ই-পেপার

SITE UNDER CONSTRUCTION
বাংলাদেশ পুলিশের মুখপত্র
অব্যাহত প্রকাশনার ৬৩ বছর

কোহিনূর বিনতে আবুবকর

প্রকৃতি নীরবে জুলুম সহ্য করে, মানুষ হয়তো বুঝে না অথবা বুঝেও না বোঝার ভান করে। কিন্তু মমতাময় প্রকৃতি যখন দেখে মানুষে মানুষে অসুস্থ আর অর্থহীন প্রতিযোগিতা তাদের মন-মননশীলতা, মানবতাকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছে। তাদের একজনকে অন্যজনের শত্রুতে রূপান্তরিত করেছে, এক পক্ষকে অন্য পক্ষের সীমাহীন নির্যাতনের শিকারে পরিণত করেছে এবং অতিমাত্রায় জড়বাদী চিন্তা-চেতনার চর্চা তাদেরকে একজন নিরঙ্কুশ ক্ষমতাধর স্রষ্টার আনুগত্য থেকে বিচ্যুত করে অন্ধত্বের অতল গহ্বরে নিমজ্জিত করেছে। তখন প্রকৃতি ঘুরে দাঁড়ায়, প্রকৃতি তখন মানুষের ওপরে ভয়ঙ্কররূপে প্রতিশোধ নিতে শুরু করে। মানব সভ্যতার ইতিহাসে দেখা গেছে প্রকৃতি কখনও এইরূপ সীমালঙ্ঘনকারী জাতিকে একেবারে ধ্বংস করে দিয়ে সেখানে নতুন জাতি, নতুন সভ্যতার সূচনা করেছে। আবার কখনও পুরোপুরি ধ্বংস না করে তাদের ওপরে ঝড়-জলোচ্ছ্বাস, দুর্ভিক্ষ-মহামারি, ভূমিকম্প দিয়ে শাস্তির ফয়সালা করেছে। শাস্তি ভোগ আর আপতিত এসব দুর্যোগ মোকাবিলা করে যারা পৃথিবীতে টিকে থেকেছে তারা পরবর্তীতে প্রকৃতি বা স্রষ্টার বিধি-নিষেধকে মেনে নিয়ে তাঁর প্রতি অনুগত জীবন-যাপন করার চেষ্টা করেছে। সময়ের আবর্তনে ধীরে ধীরে আবার মানুষ প্রকৃতি বিরুদ্ধ হয়ে উঠেছে, স্রষ্টার একচ্ছত্র শাসন ও ক্ষমতাকে অস্বীকার করা শুরু করেছে।

আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, প্রকৃতির মধ্যেই স্রষ্টার নিজের অস্তিত্বকে ছড়িয়ে রেখেছেন। স্রষ্টার সাথেই সৃষ্টির অস্তিত্ব জড়িয়ে আছে। স্রষ্টাকে ছাড়া সৃষ্টি জগতের যে কোনো কিছুরই অস্তিত্ব অসম্ভব। তাই প্রকৃতি মানেই স্রষ্টা। সমস্ত সৃষ্টি জগৎ তাঁরই অধীনস্থ পরিবার। আমরা মানবজাতিও সেই পরিবারেরই অংশ। এই প্রকৃতি বা স্রষ্টা বা আল্লাহ্ অথবা আমরা যে যেই নামেই ডাকি না কেন, তিনি তাঁর পরিবারের প্রতি অত্যন্ত সংবেদনশীল। যখন তিনি কোনো জনপদ ও সভ্যতাকে ধ্বংস করেন তখন তাদের ঔদ্ধত্য ও অবাধ্যতা সীমালঙ্ঘনের পর্যায়ে চলে যায়, কিছুতেই তাদেরকে আর ফেরানো যায় না। ফলে তিনি প্রতিশোধপরায়ণ হয়েই তাদেরকে সমূলে বিনাশ করেন। আর যখন শাস্তি ও শাসনের দ্বারা তাদের আনুগত্য ফিরিয়ে আনা সম্ভব মনে করেন, তখন তিনি এভাবে দুর্যোগ, মহামারি দিয়ে তাদেরকে নিজের কাছে আনার ব্যবস্থা করেন।

