ই-পেপার

SITE UNDER CONSTRUCTION
বাংলাদেশ পুলিশের মুখপত্র
অব্যাহত প্রকাশনার ৬৩ বছর

অমিতাভ চৌধুরী

দীর্ঘ ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে ৩০ লাখ শহিদের রক্তের বিনিময়ে স্বাধীনতা পেয়েছিল বাংলাদেশ। পেয়েছিল লাল সবুজের নিজস্ব পতাকা। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আজীবন সংগ্রামে মিলেছিল এই স্বাধীনতার স্বাদ, সেই জাতির পিতার নেতৃত্বেই শুরু হয় যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশকে পুনর্গঠনের লড়াই। সদ্য স্বাধীন দেশকে সোনার বাংলায় পরিণত করার দুর্ণিবার আকাক্সক্ষা। কিন্তু মাত্র সাড়ে তিন বছরের মাথায় স্বাধীন বাংলাদেশের রূপকার জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার মাধ্যমে রুখে দেওয়া হয় বাংলাদেশের অগ্রগতি। মুখ থুবড়ে পড়ে বাংলাদেশ, শুরু হয় উল্টো যাত্রা। তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার রীতিমতো বাংলাদেশকে আখ্যা দেন ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ (Bottomless basket) হিসেবে। এরপর সামরিক শাসনের যাঁতাকলে বাধাগ্রস্ত হয় গণতন্ত্রের অভিযাত্রা। এক কঠিন সংগ্রামের মাধ্যমে সংসদীয় গণতন্ত্রের ধারায় ফিরে আসে বাংলাদেশ। আজ স্বাধীনতার পাঁচ দশকের পথপরিক্রমা শেষে জাতি যখন স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপন করছে, সেই বাংলাদেশের আর পেছনে ফিরে তাকানোর কোনো প্রয়োজন নেই। এক সময়ের ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ এখন বিশ্বের অনেক দেশের কাছেই উন্নয়নের রোল মডেল। তলাবিহীন ঝুড়ির তকমা ঘুচিয়ে বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদায় বিশ্বের দরবারে আসীন হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে গত এক যুগে দারিদ্র্য দূরীকরণ আর উচ্চ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জনে বড় সফলতা এসেছে। সব ঠিক থাকলে, ২০৩৫ সাল নাগাদ বাংলাদেশ হবে বিশ্বের ২৫তম অর্থনীতির দেশ, আর ২০৪১ সালে হবে উন্নত দেশ। স্বাধীনতার  পরপর উন্নত দেশের কাছ থেকে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য ছিল বাংলাদেশের নিত্য সঙ্গী। বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটি টিকবে কিনা- এমন সন্দেহ ছিল খ্যাতনামা অনেক অর্থনীতিবিদের। সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার ১৯৭২ সালে বলেছিলেন, ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ হতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। সেই ছোট্ট রাষ্ট্রটি এখন বিশ্বের বিস্ময়, পৃথিবীর ৪১তম বৃহৎ অর্থনীতির দেশ। কৃষি, শিল্প ও সেবা খাতের ওপর ভর করে গড়ে ৭শতাংশের বেশি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিয়ে দেশ এগিয়ে যাচ্ছে।

বাংলাদেশ যে আর স্বল্পোন্নত দেশের তালিকায় থাকছে না তা, ২০১৮ সালে জানিয়েছিল জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি-সিডিপি। উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের জন্য মাথাপিছু আয়, মানবসম্পদ এবং অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা- এ তিনটি সূচকেই অনন্য অর্জন আছে বাংলাদেশের।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে দেশের জন্য এলো আরেকটি বড় সুখবর। সিডিপির দ্বিতীয় দফার বৈঠকেও বাংলাদেশ প্রতিটি সূচকেই প্রয়োজনীয় মানদণ্ডের যোগ্যতা অর্জন করেছে। কয়েক বছর ধরেই বাংলাদেশ ধারাবাহিকভাবে এগিয়ে চলেছে। অবকাঠামো খাতে হয়েছে ব্যাপক উন্নয়ন। পদ্মাসেতু এখন দৃশ্যমান বাস্তবতা। বিদ্যুতে দেশ আজ স্বয়ংসম্পূর্ণ।

