ই-পেপার

SITE UNDER CONSTRUCTION
বাংলাদেশ পুলিশের মুখপত্র
অব্যাহত প্রকাশনার ৬৩ বছর

ইরানী বিশ্বাস

ভেতরের ক্ষত ঢাকতে শরীরে জড়িয়েছিল দামি শাড়ি। মুখে ভারী মেকাপ করেছে। আই স্যাডো, মাসকারা, ঠোঁটে ডার্ক কালারের লিপিস্টিক যা সাধারণত নাইমার পছন্দ নয়। কিন্তু আজ কেন যেন খুব সাজতে ইচ্ছে করছে। বেছে বেছে ভারী গয়না পরেছে। মানুষ

পৃথিবীতে দুই রকমের। কেউ দুঃখ পেলে অন্যের কাছে দুঃখি প্রকাশ করে। আবার কেউ দুঃখ পেলে অন্যের সামনে নিজেকে সুখী প্রকাশ করে। রাকিবের এই দুঃখের গল্পটা যেন নাইমার কাছে বিজয়ের চিহ্ন। তাই এই বিজয় সে চোখের জলে সেলিব্রেট করেছে। একা কোনো কিছু সেলিব্রেসন করা যায় না। এই আনন্দে কেবল শুভকেই পাশে রাখা শুভকে কল করে আসতে বলা হয়েছে। বাসা থেকে যেতে যেতে মনের কোণে কতো কি যে উঁকি দিতে থাকে। সন্ধ্যার স্নিগ্ধ অন্ধকারে নিজেকে ডুবিয়ে দিয়ে রিকশায় করে যাচ্ছে। শুভর সঙ্গে দেখা করতে সাধারণত গাড়ি নিয়ে যায় না। শুভর খুব ইচ্ছে দামি গাড়িতে এসির ঠান্ডা বাতাসে সুগন্ধী ভেসে বেড়াবে। নাইমার পাশে বসে তার নরম তুলতুলে হাতের পরে হাত রেখে দূর সময়ের স্বপ্ন দেখবে। এমন স্বপ্নের কথা প্রায়ই বলতো শুভ। নাইমা এসব পাত্তাই দেয়নি। সন্ধ্যা রাতের রাস্তায় অনেক মানুষ অনেক ব্যস্ততা। নাইমা ঠিক সময়ে রিকশা থেকে নেমে দ্রুত পায়ে হেঁটে যায় শুভকে লক্ষ্য করে।

নির্ধারিত চেয়ারে বসতে বসতে নাইমা খেয়াল করে, শুভ এক অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার দিকে। মিষ্টি হেসে, নাইমা চোখের ইশারায় জানতে চায়, কি ব্যাপার? প্রতিউত্তরে শুভ জানতে চায়, কি ব্যাপার, আজ এত সুন্দর করে সাজগোজ করেছো? কোনো স্পেশাল কিছু আছে নাকি? বরাবরের মতো শুভ পছন্দের খাবার অর্ডার করেছে। নাইমা হাত গুটিয়ে বসে না থেকে খেতে খেতে জবাব দেয়,

