ই-পেপার

SITE UNDER CONSTRUCTION
বাংলাদেশ পুলিশের মুখপত্র
অব্যাহত প্রকাশনার ৬৩ বছর

জব্বার আল নাঈম

বাবা অসুস্থ। হাঁটতে পারেন না। কথা আটকে যাচ্ছে বার বার। দিনের অধিকাংশ সময় শুয়ে থাকেন। মাঝে মধ্যে বসার চেষ্টা করেন, তাও অন্যের সহযোগিতায়। বসিয়ে দিলেও থাকতে পারেন না, ধরে রাখতে হয়। বালিশ-বেষ্টনীতে রাখতে হয়। মায়ের অনুপস্থিতে বাবা দুর্বল হয়ে পড়েছেন। শরীরের কোনো অংশই বুঝ মানছে না। একটা সময় বাবার শরীরের চামড়া আজকের আমার মতোই টান টান ছিল। এখন কুচকে গেছে। শরীরের প্রতি অঙ্গ অংশে ভাঁজ। এখন ঠিকঠাক কিছুই দেখতে পারছেন না। মাঝে মধ্যে আমাকেও চিনতে কষ্ট হয়। মুখে দাঁত নেই। বাহুতে নেমেছে বার্ধক্য। দাঁড়ানোর শক্তি নেই। বাবার মাথায় ছিল বাহারি রঙের কেশ, অথচ এখন কেশ শূন্য। স্মরণ শক্তিতেও আগের তীক্ষ্মতার অভাব। নিজের নামও ঠিকঠাক মনে রাখতে কষ্ট হয়।

ঘরে বাবা আর আমি। কাজের লোক নেই। মফস্বলের বাড়িতে কাজের লোক পাওয়া দুষ্কর। বাধ্য হয়ে রান্না ঘরে যেতে হয় আমাকে। বাবার গোসল থেকে ওষুধ খাওয়ানো এক হাতে সামলাতে হয়। পায়খানা প্রস্রাব আমি ছাড়া কে পরিষ্কার করবে। কোনোরকম দ্বিধা ছাড়াই এসব সম্পন্ন করি। এ নিয়ে বন্ধুরা নাক ছিটকায়। কেউ আমার সঙ্গে মিশতে চাইত না। নিজেকে বুঝ দিতাম- বন্ধুদের ব্যস্ততা বেড়েছে। যদিও আগে অনেকের সঙ্গে কারণে-অকারণে দেখা মিলত। আড্ডা হলো বাঙালির প্রাণ। না দিতে পারলে মন খারাপ হয়ে যায়। আমিও হাঁপিয়ে উঠি। আবার মনকে সান্ত¡না দেই। এই মুহূর্তে আমি ছাড়া বাবার কাছে দ্বিতীয় কেউ নেই। বাবাও অন্য ভাইবোনদের চেয়ে আমার সঙ্গ উপভোগ করেন।

পাঁচ ভাই, চার বোনের ছোটো আমি। বড়ো ভাই জেলা শহরের নামকরা আইনজীবী। বাবাকে দেখার সময় হাতে নেই তার। দারুণ ব্যস্ততা আইন চর্চায়। ভাবির অভিযোগ সন্তানদেরকেও সময় দেয় না ভাই। দ্বিতীয় ভাই আইটি স্কলারশিপে সপরিবারে থাকেন অস্ট্রেলিয়ায় । তা-ও প্রায় নয় বছর। বিয়ে করেছেন ওই দেশের মেয়ে। ওখানে কাজের মূল্য অনেক। বসে থাকারও সুযোগ কম। নানা ব্যস্ততার কারণে দেশের কথা ভুলেই আছেন ভাই-ভাবি। বড়ো বোন স্বামীর সঙ্গে ঢাকায় স্থায়ী। পারিবারিক ব্যবসা দেখাশোনা করেন দুলা ভাই। শ^শুর বাড়িতে একগাল কুলি ফেলার সময় কম। দ্বিতীয় বোনের স্বামী উপজেলা শহরের পৌর মেয়র। মানুষের অভাব-অভিযোগের বিচার আচার রাজনীতি নিয়ে থাকতে হয় তার। নগর পিতাকে যোগ্য সঙ্গ দিতে হয় নগর মাতার। এত কাছে থাকার পরও আসার সময় থাকে না। তৃতীয় ভাই ইসলামিক স্কলার। মিশরের আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয় পাশ। দেশ-বিদেশে ওয়াজ মাহফিল করে মানুষকে হেদায়েতের বাণী শোনায়। অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে একটি বড়ো মাদরাসার ভারপ্রাপ্ত মুহতামিম। পর্দানশীল স্ত্রী। পর পুরুষের সঙ্গে দেখা করতে ভাইয়ের নিষেধ আছে। এমনকি শ্বশুরের খেদমতও করা যাবে না।

