ই-পেপার

SITE UNDER CONSTRUCTION
বাংলাদেশ পুলিশের মুখপত্র
অব্যাহত প্রকাশনার ৬৩ বছর

মোহাম্মদ আমজাদ হোসাইন

দেশের মানুষের জীবন ও জীবিকাকে প্রাধান্য দিয়ে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল ০৩ জুন জাতীয় সংসদে ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেট ঘোষণা করেছেন। ইতোমধ্যে বাজেট ২০২১-২২ অর্থবছরের বাস্তবায়ন সময়কালও শুরু হয়েছে। এবারের বাজেটের লক্ষ্য হচ্ছে, বিশ্বব্যাপী চলমান মহামারি করোনার ক্ষতি থেকে অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, স্বাস্থ্যখাতের প্রয়োজন মেটানো এবং ভ্যাকসিন প্রয়োগের মাধ্যমে মানুষের সুরক্ষা নিশ্চিত করা। আর আগামী অর্থবছরের উন্নয়নের ক্ষেত্রেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চলমান করোনা মহামারিকে বিবেচনায় নিয়েছেন। মূল বাজেটের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে উন্নয়ন কর্মসূচিতে বরাদ্দের ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য    কৃষি ও কর্মসৃজনকে প্রাধান্য দিয়েছেন। এছাড়া এই প্রথম কোভিড-১৯-এর প্রভাব মোকাবিলায় প্রতিটি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের লক্ষ্যমাত্রা পূরণের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে বাজেটে।

২০২১-২০২২ অর্থবছরের বাজেট মূলত মহামারি করোনাকে ঘিরেই। সবকিছুতেই বাজেটে অগ্রাধিকার পেয়েছে করোনা। বাজেটে করোনার ক্ষতি থেকে যেমন অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ আছে, তেমনি করোনায় বিপর্যস্ত মানুষের জীবন বাঁচানোরও উদ্যোগ রয়েছে। রয়েছে করোনা থেকে স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য টিকার বিষয়টিও। ফলে স্বাভাবিকভাবেই এবারের বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তাখাতে বরাদ্দ অনেক বেড়েছে। এ খাতে চলতি অর্থ বছরের জন্য যে বরাদ্দ রেখেছেন তার মধ্যে সর্বোচ্চ ১ লাখ ৭ হাজার ৬১৪ কোটি টাকাই বরাদ্দ রেখেছেন সামাজিক নিরাপত্তাখাতে। এই অঙ্ক মোট বাজেটের প্রায় ১৮ শতাংশ। নতুন বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় বিভিন্ন ভাতাভোগীর সংখ্যা ব্যাপকভাবে সম্প্রসারণ করা হয়েছে। এতে সব মিলিয়ে আরও প্রায় সাড়ে ১৪ লাখ গরিব মানুষ সরকারের সহায়তা পাবে। নতুন করে সুবিধাভোগীর সংখ্যা যোগ হলে ভাতা পাওয়া গরিবের সংখ্যা এক কোটি ছাড়িয়ে যাবে। একইভাবে স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ বৃদ্ধির সঙ্গে করোনা ভ্যাকসিন ক্রয়ের জন্য নতুন বাজেটেও থোক বরাদ্দ হিসেবে ১০ হাজার কোটি টাকা রাখা হয়েছে। অর্থমন্ত্রীর মতে, ‘আমাদের এবারের বাজেটও দেশ জাতির উন্নয়নের পাশাপাশি প্রাধিকার পাচ্ছে দেশের পিছিয়ে পড়া মানুষ- প্রান্তিক জনগোষ্ঠী ও তাদের জীবন জীবিকা।’

