ই-পেপার

SITE UNDER CONSTRUCTION
বাংলাদেশ পুলিশের মুখপত্র
অব্যাহত প্রকাশনার ৬৩ বছর

ইরানী বিশ্বাস

মেহেরিন ঘুমিয়ে পড়ে। সুমন আস্তে উঠে ডাইনিং থেকে পানি খেয়ে ড্রইং রুমে সোফায় গিয়ে বসে। মেয়েটির সঙ্গে দেখা হওয়া, তার সঙ্গে কথা বলা কোনো কিছুই যেন চোখ থেকে সরিয়ে রাখতে পারছে না। মনের মধ্যে দ্বন্দ্ব তৈরি হচ্ছে। এই মেয়েটি,  একটা ছেলেকে খুন করেছে? কিভাবে সম্ভব? মেয়েটির চোখে এত মায়া, মুখে যেন এক চিরন্তন বাঙালির পরিচিত নারী মূর্তি। হয়তো তার ভুল হচ্ছে। আচ্ছা শুধু ফেস অ্যাপসের সাথে তার চেহারার মিল খুঁজে পাওয়া গেছে বলেই কি সে খুনি হতে পারে? নানান জটিল প্রশ্ন এখন সুমনের মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। কথার ছলে শুভ নামের ছেলেটির সাথে তার পরিচয়ের যোগসূত্র খোঁজার চেষ্টা করেছে। একবার মিথ্যা ফোনে শুভ নামের এক বেস্ট ফ্রেন্ডের সাথে কথা বলেছে। তখন অবশ্য সুমন মেয়েটির চেহারার পরিবর্তন লক্ষ্য করেছে। চোখ ছলছল করে উঠেছিল। দেয়াল ঘড়িটা জানিয়ে দিচ্ছে রাত ৩ টা পেরিয়ে যাচ্ছে। কাল তার ছুটির শেষ দিন। যে করেই হোক এই কেসের ইতি টানতে হবে। কিন্তু কোথায় যেন দ্বিধা। সমাধানের এত কাছে এসেও ইচ্ছে হচ্ছে না, মেয়েটিকে এরেস্ট করতে। সত্যি তো উপযুক্ত কোনো প্রমান নেই তার হাতে। তবে সন্দেহের তালিকা থেকে একেবারে বাদ দেওয়াও যাবে না। কি করা যায় ভাবতে ভাবতে কখন যেন সোফার ওপর ঘুমিয়ে পড়ে।

অফিসে ঘটনাটি গোপন রেখে শুধু বিশ্বস্ত অফিসারকে সব জানিয়ে নিজে রেডি হয়ে নেয়। মেহেরিন বেশ আশ্চর্য হয়। বলা নেই কওয়া নেই দুম করে অফিসে যাওয়া বন্ধ ! মনের মধ্যে থেকে সন্দেহ যেন কিছুতেই সরাতে পারছে না। একটা যায় তো আরেকটা এসে ভিড় জমায়। কিছুদিন আগে দেখেছে বাসায় সময় দেয় না। এখন দেখছে অফিসেই সময় দেয় না। তাছাড়া গতকালও ঠিক সেজেগুজে বাসার বাইরে চলে গেল। আজ  আবার অন্য ড্রেস পরে রেডি হচ্ছে। মাথায় জেল, পারফিউমের গন্ধ চারিদিকে ম ম করছে। বিয়ের প্রথম ঈদে মেহেরিন একটা ব্রেসলেট গিফট করেছিল। সেটাও খুঁজে নিয়ে হাতে পরেছে। আজকের এই পরিবর্তন সত্যি অবাক হয়ে দেখছে মেহেরিন। কৌতূহল মিশানো সন্দেহের সুরে জিজ্ঞেস করে মেহেরিন,

– কোথায় যাচ্ছো তুমি?

– একজনের সঙ্গে দেখা করতে।

– কে সেই স্পেশাল মানুষ, যার জন্য এত ঘটা করে নিজেকে তৈরি করছো?

