ই-পেপার

SITE UNDER CONSTRUCTION
বাংলাদেশ পুলিশের মুখপত্র
অব্যাহত প্রকাশনার ৬৩ বছর

শাহরিয়ার বিন সালেহ

হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সুযোগ্য কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার

নেতৃত্বে বাংলাদেশ সারা বিশ্বে উন্নয়নের এক রোল মডেলে পরিণত হয়েছে। অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি আর্থসামাজিক উন্নয়নের সংমিশ্রণে ২০০৯ সাল হতে এক যুগে এদেশের মানুষের মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি পেয়েছে; ক্রয় ক্ষমতা বেড়েছে; মানুষের গড় আয়ু বৃদ্ধি পেয়েছে এবং শিক্ষা ও মানব সম্পদের প্রভূত উন্নয়ন সাধিত হয়েছে।

১,৪৮,৪৬০ বর্গ কি:মি: আয়তনের এ দেশে বর্তমানে জনসংখ্যা আনুমানিক ১৬ কোটির কিছু বেশি। বর্তমানে দেশে জিডিপির পরিমাণ ৪০৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। বাংলাদেশ এখন বিশ্বে ৩৩তম বড় অর্থনীতির দেশ। বর্তমানে দেশের মাথাপিছু আয় দুই হাজার ৫৫৪ মার্কিন ডলার। বাংলাদেশ এখন মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হয়েছে।

কে ভেবেছিল একাত্তরের স্বাধীনতা সংগ্রামের পরে অবকাঠামোগত ধ্বংসস্তূপের ভেতর দিয়ে মাত্র ৫০ বছরেই বাংলাদেশে এরূপ অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটবে। স্বাধীনতাযুদ্ধের পর বাংলাদেশ ছিল অর্থনৈতিক এবং সামাজিকভাবে বিধ্বস্ত একটি দেশ। পাকিস্তানের ২৩ বছরের ঔপনিবেশিক দুঃশাসন ও ন্যায্য হিসাব থেকে বঞ্চনার কারনে এ দেশের মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থা ছিল খুবই নাজুক। আর মুক্তিযুদ্ধের প্রায় ৯ মাসে পাকিস্তানী বর্বর সেনাবাহিনী এদেশের সড়ক, রেল-যোগাযোগসহ অবকাঠামো খাত সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেয়। গ্রাম এবং শহর জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দেয়। ফসলের ক্ষেত ধ্বংস করে দেয়। এদেশের শস্য উৎপাদন থেকে শুরু করে অন্যান্য অর্থনৈতিক প্রক্রিয়াকে ধ্বংস করে দেয়। ফলে স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান একটি নিঃস্ব, রিক্ত এবং ধ্বংসপ্রাপ্ত দেশ পান। জাতির পিতার অসমাপ্ত কাজ গত এক যুগ ধরে অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন তাঁরই সুযোগ্য কন্যা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

বর্তমানে দেশে মেগা প্রজেক্টগুলোর কাজ চলছে তা বাস্তবায়ন শেষে আশা করা যায় যে, ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ একটি উন্নত, সমৃদ্ধ দেশে পরিণত হবে। এ মেগা প্রজেক্টগুলোর বৈশিষ্ট্য এবং সফলতা নিচে তুলে ধরা হলো :

(১) পদ্মা সেতু :

(ক) বৈশিষ্ট্য

* মোট দৈর্ঘ্য ৬.১৫ কিলোমিটার (২০,২০০ ফুট)।

* প্রস্থ ১৮.১০ মিটার (৫৯.৪ ফুট)।

* পদ্মা সেতু বাংলাদেশের পদ্মা নদীর উপর নির্মাণাধীন একটি বহুমুখী সড়ক ও রেল সেতু। এর মাধ্যমে মুন্সিগঞ্জের লৌহজংয়ের সঙ্গে শরীয়তপুর ও মাদারীপুর জেলা যুক্ত হবে। ফলে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম অংশের সঙ্গে উত্তর-পূর্ব অংশের সংযোগ ঘটবে। বাংলাদেশের জন্য পদ্মা সেতু হতে যাচ্ছে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জিং নির্মাণ প্রকল্প।

* দুই স্তরবিশিষ্ট স্টিল ও কংক্রিট নির্মিত ট্রাস ব্রিজটির ওপরের স্তরে থাকবে চার লেনের সড়ক পথ এবং নিচের স্তরটিতে থাকবে একটি একক রেলপথ।

