ই-পেপার

SITE UNDER CONSTRUCTION
বাংলাদেশ পুলিশের মুখপত্র
অব্যাহত প্রকাশনার ৬৩ বছর

আমেনা বেগম বিপিএম

বাংলাদেশ পুলিশের ইতিহাস দু’শ বছরের হলেও পুলিশে নারীদের পদচারণা প্রায় চার দশক। নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠায় সময়ের চেয়ে এগিয়ে থাকা বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সুদূরপ্রসারী উদ্যোগের আলোকে ১৯৭৪ সালে সর্বপ্রথম ছয়জন নারী উপপরিদর্শক (এস.আই) বাংলাদেশ পুলিশে যোগদান করেন। ১৯৮৬ সালে ষষ্ঠ বিসিএস এর মাধ্যমে ক্যাডার সার্ভিসে ফাতেমা বেগম সহকারী পুলিশ সুপার হিসেবে প্রথম এবং ৭ম বিসিএস-এর মাধ্যমে ১৯৮৮ সালে চার জন নারী সহকারী পুলিশ সুপার হিসেবে যোগদান করেন। ১৯৮৮ সালের পর তৎকালীন সরকার সহকারী পুলিশ সুপার পদে ‘নারী’ কর্মকর্তার নিয়োগ স্থগিত করে। ১৯৯৬ সালে বঙ্গবন্ধুর আদর্শে উজ্জীবিত মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকার প্রধান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর বিসিএস (পুলিশ) সার্ভিসে নারী কর্মকর্তাদের পূণরায় অংশগ্রহণের সুযোগ করে দেন। এই ধারাবাহিকতায় ১৯৯৯ সালে ১৮তম বিসিএস-এর মাধ্যমে আটজন নারী সহকারী পুলিশ হিসেবে যোগদান করেন। ১৮তম বিসিএস পরিক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে আমিও ১৯৯৯ সালে এর ২৫ জানুয়ারি বাংলাদেশ পুলিশে যোগদান করি।

আজ থেকে প্রায় ২২ বছর আগে পুলিশে হাতে গোনা কয়েকজন নারী কর্মকর্তাকে প্রতিনিয়ত বন্ধুর পথ অতিক্রম করতে হয়েছে। প্রথমে আমি সহকারী পুলিশ কমিশনার হিসেবে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশে পদায়িত হই। চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশে কাজ করার মাধ্যমে আমি নিত্যনতুন অনেক অভিজ্ঞতা অর্জন করি। পুলিশের একজন নারী কর্মকর্তা তখন অনেক নারীর জন্যই রোল মডেল। অনেকেই বিস্ময় ও কৌতূহল নিয়ে আমাকে পর্যবেক্ষণ করতেন। ২০০০ সালে কুমিল্লা জেলায় শিক্ষানবীশ সহকারী পুলিশ সুপার হিসেবে বাস্তব প্রশিক্ষণ গ্রহণের অংশ হিসেবে থানার কার্যক্রম শিখছিলাম। এমন সময় থানায় সেবা নিতে আসা একজন শিক্ষক আমায় প্রশ্ন করলেন, কেন আমি এই পেশায় এসেছি? তিনি আরো বললেন, একজন নারী হয়ে পুলিশের মতো একটি পেশায় আমি কি করতে পারব? বাস্তবিক অর্থে ২৬ বছর বয়সী পুলিশের ইউনিফর্ম পরিহিত একজন নারী এই অজপাড়াগাঁয়ে থানার অফিসার ইনচার্জের পাশে বসে বড় বড় বালাম বই পড়ে যাচ্ছেন বলেই হয়তো ওই শিক্ষকের হিসেবের গরমিল হয়েছিল। আমি সেদিন মৃদু হেসে উত্তর দিয়েছিলাম যে পুলিশের চাকরিকে আমার পেশা হিসেবে বেছে নেওয়ার কারণ আমার এই উদ্দীপনার ঢেউ যেন আপনার কন্যা সন্তানকেও স্বাবলম্বী হতে উৎসাহ দেয়, সাহস যোগায় প্রত্যয়ী হয়ে এগিয়ে যেতে। ১৯৭৪ থেকে ২০২২ সাল এই চার দশকে বাংলাদেশ পুলিশে নারীর অবস্থানে আমূল পরিবর্তন এসেছে। ১৯৮৬ সালের একজন সহকারী পুলিশ সুপার থেকে আজ বাংলাদেশ পুলিশে অসংখ্য নারী পুলিশ কর্মকর্তার দৃপ্ত পদচারণা।

