ই-পেপার

আবু বাকের

করোনাভাইরাসের নেই নির্দিষ্ট ওষুধ, ভ্যাকসিন। ভাইরাসটির বিস্তার ঠেকাতে তাই লকডাউনের মতো কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে দেশে দেশে। এতে ঘরবন্দী হয়ে পড়েন পৃথিবীর বেশির ভাগ মানুষ। বন্ধ করে দেওয়া হয় সব ধরণের যানবাহন ও চলাচল। ঘরবন্দী মানুষের প্রাণে বাঁচার এই লড়াইয়ে লকডাউনে থাকার অভিজ্ঞতা বদলে দিয়েছে অনেক কিছু। অর্থনৈতিকভাবে বড় ধরণের ক্ষতির মুখে পড়েছে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো। দেশে দেশে তাই দীর্ঘদিন ধরে চলা লকডাউন শিথিল করা হচ্ছে। শুরুতেই যারা কঠোর লকডাউন পালন করেছেন তারা ফিরছেন স্বাভাবিক জীবনে। মাসের পর মাস ঘরে থাকায় সাধারণ মানুষও বাড়ির বাইরে বেরিয়ে আসার জন্য অস্থির হয়ে উঠেছেন। লকডাউন শিথিল করতেই মানুষ নানা ধরণের কান্ড করে বেড়াচ্ছেন। তারই একটি খন্ড চিত্র।

চীনের পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে মানুষের ঢল

করোনাভাইরাসের প্রথম ছোবল পড়েছিল চীনে। গোটা বিশ্ব দেখেছে চীনের উহানে মৃত্যুর মিছিল। কঠোর লকডাউন দিলেও দেশজুড়ে করোনা সংক্রমণ আটকে রাখতে পারেনি তারা। প্রায় আড়াই মাসের ব্যবধানে চীনে এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয় ৮২ হাজার মানুষ। মৃত্যু হয় ৪ হাজারের বেশি মানুষের। কঠোর লকডাউনে সব যোগাযোগ বন্ধ করে দেওয়া হয়। সব ধরণের ব্যবসা, অফিস, দোকানপাট বন্ধ ছিল। তিন মাসে পুরো চীন অচল হয়ে পড়ে। তবে একের পর এক শহর বিচ্ছিন্ন করে ফেলা, নতুন আক্রান্ত রোগী খুঁজে আলাদা করে ফেলা ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলে, কোয়ারেন্টাইনে পাঠানোর কারণে শেষ পর্যন্ত দেশটিতে করোনা নিয়ন্ত্রণে আসে। করোনাভাইরাসের বিস্তার নিয়ন্ত্রণে আসায় অবরুদ্ধ জীবন, কোয়ারেন্টাইন ও ভ্রমণ বিধি-নিষেধ ধীরে ধীরে উঠিয়ে নেওয়া হয়। বেশিরভাগ শহর থেকে লকডাউন তুলে নেওয়া ও শিথিল করায় স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে শুরু করেছে দেশটি। চীনের শ্রমিকরা কাজে ফিরতে শুরু করেছেন। খুলে দেওয়া হচ্ছে পর্যটনগুলোও। চীনের প্রধান কয়েকটি শহরের পর্যটন কেন্দ্রে পর্যটকদের ঢল নেমেছে। সাপ্তাহিক ছুটির দিনে বেশ কয়েকটি পর্যটন কেন্দ্রে শত শত মানুষের জমায়েত দেখা যায়। আনহুই প্রদেশের হুয়াংশান পার্বত্য পার্কের কিছু ছবি এরই মধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। ছবিতে দেখা যাচ্ছে হাজার হাজার মানুষ ঠেলাঠেলি করে সংকীর্ণ পথ দিয়ে হাঁটছেন। বেশিরভাগই মাস্ক পরা। করোনা মহামারীর কারণে টানা কয়েক মাস বন্দী থাকার পর বাইরে খোলা হাওয়া খেতে বেরিয়ে পড়েছে মানুষ। মানুষের ভিড় এতই বেড়ে যায় যে, সকাল ৮টার আগেই হুয়াংশান পার্বত্য পার্কের দৈনিক সর্বোচ্চ ধারণক্ষমতা পেরিয়ে যায়। সকালবেলায় পার্কটিতে ২০ হাজারের বেশি মানুষ চলে আসে। ফলে কর্তৃপক্ষ নতুন করে পর্যটক প্রবেশ বন্ধের নোটিস দিতে বাধ্য হয়। অপরদিকে সাংহাইয়ের বিখ্যাত বান্ড জলাধারের সামনের এলাকা আবার ক্রেতা ও পর্যটকে ভরে উঠছে। বেশ কয়েক সপ্তাহ এ এলাকা একেবারে জনশূন্য ছিল। শহরের রেস্টুরেন্টগুলোও খুলছে। একই পরিস্থিতি রাজধানী বেইজিংয়ে। স্থানীয়রা ভিড় করছেন পার্ক ও খোলা জায়গাগুলোতে।