এই বাজেট ঘোষণার মধ্য দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের বাজেটেরও সুবর্ণজয়ন্তী হলো। ১৯৭২ সালের জুন মাসে তৎকালীন অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ ১৯৭২-৭৩ অর্থবছরের জন্য ৭৮৬ কোটি টাকা ব্যয়ের প্রস্তাব করে বাংলাদেশের যে বাজেটের গোড়াপত্তন করেছিলেন, তারই ধারাবাহিকতায় বর্তমান অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল দেশের ৫০তম বাজেট পেশ করলেন। সুবর্ণজয়ন্তীতে এসে বাংলাদেশের বাজেটের আকারও ৬ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। অর্থমন্ত্রী জাতীয় সংসদে ‘জীবন-জীবিকায় প্রাধান্য দিয়ে সুদৃঢ় আগামীর পথে বাংলাদেশ’ শীর্ষক যে বাজেটের প্রস্তাব করেছেন তার আকার দাঁড়াচ্ছে ৬ লাখ ৩ হাজার ৬৮১ কোটি টাকা- যা দেশের মোট জিডিপির ১৭.৫ শতাংশ। এই বাজেটে পরিচালনসহ অন্য খাতে মোট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ৩ লাখ ৭৮ হাজার ৩৫৭ কোটি টাকা এবং বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ২ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা। এই ব্যয় নির্বাহের জন্য ২০২১-২২ অর্থবছরে মোট রাজস্ব আয়ের প্রাক্কলন করা হয়েছে ৩ লাখ ৮৯ হাজার কোটি টাকা। যা জিডিপির ১১.৩ শতাংশ। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) উৎস থেকে পাওয়া যাবে ৩ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। এনবিআর-বহির্ভূত সূত্র থেকে কর রাজস্ব আসবে ১৬ হাজার কোটি টাকা। এছাড়া, কর-বহির্ভূত খাত থেকে রাজস্ব আহরিত হবে আরও ৪৩ হাজার কোটি টাকা।

চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনীর আওতা ও ভাতার পরিমাণ বাড়ানো হয়েছে। বেড়েছে বরাদ্দও। এ বরাদ্দ গত অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের বরাদ্দের তুলনায় ১১ হাজার ৮৪০ কোটি টাকা বেশি। সংশোধিত বাজেটে (২০২০-২০২১) বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৯৫ হাজার ৫৭৪ কোটি টাকা। সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনীর আওতায় বয়স্ক, বিধবা, স্বামী নিগৃহীতা, প্রতিবন্ধীসহ বিভিন্ন ভাতার সুবিধাভোগীর সংখ্যা ব্যাপকভাবে বাড়ানো হয়েছে। শুধু মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মানি ভাতা ১২ হাজার থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা করা হয়েছে। এই ঘোষণা অবশ্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আগেই দিয়েছিলেন।

করোনাভাইরাস মহামারিতে সবেচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছে নিম্ন আয়ের শ্রমজীবী মানুষ। প্রায় আড়াই কোটি মানুষ নতুন করে দরিদ্র হয়েছে বলে বিভিন্ন গবেষণা জরিপে তথ্য দেওয়া হয়েছে। বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী বলেন, করোনাভাইরাসজনিত কারণে কর্মহীনতা ও আয়ের সুযোগ হ্রাসের কবল থেকে দেশের অতিদরিদ্র জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষা দিতে আমাদের সরকার সামাজিক নিরাপত্তা বলয়ের আওতা বাড়ানোর উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।’

করোনাভাইরাস মহামারির সময় মানুষের জীবন ও জীবিকার সুরক্ষার কথা তুলে ধরে তিনি আরও বলেন, নিম্নআয়ের মানুষের জন্য নগদ সহায়তা কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে। লকডাউনের সময় ৩৫ লাখ পরিবারকে আড়াই হাজার টাকা করে ৮৮০ কোটি টাকা আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে। সরকারের সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনীর আওতায় বয়স্ক, বিধবা ও স্বামী নিগৃহীতা নারীরা মাসে ৫০০ টাকা ভাতা পান। গত ০৩ বছর ধরে একই পরিমাণ ভাতা পাচ্ছেন তারা। করোনাভাইরাস মহামারির মধ্যেও তাদের ভাতার পরিমাণ একই রেখেছেন প্রধানমন্ত্রী।

