ই-পেপার

SITE UNDER CONSTRUCTION
বাংলাদেশ পুলিশের মুখপত্র
অব্যাহত প্রকাশনার ৬৩ বছর

বিশ্ব পরিবেশ দিবস: বাস্তুতন্ত্র পুন:প্রতিষ্ঠা

Published by Detective BD on

করোনামুক্ত পৃথিবীতে হাসতে চাই প্রাণ খুলে

বিশ্ব পরিবেশ দিবসে এবারের প্রতিপাদ্য হলো Ecosystem Restoration বা বাস্তুতন্ত্র পুন:প্রতিষ্ঠা। এই প্রতিপাদ্যটিকে বাস্তবায়নের জন্য পরিকল্পনা অনুযায়ী যথাস্থানে গাছ লাগানো এবং পরিচর্যা করা; দালানকোঠার শহরকে সবুজায়ন করা; উদ্যান পুণঃনির্মান এবং নদী এবং সমুদ্রকে বর্জমুক্ত করে পরিষ্কার রাখা। আর কাজটির দায়িত্ব আমাকে এবং আপনাকেই নিতে হবে। পরিবেশের প্রধান দুটি অঙ্গ আছে। একটি হলো জীব অন্যটি হলো জড়। জীবের মধ্যে প্রাণী, উদ্ভিদ, অণুজীব আর জড়ের মধ্যে মাটি, পানি, আলো-বাতাস উল্লেখযোগ্য। এসবগুলোর মধ্যে একটি ভারসাম্য থাকতে হবে। পরিবেশই প্রাণের ধারক, জীবনীশক্তির বাহক। সৃষ্টির শুরু থেকেই পরিবেশের সঙ্গে প্রাণীর মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতার ওপরেই তার অস্তিত্ব নির্ভর করে আসছে। পরিবেশ প্রতিকূল হলে জীবের ধ্বংস ও বিনাশ অবশ্যম্ভাবী। পরিবেশের ওপর নির্ভর করে মানুষ, অন্যান্য উদ্ভিদ ও প্রাণী-জীবনের বিকাশ ঘটে। তাই পরিবেশ ও মানুষের মধ্যে রয়েছে এক নিবিড় যোগসূত্র। কিন্তু নানা কারণে পরিবেশদূষণ সমস্যা প্রকট হওয়ায় মানবসভ্যতা আজ চরম হুমকির সম্মুখীন। এ থেকে মুক্তির উপায় নিয়ে চলছে নানা ধরনের গবেষণা। বিশ্বব্যাপী পরিবেশদূষণ নিয়ে ব্যাপক জনসচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে জাতিসংঘ ৫ জুনকে ঘোষণা করেছে ‘বিশ্ব পরিবেশ দিবস’ হিসেবে। বিশ্ব পরিবেশ দিবসে করোনা মহামারী ২০২০ সালের মার্চ মাস থেকে শুরু করে ডিসেম্বর পর্যন্ত আমাদের যে শিক্ষা দিল সেটি যেন কোনোভাবেই আমরা ভুলে না যাই অর্থাৎ প্রকৃতির বিরুদ্ধে গেলে কী হতে পারে। এই শিক্ষাটি বিশ্ব পরিবেশ দিবসে মূল প্রতিপাদ্য হতে পারত।

