ই-পেপার

SITE UNDER CONSTRUCTION
বাংলাদেশ পুলিশের মুখপত্র
অব্যাহত প্রকাশনার ৬৩ বছর

শুক্লা পঞ্চমী

“পৃথিবী একটি বই। যারা ভ্রমণ করেন না তারা বইটি পড়তে পারেন না”— সেন্ট অগাস্টিন

ভ্রমণ নিয়ে অনেক উক্তির মধ্যে আমার কাছে এটি বেশ লাগে। খুব কম মানুষই আছেন যারা ভ্রমণ পছন্দ করেন না। প্রকৃতির সান্নিধ্য বা ঐতিহাসিক নিদর্শন যা-ই হোক না কেন ভ্রমণ পিয়াসীদের কাছে তা হয়ে উঠে অত্যন্ত আকর্ষণীয় বস্তু। তবে সাধের সাথে সাধ্যের সংগতি তো রয়েইছে। যারা ভ্রমণ পিপাসু, তারা কোনো না কোনোভাবে খরচ জুগিয়ে ফেলেন। ইদানীংকালে ভ্রমণকারীদের সংখ্যা চোখে পড়ার মতো। আর ট্যুরিজম সংস্থাগুলোও বেশ জাঁকিয়ে বসেছে। দেখা যাচ্ছে কয়েকদিনের ছুটি হলে, শর্টকাট একটি ট্যুর করে আসা যায় সহজেই।

আমার এই ভ্রমণ বিষয়ক লেখাটি শুরু করেছিলাম দু’বছর আগে অর্থাৎ ২০১৮ সালে। আমরা তিন সহকর্মী বেরিয়ে পড়েছিলাম বালি রাজার দেশ দেখতে। একটু ব্যাখ্যা দিতে চাই কেন বালি রাজার দেশ বলে শিরোনাম করেছি। ছোটবেলা ঠাকুরমার মুখে রামায়ণের গল্প শুনতাম। প্রতিদিন ঘুমানোর আগে মোটামুটি টনিকের মতো হয়ে গিয়েছিল। ঘুমের সময় এলেই ঠাকুরমার পিছু নিতাম। তার কাছেই শুনেছি বালি নামে একটি রাজ্য ছিল। সেই দেশের রাজার নাম ছিল বালি। সুগ্রীব নামে তার আরেক যমজ ভাই ছিল। সিংহাসনে অধিষ্ঠান নিয়ে দুই ভাইয়ের মধ্যে রয়েছে বিস্তর মনোমালিন্য। রাবণ যখন সীতাকে হরণ করে লংকায় নিয়ে যায়, তখন রাজা রাম তাকে উদ্ধারের জন্য সুগ্রীবের স্মরণাপন্ন হন। সুগ্রীবকে নিজ দলে পেতে রাজা রাম কিছু কৌশল অবলম্বন করেন। তারমধ্যে ছিল সুগ্রীবকে তার রাজ্য ফিরিয়ে দেয়া। রাজা রাম সুগ্রীবের সাহায্য নিয়ে সদলবলে বালি রাজ্য আক্রমণ করলেন এবং বালিকে পরাজিত করে সুগ্রীবকে বালি রাজ্যের রাজত্ব ফিরিয়ে দিলেন। যুদ্ধকালীন সময়ে বালি দ্বীপের যে বর্ণনা পাওয়া যায় তা ছিল অত্যন্ত আকর্ষণীয়। ভেবে আশ্চর্য হতাম। চারপাশে সমুদ্র, উঁচু উঁচু ঢেউ, তার মাঝখানে দ্বীপ; কেমন হবে দিব্যচক্ষুতে দেখতে! সেই যে গল্পের সাথে একাত্ম হয়ে গিয়েছিলাম, এতবছর পড়েও এতটুকু মলিন হয়নি। বালি দেশ ভ্রমণের আগে আমার চোখে ঠাকুরমার গল্প ভাসতো। চোখে যে চিত্র আঁকতাম তা যেন মূর্ত হয়ে দেখা দিত।

আমার ভ্রমণ সঙ্গীরা অভিজ্ঞ। তারা বহু জায়গা ঘুরে দেখেছে। আমার ঘুরার অভিজ্ঞতা থাকলেও তাদের সাথে এই প্রথম। আমরা তিন সহকর্মী মনের দিক দিয়ে খুব কাছাকাছি। কেউ ছোট কেউ বড় সেটা বিবেচ্য নয়।

আমরা প্রথমেই যে কাজটা করেছিলাম তা হল প্লান বা পরিকল্পনা। আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম বালি ভ্রমণেই যাব। ইন্টারনেট ঘেটে দেখে নিলাম দর্শনীয় স্থানগুলো। তাছাড়া ভিসার ঝামেলাও নেই। অনেকেই হয়ত জানেন না বালি যেতে ভিসার দরকার হয় না। বালি এয়ারপোর্টে নেমে শুধু একটি পারমিশন নিতে হয়।