গ্রিসে চুল কাটা ও ফুল কেনার হিড়িক

ছয় সপ্তাহ লকডাউনে থেকে করোনাভাইরাসকে মোকাবিলা করেছে গ্রিস। ধীরে ধীরে নতুন সংক্রমণ কমে আসায় লকডাউন শিথিল করতে শুরু করে তারা। মানুষজন স্বাস্থ্যবিধি মেনে রাস্তায় বের হতে শুরু করেন। মুক্ত বাতাসের স্বাদ নিতে দলে দলে রাস্তায় নেমে এসেছে গ্রিকরা। রাজধানী এথেনস ও অন্যান্য বড় শহরে বিদ্যুৎচালিত পণ্যের দোকানের বাইরে লম্বা লাইন দেখা গেছে। একই অবস্থা দেখা গেছে ফুলের দোকান, বইয়ের দোকান ও সেলুনগুলোয়। স্কুল, রেস্টুরেন্ট ও বার এখনো খুলে দেওয়া হয়নি। তবে চলতি সপ্তাহের শেষের দিকেই খুলে দেওয়া হতে পারে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে। ৪ মে ২০২০ থেকে দেশটিতে লকডাউন আরও শিথিল করে দেওয়ায় ভিড় দেখা যায় বাইরে। গ্রিসের একটি টিভি চ্যানেলে দেখা যায় মানুষ ছুটছে পার্লারে ও সেলুনে। মাস্ক পরে চুল ছাঁটছেন নাপিত। ছোট বড় দোকানগুলোও খুলে দেওয়া হয়েছে। মানুষ প্রিয়জনের জন্য কিনছে ফুল। অনেকে ফুল কিনছেন ঘর সাজাবার জন্য। একই দৃশ্য বইয়ের দোকানে। লকডাউন শিথিলের পর দোকানগুলোয় ক্রেতাদের ভিড় লেগে যায়। ঘর থেকে বের হতে এখন আর জরুরি প্রয়োজনের জবাবদিহিতা করতে হচ্ছে না সেখানে। তবে মাস্ক পরা ও শরীরের তাপমাত্রা মেপে দেখা হচ্ছে। সতর্কভাবে লকডাউন শিথিল করছে গ্রিস। আগামী সপ্তাহগুলোয় ধীরে ধীরে লকডাউন আরও শিথিলের পরিকল্পনা করছে সরকার। যাত্রীরা মাস্ক পরছে কিনা ও সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখছে কিনা তা নিশ্চিতে ভোর থেকে বাস ও মেট্রো স্টেশনগুলো পরিদর্শন করেছে পুলিশ। গ্রিসে করোনা সংক্রমণ কম হলেও দেশটির অর্থনীতির ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করেছে করোনা মহামারী। করোনা মহামারীতে ছয় সপ্তাহ এর অর্থনীতি কার্যত অচল ছিল। সেই ক্ষতি পুষিয়ে নিতে লকডাউন শিথিল করে দেশটি। ৪মে ২০২০ থেকে শহরের ছোট ছোট সব ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, চুল কাটার সেলুন, ফার্স্টফুড ইত্যাদি খুলে দেওয়া হয়। পর্যায়ক্রমে স্কুল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো খুলে দেওয়া হবে। ১৫ মে থেকে সরকারি নানা অফিস-আদালত ১৭ মে থেকে গির্জাসহ সব ধরণের উপাসনালয়, মিউজিয়াম ও কালচারাল সেন্টারগুলো খুলে দেওয়া হবে। মে মাসের শেষ দিকে ও জুনের শুরুতে শপিং সেন্টার, মল, কলকারখানা, বড় বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, দূরপাল্লার যানবাহন খুলে দেওয়া হবে। পাশাপাশি ১ জুন থেকে রেস্টুরেন্ট, খাবারের দোকান, কফি, বার, বাইরে বসা যায় এমন ব্যবসাগুলো খুলে দেওয়া হবে। ১৫ জুন থেকে নাইটক্লাব, বিনোদন কেন্দ্র, খেলাধুলার জায়গা, ব্যায়ামাগার, সুইমিং পুল, সমুদ্রতীরবর্তী প্রতিষ্ঠানগুলো খুলে দেওয়া হবে।