আমার সাথে সকলেই একমত হবেন যে করোনার মহামারীতে কিছুটা হলেও পরিবেশে দূষণ কমেছে।

প্রকৃতিও হয়ত ফিরে পেয়েছে আসল চেহারা মানুষকে গৃহবন্দী করে। পরিবেশের অন্যতম উপাদান যে বাস্তুতন্ত্রে সেটি ফিরে পেয়েছিল তার প্রাণ। হালদা নদীতে বিশেষ প্রজাতির ডলফিনের বিচরণ। কক্সবাজারের সমুদ্র সৈকতে নির্ভয়ে লাল কাঁকড়ার ছোটাছুটি আর আল্পনা আঁকা। সেন্টমার্টিনে কচ্ছপের ডিম থেকে মুক্ত হয়ে বাচ্চাগুলোর নির্ভয়ে সমুদ্রের পানিতে সাঁতার কাটা। বাংলাদেশের মিঠাপানির অন্যতম প্রজনন কেন্দ্র হলো হালদা নদী। মানুষের অত্যাচারে নদীটির চেহারা বদলে গিয়েছিল। ভ্রমণপিপাসু মানুষের অত্যাচারে কক্সবাজার-সেন্টমার্টিন যেন বর্জ্যস্তুপে পরিণত হয়েছিল। করোনা আমাদের অনেক জীবনহানি ঘটিয়েছে কিন্তু ফিরিয়ে দিয়েছে প্রকৃতির আসল চেহারাকে। করোনার সময় নদী এবং সমুদ্র সৈকত ছিল নিরাপদ তাইতো হালদা নদী আর কক্সবাজার-সেন্টমার্টিনের এমন দৃশ্য কতদিন দেখা যায়নি! মানুষের খামখেয়ালীপনায় প্রকৃতি তার অস্তিত্ব রক্ষার পথ খুঁজছিল। অনেকটা কল্পকাহিনীর মতোই যেন পরোক্ষভাবেই প্রকৃতির বন্ধু হয়ে গেল মানুষের সবচেয়ে বড় শত্রু করোনা। করোনা আতংক এবং লকডাউনের কারণে মানুষের বিচরণ, কল-কারখানা এবং ভাঙাচুরা যানবহন থেকে নির্গত কালো ধোঁয়া শহরের বাতাসে প্রবেশ না করায় বাতাস কিছুদিনের জন্য হলেও ছিল নির্মল। সবুজ গাছপালা বাতাসের কার্বন-ডাই-অক্সাইড শোষণ করে বিশুদ্ধ অক্সিজেনকে বাতাসে ফিরিয়ে দিয়েছে। এসব বিবেচনায় গত একবছর করোনা মানুষকে প্রকৃতি বান্ধব হওয়ার শিক্ষা দিয়ে গেল কি না, প্রশ্নটি পাঠকের নিকট রেখে দিলাম। আশা করি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অন্তর দিয়ে বিষয়টি ভেবে দেখবেন। একারণেই হয়ত বিশ্ব পরিবেশ দিবসে এবারের প্রতিপাদ্য হলো Ecosystem Restoration বাস্তুতন্ত্র পুন:প্রতিষ্ঠা।

বিশ্বব্যাংকের পরিসংখ্যানে বলা হয়েছে, শহরাঞ্চলে এই দূষণের মাত্রা উদ্বেগজনক পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছেছে। এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে তুলনা করতে গিয়ে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, পরিবেশ দূষণজনিত কারণে বাংলাদেশে যেখানে ২৮ শতাংশ মৃত্যু হয়, সেখানে মালদ্বীপে এই হার ১১ দশমিক ৫ শতাংশ আর ভারতে ২৬ দশমিক ৫। নিজে বাঁচতে হলে সবার আগে আপনার পরিবেশকে বাঁচান, করোনা সঙ্কটসহ নানা সমস্যা থেকে দেশ তথা গোটা বিশ্বকে বাঁচাতে এমনটাই বলছেন পরিবেশবিদরা। বর্তমান বিশ্বে জনসংখ্যার চাপ, শিল্পায়ন এবং বনভূমি ধ্বংসের কারণে প্রাকৃতিক বিপর্যয় ঘটছে, বাড়ছে উষ্ণতা, দূষণের শিকার হচ্ছে নদী এবং সমুদ্র। অতিরিক্ত কার্বন নিঃসরণ এবং সবুজ বনভূমির অপর্যাপ্ততায় বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে ফলে উত্তর মেরুর বরফ গলা পানিতে বিশ্বের বিশেষ করে বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের একটা বড় অংশ পানির তলে তলিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। অতিরিক্ত প্লাস্টিক ব্যবহারের ফলে সমুদ্রের তলদেশে অপচনশীল প্লাস্টিক ও পলিথিন জমা হচ্ছে এবং হুমকির মুখে পড়ছে সেখানকার জীববৈচিত্র।