ঠিক হলো রোজার ঈদের পরপরই আমরা বালির উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিব। সেই মোতাবেক এজেন্সির মাধ্যমে টিকিট কাটাও হয়ে গিয়েছে। আমাদের খুশি আর দেখে কে! আমাদের দলের সবচেয়ে বুদ্ধিমতি সেলিনা (রাখী) মেসেঞ্জারে ‘বালি’ নামে একটি গ্রুপ খুলে ফেললো। আমরা মিনিটে মিনিটে সেখানে শেয়ার করতাম আমাদের পরিকল্পনা। চলত ভ্রমণের প্রস্তুতি পর্ব। কি কি নেয়া হবে কোনটা জরুরি। বিদেশ বিভূঁইয়ে যেন কিছুতেই বিপাকে না পড়ি। সময় গড়িয়ে আসছে আর আমরাও ট্রায়াল দিচ্ছি নানাভাবে। এর মধ্যে কেনা হচ্ছে পোশাক আশাক। আরামদায়ক পোশাকেরই প্রাধান্য দেয়া হচ্ছে বেশি। কিছু মর্ডান ড্রেসও আমরা কিনলাম। বাকি শুধু ওড়ার অপেক্ষা।

আগেই বলেছি ভ্রমণে চাই সমমনা। যেখানে আমাদের ছিল শতভাগ পূর্ণতা। হাসি ঠাট্টা আনন্দ কোনটারই কমতি হবে না। অবশেষে আসল সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। আমরা মিলিত হলাম শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরে। চোখেমুখে আনন্দের ঢেউ। আনন্দের চোটে আমাদের বুদ্ধিমতি রাখী ইবিএল ভি আই পি লাউঞ্জে গিয়ে বসল। কারণ আমাদের ফ্লাইট রাত একটায়। তখন বাজে মাত্র দশটা। উড়– উড়– মন কিছুটা স্বস্তি পেতে ডিনার কফি বেশ ছিল। হা হা হি হি সেলফি এসব করে কোন দিক দিয়ে সময় কেটে গেল টেরই পাইনি।

আমরা এয়ার বাসে চেপে বসলাম। পরিবারের জন্য তিনজনেরই মনটা খচখচ করল। আমাদের বিমান ছিল মালেশিয়ান। বেশ সুন্দরী স্মার্ট বিমানবালা দেখে মুগ্ধ। কটাকট মেঘ কেটে পাড়ি দিলাম দীর্ঘ চার ঘণ্টার পথ। ঘুম কাতুরে রাখী টানা ঘুম দিয়ে ঝরঝরে হয়ে উঠল। জান্নাত আপাও মোটামুটি ভালোই ঝিমিয়েছে। জার্নিতে আমার এটা হয় না। তাই মেঘকাটার বিদঘুটে শব্দটা সহ্য করতে হয়েছে। আমরা যখন মালয়েশিয়া এয়ারপোর্টে নামলাম তখন ভোর পাঁচটা। সূর্যের আলো নেই মনে হচ্ছে দুম মেরে আছে আকাশ। আসলে মালয়েশিয়ার আবহাওয়াটাই এরকম। কিছুটা গ্লুমি। আবার দুই ঘণ্টা অপেক্ষা পরের ফ্লাইটের জন্য। এয়ারপোর্টে ফ্রি নেটওয়ার্ক থাকায় অনায়াসে তিনজনই যোগাযোগ করে ফেললাম পরিবারের সাথে। গল্পে গল্পে কেটে গেল সময়। আমরা আবার সওয়ার হলাম বিমানের বডিতে। প্রায় দু ঘণ্টা আকাশে উড়ে নামলাম বালির মাটিতে। আগেই বলেছি পারমিশন নিতে হয় থাকার জন্য। প্রত্যেকের জন্য আলাদা ফরম পূরণ করতে হলো। সব শেষ করে আমরা ট্যাক্সিযোগে রওয়ানা দিলাম হোটেল অভিমুখে। আগেই বুকিং দেয়া ছিল রামায়ণা হোটেল। হোটেলের ব্যাপারে একটু খুঁতখুঁতে আছে তিনজনেরই। তাই মোটামুটি থ্রিস্টার হোটেলই বেছে নেয়া হয়েছিল। এয়ারপোর্টে থেকে ট্যাক্সি নিয়ে সোজা রামায়ণার দিকে। রামায়ণা হোটেলের প্রধান সুবিধা হলো কুতা বীচের কাছে। বলতে গেলে যোগাযোগের জন্য বেস্ট। আর ভ্রমণ পিয়াসীদের জন্য অত্যন্ত আনন্দদায়ক। পথের দু’ধারে রয়েছে ছোট ছোট মেসাজ সেন্টার, দোকানপাট, খাবারের দোকান। রয়েছে সারি সারি সী ফিসের অ্যাকোরিয়াম। আর রয়েছে পাফ।

শহরে ঢুকেই চোখে পড়ল বড় বড় কাহিনি ভিত্তিক স্ট্যাচু। বুঝতে পারছিলাম রামায়ণ, মহাভারতের ঘটনাবলীর উপর নির্মিত সেইসব স্ট্যাচু। অপূর্ব কারুকাজ খচিত।

যেতে যেতে আলোচনা হল, কিছুক্ষণ ঘুমিয়ে বের হব কুতা বীচের দিকে। হোটেলে ঢুকে আনুষঙ্গিক কাজ সেরে আমরা আমাদের রুমের চাবি পেলাম। রুমে দেখে মন আরো ভালো হয়ে গেল। বিশাল রুম, সাথে ডিলাক্স বেড। সাথে বারান্দা। আমরা সটান হয়ে ধবধবে বিছানায় শুয়ে পড়লাম। আমি আর রাখী জান্নাত আপাকে বড় ভিক্টোরিয়ান বেড অফার করলাম। রাখী বলছিল জান্নাত আপা সিনিয়র সেই হিসাবে জান্নাত আপাই ঐ বেডে শোবে। সিঙ্গেল বেড দুটো আমি আর রাখী নিলাম। সিঙ্গেল বাথ এই ক্ষেত্রেও আমরা জান্নাত আপাকেই আগে পাঠালাম।

