ই-পেপার

SITE UNDER CONSTRUCTION
বাংলাদেশ পুলিশের মুখপত্র
অব্যাহত প্রকাশনার ৬৩ বছর

চৌধুরী মোঃ তানভীর

সমগ্র পৃথিবীর করোনা পরিস্থিতির কারণে অর্থনৈতিক বিশ্লেষকগণ ভবিষৎবাণী করেছিলেন ২০২০ সালে বাংলাদেশে প্রবাসীদের রেমিট্যান্স আসবে ১৪ বিলিয়ন ডলার, কিন্তু বাস্তবে রেমিট্যান্স এল ২১.৭৪ বিলিয়ন ডলার (দৈনিক প্রথম আলো অনলাইন ভার্সন, ০৮/০২/২০২১)। দেশে কী পরিমাণ রেমিট্যান্স আয় কিভাবে প্রত্যাবাসিত হয় তার সঠিক পরিসংখ্যান না থাকলেও ধারণা করা হয় দেশে যে পরিমাণ বৈধ রেমিট্যান্স আসে তার অনুমানিক ৫০ ভাগ রেমিট্যান্স আয় অবৈধভাবে এসে হয়ে থাকে। বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রধান দুটি খাত হলো রফতানি ও প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স। তাই বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে রেমিট্যান্স প্রত্যাবাসন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

রেমিট্যান্স প্রত্যাবাসন সাধারণত তিন ভাগে ভাগ করা যায়

১) পণ্য (Physical Goods) রপ্তানির মাধ্যমে রেমিট্যান্স প্রত্যাবাসন

২) সেবা (Service) প্রদানের মাধ্যমে রেমিট্যান্স প্রত্যাবাসন

৩) প্রবাসীদের (Wage Earner) রেমিট্যান্স প্রত্যাবাসন

১) পণ্য (Physical Goods) রপ্তানির মাধ্যমে রেমিট্যান্স প্রত্যাবাসন বাংলাদেশে যে সকল ব্যাক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বৈধ রপ্তানি নিবন্ধন সনদ (ERC) রয়েছে তার দেশের বাইরে সরকার কর্তৃক অনুমোদিত পণ্য রপ্তানি করতে পারে। যখন বিদেশি কোনো প্রতিষ্ঠান উক্ত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নিকট থেকে বৈধ পণ্য আমদানি করে তারা ব্যাংকিং চ্যানেলে আমদানিকৃত মূল্য বৈদেশিক মুদ্রায় পরিশোধ করে থাকে। এইটিকে পণ্য রপ্তানির মাধ্যমে মূল্য বা রেমিট্যান্স প্রত্যাবাসন নামে অভিহিত করা হয়। এই সকল বৈদেশিক মুদ্রা ব্যাংকের নষ্ট্র হিসাবে (Nostro Account) জমা হয়। পরবর্তীতে ব্যাংকের নষ্ট্র হিসাব (FC Account) থেকে দেশে অবস্থিত ব্যাংকে রক্ষিত উক্ত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বৈদেশিক মুদ্রা হিসাবে (ঋঈ অপপড়ঁহঃ) জমা করা হয়। এটি গ্রাহকের প্রয়োজনীয়তা অনুযায়ী টাকায় রূপান্তর করা হয় বা আমদানি বিল পরিশোধে ব্যবহৃত হয়।

২) সেবা (Service) প্রদানের মাধ্যমে রেমিট্যান্স প্রত্যাবাসন

বাংলাদেশের যে সকল ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান সেবা (Service) প্রদান করে থাকে বিদেশি সেবাগ্রহীতা তাদের আয় বৈদেশিক মুদ্রায় পরিশোধ করে থাকে। এ খাতে অর্জিত আয় সেবা প্রদানকারীর ব্যাংকে রক্ষিত কনভার্টিএবল টাকা হিসাবে জমা হয়। কনসালটেন্সি (Consultancy fee), ফ্রিল্যান্সিং আয় (Freelancing), বিভিন্ন বহুজাতিক কোম্পানিতে চাকুরিরত কর্মকর্তাদের প্রাপ্ত বেতন ইত্যাদি সেবা (Service) প্রদানের মাধ্যমে রেমিট্যান্স আয়ের অন্তর্ভুক্ত। এই সকল রেমিট্যান্স প্রাপ্তির জন্য গ্রাহকের বা সেবা প্রদানকারীর সাধারণত কোনো লাইসেন্স বা অনুমতি পত্রের দরকার হয় না কিন্তু সেবাগ্রহীতা এবং সেবা প্রদানকারীর মধ্যে একটি সাধারণ চুক্তি (Agreement) থাকতে হয়।