– আছে তো অবশ্যই। আগে খাওয়া শেষ করো তারপর বলছি।

ডা. আফজাল সাহেবের চেম্বার থেকে ফেরার সময় মেহেরীনের মনে অনেক প্রশ্নের জন্ম হয়েছে। মেয়েটি হয়তো কাছাকাছি কোথাও থাকে। এর আগে কখনো দেখেছে বলে মনে করতে পারে না। তারপরও সে মনে করার চেষ্টা করতে থাকে। বাসায় ফিরে মেহেরীন চুপচাপ বসে থাকে নিজের বিছানায়। ভাবতে থাকে, সুমন তার সঙ্গে এতদিন ধোঁকা দিয়েছে? অথচ অন্ধের মতো তাকে বিশ্বাস করেছে। আর সেই সুমন তাকে লুকিয়ে লুকিয়ে এমন একটা কাজ করতে পারলো? বার বার আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখতে থাকে। আর নিজের মনে প্রশ্ন করতে থাকে, সত্যি কি সে দেখতে খারাপ হয়ে গেছে? এরই মধ্যে মেয়েকে খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিয়েছে। তারপর আলমারি থেকে বিয়ের অ্যালবাম বের করে, ডিভিডি বের করে। ছবিগুলো ভালো করে মন দিয়ে দেখে। সত্যি তো সে আর আগের মতো সুন্দর নেই। রিয়া হওয়ার পর ডায়েট কন্ট্রোল করা হয়নি। ওজন বেড়ে গেছে। গাল ফুলে গেছে। ডিভিডি চালিয়ে ভালো করে দেখে নিজেকে। হলুদের সন্ধ্যা থেকে বিবাহোত্তর সব অনুষ্ঠানই মনোযোগ দিয়ে নিজেকে দেখে। না সব জায়গায় নিজের চেহারা মিলিয়ে দেখেছে একটু পরিবর্তন হয়েছে মাত্র। তারপর আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখতে থাকে। চেহারা সত্যি খারাপ হয়েছে। গত দুই দিনের দুশ্চিন্তায় তার চোখের নিচ কালো হয়ে গেছে। মুখটা মলিন দেখাচ্ছে। তাড়াতাড়ি বাথরুমে যায়। ফেস প্যাক মুখে লাগিয়ে মাথায় শ্যাম্পু করে পরিপাটি হয়ে বেরিয়েছে।

অফিস শেষে বাসায় ফিরে দরজায় দাঁড়িয়ে সুমন অবাক। কোনো কথা না বলে মেহেরীন শুধু বলল,

– ড্রেস চেঞ্জ করে নাও। ফ্রেস হয়ে ড্রইং রুমে খাবে এসো।

মনে কৌতূহল জন্ম নিলেও কোনো কথাই বলা হলো না। আর কোনো প্রশ্নও করা হলো না। প্রতিদিনের মতো ড্রেস চেঞ্জ করে ফ্রেস হয়ে ড্রইং রুমে গিয়ে বসেছে সুমন।

মেহেরীন একটি ট্রে হাতে সেখানে আসে। একটি ছোট পিরিজে দত্ত মিষ্টান্ন ভান্ডারের সন্দেশ। সুমন আগে একদিন খেয়ে প্রশংসা করেছিল। তাই পাশের বাসার ভাবির কাছ থেকে চেয়ে এনেছে। টি টেবিলে ট্রে রেখে সোফায় সুমনের গা ঘেঁষে বসে। মেহেরীনের এই আচরণে মোটেই পরিচিত নয় সুমন। তাই একটু অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করে,

– এ সবের মানে কি?

– কি বলছো? আমি তোমার ওয়াইফ। তোমার কাছে বসাটা কি অন্যায়?

– আমি সে কথা বলিনি।

– তাহলে, কি বলছো?

– মাঝ রাতে তোমার এই অদ্ভুত সাজ। আজতো তোমার, আমার, রীয়া কারোরই বার্থডে না। আবার ম্যারেজডেও না। আবার ডিনারের আগেই ডেজার্ট নিয়ে এসেছো। মানে কি?

– মানে কিছুই না। ইচ্ছে হলো সাজতে তাই সেজেছি। কেন তোমার পছন্দ হয়নি বুঝি? তাহলে আর সাজবো না।

– না আমি তা বলছি না। কোনোদিন তো অফিস থেকে ফিরে তোমাকে পরিপাটি দেখি না। সব সময় তো ঘরের ড্রেসই পরে থাকো। মাঝে মাঝে সাজলে মন্দ হয় না। রোজ রোজ একঘেয়েমি ড্রেস-আপ দেখতে ভালো লাগে না। তার চেয়ে এভাবে মাঝে মধ্যে সেজেগুজে সারপ্রাইজও দিতে পারো।

– সত্যি বলছো?

– আরে বাবা, মিথ্যা বলবো কেন?

– এই শোন, একটা সত্যি কথা বলবে?

– কী কথা, বলো?

– আমাকে কি তোমার আগের মতো সুন্দর লাগে?

