ই-পেপার

SITE UNDER CONSTRUCTION
বাংলাদেশ পুলিশের মুখপত্র
অব্যাহত প্রকাশনার ৬৩ বছর

মোঃ শাহ আলম

আমাদের সমাজে বসবাসকারী শিক্ষিত-অশিক্ষিত নির্বিশেষে একশ্রেণীর মানুষের মনের অবচেতন অংশে ছোটবেলা থেকেই বাসা বাধে নানা রকম ভুত-প্রেত-দেও দানার গল্প। অনেক সময় বয়স বাড়লেও এসবের রেশ বা প্রভাব সহজে দূর হতে চায় না। বরং বয়স বাড়ার সাথে সাথে এসবের সাথে যুক্ত হয় লোভ লালসা। আর এই সুযোগটাই লুফে নেয় একশ্রেণীর প্রতারক চক্র। এই প্রতারক চক্র কখনো লটারীর, কখনো স্বর্ণ-রূপা বা টাকা দ্বিগুণ করে দেওয়ার কথা বলে, কখনো ঝাড়-ফুক তাবিজ-কবজ অথবা অবাধ্য স্বামী বা স্ত্রীকে বশিকরণমন্ত্রের কথা বলে ‘ভন্ড পীর’ ‘জ্বীন’ সেজে সহজ সরল মানুষকে প্রতারিত করে তাদের সর্বস্ব হাতিয়ে নেয়। এসকল ঘটনায় থানায় বা কোর্টে মামলা হলেও স্বাক্ষী-প্রমাণের অভাবে ভুক্তভোগি প্রতিকার পেতে ব্যর্থ হন। অপরাধী পার পেয়ে যায়। এসকল অপরাধীকে আইনের আওতায় আনতে হলে দরকার বিজ্ঞানভিত্তিক তদন্ত। সাধারণ জনগণকে সচেতন করার লক্ষ্যে এমনি কয়েকটি বাস্তব ঘটনার চিত্র নাম-ধাম বদলে তুলে ধরে বিজ্ঞানভিত্তিক তদন্তের আলোকে বিষয়টি পর্যালোচনা করা হয়েছে।

চিত্রকল্প-১

ঢাকার ধানমন্ডির একটি অভিজাত ফ্ল্যাটে গভীর রাতে টিভি দেখছেন গৃহবধূ রোকেয়া আক্তার (কাল্পনিক নাম)। একটি বেসরকারি টিভিতে তখন বিরতিহীন বিজ্ঞাপন চলছে, কিভাবে পীর বা সন্ন্যাসী বাবাকে দিয়ে অবাধ্য স্বামীকে বশ করা যায়! অনেক অনেক সময় ধরে টিভিতে পীর বাবা ও সন্ন্যাসী বাবার বিজ্ঞাপন চলে। কৌতূহলি রোকেয়া ফোন করেন পীর বাবাকে। এর পরের কয়েক দিনে তিনি প্রথমে স্বামী বশ করার মন্ত্র পাওয়ার আশায়, পরে লটারিতে পুরস্কার পাওয়ার আশায় দফায় দফায় টাকা দিয়ে যান। প্রথমে বিকাশ নম্বরে এরপর নিয়মিত ব্যাংক হিসেবে। কয়েক মাসে সাড়ে ২২ লক্ষ টাকা দেয়ার পর একসময় তিনি উপলব্ধি করেন, তিনি প্রতারকের পাল্লায় পড়েছেন। তিনি ‘ব্রেন স্ট্রোকের শিকার হয়ে শয্যাশায়ী হন। কিন্তু স্বামী বা সন্তান কাউকেই বলতে পারেননি যে তিনি সর্বস্বান্ত হয়েছেন। একপর্যায়ে তিনি সিআইডির সাথে যোগাযোগ করেন।

চিত্রকল্প-২

আরেকটি ঘটনায় টিভি জিনের বিজ্ঞাপনে সাড়া দিয়ে লটারির গোপন নম্বর পাওয়ার আশায় মধ্যপ্রাচ্য প্রবাসী জনৈক মো. আবুল হোসাইন বাংলাদেশে অবস্থানকালে তিনি নিজে; প্রবাসে থেকেও দেশে অবস্থানরত তার স্ত্রীর মাধ্যমে বিকাশ ও একটি বেসরকারি ব্যাংকের হিসাবে পর্যায়ক্রমে মোট ৬৪ লক্ষ টাকা প্রদান করেন। এভাবেই পীরবাবাকে খুশি করার জন্য, তিনি নিজের সমস্ত কষ্টার্জিত আয় পীর বাবাকে দিয়েছেন। জমি বিক্রি করেছেন, ভিটেবাড়ি বন্ধক দিয়ে নিঃস্ব হয়ে স্ত্রীকে নিয়মিত ফোনে গালাগালি করছেন; পীর বাবাকে আরো টাকা দেয়া হচ্ছে না কেন! স্ত্রী উপায়ান্তর না দেখে সিআইডির কাছে আসেন।