এদিকে বিকেল গড়িয়ে গেছে তবুও মাথার উপর প্রখর সূর্য। কিসের ঘুম আর কিসের কী। স্নান সেরে রওয়ানা দিলাম বীচের দিকে। সারা বীচে গিসগিস করছে ট্যুরিস্টরা। রাস্তার দু’পাশে নানা দ্রব্যের পশরা নিয়ে বসেছে। মনে হচ্ছিল সব কিনে ফেলি। কিন্তু পরক্ষণেই মনকে সান্ত¡না দিলাম না, তা হয় না। এখনো দেখার কিছুই হয়নি।

সমুদ্রের পাড়ে যখন গেলাম তখন জোয়ার। কী বিশাল বিশাল ঢেউ আছড়ে পড়ছে তীরে। এর আগে সমুদ্র দেখেছি বহুবার কিন্তু এমন ঢেউ কল্পনাতেও ছিল না।

জান্নাত আপা বলল এর নাম ভারত মহাসাগর। বেশ খানিকক্ষণ কাটানোর পর আমরা আশপাশটা দেখতে বেরুলাম। আর যেখানেই যাচ্ছি মোবাইলে ছবি তুলে রাখছি। নানা কায়দায় তিনজনে ছবি তুললাম। ঘুরে ঘুরে দেখলাম বাড়িঘর দোকানপাট আর রেস্টুরেন্ট। অভূতপূর্ব কারুকাজ খচিত বাড়িঘর আর রেস্টুরেন্টগুলো। রাস্তার দু’পাশে বসেছে দোকানপাট। ঘর সাজানোর জিনিস অর্নামেন্ট, বিভিন্ন লোকজ জিনিস, মুখোশ পুতুল চুড়ি, বালির বাটিকের তৈরি পোশাক, নানা ধরনের দ্রব্যাদি। কেনা ছাড়াও উপভোগ করা যায় বেশ।

আমাদের আনন্দটা ছিল একেবারেই অন্যরকম। আগেই বলেছি সমমনা। মুক্ত বিহঙ্গের মত চষে বেড়ালাম এদিক ওদিক।

রাতে বালির এক অন্যরকম আমেজ। ট্যুরিস্টদের দৃষ্টি কাড়তে চলে মনোজ্ঞ আয়োজন। বলতে গেলে হোটেলগুলোতে চলে প্রতিযোগিতা। লাইভ কনসার্টে স্থানীয় শিল্পীরা গাইছে জিম মরিসন, রেইনবো, বব ডিলান, স্করপিয়ন্সের গান। মুগ্ধ হয়ে শুনলাম সেসব গান। রেস্টুরেন্টে ডিনার সারলাম। এমন স্বাধীনতা আর বাধভাঙ্গা উচ্ছ্বাস নিয়ে রুমে ফিরলাম। হোটেলে ঢুকে ট্যুর ডেস্ক থেকে পরের দিনের ঘুরার জায়গা ও গাড়ি ঠিক করলাম। এসব কাজে রাখী খুব এক্সপার্ট। আমি আর জান্নাত আপা নাকে সরিষার তেল দিয়ে ঘুমাই। রাখি সব ঠিক করলেও মতামতে আমাদের প্রাধান্যই বেশি। ভ্রমণের জন্য পোশাক আগে থেকেই নির্ধারণ করা ছিল। একেক দিনের একেক পোশাক।

একটু স্বাধীনতা নিয়ে আমরা কিছু ওয়েস্টার্ন পোশাক নির্বাচন করেছি। জান্নাত আপা এসব বিষয়ে একটু কড়া। বারবার মনে করিয়ে দেয়। আমরা শিক্ষক মার্জিত পোশাক পরতে হবে। সব ছবি পোস্ট দেয়া যাবে না। পরের দিন থেকে শুরু হবে আসল ভ্রমণ। সেই মোতাবেক সবাই তৈরি। বিছানায় শুয়ে ঘুম আসে না এপাশ ওপাশ করি। তখনো রেস্টুরেন্ট গুলিতে বেজে চলেছে গান। শুনতে শুনতে কখন ঘুমিয়ে পড়েছি জানিনা।

চনমনে সকাল হালকা রোদ। রাতে ছিটেফোঁটা বৃষ্টি হয়েছে। ভেজা রাস্তা আর গাছগাছালির সতেজতা দেখে তাই মনে হয়েছে। আমরা তৈরি হচ্ছি ভ্রমণের উদ্দেশ্যে। গতকালই গাড়ি ভাড়া করে রাখা হয়েছিল সারাদিনের জন্য। সকালে স্নান সেরে গেলাম নাস্তা খেতে। বুকিং অনুযায়ী সকালের খাবার ফ্রি। আমরা রেডি হয়ে একেবারে নীচে চলে গেলাম। চোখ ধাঁধানো সব খাবার। আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম পেট ভরে খাবো। দুপুরে হালকা কিছু খেয়ে নেবো। টেবিলের উপর স্তরে স্তরে সাজানো নানা রকম খাবার। যার যা খুশি নিতে পারে। প্রচুর ফরেন ট্যুরিস্ট তারাও তাদের পছন্দমতো খাবার নিচ্ছে। আমাদের খাবারের তালিকায় রেখেছিলাম ওখানকার ট্রেডিশনাল খাবার। বিশেষ করে ফল আর সালাদ।