৩) প্রবাসীদের (Wage Earner) রেমিট্যান্স প্রত্যাবাসন

প্রবাসী বাংলাদেশি তাদেরকে বলা হয় যারা বাংলাদেশে জন্ম গ্রহণ করার পর অন্য কোনো দেশে পাড়ি জমিয়েছেন। ভালো পরিবেশে বসবাস করা বা বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন ও পরিবারকে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করার আশায় বাংলাদেশিরা প্রবাসে পাড়ি জমায়। ২১ শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ উড ঞঠএর অনলাইন রিপোর্ট অনুযায়ী ১৯৭৬ সাল থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় এক কোটি ত্রিশ লাখ বাংলাদেশি কর্মসংস্থানের জন্য দেশের বাইরে পাড়ি দিয়েছেন যার মধ্যে শুধু মধ্যপ্রাচ্যে বসবাস করে প্রায় ২৮ লক্ষ প্রবাসী এবং এর অর্ধেক সৌদি আরবে বাস করে। এসকল বাংলাদেশি প্রবাসী তাদের পরিবারের জন্য প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা দেশে প্রেরণ করেন। গত ৩ মে, ২০২১ কর্মদিবস শেষে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৪৫.১০ বিলিয়ন ডলারের রেকর্ড ছাড়িয়ে নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করে। প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সই এই রেকর্ড গড়তে বড় ভূমিকা রেখেছে মর্মে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। প্রবাসীরা তাদের অর্জিত অর্থ ব্যাংকিং চ্যানেলে অথবা আন্তর্জাতিক অর্থ প্রেরণ সংস্থা যথা ওয়েস্টার্ন ইউনিয়ন, রিয়া ইত্যাদির মাধ্যমে প্রেরণ করতে পারেন।

ব্যাংকের মাধ্যমে রেমিট্যান্স প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া

একজন প্রবাসী (Remitter) ব্যাংকের মাধ্যমে অর্থ প্রেরণের জন্য দেশে যে কোনো বাণিজ্যিক ব্যাংকে তার অথবা তার পরিবারের কোনো সদস্যের নামে একটি ব্যাংক হিসাব খুলতে হয়। একজন বৈধ প্রবাসী (Remitter)

 বিদেশে অবস্থিত যে কোনো ব্যাংকে গিয়ে দেশে অবস্থিত ব্যাংকে তার বা তার পরিবারের সদস্যের নামে রক্ষিত হিসাবে অর্থ পাঠাতে পারেন। বিদেশি ব্যাংক প্রবাসীদের অর্থ পাঠানোর পূর্বে তার বৈধ পাসপোর্ট ও ভিসা, ওয়ার্ক পারমিট, ব্যাংকের নাম, ব্যাংকের শাখা ও একাউন্ট নম্বর, সুইফট কোড ইত্যাদি চাইতে পারেন। প্রত্যেক বাংলাদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংকের দেশের বাইরে বিভিন্ন ব্যাংকে নিজ নামে ব্যাংক হিসাব বা একাউন্ট থাকে যাকে ব্যাংকিং ভাষায় নষ্ট্র একাউন্ট (Nostro Account) বলা হয়। প্রবাসীদের থেকে প্রাপ্ত বৈদেশিক মুদ্রা বিদেশী ব্যাংক বাংলাদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংকের নষ্ট্র একাউন্ট (Nostro Account) এ সুইফটের মাধ্যমে জমা করে দেয় এবং নির্দিষ্ট প্রবাসীর যাবতীয় তথ্য উক্ত সুইফট মেসেজের মাধ্যমে বাংলাদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংককে জানিয়ে দেয়। বাংলাদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংক উক্ত মেসেজ পাওয়ার পর নির্দিষ্ট প্রবাসী বা তার পরিবারের সদস্যের নামে রক্ষিত হিসাবে অর্থ জমা করে দেয়। এই প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করা হয়। এছাড়াও দ্রুত রেমিট্যান্স সংগ্রহ করা এবং লেনদেন খরচ কমানোর জন্য, বাংলাদেশ ব্যাংকের, বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক, অনুমোদন অনুযায়ী বাংলাদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংকসমূহ তাদের বিভিন্ন শাখা/উপশাখা/এজেন্ট/এটিএম বুথ ইত্যাদি বিদেশে খুলে থাকে। এইগুলোর মাধ্যমে সরাসরি, বাণিজ্যিক ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সাহায্যে, নির্দিষ্ট প্রবাসী বা তার পরিবারের সদস্যের নামে রক্ষিত হিসাবে অর্থ জমা করা হয়। বাংলাদেশ ব্যংকের এফই সার্কুলার ৪০ তারিখ ০২/১২/২০২০ অনুসারে, ৫০০০.০০ মার্কিন ডলার বা ৫.০০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত প্রবাসী রেমিট্যান্সের অর্থ কোনো দলিলাদি ছাড়াই বিদেশ থেকে দেশের ব্যাংকের হিসাবে আনা যায়। তবে ৫০০০.০০ মার্কিন ডলার বা ৫.০০ লক্ষ টাকার বেশি প্রবাসী রেমিট্যান্সের অর্থ আনয়নের ক্ষেত্রে ব্যাংক কর্তৃক চাহিত দলিলাদি যথাঃ বৈধ পাসপোর্ট ও ভিসা, ওয়ার্ক পারমিট, নিয়োগকারীর সাথে করা চুক্তিপত্র ইত্যাদি ব্যাংকে জমা দিতে হয়।