মাথাপিছু আয় ছাড়িয়েছে দু’হাজার ডলার। করোনার মধ্যেও তৈরি পোশাকের পাশাপাশি অন্যান্য খাতেও রপ্তানি আয় ভালো অবস্থানে। প্রবাসী আয় বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। বৈদেশিক মুদ্রার মজুত এখন নতুন উচ্চতায়।

শুধু অর্থনৈতিক অগ্রগতি নয়, জনস্বাস্থ্য, শিক্ষা, শিশু ও মাতৃ মৃত্যুর হার হ্রাস, নারীর উন্নয়নসহ সামাজিক নানা সূচকেও বাংলাদেশ ধারাবাহিকভাবে এগিয়ে চলেছে। বাংলাদেশ নানা চড়াই-উতরাই পাড়ি দিয়ে আজকের পর্যায়ে পৌঁছেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধারাবাহিকতা ধরে রাখলে বাংলাদেশ অনেক দূর এগিয়ে যাবে। সব কিছু মোকাবিলা করে যথাসময়ে পৌঁছবে উন্নত দেশের কাতারে। সেদিন হয়তো আর খুব বেশি দূরে নয়।

আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার তথ্য বলছে, স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর এই মাহেন্দ্রক্ষণে বাংলাদেশ আজ বিশ্বের ৪১তম অর্থনীতির দেশ। ২০৩২ সালে বিশ্বের বড় ২৫টি অর্থনীতির দেশের তালিকাতেও ঢুকবে বাংলাদেশ। এরই মধ্যে স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বেরিয়ে বাংলাদেশ স্থান করে নিয়েছে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে। সামাজিক বিভিন্ন সূচকে দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশকেই ছাড়িয়ে গেছে। ১৯৭১ সালে যে দেশটির প্রায় ৮৫ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্য পীড়িত ছিল, স্বাধীনতার ৫০ বছর পেরিয়ে সেই দেশটিতে দারিদ্র্যের হার নেমে এসেছে ২০ শতাংশের ঘরে।

১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর পূর্ব পাকিস্তান নামে পাকিস্তানের অংশ হিসেবে স্থান হয় বাংলাদেশের। এরপর ১৯৭১ সাল পর্যন্ত যে ২৪টি বছর পরাধীনতার নাগ পাশে আবদ্ধ ছিল, তার পুরোটা সময় আমাদের অর্থনৈতিক শোষণ, বঞ্চনা ও বৈষম্যের স্বীকার হতে হয়েছে। পাশাপাশি ক্ষুধা, অপুষ্টি, স্বাস্থ্যহীনতাসহ নানা কারণে এই ভূখণ্ডের মানুষের আয়ুষ্কালও ছিল অনেক কম। শিক্ষার হার ছিল নিম্ন পর্যায়ে। পর্যাপ্ত কর্মসংস্থানও ছিলনা। স্বাধীনতার পরও এই বৈষম্য ও বঞ্চনার প্রভাবে ভুগতে হয়েছে বাংলাদেশকে। কিন্তু গত ৫০ বছরে নানা প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করেও বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের বিস্ময়। এই সময়ে মাথাপিছু আয়, গড় আয়ু, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়েছে, কমেছে প্রসূতি ও শিশু মৃত্যুর হার। ‘মেইড ইন বাংলাদেশ’ নামে দেশের তৈরি পোশাক খাত সারাবিশ্বে পরিচিত।

১৯৭১ সালে অর্থনৈতিক মুক্তির স্বপ্ন নিয়ে পাকিস্তানি শোষণ-শাসনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিল বাঙালি জাতি। অর্জন করে স্বাধীন একটি ‘দেশ’। এরপর যুদ্ধবিধ্বস্ত স্বদেশে বৈষম্যহীন, ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত সমাজ গড়ার স্বপ্ন নিয়ে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নেন স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। এই দেশের মানুষ যাতে আর কোনোদিন অর্থনৈতিক-সামাজিক-