খাবার শেষ করে আমাদের নির্ধারিত ভাড়া গাড়িতে উঠলাম। প্রথমেই গেলাম বালির ট্রডিশনাল ব্যারং থিয়েটারে নাটক দেখতে। ও মাঝখানে একটি জরুরি কথা বলে নেই। বালিতে টাকার হিসাব হয় লাখে। একদম ভ্যাবাচেকা খাওয়ার মতো একটি বিষয়। এক জোড়া জুতা কিনলেও লাখ টাকা। আমরা খুব আয়েস করে নাটকের টিকিট কিনলাম লাখ টাকা খরচ করে। নাটকের শুরুতেই লিফলেট দিল। তাতে ইংরেজিতে পুরো ঘটনার বর্ণনা দেয়া আছে। প্রাচীন লোক গল্প। কলাকুশলীদের পোশাক, আশাক আর মুখোশ দেখেই বোঝা গেছে। যতটা উৎসাহ নিয়ে নাটক দেখতে বসেছিলাম এক ঘণ্টা পর তা আর থাকল না। দীর্ঘ সময়ের কারণে অনেকটা একঘেয়েমি লাগল। যাই হোক ওখান থেকে বেরিয়ে আমরা রওয়ানা দিলাম জীবন্ত আগ্নেয়গিরি দেখতে। মেইন বালি থেকে বেশ দূর। জায়গাটার নাম কিন্তামানি। বালির গুরুত্বপূর্ণ ট্যুরিস্ট স্পট। যেতে যেতে দেখলাম নারকেল পাতা দিয়ে বানানো ডিজাইন করা নানারকমের মনোজ্ঞ শিল্পকর্ম। সারি সারি করে রাস্তার দু’পাশে সাজিয়ে রেখেছে। প্রায় প্রতিটা বাড়ির সামনে সাদাকালো চেক কাপড়ে মোড়ানো বেদী। ইন্দোনেশিয়া মুসলিম প্রধান দেশ হলেও বালিতে হিন্দু বেশি। কিন্তামানি পৌঁছাতে পৌঁছাতে প্রায় দেড়টা বেজে গেল। সূর্য ঠিক মাথার উপর। কিন্তু রোদের তেজ তেমন নেই। তবুও একটা গুমোট ভাব। চারদিকে উঁচুনিচু পাহাড়। ঢাল ঘেঁষে নিচে নামলাম। আমাদের গাইড আমাদের ড্রাইভার। ভালোই ইংরেজি জানে। গাড়িতে তার পাশের সিটে বসে এসেছি। সারা রাস্তা বালি সম্পর্কে জেনেছি। তখন বালিতে উৎসব চলছিল। বালিতে নাকি উৎসব লেগেই থাকে। কিন্তামানি পৌঁছে উৎসবের তেমন কিছু চোখে পড়েনি। পাহাড়ের ঢাল ঘেঁষে রেলিং করা। এর পর আর যাওয়া যায় না। দেখলাম বিরাট এলাকাজুড়ে ত্রিকোণা চুল্লি বসানো। হালকা হালকা কুয়াশার মতো ধোঁয়া বেরুচ্ছে।

ড্রাইভার বলল ছ’বছর আগে একবার উদগীরণ হয়েছিল। আবার নাকি যে কোনো সময় হতে পারে। শুনে ভয় লাগছিল। মনে হচ্ছিল এই বুঝি জেগে উঠবে। জিজ্ঞেস করলাম উদগীরণ হলে কী ব্যবস্থা নেয়া হয়। তখন জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে। এখানকার লোকজনদেরকে সরিয়ে নেয় ত্রাণকেন্দ্রে সরিয়ে নেয়। সমস্ত ফ্লাইট বাতিল হয়ে যায়। দূষিত গ্যাস ছাই পরিবেশের উপর প্রভাব পড়ে। আমরা ব্যারিকেড পর্যন্ত গেলাম। দেখে মনেও হলো না যে কোনো সময় ভয়ংকর কিছু ঘটে যেতে পারে। পর্যটকদের জন্য সারে সারে বসেছে দোকানপাট। আমরা অল্পস্বল্প ট্রেডিশনাল জিনিসপত্র কিনলাম। রাখী বলল আমরা লোকাল ফল খাবো। নানা জাতের লোকাল ফল নিয়ে বসেছে। আমরা কিছু খেলাম কিছু সাথে নিয়ে নিলাম হোটেলে খাবো বলে। ফেরার পথে নজরে পড়ার মতো ছিল স্ট্যাচু। বিভিন্নরকম পাথর কেটে বানানো সেসব স্ট্যাচু। ড্রাইভার বলল বালির অর্থনীতিতে লোকাল স্ট্যাচু বড় ভূমিকা রাখে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এগুলো এক্সপোর্ট হয়। এক জায়গায় নেমে আমরা দেখলাম টুকটাক কিনলাম। যেমন ফটোফ্রেম, ছোটছোট সো পিস ইত্যাদি। মুগ্ধ নয়ন, সব কিছু কি আর লিখে বোঝানো যায়।

