ই-পেপার

ড. এম এ সোবহান

পুলিশিং হলো একটা কৌশলী কাজ।আর এজন্য পুলিশ সদস্যদের প্রয়োজন বিশেষ জ্ঞান ও কৌশল আয়ত্ত করা।সে লক্ষ্য অর্জনে পুলিশ সদস্যদের প্রশিক্ষণ প্রয়োজন।বিশ্ব আজ বিশেষায়নের দিকে এগিয়ে চলেছে।তাই সঠিক ব্যক্তিকে দিয়ে সঠিক কাজ করানো শ্রেয়।এ উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে বাংলাদেশ পুলিশে নানা রকম বিশেষায়িত সংস্থা বা ইউনিট গঠিত হয়েছে। আবার এ সমস্ত ইউনিটের ভিতরে আরো বিশেষায়িত টিম গঠন করা হয়েছে।যারা দেশে বিদেশে প্রশিক্ষণ নিয়ে কাজ করছে এবং প্রভূত সাফল্য পেয়েছে।সেজন্য দেশের হত্যা, জঙ্গি তৎপরতাসহ অন্যান্য অপরাধ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

কাউন্টার টেরোরিজম ট্রান্স ন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিট

এটি ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের একটি ইউনিট।এ ইউনিটটি দেশের জঙ্গিবিরোধী অপারেশন চালিয়ে বিরাট সাফল্য পেয়েছে।এটি মূলত জঙ্গি ও আন্তঃদেশীয় অপরাধ বিষয়ে কাজ করে থাকে।ইউনিটটি ২০১৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়।এরা অপরাধীদের সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করে, প্রোফাইল তৈরি করে, তথ্য যাচাই করে, অপারেশন করে এবং সংশ্লিষ্ট মামলা তদন্ত করে। 

এ ইউনিটের অন্যতম ২টি টিম হলো বোম ডিসপোজাল টিম ও সোয়াত।এখানে উল্লেখ্য যে, কাউন্টার টেরোরিজম ও ট্রান্স ন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের বোম ডিসপোজাল টিমটি ২০০টির বেশি জঙ্গি সংক্রান্ত মামলা ডিটেক্ট করেছে।একটা নতুন জঙ্গি সংগঠন আবিষ্কার করেছে।২০০০ এর বেশি কল রেসপন্স করছে।৫০০০ এর মতো বোমা নিষ্ক্রিয় করেছে।

অন্যদিকে সোয়াত (SWAT) টিমটি ৩০টির বেশি হাইরিস্ক অপারেশন করেছে।যা দেশের জঙ্গি আটক ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।মেধাবী, চৌকস ও কৌশলী সদস্যদের সমন্বয়ে এ টিম ২টি গঠিত।এ দুটি টিমের জন্য নতুন সদস্য সংগ্রহ করতে হবে।তাদের পৃথক প্রশিক্ষণ, থাকার ব্যবস্থা এবং প্রণোদনা দেওয়া যেতে পারে।কাউন্টার টেরোরিজম ও ট্রান্স ন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিট কিছু প্রোঅ্যাকটিভ পুলিশিং কার্যক্রমও করে থাকে।

পাবলিক অর্ডার ম্যানেজমেন্ট ডিভিশন

বিশ্বের প্রায় সবগুলো রাষ্ট্রেই দাঙ্গা দমন বিভাগকে জনতা ব্যবস্থাপনা বিভাগে রূপান্তর করেছে।যুক্তরাষ্ট্রে নব্বই দশকের শুরুতে দাঙ্গা দমন বিভাগকে জনতা ব্যবস্থাপনা বিভাগে পরিবর্তন করা হয়।বাংলাদেশ পুলিশের ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের দাঙ্গা দমন বিভাগকে পাবলিক অর্ডার ম্যানেজমেন্ট বিভাগ নাম দেওয়া হয়েছে।এ বিভাগের কাজ হলো বিভিন্ন অভিযানে বা ডিউটিতে চাহিদা মোতাবেক ফোর্স দেওয়া যেমন- রেইড, ব্লক রেইড, বিভিন্ন অভিযানে, মিছিল সমাবেশ নিয়ন্ত্রণ, ট্রাফিক ডিউটি প্রভৃতি কাজে।ডিএমপিতে দাঙ্গা দমনের জন্য এস টি এফ (স্পেশাল টাস্ক ফোর্স) নামে কয়েকটি প্লাটুন আছে।যারা বিশেষ সময়ে অর্থাৎ দাঙ্গা বা জনতাকে নিয়ন্ত্রণ করে থাকে।

