ই-পেপার

SITE UNDER CONSTRUCTION
বাংলাদেশ পুলিশের মুখপত্র
অব্যাহত প্রকাশনার ৬৩ বছর

শামসুজ্জামান খান

পূর্ব বাংলার বাঙালির চিন্তাচেতনার ধারা বিগত কয়েকশ’ বছরে বিশেষ কোনো ছকে রূপান্তরিত হয়েছে-এমনটি বলা যায় না। তবে নানা মত, পথ, গুহ্য সাধনাপন্থা, নাথ-যোগীদের তান্ত্রিকতা, চৈতন্য দেবের গৌড়ীয় বৈষ্ণবধর্ম-সংস্কৃতি, ইসলামের সুফিবাদ এবং শাস্ত্রীয় ধর্মসমূহের ভেতর থেকে চয়ন করা ইহজাগতিক বোধ ও মানব শ্রেষ্ঠত্বের বাণী এবং কেন্দ্রে পৃষ্ঠপোষকতার বাইরে বিশাল গ্রামীণ জনপদে গ্রহণ-বর্জন-সমন্বয়ের মধ্য দিয়ে একটি মূলধারা ও সামূহিক দৃষ্টিভঙ্গির বিকাশ লক্ষ্য করি। এই ধারাটিকে মিশ্র বা সমন্বিত সাংস্কৃতিক ধারা হিসাবে আখ্যাত করা চলে। বাংলাদেশের সকল ধর্ম-মত ও নানা-লোকধর্মের উপাদানের মৌল মানবিক অন্তঃসার এতে যুক্ত হওয়ায় এই ধারাটি খুবই প্রাণবন্ত ও সম্মুখাভিসারী হয়ে ওঠে। বস্তুতপক্ষে, বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ শত শত বছর ধরে তাদের বাস্তব জীবনযাত্রার অভিজ্ঞতায় সহঅবস্থান ও পরমতসহিষ্ণুতার একটি গ্রহণযোগ্য রূপের মধ্যে এই মৌল মানবিক ও সৃষ্টি-সম্ভাবনাময় অবিরল উৎসধারাটি নির্মাণ করেন। মধ্যযুগ পর্যন্ত রাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ ও প্রভাব বলয়ের বাইরে সাধারণ মানুষ তাদের ইহজাগতিক স্বার্থবুদ্ধি ও সমাজ গঠনের তাগিতে এই ধারাটি বেছে নেয় এবং এই ধারার প্রকাশ মাধ্যম হয়ে ওঠে আমাদের দৈনন্দিন জীবনের ইচ্ছা-আকাক্সক্ষা ও নানা মনোভাব প্রকাশের বুলি-আমাদের দেশীয় মৃত্তিকার গভীরে এবং বিশ্বের আকাশে একই সঙ্গে প্রোথিত ও প্রস্ফুটিত হওয়ার শক্তি অর্জন করেছে। তবু ভাষার রাষ্ট্রীয় মর্যাদা অর্জিত হয়নি। শুধু কি তাই! বাংলা ভাষার প্রতি হিংসা-বিদ্বেষ-অসুয়াত্ত কি ছিল না ? তা-না হলে সপ্তদশ শতকের কবি আবদুল হাকিম কেন লিখবেনঃ ‘ যে-জন বঙ্গেতে জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী, সে-সব কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি।’ তবে এ ছিল মধ্যযুগের এক স্বাদেশিক কবির বিচ্ছিন্ন কিন্তু দীপ্র উচ্চারণ। ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারিতে ভাষার মর্যাদা রক্ষার সংগ্রামে তরুণ গ্রাণের আত্মহুতিতে প্রথমবারের মতো বাংলা ভাষা রাষ্ট্রীয় ভাষার মর্যাদা ও গৌরব অর্জন অবশ্যম্ভাবী হয়ে ওঠে। বাংলা ভাষার দেশীয় সুদৃঢ় সাংস্কৃতিক ভিত্তি এবং আন্তর্জাতিক সংযোগ বাঙালির মনন বৈশিষ্ট্যেরই ফসল। সেই সঙ্গে সকল ক্ষুদ্র জাতিসত্তার সাংস্কৃতিক ও ভাষাগত বিকাশের প্রতি অঙ্গীকার বাঙালির সংস্কৃতিচিন্তার নৈতিক ভিত্তি। সেজন্যই ৫২-র ভাষা আন্দোলনের তাত্ত্বিক নেতাদের পক্ষ থেকে সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা করা হয়, ‘সকল ভাষার সমান মর্যাদা চাই’ (আলী আশরাফ ছদ্মনামে খোকা রায়ের প্রবন্ধ ‘একুশে ফেব্রুয়ারি সঙ্কলন’- সম্পাদক হাসান হাফিজুর রহমান দ্রঃ)। বাংলাদেশের বাঙালির রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের উপর্যুক্ত নীতি ঘোষণা যে কতটা বৈজ্ঞানিক ও আন্তর্জাতিক চেতনাপ্রসূত এবং দূরদৃষ্টিসম্পন্ন ছিল তার প্রমাণ হিসাবে ভাষা আন্দোলনের ৪৮ বছর পর বিশ্বসমাজ কর্তৃক বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলনের দিবস একুশে ফেব্রুয়ারিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসাবে গ্রহণের মধ্য দিয়ে স্বীকৃতি লাভ করেছে। সকল জাতি ও ক্ষুদ্র জাতিসত্তা এবং নিপীড়িত ভাষাসমূহের নিজস্ব সংস্কৃতির বিকাশের দ্বার মাতৃভাষা ব্যতীত অবারিত হতে পারে না ইহা অবিসম্বাদিত সত্য। এক গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্য সম্মেলনে সভাপতির ভাষণে প্রখ্যাত স্বাধীনতা সংগ্রামী ও সাহিত্যসাধক মওলানা মনিরুজ্জামান এছলামাবাদী বলেনঃ ‘‘সভ্য-জগতের ইতিহাস আলোচনা করিলে প্রমাণিত হয়, জগতে এমন কোনো জাতির দৃষ্টান্ত দেখিতে পাওয়া যায় না, যাহারা মাতৃভাষার সাহায্য ব্যতীত উন্নতির সোপানে আরোহণ করিতে সক্ষম হইয়াছে। আরব জাতি বিজয়ীবেশে পারস্যে প্রবেশ করিয়া দীর্ঘকাল রাজত্ব করিয়াছে সত্য… কিন্তু ইহা সত্ত্বেও এ দেশীয় মাতৃভাষার পরিবর্তে সেখানে তাহারা আরবি সাহিত্য প্রবর্তিত করিতে পারেন নাই। …তুর্কিরা বিগত ৬০০ বৎসর ব্যাপিয়া নিজেদের মাতৃভাষা তুর্কির সাহায্যেই তিনটা মহাদেশ জুড়িয়া রাজ্য-শাসন করিতে সমর্থ হইয়াছেন। ভারতবর্ষের দৃষ্টান্ত আরও উজ্জ্বল। আরব আমল হইতে মোগল পাঠান মোছলমান শাসকবর্গের আমলদারীর প্রায় হাজার বৎসর কাল শাসক সম্প্রদায়ের মাতৃভাষা ছিল আরবী, তুর্কি ও পার্সি, কিন্তু তাহাদের সেই ভাষা ও ভাষার প্রভাব ভারতের প্রাদেশিক বা মাতৃভাষার স্থান অধিকার করিতে পারে নাই। ভারতের হিন্দি, গুরুমুখী, গুজরাটি, তেলেঙ্গী, বাঙ্গালা, আসামী ও উড়িয়া ভাষা প্রভৃতি আজও এদেশে অক্ষুণ্ন আছে’’ (১৩৩৪ সনে বসিরহাটে অনুষ্ঠিত বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সম্মেলনে সভাপতির ভাষণের অংশ)।