নতুন অর্থবছরে সামাজিক নিরাপত্তাখাতের আওতা বাড়াতে কিছু প্রস্তাব আর উদ্যোগের কথা অর্থমন্ত্রী বলেছেন বাজেট। বিদায়ী ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেটে সর্বাধিক দারিদ্র্য প্রবণ ১১২টি উপজেলায় বিদ্যমান নীতিমালা অনুযায়ী দরিদ্র প্রবীণ ব্যক্তিকে শতভাগ বয়স্ক ভাতার আওতায় আনা হয়েছে। ২০২১-২২ অর্থবছর থেকে ‘বয়স্ক ভাতা’ কার্যক্রমে উপকারভোগীর কাভারেজ প্রাপ্য শতভাগ বয়স্ক মানুষকে অতি উচ্চ ও উচ্চ দারিদ্র্যভুক্ত গ্রুপের আরও ১৫০টি উপজেলায় সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। আর এতে ৮ লাখ জন নতুন উপকারভোগী যোগ হবে এবং এ খাতে ৪৮১ কোটি টাকা অতিরিক্ত বরাদ্দ প্রদান করা হবে। ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেটে সর্বাধিক দারিদ্র্যপ্রবণ ১১২টি উপজেলায় বিদ্যমান নীতিমালা অনুযায়ী শতভাগ বিধবা, স্বামী নিগৃহীতা মহিলাকে ভাতা কার্যক্রমের আওতায় আনা হয়েছে। নতুন বাজেটে এ কার্যক্রমে আরও ১৫০টি উপজেলায় এ উপকারভোগী শতভাগ করা হবে। এতে করে ৪ লাখ ২৫ হাজার জন নতুন উপকারভোগী যোগ হবে এবং এ খাতে ২৫৫ কোটি টাকা অতিরিক্ত বরাদ্দ প্রদান করা হবে।

সর্বশেষ প্রতিবন্ধিতা শনাক্তকরণ জরিপ অনুযায়ী অসচ্ছল প্রতিবন্ধী ভাতাভোগীর সংখ্যা ২ লাখ ৮ হাজার জন বৃদ্ধি পাবে। ফলে ২০২১-২২ অর্থবছরে এ বাবদ ২০০ কোটি টাকা অতিরিক্ত বরাদ্দের প্রয়োজন হবে। গত ফেব্রুয়ারি মাসে প্রধানমন্ত্রী বীর মুক্তিযোদ্ধাদের মাসিক সম্মানি ভাতা ২০ হাজার টাকায় উন্নীত করার ঘোষণা দেন। সে অনুযায়ী তাদের ভাতা ২০২১-২২ অর্থবছরে ১২ হাজার টাকা থেকে ২০ হাজার টাকায় উন্নীত করা হচ্ছে। এতে বরাদ্দ বাড়বে ১ হাজার ৯২০ কোটি টাকা।

সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় মাতৃত্বকালীন ভাতা, নিম্নআয়ের কর্মজীবী ‘ল্যাকটেটিং’ মা ভাতা পাবেন। আগামী অর্থবছরেও তৃতীয় লিঙ্গ, বেদে ও পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠী সহায়তা পাবে। মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক ও স্নাতকে শিক্ষাবৃত্তির জন্য ২ হাজার ১০৯ কোটি টাকার বরাদ্দের প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী। সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনীর অন্যান্য কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে পেনশন, সঞ্চয়কারীদের সুদ ভর্তুকি, অতিদরিদ্রদের জন্য কর্মসংস্থান, প্রশিক্ষণ, ক্যান্সার, কিডনি ও লিভার সিরোসিস রোগীদের সহায়তা এবং চা শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়ন কার্যক্রম।

অর্থমন্ত্রী তার বাজেট বক্তৃতায় বলেন, বর্তমান সরকার দরিদ্র জনগণের উন্নয়নে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে প্রতিবছর বরাদ্দ বৃদ্ধি করে চলেছে। ২০০৮-২০০৯ অর্থবছরে সামাজিক নিরাপত্তা বলয় খাতে বরাদ্দ ছিল ১৩ হাজার ৮৪৫ কোটি টাকা। ২০২০-২১ অর্থবছরে তা প্রায় ৭ গুণ বৃদ্ধি করে ৯৫ হাজার ৫৭৪ কোটি টাকা করা হয়। আর এবার তা লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেল।