কালের বিবর্তনে নারী পুলিশ কর্মকর্তাদের অবস্থান, কাজের পরিধি, ব্যাপ্তি ও গতানুগতিক চিন্তাধারায় এসেছে পরিবর্তন। চার দশক আগে পুলিশিং এর মতো চ্যালেঞ্জিং পেশাকে নারী কর্মকর্তার জন্য অনুপযুক্ত মনে করা হত, সেই পুলিশিংই আজ অনেক নারী পুলিশ কর্মকর্তার দৈনন্দিন কার্যক্রমের অবিচ্ছেদ্য অংশ। বাংলাদেশ পুলিশের নারী কর্মকর্তাদের সেই বিষয়টি মানসপটে গেঁথে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ এই পেশায় স্বীয় মেধা, প্রজ্ঞা ও পেশাদারিত্ব দিয়ে অবস্থান তৈরি করে নিতে হবে। এই পেশার কর্মময় জীবনকে আমি আমার সৌভাগ্য হিসেবে মনে করি, কেননা মহান এই পেশার মাধ্যমে বিপদগ্রস্ত একজন মানুষকে সহযোগিতা করা যায় যেমন একজন চিকিৎসক করেন।

একজন নারী হিসেবে পরিবারের প্রতি দায়িত্বপালনের দায়বদ্ধতা পেশাগত দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে একটি চ্যালেঞ্জ। দেশের অভ্যন্তরে দূরবর্তী জেলায় এবং জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে পেশাগত দায়িত্বপালন নারী কর্মকর্তাদের জন্য এক কঠিন চ্যালেঞ্জ। পরিবারের প্রতি দায়িত্ববোধ, সন্তান লালনপালন করে অনেকে নিজেকে তৈরি করতে পারেন না; অনেক গুরুত্বপূর্ণ পদে বদলি বা পদায়ন পেতে আগ্রহী হন না। অনেক মেধাবী কর্মকর্তাও এই দায়বদ্ধতার জন্য নিজেকে বিকশিত করতে পারেননি। ১৯৯৯ সালে বাংলাদেশ পুলিশে প্রথম পুলিশ সুপার হিসেবে মুন্সিগঞ্জ জেলায় পদায়ন পান প্রয়াত অতিরিক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শক রওশন আরা বেগম। পরবর্তীতে ঠাকুরগাঁও, মৌলভীবাজার, গাজীপুর, হবিগঞ্জ, রাঙ্গামাটি, নরসিংদী, রাজবাড়ী জেলায় বাংলাদেশ পুলিশে নারী পুলিশ সুপার অসামান্য পেশাদারিত্ব, দক্ষতা ও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯৭ সালে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পুলিশে সহকারী পুলিশ সুপার পদে নারীদের নিয়োগ উন্মুক্ত না করলে পুলিশ সুপার পদে নারীদের কাজ করার জন্য আরো দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হতো।

বর্তমান সরকারের ধারাবাহিক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় পুলিশে অধিক নারী কর্মকর্তার নিয়োগের সঙ্গে সঙ্গে কর্মক্ষেত্রে তাদের সুনাম ও দক্ষতাও বৃদ্ধি পাচ্ছে। আজ জেলা, মেট্রোপলিটন, রেঞ্জ, র‌্যাব, সিআইডি, এসবি, শিল্প পুলিশ, হাইওয়ে পুলিশ, নৌ পুলিশসহ বিশেষায়িত ইউনিট ও জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনেও নারী কর্মকর্তারা উজ্জ¦ল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে নেতৃত্ব, অপরাধ নিয়ন্ত্রণ, মামলা তদন্ত, গোয়েন্দা তথ্য ব্যবস্থাপনা, ইমিগ্রেশন সেবা, ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ, কমিউনিটি পুলিশিং, এয়ারপোর্ট সিকিউরিটি, জঙ্গিবাদ নিয়ন্ত্রণ, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, সাইবার ক্রাইম নিয়ন্ত্রণে ঈর্ষণীয় সাফল্য অর্জন করেছেন। বর্তমানে জেলা পর্যায়ে কুড়িগ্রাম, গোপালগঞ্জ, লালমনিরহাট, ঝালকাঠি, বান্দরবানের মতো দূরবর্তী জেলায় পুলিশ সুপার পদে নারী কর্মকর্তাগণ বলিষ্ঠভাবে দায়িত্বপালন করছেন। তারা স্বীয় যোগ্যতায় দেশ-বিদেশে প্রশিক্ষণ, সেমিনার, সিম্পোজিয়াম, ওয়ার্কশপে অংশগ্রহণসহ উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করে অর্জিত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা প্রয়োগের মাধ্যমে কর্মক্ষেত্রে দক্ষতার স্বাক্ষর রাখছেন।