মওলানা আকরম খাঁ বাঙালি মুসলমানের মাতৃভাষা প্রসঙ্গে যে শ্লেষমিশ্রিত বক্তব্য রেখেছেন তা বিশেষ উল্লেখের দাবি রাখে। তিনি বলেন : ‘‘দুনিয়ায় অনেক রকম অদ্ভুত প্রশ্ন আছে। বাঙ্গালী মুসলমানেরা মাতৃভাষা কি? উর্দু না বাঙ্গালা? এই প্রশ্নটা তাহার মধ্যে সর্বাপেক্ষা অদ্ভুত। নারিকেল গাছে নারিকেল ফলিবে, না বেল? যদি কেহ এই প্রশ্ন লইয়া আমাদিগের সহিত তর্ক করিতে আইসেন, তাহা হইলে আমরা তাহার সঙ্গে তর্কে প্রবৃত্ত হইবার পরিবর্তে বন্ধুদিগের নিকট হইতে টাকা সংগ্রহ করিয়া তাহাকে বহরমপুরের টিকিট কিনিয়া দিতে চেষ্টা করিব। বঙ্গে মোছলেম ইতিহাসের সূচনা হইতে আজ পর্যন্ত বাঙ্গালা ভাষাই তাহাদের লেখ্য ও কথ্য মাতৃভাষারূপে ব্যবহৃত হইয়া আসিতেছে এবং ভবিষ্যতেও মাতৃভাষারূপে ব্যবহৃত হইবে’’ (তৃতীয় বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সম্মেলনে সভাপতির ভাষণের অংশ। ১৩২৫ সনের বঙ্গীয় মুসলামন সাহিত্য পত্রিকার বৈশাখ সংখ্যা থেকে উদ্ধৃত)।

