ই-পেপার

SITE UNDER CONSTRUCTION
বাংলাদেশ পুলিশের মুখপত্র
অব্যাহত প্রকাশনার ৬৩ বছর

রায়হান রনি

বাঙালি বরাবরই উৎসবপ্রিয় জাতি। আনন্দ উদযাপনে গ্রাম থেকে শহর সকল শ্রেণি-পেশার মানুষের রয়েছে সমান উপস্থিতি। বাঙালি জাতির আত্মপরিচয়ে বিভিন্ন উৎসব, পূজা-পার্বণই চলে আসে সর্বাগ্রে। বাঙালি ছিল সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্যে যত্নবান এক জাতি।

বাঙালি জাতি পরিচয়ের ঐতিহাসিক যুগ শুরু হয় গুপ্তযুগ (৩২০ খ্রি.- ৬৫০ খ্রি.) থেকে এবং এ যুগেই প্রথম ক্ষুদ্র রাজ্যপুঞ্জগুলোকে নিয়ে গঠিত হয় বিশাল রাজ্য। যেমন গুপ্তদের সাম্রাজ্যিক ছত্রছায়ায় প্রতিষ্ঠিত হয় ক্ষুদ্র রাজ্যের বদলে বৃহৎ রাজ্য যেমন পূর্ব ভারতের দক্ষিণাঞ্চলের বঙ্গরাজ্য ও উত্তরাঞ্চলের গৌড় রাজ্য। বৃহৎ বঙ্গের প্রথম এবং ঐতিহাসিকভাবে সুনির্দিষ্ট এবং শক্তিশালী শাসক। শশাঙ্ক (খ্রিস্টপূর্ব আনু ৬০০ খ্রি.-৬২৫ খ্রি.) তাঁর দক্ষ শাসনের মাধ্যমে বাংলা ও বাঙালিকে মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করেন। তখন থেকেই বাঙালি জাতিসত্তার যাত্রা শুরু এবং পাল ও সেন আমলে এসে সে সত্তা আরো বিকশিত হয়ে বাঙালি জাতির শক্তিশালী ভিত্তি স্থাপন করে। সে ভিত্তির ওপরই স্থাপিত বাংলায় সুলতানি রাষ্ট্র। এ রাষ্ট্রের নাম দেওয়া হয় বাঙ্গালাহ বা বাংলা এবং বাংলা রাষ্ট্রের অধিবাসীরা পরিচিত হয় বাঙালিয়া বা বাঙালি নামে। সুলতানি আমলেই আবার সমগ্র বাঙালি জাতির জন্য তৈরি হয় একটি সাধারণ ভাষা। নাম বাংলা ভাষা। শতকের পর শতকব্যাপী বিকশিত হয়ে সুলতানি আমলে এসে আমরা পাই বাংলাদেশ, বাঙালি জাতি ও বাংলা ভাষা। এ পর্বে বাঙালি জাতি ও সংস্কৃতিতে যুক্ত হয় নতুন নৃগোষ্ঠী তুর্কি-আফগান-মধ্যএশীয় উপাদান। সরকারি পর্যায়ে বাংলা ভাষার পাশাপাশি প্রবর্তিত হয় ফার্সি ভাষা। এ উপাদান আরো সমৃদ্ধি লাভ করে মোগল আমলে (১৫৭৫-১৭১৭)। মোগল রাষ্ট্র কাঠামোয় বাংলাদেশ একটি সুবাহ বা প্রদেশ হলেও বাংলার সুবাদারেরা এর সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্যে যত্নবান ছিলেন। এ সময়ে প্রচলিত হয় বাঙালির প্রধান উৎসবাদি। বাংলা সাল, বাংলা মাসের নাম ও পহেলা বৈশাখ-এ নববর্ষ উৎসব মোগলদের অবদান। বাঙালি সমাজে প্রবর্তিত নানা উৎসব, নানা খাদ্য, নানা বেশভূষা যা বাঙালিত্বকে আরো বর্ণাঢ্য করে তোলে। পান, তামাক, পানীয়, জলসা বা আড্ডা প্রভৃতি মোগল শাসনের বিশেষ অবদান।

বাংলা নববর্ষ পালনের সূচনা হয় মূলত আকবরের সময় থেকেই। সে সময় বাংলার কৃষকরা চৈত্রমাসের শেষদিন পর্যন্ত জমিদার, তালুকদার এবং অন্যান্য ভূ-স্বামীর খাজনা পরিশোধ করত। পরদিন নববর্ষে ভূস্বামীরা তাদের মিষ্টিমুখ করাতেন। এ উপলক্ষ্যে তখন মেলা এবং অন্যান্য অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হতো। ক্রমান্বয়ে পারিবারিক ও সামাজিক জীবনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে মিশে পহেলা বৈশাখ আনন্দময় ও উৎসবমুখী হয়ে ওঠে এবং বাংলা নববর্ষ শুভদিন হিসেবে পালিত হতে থাকে।