– অবশ্যই সে স্পেশাল।

– সে তো তোমার ভাব-সাব দেখেই বুঝতে পেরেছি।

– সত্যি তুমি সব বোঝ। থ্যাংকস

অনেক দিন পর মেহেরিনের কপালে একটা চুমু আর মেয়েকে আদর করে বেরিয়ে যায়। মেহেরিন একদিকে খুশি আবার অন্যদিকে চিন্তার ঝাপি খুলে বসে।

আজ নতুন একটা রেস্টুরেন্টে বসেছে। যেহেতু সুমন তার পরিচয় গোপন করেছে। এবং সে বলেছে শুধু তার সাথে দেখা করার জন্য ঢাকার বাইরে থেকে সুমন এসেছে। আজ সে ফিরে যাবে তাই আবার দেখা করতে এসেছে। মেয়েটি নীল রঙের একটা শাড়ি পরেছে। ভীষণ স্মার্ট লাগছে। মন খারাপ করে মেয়েটির সামনে এসে বসেছে সুমন। মেয়েটি কারণ জিজ্ঞেস করতেই সে বলতে লাগলো,

– আমার দূর সম্পর্কের এক চাচাতো ভাতিজাকে পুলিশ ধরে নিয়ে গেছে।

– কেন?

– কোনো এক পিৎজা ডেলিভারী ম্যান শুভকে নাকি সে খুন করেছে।

– শুভ!

– আপনি চেনেন তাকে?

– আমি ! না আমি কি করে চিনবো?

– কেন আপনি তো কাল বললেন, পিৎজা খেতে আপনি খুব ভালোবাসতেন। এখন আর পিৎজা খান না।

– হু খেতাম। এখন আর খাওয়া হয় না।

– আচ্ছা ওই শুভ কি আপনাকেও পিৎজা দিতে আসতো?

– কেন বলেন তো?

– না মানে, আমার ওই ভাতিজার নাম নাইম। তার সাথে ওই পিৎজাওয়ালার কি সম্পর্ক ছিল আর কেনই বা সে মার্ডার করবে। তাই জানার ইচ্ছা ছিল।

– কি নাম বললেন?

– নাইম।

– নাইম ! আচ্ছা তার ফোন নাম্বারও কি মিলে গিয়েছিল? আর শুভ’র ফোন নাম্বার?

– কি হলো, আপনি এত ঘেমে যাচ্ছেন কেন? শরীর খারাপ করছে?

টেবিলে থাকা টিস্যু এগিয়ে দেয় মেয়েটিকে। তারপর গ্লাসে পানি ঢেলে মেয়েটির হাতে তুলে দেয় সুমন। মেয়েটি কি যেন মনে করার চেষ্টা করছে। তারপর ভয়ে কুকড়ে উঠছে। হয়তো অতীতের কোনো বিভৎস ঘটনা তার মনে পড়ে গেছে। শান্ত গলায় সুমন আবার জিজ্ঞেস করে,

– আপনি শুভকে দেখেছেন কখনো?

– না আমি দেখিনি। আর দেখলেই বা কি? আপনার কোনো লাভ হবে না।

– লাভ লস বুঝি না। আপনি যদি পুলিশকে একটু বলতেন, শুভ আসলে খারাপ একটা ছেলে ছিল। ও ব্লাক মেইল করতো সবাইকে।

মেয়েটি পাথরের দৃষ্টি নিয়ে সুমনের দিকে তাকায়। তারপর শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করে,

– ব্ল্যাক মেইল ! আপনি জানলেন কি করে?

– আমি কখন বললাম, আমি জানি। আমি তো আন্দাজ করে বললাম। মানে হলো, ওরা তো আসলে বড়লোক। তাই হয়তো টাকার জন্য ব্ল্যাক মেইল করতো অনেক দিন ধরে। তাই কথা কাটাকাটির এক পর্যায়ে ছুরি দিয়ে খুন করতে পারে।

– একদম ঠিক। এসব ছেলেদের মৃত্যু এভাবেই হয়।

– তাহলে আপনি কি যাবেন? একটু পুলিশের কাছে বলবেন শুভ খুব খারাপ একটা ছেলে।

– আ-আমি কেন যাবো। আরো তো কতো মানুষকে সে পিৎজা দিতো।

– আসলে আমি তো অন্য সবাইকে চিনি না। তাই আপনি যদি একটু হেল্প করতেন।

– কেন আমাকে বিরক্ত করছেন? প্লিজ স্টপ দিস।

– কি হলো, আপনি এভাবে উত্তেজিত হচ্ছেন কেন?