নিউজিল্যান্ডে বার্গারের দোকানে ভিড়

নতুন সংক্রমণ কমে আসায় স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে শুরু করেছে নিউজিল্যান্ডের সাধারণ মানুষ। লকডাউনে সতর্কতার মাত্রা চার থেকে তিনে নামিয়ে আনা হয়েছে সেখানে। আর এতেই ঘরের বাইরে ছুটছে মানুষ। এক মাসের দীর্ঘ লকডাউন তুলে নেওয়ার পর দেশটির সাধারণ জনতা দীর্ঘদিন পর বার্গার, ফ্রাই ও কফির স্বাদ নিতে ফাস্টফুডের দোকানগুলোতে হুমড়ি খেয়ে পড়ছে। অ্যাকল্যান্ড ও ওয়েলিংটনে ম্যাকডোনালের দোকানের সামনে মানুষের দীর্ঘলাইন দেখা যায়। সতর্কতা বজায় রেখে খাবারের দোকানসহ জরুরি সেবা নয় এমন কিছু ব্যবসায়িক কার্যক্রম চালু করার পর মানুষজন হুমড়ি খেয়ে পড়েন। রেস্টুরেন্টে বসে খাবারের নিয়ম নেই তবে খাবার কিনে নিয়ে যেতে হবে এমন শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু মানুষজন সামাজিক দূরত্ব মানেননি। কয়েক সপ্তাহের কঠোর লকডাউন শিথিল করায় দেশটিতে প্রায় ৪ লাখ মানুষ কাজে যোগদান করেছে। এর আগে ২৬ মার্চ ২০২০ থেকে দেশটির প্রায় ৫০ লাখ মানুষ বিশ্বের অন্যতম কঠোর লকডাউনের মধ্যে ছিল। ফাস্টফুডের দোকানে ভিড়ের একটি ছবি ভাইরাল হয় সেখানে। ওয়েলিংটন শহরে বার্গারের দোকান নাম ‘বার্গার ফুয়েল’। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া একটি ছবিতে দেখা যায়, বার্গার কিনতে দোকানটির সামনে ক্রেতাদের ভিড় লেগে আছে। বার্গার বিক্রি করতে হিমশিম খাচ্ছিলেন বিক্রেতারা। মানুষের এত চাহিদা তারা কল্পনাও করতে পারেননি। অনেকেই দোকানের সামনে দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থেকেও ফিরেছেন খালি হাতে। যারা শেষ পর্যন্ত বার্গার হাতে পেয়েছেন তারা যেন সোনার হরিণ ধরার আনন্দ নিয়ে ফিরেছেন। গাড়িতে বসেই আগে সেই বার্গারের ছবি পোস্ট করেছেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। শহরের বেশিরভাড় ফাস্টফুডের দোকানে ছিল একই চিত্র। সামাজিক দূরত্ব মানার কোনো চিহ্ন ছিল না কোথাও। সরকারি নির্দেশনা অমান্য করে সামাজিক দূরত্ব না রেখে বার্গারের দোকানে এমন লাইন দেখে ক্ষুব্ধ দেশটির প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডা আরডার্ন। তিনি বলেন, ‘লকডাউন শিথিল করা হয়েছে বলে এটা এমন না যে, এভাবে কোথাও ভিড় করতে হবে।’ নিউজিল্যান্ড শুরু থেকেই সঠিকভাবে কঠোর লকডাউন ও কড়াকড়ি আরোপের কারণে এর সুফলও পেয়েছে। অনেক দেশই যখন করোনার সঙ্গে লড়াইয়ে হিমশিম খাচ্ছে তখন নিউজিল্যান্ড করোনা পরিস্থিতি ভালোভাবেই নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হয়। তাই লকডাউন কিছুটা শিথিল করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসের প্রকোপ ঠেকাতে দেশটিতে গত পাঁচ সপ্তাহ ধরে কঠোরভাবে লকডাউন জারি ছিল। লকডাউন শিথিলের পর প্রায় ৪ লাখ মানুষ কাজে ফিরেছে। শিশুরাও আগের মতো স্কুলে ফিরতে শুরু করেছে। একই সঙ্গে দোকানপাট এবং ক্যাফে খুলে দেওয়া হচ্ছে। রাস্তায় বেড়েছে মানুষের চলাচল। এই শহরে কফি বেশ জনপ্রিয়। কিছু ক্যাফে পুনরায় চালু হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে অ্যাপ ব্যবহার করে অর্ডার নেওয়া হচ্ছে।