এবার আমাদের গন্তব্য মাংকি ফরেস্ট সাংচুয়ারি, উবুদ ট্যাম্পল, উবুদ রাইস টেরেইস। ঝিরঝির হাওয়া হালকা বৃষ্টি, ওয়েদার গ্লুমি। শুনলাম বালিতে দুটি ঋতু গ্রীষ্ম এবং বর্ষা। এখানে নাকি শীত নেই। বেলা প্রায় তিনের কাছাকাছি। আমরা মাংকি ফরেস্টের দিকে যত এগুচ্ছি তত বৃষ্টির চাপ বাড়ছে। তখন জুন মাস বৃষ্টির প্রকোপ বেশি। নিয়ম অনুযায়ী তখন বর্ষাকাল। যখন মাংকি ফরেস্টে গেলাম তখন ঝমঝম বৃষ্টি। গাড়ি থেকে নেমে একটি নির্দিষ্ট জায়গায় গিয়ে উঠলাম। জায়গাটা ফরেস্টেরই। অনেকটা বাংলো টাইপের বাড়ি। ছিমছাম গোছানো। সবুজের ভিতর দিয়ে চলে গেছে পিচ ঢালা পথ। বৃষ্টির তখন তুমুলদশা। ভিতরে গিয়ে মাংকি দেখা সম্ভব নয়। তাছাড়া বানরগুলো বৃষ্টির মধ্যে গাছ থেকে নামে না। রাখীর ইচ্ছে ছিল সাইকেলে চড়ে ফরেস্ট ঘুরবে তা হয়ে উঠার সম্ভাবনা নেই। দূর থেকে দেখেই তৃপ্তি মেটাচ্ছি। ঘন সবুজ বন, বৃষ্টির জল পেয়ে যেন চকচক করে উঠছে। ড্রাইভারের ছাতা নিয়ে আমরা কয়েকটা ছবি তুললাম। বনে ঢুকার মুখে বিচিত্র সব স্ট্যাচু। ছবি তুললাম ফটাফট। আমরা যখন গাড়িতে উঠে ট্যাম্পলের দিকে রওয়ানা দিলাম। তখন বৃষ্টি গলা কিছুটা কমে এসেছে। প্রতিটা দর্শনীয় স্থানের জন্য আলাদা টিকেট। উবুদ ট্যাম্পল বাইরে থেকেই দেখা যায় বেশ। তাই ভিতরে না ঢুকে বাইরে থেকে দেখেই চলে এসেছি। সুনিপুণ কারুকাজ আর সুউচ্চ চূড়া আলাদা মাত্রা প্রকাশ পায়। গাড়ি ঘুরিয়ে রওয়ানা দিলাম উবুদ রাইস টেরেইসের দিকে। ধান ক্ষেত দেখার কী আর আছে। ড্রাইভার বলল পর্যটকরা এটা না দেখে যায় না। নেটে আমরাও দেখে নিয়েছিলাম। স্বচক্ষে দেখতে পিছপা হলাম না। ততক্ষণে বৃষ্টিও থেমে গিয়েছে। বাতাসের আর্দ্রতা শরীরে মনে ঠান্ডা শিহরণ। যা দেখছি তাই ভাল লাগছে। কিন্তামানি থেকে কিনে আনা ফল একটা দুটো করে টেস্ট করে দেখছি। সাথে বিস্কুট কলা খেয়ে বেশ চাঙ্গা। দেখতে দেখতে পৌঁছে গেলাম রাইস টেরেইসে। রাস্তা থেকে বেশ নিচে। পাশে দাঁড়িয়ে এবারো দেখে নিলাম মনোমুগ্ধ দৃশ্য। ছোট ছোট টিলার উপর আল তুলে সাজানো ক্ষেত্রফল, পাশে হাঁটার রাস্তা। আমরা বাঙালি বলেই ধান ক্ষেতে নামার ইচ্ছে হলো না। ফরেন টুরিস্টরা আমাদের চেয়ে খুবই উদ্যমী। তারা ডিঙ্গিয়ে ডিঙ্গিয়ে উঠে যাচ্ছে উপরে। আমরা না নামলেও চোখ জুড়ালাম সবুজের গাহনে।

বেলা প্রায় পড়ে এলো। বৃষ্টি আমাদের ভ্রমণে বিচ্ছেদ ঘটিয়ে দিয়েছে। মাংকি ফরেস্ট না দেখার বেদনা কেবলই তাড়িত করছে। মনকে শান্ত করতে উবুদের শপিং মলে ঢুকলাম। বালির বাটিক খুব বিখ্যাত। প্রিয়জনদের জন্য কেনার চেষ্টা করলাম। জান্নাত আপা আমি রাখী তিনজনই টুকটাক কিনলাম। কিছুটা ভাল লাগা কিছুটা মন্দলাগা নিয়ে ফিরে আসলাম হোটেলে। কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে রাতের কুতা বীচ দেখব তারপর ডিনার সেরে রুমে ফিরব। রাতে যখন বীচে গেলাম তখন লোকজন খুব একটা নেই। বলতে গেলে নির্জন। কিন্তু কোন ভয় লাগেনি বরং আমার ভিতর রবীন্দ্র ভাবনা বেশ গুনগুন করে উঠল। মনে পড়ল তাসের দেশের সেই বিখ্যাত গান

“এলেম নতুন দেশে,

তলায় গেল ভগ্নতরী

কূলে এলেম ভেসে”

মনে হয় তখন অমাবস্যা কাল আজাশজুড়ে চাঁদের ছিটেফোঁটা নেই। যদিও জ্বলজ্বল করছে নক্ষত্ররাজি। সমুদ্রের গর্জন আর গানের ভাষা চিনে নিল একে অপরকে। ভিডিও ধারণে রাখী আর জান্নাত আপা সামিল হলো গানে। বাংলার শিক্ষক এবং মনেপ্রাণে রবীন্দ্র অনুরাগী উপভোগ করলাম জাগতিক স্বর্গীয় সুখ।