এ প্লাটুনগুলোর সকল সদস্যদের দল, জনতা, জনতার ব্যবহার, জনতা কিভাবে গঠিত হয়, সহিষ্ণুতা, মোটিভেশন, নিগোসিয়েশন, ডিএসকেলেশন, ফোর্স কনটিনাম, ফোর্স ম্যাট্রিক্স প্রভৃতি বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়ে থাকে।এছাড়া অস্ত্রের ব্যবহার ও শক্তি প্রয়োগ বিষয়েও এদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়ে থাকে। 

সিআইডি (ক্রিমিনাল ইনভেস্টিগেশন ডিপার্টমেন্ট)

বাংলাদেশ পুলিশের অন্যতম সফল এক অঙ্গ সংস্থার নাম হলো সিআইডি।এ সংস্থায় যেমন রয়েছে দক্ষ তদন্তকারী কর্মকর্তা তেমনি বিশেষায়িত জনবল।বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলা, জেল হত্যা মামলা, দশ ট্রাক অস্ত্র মামলা, ২১শে আগষ্ট গ্রেনেড হামলা মামলা, বিডিআর বিদ্রোহ মামলা প্রভৃতি মামলাসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর মামলাসমূহ সিআইডি তদন্ত করেছে।

বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলা জেল হত্যা মামলা

বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলাটি ২১ বছর পর রুজু হওয়ায় এর তদন্ত কার্যক্রমও শুরু হয় ২১ বছর পর।দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে মামলাটি তদন্ত করা অত্যন্ত কঠিন কাজ ছিল।তথাপিও সিআইডি মামলাটি যথাযথ তদন্ত করে এবং চার্জশিট দেয়। সিআইডির তদন্তের ওপর ভিত্তি করে মামলাটিতে সাজা হয়।জেল হত্যা মামলাটিও সিআইডি তদন্ত করে।এ মামলাটিও ২১ বছর পর রুজু হয় এবং তদন্তকাজ শুরু হয়।সি আই ডি মামলাটি সঠিকভাবে তদন্ত সম্পন্ন করে ও চার্জশিট প্রদান করে এবং ঘটনাটির সঙ্গে জড়িতদের সাজা হয়।

দশ ট্রাক অস্ত্র মামলা

দশ ট্রাক অস্ত্রের ঘটনা সংক্রান্তে ১টি অস্ত্র মামলা ও ১টি চোরাচালান মামলা রুজু হয়।মামলা ২টিই সিআইডি তদন্ত করে। তদন্তকারী কর্মকর্তা মোট ২৬৫ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ করে। তদন্তকারী কর্মকর্তা অস্ত্র মামলায় ৫০ জনকে অভিযুক্ত করে এবং চোরাচালান মামলায় ৫২ জনকে অভিযুক্ত করে চার্জশিট দেয়।

২১ শে আগস্ট গ্রেনেড আক্রমণ মামলা

ঘটনাটি ২০০৪ সালের ২১ শে আগস্ট সংঘটিত হয়।এ ঘটনায় ২৪ জন মারা যান এবং ৩০০ জনের অধিক মানুষ আহত হন।সিআইডি ২০০৯ সালে ৪র্থ দফা তদন্ত শেষে মামলাটির চার্জশিট দেয়।এ মামলাটিতেও আসামিদের সাজা হয়।

