ই-পেপার

SITE UNDER CONSTRUCTION
বাংলাদেশ পুলিশের মুখপত্র
অব্যাহত প্রকাশনার ৬৩ বছর

ইরানী বিশ্বাস

০৩

কথা শেষ করে চলে যায় রুমের মধ্যে। নাইমা কি করবে কিছুই বুঝতে পারে না। সোফায় বসে কাঁদতে থাকে। রুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে নিজে রুমে লাইট অফ করে ঘুমিয়ে পড়ে। সে রাতে আর নাইমার খবর নেয়নি রাকিব। অনেকক্ষণ পর নাইমা দেখতে পেল রুমে কোন সাড়া শব্দ নেই। তখন নিজেই রুমে ঢুকে লাইট অন করে খাটের এক পাশে বসে থাকে। আর রাকিবের ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। কি শান্ত, স্নিগ্ধ, সরল মুখটি যেন পৃথিবীর সর্বকনিষ্ঠ সদ্য ভুমিষ্ঠ শিশু। তাকে কোন পাপ স্পর্শ করতে পারেনি। মুখের একপাশে আলো পড়েছে। সেদিকে তাকিয়েই আছে নাইমা। ডানহাতটি বাড়িয়ে দেয় সেই নিস্পাপ মুখ স্পর্শ করবে বলে। কিন্তু না, স্পর্শ করতে পারে না, ফিরে আসে। কোথায় যেন একটা দেয়াল বাধা হয়ে দাঁড়ায়। হঠাৎ নাইমার মুখের রেখা পরিবর্তিত হয়। প্রতিবাদী হয়ে ওঠে, না। এ আমি কি করছি। কেন তাকে আমার এত ভাললাগছে। মনে হচ্ছে বুকে জড়িয়ে চুমুতে চুমুতে ভরিয়ে দেই সমস্ত মুখ। তারপর অভিমানী সুরে চোখ থেকে চোখ সরিয়ে বলি,

–           এমন করো কেন? আমি তোমার সেই প্রিয়তমা, যাকে একবার একপলক দেখে হৃদয়ে নাম লিখেছিলে। সেই তো আমি। তাকিয়ে দেখো।

ভাবতে ভাবতে নাইমা ভীষণ আবেগী হয়ে পড়ে। তারপর রাকিবের পিঠের উপর ঝুকে মুখের কাছে মুখ নিতে যাবে, এমন সময় ঝট করে চোখ খুলে যায় রাকিবের। তাকিয়ে দেখে মুখের উপর নাইমার মুখ। রুমে লাইট জ্বলছে। কিছু বুঝতে পারে না। পরক্ষণেই মনে পড়ে যায় লোটাসের চেহারা। তার হরিনী চঞ্চল চোখ, ঝর্নার মতো কলকল হাসি। কি সেই অভিনব মাদকতা। আহ্! ভাবতেই বুকের ভেতর একটা কামড় দেয়। আর তখনই ঝট করে উঠে বসে। তারপর রাগি কন্ঠে চেচিয়ে বলে,

– বসে আছো কেন?

– ঘুম আসছিল না, তাই।

– কি হয়েছে তোমার, এই মিড নাইটে না ঘুমিয়ে লাইট জ্বেলে বসে আছো?

নাইমা অসহায়ের মতো তাকিয়ে আছে রাকিবের দিকে। এই কিছুক্ষণ আগে তাকে কি নিস্পাপ দেখাচ্ছিল। অথচ এখন সেই মানুষটাকে সে চিনতে পারছে না। ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে রাকিবের দিকে। নাইমার এই তাকিয়ে থাকা দেখে আরো রেগে যায় রাকিব। তারপর আবার ধমক দিয়ে বলে,

– তাকিয়ে আছো কেন?

নাইমার চোখ দিয়ে শুধু পানি গড়িয়ে পড়তে থাকে। সে কোন কথা বলতে পারে না। বুকের মধ্যে জমা হওয়া সব জল যেন প্লাবিত হয়ে উপচে পড়তে চাইছে। তাইতো বুকে ভীষণ ব্যথা লাগছে। কিন্তু না কোন কান্না যেন  প্লাবিত হতে পারছে না। কোথায় যেন একটা বাঁধা পাচ্ছে। কিছুতেই সেই বাঁধা ঠেলে বেরিয়ে আসতে পারছে না। রাকিব অনেক্ষণ চুপ থেকে আবার বিরক্ত হয়ে বলে,

– কি হলো, আমি কি এমন বললাম, তার জন্য এই মিড নাইটে বসে নাটক করছো? যত্তোসব..