আমার বড়ো ভাই মেডিকেল ডিগ্রি নিতে লন্ডন গেছেন বছর তিনেক আগে। সেখানে তার বিয়ের কথাবার্তা চলছে। হবু ভাবি বাংলাদেশি মেয়ে। পরিবারের সঙ্গে সেখানে থাকেন। বিয়ের পর স্থায়ীভাবে থাকার ইচ্ছে ভাইয়ের। বাংলাদেশ ভালো লাগেনি। এখানে বসবাসের সুন্দর পরিবেশ নেই। একজন আরেকজনের পেছনে লেগে থাকে। ধান্ধাবাজির পেছন ঘুরঘুর করে। কে কার ক্ষতি করবে সেই ফন্দি আঁটে। আবার মেধাবী ও যোগ্যদের মূল্যায়ন করা হয়নি ঠিক মতো। আবেগে ভরপুর জাতি। এসব ভাইয়ের একান্ত ভাবনা। তাঁর সিদ্ধান্ত দেশে ফিরবেন না। তৃতীয় বোন ও ভগ্নিপতি দুইজনেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাক্তার। ফুটফুটে একটি মেয়ে সন্তানের জননী। আমাকে পছন্দ করে। আমার সঙ্গে ফোনে কথা বলতে গিয়ে নানার সঙ্গেও কথা বলতে চায়। সে জানে না এসবের প্রতি কোনো আকর্ষণ নেই নানার। একদম ছোটো বোন বিসিএসের প্রশাসন ক্যাডার। কয়েকদিন পরপর তার অফিস বদলি হয়। সেই সুবাধে পালটাতে হয় বাসা-বাড়ি। ছেলেটা জন্ম থেকেই বধির। দেখাশোনার জন্যে লোক রেখেছেন একজন। চিকিৎসা করতে কয়েক বার দেশের বাইরে পাঠানো হয়েছে। সুস্থ আর হয়ে ওঠেনি।

০২

বিশ^বিদ্যালয় পাশ করেও দীর্ঘদিন বেকার আমি। চুপচাপ দেখছি, এ নিয়ে কারো উদ্বিগ্নতা নেই। এমনকি কেউ ভাবছেও না। সৌজন্যতা দেখিয়েও কেউ কিছু বলেনি। মাঝে মধ্যে আশপাশের মানুষ ও পৃথিবী নিয়ে বিস্মিত হই। কেউ কেউ জানতে চায়, কেনো চাকরি করছি না? আবার কারো কারো ধারণা একাডেমিক রেজাল্ট ভালো নয়। নয়ত ঢাকায় ঠিকঠাক লেখাপড়া করিনি। চাকরি না হওয়ার অন্য কোনো কারণ নেই। চাকরির জন্যে যে চেষ্টা করিনি এমন নয়। হয় না। নিজের হীনম্মন্যতা বাড়তে থাকে। আত্মবিশ্বাস হারিয়ে যায়। অথচ পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণিতে সরকারি স্কলারশিপ পেয়েছি। এসএসসি ও এইচএসসিতে গোল্ডেন এ প্লাস। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় প্রথম শ্রেণিতে অনার্সসহ মাস্টার্স। সেই আমি চাকরি না করাটা মানুষের কাছে যেমন অবিশ্বাসের ঠেকে, নিজের কাছেও অবিশ্বাস্য লাগে। যখনই বাবাকে বলতাম আমার চাকরি হচ্ছে না কেনো? বলতেন- একদিন হবে। রোজ রোজ বাবার এমন কথা শুনে বিরক্ত লাগত। জানি না সেই একদিন আর কবে! আবার এটাও ভাবি, চাকরি হয়ে গেলে কে বাবার দেখা শোনা করবে? কার আশ্রয়ে রাখব? তখন মনে হয়, চাকরি না হওয়াটা আরো ভালো।