* পদ্মা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা নদীর অববাহিকায় ১৫০ মিটার দৈর্ঘ্যরে ৪১টি স্পান ইতিমধ্যে বসানো সম্পন্ন হয়েছে।

(খ) অর্থনৈতিক গুরুত্ব

* প্রস্তাবিত পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্প মাওয়া-জাজিরা পয়েন্ট দিয়ে নির্দিষ্ট পথের মাধ্যমে দেশের কেন্দ্রের সঙ্গে দক্ষিণ-পশ্চিম অংশের সরাসরি সংযোগ তৈরি করবে। এই সেতুটি অপেক্ষাকৃত অনুন্নত অঞ্চলের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও শিল্প বিকাশে উল্লেখযোগ্যভাবে অবদান রাখবে। প্রকল্পটির ফলে প্রত্যক্ষভাবে প্রায় ৪৪ হাজার বর্গ কি: মি: (১৭ হাজার বর্গমাইল), যা বাংলাদেশের মোট এলাকার ২৯% সে অঞ্চলজুড়ে তিন কোটিরও অধিক জনগণ প্রত্যক্ষভাবে উপকৃত হবে। ফলে প্রকল্পটি দেশের পরিবহন নেটওয়ার্ক এবং আঞ্চলিক অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। সেতুটিতে ভবিষ্যতে গ্যাস, বৈদ্যুতিক লাইন এবং ফাইবার অপটিক কেবল সম্প্রসারণের ব্যবস্থা রয়েছে। এই সেতুটি নির্মিত হলে দেশের জিডিপি ১.২ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পাবে।

* পদ্মা সেতু হতে পারে এদেশে অর্থনীতির “গেম চেঞ্জার”। এ সেতুর মাধ্যমে দেশের উত্তর-মধ্য এবং পূর্বাঞ্চলের সাথে বিস্তীর্ণ দক্ষিণাঞ্চল সরাসরি সড়ক এবং রেলের মাধ্যমে সংযুক্ত হবে। দেশের দক্ষিণাঞ্চলে রয়েছে বিস্তীর্ণ সমুদ্র ও উপকূলীয় অঞ্চল, যা যোগাযোগ ব্যবস্থার অপ্রতুলতার কারণে এতদিন ছিল অবহেলিত। পদ্মাসেতুর মাধ্যমে রাজধানী ঢাকার সঙ্গে দেশের উত্তর এবং মধ্যাঞ্চলের অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলো সরাসরি সংযুক্ত হতে পারবে মংলা বন্দর ও নির্মাণাধীন পায়রা গভীর সমুদ্র বন্দরের সঙ্গে। এছাড়া এ অঞ্চলের বিস্তীর্ণ সমুদ্র তটের দৈর্ঘ্য মাথায় রেখে বলা যায়, ভবিষ্যতে এ অঞ্চলে আরো সমুদ্র বন্দর নির্মাণের সম্ভাবনা আছে। পদ্মা সেতুর মাধ্যমে দক্ষিণাঞ্চলের কৃষি, মৎস্য, পশুপালন, পর্যটন, সেবা ও সার্ভিস খাতের ব্যাপক উন্নয়ন ঘটবে বলে আশা করা যায়।

(২) পায়রা গভীর সমুদ্রবন্দর ও মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মাণ

(ক) পায়রা গভীর সমুদ্রবন্দরের বৈশিষ্ট্য

* পায়রা বন্দর পটুয়াখালী জেলায় অবস্থিত বাংলাদেশের তৃতীয় সামুদ্রিক বন্দর। এটি বাংলাদেশের পটুয়াখালী জেলার কলাপাড়া উপজেলায় অবস্থিত।

* ২০১৩ সালের ১৯ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা টিয়াখালী ইউনিয়নের ইটবাড়িয়া গ্রামে এর ভিত্তিফলক উন্মোচন করেন।

* আগস্ট ১৩, ২০১৬ সালে সমুদ্রবন্দরটির আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়।

* পায়রা বন্দরের চ্যানেলের ৩৫ কিলোমিটার এলাকায় ড্রেজিং করা হলে জোয়ারের সময়ে ১৬ মিটার গভীর এবং ৩০০ মিটার দৈর্ঘ্যবিশিষ্ট জাহাজ আসতে পারবে।

* বন্দরটি আমদানি ও রপ্তানির জন্য একটি সরকারি রুট। ৫ নভেম্বর জাতীয় সংসদে পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষ আইন, ২০১৩ পাস হয়।

* পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষ একটি সরকারি স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা, যেটি পায়রা সামুদ্রিক বন্দর পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে নিয়োজিত। এর সদর দপ্তর বাংলাদেশের পটুয়াখালী জেলায় অবস্থিত।

* প্রায় ছয় হাজার একর জায়গায় এটি গড়ে উঠেছে যেখানে বিশাল অবকাঠামো বানানো হচ্ছে।

(খ) মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরের বৈশিষ্ট্য

* মাতারবাড়ি বন্দর কক্সবাজার জেলার মাতারবাড়ি এলাকায় নির্মাণাধীন গভীর সমুদ্রবন্দর।

* এই বন্দরে অন্তত ১৫ মিটার গভীরতা বা ড্রাফটের জাহাজ অনায়াসে ঢুকতে পারবে।

* প্রস্তাবিত মাতারবাড়ি বন্দরের গভীরতা ১৬ মিটার হওয়ায় প্রতিটি জাহাজ আট হাজারের বেশি কন্টেইনার আনতে পারবে।

* মাতারবাড়ি বন্দর স্থাপনের কাজে প্রায় ১৪.৩ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি নৌ-চ্যানেল তৈরি হচ্ছে।

* প্রধান ন্যাভিগেশনাল চ্যানেল ৩৫০ মিটার প্রশস্ত। সে সঙ্গে বন্দরের অর্থায়নে নির্মাণ করা হবে ১০০ মিটার দীর্ঘ জেটি।

* ২০২৬ সালের নভেম্বর মাসে গভীর সমুদ্রবন্দরটির বহুমুখী টার্মিনাল কন্টেইনার জাহাজের জন্য প্রস্তুত হবে।

* মাতারবাড়ী বন্দর নির্মাণের প্রাথমিক পরিকল্পনায় প্রথম ধাপে রয়েছে দুটি টার্মিনাল। সাধারণ পণ্যবাহী ও কনটেইনার টার্মিনালে বড় জাহাজ (মাদার ভ্যাসেল) ভিড়তে পারবে, যেটি এখন বাংলাদেশের কোনো বন্দর জেটিতে ভিড়তে পারে না।

* নির্মাণের প্রথম পর্যায়ে কন্টেইনার টার্মিনালটি ১৮ হেক্টর জমিতে নির্মিত হবে এবং ৪৬০ মিটার দীর্ঘ বার্থ থাকবে। এটি আট হাজার টিইইউ জাহাজ ধারণ করতে সক্ষম হবে এবং এর বার্ষিক ক্ষমতা ছয় লাখ থেকে ১.১ মিলিয়ন টিইইউ হবে।

(গ) অর্থনৈতিক গুরুত্ব

* পটুয়াখালীর পায়রা এবং কক্সবাজারের মাতরবাড়ীতে নির্মিতব্য দুটি গভীর সমুদ্রবন্দর বিদ্যমান চট্টগ্রাম ও মংলাবন্দরের ওপর চাপ কমিয়ে দেশের আমদান-রপ্তানিকে আরো গতিশীল করবে মর্মে আশাবাদ ব্যক্ত করা যায়।

(৩) রূপপুর পারমাণবকি বিদ্যুৎ কেন্দ্র, পাবনা

(ক) বৈশিষ্ট্য

* রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র হচ্ছে ২.৪ গিগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন একটি পরিকল্পিত পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, যা বাংলাদেশের পাবনা জেলার ঈশ্বরদী উপজেলার রূপপুর নামক স্থানে নির্মিত হচ্ছে।

* এটি হতে যাচ্ছে বাংলাদেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, যার প্রথম ইউনিট ২০২৩ সালে বিদ্যুৎ উৎপাদন কার্যক্রম শুরু করবে।

* এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি রাশিয়ার রোসাটোম স্টেট অ্যাটমিক এনার্জি কর্পোরেশন কর্তৃক নির্মিত হচ্ছে।

(খ) অর্থনৈতিক গুরুত্ব

* দেশের জ্বালানি স্বনির্ভরতা এবং টেকসই ও নিরাপদ জ¦ালানি মজুদের ক্ষেত্রে রূপপুর পারমাণবকি বিদ্যুৎ প্রকল্প একটি বিরাট মাইলফলক। এ বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মাধ্যমে দেশের বিদ্যুৎ সক্ষমতা নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পাবে।