পহেলা বৈশাখ বাংলা সনের প্রথম দিন। এটি বাঙালির সর্বজনীন লোক উৎসব। বাঙালির জীবনে পহেলা বৈশাখ যোগ করে দেয় ভিন্নমাত্রা। অতীতের ভুল ত্রুটি ও ব্যর্থতার গ্লানি ভুলে নতুন করে সুখ-শান্তি ও সমৃদ্ধি কামনায় উদযাপিত হয় বাংলা নববর্ষ।

বাঙালির প্রাণের উৎসব পহেলা বৈশাখের মঙ্গল শোভাযাত্রা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ প্রতিবছর এ মঙ্গল শোভাযাত্রার আয়োজন করে। ১৯৮৯ সালে সামরিক স্বৈরশাসনের হতাশার দিনগুলোতে শিক্ষার্থী-তরুণেরা শুরু করেছিল মঙ্গল শোভাযাত্রা। কালের বিবর্তনে যা এখন বিশ্ব ঐতিহ্যেরও অংশ।

বৈশাখী সালের ইতিহাস কয়েকশো বছরের পুরনো হলেও মঙ্গল শোভাযাত্রার ইতিহাস খুব পুরনো নয়। ১৯৮৯ সাল থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউট থেকে প্রথম এই শোভাযাত্রা বের হয়। শহরের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে এই শোভাযাত্রা পুনরায় চারুকলার গেটে এসে সমাপ্ত হয়। পরবর্তী সময়ে ধর্মনিরপেক্ষ একটি উৎসব হিসেবে এটি ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। এরই ধারাবাহিকতায় দেশের বিভিন্ন জেলা সদরে পালিত হয়ে আসছে মঙ্গল শোভাযাত্রা।

১৯৮৬ খ্রিস্টাব্দে চারুপীঠ নামের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান যশোরে প্রথমবারের মতো নববর্ষ উপলক্ষ্যে আনন্দ শোভাযাত্রার আয়োজন করে। যশোরের সেই শোভাযাত্রায় ছিল – পাপেট, বাঘের প্রতিকৃতি, পুরানো বাদ্যযন্ত্রসহ আরো অনেক শিল্পকর্ম। শুরুর বছরেই যশোরে শোভাযাত্রা আলোড়ন তৈরি করে। পরবর্তীতে যশোরের সেই শোভাযাত্রার আদলেই ঢাকার চারুকলায় ১৯৮৯ সাল থেকে মঙ্গল শোভাযাত্রা পালিত হয়ে থাকে।

মঙ্গল শোভাযাত্রার একটি রাজনৈতিক ইতিহাসও রয়েছে। ১৯৮০ দশকের স্বৈরাচার সরকারের বিরুদ্ধে একটি অবস্থানও ছিল মঙ্গল শোভাযাত্রার উদ্দেশ্য। অশুভ শক্তির বিপক্ষে শুভশক্তির সূচনা করতেই শোভাযাত্রার শুরু হয়।

শুরুতে এর নাম আনন্দ শোভাযাত্রা ছিল। তৎকালীন রাজনৈতিক অবস্থাকে মাথায় রেখেই এমনটা করা হয়েছিল। পরবর্তীতে এটি মঙ্গল শোভাযাত্রা হিসেবেই পরিচিত হয় ।

এই শোভাযাত্রা বর্ণিল রঙে রাঙা। গ্রাম বাংলার বিভিন্ন লোকজ উপাদান এই শোভাযাত্রায় ফুটিয়ে তোলা হয়। এই শোভাযাত্রা উপলক্ষ্যে বানানো হয় বিভিন্ন মুখোশ, মূর্তি, ট্যাপা পুতুল, নইশি পাখি এবং বিভিন্ন প্রাণীর প্রতিকৃতি।

