাদের দেশে সে ভাবনার সচেতন মানুষের খুবই অভাব। সে কারণেই আজো জাতি সব ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়ার আশঙ্কায় রয়েছে। রেণু নিঝুম পল্লী গাঁয়ের ছায়াসুনিবিড় লোকালয় বেড়ে ঊঠেছেন। অথচ তাঁর অনন্যসাধারণ কর্মপ্রয়াসের দিকে লক্ষ্য করলে আমারা দেখতে পাই তিনি একজন অত্যন্ত মেধাবিও গুণিমানুষ ছিলেন। অতি সরলপ্রাণা মানুষ হয়েও কীভাবে এমন দুঃসাহসী কর্মকা- অব্যাহত রেখেছিলেন তা আজকের দিনে এসেও কি ভাবা যায়! সে সময়ের মানুষ জনের কি আচার আচারণ অথবা রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটইবা কেমন ছিলো! আমরা একালে এসে তা বুঝতে পারি।

তখনকার সামাজিক বিধি-নিষেধের ফলে রেণু উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করতে ও বাধাপ্রাপ্ত হয়েছেন বিধায় শিশুকালেই বন্ধ হয়ে যায় উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন। তারপরও তিনি দমে যাওয়ার মানুষ নন। আপন মনে নিজেকে নিজের মতো করে জানতে বুঝতে ধারাবাহিকভাবে তিনি জ্ঞানচর্চার মধ্যদিয়ে জীবনের সবচে আপন স্বজন প্রিয়তম স্বামীর আদর যত্নে মনোনিবেশ করতে গিয়ে  অনেক অজানাকে জানার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে প্রতিজ্ঞা করলেন মানবসেবায় কীভাবে নিজেকে নিয়োজিত করা যায়। এমন বিরল মমত্ববোধের মহীয়সী নারী বিশ্বজুড়ে কয়জন খুঁজে পাওয়া যাবে! তিনি যে, নীরবে-নিভৃতে দুঃসহ সংগ্রামে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন- তার খানিকটা অরচিত ইতিহাস বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনিতে সে মমতাময়ী রেণুর আবেগীয় উপাখ্যানের সন্ধান পাওয়া যায়। নতুন দিনের স্বপ্নলোকের দিশারী শ্যামলিমা মাতৃভূমির স্বপ্নসাধক তৎকালীন পূর্ব বাংলার গণমানুষের প্রাণপ্রিয় নেতাই শুধু নন বঙ্গবন্ধু ছিলেন পূর্ব বাংলা ও পশ্চিম পাকিস্তান উভয় দেশের সবচে জনপ্রিয় নেতা। তার আলামত আমরা দেখতে পাই সত্তরের নির্বাচনে উভয় দেশের মানুষ বঙ্গবন্ধুকে ভোট দিয়ে নির্বাচিত করেছে।

এ বিষয়টি নিয়ে আজো আমাদের বিদগ্ধ প্রাজ্ঞ মনীষী কিংবা রাজনৈতিক নেতাদের উদাসীনতা আমাকে ভাবায় ভীষণ। গভীরভাবে লক্ষ্য করলে দেখা যায় যে, বঙ্গবন্ধু শুধু পূর্ববাংলারই জনপ্রিয়নেতা ছিলেন না; তিনি পশ্চিম পাকিস্তানের ও সবচে জনপ্রিয় নেতা, তা নির্বাচনে ভোটের মাধ্যমে জানা যায়। বঙ্গবন্ধু পূর্ববাংলায় কতো  পার্সেন্ট ভোট পেয়েছেন; কিংবা পশ্চিম পাকিস্তানে কতো পার্সেন্ট ভোট পেয়ে এক অনন্য ইতিহাস সৃষ্টি করেছিলেন! ওই নির্বাচনে বাঙালি জাতি রাষ্ট্রের মুক্তির পথকে শুধু তরান্বিতই করেনি। এর স্বপ্ন ও সম্ভাবনাকে অনেক বেশি শক্তিশালী করেছে, স্বাধীনতার মহাকাব্য রচনার পথকে করেছে সুগম। এসব ব্যাপারে তেমন গবেষণা আজো সম্পূর্ণ হয়নি বিধায় আমরা তা জানতে ও বুঝতে না পারার ফলে ক্রমাগত পিছিয়ে পড়ছি সব ক্ষেত্রে। মহান সৃষ্টিকর্তার অভিশপ্ত বর্বর পরাজিত পাকিস্তানি জাতিগোষ্ঠী আজো আমাদের অনেক ক্ষেত্রে তাদের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন লক্ষ্য কারা যায় না। এসব কারণে আমাদের বীরত্বপূর্ণ গর্বিত সব অর্জন ও সার্বিক সৃজনশীল কর্মপ্রয়াসে ও নানামাত্রিক সমস্যার সৃষ্টি হয়। বঙ্গবন্ধুর বীরত্বপূর্ণ উত্থান ও এতো জনপ্রিয়তার পর্দার আড়ালে লুকিয়ে ছিলেন-এমন এক অলৌকিক অলোকসুন্দর। আমরা আজো সে অত্যন্ত অনিন্দসুন্দর-মহৎপ্রাণ মহীয়সী- পরম আপনকে জানার অনুসন্ধান করিনি কেন! যে আত্মপ্রত্যয়ী মানুষটির আত্মত্যাগের বিরল মহিমায় উদ্ভাসিত মাতৃভূমির তাবৎ গৃহলোক।