কথা শেষ করতে করতে আবার বিছানায় শুয়ে পড়ে। এবার নাইমা তার কান্না চেপে রাখতে না পেরে হাউ মাউ করে কাঁদতে কাঁদতে রাকিবকে জড়িয়ে ধরে। কি জানি কি মনে হলো। রাকিব উঠে বসে। তারপর নরমাল সুরে বলতে থাকে,

– আচ্ছা কান্নাকাটির কি হলো?  কান্নার মতো কিছু হয়েছে?

রাকিব নাইমার হাত গলা থেকে সরানোর চেষ্টা করতে থাকে। আর নাইমা আরো জোরে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বুকের মধ্যে নিজের মুখ লুকিয়ে বলতে থাকে,

– তোমার কি হয়েছে, আমার সাথে শেয়ার করতে পারো। বিজনেসের কোন প্রবলেম হলে তুমি আমাকে বলতেই পারো। তাই বলে এভাবে আমার সাথে খারাপ ব্যবহার করবে?

– আমার সত্যি কিচছু হয়নি। তুমি শুধু শুধু সাধারণ বিষয় নিয়ে জটিল করছো। প্লিজ অনেক রাত হয়েছে। সকালে আমার জরুরি একটা মিটিং আছে।

রাকিব অন্য দিকে ফিরে ঘুমালেও, নাইমা তার স্বভাব বসত রাকিবের গায়ের উপর হাতটা দিয়ে শুয়ে পড়ে।

উত্তরা থানায় ঢুকতেই মারুফের সাথে দেখা হয়ে যায়। মারুফ এই থানায় বেশ কিছুদিন আগে জয়েন করেছেন। এখানে আসার আগে পুরানো ঢাকার গেন্ডারিয়া থানায় কিছুদিন ছিলেন। তারপর সোজা এখানে চলে আসেন। আজ তিনি শুভ হত্যাকান্ডের ইনভেস্টিগেশনেই যাচ্ছিলেন। কিন্তু সুমনের সাথে দেখা হতেই কুশল বিনিময় করে কথা বলতে বলতে আবার ফিরে আসে ভেতরে। এখানে অনেক পরিচিতজনেরা আছে তাই সকলের সাথেই কুশল বিনিময় চলতে থাকে।

এসপি স্যার সামনে বসে আছে। মারুফ আর সুমন দুজনে গিয়ে দাঁড়ান এসপি স্যার সামনে। তিনি অন্য দুইজন লোকের সাথে খুব মনোযোগ দিয়ে কথা বলছেন। কিন্তু মারুফ আর সুমন সেলুট দিতেই তিনি হঠাৎ চোখ তুলে তাকান। চোখে পড়ে যায় নেমপ্লেটে দিকে। তারপর মৃদু হেসে বলেন,

– তারপর বলেন, মিষ্টার সুমন।

একটু অবাক হয়ে সুমন বলেন,

– না মানে স্যার, আপনি আমার নাম জানেন কি করে?

– জানেন মিষ্টার সুমন, পুলিশের দুটি চোখ থাকে সামনে আর পেছনে অনেকগুলি চোখ থাকে। কখনো কখনো চোখ বন্ধ করেও দেখতে হয়। কি আমি ঠিক বলেছি?

– জ্বী স্যার। স্যার বুঝতে পেরেছি। সরি স্যার। কথা বলতে বলতে লজ্জা পেয়ে নিজের নেমপ্লেটের দিকে অজান্তেই হাতটা চলে যায় সুমনের।

– না না ঠিক আছে। লজ্জা পাবার কিছু নেই। পুলিশে চাকরি করলেও আমারা তো মানুষ। তাই ভুল হওয়াটা স্বাভাবিক। একটা কথা কি জানেন, মানুষ আমাদের মানে এই পুলিশের কাছে অনেক বেশি প্রত্যাশা করে। তাদের ধারণা সাধারণ মানুষ যখন পুলিশ হয়ে আসে তখন তারা এক্সট্রা শক্তি নিয়ে পুলিশ বাহিনীতে যোগদান করে। তাই পুলিশদের ভুল করলে চলে না।

– জ্বী স্যার, আপনি একদম ঠিক বলেছেন স্যার।

– আরে বসেন বসেন। এখনো দাঁড়িয়ে কেন? দুজনে পাশের চেয়ারে বসে। আর সামনে বসে থাকা অতিথিরা চলে যায় সালাম জানিয়ে।

কিছুক্ষণ নিরবতা ভেঙ্গে মারুফ বলেন,

– স্যার গত সপ্তাহে যে মার্ডার কেসটা, ওই ঘটনার সাথে স্যার উনি জড়িত। মারুফের কথায় অনেকটা ঘাবড়ে যায় এসপি। তারপর ভ্রু কুচকে সামনে ঝুঁকে সন্দিহান দৃষ্টিতে সোজা তাকায়। তারপর দৃঢ় কন্ঠে বলেন,

– হোয়াট! জড়িত মানে?