১৯৮৯ সালে প্রথম আনন্দ শোভাযাত্রায় ছিল পাপেট, ঘোড়া এবং হাতি। ১৯৯০ খ্রিস্টাব্দের আনন্দ শোভাযাত্রায়ও নানা ধরনের শিল্পকর্মের প্রতিকৃতি স্থান পায়। ১৯৯১ সালে চারুকলার শোভাযাত্রা জনপ্রিয়তায় নতুন মাত্রা লাভ করে। চারুকলা অনুষদের শিক্ষার্থী, শিক্ষক-শিক্ষিকা ও শিল্পীদের উদ্যোগে হওয়া সেই শোভাযাত্রায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন ভাইস চ্যান্সেলর, বিশিষ্ট লেখক, শিল্পীগণ-সহ সাধারণ নাগরিকরা অংশ নেয়।

শোভাযাত্রায় স্থান পায় বিশালকায় হাতি, বাঘের প্রতিকৃতির কারুকর্ম। কৃত্রিম ঢাক আর অসংখ্য মুখোশখচিত প্ল্যাকার্ডসহ মিছিলটি নাচে গানে উৎফুল্ল পরিবেশ সৃষ্টি করে। ১৯৯২ খ্রিস্টাব্দে আনন্দ শোভাযাত্রার সম্মুখে রং বেরংয়ের পোশাক পরিহিত ছাত্র-ছাত্রীদের কাঁধে ছিল বিরাট আকারের কুমির। বাঁশ এবং বহু বর্ণের কাপড় দিয়ে তৈরি করা হয়েছিল কুমিরটি। ১৯৯৩ খ্রিস্টাব্দে ‘১৪০০ সাল উদযাপন কমিটি’ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের সামনে থেকে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা বের করে। শোভাযাত্রার আকর্ষণ ছিল বাঘ, হাতি, ময়ূর, ঘোড়া এবং  বিভিন্ন ধরনের মুখোশ। চারুকলার সামনে থেকে শোভাযাত্রাটি শুরু হয়ে শাহবাগ মোড় দিয়ে শিশু একাডেমি হয়ে পুনরায় চারুকলায় এসে শেষ হয়।

শুরুর দিকে এটি তেমন বর্ণাঢ্য ছিল না। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে নিজ-নিজ জায়গা থেকে ভূমিকা রাখার চেষ্টা করছিলেন অনেক শিল্পী-সাহিত্যিক। কিছুটা সেই প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে, বিশেষ করে চিত্রশিল্পীরা এই মঙ্গল শোভাযাত্রার পরিকল্পনা করেন। যার ১৯৯৬ সালে নাম হয় মঙ্গল শোভাযাত্রা। ইউনেসকো মঙ্গল শোভাযাত্রাকে মূল্যায়ন করেছে অন্যায় ও অকল্যাণের বিরুদ্ধে সত্য, ন্যায় ও কল্যাণ প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশের মানুষের সাহসী সংগ্রামের প্রতীক হিসেবে। ২০১৬ সালের ৩০ নভেম্বর স্বীকৃতি পায় বিশ্ব ঐতিহ্যের ।

জাতিসংঘের সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থা ইউনেসকো মঙ্গল শোভাযাত্রাকে তাদের ‘রিপ্রেজেনটেটিভ লিস্ট অব ইনট্যানজিবল কালচারাল হেরিটেজ অব হিউম্যানিটি’র তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছে। ইউনেসকোর স্বীকৃতি লাভের পরিপ্রেক্ষিতে সরকারি ব্যবস্থাপনায় এ বছর সারা দেশেই বৈশাখী উৎসবে মঙ্গল শোভাযাত্রা করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কোনো ধরনের পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়াই চারুকলার শিক্ষক, শিক্ষার্থী বা চিত্রশিল্পীদের নিজস্ব প্রয়াসে এ শোভাযাত্রা হয়ে উঠেছে বিশ্বের ঐতিহ্য। আমাদের সংস্কৃতিকে করে তুলেছে ঋদ্ধ।

মঙ্গল শোভাযাত্রা এমনভাবে আয়োজন করা হয়ে থাকে যা বাঙালি ও বাংলাদেশের চিরায়ত সত্তার মৌলিক অংশকেই পরম যত্নে ধারণ করে।

কবি জীবনানন্দের ভাষায়-

বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি, তাই আমি পৃথিবীর রূপ

খুঁজিতে যাই না আর….

মঙ্গল শোভাযাত্রার বার্তাও ঠিক কবির ভাষার মতো। যা বাঙালি জীবনে শুভ ও সুন্দর বার্তা বয়ে আনে, জীবনের আলাদা মানে দাঁড় করায়।

 লেখক : শিক্ষার্থী, চারুকলা অনুষদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

ভালো লাগলে শেয়ার করে দিন :)

0 Comments

Leave a Reply

Avatar placeholder

Your email address will not be published. Required fields are marked *