পরেরদিন রওয়ানা দিলাম ভাসমাম মন্দির দেখতে। বালির বিখ্যাত দুটি মন্দির। একটি পাহাড়ের উপর অন্যটি সমুদ্রের উপর। গতকালের মতো বৃষ্টিভেজা সকাল নেই। নীল আকাশে ভাসছে সাদা মেঘের ভেলা। আবারো সেই ভাড়া গাড়ি সারাদিনের জন্য। যথারীতি সকাল ভরপেট খেয়ে চললাম মন্দির দর্শনে। গাড়ি ছুটছে দ্রুত থেকে দ্রুততর গতিতে। চারপাশে আবারো দেখতে পাচ্ছি বাঁশবেতের কারুকাজ খচিত বড় বড় শিল্পকর্ম। আধভাঙ্গা ইংরেজি ড্রাইভার জানালো তাদের উৎসবের কথা। এই শিল্প কর্মের নাম “পেঞ্জর;। এটা পর্বতের রূপক। বালিনিজরা অত্যন্ত ধর্মপ্রিয়। তাদের সাদাসিধে জীবনে প্রাত্যহিক ধর্মীয় কাজ গুরুত্বপূর্ণ। সুখ সমৃদ্ধি আর প্রবৃদ্ধির জন্য সপ্তাহব্যাপী গাঙ্গুলান পূজা করে। পেঞ্জর বানানো এবং বাড়ির সামনে প্রতিস্থাপন তারই অংশবিশেষ।

নারকেল পাতা, বাঁশ ও বেত দিয়ে বানানো পেঞ্জর। সাতদিনব্যাপী চলবে সেই উৎসব। আমরা এগুচ্ছি সামনের দিকে। গ্রামগঞ্জ পেরিয়ে খাড়া উঠছি পাহাড় ঘেঁষে। টের পাচ্ছিলাম সমতল থেকে উঠে এসেছি অনেকটা উপরে। শীত অনুভব করছিলাম বেশ। গাড়ির গতি ক্রমশ শ্ল­থ হয়ে আসছিল এবং নিশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল। খাড়া পাহাড় মেঘ মাখানো আকাশ। সবুজের গায়ে গায়ে মিশে আছে। গন্তব্যে যখন পৌছুলাম তখন আমরা সমতল থেকে ১২০০ মিটার উপরে। পাহাড়ের উপর বিশাল এরিয়া জুড়ে চলছে উৎবের আয়োজন। নানা রঙের কাগজফুল দিয়ে সাজিয়ে তোলা হচ্ছে পাহাড়ের উপর সমতল জায়গা। আশ্চর্য হওয়ার মতো সব দেখলাম সবই প্রাকৃতিক। ১২০০ মিটার উপরে এত বড় লেক সাথে ভাসমান মন্দির। স্থানীয় লোকজন বলল সবার ভাগ্যে নাকি এই লেক দেখার সুযোগ হয়না। মেঘে ঢেকে ফেলে। এমন শক্ত হয়ে চেপে যায় যে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকলেও তার মুখদর্শন মেলে না। আমরাও খুব বেশিক্ষণ দেখতে পাইনি। চঞ্চলা কিশোরীর মতো উড়ে উড়ে এসে ঢেকে ফেলেছে লেক। বালির মানুষ খুব সহজ সরল এবং আন্তরিক। আমরা চলে গেলাম অনুষ্ঠানস্থলে। সেখানে চলছে নানা আয়োজন। আমরাও যুক্ত হলাম সবার সাথে।

উপভোগ করলাম মন ভরে।

কোথা দিয়ে সময় কেটে যায় বোঝা যায় না। দ্বিতীয়বার আর লেকের দেখা পেলাম না মেঘরানী মুখ ঢেকে ফেলেছেন সহজে দেখা দেবেন না। যতটুকু পরশ পেয়েছি তাতে তুষ্ট হয়ে ফিরে গেলাম সমুদ্রের দিকে। যাবার সময় ড্রাইভার বলল আরেকটা ছোট মাংকি ফরেস্ট আছে চাইলে দেখে যেতে পারি। আমাদের সময় ছিল তাই সেটাও ছাড়িনি। পাহাড় থেকে নেমে গেলাম বানরের রাজত্বে। ড্রাইভার বলল চশমা যেন হাতে রাখী কারণ বানর চশমা নিয়ে উঠে যায় গাছে। জান্নাত আপা বানর ভয় পায় গাড়ি থেকে নামেনি। আমি আর রাখী ঢুকে গেলাম বানর সাম্রারাজ্যে। চশমা ছাড়া দেখি না কিছু অনুমান করেই হাঁটছিলাম। দেখলাম উনারা সব চারপাশ থেকে ঘিরে ধরছেন। তদুপরি দেখভালকারী লোকজন জানাল নাট খাওয়ালে কিছু করবে না। আমরা কিছু নাট কিনে দিলাম। হাত থেকে তুলে নিচ্ছে। কেউ কেউ ঘাড়েও চেপে বসল কিন্তু উল্টাপাল্টা কিছু করল না। আমরা বালির ট্রেডিশনাল পোশাকে সেজে ছবি তুললাম।