সাংস্কৃতিক বৈষম্যের শিকার না হয়, গ্রাম প্রধান-কৃষি প্রধান বাংলাদেশের মেহনতি মানুষ যাতে মেরুদ- সোজা করে দাঁড়াতে পারে সেজন্য তিনি সংবিধান রচনা করেন চারটি মূলনীতির ভিত্তিতে। প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায়ও তিনি প্রাধান্য দেন সুষম একটি অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তোলার ওপর। দারিদ্র্য জয় করে দীর্ঘ ৫০ বছরে বাংলাদেশ আজ বিশ্বের বুকে উন্নয়নের রোলমডেল। রফতানি, রিজার্ভ, জিডিপি থেকে শুরু করে দেশের বাজেটের আকার, সরকারি-বেসরকারি বিনিয়োগ, রাজস্ব আয়, রেমিটেন্স আহরণ, দারিদ্র্য নিরসন, খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, অবকাঠামো তৈরি ও উন্নয়ন, বিদ্যুৎ উৎপাদন, মানব সম্পদ উন্নয়ন, ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে এসেছে সফলতা। নিজস্ব অর্থায়নে তৈরি করা হচ্ছে বিশ্বের দীর্ঘতম দৃষ্টিনন্দন পদ্মা সেতু। ৪১তম স্প্যান বসানোর মধ্য দিয়ে স্বপ্নের পদ্মা সেতু বাংলাদেশকে তুলে ধরছে বিশ্বের দরবারে। স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীতে অর্থনৈতিক বিভিন্ন সূচকে বাংলাদেশ ছাড়িয়ে গিয়েছে অনেক দেশকে, বিশেষত দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিবেশী দেশগুলোকে।

জিডিপি প্রবৃদ্ধি

সদ্য স্বাধীন যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি শুরু হয়েছিল ঋণাত্মক সূচক দিয়ে, প্রবৃদ্ধির হার ছিল মাইনাস ১৩.৯৭ শতাংশ। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ক্ষমতা গ্রহণ করার পর থেকেই উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পায় প্রবৃদ্ধি।

সর্বশেষ ২০২০-২১ অর্থবছরের জন্য ও ৭.২ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ধরেছে সরকার। গত অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি সরকারি হিসেবে ৫.২৪ শতাংশে নেমে আসে। এর আগে ২০১৮-১৯ অর্থবছরের চূড়ান্ত হিসাবে জিডিপি প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ৮.১৫ শতাংশে। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি হয় ৭.৮৬ শতাংশ, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ৭.৫০ শতাংশ। এর আগের অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ছিল ৬.৫০ শতাংশ।

মাথাপিছু আয়

বর্তমানে বাংলাদেশের গড় মাথাপিছু আয় ২২২৭ মার্কিন ডলার। আর ১৯৭২ সালে বাংলাদেশের মানুষের মাথাপিছু গড় আয় ছিল মাত্র ১২৯ মার্কিন ডলার। স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশের মানুষের মাথাপিছু গড় আয় প্রায় ১৭ গুণ বেড়েছে। মাথাপিছু আয়, মানব সম্পদ এবং অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা- এ তিনটি সূচকের দুটিতে উত্তীর্ণ হলে কোনোদেশ এলডিসি থেকে উত্তরণের যোগ্য বলে বিবেচিত হয়। বাংলাদেশ তিনটি সূচকেই যোগ্য বিবেচিত হয়েছে। আগামী কয়েক বছরের মধ্যে এর যেকোনো দুটি সূচকে জাতিসংঘের মান ধরে রাখতে পারলে বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশ হবে। মানব সম্পদ সূচকে পাঁচটি বিষয়ের পরিসংখ্যান বিবেচনায় নেয় জাতিসংঘ। ২০২০-২১ অর্থবছরে প্রথমবারের মতো মাথাপিছু আয়ের দিক থেকে জায়ান্ট প্রতিবেশী ভারতকে ছাড়িয়ে গেছে বাংলাদেশ। সেই ভারত যার হস্তক্ষেপ ছাড়া বাংলাদেশের জন্ম লাভ কঠিন হয়ে যেত, তাদের সঙ্গে বাংলাদেশ এত দ্রুত আয়ের ব্যবধান কমিয়ে এনেছে, যা এই অঞ্চলে অর্থনৈতিক দক্ষতার এক গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনকে উপস্থাপন করছে।