প্রেমিকার নাম গুলবদন। ফোনালাপ হলেই জানতে চায়, কবে বিয়ে করছি। অথচ এর সঠিক জবাব আমার কাছে নেই। এ নিয়ে কোনো দিন ঝগড়া থামেনি বরং বেড়েছে। লেখাপড়া শেষ করে হ্যান্ডসাম সেলারিতে কর্পোরেট চাকরি করছে সে। তা-ও তিন বছর। বউ চাকরি করবে আমি বেকার বসে খাবো এমন ছেলে আমি না। চাকরি হলে তারপরই বিয়ের পিঁড়িতে বসব। স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছি। গুলবদনও চেষ্টা করছে আমার চাকরির জন্যে। হচ্ছে না। এক চাকরি হচ্ছে না তার উপর পরিবারের চাওয়া ছোটোখাটো চাকরি করা যাবে না। পরিবারের সম্মানে লাগবে।

প্রেমিকার বিয়ে প্রতিদিনই হয়- এমনটা শুনতে শুনতে কান ঝালাপালা। সেই রাখাল ছেলে আর জঙ্গলের বাঘের গল্পের মতো, সত্যি সত্যি একদিন বাঘ এসে রাখাল ছেলেকে খেয়ে ফেলবে। গুলবদন বিয়ে করে স্বামীর সংসার শুরু করবে। বছর শেষে জন্ম নেবে ফুটফুটে সন্তান। এভাবে কতদিন একজনকে স্বপ্ন দেখিয়ে থামিয়ে রাখা যায়? আমাকে ছাড়া অন্য কাউকে ভাবতেও পারছে না গুলবদন। এটা তার দোষ নয়। তাকে স্বপ্ন দেখিয়েছি আমি। ভাবাতে বাধ্য করেছি। স্বাভাবিকভাবেই অন্য কাউকে ভাবতে পারছে না সে। গুলবদন অন্য কোথাও বিয়ে করলে আমি নিঃসঙ্গই থেকে যাব। গুলবদন এ জন্যেই অপেক্ষা করছে। কিন্তু একটা মেয়ে কতদিন অপেক্ষা করবে সেটাও ভাবছি। এমন অনেক ভাবনা আমাকে উন্মাদ হতে সাহায্য করবে।