এবার আমাদের যাত্রা সমুদ্রের দিকে। সেখানে অপেক্ষা করছিল আরেক আশ্চর্য। দুপুর পেরিয়ে সূর্য কিছুটা হেলান দিয়েছে। আমরা টিকিট কেটে ভিতরে গেলাম। মন্দির পথে বিশাল উঁচু গেট। লোহা দিয়ে তৈরি অথচ নিখুঁত কারুকাজ। দেখতে পাচ্ছিলাম বিশাল বড় কালো পাথরের মন্দির। আসলে সেটা বানানো কোন মন্দির নয়। পাথরের বিশাল আকৃতির প্রস্তর খন্ডকে মন্দিরে রূপ দেয়া হয়েছে। বীচ থেকে অল্প দূরত্বে কিন্তু বিশাল আকৃতির ঢেউয়ের জন্যে যাওয়া খুব মুশকিল। এদিকে জোয়ারের সময় হয়ে এসেছে এখন দেখতে না গেলে আর সম্ভব হবে না। আমি একটু দ্বিমনা ছিলাম। দেখলাম গাইডের সাহায্য নিয়ে অনেকেই যাচ্ছে। আমার দুই সহযোগী আমাকে রেখেই হাত ধরল গাইডের। জান্নাত আপা বলল না দেখলে নাকি আফসোস হবে। আমিও তাই ভাবছিলাম কিন্তু ভিতু মনকে সায় জানাতে পারছিলাম না। এর মধ্যে জোয়ারের তেজ শুরু হয়ে গিয়েছে। গাইডরা বলছে তাড়াতাড়ি করতে। খুব বেশি জল নয় কিন্তু আমার সহযাত্রীরা ভিজে একসা। মাথার উপর দিয়ে ঢেউ নামছে। হঠাৎ মন ঘুরিয়ে ফেললাম যা হয় হবে দেখে আসব গিয়ে। হাত ধরলাম গাইডের জোয়ারের বেগ ক্রমশ বেড়ে যাচ্ছে। গাইড বলল কোন ভাবেই যেন তার হাত না ছাড়ি।  শাঁ শাঁ শব্দ কান রাখা দায়।

তানালট ট্যাম্পল

ঢেউয়ের মাপ বোঝে গাইড নিয়ে গেল। আমিও ভিজে চুবা। মন্দিরের নিয়ম সবার জন্য এক। যাওয়ায় সাথে সাথে পবিত্র জল দিয়ে মুখ ধুতে হবে। তারপর কপালে চন্দনের ফোঁটা আার কানে কাঁঠালচাঁপা ফুল গুঁজে দিতে হবে। মন্দিরের নিয়ম পালন করে আমরা সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠলাম। সামনে তাকিয়ে দেখি বিশাল সাগর উন্মাদের মতো তান্ডব করছে। ভয়ে তাকানো যায় না। গলা শুকিয়ে আসে। নিচ থেকে গাইডরা তাগাদা দিচ্ছিল আর থাকা যাবে না। আমরা তাড়াতাড়ি নেমে আসলাম। আসার সময় বুঝতে পারছিলাম জোয়ারের জোর কত। গাইড না থাকলে ভেসে যেতাম অকূলে।

তানালটের সৌন্দর্য একদিনে উপভোগ করার নয়। এক সপ্তাহ হলে কিছুটা মন ভরবে। চারিদিকে এত সুন্দর সুন্দর প্রাকৃতিক দৃশ্য মনে হয় বসে থাকি। বালি এতটা শান্ত আর নিরাপদ জায়গা না আসলে বুঝতাম না। মানুষের বাড়ি ঘর দেখে বোঝা যায়না কে গরিব কে ধনী। আলাদা কোন বড়লোকি কারুর মধ্যে দেখিনি। সমুদ্রের ধারে রীতিমতো বিকিনি পরে ফরেনাররা হাঁটছে। আমাদের তখনো অনেক কিছু দেখার বাকি।

চতুর্থ দিন ঠিক হলো আমরা আয়ল্যান্ডে যাব। কাছাকাছি নুসা পেনিদা নুসা ল্যাম্বোগন দুটোই সুন্দর। আমরা ঠিক করলাম নুসা ল্যাম্বোগন যাব। কারণ ওখানে একটা ম্যানগ্রোভ আছে সমুদ্রের মধ্যে সেটা দেখবার মতো। তাছাড়া আছে বিভিন্ন রাইড। পরদিন চলে গেলাম ফেরি ঘাটে। সেখানে সারে সারে রয়েছে বোট। সমুদ্র পাড়ি দিয়ে ওরা বিভিন্ন দ্বীপে নিয়ে যায়। টিকিট কেটে আমরা চড়ে বসলাম বোটে। কিছুদূর যাওয়ার পর দেখলাম নীল আর নীল। বিশাল বিশাল ঢেউ। বোট কখনো ঢুকে যাচ্ছে ঢেউয়ের ভিতর আর কখনো আছাড় দিচ্ছে মাথার উপর থেকে। ভয়ে বুক ঢিপঢিপ করছে। কারুর মুখে কোন কথা নেই। যাত্রীদের সবারই এক অবস্থা। অবশ্য কেউ কেউ হাসছে। প্রায় দেড় ঘন্টা সমুদ্রের দাপাদাপি সহ্য করে দ্বীপের চিহ্ন দেখতে পেলাম।