অন্যদিকে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ বাঙালি মুসলমানের মাতৃভাষার প্রশ্নটিকে জাতিগঠনের নৃতাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গিতে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘‘আমরা বাংলার হিন্দু মুসলমান বৌদ্ধ খ্রিষ্টান একমিশ্রিত জাতি’’ (ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ স্মারকগ্রন্থ ১৯৮৫, পৃ. ৪০৩)। মুসলমান ছাত্রদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেনঃ ‘‘ভুলিয়া যাও কেন, তোমরা বাঙ্গালী ? তোমাদের ধমনিতে আর্য্য, মোঙ্গলীয়, দ্রাবিড়ী, আরবী, পারসী, আফগানী ও তুর্কী রক্ত মিশ্রিত আছে’’ (প্রাগুক্ত গ্রন্থের ভূমিকা পৃ. ১৬)। শহীদুল্লাহর লক্ষ্য ছিল বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির বিকাশে বাঙালি মুসলমানের সম-অংশগ্রহণের মাধ্যমে ‘একজাতি গঠন’কে সম্ভব করে তোলে। একজাতি অর্থাৎ সমন্বিত বাঙালি জাতিগঠনের জন্য তিনি বাঙালি মুসলমানকে দেশীয় নাম গ্রহণের পরামর্শও দিয়েছিলেন। এবং এই জাতিগঠনের মূল ভিত্তি যে হবে বাংলা ভাষা সে সম্পর্কে সন্দেহের বিন্দুমাত্র অবকাশ নেই। আর তাই বাংলা ভাষার ওপর অন্য ভাষা চাপিয়ে দেওয়াকে তিনি পূর্ব বাংলায় গণহত্যার শামিল বলে মনে করেন। মানুষ তাদের ইহজাগতিক স্বার্থবুদ্ধি ও সমাজ গঠনের তাগিতে এই ধারাটি বেছে নেয় এবং এই ধারার প্রকাশ মাধ্যম হয়ে ওঠে আমাদের দৈনন্দিন জীবনের ইচ্ছা-আকাক্সক্ষা ও নানা মনোভাব প্রকাশের বুলি-আমাদের মাতৃভাষা বাংলা। সমাজ ও ব্যক্তিজীবনের সঙ্গে ভাষার এই মেলবন্ধনের মধ্যেই তৈরি হয় বাঙালির স্বকীয়, জীবনঘনিষ্ঠ ও গভীরভাবে মানবিক প্রাণবন্ত সংস্কৃতি। এই সংস্কৃতি বাঙালি হিন্দুদের নয়, বৌদ্ধদের নয়, খ্রিষ্টান বা মুসলমানদের নয়-এই সংস্কৃতি সকল বাঙালির সমন্বিত সংস্কৃতি। এই সংস্কৃতির মূল ভিত্তি আমাদের যাপিত জীবনের অভিজ্ঞতা এবং জীবকে সুন্দর করার নানা উদ্যোগ-আয়োজন-প্রয়াসের মধ্যে। প্রাচীন ও মধ্যযুগের বাংলার সমাজ গঠন ও সংস্কৃতি নির্মাণে নানাদিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান এসে যুক্ত হয়েছে। প্রাচীন বাংলায় অস্ট্রিক জনগোষ্ঠীর চিন্তাচেতনা-জীবনাচরণ ও বিশ্বাস-সংস্কারের প্রভাবই কৃষিনির্ভর গ্রাম-সমাজে প্রবল ছিল বলে মনে হয় এবং এইসব সংস্কৃতি-উপাদান সৃজ্যমান বাঙালি সমাজ দু’বাহু বাড়িয়ে এমনভাবে গ্রহণ করেছে যে, তাতে কালো আর ধলা পানির ভেদরেখা মুছে গেছে। সামাজিকভাবে বাঙালি জীবন ও বাংলা ভাষাও এর দ্বারা বিপুলভাবে সমৃদ্ধ হয়েছে। বাংলা ও বাঙালির গ্রহণ ও আত্মীকরণের ক্ষমতা অসামান্য। পাশ্চাত্য বিশ্বে ক্রিয়ল () সংস্কৃতি কোনো কোনো দেশে অনন্যতা অর্জন করেছে। আমাদের সংস্কৃতিতে এই ক্রিয়ালতা শুধু অস্ট্রিক উপাদান নয়-আর্য-অনার্য, দ্রাবিড়-ভোটচীন, আরবী-ফার্সি-তুর্কি-আফগান-পর্তূগিজ-ইংরেজসহ অসংখ্য জাতি-উপজাতির উপাদান এমনভাবে মিশে গেছে যে, একে এখন আলাদা করে চেনার উপায় নেই।

আসলে বাংলা ভাষার শক্তি ও গ্রহণক্ষমতা এতই অসামান্য যে, তা অন্য শক্তিশালী ভাষা ও সাংস্কৃতিক উপাদানের প্রভাবে দুর্বল বা বিলুপ্ত না হয়ে আরও শক্তিশালী হয়েছে এবং বহির্বিশ্বের প্রবহমান চিন্তাচেতনার সঙ্গে মিথস্ক্রিয়াতেও সক্ষমতা অর্জন করেছে।