দেশি বা আন্তর্জাতিক এজেন্ট এর মাধ্যমে রেমিট্যান্স প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া

দেশের বাইরে বেশ কিছু এক্সচেঞ্জ হাউজ ও মানি ট্রান্সফার সার্ভিস কোম্পানি দ্রুততার সাথে গৃহীত রেমিট্যান্স দেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করে থাকে। এগুলোর মধ্যে মানিগ্রাম ইন্টাঃ, এক্সপ্রেস মানি, ইনডেক্স এক্সচেঞ্জ, আল ফারদিন এক্সচেঞ্জ, ব্রাক সজন, ওয়েস্টার্ন ইউনিয়ন, ট্রান্সফাস্ট, রিয়া, আল আনসারি এক্সচেঞ্জ, এনইসি মানি ইউকে, ন্যাশঅনাল এক্সচেঞ্জ কোম্পানি ইতালি, কেএমবি মানি ট্রান্সফার, আফতাব কারেন্সি এক্সচেঞ্জ, ব্যাংক আল বিলাদ, এসএইচএ গ্লোবাল, সানম্যান গ্লোবাল, প্লাসিড ইন্টাঃ অন্যতম। এইসব এক্সচেঞ্জ হাউজ ও মানি ট্রান্সফার সার্ভিস কোম্পানির সাথে দেশের বিভিন্ন ব্যাংকের চুক্তি করা থাকে। এক্সচেঞ্জ হাউজ ও মানি ট্রান্সফার সার্ভিস কোম্পানির সাথে রেজিস্ট্রেশন করে একজন প্রবাসী দেশে রেমিট্যান্সের অর্থ পাঠাতে পারেন। রেজিস্ট্রেশন করে রেমিট্যান্সের অর্থ পাঠানোর সময় একজন প্রবাসীকে বাংলাদেশে অর্থ গ্রহণকারীর নাম ও ফোন নম্বর, ক্ষেত্র বিশেষে জাতীয় পরিচয় পত্রও দিতে হয়। এক্সচেঞ্জ হাউজ ও মানি ট্রান্সফার সার্ভিস কোম্পানি প্রবাসীকে একটি পাসওয়ার্ড দেন। পরবর্তীতে ব্যাংক অর্থ গ্রহণকারীর নাম ও ফোন নম্বর, জাতীয় পরিচয় পত্র এবং প্রদত্ত পাসওয়ার্ড যাচাই করে রেমিট্যান্সের অর্থ প্রদান করে থাকেন।

সম্প্রতি সরকার বৈধভাবে দেশে ওয়েজ আরনার্স বা প্রবাসীদের রেমিট্যান্স প্রদানের ক্ষেত্রে প্রদত্ত অর্থের ২% নগদ প্রণোদনা প্রদানের ঘোষণা করেছে। এর ফলে সম্প্রতি ওয়েজ আরনার্স বা প্রবাসীদের রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধি পেয়েছে মর্মে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।