থাইল্যান্ডে জমে উঠেছে ফুটপাথের বাজার

নতুন করে করোনা রোগীর সংখ্যা কমে যাওয়ায় করোনার বিধিনিষেধ শিথিল করতে শুরু করেছে থাইল্যান্ডও। এর পরই ব্যাংকক ও প্রদেশগুলো ব্যবসা প্রতিষ্ঠান খুলতে শুরু করে। জমে ওঠে ফুটপাথের বাজারগুলো। বাহারি পণ্য সাজিয়ে হাঁকডাক শোনা যাচ্ছে দোকানিদের। মানুষও ভিড় করেছে এসব দোকানে। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত টানা ভিড় লেগে গেছে এই ফুটপাথের দোকানগুলোতে। দীর্ঘ সময় লকডাউনে থাকায় প্রয়োজনীয় জিনিস ফুরিয়ে গেছে অনেকের। তারা দোকান ঘুরে ঘুরে এখন কেনাকাটা করছেন।

থাইল্যান্ডের হোটেলগুলো খাবার ও পানীয় কিনতে মানুষের ভিড় বেড়েছে। বিমানবন্দর, রেল স্টেশন, বাস স্টেশন, হাসপাতাল, রেস্টুরেন্টও বেভারেজের দোকানগুলোর সামনে দাঁড়িয়ে ক্রেতারা। মাসব্যাপী বন্ধ থাকার পর খুলছে পানশালাও। তবে মদ বা অ্যালকোহল জাতীয় পানীয় বাসায় নিয়ে পান করতে হচ্ছে। এরই মধ্যে জানানো হয়েছে, জনসমাগম কিংবা প্রতিযোগিতা ছাড়া বিভিন্ন খেলাধুলার মাঠ কিংবা কোর্ট আবার খুলতে পারবে। একই শর্তে মানুষ পার্কে দৌড়াতে, হাঁটতে বা বাইকিং করতে পারবে। করোনার প্রকোপ কমে বেশ কিছু ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও পার্ক পুনরায় খুলে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে থাই কর্তৃপক্ষ। রেস্টুরেন্ট, সেলুন, ফুটপাথের বাজার আবারও চালু হচ্ছে।