ওনার জীবনের ঘটে যাওয়া অনেক অজানা তথ্য আজো জানা হয়নি আমাদের জ্ঞানপিপাসু সচেতন নাগরিকের। যারা মুক্তজ্ঞানচর্চার মাধ্যমে তাঁর সংগ্রামমুখর জীবনের কিংবা অপ্রকাশিত সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনার গর্বগাথা সৃজনশীল কর্মপ্রয়াসের ভেতর দিয়ে বিকশিত আলো-আঁধারে ছড়িয়ে দেবে দেশ-দেশান্তরে। আর এসব গর্বিত অধ্যায় সম্পর্কে জেনে জগৎবাসী চমকিত হবে বাংলা মায়ের পরম স্বজনের দিগন্ত কাঁপানো ইতিহাস পাঠে।  আজ আমরা জানার চেষ্টা করবো কীভাবে তিনি এমন সব দুঃসাহসী কর্মকাণ্ডে নিজেকে সম্পৃক্ত রেখেছেন বাংলার বিপ্লবী মানবিক নেতা বঙ্গবন্ধুকে নানামাত্রিক উপদেশ দেওয়ার মাধ্যমে। মহানসৃষ্টিকর্তা বুঝি হাজার বছরের লাঞ্ছিত-বঞ্চিত অসহায় একটি জাতিগোষ্ঠীর ভাগ্যবদলের এক অসীম সাহসী কালজয়ী- কালপুরুষকে এ জগৎপারাবারে পাঠিয়ে ছিলেন। যার সঙ্গে পাঠান তাঁরই সহধর্মিণী মহীয়সী নারী বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেসা রেণুকে। মহান রাব্বুল আলামিনকে অনেক ধন্যবাদ ও কৃজ্ঞতা জানাই। তিনি অধিকারহারা বাঙালির মনোব্যাকুল করা আহাজারির মর্মবেদনা বুঝতে পেরে এ বৃহৎজনগোষ্ঠীকে বর্গি-দখলদার শাসকগোষ্ঠীর কবল থেকে উদ্ধারের আয়োজনের মধ্যদিয়ে দু’জন প্রাজ্ঞ-মাটিও মানুষপ্রেমী সুহৃদ স্বজনকে পাঠিয়ে ছিলেন। রেণুর বিরল আত্মত্যাগ- নির্মম দুঃখ-কষ্টের মর্মগাথায় বিকশিত হলো বাংলা ও বাঙালি।