করোনা মহামারির কারণে ব্যবসা-বাণিজ্যে এক প্রকার স্থবিরতার কারণে নতুন অর্থবছরের জন্য রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে অর্থমন্ত্রী আর খুব বেশি উচ্চাভিলাষী হননি। মোট রাজস্ব আদায়ের প্রাক্কলন গত অর্থবছরের কাছাকাছি রাখা হয়েছে। বরং দেশের রাজস্ব আদায়ের যে বড় উৎস জাতীয় রাজস্ব বোর্ড তার রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা চলতি অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রার সমান রাখা হয়েছে। অর্থাৎ করোনার কারণে অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণে বেশি জোর না দিয়ে অর্থমন্ত্রী চলতি অর্থবছরে বিদেশি অর্থায়নের দিকে বেশি জোর দিয়েছেন। ফলে অর্থমন্ত্রী আশা করছেন, রাজস্ব ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে বেশ কিছু সংস্কারমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে এবং নতুন ভ্যাট আইন কার্যকর এবং নতুন কাস্টমস আইন ২০২০ সংসদে পাস হলে আগামী অর্থবছরের রাজস্ব সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হবে।

নারী উদ্যোক্তাদের ব্যবসায় আরও বেশি উৎসাহিত করতে বার্ষিক লেনদেন বা টার্নওভার করমুক্ত সীমা বেড়েছে। বিদ্যমান সীমা ৫০ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৭০ লাখ টাকা করার প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। অন্যদিকে সামগ্রিকভাবে টার্নওভার করের বিদ্যমান হার শূন্য দশমিক ৫০ শতাংশ থেকে কমিয়ে শূন্য দশমিক ২৫ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। বার্ষিক লেনদেনের ভিত্তিতে আরোপিত কর টার্নওভার কর হিসেবে বিবেচিত। বর্তমানে নারী-পুরুষ সব উদ্যোক্তার জন্য টার্নওভার করমুক্ত সীমা ৫০ লাখ টাকা। বাজেট বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী বলেন, একটি দেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রা এবং টেকসই উন্নয়নে নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের গুরুত্ব অপরিসীম। পুরুষের পাশাপাশি নারী উদ্যোক্তার সংখ্যা বাড়লে নারীর অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত হবে। নারী উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ প্রণোদনা হিসেবে ব্যবসার মোট টার্নওভারের ৭০ লাখ টাকা পর্যন্ত করমুক্ত রাখায় এসএমই খাত ও নারী উদ্যোক্তারা উপকৃত হবেন।

প্রস্তাবিত বাজেটে স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়নে ৪১ হাজার ১০ কোটি টাকা বরাদ্দ রেখেছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। গত অর্থবছরে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ এ খাতে বরাদ্দ ছিল ৩৮ হাজার ৩৩৮ কোটি টাকা। নতুন অর্থবছরে স্থানীয় সরকার বিভাগে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৩৯ হাজার ২২০ কোটি টাকা। এর মধ্যে পরিচালন খাতে পাঁচ হাজার ৩২২ কোটি এবং উন্নয়ন খাতে ৩৩ হাজার ৮৯৮ কোটি টাকা। এ ছাড়া পল্লি উন্নয়ন ও সমবায় খাতে বাজেটে বরাদ্দ রাখা হয়েছে এক হাজার ৭৯১ কোটি টাকা।

বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী বলেন, ২০১৮ সালের নির্বাচনি ইশতেহারে সরকার দেশের প্রতিটি গ্রামে নাগরিক সুবিধা সম্প্রসারণ ও বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়ার লক্ষ্যে ‘আমার গ্রাম আমার শহর’ অঙ্গীকার ব্যক্ত করে। নির্বাচনি ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অন্যতম দর্শন ‘আমার বাড়ি আমার শহর’ ধারণাটির বাস্তবায়নে সরকার অনেক দূর এগিয়ে গেছে। এ পরিকল্পনার লক্ষ্য হলো- সামগ্রিকভাবে একটি উন্নত জীবনযাত্রার জন্য যে ব্যবস্থাপনা মানুষের প্রয়োজন এবং শহরে যেগুলো পাওয়া যায়, সেগুলোর সবকিছুই গ্রামে করা হবে।