বাজেট

২০২০-২১ অর্থবছরে বাংলাদেশের বাজেটের পরিমাণ ৬ লাখ ৩ হাজার ৬৮১ কোটি টাকা, যা দেশের ৫০তম বাজেট। স্বাধীনতার পর থেকে (১৯৭২-৭৩ থেকে ২০২০-২১) বাংলাদেশের জাতীয় বাজেটের আকার বেড়েছে ৭৬৮গুণ। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২-৭৩ অর্থবছরে তৎকালীন অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ ৭৮৬ কোটি টাকার প্রথম বাজেট ঘোষণা করেন। অর্থাৎ অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে উন্নয়নের দিক দিয়ে বাংলাদেশ এখন উন্নয়নশীল দেশগুলোর কাছে এখন রোলমডেল। ছোট্ট অর্থনীতির দেশটি আজ পরিচিতি পেয়েছে এশিয়ার ‘টাইগার ইকোনমি’ হিসেবে।

প্রস্তাবিত ২০২১-২২ অর্থ-বছরের বাজেটে করোনা মোকাবিলায় ১০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে যা করোনা মহামারি প্রতিরোধে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। করোনা মোকাবিলায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর বিভিন্ন উদ্যোগ প্রশংসিত হচ্ছে সারা বিশে^।

বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ

বর্তমানে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৪ হাজার ৪০৩ কোটি টাকা, যা অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে রেকর্ড পরিমাণ বেশি। ১৯৭২ সালে মাত্র ২ বিলিয়ন ডলার ছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের পরিমাণ। ২০১৪ সাল থেকেই বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এর পরিমাণ বাড়ছে। ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে তা ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা অতিক্রম করে এবং ২০১৬ সালের জুনে রিজার্ভ বেড়ে দাঁড়ায় ৩ হাজার কোটি টাকা। করোনার মধ্যেও জোর গতিতে প্রবাসী আয় আসায় এবং পণ্য রপ্তানিতে বড় আকারের ধস না নামায় রিজার্ভ বেড়েই চলছে। ২০২১ সালের ২৫ মে দক্ষিণ এশিয়ার ছোট্ট দেশ বাংলাদেশের জন্য এক ঐতিহাসিক দিন। এ দিন দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে প্রতিবেশী দ্বীপ রাষ্ট্র শ্রীলঙ্কার জন্য ২০ কোটি ডলারের ঋণ চুক্তি অনুমোদন দেয়।

গত মাসে শ্রীলঙ্কার বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে ৪.৫ বিলিয়ন ডলারে নেমে যায়। ঋণদাতাদের দেনা পরিশোধ করে এবং করোনা ভাইরাসের অভিঘাতে তীব্র অর্থনৈতিক মন্দায় পড়ে দেশটির অর্থনীতি এখন ক্ষতির মুখে। তবে বিপরীতে বাংলাদেশ এই করোনা মহামারির সময় বিস্ময়কর সাফল্য দেখিয়েছে। বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এই করোনা মহামারির সময়ও ৪৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।

রেমিটেন্স

বৈশ্বিক মহামারি করোনা ভাইরাসের শুরু থেকেই আশঙ্কা ছিল রেমিটেন্স বা প্রবাসী আয়ে ধস নামবে। কিন্তু সব আশঙ্কা দূর করে রেকর্ড সংখ্যক রেমিটেন্স পাঠিয়েছে প্রবাসীরা। ২০২০-২১ অর্থবছরে ২২ মিলয়ন রেমিটেন্স পাঠিয়েছে প্রবাসীরা। মহামারির কারণে রেমিটেন্স কমে যাবে বলে ধারণা করা হলেও তা ঘটেনি। রেমিটেন্স আয়ে বর্তমানে বাংলাদেশের অবস্থান ৭ম স্থানে। বিশ^ব্যাংক পূর্বাভাস দিয়েছিল, কোভিড-১৯ মহামারির ধাককায় ২০২০ সালে দক্ষিণ এশিয়ার রেমিটেন্স ২২ শতাংশ কমবে। বাংলাদেশের কমবে ২০ শতাংশ। কিন্তু বাস্তবে বাংলাদেশের রেমিটেন্স বেড়েছে ১৮ দশমিক ৬৬ শতাংশ। দেশের জিডিপি সব মিলিয়ে রেমিটেন্সের অবদান ১২ শতাংমের মতো।

