ই-পেপার

SITE UNDER CONSTRUCTION
বাংলাদেশ পুলিশের মুখপত্র
অব্যাহত প্রকাশনার ৬৩ বছর

মোঃ জহিরুল হক

বাংলাদেশ ও বঙ্গবন্ধু অভিন্ন। তিনি আমাদের জাতির জনক, স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি। লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে আমাদের স্বাধীনতা। নির্যাতন, নিপীড়ন, জেল জুলুম, এমনকী ফাঁসির ভয় দেখিয়েও বঙ্গবন্ধুকে স্বাধীনতার লক্ষ্য থেকে এক চুলও বিচ্যুত করা যায়নি। তিনি বজ্র কণ্ঠে যেমন ঘোষণা করেছিলেন ‘এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’ তেমনি শত নির্যাতন ও নিপীড়নের মধ্যেও ছিলেন ইস্পাতের মতো দৃঢ় ও অবিচল। ইতিহাসের মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তাঁর কাছে আমাদের ঋণের শেষ নেই। তাঁর উদাত্ত আহ্বানে সাড়া দিয়ে সাড়ে সাত কোটি মানুষ মুক্তিসংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ে। বাঙালি মুক্তিযুদ্ধ করেছে অস্ত্র হাতে। বঙ্গবন্ধুর ডাকে সেদিন যার যা কিছু ছিল তাই নিয়ে শত্রু হননে একাত্ম হয়েছিল সমগ্র জাতি। বাঙালির জীবনের সে এক অনন্য ইতিহাস। ত্রিশ লক্ষ শহীদের রক্তের বিনিময়ে, দু’লক্ষ মা-বোনের আত্মত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত মহান বিজয় দিবস আমাদের উজ্জীবিত করে। 

এই জাগরনের সূচনা ৫২-এর ভাষা আন্দোলনে। মাতৃভাষার জন্য বাঙালির সে এক অসামান্য আত্মত্যাগ। রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে শফিক, জব্বার, মতিউরসহ নাম না জানা অনেকেই বুকের রক্তে প্রমাণ করে বাংলা তাদের প্রাণের ভাষা। ভাষা আন্দোলনের অসম্প্রদায়িক চেতনা যে বোধের জন্ম দেয় তা থেকে ভাষাভিত্তিক সেক্যুলার রাষ্ট্রের চেতনারও জন্ম হয়। বন্ধবন্ধু এই চেতনার দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে থাকেন বাংলার মানুষকে। লক্ষ একটাই, স্বাধীনতা অর্জন। এর পর ধাপে ধাপে আন্দোলনের মধ্য দিয়ে ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ রমনার রেসকোর্স ময়দানের জনসমুদ্রে বঙ্গবন্ধু স্বকণ্ঠে ঘোষণা করেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ ইতিহাসে এই ভাষণের তুলনা খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। আব্রাহাম লিংকন ও চার্চিলের ভাষণ ছিলো লিখিত, বঙ্গবন্ধুর ভাষণ ছিলো অলিখিত, তাৎক্ষণিক, স্বতঃস্ফূর্ত। মূলতঃ বঙ্গবন্ধুর এই ভাষণই ছিলো প্রকারন্তরে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা।

পাকিস্তানি বর্বরবাহিনী ৯ মাসব্যাপী নির্বিচারে এই বাংলাদেশে গণহত্যা ও নির্যাতন চালায়। এতে ৩০ লক্ষ বাঙালি শহিদ হন এবং ২ লক্ষ মা-বোন সম্ভ্রম হারান। ১৬ ডিসেম্বর পাক-হানাদার বাহিনী সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মুক্তিযোদ্ধা ও যৌথবাহিনীর নিকট আত্মসমর্পণের মাধ্যমে ৯ মাসের সশস্ত্র যুদ্ধের সমাপ্তি হলেও বাঙালি বিজয়ের স্বাদ পায়নি। ১০ জানুয়ারি ’৭২ বঙ্গবন্ধুর স্বাধীন বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তনের মাধ্যমেই স্বাধীনতা পূর্ণতা পায়। দেশে ফিরেই বঙ্গবন্ধু যুদ্ধবিধ্বস্ত এই দেশ পুনর্গঠনে নেমে পড়েন। বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার মাত্র এক বছরের মধ্যে জাতিকে সংবিধান উপহার দেন। উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের জন্য প্রথম বছরেই প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা প্রণয়ন করেন। শিক্ষার গুরুত্ব উপলব্ধি করে একটি গণমুখী শিক্ষানীতি প্রণয়ন ও শিক্ষা কমিশন গঠন করেন। বাংলাদেশে কৃষি ক্ষেত্রে গ্রহণ করেন ব্যাপক কর্মসূচি। বঙ্গবন্ধুর উদ্যোগে বাংলাদেশ স্বাধীনতার পর ১৪২টি দেশের