মারুফ অনেকটা ঘাবড়ে গিয়ে অপ্রস্তুত হয়ে তাৎক্ষণিক উত্তর দেয়,

– না না, সরি স্যরি স্যার। আসলে সুমন স্যার সেদিন রাতে আমাকে কল করে ওই কেসটার ব্যাপারে বলেছিলেন।

এসপি বেশ শান্ত গলায় শুধু উচ্চারণ করেন,

– ও..।

তারপর কিছুক্ষণ চুপ থেকে সুমনের দিকে ভাল করে তাকায়। তারপর বলেন,

– আচ্ছা মিষ্টার সুমন, সেদিন এক্সাক্টলী কি ঘটেছিল বলেন তো? না মানে আমি বলতে চাচ্ছি উত্তরা থানার আন্ডারে ঘটে যাওয়া একটা মার্ডার কেস, আপনার নলেজে এলো কি করে?

সুমন খুব মনোযোগ দিয়ে এসপি স্যারের কথা শুনছিলেন। তার মুখে চিন্তার ছাপ ফুটে ওঠে। কিছু ভাবতে থাকে সে টেবিলের দিকে চোখ নামিয়ে। দেখে মনে হচেছ সে রাতের বিষয়টি তিনি মনে করার চেষ্টা করছিলেন। এবার ধীরে ধীরে চোখ তুলে দৃষ্টি রাখেন এসপি স্যারের দিকে। বলতে থাকেন,

– রাত তখন আনুমানিক ৪টা থেকে ৫ টা হবে। আমি গভীর ঘুমে। আমার মোবাইলে একটা কল আসে। আমার ঘুম ভেঙ্গে যায় তারপর কল রিসিভ করতেই একটা মেয়েলী কন্ঠে জানানো হয় উত্তরা ১২ নম্বর সেক্টরে একটা খুন হয়েছে। আর তারপর স্যার আমি উত্তরা থানায় যোগাযোগ করি এবং ডিটেলস বলি।

– ব্যাস এটুকুই?

– জ্বী স্যার।

– হু, আই আন্ডারস্ট্যান্ড। আচ্ছা একবারও কি মনে হয়নি, টেলিফোনটা আপনাকেই কেন করা হলো?

– জ্বী স্যার। এ বিষয়টা নিয়ে আমি অনেক বার ভেবেছি। তাই তো স্যার আমি আজ এসেছি।

– গুড। আমরা এ বিষয়টা নিয়ে একটু কথা বলবো।

একজন পুলিশ এসে সামনে দাঁড়ায়। এসপি স্যারের খাবার রেডি করা হয়েছে সে কথা জানানোর জন্য সে এসেছে। এসপি অধিনস্থ পুলিশকে বলে সুমন ও মারুফের জন্য লাঞ্চের ব্যবস্থা করতে।

রাতের খাওয়া শেষে প্রেসক্রিপশান মিলিয়ে ওষুধগুলি খেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে রাকিব। গুটিগুটি পায়ে নিজের রুমে এসে দাড়ায় নাইমা। জবা এসে দরজায় দাঁড়ায়। মুখ ঘুরিয়ে সেদিকে তাকিয়ে নাইমা জিজ্ঞেস করে,

– কি রে কিছু বলবি?

– জ্বী খালাম্মা, কইতেছিলাম কি, বড় টিভি তে বাংলাদেশের চ্যালেন আসে না। আজ মান্নার একটা ভাল বই হবে।

কি জবাব দেবে একবার ভেবে নেয় নাইমা। একটা সুন্দর বিশ্বাসযোগ্য উত্তর খুঁজতে থাকে মনে মনে। তারপর ঈষৎ হেসে জবাব দেয়,

– কী হয়েছে বলতো? ডিসওয়ালা ফোন করেছিল। বলল, বাংলাদেশের চ্যানেলগুলি দেখাতে লাইনে একটু প্রবলেম হচ্ছে। তাই কিছুদিন দেখা যাবে না। আর তুই তো স্টার জলসা, আর জি-বাংলা দেখিস সারক্ষণ। হঠাৎ করে তোর বাংলাদেশের ছবি দেখার শখ হলো কেন?

– না, এমনিতে। দোকানে গেছিলাম না, তখন তারাবানুর সাথে দেখা হইছিল। ও কইল মান্নার ছবি আছে। তাই দেখতে চাইছিলাম।

– এখন অনেক রাত হয়েছে। ঘুমাতে যা।

– ঠিক আছে যাইতাছি।

চলে যাবার জন্য পা বাড়ায়। আবার কি মনে করে ফিরে আসে তারপর প্রশ্ন করে,

– আচ্ছা খালাম্মা, কাইল কি ঠিক হইবো?