তাঁর সংগ্রামী জীবনের অনেক অজানা অধ্যায়ের ওপর ব্যাপক গবেষণা হওয়া জরুরি। আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মানসগঠনে বঙ্গমাতার অবিস্মরণীয় আত্মত্যাগের গর্বগাথায় উৎসাহিত ও প্রেরণা যোগাবে বলে আমার বিশ্বাস। আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামে বঙ্গমাতার অবিশ্বাস্য সব কর্মকাণ্ডের ওপর আজো কোনো চলচ্চিত্র নির্মাণ হয়নি, যা হওয়া প্রয়োজন। শুরুতেই আদি মানবসভ্যতা বিকশিত হওয়ার নানা মাত্রিক অনুষঙ্গ প্রসঙ্গে বলেছি। মানুষের বীরত্বপূর্ণ ইতিহাস বিণির্মানে অনেক উজ্জ্বল ভূমিকা  রয়েছে বিশ্বের দেশে দেশে। আজকের বাংলাদেশের বিকশিত রূপরেখায় সর্বক্ষেত্রে বিপুল সম্ভাবনার সুরম্য সোনালি সাঁকো নির্মাণে  ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করছেন বঙ্গবন্ধু-বঙ্গমাতার সুযোগ্য সন্তান দেশরত্ন শেখ হাসিনা। বঙ্গমাতা সম্পর্কে লিখতে গিয়ে বারবার মনে পড়ছে আমাদের জাতীয় কবি নজরুলের সে বিখ্যাত কবিতার দুটি লাইন। ‘বিশ্বে যা কিছু মহান সৃষ্টি চির কল্যাণ কর, অর্ধেক তার করিয়াছে নারী- অর্ধেক তার নর’। বঙ্গমাতার মতো এমন ঔষর্য্যমণ্ডিত প্রাজ্ঞ – মেধাসিক্ত মানবিক নারী যুগে যুগে  জন্মায় না। তার জন্য বাঙালি জাতিকেও হাজার বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে। যা কিনা বর্তমানে বাঙালি জাতি রাষ্ট্রের গর্বিত ইতিহাসের প্রতিটি পাতায় পাতায় লিপিবদ্ধ হওয়া বড় বেশি জরুরি।

প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিকের পাঠ্যসূচিতে এ অনন্য মহৎপ্রাণ মহীয়সী নারীর গৌরবান্বিত জীবনগাথা অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি। তাঁর কাছে আমাদের প্রাপ্তি ও প্রত্যাশার সে বিরল বীরত্বগাথা উন্মোচিত হওয়া প্রয়োজন জাতির বিহত্তর স্বার্থে। তিনি কীভাবে নিজের ভালো-মন্দ কখনো চিন্তা না করে নিজেকে উৎসর্গ করেছেন তার পরম সঙ্গী বঙ্গবন্ধুর দেশপ্রেম আর চির অবহেলিত অধিকার বঞ্চিত বাঙালির আমূল মুক্তির আকাক্সক্ষায়। এসব ভেবে হয়তো বঙ্গজননী তার নিজস্ব কোনো স্বার্থ আছে বলে মনেই করেনি কখনো। মহীয়সী নারী বঙ্গমাতার এমন অনন্যসাধারণ গৌরবোজ্জ্বল অবদানের মহিমান্বিত ইতিহাস বিশে^র অন্য কোনো নারীর আছে বলে আমার জানা নেই। মহান স্বাধীনতার অর্ধশত বছর পরও আমরা কি দেখতে পাই! সর্বত্র নানা অপকর্ম আর অপরাজনীতির অশুভ আলামত সচেতন নাগরিক সমাজকে দগ্ধ করে। আজ আমরা বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ্য করছি দেশজুড়ে নারীর  প্রতি সহিংসতা যেমন বৃদ্ধি পাচ্ছে আবার নারীদের নানা অপকর্মে কুলষিত হচ্ছে সমাজ সংসার। সে মহীয়সী নারী বঙ্গজননীর মহান আদর্শ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করলে এমন পতন ও অবক্ষয়ের ঘোর অন্ধকারে নিমজ্জিত হওয়ার কথাতো নয়। আমরা ভুলেও কখনো ওই মমতাময়ী জননীর মহান আদর্শের বিরল গর্বগাথা সম্পর্কে জানতে ও বুঝতে চাইনি বলে আজ আমাদের সর্বত্র এমন  সামাজিক পতন ও অবক্ষয়ের ভয়ঙ্কর অন্ধকার তাড়িয়ে বেড়ায়।