– কী শুরু করলে বলো তো। যাও খাবার রেডি করো খুব খিদে পেয়েছে।

– ও.. এখন তো এসব কথা বলবেই। আসলে আমাকে তোমার একদমই সহ্য হয় না। আর হবেই বা কি করে, এখন তো চোখে অন্য মানুষ বসে আছে।

সুমন একটু নড়েচড়ে বসে। মেহেরীনের গলায় অভিযোগের সুর। ঘটনা কি হতে পারে। তার মানে এই রাতের বেলা সাজগোজ, এই অসংলগ্ন কথা-বার্তা এ সবই এখন একটা বিন্দুতে মিলিত হয়েছে।

মেহেরীন ওঠে যায়। সুমন মনে করার চেষ্টা করে, কাল রাত থেকেই মেহেরীন কেমন যেন অস্বাভাবিক ছিল। সে কি কোনো কারণে মেহেরীনকে কষ্ট দিয়েছে। এরই মধ্যে কানে ভেসে আসে মেহেরীন ডেকে বলছে,

– টেবিলে খাবার দেওয়া আছে। খেয়ে নিও।

এ-তো মহামুসকিলে পড়া গেল। এবার আরেক ঝামেলাতে পড়তে হলো। এমন তো কখনো করে না। প্রতিদিন অফিস থেকে ফিরে আসার পর দুজনে গল্প করতে করতে ডিনার করে। এমনিতো সারাদিনে তেমন কথা বলার সময় হয় না। তাই রাতে খাবার টেবিলেই সারাদিনের কথা বা পরদিনের প্ল্যান সবই হয়। আজ কি হয়েছে কে জানে। কপালে চিন্তার রেখা নিয়ে ধীর পায়ে হেঁটে যায় বেডরুমের দিকে। গিয়ে দেখে মেয়ের পাশে শুয়ে আছে মেহেরীন। সেখানে গিয়ে কতোক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে। তারপর মেয়ে ওঠে যাওয়ার ভয়ে আস্তে আস্তে ডাকে,

– মেহেরীন তুমি খাবে না?

– না, আমার খিদে নেই। তুমি খেয়ে নাও।

– কি বলছো এসব। তোমাকে ছাড়া আমি কখনো খেয়েছি?

– থাক এসব কথা বলে আর লাভ নেই। তুমি যাও।

– শোন এখানে বসে কথা বলা যাচ্ছে না। মেয়েটা ওঠে যাবে। তুমি আসো আমরা বসে কথা বলি।

মেহেরীনের হাত ধরে টেনে তোলে সুমন। তারপর ডাইনিং রুমে গিয়ে চেয়ারে বসায় মেহেরীনকে। সুমন মুখোমুখি বসে বলে,

– এবার বলো কি হয়েছে? কেন তুমি এমন অদ্ভুত আচরণ করছো?

সুমনের কথা শুনে হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে সুমনকে জড়িয়ে ধরে মেহেরীন। কিছুই বুঝতে পারে না। সান্ত¡নার সুরে সুমন বলে,

– কী হয়েছে আমাকে খুলে বলো। না বললে সমাধান হবে কি করে?

চোখের জল মুছতে মুছতে মেহেরীন বলে,

– আমি কি আগের চেয়ে দেখতে খারাপ হয়ে গেছি? আমাকে কি তোমার আগের মতো আর ভালো লাগে না? এমন কেন করলে তুমি?

– কি বলছো বোকার মতো। আমি কখন তোমাকে বললাম এসব কথা?

– তাহলে এই যে কতোদিন ধরে তুমি মুড অফ থাকো, ঠিক মতো কথা বলো না।

– ওহ এই কথা। দেখো তোমাকে তো আমি বলেছি। অফিসে একটা ঝামেলা হয়েছে। সেটা নিয়ে আমি একটু ডিস্টার্ব আছি।

– তাহলে তোমার মোবাইলে ওই মেয়েটার ছবি? ওটা কে?

– কোন ছবির কথা তুমি বলছো?

– গতকাল রাতে তোমার মোবাইলে একটা মেয়ের ছবি আমি দেখলাম।

সুমন ভীষণ চিন্তায় পড়ে যায়। মনেই করতে পারে না কোন মেয়ের ছবি দেখে মেহেরীন এমন পাগলের মতো অদ্ভুত আচরণ করছে। তারপর বলে, 

– আমার মোবাইলে, মেয়ের ছবি? কি সব বলছো তুমি?

মেহেরীন সুমনের মোবাইল থেকে একটি মেয়ের ছবি বের করে সুমনের সামনে ধরে। সুমন সে ছবি দেখে হো হো করে হাসতে থাকে।

– তুমি এই ছবি দেখে, এত কা- করলে?