(৪) এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ

বৈশিষ্ট্য

*           এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) সহায়তায় ‘ঢাকা-সিলেট সিক্স লেন এক্সপ্রেসওয়ে। এর দৈর্ঘ্য হবে ২০৯ কিলোমিটার। এতে ফ্লাইওভার থাকবে আটটি, ওভারপাস থাকবে ২২টি। রেল ওভারপাস থাকবে পাঁচটি, ব্রিজ

থাকবে ৬৯টি। আন্ডারপাস থাকবে ১০টি, ফুটওভার ব্রিজ থাকবে ২৯টি।

*           ঢাকা থেকে বঙ্গবন্ধু সেতু হয়ে রংপুর পর্যন্ত ছয় লেন এক্সপ্রেসওয়ের কাজ চলমান রয়েছে।

*           দেশে সড়ক যোগাযোগ উন্নত করতে উত্তরাঞ্চলে ‘এক্সপ্রেস হাইওয়ে’ নির্মাণ করছে সরকার। সাসেক-৩ প্রকল্পের আওতায় বুড়িমারী থেকে রংপুরের পায়রাবন্দর পর্যন্ত চার লেনের এই সড়ক নির্মাণ করা হবে।

*           প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে শক্তিশালী যোগাযোগ গড়ে তুলতে দেশের সমুদ্রবন্দর ও কয়েকটি স্থলবন্দরকে সংযুক্ত করে আটটি এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের জন্য একটি মেগা পরিকল্পনা প্রস্তুত করছে সরকার।

*           দেশের দক্ষিণ ও উত্তরাঞ্চলকে যুক্ত করতে পাঁচটি এক্সপ্রেসওয়ে; পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চলকে সংযুক্ত করতে তিনটি এক্সপ্রেসওয়ে মোট আটটি এক্সপ্রেসওয়ে নির্মিত হবে।

*           প্রস্তাবিত চার লেনের এক্সপ্রেসওয়েগুলোর মোট দৈর্ঘ্য হবে দুই হাজার ৩৫২ কিলোমিটার। কেবল দূরপাল্লার যাত্রী ও মালবাহী যানবাহনকে টোল দেওয়ার বিনিময়ে এক্সপ্রেসওয়েগুলো ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হবে।

*           এক্সপ্রেসওয়েগুলো ব্যবহার করে দূরপাল্লার যানবাহনগুলো যেমন ঢাকার যানজট এড়িয়ে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারবে, তেমনি এর ফলে রাজধানীতেও যানবাহনের চাপ কমবে।

*           উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলকে যুক্ত করার জন্য সিলেটের তামাবিল স্থলবন্দর থেকে কক্সবাজারের গুনদুম পর্যন্ত প্রথম এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ করা হবে। এটি চট্টগ্রাম ও মাতারবাড়ী সমুদ্রবন্দরকেও সংযুক্ত করবে।

*           ময়মনসিংহের গোবরাকুড়া স্থলবন্দর থেকে আরেকটি এক্সপ্রেসওয়ে গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায় এসে দুই দিকে চলে যাবে এক ভাগ যাবে মোংলা বন্দরে, অন্যটি পায়রা বন্দরে।

*           সাতক্ষীরার ভোমরা স্থলবন্দর থেকে আরও একটি এক্সপ্রেসওয়ে নীলফামারীর জলঢাকায় দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে একটি যাবে পঞ্চগড়ের বাংলাবান্ধা স্থলবন্দরের দিকে, অন্যটি লালমনিরহাটের বুড়িমারী স্থলবন্দরের দিকে।

*           পূর্ব ও পশ্চিমে বেনাপোল স্থলবন্দর থেকে কুমিল্লার লাকসাম পর্যন্ত একটি এক্সপ্রেসওয়ে প্রস্তাব করা হয়েছে। এটি চাঁদপুর-শরীয়তপুর পয়েন্টে মেঘনা নদীর ওপর একটি সেতুসহ তামাবিল-গুনদুম এক্সপ্রেসওয়ের সাথে মিলিত হবে।

*           আরেকটি এক্সপ্রেসওয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় তামাবিল-গুনদুম এক্সপ্রেসওয়েকে চাঁপাইনবাবগঞ্জের সোনা মসজিদ স্থলবন্দরের সঙ্গে যুক্ত করবে বলে কথা রয়েছে। ব্রহ্মপুত্র নদের ওপর সেতুসহ তামাবিল থেকে জয়পুরহাট পর্যন্ত আরও একটি এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের প্রস্তাব করা হয়েছে।