বিডিআর বিদ্রোহ মামলা

এ মামলাটিও সিআইডি তদন্ত করে।সিআইডি মামলা সংক্রান্তে প্রায় ৯৫০০ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ করে।মামলাটিতে ৫৪৩ জন অভিযুক্ত দোষ স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান করে।সিআইডি তদন্ত শেষে ৮২৪ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ পায় যার মধ্যে ৮০১ জন বিডিআর সদস্য ও ২৩ জন সিভিলিয়ান।সিআইডি এ মামলায় ১৩২ পৃষ্ঠার চার্জশিট দেয় এবং আসামিদের সাজা হয়।ছাড়াও সিআইডিতে ফিঙ্গার প্রিন্ট, ফুট প্রিন্ট, ক্রাইম সিন, ব্যালেসটিক ও হস্তলেখা বিশেষজ্ঞ আছে।যারা মামলা উদঘাটনে প্রভূত ভূমিকা রেখে চলেছে।সিআইডিতে ডিটিএস, সাইবার ট্রেনিং সেন্টার, ফরেনসিক ট্রেনিং ইনস্টিটিউট আছে।ঐ সকল প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানে সাইবার ক্রাইম, ফরেনসিক ক্রাইম, ডিজিটাল ফরেনসিক, ফিনানসিয়াল ক্রাইম প্রভৃতি বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।সিআইডির প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত একটি টিম ডি.এ.এ নমুনা সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও প্রোফাইল স্টাডি করে থাকে। বিশেষজ্ঞ টিম ও বিজ্ঞানভিত্তিক প্রশিক্ষণের ফলে সিআইডি মামলা উদঘাটনে ও তদন্তে প্রভূত সাফল্য পেয়েছে। সর্বশেষ সিআইডিতে যুক্ত হয়েছে সাইবার পুলিশ সেন্টার যেখানে সাইবার তদন্তে সুফল পাচ্ছে সাধারণ জনগণ।

এ্যান্টিটেরোরিজম ইউনিট

জঙ্গি দমন ও সন্ত্রাস নির্মূলে সদাজাগ্রত এ ¯স্লোগানকে সামনে রেখে ২০১৭ সালে এ্যান্টিটেরোরিজম ইউনিট যাত্রা শুরু করে। এটি বাংলাদেশ পুলিশের সর্বশেষ সংযোজিত ইউনিট।এর মূল কাজ হচ্ছে উগ্রবাদ, জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাস দমন করা এবং এ ধরনের কাজ যারা সংঘটিত করে তাদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করা।উপরন্তু কেহ যেন উগ্রবাদ, জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসে নতুন করে সংশ্লিষ্ট হতে না পারে সেজন্য ব্যাপক সচেতনতা সৃষ্টি করা এবং জনগণকে সাথে নিয়ে কাজ করা।

এ ইউনিটের সদস্যরা ইন্টিলিজেন্সের উপর ভিত্তি করে কার্যক্রম করে থাকে।এ ইউনিটের সদস্যরা দেশব্যাপী জঙ্গি, উগ্রবাদ ও সন্ত্রাসবাদে জড়িত ব্যক্তিদের প্রোফাইল তৈরি ও ডাটাবেইজ তৈরি করছে এবং সে মোতাবেক অভিযান পরিচালনা করছে।বর্তমানে ৫০০ এর অধিক সংখ্যক পুলিশ সদস্য এ ইউনিটে নিরলস পরিশ্রম করে চলেছে।

এ ইউনিটের সদস্য কর্তৃক প্রতিমাসে গ্রেফতার হচ্ছে অনলাইনে নতুন সদস্য সংগ্রহ ও সমমনাদের সংগঠিত করার লক্ষ্যে জড়িত আল্লাহর দল, আনসার উল্লাহ বাংলা টিম, জেএমবি ও নিউজেএমবি এর সদস্য।এ ইউনিটটির রয়েছে সোয়াত ও বোম ডিসপোজাল টিম।সোয়াত টিমের সদস্যদের রয়েছে কমান্ডো প্রশিক্ষণ এবং বোমডিসপোজাল টিমের সদস্যদের রয়েছে দেশি বিদেশি উন্নতর প্রশিক্ষণ।