বর্তমানে দেশের ভেতর ঘটে যাওয়া এসব অনাকাক্সিক্ষত অপকর্মে জড়িতদের বিরুদ্ধে বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকার যে প্রদক্ষেপ নিচ্ছেন, তাতে আমরা আমজনতা আশান্বিত হতে পারি যে, এসব বিষয় ত্বরিত ব্যবস্থা গ্রহণ করলে ভবিষ্যতে দেশের মান-মর্যাদা, সুনাম অক্ষুণ্ন থাকবে বলে বিজ্ঞজনের অভিমত। মানবসভ্যতার ইতিহাস পাঠে দেখা যায় মানুষ ক্রমাগত অন্যায় অবিচারের ভয়াবহ আঁধারকে উপেক্ষা করে সভ্য ও মানবিক হয়ে ওঠার গল্প কে না জানে! অথচ বিশে^ একমাত্র বাঙালি জাতিগোষ্ঠীর ভাগ্যললাটে এমনটি দেখা যায় না কেন! এখানে প্রসঙ্গক্রমেই বলতে হয় বাঙালি আজো রবীন্দ্রনাথের মানুষ হতে পারেনি। বাঙালি আজো বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের মানুষ বাঙালি হতে পারেনি। তবে স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দী পরও বাঙালির এ অধঃপতনের রহস্য টা কি! এখানে বলতে দ্বিধা নেই পঁচাত্তরের নির্মম ট্র্যাজেডি বাঙালি জাতিকে লাইনচ্যুত করে ফেলেছিলো বিধায় বাঙালি তার নিজেকে হারিয়ে ফেলেছে। সে ভয়ঙ্কর পতনের কাল থাবা আজো বাংলা ও বাঙালি জাতিগোষ্ঠীকে তাড়িয়ে বেড়ায় অবলীলায়। আমরা আজো সে মর্মান্তিক ভয়ঙ্কর দুর্ঘটনার খলনায়ক সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের ভয়াবহ আগ্রাসন থেকে মুক্ত হতে পারিনি। দেশের বিরুদ্ধে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র-চক্রান্ত আজো অব্যাহত রয়েছে।

ওদের সব অপতৎপরতা চিরদিনের জন্য রুখে দিতে হবে বীর তারুণ্যের দৃঢ় প্রত্যয়ের ভেতর দিয়ে জানান দিতে হবে বীর বাঙালি কখনো অসত্য অন্যায়ের সঙ্গে আপস জানে না। শত্রুর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে সদা জাগ্রতপ্রাণ মুজিব আদর্শে হয় বলিয়ান। সে ভয়াবহ মধ্য আগস্টের নির্মম হত্যাযজ্ঞের সঙ্গে যারা সরাসরি জড়িত, তারা আজো এ দেশের মুক্ত আলো-বাতাসে রাজনীতি করার সুযোগ পায় কীভাবে! এসব নানা কারণে দ্বিধাবিভক্ত হয়ে  পড়ছে দেশের অসচেতন নাগরিক সমাজ। এখান থেকে বের হতে হলে দীর্ঘ সময়ের ব্যপার। দেশের সব মানুষকে জ্ঞানভিত্তিক শিক্ষার আলোয় উদ্ভাসিত করতে হবে। তার পাশাপাশি ভবিষ্যৎ বংশধর প্রতিটি শিশু-কিশোর ও তরুণ-তরুণিকে রাজনীতিক, সামাজিক,

সাংস্কৃতিকভাবে সচেতনতায় তাদের মননে- জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্র সৃষ্টি করতে পারলে- মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে যেতে বাধ্য। মানুষ ক্রমান্বয়ে জ্ঞান অর্জনের মধ্যদিয়ে সত্য-মিথ্যা ইতিহাস জানার ফলে নিজেকে আবিষ্কারে উজ্জ্বীবিত হয়ে উঠবে বলে আমার বিশ্বাস। একজন মানুষ তার নিজের গর্বিত অতিত ইতিহাস ঐতিহ্য সম্পর্কে  সচেতন হলে তাকে আর কেউ কখনো বিভ্রান্ত কিংবা বিপদগামিতার অন্ধকার গুহায় বন্দি করতে পারবে না। রাষ্ট্র কিংবা সরকারের এসব বিষয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা নিরসনের পাশাপাশি সরকারের দলীয় লোকজনদের  দৃষ্টিভঙ্গিও পাল্টাতে হবে। আমাদের আগামী প্রজন্মের সব মানুষজনকে একটি নির্ধারিত কর্মসূচির আওতায় আনতে হবে।