– আপনাকে বলেছি না, এ বিষয়ে আর একটা কথাও না।

– দেখুন আমি বুঝতে পেরেছি আপনার খারাপ লেগেছে। আপনার হয়তো তার লাশের বীভৎস ছবি মনে পড়ে যাচ্ছে।

– হ্যাঁ হ্যাঁ হ্যাঁ। এটাই সত্যি। আমি আর নিতে পারছি না। প্লিজ আমাকে মুক্তি দিন এই জঘন্য স্মৃতির কারাগার থেকে।

সুমনের হাত নিজের দুহাতে চেপে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়ে মেয়েটি। সুমন বুঝতে পারে নিজের অজান্তে এসব করছে। সময়টা লুফে নিতে একটুও ভুল করেনি সুমন। পরম ভালোবাসার ছোঁয়ায় দুহাতে মেয়েটির মুখ দুহাতে আটকে বলে,

– আমাকে আপনি বন্ধু ভাবতে পারেন। আপনার মনে যা কষ্ট আছে আমাকে খুলে বলতে পারেন। আমি আপনার সব কথা শুনবো।

দুপুরের খাওয়া শেষে মেয়ের পাশে এসে শুয়েছে। কখন যে দুচোখের পাতা জুড়ে এসেছে বুঝতেই পারেনি মেহেরিন। তবে বালিশের পাশে মোবাইলের ভাইব্রেট বুঝতে পরে ঘুম জড়ানো চোখে রিসিভ করে। ও পাশ থেকে মামাতো বোন দোলা ফোন করেছে,

– আপু তুমি কোথায়?

– বাসায়, কেন রে?

– সুমন ভাইয়া কোথায়?

– একটু বেরিয়েছে।

– অফিসে যায়নি?

– না, কয়েকদিন যাচ্ছে না। কি একটা জরুরি কাজ করছে তাই..

– হু বুঝতে পেরেছি, রেস্টুরেন্টে জরুরি কাজ করছে।

– কি বলছিস তুই। সুমন রেস্টুরেন্টে !

– হু। তবে সঙ্গে দেখলাম একটা সুন্দরী মেয়ে। নীল শাড়ি পরে সেজেগুজে সুমন ভাইয়ের হাত ধরে.. কি যাচ্ছেতাই অবস্থা।

– দোলা, কি বলছিস এসব?

– কি বলছি মানে? আমি আর আমার বান্ধবীরা মিলে গিয়েছিলাম ওই রেস্টুরেন্টে। এসব দেখে আর সেখানে বসি নাই। বেরিয়ে চলে এসেছি। বিশ্বাস না হয় ফোন দিয়ে দেখো।

মোবাইলের লাইন কেটে দিয়ে রাগে ক্ষোভে কাঁপতে থাকে মেহেরিন। এতদিনের সন্দেহ আজ তাহলে সত্যি হলো। ওসব জরুরী কাজ শুধু মাত্র বাহানা। আসলে ওই মেয়েটার সাথে..। আর ভাবতে পারছে না মেহেরিন। কষ্টে বুক ফেটে যাচ্ছে। বাথরুমে গিয়ে কল ছেড়ে দিয়ে কাঁদতে লাগলো। কারণ রুমে যদি কান্নাকাটি করে তাহলে ছোট রিয়া জেগে যাবে। মন খুলে কিছুক্ষণ কান্না করার পর একটু হালকা লাগছে নিজেকে। নিজেকে বুঝিয়ে শান্ত করে। তারপর সিদ্ধান্ত নেয় সুমনকে কল করে সত্যিটা জানা যাবে।

অনেকক্ষণ ধরে রিং হয়ে যাচ্ছে সুমন কিছুতেই রিসিভ করছে না। এতে আরো সন্দেহ বেড়ে যেতে লাগলো মেহেরিনের। এরপর আরো কয়েকবার কল করেছে। কিন্তু কোনো বারেই কল রিসিভ করে নাই। অনেকক্ষন পর একটা ম্যাসেজ সেন্ড করেছে, ‘জরুরি কাজে ব্যস্ত আছি, পরে কথা বলছি’। ম্যাসেজ দেখে মেহেরিন আরো ভেঙে পড়লো। মনে মনে ভাবতে লাগলো এখন তার  কি করা উচিত। দোলার কথা তাহলে সত্যি। আর এ ঘটনা তো একদিনে হয়নি। অনেক দিন ধরে ঘটেছে। তার মানে তার পাশে ঘুমিয়ে অন্য মেয়ের চিন্তা করে রাত কাটিয়েছে! মনে মনে কঠিন হয়ে ওঠে মেহেরিন। এত ভালো সম্পর্ক, কখনো মেহেরিন তার কাছে অন্যায় আবদার করেনি। পুলিশে চাকরি, পরিবারে সময় দিতে পারেনি। তাতেও কোনদিন আক্ষেপ করেনি। বাপের বাড়ির অনেক পারিবারিক অনুষ্ঠানে সে একা হাসিমুখে আনন্দ করেছে। অনেকে উপহাস করে কতো কথা বলেছে, সব সহ্য করেছে মেহেরিন। সেই সুমন আজ অন্য মেয়ের হাত ধরে রেস্টুরেন্টে যায়। দোলা না হয়ে যদি মেহেরিনের বাবা-মা বা বড়দের কারো সামনে পড়তো ? তাহলে কি তারা সুমনকে ছেড়ে দিতো? আর না, অনেক সহ্য করেছি’ এমন কঠিন মনোভাব নিয়ে চোখ মুছে ওঠে দাঁড়ায়।