রেমিট্যান্স প্রধানত দুইভাবে প্রত্যাবাসিত হতে পারে;

ক) বৈধভাবে

খ) অবৈধভাবে।

দেশে কি পরিমাণ রেমিট্যান্স আয়, কিভাবে প্রত্যাবাসিত হয় তার সঠিক পরিসংখ্যান না থাকলেও ধারণা করা হয় দেশে যে পরিমাণ বৈধ রেমিট্যান্স আসে তার অনুমানিক ৫০ ভাগ রেমিট্যান্স আয় অবৈধভাবে প্রত্যাবাসিত হয়ে থাকে। অপরদিকে অবৈধভাবে দেশে রেমিট্যান্স আসে প্রধানত হুন্ডির মাধ্যমে। ধরি জনাব করিম একজন প্রবাসী যিনি কিছুকাল অবৈধভাবে প্রবাসে ছিলেন তিনি দ্রুত দেশে অর্থ প্রেরণ করতে চান। করিম যদি ৫ লাখ টাকা দেশে পাঠাতে চান তিনি অবৈধ হলে ব্যাংকিং চ্যানেলে অর্থ প্রেরণ করতে পারবেন না। তাহলে দ্রুত অর্থ প্রেরণের জন্য করিম হুন্ডি ব্যবসায়ীদের ধারস্থ হবেন। উক্ত হুন্ডি ব্যবসায়ী হতে পারেন বাংলাদেশি, বিদেশি অথবা ওই দেশের নাগরিক। উক্ত হুন্ডি ব্যবসায়ী বাংলাদেশে তার এজেন্ট বা পরিচিত অন্য হুন্ডি ব্যবসায়ীকে ফোন করে করিমের পরিবারকে ৫ লাখ টাকা দিয়ে দিতে বলবেন। বাংলাদেশি হুন্ডি ব্যবসায়ী করিমের পরিবারকে ৫ লাখ টাকা দিয়ে দিলে তার পরিবার তথ্যটি করিমকে জানাবে (confirm)। করিম তখন বিদেশে অবস্থিত হুন্ডি ব্যবসায়ীকে ৫ লাখ টাকার সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা দিয়ে দিবেন। লেনদেনটি প্রাথমিকভাবে এখানেই শেষ হবে। কিন্তু অর্থনীতিতে এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব রয়েছে। এছাড়া, অনুমোদিত সীমার অতিরিক্ত নগদ বৈদেশিক মুদ্রা বহনের মাধ্যমে অবৈধভাবে রেমিট্যান্স এসে থাকে। হুন্ডির ক্ষেত্রে প্রবাসী বাংলাদেশিরা হুন্ডির সাথে সংশ্লিষ্ট এজেন্টের কাছে বৈদেশিক মুদ্রায় অর্থ প্রদান করে। অতঃপর হুন্ডির সাথে সংশ্লিষ্ট এ দেশীয় এজেন্টরা রেমিট্যান্স গ্রহীতাকে বাংলাদেশি মুদ্রায় সেই অর্থ পরিশোধ করে থাকে। এর ফলে দেশ মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা হতে বঞ্চিত হয়।

অবৈধভাবে রেমিট্যান্স প্রত্যাবাসনের কারণ

অবৈধভাবে রেমিট্যান্স প্রত্যাবাসনের ফলে বৈধভাবে রেমিট্যান্স প্রত্যাবাসনের পরিমাণ কমে যায়। এর ফলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতার সম্ভাবনা থেকে যায়। যে কয়েকটি কারণে অবৈধভাবে রেমিট্যান্স প্রত্যাবাসন বেশি হয় সেগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো ক) ব্যাংকের মাধ্যমে রেমিট্যান্স প্রেরণে দীর্ঘসূত্রিতা ও কাগুজে জটিলতা, খ) অতিরিক্ত চার্জ/ফি, গ) কম বিনিময় হার, ঘ) মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের অপব্যবহার ঙ) অবৈধ থাকা চ) ভিসা বা ওয়ার্ক পারমিট এর মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়া ছ) বিদেশে আয়কর ফাঁকি দেওয়া জ) হাতে হাতে অর্থ পাওয়ার সুবিধা ইত্যাদি।