– হাসছো তুমি? আমার হাসব্যান্ড অন্য মেয়ের ছবি মোবাইলে নিয়ে ঘুরবে আর আমি তা দেখে ধেই ধেই করে নাচতে থাকবো?

– তোমার নাচা উচিত। একটু ফ্যাটি হয়ে গেছো। তাহলে ফিগারটা সুন্দর থাকবে।

– এখন তো কতোকথাই বলবে। কথা না ঘুরিয়ে, আসল কথাটা বলো। কে এই মেয়েটা?

– এটা একটা ছেলের ছবি।

সুমনের কথা শুনে মেহেরীন আরো রেগে যায়।

– এখনো পাগল হইনি। একটি মেয়ের ছবি দেখিয়ে তুমি বলবে এটা একটা ছেলের ছবি, আর অমনি সেটা মেয়ে থেকে ছেলে হয়ে গেল, তাই তো?

– আমি বলছি তো একটা ছেলের ছবি। আসো তোমার ছবি দিয়ে ছেলের ছবি বানাই।

– থাক তোমাকে আর ছেলে ভুলানো গল্প করতে হবে না। আসল ঘটনা খুলে বলো। তা না হলে আমি কাল মাকে কল করে সব বলবো।

সুমন আবার হাসতে থাকে। মেহেরীন তুমি সত্যি সত্যি পাগল হয়ে গেছো। ডাক্তার দেখাতে হবে। মাথাটা একটু ঠান্ডা করো। তারপর বলে,

– দেখো, তোমাকে আগেই বলেছি একটা মার্ডার কেস নিয়ে ঝামেলায় আছি। সিসিটিভি ফুটেজে সন্দেহজনক একটি ছেলের ছবি দেখা গেছে। ডিটেকটিভ ক্রিয়েটিভ সেলে এই ছবিটাকে বিভিন্ন সেপে আনা হয়েছে। ছেলে, বুড়ো, বুড়ি, যুবতি, মহিলা এসব অ্যাপের মাধ্যমে এখন করা যায়। আমার মোবাইলে যে ছবি দেখেছো ওটা ওই ছেলেটার মেয়ে সাজানো ছবি। এবার মাথায় কিছু ঢুকেছে?

– কিন্তু, আমি ওই ছবির মেয়েটাকে তো দেখেছি।

– বলছো কি তুমি! দেখেছো? কোথায়?

– ওই যে আমার মায়ের বান্ধবী আছে না পপি আন্টি, ওনার হাসব্যান্ড ডা. আবজাল হোসেন। নাম করা সাইক্রিয়েটিক। ওনার চেম্বারে।

– চেম্বারে? কি বলছো তুমি। সত্যি তুমি এই মেয়েটাকে দেখেছো?

– হ্যা। সত্যি বলছি। আমি আঙ্কেলের রুম থেকে বেরিয়ে দেখি ওই মেয়েটি, অন্য রোগীদের সাথে বসে আছে।

উত্তরার মার্ডার কেসের খুনি এখনো ধরা পড়েনি। সময় গড়িয়ে যাচ্ছে। এ বিষয়ে অফিসে আজ সবাই তটস্থ। তার মধ্যে সুমন বলেছে, আমি কিছুদিন ছুটি নিতে চাই। এতে আরো মাথা খারাপ এসপি স্যারের। তখনো টেবিলের ওই পারে এসপি এবং এপারে সুমন চুপচাপ বসে আছে। দুজনেই যেন মনস্তাত্ত্বিক লড়াইয়ে ব্যস্ত আছেন। নাছোড়বান্দা সুমনকে কিছুতেই বোঝানো যাচ্ছে না, এখন সময় ভালো নয়। কারণ এ মুহূর্তে ছুটিতে যাওয়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়। এ রকম চলতে থাকলে প্রশাসনের প্রতি আঙুল উঠবে। তিল তিল করে পুলিশ জনগণের মনে যে আস্থার জায়গা করে নিয়েছে, এখন হয়তো সে আস্থা হারাতে বসবে। মনের মধ্যে অনেক দ্বিধা নিয়ে গম্ভীর মুখে এসপি বললেন,

– আপনার প্রবলেম টা কি ?