সাম্প্রতিক সময়ে ইউনিটটি উগ্রবাদী কার্যক্রমবিরোধী জনসচেতনামূলক প্রোগ্রাম টিভিসি (টেলিভিশন কমার্শিয়াল) ও ওভিসি চালু করেছে।যার ফলে অল্প বয়সি, কোমলমতী শিশু ও কিশোরদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং নতুন সদস্য সংগ্রহের উদ্যোগ ব্যাহত হচ্ছে।

এপিবিএন (আমর্ড পুলিশ ব্যাটালিয়ন)

এপিবিএন ১৯৭৫ সালের ১লা অক্টোবর গঠিত হয়।এটি বাংলাদেশ পুলিশের অন্যতম এক বিশেষায়িত সংস্থা। এর প্রধান কার্যালয় ঢাকার উত্তরায় অবস্থিত।এর প্রধান একজন অতিরিক্ত আইজিপি।এ ইউনিটটির অধীনে বর্তমানে ১৫টি ব্যাটালিয়ন আছে।যার মধ্যে একটি নারী ব্যাটালিয়ন আছে।যেখানে সকল সদস্যই নারী।এখন এর তিনটি ব্যাটালিয়ন রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ক্যাম্পগুলোর নিরাপত্তা, আইনশৃঙ্খলা ও অপরাধ নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে।একটি ব্যাটালিয়ন হাইকোর্টের নিরাপত্তা দেখভাল করে থাকে।একটি ব্যাটালিয়ন হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নিয়োজিত।যারা বিমানবন্দরের চোরাচালান দমন, মাদক পাচার, মানব পাচার, বন্য জীবজন্তু পাচার বন্ধে কাজ করছে এবং বিমানবন্দরের সঠিক নিরাপত্তা প্রদান করছে।

বাংলাদেশ সচিবালয়ের নিরাপত্তার এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ এপিবিএন সদস্যরা পালন করে থাকে।ভিভিআইপি ঢাকার বাইরে কোনো প্রোগ্রামে গেলে এপিবিএন সদস্যরা ফাস্ট লাইন সিকিউরিটির দায়িত্ব পালন করে থাকে।এছাড়া এপিবিএন বর্তমানে অস্ত্র উদ্ধার, মাদক উদ্ধার, ভেজালবিরোধী অভিযান ও আসামি গ্রেফতার করে প্রভ‚ত সাফল্য লাভ করেছে।

র‌্যাব (র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন)

এটি বাংলাদেশ পুলিশের একটি বিশেষায়িত ইউনিট।যেটি ২০০৪ সালের ২৬শে মার্চ গঠিত হয়।এ ইউনিটটিতে বাংলাদেশ পুলিশ, বাংলাদেশ আর্মি, বাংলাদেশ নেভি, বাংলাদেশ বিমান বাহিনী, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ ও বাংলাদেশ আনসারের অফিসার ও ফোর্স কাজ করে।এটি দেশের অপরাধ নিয়ন্ত্রণ ও জঙ্গি দমনে উল্লেখযোগ্য ভ‚মিকা রেখে চলেছে। বর্তমানে র‌্যাবের ১৫ টি ব্যাটালিয়ন আছে।র‌্যাব সদস্যরা সাদা পোশাকে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করে এবং ইউনিফর্ম (কালো পোশাক) পরে অন্যান্য কাজ করে থাকে।

জঙ্গি সংগঠন জেএমবির প্রধান দুই নেতা শায়খ আব্দুর রহমান ও সিদ্দিকুর রহমান বাংলাভাইসহ অসংখ্য জঙ্গি সদস্য ও সন্ত্রাসী র‌্যাক কর্তৃক ধৃত হয়েছে। এ ইউনিটটির প্রধান কার্যালয় ঢাকার উত্তরায়। এ ইউনিটের প্রধান হলেন বাংলাদেশ পুলিশের একজন অতিরিক্ত আইজিপি।