উনবিংশ শতকের বঙ্গীয় রেনেসাঁসের ঋত্বিকেরা কালজয়ী হয়েছেন বিপুল সম্ভাবনাময় বাংলা ভাষাকে প্রাদেশিক ভাষার স্তর থেকে আন্তর্জাতিক ভাষার স্তরে উন্নীত করে। রামমোহন, মাইকেল, বিদ্যাসাগর, বঙ্কিমচন্দ্র, অক্ষয়কুমারও বাংলা ভাষার সঙ্গে বিশ্ব জ্ঞান-বিজ্ঞান-দর্শনের সংযোগ ঘটিয়েছেন, অর্থাৎ বিশ্বের শ্রেষ্ঠ চিন্তাভাবনাকে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির মধ্যে ধারণ করেছেন। মধ্যযুগের বাংলা পশ্চিমী বিশ্বের মতো ভৌগোলিক আবিষ্কার, শিল্প বিপ্লব, বিজ্ঞান-প্রযুক্তির প্রসার, যুক্তিবাদ, আলোকায়ন-গির্জা তথা ধর্মের কর্তৃত্ব লোপ করার সুযোগ না পেয়েও ইউরোপের রেনেসাঁস চিন্তার শ্রেষ্ঠ ফসল ‘মানুষ’কে সবার উপরে স্থান দেওয়ার বিজ্ঞতা ও দূরদৃষ্টির পরিচয় দিয়েছিল। স্মর্তব্য, চন্ডীদাসের সেই বিখ্যাত মানব শ্রেষ্ঠত্বের কবিতা-তা যেমন বাঙালির মানবিক-ঐতিহ্যের এক বিস্ময়কর অর্জন; তেমনি প্রাক-আধুনিককালেও বাংলাদেশের হৃদয় থেকে বার করে আনা লালন ফকিরের ‘মানুষ রতন’ বা ‘কলিযুগে মানুষ অবতার’ আর তারই আধুনিক সংস্করণ রামমোহন রায়ের বাংলা ভাষা চর্চা ও পাশ্চাত্যবিশ্ব ছেঁকে তোলা মানববন্দনা যখন একই সময়ে উচ্চারিত হয় তখনই বোঝা যায়, বাঙালি সংস্কৃতির শিকড় দেশজ মৃত্তিকা ছড়িয়ে বিশ্বের আধুনিক চিন্তাধারার স্বীকৃতি লাভ করেছে। সকল জাতি ও ক্ষুদ্র জাতিসত্তা এবং নিপীড়িত ভাষাসমূহের নিজস্ব সংস্কৃতির বিকাশের লক্ষ্যে বাংলাদেশের একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসাবে বেছে নেয়ার ঘটনা তাই বাঙালি জাতির জন্য এক অনন্য গৌরবের বিষয়। কিন্তু আমরা কি আমাদের বাঙালি সংস্কৃতির ও মাতৃভাষার এই শক্তি দিয়ে বিশ্বসভায় স্বকীয় অবদান রাখার ব্যাপার সচেতন?