তৈরি পোশাকের জন্য বাজেটে রপ্তানিতে প্রণোদনা, উৎসে কর ও কর্পোরেট কর গত অর্থবছরের মতোই অব্যাহত রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। বাজেটে পোশাক খাতের এই তিন সুবিধার দিকে দৃষ্টি থাকে উদ্যোক্তাদের। ২০২০-২১ অর্থবছরে অন্যান্য প্রণোদনার সঙ্গে অতিরিক্ত ১ শতাংশ রপ্তানি প্রণোদনা রয়েছে। করপোরেট কর হার ১০ ও ১২ শতাংশ। গ্রিন বিল্ডিং সনদ আছে এ রকম কারখানার ক্ষেত্রে ১০ এবং সনদ নেই এরকম কারখানার ক্ষেত্রে ১২ শতাংশ। এ হার ২০২২ সাল পর্যন্ত অব্যাহত রাখার কথা বলা হয়েছে। রপ্তানি আয়ে বড় সম্ভাবনা আছে এমন পণ্যকে সরকার নগদ সহায়তা দিয়ে থাকে। এতে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় সক্ষমতা তৈরি হয়। গত অর্থবছরে তৈরি পোশাকসহ ৩৬ ধরনের পণ্য এ সুবিধার আওতায় আছে। গত অর্থবছরের বাজেটে আয়কর অধ্যাদেশে তৈরি পোশাকসহ সব ধরনের পণ্যের রপ্তানি মূল্যের ওপর শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। এর আগ পর্যন্ত অধ্যাদেশে এ হার ছিল ১ শতাংশ। যদিও বাজেট পেশের পর এসআরও জারির মাধ্যমে তা বিভিন্ন হারে কমানো হয়েছে বিগত বছরগুলোতে।

বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী আ হ ম মোস্তফা কামাল বলেন, বস্ত্র ও পোশাক খাতে ১ শতাংশ হারে অতিরিক্ত প্রণোদনার ফলে সফলভাবে করোনা মহামারি মোকাবিলা সম্ভব হয়েছে। গত অর্থবছরে এ ধারা অব্যাহত রাখায় বস্ত্র ও পোশাক খাত ঘুরে দাঁড়ায়। একারণে চলতি অর্থবছরেও অতিরিক্ত রপ্তানি প্রণোদনা অব্যাহত রাখা হয়েছে। ১ শতাংশ প্রণোদনার অতিরিক্ত হিসেবে নতুন বাজার এবং দেশীয় বস্ত্র ব্যবহারের ক্ষেত্রে বিভিন্ন হারে প্রণোদনা রয়েছে পোশাক খাতে। বস্ত্র ও পোশাক খাতে পরিবর্তন বলতে কারখানা ভবনের জীবনকালের বিবেচনায় আয়কর আইনের বিদ্যমান অবচয়ের হার ১০ শতাংশ করা হয়েছে। অন্যান্য সাধারণ ভবনের ক্ষেত্রে এ হার ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করা হয়েছে।

করোনাকালীন সংকট মোকাবিলায় কৃষি খাতকে বিশেষ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছিল বিদায়ী অর্থবছরের বাজেটে। এবারও এ খাতে সুখবর দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। এবার ভর্তুকি আগের মতোই সাড়ে ৯ হাজার কোটি টাকা থাকলেও কৃষি মন্ত্রণালয়ের জন্য প্রায় ৭৫০ কোটি টাকা বেশি বরাদ্দ প্রস্তাব করা হয়েছে। বাজেটে কৃষিপণ্য উৎপাদনের ছয় খাতে মিলবে ১০ বছরের কর অবকাশ। খরচ কমছে কৃষিজাত পণ্য উৎপাদনে। অধিক খাদ্য উৎপাদনের জন্য কৃষি যান্ত্রিকীকরণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে বরাদ্দ দ্বিগুণ করা হয়েছে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের জন্য গত বাজেটে বরাদ্দ প্রস্তাব করা হয় ১৫ হাজার ৪৪২ কোটি টাকা। সংশোধিত বাজেটে এর আকার দাঁড়ায় ১৪ হাজার ২১৫ কোটি টাকা। এবার করা হয়েছে ১৬ হাজার ২০১ কোটি টাকা। বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী বলেন, কৃষি আমাদের তৃতীয় সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার খাত। এ জন্য আমরা অধিক খাদ্য উৎপাদনের জন্য