এসবিপিএন (স্পেশাল সিকিউরিটি এন্ড প্রটেকশন ব্যাটালিয়ন)

বাংলাদেশ পুলিশের এ বিশেষায়িত ইউনিটটি যাত্রা শুরু করে ২০১২ সালের মে মাসে। বর্তমানে এর ২টি ব্যাটালিয়ন। এর সদর দপ্তর ঢাকার মোহাম্মদপুরের বাবর রোডে।ইউনিটটির প্রধান একজন ডেপুটি ইন্সপেক্টর জেনারেল।এসপিবিএন এর ১টি ব্যাটালিয়ন গণভবনের নিরাপত্তার জন্য নিয়োজিত এবং অপর ব্যাটালিয়নটি প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের নিরাপত্তার জন্য নিয়োজিত।এসপিবিএন এর সদস্যরা আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত থাকে।এসপিবিএন এ পোশাকী ফোর্সের পাশাপাশি সাদা পোশাকে গোয়েন্দা দল ২৪ ঘণ্টা কাজ করে যাচ্ছে।এসপিবিএন এর সদস্যদের ভিভিআইপি প্ররক্ষা, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, অস্ত্র চালনাসহ অত্যন্ত উঁচু মানের প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়ে থাকে।

ট্যুরিস্ট পুলিশ

মার্জিত, সভ্য, ভদ্র ও সৌজন্যতার সাথে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের দেশের বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্রে আমন্ত্রণ জানানো এবং তাদের নিরাপত্তা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করার মিশন নিয়ে বাংলাদেশ ট্যুরিস্ট পুলিশ ২০১৩ সালের ৬ই নভেম্বর কাজ শুরু করে। এ ইউনিটটি গঠনের উদ্দেশ্য হলো বাংলাদেশের পর্যটন স্পটগুলোকে পর্যটকদের কাছে আরও আকর্ষণীয় করে গড়ে তোলা। বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে রক্ষা করা।

এছাড়া বিকল্প আয়ের উৎস হিসেবে হোটেল, মোটেল, পর্যটন কেন্দ্র, যোগাযোগ ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি এবং প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতির গতিশীলতা আনয়ন করা।

দেশে বর্তমানে ৩১ টি জেলার অসংখ্য স্পটে ট্যুরিস্ট পুলিশের সদস্যরা ভ্রমণ পিপাসুদের নিরাপত্তা ও সুরক্ষা দিয়ে চলেছে। এ ইউনিটটিতে বর্তমানে প্রায় ১২৫৫ জন পুলিশ সদস্য কাজ করছে। এটির সদর দপ্তর রাজধানী ঢাকায় অবস্থিত। এর প্রধান একজন ডেপুটি ইন্সপেক্টর জেনারেল।

নৌ পুলিশ

দেশের মৎস সম্পদ রক্ষা ও সংরক্ষণ করার লক্ষ্যে ২০১৩ সালের ১২ই নভেম্বর নৌ পুলিশ গঠিত হয়। এটি বাংলাদেশ পুলিশের অন্যতম সফল এক বিশেষায়িত ইউনিট।যার সদস্যরা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নদী পথের উপর পুলিশিং করে থাকে।এছাড়া নৌ পুলিশ সদস্যরা জেলে ও মৎস্য শিকার নিয়েও কাজ করে থাকে।সূত্র থেকে জানা যায়, নৌ পুলিশ সদস্যদের কর্মতৎপরতায় কারেন্ট জাল উদ্ধার, মা মাছ বিশেষ করে মা ইলিশ রক্ষা, নিষিদ্ধ সময়ে মৎস্য শিকার করার কারণে মৎস্য শিকারীদের গ্রেফতারের ফলে দেশের নদীতে মৎস্য উৎপাদন অকল্পনীয় পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে।যা প্রকারান্তরে দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা রেখেছে।