তিনি বলেন, ‘যে আমার পরিবারের প্রতি দয়া সুলভ আচরণ করবে আমিও তাঁর প্রতি দয়া প্রদর্শন করব’। সুতরাং এই পরিবারের কারও প্রতি কেউ অন্যায় করলে, নিষ্ঠুর আচরণ করলে             প্রকৃতপক্ষে তা স্রষ্টার অবাধ্যতারই শামিল হয়। আর অবাধ্যতার জন্য তিনিই শাসনের একমাত্র ক্ষমতা রাখেন। পৃথিবীজুড়ে বর্তমানে যে করোনা সংকট চলছে তা মহা ক্ষমতাধর স্রষ্টার পক্ষ থেকে সমগ্র মানবজাতির জন্য এক মহা বিপদ সংকেতের আলামত। বছর ঘুরে এলো প্রায়, এখনও সমস্ত পৃথিবীর মানবজাতি স্রষ্টার সেই শাসন এবং শাস্তির কাঠগড়ায় দাঁড়িয়েই আছে, কিছুতেই যেন এ বিপদ থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব হচ্ছে না।

বিশ্বের অর্থভান্ডারের চাবি কব্জাগত করতে উদ্যত চীনের উহান থেকে যাত্রা করে দোর্দ- প্রতাপে এক সময় পৃথিবী শাসনকারী বৃটেনের রাজপ্রাসাদ শুরুতেই ঘুরে এসেছে করোনা। একই সাথে ইতালির অলিগলিতে ঘুরে হাজার হাজার মানুষের ওপরে মৃত্যুর ছোবল বসিয়ে এদের সর্বোচ্চ ক্ষমতাসীনকে সে সময় বুঝিয়ে দিয়ে এসেছে যে, ‘এই দুর্যোগের সমাধান শুধু আকাশের মালিকের দ্বারাই সম্ভব’। সাড়ে আটশত বছরের মুসলিম শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের আকাশচুম্বী সভ্যতাকে যারা মহাসাগরের জলে ডুবিয়ে দিয়ে জলস্রোতকে থমকে দিয়েছিল। অগণিত মুসলিমকে আগুনে পুড়িয়ে, পানিতে ডূবিয়ে মারার হোলিখেলায় মেতেছিল যে স্পেন, সেই স্পেনও তখন করোনার থাবায় ধরাশায়ী হয়েছিল। আর মুহূর্তেই যারা ধ্বংস করে দিতে পারে দুনিয়াজুড়ে পুরো মানব সভ্যতাকে, করোনা মহামারি এবার সুযোগ বুঝে ক্ষমতার দম্ভকে ভেঙে চুরমার করে দিয়ে সমুদ্র সমরে তাদের শ্রেষ্ঠত্ব আর অহংকারের প্রতীক প্রায় শ’ খানেক বিমান বহন করার ক্ষমতাসম্পন্ন মার্কিন রণতরী রুজভেল্ট এর হাজার হাজার সেনাদেরকে তখন কুপোকাত করে ছাড়ে।

এ পর্যন্ত বিশ্বের সর্বোচ্চ ক্ষমতাধর এইসব রাষ্ট্রগুলো ছাড়াও বিশ্বের ছোট-বড়, ধনী-গরিব প্রায় সব দেশেই মৃত্যুর মিছিল দিনকে দিন বেড়েই চলেছে। কেউ জানে না, এই মৃত্যু মিছিলের সারি সংখ্যা আরও কত বৃদ্ধি পাবে, আরও কতদূর প্রলম্বিত হবে! ছোট ও গরিব দেশের অসহায়ত্ব আবহমানকাল ধরে চলছে, হয়তো চলতেই থাকবে। কিন্তু আগ্রাসী ও ক্ষমতাসীন উন্নত রাষ্ট্রগুলোর অসহায়ত্ব মানুষের সমস্ত চিন্তা-চেতনা ও হিসাব-নিকাশকে একেবারে ওলটপালট করে দিয়েছে। কারণ, বহুকাল ধরে তাদের অগাধ ধন-সম্পদ, জনবল, ক্ষমতার রাজত্ব, জ্ঞান গবেষণার অনৈতিক প্রভাব, পরমাণু-জীবাণু অস্ত্রের অসুস্থ প্রতিযোগিতার শিকার হতে হয়েছে বিশ্বের কত না জনপদ, কত দেশ ও নিরীহ মানুষকে।    