পুলিশের গাড়ি এসে থানার ভেতর থামে। সকলের চোখ গাড়ির দিকে। সকলেই কানাঘুষা করছে কোন কেসের আসামি ধরা হয়েছে? কেউ বলতে পারছে না। কয়েকজন মহিলা পুলিশ একটি সুন্দর সজ্জিত মেয়েকে হাতকড়া পরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে থানার দিকে। থানার সকলেরই চোখে কৌতূহল। এত সুন্দর মেয়েটি আসামি! ভিড় যেন বেড়েই গেল। যথারীতি সুমনের রুমে আনা হয়েছে। ভিড় ঠেকাতে কঠোর নিরপত্তা দেওয়া হয়েছে। একটু পর খবর এলো মেয়েটিকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে, এসপি স্যার ডাকছেন।

সকলেই মনোযোগ দিয়ে শুনছে। মেয়েটির চোখ-মুখ ফ্যাকাশে। বার বার শুধু বলছে,

– দেখুন আমি পরিস্থিতির শিকার। এছাড়া আমার কোনো উপায় ছিল না।

এসপি স্যার শান্ত গলায় আবার বললেন,

– কেন খুন করলেন? কি এমন ঘটেছিল যে ছেলেটাকে আপনি খুন করলেন? আপনাকে দেখে সত্যি মানুষের খুনি সম্পর্কে ধারণাই পাল্টে যাবে।

মেয়েটি কোনো কথা বলে না। ধীরে ধীরে শান্ত হয়ে যায়। বারবার সুমনের দিকে তাকায়। হয়তো ভাবছে তার চারপাশে সকল পুরুষ ছলনাময়। একজনের পর একজনকে সে বিশ্বাস করে ঠকেছে। তারপর শান্ত গলায় বলতে শুরু করে,

– সেদিন রেস্টুরেন্ট থেকে ফেরার পথে বার বার শুধু শুভ’র নোংরা কথাগুলো মনে হচ্ছিল। কি করে সে এমন কথা বলতে পারলো। বাসায় ফিরে আমি ফ্রেশ হয়ে রাকিবের সামনে গিয়ে বসি। আমি আবার মনস্থির করলাম যদি সম্ভব হয় তাহলে আবার নতুন করে শুরু করবো। এরই মধ্যে আমার মোবাইলে কল আসে। তাকিয়ে দেখি শুভ কল করেছে। রাকিবকে আড়াল করতেই নিজের রুমে গেলাম। শুভ বার বার আমাকে ভয় দেখাতে লাগলো, আমার নোংরা ভিডিও সে ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেবে। অথবা কারো সঙ্গে রাত কাটিয়ে তাকে টাকা পাইয়ে দিতে হবে। রাগে, ক্ষোভে মোবাইল কেটে দিয়ে কিছুক্ষণ বিছানায় বসে রইলাম। কোনো সিদ্ধান্তে আসতে পারলাম না। তারপর কয়েক ঘণ্টা পর নিজেই শুভকে কল করলাম আর বললাম, কাল তোমার সাথে দেখা করতে চাই। সঙ্গে টাকা নিয়ে আসবো।

কেউ কোনো কথা বলছে না। একজন শুধু স্বীকারোক্তি খাতায় লিখে যাচ্ছেন। পিন পতন নীরবতা ভেঙে এসপি স্যার জিজ্ঞেস করলেন,

– সবই তো বুঝলাম। তবে খুন কেন করতে হলো?

