ই-পেপার

SITE UNDER CONSTRUCTION
বাংলাদেশ পুলিশের মুখপত্র
অব্যাহত প্রকাশনার ৬৩ বছর

ইরানী বিশ্বাস

পর্ব-০৯

এসপি স্যার গভীর মনোযোগ দিয়ে ভাবছেন। এমন সময় সেখানে আসে মারুফ এবং অপর এক এসআই। সামনে এসে সম্মান দেখিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে কিছুক্ষণ। এসপি স্যার তখনো চিন্তামগ্ন। মারুফ নিজের উপস্থিতি জানান দিতে আস্তে করে বলেন,

– স্যার..

– হুউ.., দুজনের মুখের দিকে তাকিয়ে চোখের ইশারায় বসতে বলেন। ওরা সামনের চেয়ারে বসে। এসপি স্যার নিজেকে স্বাভাবিক করে বলেন,

– কিছু বলবেন?

– স্যার আপনি তো ডেকেছিলেন।

– ওহ, হ্যাঁ । ডেকেছিলাম ওই কেসটার বিষয়ে একটু কথা বলবো।

– হ্যাঁ স্যার। এবার তো ছেলেটার বাড়ির ঠিকানা পাওয়া গেল। কে ওর শত্রু ছিল বা কাদের সাথে মিশতো এসব জানা যাবে। রাজীবের এই কথা শুনে এসপি স্যার চেয়ারে হেলান দিয়ে বসেন। তারপর বলেন,

– আপনারা কি জানেন শুভর পরিবারে শুধু মাত্র অসুস্থ মা আছেন। আর একমাত্র বোনের বিয়ে হয়ে গেছে। আর তারা এখনো জানেই না তাদের ছেলে মারা গেছে।

– সে কি কথা স্যার! এত মাস হয়ে গেল, তাও জানে না!

– কারণ বাড়ির লোকেরা শুভ কোথায় কাজ করে তা জানতো না। আর ওর মোবাইল ফোনটা এখনো বন্ধ।

– ওহ, সরি স্যার, একটা কথা বলবো?

– হ্যাঁ বলেন।

– স্যার আমার মনে হয়, পিৎজা দোকানের কেউ ওকে মেরেছে।

– হু সাসপেক্ট করা যেতেই পারে। সোর্স লাগান  ওই দোকানে।

– জ্বী স্যার, ওকে, স্যার। কথা শেষ করে এসপি স্যারকে সম্মান জানিয়ে বেরিয়ে আসে রুম থেকে।

কয়েক ঘন্টা পর অনেকটা স্বাভাবিক হয়ে গেল রাকিব সাহেব। তাকিয়ে দেখে নিজের রুমে শুয়ে আছে। আর জবা সামনে বসে আছে। জবাকে দেখে রুগ্ন কন্ঠে জানতে চাইলো,

– তোর খালাম্মা কোথায়?

– এতক্ষন এখানেই ছিল। ডাইকা আনবো?

– হ্যা, যা ডেকে নিয়ে আয়।

জবা উঠে বাইরে যাবে এমন সময় তাকিয়ে দেখে নাইমা সেখানে ঢুকছে। নাইমার উপস্থিতি টের পেয়ে রাকিব সাহেব চোখ বন্ধ করে রইল। নাইমা এসে জবাকে জিজ্ঞেস করে,

– ঘুমাচ্ছে এখনো?