তাই বোধহয় আজ, দেশ-কাল, জাত-পাত, ধন-মান, ধর্ম-বর্ণ, সাদা-কালো, ধনী, গরিব কোনোকিছুর হিসাব নিকাশই মানছে না অদৃশ্য, অতর্কিতে হামলাকারী, নীরবঘাতী এই ভাইরাস। 

বস্তুত সব ক্ষমতাসীনরাই অনেক আগেই বুঝে গেছে তাদের ক্ষমতা আর শ্রেষ্ঠত্বের সীমাহীন সীমাবদ্ধতা। তাদের হতাশা, নিরাশা আর অসহায়ত্বের মীমাংসাহীন বাস্তবতা। যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা পেতে সমগ্র পৃথিবীর রাজনীতি, বাজারনীতি আর অর্থনীতিকে কুক্ষিগত করার চক্রান্তের নিষ্ঠুর পরিণতি। প্রত্যেকেই তারা নিজেকে সবচেয়ে বড় ক্ষমতাধর ভাবছিলো আর এ জন্যই সকল ক্ষমতার উৎস যার হাতে, সেই একক ও নিরঙ্কুশ ক্ষমতাধর প্রতিপালকের ধ্যান-জ্ঞান থেকে তারা দূরে সরে ছিলো। তারা নিজেদেরকেই পৃথিবীর অভিভাবক করে নিয়েছিলো। কিন্তু অভিভাবক হয়েও নিজেদেরকেই তারা করোনার মরণ গ্রাস থেকে বাঁচাতে পারছে না।

আমরা খুব ছোট্ট একটি দেশে গাদাগাদি করে বসবাসরত নিতান্ত দুর্বল, অসহায়, এক উন্নয়নশীল জাতি। করোনা এখানেও ছোবল বসিয়েছে প্রায় সমসাময়িক সময়ে। কেউ তখন জানতো না করোনার বহুরূপী রূপ কিরূপে বিস্তৃত হবে এই জনবহুল জনপদে! তবু ভরসা ছিলো একটাই, আমাদের একজন অভিভাবক আছেন, আমরা অভিভাবকহীন নই। আমরা তাঁকে ভয় পাই, মেনে চলার চেষ্টা করি। তাই আমরা কারও জন্য ভীতিকর হয়ে উঠি না, আমরা কারও ওপরে জুলুমও করি না। তাই আমাদের অভিভাবক, প্রতিপালক হয়তো আমাদেরকে ক্ষমা করে দিতেও পারেন! করোনার বিস্তৃত মরণ থাবা তিনি হয়তো আমাদের জন্য সংকুচিত করেও দিতে পারেন!

আবার আমরা এই ভয়েও ভীত ছিলাম, তিনি যদি ভাবেন- আমরা তাঁকে ভয় পেলেও, আমরা কারও ওপরে জুলুম না করলেও যারা জুলুমের শিকার হয়েছে, নির্যাতিত-নিষ্পেষিত হয়েছে, নির্বাসিত হয়েছে আপন আপন ভূখন্ড থেকে। আর যারা অন্যায়ভাবে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে বাধ্য হয়েছে, তাদের জন্য আমাদের যেটুকু করণীয় ছিল তা আমরা করিনি, আমরা অন্যায়কে মুখ বুজে মেনে নিয়ে প্রকারান্তরে আমরা অন্যায়-জুলুমকে প্রশ্রয় দিয়েছি, উৎসাহিত করেছি! তাহলে আমরাও একই দোষে সমানভাবে দোষী! তাই তিনি আমাদের ওপরেও করোনাকে সমানভাবে আগ্রাসী করে তুলবেন, তাহলে আমাদের কি কোনো উপায় ছিলো? না, কোনো উপায় আমাদের ছিল না, যদি জমিনের মালিক শাস্তির আওতায় নিয়ে আমাদেরকে একেবারে নিশ্চিহ্ন করে ফেলতেন। মালিকের অনেক দয়া আর মেহেরবানিতে আমরা আমাদের মৃত্যু মিছিলকে অনেক ছোট পরিসরে রাখতে পেরেছি।  