পার্কে গিয়ে আড্ডা দিচ্ছে ইতালির বাসিন্দারা

লকডাউন শিথিল করায় শরীরচর্চার জন্য পার্কগুলো খুলে দেওয়া হয়েছে ইতালিতে। ব্যায়াম করতে আসা মানুষদের দেখা যাচ্ছে হাস্যোজ্জ্বল। কিছুটা দূরে দাঁড়িয়েই তারা আড্ডায় মজেছেন। হাঁটাহাটি ও দৌড়ানোর জন্য পার্কগুলো খুলে দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে খেলাধুলার জন্য লোকজন বাড়ি থেকে দূরে যাওয়ার অনুমতি পেয়েছে। এরপরই তারা যাচ্ছেন আত্মীয়-স্বজন এবং পরিচিত লোকজনের বাড়িতে। আপাতত একই এলাকার মধ্যে তারা ঘোরাঘুরি করতে পারছেন। জনসমাগমে নিষেধাজ্ঞা থাকছে। রেস্টুরেন্ট ও বারগুলো খোলার অনুমতি পেয়েছে। তবে সেখানে বসে খাওয়া বা পান করা যাবে না। খাবার নিয়ে বাসায় বা অফিসে খেতে হবে। এ ছাড়া গণপরিবহন বা অনেক মানুষ চলাচল করে- এমন স্থানে মাস্ক পরা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। শেষকৃত্য আয়োজনে কিছুটা শিথিল কড়াকড়ি করা হয়েছে। বিয়ের অনুষ্ঠানে এখনই অনুমতি দেওয়া হচ্ছে না। এজন্য আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হচ্ছে। বার, সেলুন, রেস্টুরেন্ট আগামী ১ জুন ২০২০ থেকে পুরোপুরি চালু হবে। ইউরোপের প্রথম দেশ হিসেবে লকডাউন শিথিল করেছে ইতালি। লকডাউনের কারণে দেশটির অর্থনীতি ভয়াবহ ক্ষতির মুখে পড়েছে। এই পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠতেই লকডাউন শিথিল করা হয়েছে এবং লোকজন কাজে ফিরতে শুরু করেছে। ইতালিতে লকডাউন শিথিলের পর প্রায় ৪৪ লাখ মানুষ কাজে ফিরেছে। দেশটিতে এরই মধ্যে বিভিন্ন ফ্যাক্টরির কার্যক্রম, নির্মাণ কাজ ও পাইকারি ব্যবসা পুনরায় চালু হয়েছে। দুই মাসের বেশি সময় ধরে করোনার প্রাদুর্ভাবে ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়েছে ইতালি। ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে ইতালিতেই সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত ও মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। এখন পর্যন্ত করোনায় আক্রান্ত ও মৃত্যুতে তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে ইতালি।

সমুদ্র সার্ফিং, পার্কে ভিড় স্পেনে

৪৯ দিন পর লকডাউন শিথিল করা হয় স্পেনে। এরপর থেকেই দেশটির রাস্তাগুলোতে মানুষের ভিড় বেড়ে যায়। প্রাতঃভ্রমণ, শরীরচর্চা এবং সাইক্লিং করতে দেখা যায়। স্পেনে লকডাউন শিথিল করায় মানুষ সকাল-বিকাল পার্কে ভিড় করছে। শত শত মানুষের পদচারণায় মুখর হয়ে ওঠে রাস্তাঘাট। টানা দেড় মাসের বেশি সময় গৃহবন্দী থাকার পর অনেকে ছুটে যান উত্তাল সমুদ্রে। সমুদ্রে সার্ফিংয়ে নেমে পড়েছেন অনেকে। কেউ আবার সাগর তীরে মুক্ত বাতাসে প্রাণ ভরে নিঃশ্বাস নিচ্ছেন। সামাজিক দূরত্ব মেনে চলায় অনেকেই সতর্ক ছিলেন। গণপরিবহন চলছে। তবে এতে মাস্ক ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। রাস্তায় যানবাহন কম থাকলেও সাইকেল ও স্কেটবোর্ড নিয়ে অনেকেই বেরিয়েছিলেন। বাইরে মানুষের ভিড় কমাতে দেশটির সরকার ‘শিফট’ ব্যবস্থা চালু করেছে। এর মাধ্যমে বিভিন্ন বয়সের মানুষ ভিন্ন সময়ে বাইরে বের হওয়ার অনুমতি পাচ্ছেন। ৪ মে ২০২০ থেকে সেলুন খুলে দেওয়ার পর সেলুনে ভিড় জমে যায়। আগামী সপ্তাহ থেকে সেখানে মদের বার ও রেস্টুরেন্ট খুলে দেওয়ার কথা। পরিস্থিতি বিবেচনায় পর্যায়ক্রমে খুলে দেওয়া হবে অন্য ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। করোনাভাইরাসে বিশ্বে যে কয়েকটি দেশ সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে, স্পেন তার মধ্যে অন্যতম। করোনার ভয়াল সংক্রমণ ঠেকাতে মার্চে দেশটিতে কঠোর লকডাউন জারি করা হয়। এই সময় লোকজন শুধু ওষুধ এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী কেনার জন্য বাড়ি থেকে বের হওয়ার অনুমতি পেতেন। এ ছাড়া যাদের বাসা থেকে অফিস করার সুযোগ নেই, শুধু তারাই অফিসে যেতে পারতেন। করোনার প্রকোপ কমতে থাকায় স্পেনে শিথিল হয়েছে লকডাউন। সামাজিক দূরত্ব মেনে বাইরে বের হচ্ছেন অনেকেই। এ ক্ষেত্রে বয়স ভেদে সময় নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে।