পুলিশের নারী সদস্যদের জন্য জেন্ডার সংবেদনশীল কর্মপরিবেশ তৈরি, পেশাগত প্রতিবন্ধকতা থেকে উত্তরণ,  দক্ষতা বৃদ্ধির প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ২০০৮ সালে বাংলাদেশ পুলিশ উইমেন নেটওয়ার্ক (BPWN) প্রতিষ্ঠিত হয়। BPWN পেশাগত দায়িত্বপালনরত নারীদের সবচেয়ে বড় সংগঠন যার সদস্য সংখ্যা প্রায় ১৫ হাজার এবং বর্তমানে ডিআইজি হতে নারী কনস্টেবল সবাই এই নেটওয়ার্ক-এর সদস্য। ইউএনডিপি’র সহায়তায় পুলিশ রিফর্ম প্রোগ্রাম (পিআরপি)-এর পৃষ্ঠপোষকতায় এই নেটওয়ার্ক কর্মক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার মাধ্যমে এগিয়ে যাওয়া নারী পুলিশ সদস্যদের অগ্রযাত্রার সাক্ষী হয়েছে। ২০১৫ সালে পিআরপির পরিসমাপ্তি হলেও বাংলাদেশ পুলিশের সহায়তায় এবং মাননীয় ইন্সপেক্টর জেনারেল ড. বেনজীর আহমেদ বিপিএম (বার) মহোদয়ের পৃষ্ঠপোষকতার BPWN এর কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। একই কর্মধারায় সকল ইউনিটে কর্মরত নারী পুলিশ সদস্যদের পরিচালনা, কর্মসাধন, পেশাদারিত্ব বৃদ্ধি, মেধা ও দক্ষতার মূল্যায়ন সর্বোপরি অধিকতর কর্মোদ্দীপনা তৈরি করতে BPWN কৌশলগত পরিকল্পনা ২০২১-২০২৩ এর পাঁচটি লক্ষ্য বাংলাদেশ পুলিশকে অষ্টম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা, এসডিজি লক্ষ্যমাত্রাগুলো অর্জন, রূপকল্প-২০৪১ এবং ডেল্টা প্ল্যান-২১০০ বাস্তবায়নে সহায়তা করবে।

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী এবং মুজিববর্ষের লক্ষ্য অর্জনে বাংলাদেশ পুলিশের সব থানায় নারী, শিশু, বয়স্ক ও প্রতিবন্ধী সহায়তা ডেস্ক চালুকরণ এবং সাইবার স্পেসে নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের জন্য বাংলাদেশ পুলিশ সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেন নারী পুলিশ সদস্যদের কর্মক্ষেত্রে সেবা দানে অনন্য মাত্রা যোগ করেছে। ‘টেকসই আগামীর জন্য; জেন্ডার সমতাই আজ অগ্রগণ্য’ নারী দিবস ২০২২ এর এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে সংবেদনশীল পুলিশ পরিষেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে পুরুষের পাশাপাশি বাংলাদেশ পুলিশের নারী সদস্যরা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্নের বাংলাদেশকে উন্নয়নের রোল মডেল হিসেবে বিনির্মাণে মুক্তিযুদ্ধের মূলমন্ত্রে উজ্জীবিত হয়ে দক্ষতা, পেশাদারিত্ব ও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন।

লেখক : প্রেসিডেন্ট, বাংলাদেশ পুলিশ উইমেন নেটওয়ার্ক

ডেপুটি ইন্সপেক্টর জেনারেল (ডিআইজি)

প্রটেকশন অ্যান্ড প্রটোকল

স্পেশাল ব্রাঞ্চ, বাংলাদেশ পুলিশ

ভালো লাগলে শেয়ার করে দিন :)

0 Comments

Leave a Reply

Avatar placeholder

Your email address will not be published. Required fields are marked *