– না, খালাম্মা। একটু আগে চোখ মেলছিল। আর আপনের কথা জিগাইছিল।

– ও। আচ্ছা ঠিক আছে তুই যা, কাজ কর। আমি আছি।

জবা চলে যাবার পর দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে খাটের পাশে চেয়ারে বসে নাইমা। মনের মধ্যে কি চলছে তা একমাত্র নাইমাই জানে। এই যে নিথর হয়ে পড়ে থাকা মানুষটি একসময় তাকে পাগলের মতো ভালোবাসতো। তারপর কি ভাবে কি হলো তা এখনো নাইমার অজানা। একজন ভদ্র-শান্ত মানুষ কি ভাবে এত খারাপ মানুষে পরিণত হতে পারে। সে প্রশ্নের উত্তর এখনো নাইমার মনে। হঠাৎ একটা শব্দ শুনে নাইমা তাকায় রাকিবের দিকে। দেখে কি করুণ দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে আছে রাকিব। কিছু হয়তো বলতে চায়। দিনে দিনে এতটাই ঘৃণা জন্মেছে মনে, সে চাইলেও রাকিবের চোখে চোখ রাখতে পারছে না। সময়ের দেয়াল এসে দুজনের মধ্যে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। নাইমা বুঝতে পারছে, দিনে দিনে দূরত্বের দেয়াল শক্ত প্রাচীরে পরিণত হয়েছে। কিভাবে এ প্রাচীর ডিঙিয়ে রাকিবের কাছে যাবে। কোনো রাস্তা খুঁজে পাচ্ছে না। অস্ফুট স্বরে রাকিবের মুখে নিজের নাম শুনে চমকে ওঠে। এ নামটি তার এখনো মনে আছে? বাসর রাতে ভালোবেসে এ নামটি উপহার দিয়েছিল ‘নয়ন’। রাকিবের ধারণা মানুষের চোখ না থাকলে পৃথিবীটাই তার কাছে অন্ধকার, তেমনি নাইমা ছাড়া তার জীবন অর্থহীন। অনেক দিন পর রাকিবের মুখে সেই চিরচেনা শব্দটি শুনে বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ। নিজেকে এ শব্দের সঙ্গে মানিয়ে নিতে মনের অজান্তে কখন যেন এক ফোঁটা জল টুপ করে কোলের উপর ঝরে পড়েছে। রাকিব ডাকছে

– নয়ন..। আই এ্যাম সরি। আমি জানি তুমি আমাকে কখনো ক্ষমা করতে পারবে না। তবুও তোমার কাছে আমি ক্ষমা প্রার্থনা করছি। পারলে আমাকে ক্ষমা করে দিও।

রাকিবের কথা শুনছে, কিন্তু কি আশ্চর্য কোনো উত্তর দিতে পারছে না নাইমা। জিভ যেন আড়ষ্ট হয়ে আসছে। অতিরিক্ত ঘৃণা জন্মালেই বুঝি মানুষের এমন অনুভূতি হয়। রাকিব বুঝতে পারে, নাইমা স্বাভাবিক হতে পারছে না। তাই অনেক কষ্ট করে নিজের হাতটি বাড়িয়ে দেয় নাইমাকে স্পর্শ করার জন্য। অনেক দিন পরিচিত রাস্তায় না হাঁটলে যেমন অচেনা লাগে। নাইমার কাছে রাকিবের স্পর্শ যেন  তেমনই লাগছিল। এখন আর সেই স্পর্শে মনের মধ্যে আবেগের তরঙ্গ খেলে না। কেমন অস্বস্তি হচ্ছে। হাতটি সরিয়ে নেয়। রাকিব তখনো ক্ষমাপ্রার্থী হয়ে তাকিয়ে থাকে নাইমার দিকে। নাইমার প্রত্যাখ্যানে ফিরিয়ে নেয় নিজের হাত। তারপর ওঠে বসার চেষ্টা করেও না পেরে পড়ে যেতে থাকে। সেদিকে তাকিয়ে নাইমা দ্রুত ছুটে আসে রাকিবকে তুলে ধরতে। শরীরে যতটুকু শক্তি ছিল সেটা দিয়ে জাপটে ধরে নাইমাকে। শিশুর মতো নাইমার বুকে মুখ গুজে হারিয়ে যাওয়া ঘ্রাণ নিতে থাকে। শতচেষ্টা করেও নাইমা নিজেকে আলাদা করতে পারেনি। তারপর রাকিব বলে,