কৃষি যান্ত্রিকীকরণ, সেচ ও বীজ প্রণোদনা, কৃষি পুনর্বাসন, সারের ওপর ভর্তুকি প্রদানসহ কার্যক্রম অব্যাহত রাখব।

দেশের বিপুল জনগোষ্ঠীর জন্য প্রোটিনের চাহিদা পূরণের বিষয় মাথায় রেখে প্রস্তাবিত বাজেটে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে ২৪৪ কোটি টাকা বরাদ্দ বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। এ খাতে ৩ হাজার ৪৩৭ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। গত অর্থবছরে এই খাতে বরাদ্দ ছিল ৩ হাজার ১৯৩ কোটি টাকা। সংশোধিত বাজেটে এর আকার দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৫২৫ কোটি টাকা। এবারের বাজেটে বেশ কয়েকটি কৃষি উপকরণের ওপর মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট অব্যাহতির প্রস্তাব করা হয়েছে। উইডার ও উইনোয়ারের উৎপাদন ও ব্যবসায়ী পর্যায়ে ভ্যাট অব্যাহতির প্রস্তব করা হয়েছে বাজেট প্রস্তাবনায়।

করোনাভাইরাসের এই সময়ে কর্মসংস্থান বাড়াতে এবং নতুন বিনিয়োগ খরা কাটাতে উদ্যোক্তাদের জন্য বেশকিছু খাতে কর ছাড় দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। এর মধ্যে কৃষিপণ্যের ছয় খাতে থাকছে ১০ বছরের কর অবকাশ। অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, স্বল্পমূল্যে কৃষিজাত পণ্য উৎপাদন ও বাজারজাতকরণের জন্য কৃষি খাতের আধুনিকায়নের জন্য বেশ কয়েকটি পণ্যের উৎপাদন ও ব্যবসায়ী পর্যায়ে ভ্যাট অব্যাহতি দেওয়া হবে। থ্রেসার মেশিন, পাওয়ার রিপার, পাওয়ার টিলার, অপারেটেড সিডার, কম্বাইন্ড হারভেস্টার, রোটারি টিলারের ওপর আমদানি পর্যায়ে আগাম কর অব্যাহতির কথাও জানান অর্থমন্ত্রী। শর্তসাপেক্ষে ফল ও শাকসবজি প্রক্রিয়াজাতকরণ, দুগ্ধ ও দুগ্ধজাত পণ্য উৎপাদন, সম্পূর্ণ দেশীয় কৃষি হতে শিশুখাদ্য উৎপাদনকারী শিল্প এবং কৃষি যন্ত্রপাতি উৎপাদনে নতুন বিনিয়োগে ১০ বছরের করমুক্তি সুবিধা রাখা হয়েছে।

করোনাকালে সাধারণ জনগণের ওপর করের বোঝা না চাপিয়ে সমাজে যারা বিত্তবান, তাদের কাছ থেকেই বেশি কর আহরণে চলতি বাজেট জোর দিয়েছেন। এ জন্য ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেটে সম্পদশালীদের ওপর সারচার্জ বাড়ানো হয়েছে। সেই সঙ্গে সারচার্জ আদায় প্রক্রিয়াও সহজ করা হয়েছে। দেশের জনসংখ্যার বড় একটি অংশ কর প্রদানে সক্ষম হলেও কর প্রদানকারীর সংখ্যা বর্তমানে মাত্র ২৫ লাখ ৪৩ হাজার। ফলে রাজস্ব জিডিপির অনুপাতে অন্যান্য দেশের চেয়ে বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে আছে। তাই চলতি অর্থবছরে এই কর ফাঁকি রোধ করে কর পরিধি আরও বিস্তৃত করা হবে, যাতে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা যায়।