উল্লিখিত কারণসমূহ আমলে নিয়ে ব্যাংকের মাধ্যমে রেমিট্যান্স প্রেরণ দ্রুত ও সহজিকরণ, ব্যাংকের মাধ্যমে রেমিট্যান্স প্রেরণে সরকার কর্তৃক ২ শতাংশ হারে নগদ প্রণোদনা, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের সুপারভিশন জোরদারকরণ ইত্যাদি ব্যবস্থা গ্রহণের ফলে ব্যাংকের মাধ্যমে রেমিট্যান্স প্রেরণ উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য মতে ২০২০-২০২১ অর্থ বছরের প্রথম ১০ মাসেই (জুলাই-এপ্রিল) ২০.৬৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ অর্থ রেমিট্যান্স এসেছে যা এ যাবৎ কালের রেকর্ড। ইতোপূর্বে কোনো অর্থ বছরেও এত পরিমাণ অর্থ রেমিট্যান্স হিসেবে আসেনি।

অবৈধভাবে রেমিট্যান্স প্রত্যাবাসনের ঝুঁকি

অবৈধভাবে রেমিট্যান্স প্রত্যাবাসনের ফলে দেশ একদিকে যেমন দেশ বৈদেশিক মুদ্রা হতে বঞ্চিত হয় তেমনি অন্যদিকে দেশে বিভিন্ন রকম অবৈধ কার্যক্রম বৃদ্ধির ঝুঁকি সৃষ্টি হয়। এর ফলে দেশে সার্বিক সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি অস্থিতিশীল হতে পারে। উদাহরণের মাধ্যমে বিষয়টি আরও স্পষ্ট করা যাকঃ

চিত্র ১- মুদ্রা পাচারের সম্ভাবনা

ধরা যাক জনাব রহিম একজন ব্যবসায়ী যার দেশে-বিদেশে ব্যবসা রয়েছে। তিনি একইসাথে অবৈধ হুন্ডি ব্যবসায়ের সাথে জড়িত। অপরদিকে জনাব মুশফিক কাতার প্রবাসী। এখন জনাব মুশফিক দেশে হুন্ডির মাধ্যমে টাকা পাঠাতে চাইলে জনাব রহিমের কাতারের এজেন্টকে কাতারি রিয়েল পরিশোধ করবেন এবং জনাব রহিমের দেশীয় এজেন্ট সমপরিমাণ বাংলাদেশি টাকা জনাব মুশফিকের পরিবারের লোককে প্রদান করবে। জনাব রহিমের দেশীয় এজেন্ট যে পরিমাণ টাকা পরিশোধ করলেন সেই টাকা কিন্তু আর কখনোই দেশে আসবে না। জনাব রহিম কাতারের সেই অর্থ তার সুবিধামতো জায়গায় প্রেরণ করবেন। দেশের বাইরে সেকেন্ড হোম তৈরি করার উদ্দেশ্যে ব্যাপকভাবে এসব অর্থ ব্যবহার করা হয়। বাংলাদেশে ক্যাপিটাল একাউন্ট ওপেন না হওয়ার ফলে স্বাভাবিকভাবে অনুমোদন ব্যতিত নির্দিষ্ট সীমার বেশি অর্থ দেশের বাইরে নেওয়া যায় না। এর ফলে এভাবে প্রচুর অর্থ দেশের বাইরে চলে যায়।

চিত্র ২- অরাজকতা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে জঙ্গি গোষ্ঠীসমূহের দেশে অর্থ আনয়ন