নৌ পুলিশ বর্তমানে দেশের নদীসমূহকে ১১টি অঞ্চলে বিভক্ত করে কাজ করছে।যেখানে ১৪ টি নৌ থানা রয়েছে এবং ১০৩ টি নৌ ফাঁড়ি রয়েছে।এর সদর দপ্তর ঢাকায় অবস্থিত।বর্তমানে নৌ পুলিশে প্রায় ২০০০ পুলিশ সদস্য কাজ করছে।এ ইউনিটটির প্রধান একজন ডেপুটি ইন্সপেক্টর জেনারেল।

হাইওয়ে পুলিশ

মহাসড়কের শৃঙ্খলা রক্ষায় হাইওয়ে পুলিশের সৃষ্টি হয়। হাইওয়ে পুলিশ ২০০৫ সালে ৫৫৭ জন জনবল নিয়ে কার্যক্রম শুরু করে।বর্তমানে ১জন অতিরিক্ত আইজি, ১জন ডিআইজি, ১জন অতিরিক্ত ডিআইজি ও ৫ জন পুলিশ সুপারসহ ২৯২৯ জন সদস্য।বর্তমানে হাইওয়ে পুলিশ ৬টি রিজিয়ন, ১০ টি সার্কেল এবং ৭৩টি থানা/ফাঁড়ি  নিয়ে কাজ করছে। প্রত্যেকটি রিজিয়নের দায়িত্বে ১জন পুলিশ সুপার, সার্কেলের দায়িত্ব একজন সহকারী পুলিশ সুপার এবং থানা/ফাঁড়ি যথাক্রমে ইন্সপেক্টর/সাব-ইন্সপেক্টদের দায়িত্বে আছে।বাংলাদেশের ৬৪টি জেলার মধ্যে মাত্র ৪৩টি জেলায় হাইওয়ে পুলিশের কার্যক্রম আছে এবং ২১ জেলার মহাসড়কে তাদের কোনো কার্যক্রম নেই।হাইওয়ে পুলিশের কার্যক্রম সকল জেলায় পরিচালনার জন্য আরও জনবল ও থানা/ফাঁড়ি তৈরি করা প্রয়োজন।

অতি সম্প্রতি হাইওয়ে পুলিশের সক্ষমতা বৃদ্ধি প্রকল্পের আওতায় ঢাকার কাঁচপুর থেকে চট্টগ্রামের সিটি গেট পর্যন্ত সিসি টিভি মনিটরিং ও ভিডিও সার্ভিলেন্স কার্যক্রম শুরু হতে যাচ্ছে।এ কার্যক্রম সম্পন্ন হলে ঐ রুটের সকল দুর্ঘটনা উদঘাটন সহজ হবে।হাইওয়ে পুলিশ আধুনিকায়নের আওতায় ইতোমধ্যে অ্যাম্বুলেন্স, অ্যালকোহল ডিটেকটর এবং ওয়েট স্কেল স্ক্যানার ক্রয় করেছে।এ সমস্ত নতুন উদ্যোগের মাধ্যমে হাইওয়ে পুলিশ আরো সুচারুভাবে কাজ করতে পারবে।