আমি কর্মসূত্রে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞানের অধ্যাপক এবং আরবরিকালচার সেন্টারের পরিচালক। শিক্ষক হিসেবে করোনা মহামারীতে পরিবেশ নিয়ে একটু বেশিই ভেবেছি এবং ভাবারই তো কথা। সেকারণে স্বাস্থ্যবিধি মেনে মাস্ক পরিধান করে কর্মস্থলে গিয়েছি এবং সেন্টারের পরিচালকের দায়িত্ব কিছুটা হলেও পালন করেছি। করোনায় বিশ্ববিদ্যালয় ছিল বন্ধ। বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউক্লিয়াস টিএসসি কেন্দ্রিক রাজনীতি এবং সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডও ছিল বন্ধ একারণেই সবুজ বিশ্ববিদ্যালয় আরও সবুজ হয়েছিল। জীববৈচিত্রের প্রকৃত উদাহরণ হয়ে উঠেছিল নিষ্প্রাণ বিশ্ববিদ্যালয়। বেগুনী-লাল-হলুদ রঙে সুশোভিত হয়েছিল জারুল,

কৃষ্ণচূড়া, রাঁধাচূড়া আর সোনালুর গাছগুলো। কুরচি, নাগেশ্বর, কাঠ-গোলাপ, ম্যাগনোলিয়া আর স্বর্ণচাঁপার সাদা-গোলাপী ফুলগুলো

প্রকৃতিতে মিষ্টি সুবাস ছড়িয়ে দিয়েছিল। নাগলিঙ্গমের বিশেষ ধরণের মিষ্টি রঙের ফুলগুলো যেন গাছকে সাপের মত পেঁচিয়ে ফণা তুলে ফোঁসফোঁস করে নির্ভয়ে গন্ধ ছড়িয়েছে। করোনায় আরও একটি লক্ষণীয় ছিল ঝড়ে পড়ে যাওয়া মৃতপ্রায় শিউলি গাছের কা- থেকে নতুন গাছের সৃষ্টি।  এই পৃথিবীতে সকলেই বাঁচতে চায় এবং তার বংশধর রেখে যেতে চায়। এটি তারই প্রমাণ। আরও একটি উদাহরণ দিতে চাই। সবুজ মল চত্ত্বর: করোনার সময়ে অন্যতম উপহার। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাননীয় উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান মহোদয়ের সময়পোযোগী নির্দেশনায় আরবরিকালচার সেন্টার-এর প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ধুলাময় মল চত্বরের দুটি লনের সবুজায়নের কাজ শুরু হয়েছিল ঠিক করোনা মহামারীর পূর্বে। অত্র সেন্টারের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মচারীবৃন্দ করোনার সময়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে স্বাস্থ্যবিধি মেনে নিরলস পরিশ্রম করে ধুলোময় লন দুটিকে সবুজায়ন করতে সক্ষম হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় খোলা থাকলে সবুজায়ন সম্ভব হতো কী না একটি বড় জিজ্ঞাস্য? আরবরিকালচার সেন্টার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সবুজায়ন এবং সৌন্দর্যবর্ধনের কাজটি নিরলসভাবে করে চলেছে। সকলের সহযোগিতা নিয়েই শতবর্ষের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে আরও সবুজায়ন করে, সৌন্দর্যবর্ধনকারী গাছ আর মৌসুমী ফুল দিয়ে সৌন্দর্যমন্ডিত করার প্রয়াস অব্যাহত রাখতে আমরা দৃঢ়ভাবে অঙ্গীকারাবদ্ধ। “শিক্ষার পাশাপাশি পরিবেশও হবে শিক্ষার উপযোগী” এই স্লোগান নিয়ে বিশ্ব পরিবেশ দিবসে আমরা এগিয়ে যেতে চাই।