দেশে অরাজকতা সৃষ্টি করতে জঙ্গি গোষ্ঠীসমূহ বিভিন্ন সময়ে সশস্ত্র হামলা চালায়। জঙ্গি গোষ্ঠীসমূহের প্রশিক্ষণ প্রদান, অস্ত্র সরবরাহ, প্রতিষ্ঠান চালানোর খরচ এবং মিশন চালনার জন্য অর্থের প্রয়োজন। এসকল হামলার অর্থের উৎস সন্ধানে দেখা যায় জঙ্গি হামলার অর্থায়ন বহিঃবাংলাদেশ হতে সংস্থান করা হয়েছে। ব্যাংকের মাধ্যমে বৈধভাবে অর্থ প্রেরণ করলে তার ট্রেইল (Trail) থেকে যায় এবং এর মাধ্যমে অর্থ কোথা হতে কোথায় গেছে তা বের করা সম্ভব হয়। কিন্তু হুন্ডি বা হাওলা ব্যাবসায়ের ট্রেইল বা উৎস বের করা বেশ কঠিন তাই স্বভাবতই অপরাধীরা এই পথটি বেছে নেন। বাংলাদেশ ফাইনান্সশিয়াল ইনটেলিজেন্স ইউনিট (BFIU), বাংলাদেশ পুলিশের এন্টি টেরোরিজম ইউনিট (ATU), কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট (CTTC) অবৈধভাবে অর্থ প্রেরণ ইস্যুতে খুবই সক্রিয় হওয়াতে জঙ্গি গোষ্ঠীসমূহ হুন্ডি বা হাওলার মাধ্যমে এসব অর্থ প্রেরণ করে থাকেন যাতে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী প্রতিষ্ঠানসমূহ তাদের অর্থের উৎস খুঁজে বের করতে না পারেন। ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্সের অর্থ প্রেরণ না করে হুন্ডি বা হাওলার মাধ্যমে অর্থ প্রেরণ করলে জঙ্গি গোষ্ঠীসমূহ এসব অর্থ ব্যবহার করে দেশের আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নাজুক করে তুলতে পারেন।

চিত্র ৩- বিদেশ থেকে অস্ত্র ক্রয়ে অবৈধ

পথে আসা রেমিট্যান্সের অর্থ ব্যবহার

সম্প্রতি আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী লিবিয়া থেকে অস্ত্র ক্রয়ের অর্থ প্রেরণে জড়িত থাকার অভিযোগে বাংলাদেশের কিছু হুন্ডি ব্যাবসায়ীকে জিজ্ঞাসাবাদ করে। এই ঘটনায় এটি স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্সের অর্থ প্রেরণ না করে হুন্ডি বা হাওলার মাধ্যমে অর্থ প্রেরণ করলে হুন্ডি ব্যবসায়ীদের হাতে প্রচুর পরিমান বৈদেশিক মুদ্রা জমা হয়। অতিরিক্ত লাভের আশায় এসব ব্যবসায়ীরা জমাকৃত বৈদেশিক মুদ্রা রাষ্ট্রবিরোধী কার্যক্রমে জড়িত প্রতিষ্ঠান সমূহকে সরবরাহ করে। দেশের আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নাজুক করে তোলার উদ্দেশ্যে রাষ্ট্রবিরোধী কার্যক্রমে জড়িত প্রতিষ্ঠানসমূহ অবৈধ পথে আসা এসব অর্থ অস্ত্র ক্রয়সহ অন্যান্য রাষ্ট্রবিরোধী কাজে ব্যবহার করে থাকেন।

চিত্র ৪- সোনা চোরাচালান, মানব পাচার এবং মাদকের চালানে অবৈধ পথে আসা রেমিট্যান্সের অর্থ ব্যবহার

কিছুদিন পূর্ব পর্যন্ত বাংলাদেশে সোনা আমদানির কোনো নীতিমালা ছিল না। বাংলাদেশে সোনা উৎপাদন খুবই নগণ্য। এখানে প্রশ্ন থেকে যায় তাহলে দেশের ভিতরে বিশাল সোনার চাহিদা কিভাবে পূরণ হয়। এত সোনা দেশে কিভাবে আসে এবং আসলে তার অর্থায়ন কিভাবে সম্পন্ন হয়। এটা স্পষ্টই প্রতীয়মান হয় অবৈধ পথে আসা রেমিট্যান্সের অর্থ দ্বারা সোনা চোরাচালানের অর্থায়ন সম্পন্ন হয়। একইভাবে বাংলাদেশ থেকে প্রচুর পরিমাণ মানুষ প্রতিবছর অবৈধ পথে বিদেশের উদ্দেশ্যে পাড়ি জমায়। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকা থেকে প্রচুর পরিমাণ বাংলাদেশি সীমান্ত পথে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ইউরোপের উদ্দেশ্যে পাড়ি জমায়। আন্তর্জাতিক মানব পাচারে জড়িত দালালরা এসব মানুষজন থেকে প্রচুর পরিমাণ অর্থ নিয়ে থাকে। অনেক সময় তারা অর্থ দিতে না পারলে দেশে অবস্থানকারী তাদের আত্মীয়দের থেকে অর্থ পাঠাতে হয়। দেশে থেকে এই অর্থ অবৈধ পথে আসা রেমিট্যান্সের অর্থ দ্বারা মানব পাচারে জড়িত দালালদের কাছে পৌঁছে যায়। মাদক চোরাচালানের অর্থায়নেও একইভাবে অবৈধ পথে আসা রেমিট্যান্সের অর্থ ব্যবহার করা হয়।