– তুমি না চাইলেও আমি আজ অনেক কথা বলতে চাই তোমাকে। আমি জানি তুমি আমার কোনো কথার উত্তর দেবে না। তবুও তোমার শোনা উচিত। আমি হয়তো বাঁচবো না। কিন্তু তোমাকে বাঁচতে হবে। তুমি কি নিয়ে বাঁচবে, কিভাবে বাঁচবে এটা তোমার জানা দরকার। আমি যে অন্যায় তোমার সাথে করেছি, তার কোনো ক্ষমা হয় না। শুধু শেষ সময়ে জানিয়ে যেতে চাই কি কি ক্ষতি আমি তোমার করেছি। যেগুলো এখনো তুমি জানো না। আমি তোমার কাছে আরেকটি সুযোগ চাইবো না। তবে কিছু অজানা কথা তোমাকে জানাতে চাই। চরম সত্যি কথাটি হলো এই মুহূর্ত থেকে আমি নিঃস্ব। কয়েকটি বাড়ি ছাড়া আমার আর কিছু নাই। আমি সব হারিয়েছি।

নাইমা অবাক দৃষ্টিতে তাকায় রাকিবের দিকে। এক ঝটকায় তার কাছ থেকে দূরে গিয়ে চেয়ারে বসে পড়ে। এ কি বলছে রাকিব। যার গলায় এত দাম্ভিকতা ছিল এই কি সেই মানুষটি। যে তাকে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করে ছুড়ে ফেলে দিয়েছিল ডাস্টবিনে ! মিলাতে পারছে না দুটি মানুষকে। তাহলে কি সেই ঘটনা। কি হয়েছিল ? তার মনে হাজারো প্রশ্ন নিয়ে নির্বাক তাকিয়ে থাকে সামনে। দীর্ঘ দৃষ্টি জুড়ে কেবল হাহাকার মেশানো প্রশ্ন। একটু পর আবার রাকিব বলতে শুরু করে,

– আমি জানি তুমি বিশ্বাস করবে না আমার কথা। হয়তো বলবে তোমাকে ফিরে পাবার জন্য আমার এই মিথ্যে ছলনা। হয়তো ভাবছো, তোমার কাছে করুনা চাইছি। না আমি তার কিছুই চাই না। আমার আর বাঁচতে ইচ্ছে করছে না। তাই আমি আর চিকিৎসা করাতে চাই না। শুধু তোমাকে এই কথাগুলি বলার জন্য ডাক্তারের সব কথা শুনেছি, মেনেছি। তোমার ইচ্ছে না থাকা সত্ত্বেও তোমাকে আমার কথাগুলি বলছি। মন দিয়ে না শোন ঘৃণা আর অবজ্ঞা নিয়ে হলেও আমার কথাগুলো শোন। তা না হলে আমি মরেও শান্তি পাবো না।

নাইমা বুঝতে পারে না সে কি করবে। একবার ইচ্ছে হলো দৌড়ে পালিয়ে যায়। আবার মনে হলো চিৎকার করে কেঁদে ঘৃণার দেয়াল ভেঙে রাকিবকে জড়িয়ে ধরে। আবার মনে হলো রাকিবকে শাস্তি দিতে। চোখ জ্বলে যাচ্ছে, এক ফোটা জল নেই সেখানে। অথচ গলা শুকিয়ে আসতে লাগলো পানির জন্য। পাশে থাকা জলের গ্লাস নিয়ে ঢকঢক করে গলায় ঢেলে স্থির বসে থাকে। রাকিব আবার বলতে শুরু করে,

– তোমাকে আমি পছন্দ করে বিয়ে করেছিলাম। তারপর অন্য সবার মতো আমাদের একটি সংসার হয়েছিল। কিন্তু প্রেম-ভালবাসার স্বাদ সে তো আমাকে লোটাস দিয়েছিল। এর আগে আমি জানতাম না প্রেম এত মধুর। মধু যেমন উপকারী, তেমন জীবননাশক। তবে মাত্রা ঠিক রাখতে হয়। আমি প্রেমের মধুর স্বাদ গ্রহণ করেছিলাম মাত্রাহীন। তাই সেটা আমার জন্য জীবননাশক হয়েছে। লোটাসের ভালোবাসা আমাকে এতটাই মুগ্ধ করেছিল, আমি হিতাহিত ভুলে গিয়েছিলাম। এই সুযোগে কখন কোনো সময়ে সে আমার ব্যবসা, ব্যাংক ব্যালেন্স নিজের করে নিয়েছিল তা আমি বুঝতেই পারিনি। হঠাৎ করে আজ যখন আমার কাছে আদালতের নোটিশ আসে আমি সেটা দেখার পর নিজেকে ঠিক রাখতে পারিনি।