স্বীকৃতি, জোট নিরপেক্ষ আন্দোলন, জাতিসংঘ, কমনওয়েলথসহ ওআইসির সদস্যপদ লাভ করে। বঙ্গবন্ধু প্রথম বাঙালি যিনি একটি দেশের সরকার প্রধান হিসেবে জাতিসংঘে বাংলা ভাষায় ভাষণ দেন। কিন্তু এদেশের মানুষ স্বাধীনতার প্রকৃত অর্থ ও তাৎপর্য বুঝে ওঠার আগেই তাঁকে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট একদল বিপথগামী সৈনিক সপরিবারে নির্মমভাবে হত্যা করে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর হত্যাকান্ডের মধ্য দিয়ে এ দেশের মানুষ বঞ্চিত হয়েছিল স্বাধীনতার প্রকৃত অর্জন ও সুফল থেকে। অগণতান্ত্রিক ও সামরিক শাসনব্যবস্থা আমাদের দেশকে পিছিয়ে দিয়েছিল। রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক ব্যবস্থাসহ সর্বক্ষেত্রে সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্পের অনুপ্রবেশ মুক্তিযুদ্ধের মূলচেতনাকে বারবার আঘাত করেছে। এ দেশের অর্থনৈতিক কর্মকা- ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি বাংলাদেশের মহান স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্ন ছিল একটি সুখী, সমৃদ্ধ, বৈষম্যহীন ও শোষণমুক্ত সোনার বাংলা গড়ার। কিন্তু ষড়যন্ত্রকারী ও কুচক্রীরা দেশ স্বাধীনের মাত্র সাড়ে তিন বছরের মধ্যে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মাধ্যমে সদ্য স্বাধীন উদীয়মান বাংলাদেশের অগ্রযাত্রাকেও হত্যা করেছিল।

বঙ্গবন্ধু কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি, সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীসহ বিভিন্ন খাতের উন্নয়নের মাধ্যমে বিশ্বের বুকে বাংলাদেশকে উন্নয়নের রোল মডেলে পরিণত করেছেন। জাতির পিতার স্বপ্নপূরণের মাধ্যমে এ দেশের মানুষের কাছে স্বাধীনতার স্বপ্ন বাস্তবায়ন করে যাচ্ছেন। বিশ্বের অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের গড় প্রবৃদ্ধি যেখানে ৫.১ শতাংশ, সেখানে বাংলাদেশের গড় প্রবৃদ্ধি ৭.৮৬ শতাংশ। আমাদের মাথাপিছু আয় ২০০৯ সালে মাত্র ৭৫৯ মার্কিন ডলার থেকে বর্তমানে ২,৫৫৪ মার্কিন ডলার। বাজেটের আকার ছিল ৮৯ হাজার কোটি টাকা, যা এখন ৬ লাখ ৩ হাজার কোটি টাকা। আমাদের দারিদ্র্যের হার কমেছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা এখন ২৬ হাজার ২৩৫ মেগাওয়াট। খাদ্য উৎপাদন বেড়েছে বহুগুণ। খাদ্য উৎপাদনে আমরা স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছি। বাংলাদেশ খাদ্য উদ্বৃত্ত দেশ। দেশব্যাপী ১৩,৭৪৩টি কমিউনিটি ক্লিনিক মানুষের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিচ্ছে। এসব ক্লিনিক থেকে ৩০ ধরনের ওষুধ বিনামূল্যে দেওয়া হয়। শিক্ষা ক্ষেত্রে আমাদের অসামান্য অর্জন হয়েছে। ২৬,১৯৩ টি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ৩১৭টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, ৩৩৯টি কলেজ জাতীয়করণ করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক সালিশি আদালতের রায়ে সমুদ্রসীমা নিয়ে বিরোধ নিষ্পত্তি হয়েছে। এর ফলে বাংলাদেশের স্থায়ী সমুদ্রসীমা এখন ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটার। বাংলাদেশ মহাকাশে সফলভাবে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ পাঠিয়েছে। পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্প, পদ্মা রেলসেতু প্রকল্প, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, রামপাল কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্প, মাতারবাড়ি পাওয়ার প্রকল্প, মেট্রোরেল প্রকল্প, সোনাদিয়া গভীর সমুদ্রবন্দর, পায়রাবন্দর, চট্টগ্রাম-গুংদুম রেলপথ ও এলএনজি টার্মিনাল প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন রয়েছে।