চিত্র ৫- অফশোর ব্যাংকিং ইউনিট (OBU) এবং

অবৈধ জমাকৃত রেমিট্যান্সের অর্থের অপব্যাবহারের সম্ভাবনা

ধরা যাক আল হাসান ফাইন্যান্স এন্ড মানি চেঞ্জার লিঃ একজন বাংলাদেশি এবং একজন দুবাই নেটিভ অধিবাসীর জয়েন্ট ভেনচার (Joint Venture) প্রতিষ্ঠান। এই প্রতিষ্ঠান হুন্ডির মাধ্যমে রেমিট্যান্সের ব্যবসা করে ১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় করে বা জমায়। জমাকৃত এই বৈদেশিক মুদ্রা তারা যেকোনো দেশের অফশোর ব্যাংকিং ইউনিটে বিনিয়োগ করতে পারবে এবং বিদেশি প্রতিষ্ঠান তাদের দেশের আইন অনুযায়ী অফশোর ব্যাংকিং থেকে এই অর্থ ঋণ নিতে পারে। মুদ্রা পাচারে জড়িত অনেক প্রতিষ্ঠান (Shadow Organization) এসব অর্থ বিভিন্ন রাষ্ট্রবিরোধী কার্যক্রমে জড়িত প্রতিষ্ঠানসমূহকে বিভিন্নভাবে এমন পর্যায়ে হস্তান্তর করেন যা এক পর্যায়ে এই অর্থের উৎস খুঁজে পাওয়া যায় না। অবৈধ পথে আসা রেমিট্যান্সের এসব অর্থ এভাবে রাষ্ট্র বা মানবতাবিরোধী প্রতিষ্ঠানের হস্তগত হয় মর্মে প্রতীয়মান হয়।

বিভিন্ন কারণে প্রবাসীরা ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্সের অর্থ না পাঠিয়ে অবৈধভাবে হুন্ডি বা অন্য কোনোভাবে রেমিট্যান্স পাঠান। আর বিভিন্ন মহল হুন্ডি ব্যবহার করেন দেশীয় আয়করসহ অন্যন্য আইনকে ফাঁকি দিতে কারণ হুন্ডির মাধ্যমে অর্থ বিনিময়ের কোনো রেকর্ড বা দলিল থাকে না। মুদ্রাপাচার, অস্ত্র ক্রয়, সোনা চোরাচালান, মানবপাচার, মাদক ব্যবসায়সহ অন্যান্য সংঘবদ্ধ অপরাধের অর্থায়ন এবং অর্থ স্থানান্তর হুন্ডি ব্যবসায়ী তথা অবৈধ পথে আসা রেমিট্যান্সের অর্থের মাধ্যমে হয়ে থাকে। তাই অবৈধ পথে আসা রেমিট্যান্সের অপব্যবহার শুধু দেশের অর্থনীতি নয় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও নাজুক করে তোলে। ২০৪১ সালে সমৃদ্ধশালী বাংলাদেশ গড়ে তোলার লক্ষ্যে, দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে এবং দেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে, ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স আনয়নের পথ সহজীকরণ এবং অবৈধ পথে আসা রেমিট্যান্স প্রবাহ বন্ধকরণ তথা হুন্ডি ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম্য বন্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও তদারকীকারী প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি দেশের সকল নাগরিককে সচেতন ও এগিয়ে আসতে হবে।

(তথ্যঋণ ঃ মোঃ ইমানুর হাসান, উপ-পরিচালক, বাংলাদেশ ফাইন্যান্সশিয়াল ইনটেলিজেন্স ইউনিট (BFIU), বাংলাদেশ ব্যাংক এবং শাহ মোঃ তারেক মনসুর, সিনিয়র এক্সিকিউটিভ অফিসার, এসইবিএল এর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি)

  লেখক : শিক্ষানবিস এএসপি (বর্তমানে কুড়িগ্রাম জেলায় সংযুক্ত)

ভালো লাগলে শেয়ার করে দিন :)

0 Comments

Leave a Reply

Avatar placeholder

Your email address will not be published. Required fields are marked *