দিনে দিনে সুমন কেমন যেন হয়ে পড়ছে। অদ্ভুত আচরণ করছে। মনে মনে মেহেরীন নিজেকে প্রশ্ন করে, সত্যি কি সুমন পাল্টে গেছে। নাকি তার সন্দেহ সুমনকে পাল্টে দিয়েছে। মনের মধ্যে নানা প্রশ্ন ঘুরপাক খেতে থাকে। এ নিয়ে মেহেরীন খুব টেনশানে আছে। এতদিনের পরিচিত সুমন কেমন যেন অচেনা হয়ে যাচ্ছে। বান্ধবীরা বলেছিল, পুলিশে চাকরি করে, বিয়ে করিস না। তোকে একদম বুঝবে না। ক্রিমিনালদের সাথে থাকতে থাকতে নাকি তারা সবাইকে ক্রিমিনাল ভাবতে শুরু করে। এমন একটা বিষয় যা কাউকে শেয়ার করতে পারছে না। ভিতরে ভিতরে গুমরে মরছে। মাঝে মাঝে টিভি সিরিয়াল দেখে মনে সন্দেহ হয় কোনো মেয়েলি কেস নয়তো। ভাবতে ভাবতে সুমন আসে ঘরে। ড্রেস চেঞ্জ করে ওয়াশ রুমে ঢুকেছে। এই সুযোগে সুমনের মোবাইল নিয়ে ঘাটতে শুরু করে। হঠাৎ এক অপরূপ সুন্দরী মেয়ের ছবি দেখে চমকে যায়। সুমনের মোবাইলে সুন্দরী মেয়ের ছবি ! কিন্তু এ মেয়েকে তো সে আগে কখনো দেখেনি। দুজনের পরিবারের আত্মীয়-স্বজন সকলের কথাই চিন্তা করতে লাগলো। কিন্তু না, এই মেয়েকে তো সে কখনো কোথাও দেখেনি। তাছাড়া নিজের বান্ধবীমহল বা সুমনের বন্ধুদের স্ত্রী কারো সঙ্গেই তার চেহারার কোনো মিল নেই। ভাবতে ভাবতে মেহেরীনের সন্দেহ যেন আরো বেড়ে গেল। তাহলে কি সুমনের মন পরিবর্তনের এটাই বড় কারণ। নিমিষেই মেহেরীন চোখের সামনে অন্ধকার দেখতে পেলো। এই মেয়ের সাথে যদি সত্যি সুমনের সম্পর্ক থাকে তার ধারণা যদি সত্যি হয় তাহলে ভবিষ্যৎ কি হবে। এই ছোট রিয়াকে নিয়ে সে কোথায় যাবে? ভাবতে ভাবতে বাথরুমের দরজা খোলার শব্দ পেয়ে মোবাইল অফ করে উঠে যায়।

ডাইনিং টেবিলে একটা কথাও বলেনি মেহেরীন। সুমনকে যতবার দেখছে ততবার ওই ছবিটি তার চোখে ভেসে উঠছে। এমন একটি প্রবলেম নিয়ে সময় পার করছে মেহেরীন যা অন্য কাউকে এ মুহূর্তে শেয়ার করতে পারছে না। তাদের আত্মীয়-স্বজন সকলে জানে তারা সুখী দম্পত্তি। হঠাৎ যদি মেহেরীন সুমনের নামে কমপ্লেইন করে তাহলে উল্টো দোষ তার ঘাড়ে এসেই পড়বে। কি এক সমস্যা। ভাবতে ভাবতে মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ে মেহেরীন। মনে মনে ঠিক করে কিছু একটা করা উচিত। মানসিক সমস্যা চেপে রাখা একদমই ঠিক নয়। তাই যে করেই হোক তাকে কারো না কারো কাছে শেয়ার করতেই হবে।