সিঙ্গাপুরে আকুপাংচার নিতে ভিড়

করোনার সঙ্গে লড়াইয়ে সফল দেশগুলোর তালিকায় ওপরের দিকে রয়েছে সিঙ্গাপুর। করোনাভাইরাসকে আটকে রাখতে ৭ এপ্রিল ২০২০ থেকে পুরোপুরি লকডাউন শুরু হয় সিঙ্গাপুরে। ৪ মে ২০২০ থেকে সেখানে শিথিল করা হয় লকডাউন। লকডাউন শিথিল করতেই সেখানে ঐতিহ্যবাহী চীনা চিকিৎসা পদ্ধতি আকুপাংচার ফের চালুর মাধ্যমে শুরু হয় ব্যবসায়িক কার্যক্রম। চীনের প্রাচীন ও জনপ্রিয় এই চিকিৎসাপদ্ধতিতে শরীরে ব্যথাজনিত ও স্নায়ু সম্পর্কিত বিভিন্ন রোগের উপশম পাওয়া যায়। লকডাউন শিথিল করতেই আকুপাংচার চিকিৎসা নিতে হুমড়ি খেয়ে পড়েন সিঙ্গাপুরের বহু মানুষ। বিভিন্ন ধরণের ব্যথা নিয়ে ঘরে কষ্ট করছিলেন অনেকে। তারা লকডাউন খুলতেই সেখানে পৌঁছে গেছেন। সিঙ্গাপুরে দ্রুতই আরও বড় পরিসরে লকডাউন খুলে দেওয়ার ঘোষণা রয়েছে। আগামী সপ্তাহ থেকে সেখানে সেলুন, লন্ডি ও গৃহভিত্তিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো চালু হবে। এতদিন বাইরে হাঁটাচলা-ব্যায়াম নিষিদ্ধ থাকলেও এ ব্যাপারে বিধি-নিষেধ তুলে নেওয়া হচ্ছে। তবে জিম-সুইমিংপুল বন্ধই থাকবে। এ ছাড়া ১৯ মে থেকে কিছু স্কুলও ফের খুলে দেওয়া হচ্ছে। সে ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের ছোট ছোট দলে ভাগ করে পাঠদান করা হবে। আগামী কয়েক সপ্তাহে ধীরে ধীরে শিথিল করা হবে সিঙ্গাপুরের লকডাউন।