রফতানি আয়

চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরে জুলাই-এপ্রিল সময়ে পণ্য রফতানি করে মোট ৩ হাজার ২০৭ কোটি ডলার আয় করেছে বাংলাদেশ। ২০১৯-২০ অর্থ বছরের (জুলাই-ফেব্রুয়ারি সময়ে পণ্য রপ্তানি কর আয় হয়েছিল ২ হাজার ৬২৪ কোটি ডলাল। করোনা ভাইরাসের প্রভাবে ইউরোপ আমেরিকার মতো বড় বাজারে রফতানি আয় নিয়ে শঙ্কা বাড়লেও চলতি অর্থ বছরের প্রথম পাঁচ মাসে (জুলাই-নভেম্বর) বাংলাদেশের বিভিন্ন পণ্য রফতানিতে আয় বেড়েছে।

বিদেশি বিনিয়োগ

বর্তমানে বাংলাদেশে বৈদেশিক বিনিয়োগের সুযোগ অনেক। দেশে বিনিয়োগ ও টেকসই বিনিয়োগের জন্য সহায়ক স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশ বিদ্যমান রয়েছে।

করোনা ভাইরাসের সংক্রমণে অন্যান্য খাতের মতো বিনিয়োগেও ব্যাপক প্রভাব পড়েছে। চলতি বছর জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে নয়টি শতভাগ ও ১১টি যৌথ বিনিয়োগের জন্য মোট ২০টি নিবন্ধিত বিদেশি শিল্পে প্রস্তাবিত বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল ১ হাজার ২৮৫ কোটি টাকা। আগের বছরের একই সময়ে ৪৪টি শতভাগ বিদেশি ও যৌথ বিনিয়োগ শিল্পে বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল ১৭ হাজার ৪০১ কোটি টাকা। এ হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে দেশে বিদেশি বিনিয়োগের প্রস্তাব কমেছে ৯২ দশমিক ৬১ শতাংশ বা ১৬ হাজার ১১৪ কোটি ৯২ লাখ টাকা।

তৈরি পোশাক শিল্প

তৈরি পোশাক শিল্পে বর্তমান বাংলাদেশর অবস্থান ২য়। পোশাক শিল্পে বাংলাদেশের উত্থান রুপকথার গল্পের মতো। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরের বছর অর্থাৎ ১৯৭২ সালে মাত্র ৩৪ কোটি ৮৪ লাখ মার্কিন ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছিল বাংলাদেশ। তারমধ্যে ৯০ শতাংশ বা ৩১ কোটি ৩০ লাখ ডলারের পণ্যই ছিল পাট ও পাটজাত। পাটের পর প্রধান রপ্তানি পণ্যের মধ্যে ছিল চা ও হিমায়িত খাদ্য। যদিও মোট রপ্তানিতে এ পণ্য দুটির অবদান ছিল সোয়া শতাংশের কাছাকাছি।

তৈরি পোশাক শিল্প ৫০ বছর আগের পণ্য রপ্তানি চিত্রের পাশাপাশি দেশের অর্থনীতির চেহারার খোলনলচে বদলে দিয়েছে। পাটকে হটিয়ে পণ্য রপ্তানির শীর্ষ স্থান দখল করেছে তৈরি পোশাক শিল্প। পাঁচ দশকের ব্যবধানে রপ্তানি আয় ৯৬ গুণ বৃদ্ধি, প্রায় ৪০ লাখ গ্রামীণ নারী-পুরুষের কর্মসংস্থান, নারীর ক্ষমতায়ন, সহযোগী শিল্পের বিকাশসহ অনেক ক্ষেত্রে অবদান রেখেছে পোশাক শিল্প। চীনের পর একক দেশ হিসেবে দ্বিতীয় শীর্ষ পোশাক রপ্তানিকারক বাংলাদেশ। পরিবেশ বান্ধব পোশাক কারখানার সংখ্যার দিক থেকেও বিশ্বে সবার ওপরে বাংলাদেশ। সবমিলিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে এসে তৈরি পোশাকখাত বড় বিস্ময় হয়ে দাঁড়িয়েছে। শক্ত ভীত গড়েছে বিশ্ববাজারে।