বিশ্ব পরিবেশ দিবসের আলোকে করোনা মহামারী নিয়ে এই মুহুর্তে আমার ছোট ছোট ভাবনাগুলো আপনাদের সাথে ভাগাভাগি করে নিতে চাই। আপনারা অনেকেই একমত হবেন যে কোনো রোগ সাধারণত মানুষ, রোগজীবাণু এবং পরিবেশ-এই তিনটির আন্তঃক্রিয়ার (interaction) বহিঃপ্রকাশ। সাধারণত রোগজীবাণু মানুষ (পোষক)-কে পরাজিত করেই রোগের সৃষ্টি করে। মহামারীর ক্ষেত্রে তিনটি বিষয় (জীবাণু, পোষক এবং পরিবেশ) বিশেষভাবে বিবেচ্য। এই তিনটি বিষয়কে একটি ত্রিভুজের সাথে তুলনা করা যেতে পারে। রোগের এই ত্রিভুজে জীবাণু যদি মারাত্মক ছোঁয়াচে হয়, মানুষ দুর্বল বা কম রোগ প্রতিরোধক হয় আর পরিবেশ রোগ বিস্তারের অনুকূলে থাকে তাহলে রোগটি মহামারী হতে পারে বলে বিশ্বাস করা হয়। রোগের এই কাল্পনিক ত্রিভুজটির আন্তঃক্রিয়া সকল দেশে একই রকম হবে না বলে আমার বিশ্বাস। তার কারণেই হয়ত বিশ্বে করোনায় আক্রান্ত এবং মৃত্যুর হারে ভিন্নতা দেখা গিয়েছে।

বিশ্ব পরিবেশ দিবসে করোনা ভাইরাসের মারাত্মকতা বা রোগ সৃষ্টির তীব্রতার বিষয়ে কিছু আলোচনা করা যেতে পারে। চীনের উহান থেকে ভাইরাসটি বিমান ভ্রমণে বিভিন্ন দেশে গিয়েছে বলে ধারণা করা হয়। বিমান ভ্রমণে কসমিক রশ্মির প্রভাবে মিউটেশন ঘটতে পারে। এরপর যে দেশে পৌঁছেছে সে দেশের প্রাকৃতিক বা

কৃত্রিম তেজস্ক্রিয় রশ্মির প্রভাবে আবার মিউটেশন ঘটতে পারে। এই মিউটেশনের ফলে ভাইরাসটি মারাত্মক হতে পারে। এরপর ভাইরাসটি যে দেশে অবস্থান করছে সে দেশের মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং রোগ প্রতিরোধের ব্যবস্থার উপর নির্ভর করতে পারে মহামারীর তীব্রতা। ত্রিভুজের তৃতীয় বিষয়টি হলো সে দেশের পরিবেশ অর্থাৎ তাপমাত্রা, আর্দ্রতা ইত্যাদি। সুতরাং সকল ক্ষেত্রেই পরিবেশের গুরুত্ব রয়ে গেছে। সবুজায়ন, নির্মল বাতাসের পাশাপাশি বিশ্ব পরিবেশ দিবসে পানি দূষণরোধেও আমাদেরকে ভাবতে হবে। আমাদের দেশে শিল্পায়নের সাথে সাথে গৃহস্থলি এবং শিল্পবর্জ্য পরিশোধিত না হয়ে সরাসরি নদীর পানিকে দূষিত করছে। পানীয় পানির জন্য আমাদের নির্ভর করতে হয় ভুগর্ভস্থ পানির উপর। নানা কারণে ভুগর্ভস্থ পানির স্তরও নিচে নেমে যাচ্ছে। আজকে বিশ্ব পরিবেশ দিবসে তাই নদীর দূষণ রোধ এবং নিরাপদ পানীয় পানির উপরও কিছুটা আলোকপাত করতে চাই।