অর্থমন্ত্রীর বাজেট ব্যয় এবং রাজস্ব আয়ের মধ্যে ঘাটতি মেটানোর জন্য অর্থমন্ত্রী বৈদেশিক এবং অভ্যন্তরীণ দুই উৎসের ওপরই সমানভাবে নির্ভর করেছেন। ঘাটতি মোকাবিলায় বৈদেশিক উৎস থেকে চলতি অর্থবছরে এক লাখ ১ হাজার ২২৮ কোটি টাকা পাওয়া যাবে বলে অর্থমন্ত্রী আশা করছেন। আর অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ঋণ নেওয়া হবে এক লাখ ১৩ হাজার ৪৫২ কোটি টাকা। অভ্যন্তরীণ উৎসের মধ্যে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ৭৬ হাজার ৪৫২ কোটি টাকা এবং সঞ্চয়পত্র ও অন্য ব্যাংক বহির্ভূত খাত থেকে নেওয়া হবে ৩৭ হাজার ১ কোটি টাকা।

প্রধানমন্ত্রী করোনা ভাইরাসের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব মোকাবিলায় জীবন ও জীবিকাকে প্রাধান্য দিয়ে এই বাজেটে দেশের অর্থনীতি পুনর্গঠনের মাধমে জনগণের মৌলিক চাহিদা পূরণ করার চেষ্টা করেছেন। বিগত এক দশকে দেশের ক্রমাগত উচ্চ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন কোভিড-১৯ এর প্রভাবে বাধাগ্রস্ত হয়েছে। অর্থমন্ত্রী আশা করেছিলেন, কোভিড-১৯ এর প্রভাব থেকে চলতি অর্থবছরে অর্থনীতি পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হবে। এজন্য মূল বাজেটে জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ৮.২০ শতাংশ। কিন্তু করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের কারণে অর্থনীতি শ্লথ গতি অব্যাহত আছে। আমদানি-রফতানিও কাক্সিক্ষত গতি ফিরে পায়নি। তাই প্রবাসী আয়ে প্রবৃদ্ধি এবং সরকারের প্রণোদনা প্যাকেজগুলোর বাস্তবায়ন বিবেচনায় নিয়ে ২০২০-২১ অর্থবছরের ডিজিপি প্রবৃদ্ধির প্রাক্কলন সংশোধন করে ৬.১ শতাংশে নির্ধারণ করা হয়েছে। আর কোভিড-১৯ পরবর্তী উত্তরণ বিবেচনায় নিয়ে ২০২১-২২ অর্থবছরের প্রবৃদ্ধির হার নির্ধারণ করা হয়েছে ৭.২ শতাংশ। এ সময়ে মূল্যস্ফীতি ৫.৩ শতাংশের মধ্যে রাখা সম্ভব হবে বলে অর্থমন্ত্রী আশা করছেন।

গত পাঁচ দশকে বাংলাদেশ অনেক দিক দিয়ে বদলে গেছে। কেবল বদলায়নি বঙ্গবন্ধুর চিরঞ্জীব আদর্শ এবং জাতির জীবনের সর্বক্ষেত্রে তার সজীব উপস্থিতি। তার নির্দেশিত পথেই বাংলাদেশ এগিয়ে চলেছে। এর মধ্য দিয়েই বাংলাদেশের স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণ ঘটেছে। বাংলাদেশ স্থান পেয়েছে বিশ্বসভায় এক অনন্য উচ্চতায়। অর্থমন্ত্রী আশা প্রকাশ করে বলেন, ‘আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি জাতির পিতার তুলিতে আঁকা স্বপ্ন সোনার বাংলাদেশ বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে যাবে, এগিয়ে যাবে অনেক দূর- বহু দূর, বহু দূর-নিরন্তর।’ 

  প্রতিবেদক : এআইজি

  (প্ল্যানিং অ্যান্ড রিসার্চ-১)

  বাংলাদেশ পুলিশ

ভালো লাগলে শেয়ার করে দিন :)

0 Comments

Leave a Reply

Avatar placeholder

Your email address will not be published. Required fields are marked *