– সে কথায় আসছি স্যার। মানুষের জীবনে দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আত্মসম্মান ও অর্থ-সম্পদ। আমার দুটি বিষয় ইতোমধ্যে চলে গিয়েছে। আত্মসম্মান নিয়ে খেলা করছে শুভ। আর অর্থ-সম্পদ হারিয়েছে আমার স্বামী রাকিব। চাইলে জীবনে আবার হয়তো অর্থ-সম্পদ ফিরিয়ে আনা সম্ভব। তবে শুভ আমাকে আত্মসম্মান নিয়ে হুমকি দিয়েছিল। আমি চিন্তা করেছিলাম, যদি সে আমার ভিডিও ইন্টারনেটে শেয়ার করে দেয়, তাহলে আমার বেঁচে থাকার কোনো মানে হয় না।  তাই শুভকে আমি নিজেই কল করলাম। আর বললাম, আমি তোমার সঙ্গে দেখা করবো। শুভ খুশি হলো। তারপর আমার প্ল্যান অনুযায়ী হোটেল বুক করেছিল। আর আমি তাকে বললাম, আমার মোবাইল সঙ্গে নেওয়া সম্ভব না। কারণ রাকিব আমার মোবাইলে কল করতে পারে। ভুল করে বাসায় ফেলে আসার নাটক করবো। তাই আসার সময় ২/৩ টা কল করেছি রাস্তায় মোবাইলের দোকান থেকে। এরপর যথাসময়ে বোরখা খুলে ব্যাগে ঢুকিয়েছি। আর নাইমা থেকে নাঈম সেজে হোটেলে প্রবেশ করেছি। রুমে ঢুকে আমি শুভকে বললাম, আমি আসলে বুঝতে পারিনি তাই ভুল করেছি। তুমি আমাকে জীবনে আসল সুখ দিয়েছো। তোমাকে ভুলে থাকা আমার পক্ষে সম্ভব না। তাই আজ আমরা মন ভরে এনজয় করবো। শুভ আমাকে বিশ্বাস করেছিল। তাই তাকে বললাম আমি আজ যা যা করবো তুমি শুধু দেখবে। কোনো কথা বলবে না। সে তাতেই রাজি হয়ে গেল। আমি তাকে  আমার ওড়না দিয়ে চোখ বেঁধে দিলাম। তারপর মিষ্টি করে কানের কাছে গিয়ে কয়েকটি কথা বললাম। শুভ আনন্দে আত্মহারা হয়ে গেল। আমি কস্টেপ দিয়ে মুখ আটকে দিলাম। ও বাধা দিলো না। এরপর আমার ব্যাগে করে আনা ছুরি দিয়ে ওর পেটে ঢুকিয়ে দিলাম। কয়েক মুহূর্তে সে নিস্তেজ হয়ে পড়লো। কিন্তু আমাকে অপেক্ষা করতে হলো ভোরের আজান দেওয়া পর্যন্ত।

ভয়ে ভয়ে সুমন বলে উঠলো, আমার নাম্বার পেলেন কি করে?

– আমি কি করে পাবো, আপনি তো ফোন করেছিলেন আমাকে।

এসপি স্যার সুমনের দিকে তাকিয়ে কিছু ভাবতে থাকেন। সুমন ভয় পেয়ে যায়। কি জানি কোন কথায় আবার সে এর মধ্যে ইনভল্ব হয়ে পড়ে কে জানে। তাই ভয় জাড়ানো কন্ঠে সুমন বলেন,

– আমি কল করেছিলাম? কি বলছেন এসব। আমি তো ডা. আবজাল সাহেবের কাছ থেকে আপনার নম্বর পেলাম মাত্র ৩ দিন আগে।

– আমি আগেই বলেছিলাম, আপনি এই ঘটনার সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন। তা না হলে খুন করার সাথে সাথে আপনার কথা তার মাথায় এলো কি করে?

– স্যার আপনি কি বলছেন? আমি তার নাম্বার না নিলে থানায় ধরে আনতাম কি করে? এই যে আসামি এখানে এসেছে, এটা তো আমি তাকে ধরেছি স্যার।

– ও আচ্ছা। তবে কেউ তো এ কথা এখনো আমাকে বলেনি। সে যাই হোক, থানার ওসি’র ফোন নাম্বার কোথায় পেলেন?