– স্যার বাসায় প্রচন্ড প্রবলেম হচ্ছে। স্ত্রী আমাকে ছেড়ে চলে যাবে। স্যার একটু বোঝার চেষ্টা করুন।

সুমনের কথা শুনে রাশভারি মানুষটি হো হো করে হেসে উঠলেন। সুমন অনেকটা অবাক হয়ে তাকালেন। একজনের জীবন যায় যায়, আরেকজন হেসে লুটোপুটি খাচ্ছে। এ জন্যই বলে, কারো পৌষ মাস, কারো সর্বনাশ। সুমন আবারও নিচু গলায় বলেন,

– স্যার, স্যার একটু বোঝার চেষ্টা করুন। আমার স্ত্রীর মাথায় কিভাবে যেন ঢুকেছে, আমার অন্য কারো সাথে রিলেশন। তাই ওকে একটু সময় দিতে চাই।

– তাহলে এখন কি করতে হবে? এখন তো দেখছি আপনাদের পারসোনাল প্রবলেম মিটাতে পারিবারিক আদালত খুলতে হবে। জনগণের ঝামেলা মিটানোর চেয়ে আপনাদের ঝামেলা মেটানোই এখন প্রধান কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

– প্লিজ স্যার। পুলিশ হলেও আমরাও তো মানুষ স্যার। আমাদেরও সংসার আছে। তাই তাদের ভালো মন্দ দেখার দায়িত্বও ..

– এই এক প্রবলেম বুঝলেন। প্রফেশনাল মানুুষদের পাশের মানুষগুলো যদি এতটা বোকা হয়। তাহলে তাদের পক্ষে প্রমোশন পাওয়া তো দূরের কথা, চাকরি টিকিয়ে রাখাটাও কষ্টকর।

– স্যার প্লিজ..

– ডিজগাস্টিং

– কিছু বললেন স্যার?

– না কিছু না। ঠিক আছে। আমি ব্যবস্থা করছি। তবে অনলি থ্রি ডে’স। ঠিক আছে?

– জ্বী স্যার। থ্যাংক ইউ স্যার।

সুমন ওঠে খুশি মনে দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে অবাক। এরা সবাই এখানে কি করছে, এমন প্রশ্ন ভাবতে ভাবতে একটু সামনে আসতেই তাকে ঘিরে ধরেছে সবাই। সুমন বুঝতে পারছে না, রুমের বাইরে এরা সবাই দাঁড়িয়ে রয়েছে কেন। সকলেই যেন উন্মুখ হয়ে আছে কিছু শোনার জন্য। সুমনকে দেখেই আসামির মতো ঘিরে ধরলো অন্য সব পুলিশ বন্ধুরা। তাদের সকলের চোখেই জিজ্ঞাসা

– কি বললেন স্যার?

– তেমন কিছু না। আমাকে ৩ দিনের ছুটি দিয়েছেন।

– ছুটি? কেন?

– বউকে নিয়ে  কক্সবাজার যেতে বলেছেন।

সুমনের কথা শুনে সকলেই হেসে উঠলো। তারপর সত্যিটা যাচাই করার জন্য বেশ জোরাজুরি করতে লাগলো। কেউ বলল,

– হানিমুন বাকি ছিল বুঝি?

– আরে না।

– তাহলে, নতুন করে প্রেম ঝালাই করবে বুঝি?

এমন হাজারো রসিকতা শুনতে শুনতে ক্লান্ত হয়ে বাসায় ফিরে যায় সুমন।

অভিমানের সকল দরজা ভেঙে মুখোমুখি হয় রাকিব-নাইমা। ঠিক তখন শুভ ফোন করে। একটু যেন দ্বিধায় পড়ে যায় নাইমা। একদিকে রাকিব অন্যদিকে শুভ। কোন দিকে যাবে। তারপরও নাইমা কল রিসিভ করে,

– হ্যালো

– তুমি জরুরি আমার সঙ্গে দেখা করতে পারবে?

– কেন?

– কেন মানে? আগে তো কখনো প্রশ্ন করোনি?

– শুভ তোমাকে একটা কথা বলা হয়নি। রাকিব আমাকে সরি বলেছে।

– সেতো খুব ভালো কথা।

– তবে সে উপলক্ষ্যে তুমি অন্তত একবার আমার সঙ্গে দেখা করো।

– দেখো রাকিব এখনো পুরোপুরি সুস্থ হয়নি। পরে দেখা করি?

