ই-পেপার

SITE UNDER CONSTRUCTION
বাংলাদেশ পুলিশের মুখপত্র
অব্যাহত প্রকাশনার ৬৩ বছর

ভাগ্যশ্রী রায় যুথী

স্বাধীনতার ৫০ বছর পেরিয়ে একটি উন্নত-সমৃদ্ধ দেশ হবার পথে রয়েছে বাংলাদেশ। এক সময়ের ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’র অপবাদ দূর করে উন্নয়নের মহাসড়কে আমাদের গতি এখন অপ্রতিরোধ্য। উন্নয়নশীল বিশ্বের দেশগুলোর কাছে বাংলাদেশ এখন উন্নয়নের রোল মোডেল। একই সাথে নারীর ক্ষমতায়নেও বাংলাদেশ অনেক অনেক দেশের কাছে অনুসরণযোগ্য।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সুযোগ্য কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনার বলিষ্ঠ নেতৃত্বে দেশের অর্থনীতির পাশাপাশি সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক প্রতিটি ক্ষেত্রে ঘটেছে অবিশ্বাস্য পরিবর্তন। বদলে যাওয়া এই বাংলাদেশে নারীর ক্ষমতায়নও ঘটেছে প্রশ্নাতীতভাবে। নারীদের ক্ষমতায়নে নজিরবিহীন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তার আমলে সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে শুরু করে স্থানীয় প্রশাসন ও তৃণমূল পর্যন্ত নারীর ক্ষমতায়নের ঘটেছে প্রসার। নারী শিক্ষা নিশ্চিত করা, অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করা এবং সুরক্ষা ও অধিকার নিশ্চিত করতে আইন প্রণয়নের পাশাপাশি সবক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে যাচ্ছেন বঙ্গবন্ধুকন্যা। নারীর ক্ষমতায়ন ও উন্নয়ন ছাড়া দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন সম্ভব নয় এমন উপলব্ধি থেকেই জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার পর নানা পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। উপহার দিয়েছিলেন বাহাত্তরের সংবিধান। যেখানে বলিষ্ঠভাবে নারী-পুরুষের মর্যাদা সমুন্নত করা হয়েছে। বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা জাতির পিতার দর্শন অনুসারে দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠী নারীর অর্থনৈতিক, সামাজিক, পারিবারিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের নতুন ধারা সূচিত করেন।

বর্তমান সরকার ২০০৯ সালে ক্ষমতায় এসে জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি ২০১১ প্রণয়ন করে। জাতীয় সংসদের স্পিকার পদে একজন নারীকে নির্বাচিত করেন। শেখ হাসিনাই পথম তার মন্ত্রীসভায় প্রথম স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীর পদে নারীকে দায়িত্ব দেন। সংসদ উপনেতাও হন একজন নারী। তিনিই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম নারী উপাচার্য, উচ্চ আদালতের বিচারপতি, প্রথম সংখ্যালঘু নারী সেনাবাহিনীর মেজর করেছেন। স্থানীয় সরকার পর্যায়ে নারীর ক্ষমতায়নে ইউনিয়ন পরিষদে নারী জনপ্রতিনিধিকে সরাসরি ভোটে নির্বাচনের ব্যবস্থা করেছেন তিনি। বাল্যবিবাহ রোধ ও নারী নির্যাতন প্রতিরোধে কঠোর আইন করেছে সরকার। সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত মেয়েদের বিনা বেতনে শিক্ষার ব্যবস্থাও করেন শেখ হাসিনা। যে কারণে দেশে নারী শিক্ষার হার ৫০ দশমিক ৫৪ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। শিক্ষা সহায়তা ট্রাস্ট ফান্ড গঠন করে প্রাথমিক থেকে স্নাতকোত্তর পর্যন্ত নারীদের শিক্ষা বৃত্তি প্রদান করা হচ্ছে।

দুস্থ, অসহায় ও পিছিয়ে পড়া নারীদের জন্য ভিজিএফ, ভিজিডি, দুস্থ ভাতা, বয়স্কা ভাতা, মাতৃত্বকালীন ও গর্ভবতী মায়েদের ভাতা, অক্ষম মা ও স্বামী পরিত্যাক্তাদের জন্য ভাতা, বিধবা ভাতা, কাজের বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচিসহ বিভিন্ন কর্মসূচি প্রণয়ন করেছে শেখ হাসিনার সরকার। সর্বক্ষেত্রে সন্তানের পরিচয় ও নিবন্ধনে বাবার নামের পাশাপাশি মায়ের নামও যুক্ত করা হয়েছে তার আমলেই। এছাড়া নারীদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করতে কোনও জামানত ছাড়াই সর্বোচ্চ ২৫ লাখ টাকা এসএমই ঋণ দেয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে।