মদের দোকানে তালা খুলতেই লকডাউন উধাও ভারতে

দ্রুত ছড়িয়ে পড়া মহামারী করোনভাইরাসকে তোয়াক্কাই করল না ভারতবাসী। বেশ কিছুদিন ধরেই সেখানে মদের দোকান খুলবে কি খুলবে না, তা নিয়ে আলোচনা হচ্ছিল। মদের অনলাইন ডেলিভারি দেওয়া হবে এমন খবরও বের হয়। ভারতে কেন্দ্রীয় সরকারের নির্দেশে খুলে দেওয়া হয় মদের দোকান। এতে দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে যান শত শত মানুষ। এই চিত্র দেখা গেছে ভারতের একাধিক জায়গায়। আর ভিড় ঠেকাতে লাঠিচার্জ করতে হয়েছে পুলিশকে। তবে ৪ মে সকাল থেকে দেশটিতে মদের দোকান খুলে দিতে পারে সে খবর ছড়িয়ে যায়। সেদিন সকাল হতে না হতেই মহানগরের বিভিন্ন মদের দোকানে দীর্ঘ লাইন পড়ে গেল। দিনভর সামাজিক দূরত্বের কোনো তোয়াক্কা না করেই চলে মদের কেনাবেচা। মদের লাইন সামলাতেই ব্যস্ত হয়ে পড়ে পুলিশ। কলকাতা করপোরেশন এলাকা থেকে নিউ আলিপুর, কালিঘাট থেকে ঢাকুরিয়া সর্বত্র সকাল থেকেই দীর্ঘ লাইন ছিল ক্রেতাদের। কালীঘাটে গ্রাহকদের লাইন এতই ভিড়ে ঠাসা হয়ে যায় যে তা হটাতে হয় পুলিশকে। এই ভিড়ের কারণে কিছু দোকানের মালিক জানিয়ে দেয়, পুলিশি নিরাপত্তা ছাড়া দোকান খোলা সম্ভব নয়। কিছু ক্ষেত্রে দেখা গিয়েছে হাতে কুপন ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে। আজ যারা মদ পায়নি তারা আগামীকাল কিনতে পারবে। কেনার ছাড়পত্র ওই কুপন। এ দিন শহর বা শহরতলির অনেক মদের দোকানেই সামাজিক দূরত্ব মানা হয়নি। সরকারের বেঁধে দেওয়া নির্দিষ্ট বিধি মেনে মদ বিক্রির অনুমতি ছিল। তার অন্যতম দুটি শর্ত মদের দোকানের সামনে পাঁচজনের বেশি জড়ো হওয়া যাবে না এবং একজনের থেকে আর একজনের দূরত্ব থাকতে হবে ছয় ফুট। সেসব পাত্তা পায়নি। কলকাতার কালীঘাট দমকল কেন্দ্রে পাশের মদের দোকানে মদ কেনার জন্য ৪ মে ২০২০ সকালে লাইনে দাঁড়িয়ে পড়লেন কয়েক শ মানুষ। তাদের মধ্যে দুই গজের দূরত্ব তো অনেক দূরের কথা দুই ইঞ্চিও ফাঁক নেই। একজনের ঘাড়ে আর একজন উঠে পড়ার মতো অবস্থা। এই পরিস্থিতি তৈরি হতেই ঘটনাস্থলে যায় কালীঘাট থানার পুলিশ। লাঠি চালিয়েও ভিড় ফাঁকা করতে পারেনি প্রশাসন। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে মদের দোকানের মালিককে দোকান বন্ধ করে দেওয়ার নির্দেশ দেয় পুলিশ। দিল্লিতেও মদের দোকানের সামনে ছিল ঠাসাঠাসি ভিড় এবং বিশাল লাইন। কোনো কোনো জায়গায় দোকানের তিনটি কাউন্টার থেকে মদ বিক্রি করা হচ্ছিল। প্রতিটি কাউন্টার থেকে লাইন এঁকেবেঁকে চলে গিয়েছিল কয়েক কিলোমিটার। একজনের গায়ের ওপরে অন্যজন দাঁড়িয়ে। সেখানে কাশ্মীরি গেটে মদের দোকানের লাইনে কোনো সামাজিক দূরত্ব না মেনেই লম্বা লাইনে কাছাকাছি মানুষ দাঁড়িয়ে ছিল। লকডাউনের নিয়ম না মানার জন্য পুলিশ তাদের ওপর লাঠিচার্জ করে। পূর্ব মেদিনীপুরের নন্দকুমারে লাইনে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে মদ না পেয়ে দোকান ভাঙচুরের চেষ্টা চালানো হয়। হুগলি, বাঁকুড়া, পশ্চিম বর্ধমানেও মদের দোকানের বাইরের দিক থেকে ভিড়ের ছবি দেখা গেছে। কলকাতা ছাড়াও অন্য রাজ্যের অবস্থাও কম বেশি একই। অন্ধ্র প্রদেশেও মদের দোকানের ভিড় সামলাতে লাঠি চালিয়েছে পুলিশ। উত্তর প্রদেশেও মদের দোকানের সামনে পুলিশকে লাঠি চালাতে হয়েছে। যোগী আদিত্যনাথের রাজ্যে প্রথম দিনেই রেকর্ড ১০০ কোটি টাকার মদ বিক্রি হয়েছে। সোমবার কম সময়ের জন্য দোকান খুলেছিল। তা সত্ত্বেও বিক্রির পরিমাণ প্রায় ২৫ থেকে ৪০ শতাংশ বেড়েছে। শুধু লখনউতেই ৬ কোটি ৩০ লাখ টাকার মদ বিক্রি হয়েছে। দেশের বিভিন্ন জায়গায় দুপুর-বিকালের মধ্যেই দোকানের স্টক শেষ হয়ে যায়। কোথাও সামাজিক দূরত্বের বালাই নেই। রেড জোন এলাকায় বাজারগুলোতে যেখানে নিয়ন্ত্রণ রাখার চেষ্টা চলছে সেখানে এমন অবস্থা দেখে শহরবাসী হতবাক।

লেখক : কলামিষ্ট।

ভালো লাগলে শেয়ার করে দিন :)

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x