– দেখি। হলে তো হবে। না হলে প্রবলেম কি। এখন তো তোর খালু অসুস্থ। টিভি দেখে না। তুই একটু দেখিস, তাওতো ভারতের চ্যানেল। বাংলাদেশের চ্যানেল না আসলে প্রবলেম কি। যা ঘুমাতে যা।

জবা মনক্ষুন্ন হয়ে ধীর পায়ে সামনের দিকে চলে যায়। নাইমা নিজের দিকে তাকায়। এখনো তার শরীর জড়িয়ে আছে নীল শাড়িতে। দিনের আলো নিভে গিয়ে কেমন চাঁদের আলো ছড়িয়েছে চারিদিকে। খুব ইচ্ছে করছে টেলিভিশনের স্ক্রিনে চোখ রাখতে। সেখানে কি আছে। আচ্ছা মার্ডার কেসের ক্লু পেয়েছে পুলিশ? কি পেলো সেখান থেকে? মানুষ বলে খুনিরা নাকি কিছু একটা নিদর্শন রেখে আছে স্পটে। তাহলে সেখানে কি পাওয়া গেল? আবোল তাবোল অনেক কিছু ভাবতে ভাবতে কখন যেন ঘড়িতে ৩ টা বেজে গেছে। শরীরটাও কেমন ক্লান্ত লাগছে। তাই ফ্রেশ না হয়ে, ড্রেস না চেঞ্জ করেই বালিশে মাথা রাখে নাইমা। এক রকম ঘুমিয়েই পড়েছিল। হঠাৎ ঘুমের মধ্যে বিভৎস একটা স্বপ্ন দেখে চিৎকার দিয়ে উঠে বসে বিছানায়। একটা মুখ বার বার তার চোখের সামনে ভেসে উঠছে। উহ কি বিভৎস। সেই চোখ দুটি। না তাতে কোন প্রেমের দৃষ্টি ছিল না। কি ভয়ংকর সেই দৃষ্টি, অভিমান নয় কেবল সেখানে বেঁচে থাকার আকুতি। বাঁচার জন্য প্রানপণ চেষ্টা। আকুতি, মিনতি ভরা সেই দৃষ্টি।

শরীর থেকে ঘাম ঝরছে। এসি চলছে রুমে। তবু যেন ঠান্ডা হচ্ছে না। সাইড টেবিল থেকে গ্লাস নিয়ে এক মুহুর্তে ঢকঢক সমস্ত পানি নিঃশেষ করে ফেলে। তবু যেন তার তৃষ্ণা মিটছে না। কপালে হাত দিয়ে দেখে সত্যি তো কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে। উঠে আস্তে আস্তে বাথরুমে গিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়ায়। বেসিনের কল খুলে রাখে। পানি পড়ছে, সেদিকে তাকিয়ে থাকে নাইমা। কলের পানি দিয়ে যেন লাল রক্ত বের হচ্ছে। এ তো রক্ত ! এতো রক্ত, কার রক্ত উহ্ মনে মধ্যে কি অদ্ভুত তোলপাড় হচ্ছে। ইচ্ছে করছে হাউ মাউ করে কেঁদে মনের ভেতর পুষে রাখা কষ্টগুলি বের করে জলের ¯্রােতে ভাসিয়ে দিতে। কিন্তু কিছুতেই চোখ ফেটে জল বেরিয়ে আসছে না। আয়নায় নিজের দিকে তাকিয়ে আছে নাইমা। দুচোখে শুধু রক্ত জবার রং মিশে আগুন তৈরির প্রস্তুতি চলছে। হয়তো সে আগুনে চোখের সমস্ত জল শুকিয়ে গেছে। বুকের ভেতর থেকে কষ্টগুলি ডুকরে উঠে আসতে চাইছে কিন্তু কি অদ্ভুত বিষয়, কিছুতেই সে কষ্ট কন্ঠনালী বেয়ে উপরে প্রস্ফুটিত হচ্ছে না। কেন এমন হচ্ছে, কোথায় বাঁধা, বুঝতে পারছে না সে। অথচ আজ তার সব কষ্ট ভুলে স্বাভাবিক হওয়ার কথা ছিল। কাকে বলবে এ কথা। ভেবে ভেবে সারা ঘরের দিকে তাকিয়ে দেখে কেউ নেই। এই ঘরে কেবল সে একা।

(চলবে)

লেখক : সাংবাদিক, সাহিত্যিক,

নাট্যকার ও নাট্যপরিচালক।

ভালো লাগলে শেয়ার করে দিন :)

0 Comments

Leave a Reply

Avatar placeholder

Your email address will not be published. Required fields are marked *