০৩

মুহতামিম ভাইয়ের দুই ছেলেকে পছন্দ করেন বাবা। তারাও বাবাকে পছন্দ করে। মাঝে মধ্যে বেড়াতে এসে সালাম দিয়ে বাবার কাছে বসে, ইহকাল, পরকাল, নামাজ, রোজা, আহকাম-আরকান প্রসঙ্গে কথা বলে। বাবা খুশি হন। তারা আরবি পড়ুয়া বলেই যে বাবা খুশি তা নয়, আরেকটা কারণ, তারা বাংলায় কথা বলে। খুশিতে চোখে পানি ঝরে বাবার। অন্য ভাইয়ের ছেলেমেয়েরা ইংরেজি মাধ্যমে পড়ে। বাংলা উচ্চারণ পারে না বলা যায়। অথচ অন্য ভাষায় কথা বলা বাবার অপছন্দ। তাই আমাকে বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলায় পড়তে বাধ্য করেছেন। বাবার কথা পৃথিবীতে একমাত্র আমরাই ভাষার জন্যে রক্ত দিয়েছি। মিছিল করেছি। ভাষা আন্দোলনে বাবার গায়ে গুলি লেগেছিল। সেই ক্ষত এখনও তাজা। যাকে রক্ত দিয়ে অর্জন করেছি তাকে অন্যের প্রেমে পড়ে বর্জন করব না! এমন ইতিহাস কেনো অস্বীকার করব। যখন যে ভাষার প্রয়োজন তখন সেই ভাষা ব্যবহার করব। কিন্তু নিজেরটাকে চিরতরে বাদ দিয়ে নয়। ভাইবোনের ছেলেমেয়ে মোট তের জন। এগার জনই কথা বলে ইংরেজিতে। এমনটা বাবার অপছন্দ। বাংলা ভাষার পাশাপাশি অন্য ভাষার চর্চা করা যেতে পারে। বাঙালি হয়ে অন্য ভাষার পাশাপাশি বাংলা চর্চাটা একেবারে বেমানান। তারা জানে না ঠাকুরমার ঝুলি কী? লেখক কে? রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কিসের জন্যে নোবেল পেয়েছেন? তিনি কোন ভাষার কবি? কাজী নজরুল ইসলাম কোন ভাষার জাতীয় কবি? এমন ছেলেমেয়েরা হয়ত পটরপটর ইংরেজি বলতে পারবে, প্রাণ খুলে বাংলা বলতে পারবে না। নব্বই শতাংশ কৃষকের দেশে পটরপটর ইংরেজি বলা মানুষকে কেউ পছন্দ করবে না। করলেও দূরত্ব বজায় রেখে চলে। কারণ, ইংরেজি বাংলার মতোই একটি ভাষা। ইংরেজরা প্রভূত্ব সব দেশের ওপর চাপিয়েছে। বাংলাকে আমরা রক্ত দিয়ে অর্জন করেছি। অর্জন করা জিনিস ছোটো হলেও আনন্দের।

বেকারত্বের ফলে নিজের ওপর এক ধরনের অবসাদ নেমে এসেছে। অবসাদ কাটাতে বাড়ির পাশের কিন্ডার গার্টেনে বাংলার ক্লাস নেই। ছাত্রছাত্রীরা আমাকে পেয়ে খুশি। তাদেরকে বাংলা ভাষার গুরুত্বের প্রসঙ্গ বলি। বিশুদ্ধভাবে বলতে ও লিখতে চেষ্টা করে তারা। আঞ্চলিকতা পরিহার না করতে বলি। এটি ভাষার অলংকার। সৌন্দর্য। আঞ্চলিক ভাষায় নতুন নতুন শব্দের সন্ধান মিলে। আমার সামান্য কাজে বাবাকে খুশি খুশি লাগে। ভাষা নিয়ে আগ বাড়িয়ে কথা বলেন। বাংলা ভাষার অগ্রগতি কতটুকু শুনতে চান। সেই থেকে আমরা বন্ধুর মতো বিভিন্ন প্রসঙ্গে আলোচনায় মেতে উঠি। মৃদু-মন্দ পক্ষ-বিপক্ষ বা তর্ক-বিতর্ক হয়। যদিও এর সবটুকুই মধুর। বাবা রেগে গেলেও আমি সহজ করে ফেলি। তখন বাবা বলেন, তুমি শিক্ষক হিসেবে যোগ্য।