একজন সাইক্রিয়েটিক এর সাথে কথা বলা খুব জরুরী। খুঁজতে থাকে কার কাছে খবর নেবে। হঠাৎ মনে পড়ে যায় তার মায়ের বান্ধবী পপি আন্টি। ছোটবেলায় ওদের বাসায় মায়ের সাথে খুব গিয়েছে। ওই আন্টির হাসব্যান্ড ড. আবজাল হোসেন। খুব ভালো মানুষ। তিনি নাম করা সাইক্রিয়েটিক। কলেজের প্রফেসর। ইন্টার নেটে সার্চ দিয়ে চেম্বারের টেলিফোন নাম্বার জোগাড় করে। সাহস করে কল দিয়ে রিসিপশনের মেয়েটিকে নিজের পরিচয় দেয়। কিছুক্ষণ পরে দেখে ডক্টর নিজেই কল করেছে মেহেরীনকে। অনেক কথার পর আঙ্কেলের সাথে দেখা করার কথা জানায়।

প্রতিদিনের মতো সকালে সুমন অফিসে চলে যায়। মেয়েকে রেডি করে মেহেরীন বেরিয়ে যায়। সিসি টিভিতে মেহেরীনকে দেখতে পেয়ে রিসিপশনে কল করে ভেতরে পাঠিয়ে দিতে বলে। অনেকদিন পর মেহেরীনকে দেখে কুশল বিনিময় করে। মেয়েকে দেখে খুব অবাক হয় ড. আবজাল হোসেন। দেশের বাইরে থাকার কারণে তিনি মেহেরীনের বিয়েতে আসতে পারেননি। জামাইকে সাথে নিয়ে আসলে ভালো হত এসব কথাও বলে। তাছাড়া আরো বলে মেহেরীনের মা-বাবা এবং তাঁর স্ত্রীর কাছে জামাইয়ের এত প্রশংসা শুনেছে। তাই জামাইকে দেখার ইচ্ছা পোষণ করলেন। মেহেরীন পড়ে যায় উভয় সংকটে। যে লোকটা সামনে বসে এত প্রশংসা করছে যার, তারই বিরুদ্ধে কমপ্লেইন করতে এসেছে। নিজের বোকামি বুঝতে পেরে কোনো কথা না বলে চলে যাবার জন্য অনুমতি নেয়। ওদিকে রোগীরা অপেক্ষা করছে। বেশি সময়ও নষ্ট করা ঠিক হবে না। তাই আগে থেকে এনে রাখা নাস্তা খেয়ে বিদায় নেয় মেহেরীন। মনের কথাগুলি বলতে না পারায় কষ্ট পেতে থাকে। তবুও হাসি মুখে জামাইকে দেখার জন্য হলেও যেন তার বাড়িতে যায়, এ কথা বলে দরজা দিয়ে বের হয়ে চমকে ওঠে। ওয়েটিং রুমে অনেক রোগীর ভিড়ে একটি মহিলা বসে আছে। এই মেয়েটিকে কোথায় যেন দেখেছে। না এ মেয়েটি আর কেউ নয়, সুমনের মোবাইলে দেখা সেই মেয়েটি।

ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত ওষুধ খাওয়া আর জবার হাতের পথ্য খেয়ে রাকিব এখন অনেকটা সুস্থ। কিন্তু দিনে দিনে অসুস্থ হতে থাকে নাইমা। শারীরিকভাবে সুস্থ থাকলেও মানসিক অসুখটা ইদানীং বেড়েছে। তাই তো আবার সাইক্রিয়েটিকের সাথে যোগাযোগ করে কাউন্সিলিং করতে হচ্ছে। রাকিবের কাছ থেকে সব হারানোর গল্পটা শোনার পর নাইমার মানসিক অবস্থা কেমন হয়েছিল তা বলার অপেক্ষা রাখে না। একটা মানুষ ভালোবেসে তাকে মনের সিংহাসনে বসিয়েছিল। স্বাধীনতা দিয়েছিল রাকিবের মনের সর্বত্র বিচরণ করতে। হেসে খেলে দিন কেটে যেতে থাকে। আর ভবিষ্যৎ চিন্তা করে ব্যবসার প্রসার করতে চেয়েছিল। হঠাৎ সেই সাম্রাজ্যে ছন্দপতন। রাকিবের সেই সিংহাসনে অন্য মেয়ের প্রবেশ। আদরে যত্নে রাখা নাইমাকে টেনে হিঁচড়ে রক্তাক্ত করে বের করে দিল। তারপর ধীরে ধীরে সেখানে স্থলাভিষিক্ত হলো লোটাস নামের একটা মডেলের। শুধু তা-ই নয়। লোটাস তার অভিনয়ের দক্ষতায় রাকিবকে বন্দী করেছিল। এরপর একের পর এক সাম্রাজ্য দখল করতে থাকে। এই ধারাবাহিকতায় একদিন রাকিব জানতে পারে তার সাম্রাজ্য অন্যের দখলে চলে গেছে। সে এখন রাজ্যহীন পথের ভিখারি!