– প্লিজ একবার দেখা করো। মাত্র এক ঘণ্টার জন্য।

– ওকে।

পরদিন রেডি হয়ে দেখা করতে যায় নাইমা। আগে থেকে সেখানে উপস্থিত রয়েছে শুভ। সেই একই ভাবে নাইমার পছন্দের খাবার অর্ডার দিয়েছে। শুভ লক্ষ্য করছে নাইমার মধ্যে আগের মতো সেই উচ্ছলতা নেই। কেমন যেন মনমরা। নাইমার এই অবস্থা শুভকে একটু অসহায় করে তুলছে। যেন নিজের অবস্থান দুলে উঠেছে। নাইমা হঠাৎ লক্ষ্য করে শুভ তার দিকে তাকিয়ে আছে। মনের মধ্যে অজানা একটা ভয় কাজ করতে থাকে নাইমার। রাকিব তার প্রথম ভালোবাসা। হয়তো মনের অজান্তে ভুল করেছে। এখন তো সে তার কাছেই ফিরে এসেছে। তাহলে শুভকে এখন তার জীবনে প্রয়োজন নেই।

প্রকৃতি সব সময় তার নিয়মানুসারে চলে। তাই শুভ তার প্রয়োজনের কথা অকপটে প্রকাশ করে নাইমার কাছে।

– আচ্ছা, তোমার কাছে কিছু টাকা হবে?

– শুভ, তুমি তো জানো রাকিব সব হারিয়েছে। এখন আমাদের কাছে কোনো টাকা নেই।

– কি বলছ এসব? টাকা নেই মানে? আমার তো টাকা লাগবে।

– দেখো, যতদিন পেরেছি ততদিন দিয়েছি। তাছাড়া আমার মনে হয়, আমাদের সম্পর্কটা আর না রাখাই ভালো।

– তাই বুঝি? তোমার প্রয়োজন বুঝি ফুরিয়ে গেছে? তবে আমার প্রয়োজন যে এখনো ফুরায়নি।

– বিশ্বাস করো, আমার কাছে কোনো টাকা নেই।

– তোমার কাছে নেই, কোনো সমস্যা নেই। তবে তুমি রাজি হলে টাকা আমি পেয়ে যাবো।

– মানে?

– মানে হলো, আমার পরিচিত এক বড় বিজনেস ম্যান আছে, তোমাকে তার পছন্দ। শুধু একটি রাত, একটা ফাইভ স্টার হোটেলে কাটাবে তার সাথে। ব্যাস।

– শুভ! এ কথা বলতে তোমার লজ্জা হলো না?

– লজ্জা? হা হা হা, লজ্জা তো তোমার হবে। যদি না তুমি আমার কথায় রাজি হও।

– কি বলছো, তোমার কি মাথা খারাপ হয়ে গেছে?

– আমার কাছে তোমার একটা ভিডিও ক্লিপস আছে।

– ভিডিও? কিসের ভিডিও?

– তোমার সাথে আমার রোমান্টিক ভিডিও। যে সময়টা তুমি সবচেয়ে সুখি হয়েছিলে, তোমার বেড রুমে।

কয়েক মিনিটের জন্য নাইমা স্তব্ধ হয়ে যায়। আর যেন কোনো ভাষা খুঁজে পায় না।

তিনদিনের ছুটি পেয়ে রাতে লম্বা একটা ঘুম দিয়েছে সুমন। সকালে অফিসে যাবার তাড়া নেই। তবে মেহেরীন যথাসময়ে ওঠে সুমনের অফিসে যাবার জন্য যা যা দরকার, তা সবই প্রস্তুত করে। এদিকে সুমনের ঘুম ভাঙার কোনো লক্ষণই দেখতে পাচ্ছে না। মনে মনে একটু অবাক হয়। তারপর নিজেই গিয়ে সুমনকে ঘুম ভাঙানোর চেষ্টা করে। ঘুম ভেঙে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখে সকাল আটটা বাজে। অনেক দিন এত ফ্রেশ ঘুম হয় না। আজ যেন মাথাটা হালকা লাগছে। চটপট ওঠে ঝটপট রেডি হয়ে নেয় সুমন। তারপর একটু বেরুচ্ছি বলে বাসা থেকে বের হয়।