অনেকদিন পর খেয়াল করলাম বন্ধু-বান্ধব ছাড়া দিব্যি কাটিয়ে দিতে পারছি। বাবার মতো বন্ধু পেলে অন্যদের প্রয়োজন কমে আসে। এই বয়সেও বাবা অনেক আধুনিক। ধর্ম ও অধর্ম সম্পর্কে জ্ঞান দেন। বিজ্ঞান সম্পর্কে অনর্গল বলতে পারেন। জানতে চান আমার প্রেমিকা গুলবদনের কথা। গুলবদন একাধিকবার এসে বাবাকে দেখে গেছে। মায়ের সঙ্গে প্রথম দেখার স্মৃতিচারণ করেন বারবার। বাবার জীবনে অনেক অভিজ্ঞতা। সেসব বলতে থাকেন। আমিও মুগ্ধ পাঠকের মতো শুনি। সেলজুক সাম্রারাজ্য থেকে ওসমানীয় সাম্রারাজ্যের ইতিহাস, আমেরিকার উত্থান পর্ব ও আধিপত্যের কাহিনি, ইউরোপ যেভাবে মাথা উঁচু করে দাঁড়ায়, সেসবও বলেন। মোঘল সাম্রারাজ্য যতটা না অন্যের তারচেয়েও বেশি নিজেদের কারণে পতন ঘটেছে। এরই পরম্পরাই জানতে পারি সাতচল্লিশের ভারত-পাকিস্তান। একাত্তরে পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ হওয়ার ঘটনা। চাকরি প্রার্থীর জন্যে বিষয়গুলো উপকারী। বাবার মস্তিষ্ক আগের মতো তীব্র ও তীক্ষ্ম হচ্ছে ভেবে ভালো লাগছে। দেখলাম বন্ধুত্ব নির্দিষ্ট বয়সের কোনো মানুষের সঙ্গে নয়। একজন জানাশোনা মানুষের সঙ্গে। বাবা ঠিক তাই।

দ্বিতীয় বোন উপজেলায় থাকেন। মাঝে মধ্যে বাড়িতে ঢুঁ মারেন। আমাকে নিয়ে বাবার সঙ্গে পরামর্শে বসেন। কেনো চাকরি করছি না। বিয়ে করে সংসার করছি না। আরো কত কী। দ্বিতীয় বোনের ওপর খুশি আমি। কারণ, বিষয়টি নিয়ে ভাবছেন। একদিন বাবাকে বলেন, ও কিন্ডার গার্টেনে শিক্ষকতা করে- কীভাবে চলবে? বিশ্ববিদ্যালয় পাশ একটি ছেলে কিন্ডার গার্টেনে শিক্ষকতা করলে সম্মান থাকে? সমাজে মুখ দেখাতে পারব? চাকরি না পেলে প্রয়োজনে বেকার থাকবে। জমিজামা চাষ অথবা বিক্রি করে খাবে।

আপার কথায় হাসি পেল। চলে যাওয়ার সময় কড়া কণ্ঠে বলে গেলেন, কিন্ডার গার্টেনের চাকরি ছেড়ে দেই যেন। বেকার থাকার চেয়ে কিছু করা ভালো। কিছু করতে গিয়ে কারো মনে আঘাত লাগাটা বেদনাদায়ক। বুঝতে পারছি না, বাচ্চাদের পড়ালে সম্মান কীভাবে যায়! বাচ্চাদের পড়াতে ভালো লাগে আমার। ওরা শিখতে চায়। আমিও শেখাতে চাই। এটা ভালো পারি আমি। আপার সিদ্ধান্ত অস্বস্তিতে ফেলে দেয়। বাবা এ বিষয়ে আপাকে কিছু না বললেও আমাকে ডেকে বললেন স্কুলে নিয়মিত যাও। ছাত্রছাত্রীরা কীভাবে পড়তে চায় তা রপ্ত করো। স্কুলের প্রেমে পড়িও না।