যে বৈষম্য আমাদের পরাধীনতার বৃত্ত ভাঙতে সাহস যুগিয়েছিল। এক নতুন সূর্যোদয়ের স্বপ্ন দেখিয়েছিল। সেই সাহস ও নতুন স্বপ্ন আমাদেরকে আজ বিশ্বে মর্যাদার আসনে বসিয়েছে। বাংলাদেশের এ অগ্রযাত্রা আজ পৃথিবীর সকল প্রান্তের উন্নয়ন অর্থনীতির আলোচনার বিষয়। আমাদের আগামী প্রজন্ম বসবাস করবে সুখী, সমৃদ্ধ এক উন্নত বাংলাদেশে। আর গর্ব ও শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করবে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ মহান মুক্তিযুদ্ধের সকল বীর শহিদকে।

এবারের বিজয় দিবস ভিন্ন তাৎপর্যে উদযাপিত হচ্ছে। দেশে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে গণতন্ত্র। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ মহাজোট সরকার বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও বাঙালি জাতির হারানো গৌরব প্রতিষ্ঠায় সংকল্পবদ্ধ। পিতার স্বপ্ন সার্থক করে তোলার কঠিন দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে বঙ্গবন্ধু কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিরলস কর্মসাধনায় নিয়োজিত আছেন। দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য তিনি দিন বদলের কর্মসূচি হাতে নিয়েছেন। ইতোমধ্যেই দেশের মানুষের মনে সঞ্চারিত হয়েছে নতুন আশা ও উদ্দীপনা। বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের বিচার ও শাস্তিবিধান হয়েছে, যদিও সব খুনি অপরাধীদের দ- এখনো কার্যকর হয়নি। এই বিচার ও শাস্তিবিধান স্বাধীন ও নিরপেক্ষ বিচার ব্যবস্থার ক্ষেত্রে একটি অনন্য সাধারণ দৃষ্টান্ত। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় দেশের প্রচলিত আইন ও বিচার ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে এই বিচার সম্পন্ন হয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অশেষ সহিষ্ণুতা, ধৈর্য ও উদারতার পরিচয় দিয়েছেন, কোনো বিশেষ আদালত বা ট্রাইবুনাল গঠন করেননি। আইন তার স্বাভাবিক পথে চলেছে। আমরা জানি এই বিচারকে বন্ধ করার জন্য যেমন অর্ডিন্যান্স জারি করা হয়েছিলো তেমনি বিচারকে বিলম্বিত বা সুকৌশলে বানচাল করারও ব্যবস্থা করা হয়েছিলো। সেই দুর্যোগ কেটে গিয়ে উদ্ভাসিত হয়েছে আশার আলো, জাতি কলঙ্কমুক্ত হয়েছে। এবারের বিজয় দিবসের তাৎপর্য তাই ভিন্ন। সমগ্র জাতি আজ মাথা উঁচু করে উদযাপন করছে বিজয়ের ৫০ বছর।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট।

ভালো লাগলে শেয়ার করে দিন :)

0 Comments

Leave a Reply

Avatar placeholder

Your email address will not be published. Required fields are marked *