ই-পেপার

SITE UNDER CONSTRUCTION
বাংলাদেশ পুলিশের মুখপত্র
অব্যাহত প্রকাশনার ৬৩ বছর

বীর মুক্তিযোদ্ধা আলহাজ্ব এ কে এম রফিকুল আলম

পাকিস্তান আমলে বঙ্গবন্ধুর অনেক জনসভায় যোগদানে আমার সৌভাগ্য হয়েছিল। প্রায় প্রতিটি জনসভায় তিনি বিচার বিভাগের আইন সংস্কারের কথা বলতেন। তিনি বলতেন যে, ‘একজন আইনজীবী অধিকাংশ মামলা (বিশেষ করে দেওয়ানি) শুরু করে কিন্তু নিজের জীবনে সেসব মামলা শেষ করে যেতে পারেন না। তার জীবনের শেষ বেলায় নিজের পুত্র বা জামাতার নিকট মামলাগুলি পরবর্তী কার্যক্রমের জন্য হস্তান্তর করে যান। এ ব্যবস্থার অবসান হতে হবে। ইংরেজিতে একটা কথা আছে, `Justice delayed justice denied’ অর্থাৎ বিচারের দীর্ঘসূত্রতা বিচারহীনতার শামিল বা বিচারকে অস্বীকার করা। এটা চিরন্তন সত্য।

বাস্তবে আমরা কি দেখছি? জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার পর খুনিদের রাষ্ট্রীয়ভাবে পুরষ্কৃত করা হয়েছিল। খুনিকে রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী করা হয়েছিল। হত্যাকারীদের নানাভাবে মদদ দেওয়া হয়েছিল। হত্যার বিচার বন্ধে ইনডেমনিটি বিল জারি করা হয়। প্রায় ১৬ বছর আগে ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেত্রী বর্তমান মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে সন্ত্রাস বিরোধী জনসভায় প্রকাশ্য দিবালোকে দলবলসহ হত্যা করার উদ্দেশ্যে গ্রেনেড হামলা চালানো হয়, যার ফলে আইভি রহমানসহ ২৪ জন নেতা-কর্মী মারা যান এবং কয়েকশত নেতা-কর্মী আহত হন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী অলৌকিকভাবে নেতা-কর্মীদের চেষ্টায় এবং আল্লাহর অশেষ রহমতে বেঁচে যান। অথচ এই নৃশংস হত্যাকা- ও জঘন্য ঘটনার বিচার এখনও সম্পন্ন হয়নি। তদ্রুপ খুন ও ধর্ষণসহ গুরুতর অপরাধের অসংখ্য মামলা বছরের পর বছর বিচারের অপেক্ষায় আদালতে ঝুলে আছে। জনগণ বিচার পাচ্ছে না। বরং কোর্টে ঘুরতে ঘুরতে তারা মানসিক বা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে হয়রানি হচ্ছে। কারও মা-বাপ বা ঘনিষ্ঠজন মারা গেলে তাৎক্ষণিকভাবে তিনি বা তার পরিবার আবেগ-অনুভূতিতে যে কষ্ট পান, পরবর্তীতে দিনে দিনে সেই আবেগ ও অনুভূতি কমে ক্ষীণ হয়ে যায়। আমি দেখছি যে, কারও মা-বাবা বা আপনজন মারা গেলে প্রথম প্রথম দৈনিক সকাল-বিকেল কবরস্থানে কবর জিয়ারত করতে যায়, আস্তে আস্তে অনুভূতি কমতে থাকে এবং পরে দিনে একবার, সপ্তাহে একবার, মাসে একবার ও বছরে একাবার কবর জিয়ারত করতে যায়। অর্থাৎ যত দিন যায় মানুষের আবেগ-অনুভূতি ততো কমতে থাকে। তদ্রুপ খুন, ধর্ষণ বা অন্য কোনো গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রে সংক্ষিপ্ত সময়ে বিচার না হলে মানুষের অনুভূতি কমে যায় মানুষ ঘটনা ভুলে যায়। বছরের পর বছর মামলা চলতে থাকলে মামলার ফলাফল কি হয়েছে, সমাজ তা জানতে পারে না। এতে অপরাধীরা উৎসাহিত হয়, ফলে সমাজে অপরাধ প্রবণতা বেড়ে যায়।

এমতাবস্থায়, লঘুদন্ড বা গুরুদন্ড, যাবজ্জীবন কারাদন্ড বা মৃত্যুদন্ড কোনো বড় বিষয় নয়, বড় বিষয় হলো মামলাগুলো সংক্ষিপ্ত সময়ে সবার জ্ঞাতসারে শেষ হয়েছে কি না? বাদী স্বল্প সময়ে ন্যায়বিচার পেয়েছে কি না? বাদীকে আদালতে বছরের পর বছর ঘুরে হয়রানি, মানসিক ও আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে হয়েছে কি না? ন্যায়বিচার পেয়েছে কি না? ইত্যাদি।

আমরা দেখছি বড় বড় ঋণগ্রহীতা ব্যাংক থেকে শত শত কোটি টাকা ঋণ নিয়ে ফেরত দিচ্ছে না। ঋণ খেলাপিদের বিরুদ্ধে মামলা করলে বছরের পর বছর মামলা ঝুলে থাকে এবং ঋণ অনাদায়ী থেকে যায়। এদের অনেকে ঋণ নিয়ে বিদেশে টাকা পাচার করছে। এ যেন একটা ছেলে খেলার মতো। রাষ্ট্রের টাকা নিয়ে ছিনিমিনি খেলবে অথচ বিচার হবে না, টাকা আদায় হবে না। এভাবে চলতে পারে না। এ বিষয়ে প্রয়োজনে আইন সংশোধন করে ঋণ খেলাপিদের বিরুদ্ধে দ্রুত কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। অবৈধভাবে ঋণ প্রদানকারী কর্মকর্তা ও সুপারিশকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।

আমরা জানি, বিচারব্যবস্থা রাষ্ট্রের চারটি স্তম্ভের অন্যতম একটি। রাষ্ট্রের নাগরিকদের ন্যায়বিচার প্রাপ্তির প্রত্যাশা পূরণের দায়িত্ব যেমন বিচার বিভাগের, তেমনি বিচার বিভাগকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতার বিষয়টি নিশ্চিত করার দায়িত্বও রাষ্ট্র এবং সংশ্লিষ্ট সব মহলের।

লেখক: বীর মুক্তিযোদ্ধা।

ভালো লাগলে শেয়ার করে দিন :)

0 Comments

Leave a Reply

Avatar placeholder

Your email address will not be published. Required fields are marked *