প্রতিদিনের মতো বাবার সঙ্গে আলাপ-আড্ডায় আবার মেতে উঠি। বড়ো আপার ফোন। বাবার সঙ্গে কথা বলতে চায়। কথা বলতে অনীহা প্রকাশ করেন বাবা। আপা কথা বলবেন। বাবার অস্পষ্ট কথাগুলো আপার বুঝতে সমস্যা হয়। অনুমানে বুঝতে পারছি, বাবা কিছুতেই জমি বিক্রি করতে রাজি না। বলছেন, দেখো, একদিন সবাই এই বাড়িতে এসে আশ্রয় নিবে। তখন আমাকে স্মরণ করবে। প্রতিটি ধূলা-বালি সাক্ষ্য দিবে আমার কষ্ট ও মেহনতে নির্মিত বাড়ির কথা। এটা হবে ঐক্যের প্রতীক। নষ্ট করা ঠিক হবে না। কেউ করতে চাইলেও ঠেকানো উচিত।

বাবা কখনও বলেনি তুমি কিন্ডার গার্টেনে থাকো অথবা চাকরি খুঁজে নাও। একদিন মেজো বোনের কথার প্রসঙ্গে বলেছিলেন, আমি চাই না সব ছেলেমেয়ে চাকরি করুক। কেউ অন্তত বৃদ্ধ বয়সে আমার বিছানার পাশে থাকুক। গল্প করুক। আমার মাথায় হাত রাখুক। প্রয়োজনটা জেনে সহায়তা করুক। অভিজ্ঞতায় সে সমৃদ্ধ হোক। মৃত্যুর সময় পানির গ্লাস তুলে পিপাসা মিটাক। টাকা উপার্জন জীবনের এক মাত্র লক্ষ্য হওয়া ঠিক নয়। পৃথিবীতে মানুষ মানুষের জন্যে। সন্তান কেনো বাবা-মায়ের জন্যে হবে না?

বাবার ইচ্ছে পূরণের জন্যে বাবা চায়নি চাকরি করি। আমাকে নিয়ে পরিবারের সবাই উদ্বিগ্ন থাকলেও বাবাকে উদ্বিগ্ন হতে দেখিনি। এরপর বাবার প্রতি কিছুটা অভিমান বাড়ে। তুলনামূলক কথা বলি কম। কমে গেছে আড্ডা। যেখানে প্রাণ নেই সেখানে আড্ডা জমে না। বাবা কাছে ডেকে কথা বললেও প্রয়োজন ছাড়া তেমন কিছু বলিনি। অসুস্থ কিনা জানতে চান। সংক্ষিপ্তভাবে বলি, ঠিক আছি। তিনি আমাকে মায়ের কথা বলেন। শৈশবের কথা বলেন। জানি, বাবা আমাকে হাসাতে চান। কেনো জানি বাবার সঙ্গে বেশিক্ষণ রাগ করে থাকতে পারি না। তাছাড়া রাগ করেও লাভ নেই। মাস ছয়েক আগে সরকার নির্ধারিত চাকরির বয়স অতিক্রম করেছি। এই কারণেও আমার মন খারাপ থাকে। কিছু আবেদন করা আছে। সেগুলোই শেষ ভরসা। না হয় এই কিন্ডার গার্টেনেই থাকতে হবে। বাদ দিতে হবে গুলবদনের প্রেম ও ভালোবাসা।

০৪

বাবা আগের চেয়ে বেশি অসুস্থ। খাওয়া-দাওয়া এক প্রকার বন্ধ। কথাও বলছেন না। বাবা কথা না বললে সব কিছু অসহ্য লাগে। ডাক্তার ভরসা রাখতে পারছেন না। একই সময় আমার ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্নতা প্রকাশ করেন মেজো আপা। জমি বিক্রি করে ব্যাংকে এফডিআর করতে বলেন। এরপর বিয়ে করতে হবে। ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়েও ভাবতে হবে। ভাগের অতিরিক্ত টাকা ভাই-বোনরা বণ্টন নিতে চায়। সিরিয়াস আলোচনা চলছে। এক ফাঁকে বাবা চোখ মেলে তাকান। আবার চোখ বুঝেন। কিছুক্ষণ পর আবারও তাকান। সবাই তখন নীরব। বাবার দিকে তাকিয়ে আছি আমরা। হয়ত শেষ নসিহত করবেন ছেলেমেয়েদের। চোখ বেয়ে পানি পড়ছে। আমার দিকে তাকিয়ে ইশারা করেন বাবা। কাছে বসে চোখের পানি মুছে দেই। আবার চোখ বুজেন বাবা। উদ্বিগ্নতা বাড়ছে আমাদের। আমি চাই বাবা বেঁচে থাকুক। বাবার খেদমত করতে চাই। বাকি জীবন বাবার সেবা করে কাটিয়ে দেব। যে হবে আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ বন্ধু। সবার চেয়ে বেশি ভালোবাসেন আমাকে, এটা অন্তত বুঝি। না হয় কেনো আমাকে কাছে রাখতে চাইবেন। তাছাড়া বাবাকে ছাড়া এখন ভালোও লাগে না। এখনও অনেক কিছু জানার আছে। প্রয়োজনে চাকরি করব না। ক্যারিয়ার লাগবে না। বাবা বেঁচে থাকুক। খাদেম হিসেবে থাকতে চাই আমি।