মানুষের শরীরের প্রায় ৭০ ভাগ পানি। শরীরের রক্ত সঞ্চালন থেকে প্রায় সকল বিপাকীয় প্রক্রিয়ায় পানির প্রয়োজন অপরিহার্য। এছাড়াও দেহের অভ্যন্তরীণ তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করা, দেহের দূষিত পদার্থ দূর করা, খাদ্য পরিপাক, অস্থিসন্ধি পিচ্ছিল রাখা ও দেহের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সচল রাখতে পানির ভূমিকা অত্যাবশ্যক। একারণেই পানির অপর নাম জীবন। একবিংশ শতাব্দীতে মানব সভ্যতা যে কয়েকটি কারণে হুমকির মধ্যে পড়বে তার মধ্যে অন্যতম হলো পানি। অনেক পানি বিশেষজ্ঞ পানি নিয়ে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের আশঙ্কার কথাও উল্লেখ করেছেন। বিশ্ব পরিবেশ দিবসে সকলের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য পানি এবং দূষণ নিয়ে আমার কিছু ভাবনার কথা উপস্থাপন করছি। নিরাপদ পানির অভাব বাংলাদেশে এখন প্রকট, কি গ্রাম কি শহর! নদীমাতৃক বাংলাদেশে পানীয় পানির প্রধান উৎস হলো ভূগর্ভস্থ পানি। বাংলাদেশ এখন খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ দেশ। সেই খাদ্য উৎপাদনেও ভূগর্ভস্থ পানির ব্যাপক ব্যবহার হচ্ছে। ঢাকা শহরটি মেগাসিটিতে পরিণত হওয়ায় ভূগর্ভস্থ পানির উপর অত্যধিক চাপ পড়েছে। ফলে প্রতি বছরই পানির স্তর নিম্নমুখী হওয়ায় নতুনভাবে পানির নিচের স্তরে পাইপ দিয়ে পানির সরবরাহ চালিয়ে নিতে হচ্ছে। ভূগর্ভস্থ পানির উপর চাপ কমাতে ভূপৃষ্ঠের উপরিভাগের পানির ব্যবহারের দিকে এখন থেকেই বিশেষভাবে নজর দিতে হবে। সেক্ষেত্রে নদীর পানিই একমাত্র ভরসা। সেই ভরসার জায়গাটিও আমরা অবহেলায়, অযতেœ এবং অসচেতনতায় বিভিন্নভাবে দূষিত করে ফেলেছি। এসব বিবেচনায় সুপেয় এবং নিরাপদ পানির জন্য দুটি বিষয়ের ওপর বিশেষভাবে নজর দিতে হবে। প্রথমটি হলো পানি ব্যবহারে মিতব্যয়িতা এবং দ্বিতীয়টি নদীর পানি দূষণরোধে এগিয়ে আসা।

এখন প্রথম বিষয়ে সংক্ষেপে একটু আলোকপাত করা যাক। আমরা অনেকেই দাঁত ব্রাশ করার সময় বেসিনের কল খুলে রেখে দাঁত ব্রাশ করে থাকি। বিষয়টি ছোট্ট হলেও এটি পানি অপচয়ের একটি বড় দিক। পানি অপচয় রোধে বেসিনের কলটি বন্ধ রেখে শুধু মুখ ধোয়ার সময় পানি ব্যবহার করা উচিত। তাহলে কিছুটা হলেও পানির অপচয় রোধ করা যাবে। একজন মানুষের জীবন ধারণের জন্য প্রতিদিন কমপক্ষে ১.৫ লিটার পানির প্রয়োজন বলে ধারণা করা হয়। এছাড়া প্রতিদিন খাদ্য তালিকায় পানি সমৃদ্ধ খাদ্য যেমন কাঁচা ফল-মূল ও শাক-সবজি রেখে সেখান থেকেও পানির ঘাটতি পূরণ হয়ে থাকে। তরমুজ, শসা ও স্ট্রবেরির মোট ওজনের ৯০ শতাংশই পানি। মানুষের পানি চাহিদার ২০ শতাংশই পূরণ হয় স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়ার মাধ্যমে।