যেখানে রাষ্ট্রীয় ব্যাবস্থাপনায় মেধাবি তরুণ-তরুণীদের জন্য সৃজনশীল কর্মকৌশল প্রণয়নের মধ্য দিয়ে আমরা আগামীকে আলিঙ্গন করবো শুভবাদের দারুণ স্বপ্নে। যে মুক্ত জ্ঞানচর্চায় মানুষ তার এ ভূখণ্ডের গর্বিতসব কৃষ্টি কালচার সম্পর্কে জানতে ও বুঝতে পারলে তার আকাশচুম্বি উত্থান আর কেউ ঠেকিয়ে রাখতে পারবে না। যে জাতিগোষ্ঠীর হাজার বছরের ঐতিহ্যমণ্ডিত সামাজিক-সাংস্কৃতিক রীতি-নীতির গৌরবোজ্জ্বল গর্বগাথায় বিশ^বিবেক বিস্মিত হয়েছে বারবার। তারই ধারাবাহিকতায় আমাদের আগামী প্রজন্মকে গড়ে তুলতে হলে সরকারের বহুমুখী উদারনীতি গ্রহণ করতে হবে প্রগতিশীল ভাবধারায় রাষ্ট্র বিনির্মানের আলোকধারায় বিকশিত হবে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী। সরকারের এ ব্যাপারে দৃষ্টিভঙ্গি প্রসারিত করলে  ব্যাপক কর্মসৃজনের ক্ষেত্র ও বেকারত্বের অভিশাপ থেকে জাতি মুক্তি পাবে বলে আমার বিশ্বাস। আমাদের সবার মনে রাখতে হবে এ দেশের সাধারণ মানুষের সমঅধিকারের দাবি নিয়ে লড়াই-সংগ্রাম করতে গিয়ে বঙ্গবন্ধু বছরের পর বছর  বর্গি-হানাদার স্বৈরসরকারে নির্যাতন-নিপীড়িনের শিকার হয়ে অন্ধকার সেলে মানবেতর কাল কাটাতে হয়েছে। সেসব অতীতের নির্মম অমানবিক জঘন্য কর্মকাণ্ডের নিষ্ঠুরতা ভুলে গেলে ইতিহাস আমাদের কখনো ক্ষমা করবে না। তাই সময় থাকতে সময়ের মূল্য দিতে জানতে হবে আমাদের সব দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের।

মহীয়সী বঙ্গমাতার অমূল্য অবদান আজ আমরা ভুলতে বসেছি, বঙ্গবন্ধুর মহান আদর্শ থেকে আমরা ক্রমাগতভাবে দূরে সরে যাচ্ছি, যা কখনো জাতির জন্য শুভ লক্ষণ হতে পারে না। মহীয়সী নারী বঙ্গমাতা বঙ্গবন্ধুকে যেভাবে তাঁর রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক জনগুরুত্বপূর্ণ আন্দোলনে সারক্ষণ প্রাণিত করেছেন। বঙ্গজননীর মেধা-প্রজ্ঞায় বিকশিত হয়েছে বঙ্গবন্ধুর এগিয়ে চলার যাত্রাপথ। ওই সময়ের উত্তাল জনস্রোতের বিরুদ্ধে দখলদার বাহিনীর নানা অপকর্ম অপকৌশলকে ব্যর্থ করে দিয়েছেন বঙ্গবন্ধু তাঁর সাম্যও শান্তির  বিপ্লবী অপ্রতিদ্বন্দ্বী- অহিংস অভিযানের ভেতর দিয়ে। যার শক্তি ও সাহস যুগিয়েছেন বঙ্গবন্ধুর সহধর্মিণী রেণু। বঙ্গবন্ধুর এমন সব গৌরবোজ্জ্বল অসাম্প্রদায়িক সফল কর্মসূচি বাস্তাবায়নে পুরো বিশ্ব বিবেক তাঁকে তখন থেকেই বিভিন্নভাবে অভিনন্দিত করেছেন তাঁর  অনন্য সংগ্রামের সাফল্যগাথায়। তখন কেউ কি ভেবেছে; এর পেছনের প্রেরণাদায়ী অসম্ভকে সম্ভবের অবিস্মরণীয় মহীয়সী নারীর গৌরবগাথার অসামান্য ইতিহাস! দেশের সচেতন নাগরিক কিংবা সৃজনশীল চিন্তক গুণীজনরা বিস্মিত হচ্ছেন বঙ্গমাতার কর্মপরিধির আলোকোজ্জ্বল ভূমিকা সম্পর্কে জানতে পেরে। বঙ্গবন্ধুর জগৎকাঁপানো অপ্রতিরোধ্য উত্থানের মূলশক্তি জুগিয়েছেন বঙ্গমাতা তাঁর সুনির্দৃষ্ট চিন্তাশক্তির প্রবল প্রখরতায় সব ক্ষেত্রে কঠিন চ্যালেঞ্জিং ভূমিকায় বঙ্গবন্ধুর উত্তরণের সোনালি সোপান রচিত হয় বঙ্গমাতার অসাধারণ রাজনৈতিক মেধা-প্রজ্ঞায়।