(খ) অর্থনৈতিক গুরুত্ব

*           রাজধানী ঢাকার সঙ্গে সারাদেশের বিভাগীয় ও গুরুত্বপূর্ণ শহর, বন্দর এবং পর্যটনকেন্দ্রগুলো সঙ্গে বর্তমানে নির্মিতব্য ছয় লেন ও চারলেনের এক্সপ্রেসওয়েগুলো বাংলাদেশের ৬৪টি জেলা, উপজেলা এবং গ্রামকে একটি অভিন্ন যোগাযোগ নেটওয়ার্ক কাঠামোর ভেতরে নিয়ে আসবে। ফলে অর্থনৈতিক গতিশীলতা বহুগুণ বেড়ে যাবে। পর্যটন খাতের বিকাশ হবে বিস্ময়কর।

(৫) রেলপথ নির্মাণ

(ক) ঢাকা- চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেল প্রকল্প

বৈশিষ্ট্য

*           বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রকল্পের মধ্যে অন্যতম সর্বোচ্চ ব্যয়ের প্রকল্প হতে যাচ্ছে ঢাকা-চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেল প্রকল্প। স্থানীয় ১৩টি ছোট-বড় নদী-খাল পেরিয়ে সরসারি ঢাকা থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত রেলপথ নির্মিত হবে। প্রকল্পের আওতায় গুরুত্বপূর্ণ আটটি কম্পোনেন্ট রয়েছে। টঙ্গী খাল, বালু নদী, শীতলক্ষ্যা, আড়িয়াল খাঁ, পুরাতন ব্রহ্মপুত্র, মেঘনা, ছোট ফেনী, মুহরী, ফেনী, কর্ণফুলী, মাতামুহরী শাখা নদী ও পুরাতন মাতামুহরী শাখা নদী পেরিয়ে রেলপথ নির্মাণ করা হবে।

*           দোহাজারী থেকে রামু হয়ে কক্সবাজার পর্যন্ত ৯৯ দশমিক ৩ কিলোমিটার এবং রামু থেকে ঘুমধুম পর্যন্ত ২৮ দশমিক ৯৬ কিলোমিটার রেলপথ নির্মাণ করা হবে। অর্থাৎ প্রকল্পের আওতায় মোট ১২৭ দশমিক ৬৬ কিলোমিটার সিংগেল লাইনকে ডুয়েল গেজ ট্রাক নির্মাণ করা হবে, যা পরে ট্রান্স এশিয়ান রেলওয়ের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করবে। এছাড়া রেল যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের মাধ্যমে পর্যটন নগরী কক্সবাজারের সুবিধা আরও বাড়বে।

(খ) ঢাকা-পদ্মাসেতু-যশোর রেলপথ

বৈশিষ্ট্য

*           পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পের মাধ্যমে রেলওয়ে নেটওয়ার্কের আওতায় বাংলাদেশের দক্ষিণ এবং দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলকে আনা হবে।

*           প্রথম ধাপে ঢাকার কমলাপুর থেকে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জেলা যশোর পর্যন্ত ১৭২ কিলোমিটার ব্রডগেজ রেললাইন নির্মাণ করা হবে।

*           রেলপথটি ঢাকার কমলাপুর থেকে শুরু হয়ে নারায়ণগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, মাদারীপুর, শরীয়তপুর, ফরিদপুর, গোপালগঞ্জ, নড়াইলের ওপর দিয়ে গিয়ে শেষ হবে যশোরে।

*           প্রথম সেকশন কমলাপুর থেকে গেন্ডারিয়া পর্যন্ত হবে ডুয়েলগেজ ডাবল লাইন।

*           দ্বিতীয় সেকশন হবে গেন্ডারিয়া থেকে মাওয়া ৩৬ কিলোমিটার সিঙ্গেল লাইন। এটি ব্রডগেজ। এই সেকশনে থাকবে চারটি স্টেশন।

*           তৃতীয় সেকশন হবে মাওয়া থেকে ভাঙ্গা জংশন পর্যন্ত ৪২ কিলোমিটার। এটিও হবে সিঙ্গেল লাইন ব্রডগেজ। এই ৪২ কিলোমিটারের মধ্যে স্টেশন থাকবে পাঁচটি।

ম         চতুর্থ সেকশনে ভাঙ্গা থেকে রূপদিয়া পর্যন্ত রেলপথ হবে ৮৬ কিলোমিটার। এটিও হবে ব্রডগেজ সিঙ্গেল লাইন। এই অংশে স্টেশন হচ্ছে ১০টি।