শিল্প পুলিশ

দেশের বৈদেশিক মুদ্রার শতকরা ৮৫ ভাগ আসে শিল্প খাত থেকে।এ সমস্ত শিল্পে শ্রমিক অসন্তোষ, কর্মবিরতি, ধর্মঘট খাতটিকে হুমকির মুখে ফেলেছিল।শিল্প খাতকে শান্তকরণ ও রক্ষার জন্য ২০১০ সালের ১০ই অক্টোবর শিল্প পুলিশের কার্যক্রম শুরু হয়।বর্তমানে শিল্প পুলিশের ৮টি ইউনিট কাজ করছে, শিল্প পুলিশ-১ আশুলিয়া, শিল্প পুলিশ-২ গাজীপুর, শিল্প পুলিশ-৩ চট্টগ্রাম, শিল্প পুলিশ-৪ নারায়ণগঞ্জ, শিল্প পুলিশ-৫ ময়মনসিংহ, শিল্প পুলিশ-৬ খুলনা, শিল্প পুলিশ-৭ সিলেট, শিল্প পুলিশ-৮ হবিগঞ্জ।১টি ইউনিটে ১জন পুলিশ সুপার ২ জন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার, ৬ জন সহকারী পুলিশ সুপারসহ ৭৩৫ জন সদস্য কাজ করছে।শ্রমিকরা বিক্ষোভ কিংবা রাস্তা অবরোধ করলে শিল্প পুলিশের সদস্যরা নিবৃত্তমূলক অপারেশন করে।শিল্প পুলিশ শিল্পের চারিদিকে ২৪ ঘণ্টা টহল করে এবং সাদা পোশাকে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করে থাকে। মালিক শ্রমিক অসন্তোষ হলে শিল্প পুলিশ সদস্যরা মালিক-শ্রমিকদের মধ্যে মিডিয়েটর হয়ে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা নিরসন করে থাকে।

পিবিআই (পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন)

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশ পুলিশের যে সকল বিশেষায়িত সংস্থা সৃষ্টি হয়েছে পিবিআই তাদের অন্যতম।পিবিআই গঠিত হয় ২০১২ সালের ১৮ই সেপ্টেম্বর।পিবিআই এর কাজ হলো বিজ্ঞানভিত্তিক ও আধুনিক উপায়ে অপরাধ তদন্ত ও ডিজিটাল ফরেনসিক কার্যক্রম সম্পন্ন করা।বর্তমানে বাংলাদেশের ৩৮ টি জেলায় পিবিআই এর সর্বমোট ৪১টি ইউনিট কাজ করছে।পিবিআই ২০১২ সালের অক্টোবর মাসে যাত্রা শুরু করলেও ৫ই জানুয়ারি ২০১৬ সালে পিবিআই বিধিমালা পাশ হওয়ার পর মামলা তদন্ত শুরু করে।৫ই জানুয়ারি ২০১৬ সাল থেকে ৩০ শে জুন ২০১৮ পর্যন্ত পিবিআই ৫৬৫৭টি জিআর এবং ২১৩৭৭টি সিআর মামলা তদন্ত সম্পন্ন করে।উল্লিখিত সময়ে পিবিআই ১১১টি উল্লেখযোগ্য মামলার ডিটেকশন করেছে।পিবিআই এর চাঞ্চল্যকর মামলা তদন্তগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো সাগিরা মোর্শেদ হত্যা মামলা। এ হত্যাকাণ্ডটি সংঘটিত হয় ২৫ শে জুলাই ১৯৮৯ তারিখে।পিবিআই দীর্ঘ ৩০ বছর পর মামলাটির তদন্ত পায় এবং মাত্র ২ মাসে এ হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটন করে।পিবিআই তে মামলা তদন্ত তদারকির ক্ষেত্রে একটা বড় সমস্যা রয়েছে। সাধারণত পুলিশে সহকারী পুলিশ সুপার ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপাররা মাঠ পর্যায়ে মামলা তদারকি করে থাকে।

বাংলাদেশ পুলিশের বিশেষায়িত ইউনিটগুলোর প্রযুক্তির ব্যবহার ও যথাযথ প্রশিক্ষণ এর মাধ্যমে প্রভূত সাফল্য বয়ে আনবে এবং জনগনের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারবে।যা প্রকারন্তরে দেশ মাতৃকার সেবা ও উন্নয়নে যুগান্তকারী ভূমিকা রাখবে।

  লেখক : পুলিশ সুপার

  বাংলাদেশ পুলিশ একাডেমি,

  সারদা, রাজশাহী

ভালো লাগলে শেয়ার করে দিন :)

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x