Environment Canada-এর তথ্যানুযায়ী গোসল এবং বাথটাবে শতকরা ৩৫ ভাগ, শৌচাগারে ৩০ ভাগ, লন্ড্রির কাজে ২০ ভাগ, রান্না ও পানীয় পানির ক্ষেত্রে ১০ ভাগ এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতায় শতকরা ৫ ভাগ পানির ব্যবহার হয়ে থাকে। শুধুমাত্র বাংলাদেশই নয়, সারা বিশ্ব সুপেয় এবং নিরাপদ পানি নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছে। এ কারণে পানির অপচয় রোধে উন্নত দেশে পানির কলের সাথে সেন্সর যুক্ত করা হয়েছে। ফলে ট্যাপের নিচে হাত দিলেই শুধু পানি আসবে এবং হাত সরিয়ে নিলে পানির প্রবাহ বন্ধ হয়ে যাবে। পানির মিতব্যয়ী ব্যবহারের আরেকটি উদাহরণ দিতে চাই। একবার একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে ভারতের কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়েছিলাম। আমার সঙ্গে আমাদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জীববিজ্ঞান অনুষদের মাননীয় ডিন এবং তাঁর স্ত্রী ছিলেন। ডিন মহোদয় আমাদেরকে কলকাতার গড়িয়াহাটের একটি মিষ্টির দোকানে নিয়ে গেলেন মিষ্টি খাওয়ানোর জন্য। সেখানে মিষ্টি খেলাম। তারপর পানি খাওয়ার জন্য ছোট্ট একটি গ্লাস দেখতে পেলাম। কৌতুহলবশত ওয়েটারকে জিজ্ঞেস করলাম এত ছোট গ্লাস কেন? উত্তরে বললেন কারো বেশি পানির প্রয়োজন হলে তাঁকে আবার পানি সরবরাহ করা হবে। কিন্তু বড় গ্লাস ব্যবহার করা হলে অনেক সময় অনেকেই অর্ধেক গ্লাস পানি খেয়ে রেখে যায়। ফলে পানির অপচয় হয়। ব্যাপারটি শিক্ষণীয় বলে উল্লেখ করলাম। ভূগর্ভস্থ পানির উপর থেকে চাপ কমাতে পানির অপচয় রোধ করা এবং শহরে জলাধার তৈরির (যেমন পুকুর) উপর বিশেষভাবে দৃষ্টি দিতে হবে। শহর এলাকায় বিশেষ করে ঢাকাতে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের জন্য জলাধারের ব্যবস্থা করতে হবে। এটি যেমন জরুরি ভিত্তিতে অগ্নি নির্বাপন কাজে ব্যবহার করা যাবে তেমনই ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ঠিক রাখতে কিছুটা হলেও সাহায্য করবে।

আমার বন্ধুবর জনাব সাইফুল ইসলাম হীরক Dutch Assisted Water Supply Project-এ ১০ বছর মাগুরা পৌরসভার Water supply management কর্মরত ছিলেন তার কাজ করার অভিজ্ঞতার আলোকে জানতে পেরেছি যে Pipe Water Supply-এর ক্ষেত্রে একজন মানুষের জন্য পানির ব্যাবহার প্রতিদিন সব মিলিয়ে ১১০ লিটার ধরা হয়। আর মফস্বল শহরে ৪৫% Non tariff water এর হিসাব পাওয়া যায়”। United Nations Development Program-Human Development Report 2006-এর মতে বাংলাদেশের একজন মানুষ গড়ে প্রতিদিন ৫০-৬০ লিটার পানি ব্যবহারের সুযোগ পায়। Index of Drinking Water Adequacy (IDWA) Values for Selected Asian Countries এর জরীপে ৬টি নির্বাচিত এশিয়ান দেশের মধ্যে পানীয় পানির পর্যাপ্ততার নির্দেশকের ক্ষেত্রে ক্রমধারায় মালয়েশিয়া ৯২> ভারত ৬০> ইন্দোনেশিয়া ৫৯> শ্রীলঙ্কা ৫১> পাকিস্তান ৩৯> বাংলাদেশ ৩৭। এ থেকে প্রতীয়মান হয় যে পানীয় পানির পর্যাপ্ততা এই পাঁচটি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ একদম তলানিতে (Source: Asian Water Development Outlook 2007 Discussion Paper ADB, 2007; Appendix: The Index of Drinking Water Adequacy)। এখনই যদি আমরা পানির দিকে বিশেষভাবে নজর না দেই তাহলে আমাদেরকে কঠিন সমস্যার মোকাবেলা করতে হবে।