দুই

ভাষা আন্দোলনের শক্তি ও সম্ভাবনা ছিল বহুমাত্রিক। শুধু বাংলাকে তৎকালীন পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার লক্ষ্যের মধ্যেই এর মূল নিহিত ছিল না। এর লক্ষ্য ছিল হাজার বছরের বাঙালি জীবনের প্রগতিশীল অন্তঃসারকে অশ্বিত করে শক্তিশালী ধর্মনিরপেক্ষ ও ইহজাগতিক সাংস্কৃতিক মুক্তধারার সৃষ্টি করা। তা করা গেলে গোটা বিশ্বের উন্নত বিজ্ঞাননিষ্ঠ ও আধুনিক সংস্কৃতির সঙ্গে তা মিডিয়েট () করতে পারবে এবং তাতে আমাদের সংস্কৃতির স্বকীয় সৌন্দর্য ও বৈভব এক বিশিষ্ট রূপে পরিস্ফুট হয়ে বিশ্ব সংস্কৃতির মূল্যবান অংশ হবে-এটাই প্রত্যাশিত। তবে এ ছিল দূরবর্তী লক্ষ্য। এর জন্য যে শক্তিশালী অবকাঠামো দরকার তার কথা ভাষা আন্দোলনের নেতাকর্মী ও অংশগ্রহণকারীদের ভাবনায় যে একেবারেই ছিল না তা নয়-বীজাকারে ছিল অবশ্যই। তার মূল লক্ষ্য ছিল নৃতাত্ত্বিক জাতিসত্তার সার্বিক বিকাশ। সেটি পাকিস্তানের ফেডারেল রাষ্ট্র কাঠামোর মধ্যে জাতিগত আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারের ভিত্তিতে হতে পারতÑকিন্তু পাকিস্তানের স্বৈরশাসকরা পূর্ব বাংলাকে স্বায়ত্তশাসন ও সাংস্কৃতিক স্বাধিকার দেওয়ার পরিবর্তে জাতিগত নিপীড়নের পথই বেছে নেওয়ায় সে সম্ভাবনা বাতিল হয়ে যায়। উল্লেখ্য বিষয় হলো শুধু ইহজাগতিকতাবাদী নয়, বাংলাদেশের ইসলামী ধারার প্রাজ্ঞজনেরাও জিন্নাহ-লিয়াকত আলী ও অন্যদের বাংলাদেশের ওপর উর্দু ভাষাকে চাপিয়ে দেওয়ার অপতৎপরতাকে প্রত্যাখ্যান করে মাতৃভাষা বাংলার অনিবার্যতাকে তুলে ধরেন। পাকিস্তান সৃষ্টির আগে থেকেই বাঙালি মুসলমানের মাতৃভাষা বিতর্কের সুবাদে বা পরবর্তীকালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর থেকে শাসকদের উর্দু চাপিয়ে দেওয়ার প্রতিবাদে ইসলামী পন্ডিতদের যে সব বক্তব্য আসে তা ছিল সময়োপযোগী ও যুক্তিনিষ্ঠ। আমরা ওই ধারার মাত্র দু’জনের বক্তব্য তুলে ধরব। প্রথমে প্রগাঢ় ইসলামী পন্ডিত ও অসাম্প্রদায়িক জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক নেতা মওলানা মনিরুজ্জামান এসলামাবাদীর বক্তব্য তুলে ধরিঃ ‘‘বাংলা বাঙ্গালীর পৌনে ষোলআনা লোকের মাতৃভাষা। ইহাতে হিন্দু-মোছলমানের কোন পার্থক্য নাই। ঢাকা, কলিকাতা, মোর্শেদাবাদ ও চট্টগ্রাম টাউনের মোছলমানের মাতৃভাষা বিকৃত ও উর্দু ও বাংলায় মিশ্রিত হইয়া গেলেও তাহারা উভয় ভাষাতেই মনোভাব প্রকাশ করিতে অভ্যস্ত, বরং তাহাদের সংসারজীবনের প্রত্যেক স্তরেই তাহারা উর্দু অপেক্ষা বাংলার অধিকতর মুখাপেক্ষী। খাতা-পত্র, দলিল-দস্তাবেজ ও পত্র-ব্যবহার সমস্তই তাহাদিগকে বাংলাতেই করিতে হয়। সুতরাং বাংলা যে তাহাদেরও মাতৃভাষা, ইহাতে দ্বিমত হইতে পারে না’’।

ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ বলেছিলেনঃ মাতৃভাষার উৎকর্য সাধন ব্যতীত কোনো জাতি উন্নতির সোপানে আরোহণ করিতে পারে না। তাই উন্নত, সুষম ও স্বদেশনিষ্ঠ মানুষের জাতিগঠনের জন্য ও মাতৃভাষার উন্নয়ন প্রয়াসের জন্য তিনি পরামর্শও দিয়েছিলেন। এবং এই জাতিগঠনের মূল ভিত্তি যে হবে বাংলা ভাষা সে সম্পর্কে সন্দেহের বিন্দুমাত্র অবকাশ নেই। আর তাই বাংলা ভাষার ওপর অন্য ভাষা চাপিয়ে দেওয়াকে তিনি বাংলাদেশে গণহত্যার শামিল বলে মনে করেছিলেন। এবং এ ধরনের অপপ্রয়াস রোধ করার জন্য তিনি নিজে এবং শিক্ষাবিদদের বিদ্রোহ করার আহ্বান জানিয়েছিলেনঃ “We educationist should, however, emphatically, protest and if necessary should revolt against the fresh imposition of any language other than Bengali as the medium of instruction for East Bengalee students. This imposition will be tantamount to the genocide of East Bangalees.”