ডা. আবজাল হোসেনের কাছ থেকে রোগীর নাম হিসাবে জানা গেলো মেয়েটির নাম। ডাক্তারের রুলস ভেঙে তদন্তের স্বার্থে রোগীর নাম, ঠিকানা এমনকি মোবাইল নম্বর দিয়েছে। তবে শর্ত হিসাবে বলা হয়েছে, এসব যেন কোনোভাবেই প্রকাশ করা না হয়। ডা. আবজালকে আশ^স্থ করে নিজের মোবাইলে নাম্বারটি সেভ করে। তারপর যথাযথ নাম্বারে কল দিয়ে অপেক্ষা করে সুমন। খানিক বাদে অন্য প্রান্তে একটি মেয়ের কন্ঠ ভেসে আসে। শুরু হয় কথার আদান-প্রদান। রং নাম্বার থেকে একেবারে পাকাপোক্ত সম্পর্কে নিয়ে আসে মাত্র তিন দিনে। অফিস থেকে নেওয়া তিন দিনের ছুটি কাজে লাগিয়ে অবশেষে সিদ্ধান্ত হলো দেখা করবে। সুমন ঢাকার বাইরে বাস করে এমন পরিচয়ে আজ ওরা মুখোমুখি হবে। ধানমন্ডি নয় গুলশান নয় একেবারে পল্টনের একটি রেস্টুরেন্টে ওরা দেখা করবে।

নির্ধারিত সময়ের কিছু আগে এসে অপেক্ষা করছে সুমন। এই মাত্র একজন ভদ্রমহিলা ঢুকলেন। দেখতে আহামরি কোনো কিছুই নেই। তবে বাঙালি অবয়ব মনে হয়। সুমন মনে মনে বলতে থাকে, এই রকম একটি সাধারণ মহিলা যার চেহারায় সম্পূর্ণ বাঙালিত্বের ছোঁয়া আছে, তিনি কি করে মানুষ খুন করতে পারেন। এটা একদমই অসম্ভব। তবে পৃথিবীতে মানুষ হচ্ছে সবচেয়ে আশ্চর্য জীব। যে হাতে বিন্দু বিন্দু করে সৃষ্টি করে। সেই হাতেই এক নিমিষে ধ্বংস করে। যাই হোক, অনেক কিছু ভাবতে ভাবতে গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে আসে মহিলার টেবিলের কাছে। নিজের পরিচয় দেওয়ার আগে বেশ কয়েকবার টেবিলের সামনে সুইমিং পুলের পাশ ধরে পায়চারি করে। যদিও পর্যাপ্ত আলো সেখানে নেই, তবুও মনে মনে ভাবে তাকে যদি আগে থেকে চিনে থাকে, তাহলে নিশ্চয়ই ডেকে কথা বলবে। কিন্তু না তেমন কোনো কিছুই না। তারপর মহিলার অপজিট এঙ্গেলে দাঁড়িয়ে মোবাইলে কল করে শিওর হয়ে নেয়। সুমনের অনুমান একদম ঠিক আছে। এই, সেই মহিলা। নিজের উপস্থিত জানান দিয়ে টেবিলে এসে বসে। নিজের পরিচয় গোপন করে অন্য একটি পরিচয় দিয়ে সুমন কথা শুরু করে।

রাতে কিছুতেই ঘুম আসছে না। এপাশ ওপাশ করতে থাকা সুমনের পাশে মেহেরীন টের পেয়ে জিজ্ঞেস করে সুমনকে,

– এখনো জেগে আছে কেন?

– ঘুম আসছে না।

– কি হলো আবার, শরীর খারাপ করেনি তো?

– না না। আসলে গত রাতে একটু বেশি ঘুমিয়েছি। তাই আজ আর ঘুম আসছে না। তুমি ঘুমাও। একসময় ঠিক ঘুম আসবে।

(চলবে)

লেখক : সাংবাদিক, সাহিত্যিক,

নাট্যকার ও নাট্যপরিচালক

ভালো লাগলে শেয়ার করে দিন :)

0 Comments

Leave a Reply

Avatar placeholder

Your email address will not be published. Required fields are marked *