বাংলাদেশের নারী নেতৃত্ব বিশ্বজুড়েই আলোচিত। বর্তমানে দেশের প্রধানমন্ত্রী, জাতীয় সংসদের স্পিকার নারী। জাতীয় সংসদের উপনেতা এবং মন্ত্রিসভায় একজন পূর্ণ মন্ত্রী, দুজন প্রতিমন্ত্রী ও একজন উপমন্ত্রী রয়েছেন নারী। জাতিসংঘসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আটজন নারী রাষ্ট্রদূত দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন। নারীর ক্ষমতায়নে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত বাংলাদেশ, যা বিশ্বের অনেক দেশের কাছেই রোল মডেল। রাজনীতি, প্রশাসন, পররাষ্ট্র, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ সব ক্ষেত্রেই নারীর লক্ষণীয় সরব উপস্থিতি। প্রথম নারী উপাচার্য, প্রথম নারী পর্বতারোহী, বিজিএমইএর প্রথম নারী সভাপতিসহ অসংখ্য প্রথম গত এক দশকেই সৃষ্টি হয়েছে। নারীদের এই অভূতপূর্ব ক্ষমতায়ন ও অগ্রগতির পথ তৈরি করে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। নারীর ক্ষমতায়নের রূপকার তিনি। শিক্ষায় নারীদের শতভাগ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা, অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করে তোলা, নারীবান্ধব কর্মপরিবেশ সৃষ্টি করা, আইন প্রণয়নের মাধ্যমে নারীদের সুরক্ষা ও অধিকার নিশ্চিত করা এবং রাজনীতিতে নারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণকে উৎসাহিত করার জন্য শেখ হাসিনার গৃহীত উদ্যোগ ও সাফল্য অভাবনীয়। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম প্রকাশিত বৈশ্বিক লিঙ্গবিভাজন সূচক, ২০১৮ অনুযায়ী বিশে^ লিঙ্গবৈষম্য কমানোর ক্ষেত্রে দক্ষিণ এশিয়ার শীর্ষে বাংলাদেশের অবস্থান।

নারীর ক্ষমতায়নে বাংলাদেশ বিশ্বে এক অনন্য নজির স্থাপন করেছে, ফলে নারীর ক্ষমতায়নে, নারী উন্নয়নে বৈশ্বিক সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী। সমতাভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশের অবস্থান দক্ষিণ এশিয়ায় একেবারে শীর্ষে। ২০১১ সালে বাংলাদেশের নারী শিক্ষার হার ছিল ৪৬ শতাংশ যা বর্তমানে ৭১ শতাংশ। আজ দেশের নারীরা সচিব, বিচারক, এসপি, ডিসি, ওসি, সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনীতে উচ্চপদে দক্ষতার সহিত দায়িত্ব পালন, ব্যবসা, শিল্পোদ্যোগসহ সবক্ষেত্রেই সফলতার সঙ্গে কাজ করছে। এছাড়া নারী ও শিশু নির্যাতন ট্রাইব্যুনাল ২০০৭ সালে ছিল ৪৫টি, বর্তমানে ১০৩টি।

প্রশাসনসহ সরকারি বিভিন্ন দফতরে বেড়েছে নারীর অংশগ্রহণ। গত বছরের মার্চের একটি হিসাব অনুযায়ী, দেশে তখন সচিব ও সচিব পদমর্যাদার ৭৭ জন কর্মকর্তার মধ্যে নারী ছিলেন ১০ জন, ৫১১ জন অতিরিক্ত সচিবের মধ্যে নারী ৮৩ জন, ৬৩৬ জন যুগ্ম-সচিবের মধ্যে নারী ৮১ জন, ৬৯৫ উপসচিবের মধ্যে নারী ৩৪৯ জন, এক হাজার ৫৪৯ জন সিনিয়র সহকারী সচিবের মধ্যে নারী ৪৫৪ জন এবং এক হাজার ৫২৮ জন সহকারী সচিবের মধ্যে নারী ছিলেন ৪৭২ জন। প্রশাসনের কেন্দ্র, সচিবালয় থেকে শুরু করে মাঠ পর্যায়ের জেলা-উপজেলা পর্যায়ের নির্বাহী পদে বাড়ছে নারীর অংশগ্রহণ। দেশে বর্তমানে জেলা প্রশাসক (ডিসি) পদে ৮ ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পদে ১৩৮ জন নারী কর্মরত রয়েছেন।