অথচ স্বাধীনতার পর পণ্য রপ্তানির তালিকায় তৈরি পোশাকের কোনো নাম-নিশানা ছিলনা। সেই পোশাকখাতের রপ্তানি গত ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ছিল ৩ হাজার ৪১৩ কোটি ডলারের, যা দেশীয় মুদ্রায় ২ লাখ ৯০ হাজার ১০৫ কোটি টাকা। করোনার কারণে গত অর্থবছর রপ্তানি কিছুটা কমে ২ হাজার ৭৯৪ কোটি ডলারে নেমে এসেছিল। তারপরও মোট রপ্তানি আয়ের ৮৩ শতাংশই তৈরি পোশাকের দখলে। আর পাট ও পাটজাত পণ্যের হিস্যা কমে ২ দশমিক ৬২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশ তৈরি পোশাক শিল্পে গড়ে তুলেছে নিজস্ব ব্র্যান্ড “মেইড ইন বাংলাদেশ”।

অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও সামাজিক উন্নয়নের যেকোনো ও সূচকের বিচারে গত দুই দশকে বাংলাদেশের অগ্রগতি হয়েছে অভূতপূর্ব। জনসংখ্যা, গড় আয়ু, শিশু মৃত্যুর হার, মেয়েদের স্কুলে পড়ার হার, সক্ষম দম্পতিদের জন্মনিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা গ্রহণের হার ইত্যাদি সামাজিক সূচকে বাংলাদেশ সমপর্যায়ের উন্নয়নশীল অন্যান্য দেশগুলোকে পেছনে ফেলতে সমর্থ হয়েছে।

আর্থ সামাজিক উন্নয়নের নানা সূচকে অভাবনীয় সাফল্য পেয়েছে আজকের বাংলাদেশ। দারিদ্র্য বিমোচন, নারীর ক্ষমতায়ন, শিশু ও মাতৃমৃত্যুর হার হ্রাস, লিঙ্গ বৈষম্য দূরীকরণ, শিক্ষার হার ও গড় আয়ু বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন সূচকে কেবল দক্ষিণ এশিয়াকেই নয়, অনেক উন্নত দেশকেও ছাড়িয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে। স্বল্পোন্নোত দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশই প্রথম দেশ হিসেবে তিনিটি সূচকের সব কটি পূরণ করে পরবর্তী ধাপে উন্নীত হয়েছে। ২০২১ সালের শুরুতেই বাংলাদেশ স্বল্পোন্নোত দেশের তালিকা থকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণে জাতিসংঘ চূড়ান্ত সুপারিশ করেছে। স্বল্পোন্নোত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের ফলে বহির্বিশ্বে বাংলাদেশ একটি প্রত্যয়ী ও মর্যাদাশীল দেশ হিসেবে জায়গা করে নিবে খুব দ্রুত।

বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হওয়ায়, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলেন, “বাঙালি বীরের জাতি। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেছিলেন, ‘কেউ দাবায়ে রাখতে পারবা না।’ আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি আমাদের এই উন্নয়নের গতিধারা অব্যাহত থাকলে বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশ অচিরেই একটি উন্নত সমৃদ্ধ  মর্যাদাশীল দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে।”

  লেখক : উপ-পুলিশ পরিদর্শক

  ঢাকা রেঞ্জ ডিআইজি কার্যালয়

  ও

  সম্পাদকম-লীর সদস্য, ডিটেকটিভ

ভালো লাগলে শেয়ার করে দিন :)

0 Comments

Leave a Reply

Avatar placeholder

Your email address will not be published. Required fields are marked *