এর আগে কিংবা পেছনে অন্য কোনো শক্তি আছে বলে আমার মনে হয় না, তবে এর  আরেকটি মূল শক্তির উপাদান জুগিয়েছেন দেশের আপামর জনতা। বাংলার গণমানুষের নতুন দিগন্ত উন্মোচনের স্বপ্নসাধক জগৎসংসারে সবচে সৌভাগ্যবান ব্যক্তিত্বের অধিকারী হয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু দুটি কারণে, একটি হলো তাঁর কিশোর বেলার পুতুল খেলার সঙ্গী পরম বন্ধু মমতাময়ী রেণুর দূরদর্শী চিন্তাধারায় গর্বিত গরিমায়। অন্যটি হলো চরম  বৈষম্যের শিকার অধিকার বঞ্চিত দুখি- মেহনতি হতদরিদ্র জনগোষ্ঠীকে তাঁর মেধা-প্রজ্ঞায় জাগ্রত করতে সমর্থ্য হয়েছিলেন। এটি হলো বাংলার পীড়িত মানুষের ভালোবাসার মুকুট পরানো রাজার পরম সৌভাগ্যের পরশ পাথর। যে পাথর স্পর্শে  বিশ্বের সব অধিকারহারা মেহনতি মানুষের বন্ধুর কণ্ঠস্বর প্রবল প্রতাপের সঙ্গে হয় বিস্ফারিত বর্গি-দখলদারের নির্মম নির্যাতন ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে। মানবসভ্যতা বিকাশের হাজার বছরের ইতিহাসে এমন কৃতির্ত্বের অধিকারী মানব-মানবির জন্মে এর আগে কোথাও এমন গৌরবান্বিত ভূমিকা আছে বলে মনে হয় না। বাঙালি জাতির অতীতের যতো দুর্নামই থাকুক না কেনো, আদতে এ জাতিগোষ্ঠী সৌভাগ্যবান, কারণ যে জাতির  ভাগ্যললাটে এমন দু’জন মহৎপ্রাণ মানুষের আগমনের ফলে দীর্ঘ আন্দোলন সংগ্রাম ও নয় মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে আমরা প্রিয় মাতৃভূমিকে শত্রুমুক্ত করতে বলিয়ান হয়েছিলাম একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে।

তাদের সে অফুরন্ত প্রাণশক্তির আলোকধারায় বাঙালি জাতি জেগে উঠে গায় ‘এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবেনাকো তুমি’, সে দেশপ্রেমের অগ্নিশিখায় বীর তারুণ্য সঁপে দিয়েছিল আপনজীবন। স্বাধীনতার জন্য এতো বিপুল জীবন দান বাঙালি ছাড়া বিশে^র অন্য জাতির ইতিহাসে আছে বলে মনে হয় না। বাঙালি জাতি আবার বঙ্গবন্ধু ও বঙ্গমাতার মহান আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে জেগে উঠলে এদেশ থেকে উৎখাত হবে সব স্তরের অনিয়ম দুর্নীতি দুর্বৃত্তায়ন। বঙ্গবন্ধুর আরাধ্য স্বপ্নসাধনায় বৈষম্যহীন বাংলাদেশের জনগণ হেসে ওঠে বলবে জয়বাংলা জয়বঙ্গবন্ধু- জয়তু বঙ্গমাতা।

১০ আগস্ট ২০২১

লেখক : কবি. প্রাবন্ধিক ও মুজিবপ্রেমী।

ভালো লাগলে শেয়ার করে দিন :)

0 Comments

Leave a Reply

Avatar placeholder

Your email address will not be published. Required fields are marked *