এই পথপরিক্রমায় মৃত্যুর ছোবল থেকে যারা বেঁচে গেছে, তারা দীর্ঘ গৃহবন্দি অবস্থা থেকে মুক্ত হয়ে প্রকৃতির কাছে ফিরে গিয়ে দেখেছে, যে প্রকৃতিকে এতদিন তারা তিল তিল করে নিঃশেষ করেছে, নিজেদের স্বার্থে যেখানে নিষ্ঠুর ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে, সেই প্রকৃতিই তাদের বিরুদ্ধে ঘুরে দাঁড়িয়েছে! প্রকৃতি তার আবাসভূমিতে নিজস্ব নিয়ম চালু করেছে! মানুষের চলাচলের স্থানগুলোতে দখলদারিত্ব দিয়েছে সাপ-বেজি-ব্যাঙ-শিয়াল ও নানা সরীসৃপ জাতীয় প্রাণীকুলকে! গাছ-পালা, লতা-পাতা, বনবীথি সব বিলুপ্তপ্রায় নানা জাতের রংবেরঙের পাখপাখালিদের দখলে ফিরে গেছে! বৈশাখের আম্রশাখায় দুষ্ট ছেলের দল অথবা পথ চলতে পথিক ঢিল ছোড়েনি তাই আমগুলো ঝুলে আছে থরে থরে! মাঠঘাট, বৃক্ষতল বাহারি রঙের কত না ফুলে ছেয়ে গেছে! জলাধারগুলোর স্বচ্ছ জলে মনের আনন্দে দল বেঁধে ফিরছে হাঙ্গর, তিমি, ডলফিনের মতো নির্বাসিত জলজ প্রাণীরা! চরগুলো দখল করে নিয়েছে লাল কাকড়ার ঝাঁক, সুনিপুণ তুলির আঁচড়ে নকশি কাঁথার আচ্ছাদনে দখল নিয়ে নিয়েছে সুকৌশলে! তাদের সাথে পাল্লা দিয়ে সাগরলতা সবুজ লতানো দেহজুড়ে তাদের বেগুনি ফুলের মেলা বসিয়েছে নিশ্চিন্তে, নির্ভাবনায়!

রাস্তা-ঘাট, বনবীথি তল, সমুদ্র সৈকত, সাগর-নদী জল আবার ভারী হয়ে উঠেছে মানুষের পদভারে। মানবেরা আবার দখলদারিত্ব নিতে চলেছে প্রকৃতির অকৃত্রিম মমতায় গড়ে তোলা তার নিজস্ব আবাসভূমিতে। সেখানে ফিরে মানবকুলের কি উচিত হবে আর কখনও প্রকৃতির এই অকৃত্রিম আয়োজন, অফুরন্ত রূপ-লাবণ্য, সম্পদ ও সম্ভাবনাকে ঔদ্ধত্যের চরণে দলে মলে নিশ্চিহ্ন করে দেয়া?

বেঁচে থাক প্রকৃতি তার অপরূপ রূপের পসরা সাজিয়ে। আর সুস্থ হয়ে উঠুক মনুষ্য প্রকৃতি, অসুস্থ, অবাঞ্ছিত আর অপ্রয়োজনীয় প্রতিযোগিতার মোহমুক্ত হয়ে!

লেখক : অ্যাডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রিমকোর্ট

ভালো লাগলে শেয়ার করে দিন :)

0 Comments

Leave a Reply

Avatar placeholder

Your email address will not be published. Required fields are marked *