ঘণ্টাখানেক পর চোখ মেলেন বাবা। কাছে ডাকেন। কান্না কণ্ঠে বলেন, তোমাকে ঠকিয়েছি এমনটা মনে করো না। যেদিন আমি পৃথিবী ছেড়ে চলে যাব সেদিন তোমার চাকরি হবে। এর আগে না। আমার স্থায়ী-অস্থায়ী জায়গা-জমির বর্তমান বাজার দামটা হিসেব করো। প্রথম শ্রেণির একজন অফিসারের সমান বেতন ব্যাংকে এফডিআরে জমা আছে। ওটা তোমার নামে। উপস্থিত ভাইবোনের চোখ বড়ো হয়ে গেল! বাবা এত কিছু ভেবে রেখেছেন! সবাই টাকা নিতে অস্বীকার করল। বাবা বলেন, এই টাকায় তোমাদের কাছ থেকে বাড়িটি কিনে নিলাম। জীবনের পড়ন্ত বেলায় মুক্ত পরিবেশে আমার আশ্রয়ে কেউ এসে মাথা রাখবে। বাড়ি আমার নামে থাকবে।

বাবা প্রায় প্রতিদিনই যায় যায় অবস্থায়। বাড়িতে রোজ মানুষ আসে। আমার ওপর কিছুটা চাপ কম, সেই ফাঁকে কিন্ডার গার্টেনে বাচ্চাদের পড়াতে যাই। বাচ্চাদেরকে ভালোবেসে ফেলেছি। তারাও আমাকে ভালোবেসেছে। যেই বন্ধন ত্যাগ করা কঠিন। বাবা একবার চেয়েছেন আমি কিন্ডার গার্টেনে আসি। ভাবছি কিছুদিন পর স্কুলের সঙ্গে কথা পাকাপাকি করব। বাবার ভালোবাসকে প্রাধান্য দিয়ে তাদেরকে বাংলাটা ভালোভাবে শেখাব। ভাষার বীজ ছোটো বাচ্চাদের অন্তরে রোপণ করব। যেনো বড়ো হয়ে সমস্ত পৃথিবীতে বাংলা ভাষার ফেরিঅলা হতে পারে। ভাইবোনদের ঘৃণা আমার উপর দিন দিন বাড়তে থাকে। কেনো আমি এমন সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছি! তারা কিছুতেই আমাকে এমন সিদ্ধান্ত নিতে দেবেন না। বাবা ছিলেন বায়ান্ন’র ভাষা আন্দোলনে সামনের সারির কর্মী। চোখের সামনে পুলিশের গুলিতে জীবন বিসর্জন দিয়েছে বন্ধুরা। আহত ও নিহত বন্ধুদের হাসপাতালে নিয়েও জীবন বাঁচানো সম্ভব হয়নি। তখনই বাবার পণ ছিল বাংলাদেশ ও বাংলা ভাষাকে যে কোনো উপায়ে তুলে ধরবেন।