(গ) অর্থনৈতিক গুরুত্ব

*           ঢাকা-কক্সবাজার এবং পদ্মাসেতু-যশোর ও পদ্মাসেতু-পায়রা বন্দর রেলওয়ে স্থাপন এবং যমুনা নদীর উপর নির্মিতব্য নতুন বঙ্গবন্ধু রেলসেতু, খুলনা-মংলা বন্দর রেলসেতুর কাজ অব্যাহত গতিতে এগিয়ে চলছে যা বাস্তবায়িত হলে এদেশে রেলে আসবে বিপ্লব। সড়কের মত পুরো বাংলাদেশ একটি অভিন্ন রেল নেটওয়ার্কে সংযুক্ত হয়ে যাবে। দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধিত হবে এবং অর্থনীতিতে রেল যোগাযোগের প্রভাব হবে অপরিসীম।

(৬) মেট্রোরেল

(ক) বৈশিষ্ট্য

*           ঢাকার প্রথম মেট্রোরেলের নাম এমআরটি-৬। এটি উত্তরা থেকে শুরু হয়ে মিরপুর, ফার্মগেট, মতিঝিল হয়ে কমলাপুর যাবে।

*           মোট রেলপথের দৈর্ঘ্য ২০.১০ কি:মি: (নির্মাণাধীন)।

*           মেট্রোরেলের মাধ্যমে উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত আসতে ৩৮ মিনিট সময় লাগবে। ফলে ঢাকা শহরের মানুষদের চলাচল করার ক্ষেত্রে অনেক সময় বেঁচে যাবে।

*           প্রতি স্টেশনে থাকবে সুপরিসর প্ল্যাটফর্ম ও যাত্রীদের জন্য থাকবে আরমদায়ক বসার ব্যবস্থা এবং শীততাপ নিয়ন্ত্রিত।

*           প্রত্যেকটি ট্রেন হবে অত্যাধুনিক ও যাত্রীদের চলাফেড়া ক্ষেত্রে কোন অসুবিধা হবে না।

*           ৬০ হাজার যাত্রী প্রতি ঘণ্টায় চলাচল করতে পারবে।

*           ভাড়া আদায় করা হবে ডিজিটাল কার্ড দিয়ে মেশিনের মাধ্যমে।

*           যাত্রীদের সুবিধার্থে প্রতি সাড়ে তিন মিনিট পর পর ট্রেন এসে দাঁড়াবে ওঠা-নামার জন্য।

(খ) অর্থনৈতিক গুরুত্ব

*           ঢাকাতে নির্মিত হচ্ছে মেট্রোরেল। এই মেট্রোরেল হতে পারে ঢাকা শহরের “গেম চেঞ্জার”। এর মাধ্যমে ঢাকা শহরের সড়কের ওপর চাপ বহুলাংশে কমে যাবে। প্রতিদিন লাখ লাখ মানুষের যানবাহন হবে এই মেট্রোরেল। এর ফলে ঢাকা মহানগরের দুই কোটি মানুষ এবং তার আশপাশের আরও দুই কোটি মানুষ সরাসরি উপকৃত হবে। ঢাকা মহানগরের সামগ্রিক যোগাযোগ ব্যবস্থাপনা পাবে এক নতুন মাত্রা। যানজটমুক্ত হবে ঢাকা শহর।

পরিশেষে বলা যায় যে, মানব সম্পদের যথাযথ উন্নয়ন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের অগ্রগতি, পোশাক রপ্তানি, প্রবাসী আয় বৃদ্ধিসহ দেশের অভ্যন্তরে বিভিন্ন উন্নয়নমূলক মেগা প্রজেক্ট বাস্তবায়নের মাধ্যমে ২০৪১ সালের মধ্যে একটি উন্নত ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গঠনে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অক্লান্ত পরিশ্রম ও সাহসী পদক্ষেপ এর উপর বাংলার মানুষের দৃঢ় বিশ্বাস রয়েছে। এ দেশের মানুষ এ প্রত্যয় বুকে ধারণ করে আছে যে, হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সোনার বাংলা নির্মাণে আমরা সফল হবই হবো।

লেখক : অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপারেশন্স অ্যান্ড ইন্টেলিজেন্স)

ঢাকা রেঞ্জ অফিস, ঢাকা।

ভালো লাগলে শেয়ার করে দিন :)

0 Comments

Leave a Reply

Avatar placeholder

Your email address will not be published. Required fields are marked *