নাইমা কি যেন ভাবছিলেন। চোখের সামনে হয়তো সেই রাতের ঘটনা এসে ভিড় জমিয়েছে। তারপর আবার বলতে শুরু করেন,

– আমার কাছে কোনো মোবাইল ছিল না। সুমনের মোবাইল নিয়ে ডায়েল ঘাঁটাঘাঁটি করি। টোটাল নাম্বার লিস্ট দেখতে থাকি। হঠাৎ চোখে পড়ে ওসি পল্টন থানা। তখন আমি এই নাম্বারে ডায়েল করি। আর ওসিকে এখানে আসতে বলি। তারপর আরো কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর  দারোয়ান নামাজ পড়তে মসজিদে যাবার সময় গেট খুলেছিল। তখন আমি বেরিয়ে যাই। রাস্তায় যেতে যেতে অবশ্য একটা সিএনজি পেয়ে যাই। তাতে ওঠে সোজা বাসার একটু আগেই নেমে পড়ি। সেখানে গিয়ে বোরখা পরে বাসায় ঢুকি।

মনোযোগ দিয়ে এতক্ষণ এসপি স্যার সব কথা শুনে বললেন, কেস ফাইল করেন।

সব কাজ শেষ করে বাসায় যেতে রাত অনেক হয়ে গেল। দরজা দিয়ে ঢুকতেই সুমন রাগ-অভিমানের গন্ধ টের পেল। হঠাৎ এই রাগের কারণ বুঝতে পারছিল না। গায়ের পোশাক বদলে ফ্রেশ হয়ে ড্রইং রুমে সোফায় গিয়ে বসেছে। রিয়া ঘুমিয়ে পড়েছে। তাই তাকে আর আদর করা হয়নি। মেহেরিনকে ডেকে বলল,

– একটু এদিকে আসবে?

– কেন?

– আসোই না, একটু দরকার আছে।

– টেবিলে খাবার দেওয়া আছে, খেয়ে নাও। আমি শুয়ে পড়েছি।

– আজ ভাত খাবো না।

– তাতো খাবেই না। প্রেম করলে মানুষ খাওয়া-নাওয়া ভুলে যায়।

– এটা সত্যি বলেছো। আজ একটু প্রেম করবো তোমার সাথে। তাই ভাবছি আজ খাবো না।

– ঢং করো না তো। অন্যায় করে বাড়ি ফিরে আমাকে আর ন্যাকামো দেখাতে হবে না।

রুমে গিয়ে একরকম জোর করে মেহেরিনকে নিয়ে আসে ড্রইং রুমে। তারপর বলে,

– আজ আমি অনেক হ্যাপি।

– বিয়ে করেছো বুঝি?

– কি বলছো এসব? তুমি জানো আজ কতো গুরুত্বপূর্ণ একটা কাজ করেছি !

– হু মেয়েটার সাথে হাত ধরে ঘুরে বেড়িয়েছো। সেটা আর বলতে হবে না। আমি সব জানি। কাল সকালে মায়ের বাসায় চলে যাবো। আর থাকবো না তোমার সাথে।

– মেয়েটার সাথে শুধু ঘুরে বেড়াইনি। একেবাওে হাতকড়া পরিয়ে সোজা লকাপে।

– মানে? তুমি সত্যি সত্যি বিয়ে করেছো?

– কি সব তখন থেকে বলেই যাচেছা। আরে ওই মার্ডার কেসের আসামী ধরা পড়েছে।

– আসামি?

– হ্যা। তুমি যে মেয়েটাকে দেখেছিলে আংকেলের চেম্বারে, ওই মেয়েটা খুনি।

– এ্যা.. বলো কি ?

– হ্যা সত্যি তাই।

মেহেরিন নিজের ভুল বুঝতে পেরে স্যরি বলে সুমনের কাছে। সমাজে এমন অনেক ঘটনার জন্ম নিজে নিজেই হয়। নিজের অজান্তেই ঘটে যাওয়া এসব ঘটনা এক একটি পেয়ালা। তার কোনোটাতে রাখা থাকে অমৃত। কোনোটাতে বিষ। যে যে পেয়ালায় চুমুক দেয়। তার স্বাদই সে পেয়ে থাকে।

  লেখক : সাংবাদিক, সাহিত্যিক,

  নাট্যকার ও নাট্যপরিচালক

ভালো লাগলে শেয়ার করে দিন :)

0 Comments

Leave a Reply

Avatar placeholder

Your email address will not be published. Required fields are marked *