বাবা সংকটাপন্ন অবস্থায়। যে কোনো মুহূর্তে পড়তে হবে ইন্না নিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও হাসপাতালে নিতে পারিনি। বাবার থেকে নিষেধাজ্ঞা আছে। আমার মোবাইল বেজে উঠল। গুলবদনের ফোন। বাবার খবর জানতে চায়। এরপর আমার। বাবার পেছনে সময় দিয়ে তোমার ক্যারিয়ার নষ্ট করে দিয়েছ। তাই বলে- আমারটা তো আর নষ্ট করে দিতে পারি না। পরিবারের সিদ্ধান্তটা শেষ পর্যন্ত মেনে নিতে হলো। বিয়ে করতে যাচ্ছি। তোমার জন্যে আর অপেক্ষা করতে পারলাম না। শুভ কামনায় থেকো। বাবার দ্রুত আরোগ্য কামনা করছি। গুলবদনের কথায় মাথায় পড়ল বাজ। তবুও ছিলাম স্থির।

ইশারায় কাছে ডাকেন বাবা। বাকিদের বের হতে বলেন। বাবার চোখ বেয়ে পানি পড়ছে। পানি মুছে দেই। শ্বাস একবার বাড়ে, একবার কমে। হাত-পায়ে নিস্তেজতা। আমার ভেতরে কম্পন বাড়ছে! আমার হাতের ওপর বাবার মাথা। তাকিয়ে আছেন। চোখ নড়ছে না। চোখ বুজিয়ে দেই। এরপর আর চোখ মেলেননি। অথচ বাবা আমাকে কিছু বলতে চেয়েছিলেন।

বাড়ি জুড়ে ভয়ংকর নিস্তব্ধতা! কান্না শব্দে বাড়িটি হয়ে গেছে বিষাদের বাগান। কিছুতেই নিজেকে ধরে রাখতে পারিনি। ভেতরে ভেতরে সমুদ্রের দুই পাড়ে ভাঙন শুরু হয়েছে। ঢেউয়ের পর ঢেউ আসছে। প্রবল উত্তাল সেই ঢেউ। দর্শক হয়ে দেখছি আর অশ্রু বিসর্জন করছি।

বাবার মৃত্যুর খবর শুনে দূর-দূরান্ত হতে জানাজায় মানুষের সমাগম বাড়ে। অধিকাংশই অচেনা। সামাজিক নিয়ম মেনে চতুর্থ দিনে আয়োজন করা হয় দোয়ার অনুষ্ঠান। কয়েকজন অপরিচিত মেহমানের উপস্থিতি দেখা মিলে। একজন ইশারায় কাছে ডাকেন। নাম জানতে চান, তাকে বলি, নাহিদ।

বলেন, তোমার বাবা যখন সরকারের আমলা ছিলেন তখন আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়কে বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করেছেন। আমরা কৃতজ্ঞ ছিলাম। বয়সে সিনিয়র হলেও আমরা বন্ধুর মতো। সংসার ও সংগ্রামী জীবনের অজানা অনেক কথা বলতেন। ভাষা সংগ্রাম ও ভাষার প্রতি তাঁর ছিল সীমাহীন প্রেম। চাইতেন অন্তত এক সন্তান শেষ বয়সে পাশে থাকুক। বাংলা ভাষায় চর্চা করুক। গবেষণার মাধ্যমে ভাষাকে সমৃদ্ধ করুক। তারজন্যে সব ব্যবস্থাও করে গেছেন। বিশ^বিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে কোনো উপহার দিতে চাইলে সেটি গ্রহণ না করে বলতেন, খুশি হব ছোটো ছেলের জন্যে চাকরির ব্যবস্থা করলে। এই হলো চাকরির কাগজপত্র। দ্রুত যোগদান করো। স্বাগতম। 

লেখক : কবি ও কথাসাহিত্যিক

ভালো লাগলে শেয়ার করে দিন :)

0 Comments

Leave a Reply

Avatar placeholder

Your email address will not be published. Required fields are marked *