হয়তো আশ্রয় নিতেই নাইমার কাছে ফিরেছে। যে মানুষটি তাকে দিনের পর দিন ঠকিয়েছে। সেই মানুষটি ফিরে এসে আশ্রয় চাইলেই কি দেয়া সম্ভব! মনের মধ্যে তোলপাড় চলছে। আত্মগ্লানি আর অন্যের পরাস্ত হওয়া এই দুই মিলে নাইমা যেন অন্য এক মানুষে পরিণত হয়ে গেল। সময়ের মুখোমুখি দাঁড়াতে না পেরে, নিজেকে আড়াল করতে এক দৌড়ে রুমে চলে যায়। চারিদিকে তাকিয়ে দেখে হ্যাঁ সব ঠিক আছে। শুধু রাকিবের স্পর্শগুলো এই রুমের আসবাবপত্র, দেয়াল থেকে ঘৃণা আর দূরত্বে মুছে গেছে। অনেকদিন পর রাকিবের স্পর্শ, তার শরীরে অস্বস্তি হচ্ছে। প্রতিটি রক্তকণিকা যেন বিদ্রোহ করছে। দৌড়ে যায় বাথরুমে। ঝরনা ছেড়ে ঠান্ডা জলধারার নিচে দাঁড়ায়। এ জল যেন শাওয়ার থেকে নয়, নাইমার দুচোখ বেয়ে পড়ছে। এভাবে কতোক্ষণ সেখানে দাঁড়িয়ে ছিল মনে করতে পারে না। একসময় বুঝতে পারে শীতে যখন শরীর ঠকঠক করে কাঁপছে। বুঝতে পারে তাকে বাঁচতে হবে, নিজের জন্য। তারপর সে বেরিয়ে আসে বাথরুম থেকে।

ড্রেস চেঞ্জ করে জুবুথুবু হয়ে খাটের এক কোনে বসে থাকে। চোখে তার হাজারো প্রশ্ন। রাকিবের কাছে হেরে যাওয়া। লোটাসের কাছে রাকিবের হেরে যাওয়া। নিজের একাকীত্ব এ সব নিয়ে ভাবতে ভাবতে নিজেকে আশ্রয়হীন মনে হতে লাগলো। অজানা রাজ্যে হাজার প্রশ্নের মুখোমুখি সে। একসময় দিশেহারা হয়ে ঘুরতে থাকে মনের মধ্যে, সে কি তাহলে রাকিবের কাছে ফিরে যাবে? ভাবতেই চমকে ওঠে। না না যে একবার ছুড়ে ফেলে দেয়, সেকি মন থেকে গ্রহণ করতে পারে। আবার ভাবে হয়তো এখন রাকিব তার কদর বুঝতে পারেছে। নানান প্রশ্ন জন্ম হতে থাকে মনের মধ্যে। আশ্রয়হীন মনের মধ্যে হাত বাড়িয়ে একটু আশ্রয় খুঁজতে থাকে। খুব ইচ্ছে করছে কারো মনের দেয়ালে হেলান দিয়ে এক পলকের জোছনা মাখবে গায়ে। মন ভালো করে দেয়ার মতো কে আছে তার মনের আয়নাজুড়ে। তখন একটি ছবিই চোখের সামনে ভেসে ওঠে। সে আর কেউ নয়, শুভ। তাকে ফোন করে বলে, শুভ তুমি রেস্টুরেন্টে যাও আমি আসছি।

(চলবে)

লেখক : সাংবাদিক, সাহিত্যিক,

নাট্যকার ও নাট্যপরিচালক

ভালো লাগলে শেয়ার করে দিন :)

0 Comments

Leave a Reply

Avatar placeholder

Your email address will not be published. Required fields are marked *