আমাদের দেশে কিভাবে পানি দূষণ হচ্ছে তার একটি সংক্ষিপ্ত চিত্রে তুলে ধরা হলো এখন নদী দূষণরোধে আমাদের করণীয় নিয়ে একটু সংক্ষিপ্ত আলোচনা করা যাক। একটি সাধারণ ধারণা দিয়ে শুরু করা যেতে পারে। সেটি হলো “আমরা প্রত্যেকেই পানি দূষণের বিরুদ্ধে, তারপরও পানি দূষণ হচ্ছে, তাহলে এর পরিত্রাণের উপায় খুঁজতে হবে”। এই ধারণাটিকে গুরুত্ব দিয়ে পানি দূষণরোধে আমাদের দুটি দিক বিবেচনায় নিতে হবে। সেটি হলো দূষণরোধ এবং বর্জ্যপানির যথাযথ পরিশোধন। আমাদের দেশে প্রতিনিয়ত গৃহস্থালি এবং শিল্প-কলকারখানা থেকে নির্গত বর্জ্যপানি দিয়ে ভূপৃষ্ঠের উপরিভাগের পানি দূষিত হচ্ছে। ঢাকা শহরের বর্জ্যপানি শোধনাগার পর্যাপ্ত পরিমানে আছে বলে আমার জানা নেই। আমি জাপানের একটি শহরে উচ্চতর শিক্ষালাভে বেশ কিছুদিন অবস্থান করেছিলাম এবং সেখানকার দুটি বর্জ্যপানি শোধনাগার দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল। ঐ শহরটিতে মোট চারটি বর্জ্যপানি শোধনাগার ছিল। সুতরাং বাংলাদেশের শহরগুলোতে পর্যাপ্ত বর্জ্যপানি শোধনাগারের ব্যবস্থা নিতে হবে। অন্যদিকে শিল্প-কলকারখানা থেকে নির্গত বর্জ্যপানি পরিশোধনের ব্যবস্থাটি বাধ্যতামূলক করতে হবে। পরিশেষে পানি দূষণরোধে চারটি ধাপের কথা উল্লেখ করব। ১ম ধাপঃ জনসাধারণ এবং শিল্প-কলকারখানার সম্মানিত মালিকদের পানি দূষণের প্রভাব এবং ফলাফল সম্বন্ধে ভালোভাবে অবহিত করা। ২য় ধাপঃ সচেতনমূলক প্রোমোশনের দ্বারা প্রিন্টিং এবং ইলেকট্রনিক সংবাদ মাধ্যমের সাহায্যে প্রতিটি মানুষকে পানি দূষণের প্রভাব এবং ফলাফল সম্বন্ধে সচেতন করে তোলা। ৩য় ধাপঃ ১ম ও ২য় ধাপ কার্যকর না হলে আইন প্রণয়নের মাধ্যমে কঠোরভাবে পানি দূষণকারীকে আইনের আওয়াতায় নিয়ে আসা। ৪র্থ ধাপঃ পর্যাপ্ত পরিবেশবান্ধব বর্জ্যপানি শোধনাগার স্থাপন করে গৃহস্থালি এবং শিল্প-কলকারখানার বর্জ্যপানি শোধনের মাধ্যমে পানি দূষণ রোধ করা। এখনই সময়, আসুন বিশ্ব পরিবেশ দিবসে বাস্তুতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে সবুজায়ন, উদ্যান পুনঃনির্মান, শহর সবুজায়নের পাশাপাশি পানি দূষণ রোধে এগিয়ে আসি এবং পানির যথাযথ ব্যবহারে সকলে সচেতন হই।

মানুষকে বুঝতে হবে যে, পরিবেশকে ধ্বংস করে নয়; বরং প্রকৃতি ও পরিবেশের সঙ্গে মিলেমিশে, অনাদিকাল ধরে বিশ্বব্রহ্মা- তার যে সহজাত নিয়মের মধ্য দিয়ে চলমান রয়েছে, তাকে মান্য করেই আমাদেরকে নিরাপদে বেঁচে থাকতে হবে। নইলে বার বার পরিবেশ ও প্রকৃতির প্রতিশোধের মুখোমুখি হতে হবে সমগ্র মানব জাতিকে। করোনা আমাদের তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলো। এখন সমগ্র মানব জাতির একটাই চাওয়া “করোনামুক্ত পৃথিবীতে হাসতে চাই প্রাণ খুলে”। প্রিয় কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের ছাড়পত্র কবিতার চরণ দিয়ে বিশ্ব পরিবেশ দিবসের লেখাটি শেষ করছি।

“এ বিশ্বকে এ শিশুর বাসযোগ্য করে যাব আমি-

নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার”।

  লেখক : অধ্যাপক, উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগ

            ও

            প্রভোস্ট, জগন্নাথ হল

            ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

Share and Spread the Love

0 Comments

Leave a Reply

Avatar placeholder

Your email address will not be published. Required fields are marked *