চোখ দুটো বড়বড় করে তাকালাম। কী অপূর্ব সেই দৃশ্য। রেখায় রেখায় ভেসে উঠল আনন্দের ছলক। নুসা ল্যাম্বোগন দ্বীপে নেমে। আমরা আর একটা বাসে উঠলাম। এসব কিছুই আমাদের প্যাকেজের মধ্যেই ছিল তাই আলাদা করে খরচ হয়নি। শুনশান নীরব দ্বীপ। পাখপাখালির অবাধ কিচিরমিচির মনে করিয়ে দিচ্ছিল দেশের কথা। বাস থেকে নেমে আমরা আর একটা বেটে চড়লাম। বোটের নিচটা মোটা কাচ দিয়ে মোড়ানো। আবার চললাম সমুদ্রের দিকে। কিন্তু এবার অন্য রকম লাগল আগের মতো ভয় পাচ্ছিলাম না। চারিদিকে ছড়ানো ছিটানো অসংখ্য দ্বীপ। অনেকটা আমাদপর হাওর অঞ্চলের মতো। বোটে চলছে। সমুদ্রের দিকে। গাইড বলল নিচে বোটের কাচে তাকাতে। দেখলাম সমুদ্রের তলদেশ দেখা যাচ্ছে। নানারকম নানারঙের প্রবল। নানারকম মাছ আর উঁচু নিচু পাহাড়। যেতে যেতে সামনে তাকাতেই দেখি ম্যানগ্রোভ জঙ্গল। নীলের উপর সবুজ। শুনেছি এখানে নাকি বিষাক্ত সাপ আছে।

কাছাকাছি যখন যাচ্ছিল চোখ কান খাড়া রেখেছি। আমাদের বোট ছোট একটি দ্বীপে থামাল। কিন্তু বোট থামল দ্বীপ থেকে বেশ দূরে। হেঁটে যেতে হবে প্রায় এক কিলোমিটার। কি মুসকিল! জুতা পায়ে হাঁটা যাবে না গাইড বলছে। উঁচু নিচু জায়গা পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে। আবার খালি পায়েও যাওয়া যাবে না পা কেটে  যাবে। পা দিয়ে বুঝলাম প্রবালদ্বীপ ভীষণ পিচ্ছিল। এদিকে খিদেয় পেট চু চু করছে। যদিও পেট ভরে খেয়েই রওয়ানা দিয়েছিলাম। তবুও বেলা তো হয়েছেই। অনেক কষ্টে তীরে উঠলাম। বাংলাদেশের মতো কুঁড়েঘর। এখানে খাওয়াদাওয়া হবে। হোটেলের অবস্থা ভালো না বেশ নোংরা। করার কিছু নেই নাকমুখ বন্ধ করে খেয়ে নিলাম। সাগরে তখন ভাটা চলছে। আবারো হেঁটে গিয়ে বোটে চড়তে হবে। আমি তীরে কিছু প্রবাল কুড়ালাম। কড়ি, শামুক, শঙ্খ জীবন্ত কুড়ালাম। আমাদের ঘুরাঘুরি তখন শেষ হয়নি। বোট আমাদের নিয়ে গেল রাইডে চড়াতে। বড় একটা জাহাজের মতো যানে উঠলাম। অনেকেই নেমে গেল সমুদ্রে। কেউ কেউ অক্সিজেন নিয়ে তলদেশে। আমার সঙ্গি দুজন বানানা বোটে চড়বে। কেন জানি আমি রাজি হলাম না যেতে। দেখছি অনেকেই মজা করছে। আমাদের সাথে চাইনিজ দম্পতি ছিল ছেলে মেয়ে স্বামী শাশুড়িসহ কলাবোটে চড়ে এল। শেষ বারের ট্রিপে রাখী আর জান্নাত আপা চড়ল। আমি বললাম ঘুরে আসো আমি ছবি তুলি। আসলে দেখে শান্ত মনে হলেও ঢেউ প্রচণ্ড। কে জানত ভয়ানক কিছু ঘটবে। বানানা বোট ছেড়ে মাত্র হাফ রাউন্ড দিয়েছে অমনি বোট উলটে গেছে। জান্নাত আপা রাখী দুজনের একজনও সাঁতার জানে না। আমি পাগলের মতো চিৎকার করছি কখনো ইংরেজি কখনো বাংলা। মাথায় আসছিল না কিছু। রাইড চালক তাদের টেনে তুলতে চেষ্টা করছে। পারছে না। এদিকে বোট তখনো উল্টানো। ঠিক পনেরো মিনিট পর তাদের তুলতে সক্ষম হলো। জীবন ফিরে আসল। এই ভয়ংকর ঘটনার পর আমরা স্তিমিত হয়ে গেলাম। আরো দুই জায়গায় গিয়েছি কিন্তু মাথা থেকে সেই দৃশ্য যাচ্ছিল না। ফেরার পথে প্রচণ্ড ঢেউ রাখীকে খুব ভীত করে তুলল। আমরা সান্ত¡না দিয়ে দিয়ে বালির ফেরিঘাটে পৌঁছুলাম।

আর মাত্র একদিন বাকি। আমরা আর দূরে কোথাও গেলাম না। সেই দুর্বিষহ স্মৃতি আমাদের ভ্রমণের আনন্দকে ম্লান করে দিয়েছে। জান্নাত আপার ইচ্ছে ছিল শাড়ি পরে ছবি তুলবে। অনেক কষ্টে রাজি করালাম। ছবি তুলেছি কিন্তু মনের ভিতরে সেই ভয় আজো যায়নি। তবে আমরা তিনজন এখনো বলি। আবার কখনো সুযোগ হলে বালি ভ্রমণে যাব।

  লেখক : শিক্ষক, লেখক ও সম্পাদক

  ‘গাঙঢুফী’ ত্রৈমাসিক সাহিত্য পত্রিকা

ভালো লাগলে শেয়ার করে দিন :)

1 Comment

অসিত কর্মকার · June 9, 2021 at 7:08 pm

খুব ভাল লাগল। সহজ সরল ঝরঝরে ভাষায় লেখা এক সুন্দর ভ্রমণ কাহিনী। অভিনন্দন জানাই।

Leave a Reply

Avatar placeholder

Your email address will not be published. Required fields are marked *