পুলিশ বাহিনীতেও সাফল্যের সঙ্গে এগিয়ে যাচ্ছে নারীরা। পুলিশ বাহিনীতে নারী প্রথম নাম লেখায় ১৯৭৪ সালে। ১৪ নারী পুলিশ সদস্য দিয়ে শুরু। এর মধ্যে সাতজন ছিলেন সাব-ইন্সপেক্টর, সাতজন কনস্টেবল। দীর্ঘ সময় পর ১৯৮৬ সালে এসে বিসিএস ক্যাডারে প্রথম নারী কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হয়। কর্মক্ষেত্রে ধারাবাহিক সফলতা দেখিয়ে বর্তমানে নারী ডিআইজি রয়েছেন দুজন, অ্যাডিশনাল ডিআইজি তিনজন, পুলিশ সুপার ৭১ জন, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ১০৯ জন ও সহকারী পুলিশ সুপার রয়েছেন ১০০ জন। এ ছাড়া নারী ইন্সপেক্টর রয়েছেন ১০৯, এসআই ৭৯৭, সার্জেন্ট ৫৮, এএসআই এক হাজার ১০৯, নায়েক ২১১ এবং কনস্টেবল ১২ হাজার ৫৯৪ জন। বর্তমানে দেশের পাঁচ জেলা কুড়িগ্রাম, বান্দরবান, ঝালকাঠি, গোপালগঞ্জ ও লালমনিরহাটের দায়িত্বে আছেন নারী পুলিশ সুপার (এসপি)।

দেশের মোট জনসংখ্যার অর্ধেকই নারী, তাই সামগ্রিক উন্নয়ন তথা প্রতিনিধিত্বশীল উন্নয়নের জন্য নারীর অংশগ্রহণ অবশ্যম্ভাবী। সহশ্রাব্দ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বিশেষ ভাবে ক্ষুধা ও দারিদ্র মুক্ত বাংলাদেশ সৃষ্টির স্বার্থে প্রত্যেকটি উন্নয়নশীল এবং গুরুত্বপূর্ণ সেক্টরে নারীর অংশগ্রহণকে আরো জোরালো এবং সক্রিয় করে তুলতে হবে। নারীর ক্ষমতায়নের বলে বাংলাদেশের নারীরা এখন সাবলম্বী হয়ে উঠেছে, আত্মবিশ্বাসী এবং আত্মপ্রত্যয়ী হয়ে উঠেছে বহুগুণে। নিজেদের লুকিয়ে থাকা প্রতিভাকে প্রস্ফুটিত করে জীবনকে আপন মহিমায় মহিমান্বিত করে তুলছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যোগ্য পিতার সুযোগ্য সন্তান হয়ে নিরলস প্রচেষ্টায় নারীর ক্ষমতায়নের মাধ্যমে শিক্ষিত- সুন্দর বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় ঐক্যবদ্ধ হয়েছেন। তার এই অসামান্য অবদান নারীদের আরও আত্মপ্রত্যয়ী এবং দেশের জন্য উদ্যমী হওয়ার অনুপ্রেরণা দিবে নিঃসন্দেহে।

নারী উন্নয়ন ও ক্ষমতায়নে অবদান রাখায় গ্লোবাল উইমেন্স লিডারশিপ, প্ল্যানেট ফিফটি ফিফটি চ্যাম্পিয়ন, এজেন্ট অব চেঞ্জসহ নানাবিধ সম্মাননা অর্জন করেছেন শেখ হাসিনা। তাঁর হাত ধরেই আরো এগিয়ে যাবে বাংলাদেশ, এগিয়ে যাবে বাংলাদেশের নারীরা, এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

লেখক : শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

ভালো লাগলে শেয়ার করে দিন :)

0 Comments

Leave a Reply

Avatar placeholder

Your email address will not be published. Required fields are marked *