তিন

অতএব, বাঙালি মুসলমানের মাতৃভাষা বিতর্ক, জাতিগঠন চিন্তা এবং ভাষা আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্ব (১৯৪৮-৫২) এক সূত্রে গাঁথা। আর এই তিনটি বিষয়ের সমন্বয়েই বাংলাদেশের বাঙালি তার নিজস্ব রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখেছে এবং’ ৫২, ৫৪, ৬২, ৬৬, ৬৯-এ ভাষার মর্যাদা, স্বায়ত্তশাসন ও স্বাধিকারের জন্য সংগ্রাম করেছে, জীবন বিসর্জন দিয়েছে এবং ১৯৭১-এ ৩০ লক্ষ বাঙালির আত্মাহুতির বিনিময়ে স্বাধীন, সার্বভৌম, ধর্মনিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক, জাতিরাষ্ট্র বাংলাদেশের অর্জনকে সম্ভব করেছে। মধ্যযুগে ভাষা বিতর্কে যে-আন্দোলনের সূচনা-যার লড়াকু যোদ্ধা ছিলেন সপ্তদশ শতকের সন্দ্বীপের কবি আবদুল হাকিম তাঁর তাত্ত্বিক উত্তরসুরি ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ও ড. মুহম্মদ এনামুল হক তাঁকে জাতিগঠন প্রক্রিয়ার কাঠামোর মধ্যে বিন্যস্ত করেন। ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে সেই ধারাকে ভবিষ্যতের বাঙালির জাতীয়তাবাদ ও জাতিরাষ্ট্র গঠনের সম্ভাবনাকে বীজাকারে প্রত্যক্ষ করেন মনস্বী লেখক এস ওয়াজেদ আলী (ভবিষ্যতের বাঙালি) ও সমাজবিজ্ঞানী নাজমুল করিম (সমকাল ৫৭)। আর এঁদের অভিজ্ঞতার সারসঙ্কলন করে তার সঙ্গে দুঃখী, বঞ্চিত বাঙালির হাজার বছরের সংগ্রাম ও দেশগঠনের স্বপ্নকে রূপায়িত করার লক্ষ্যে রবীন্দ্রনাথের (আমার সোনার বাংলা) প্রেরণা, নজরুলের (নমঃ নমঃ নমঃ ‘বাংলাদেশ’ মম এবং ‘জয় বাংলা’) উদ্দীপনাময় দেশপ্রেম, তিতুমীর-সূর্যসেনের বীরত্বব্যঞ্জক স্বাধীনতার লড়াইয়ের ঘটনা এবং বাঙালির পুরাণের চাঁদ সওদাগরের মাথা না নোয়ানোর দার্ঢ্য এবং বাংলা সাহিত্যের তোরাপ ও হানিফের সাহস ও বীর্যবত্তাকে একত্রিত করে বাঙালির এক অবিসংবাদিত নেতায় পরিণত হয়ে শেখ মুজিব প্রতিষ্ঠা করেন বাঙালির উদার গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ রাষ্ট্র। এই রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ফলেই বাঙালি একটি এথনিক কমিউনিটি থেকে নেশনে পরিণতি হয়েছে। উপমহাদেশে বহু বড় এথনিক কমিউনিটি আছে, যেমন-পাঞ্জাবি, সিন্ধী, পশতু, গুজরাটি, তামিল, তেলেগু, মারাঠি, বাঙালি ইত্যাদি। কিন্তু তারা কেউ নেশন বা জাতি এবং নিজস্ব রাষ্ট্রের অধিকারী নয়। একমাত্র বাঙালিই নিজস্ব রাষ্ট্র এবং নেশনের অধিকারী। বাঙালির ভাষা, তার জন্য আন্দোলন এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে এই অসাধ্য সাধন সম্ভব হয়েছে। 

লেখক : বিশিষ্ট লোক সাহিত্য গবেষক ও

সাবেক মহাপরিচালক, বাংলা একাডেমি

ভালো লাগলে শেয়ার করে দিন :)

0 Comments

Leave a Reply

Avatar placeholder

Your email address will not be published. Required fields are marked *