প্রতারক ‘টিভি জিন’-এর ঘটনায় মামলা রুজু হয়।

কয়েকটি বেসরকারি টিভি চ্যানেলে বাংলাদেশ সময় রাত ১টা থেকে ৩টা পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে একটানা এক বা দুই ঘণ্টা সকল সমস্যার সমাধানের কিংবা লটারিতে টিকিট জেতার ভুয়া আশ্বাস দিয়ে ক্রমাগত বিজ্ঞাপন চলতে থাকে। বিজ্ঞাপন প্রচারকারীদের টার্গেট থাকে, মধ্যপ্রাচ্যের প্রবাসী দর্শক, যারা স্ত্রী-পরিজনকে দেশে রেখে এসেছেন তাঁদের টার্গেট করে চলতে থাকে একে একে ‘পরকীয়া’নাশক পীর-সন্ন্যাসীর প্রোগ্রাম। কখনো কখনো এরা ‘জ্বিন বা জ্বিনের সর্দার বলেও দাবী করে থাকে। স্বদেশে বা প্রবাসের নারী বা পুরুষ টিভি চ্যানেলে দেয়া নম্বরে ফোন করে এভাবেই প্রতারণার সহজ শিকারে পরিণত হন।

চিত্রকল্প-১-এ বর্ণিত রোকেয়া আক্তার এবং চিত্রকল্প-২-এ বর্ণিত মো. আবুল হোসাইনও একইভাবে প্রতারণার শিকার হয়েছেন। অবশেষে সিআইডির সাইবার পুলিশের তদন্তে বেরিয়ে আসে, ভোলার বোরহানউদ্দিন থানাধীন ফুলকাচিয়া গ্রামের জনৈক তুহিন ও তার ভাই কাজল ভুয়া পরিচয়ে সিম তুলে তা জনৈক আজাদ হাওলাদারের মাধ্যমে ঢাকার ফকিরাপুলে বসবাসরত জনৈক তৈয়বের সহায়তায় এসব বিজ্ঞাপন তৈরি করে এবং সেসব বিজ্ঞাপন কয়েকটি বেসরকারী টিভিতে গভীর রাতে, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের প্রবাসী দর্শকদের উদ্দেশ্যে প্রচার করে। বিজ্ঞাপনের মোবাইল নম্বরে পারিবারিক সমস্যা সমাধানের প্রত্যাশায় ফোন করে বহু দর্শক প্রতারিত হয়। অপরাধচক্রটি কাজলের স্ত্রী জান্নাতুলের নামে তফশিলী ব্যাংকের অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে স্বনামে ও বেনামে বিভিন্ন মোবাইল হিসাবের মাধ্যমে প্রতারিত ভিকটিমের অর্থ গ্রহণ করে। অপরাধচক্র ক্ষেত্রবিশেষে মানিগ্রামের পিনকোড ব্যবহার করেও রেমিট্যান্স সংগ্রহ করে।

অবাক হওয়ার বিষয় হলো, অধিকাংশ সময়ই প্রতারক ‘জিন’ (কিংবা কথিত ‘পীর’ বা ‘সন্ন্যাসী’) ভুয়া বিকাশ হিসেবে নয়, নিয়মিত ব্যাংক হিসাব ব্যবহার করেই অর্থ সংগ্রহ করে!

সিআইডির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী টিভি জিনের কর্মকৌশলচিত্র (অর্থাৎ টিভি জিন যে কৌশলে কাজ করে, তা হচ্ছে) : স্বনামে বা বেনামে সিম সংগ্রহ; জিন নিয়োগ; ভুয়া নামে মোবাইল হিসাব খোলা ও বিশ্বস্ত সহচরের নামে নিয়মিত ব্যাংক হিসাব খোলা; অপরাধচক্রের উপযুক্ত সহযোগীর মাধ্যমে প্রতারণামূলক বিজ্ঞাপন তৈরি করা ও কতিপয় বেসরকারি টিভিতে প্রচার; বিজ্ঞাপন প্রচারের পর বিজ্ঞাপনে দেয়া কথিত পীর বা সন্ন্যাসীর মোবাইল নম্বরে ভিকটিমদের কল এলে কথিত জিন কর্তৃক কল রিসিভ করা; কথিত জিনের প্ররোচনায় ভিকটিম কর্তৃক প্রদত্ত অর্থ নির্ধারিত হিসাবের মাধ্যমে সংগ্রহ করা; আদায়কৃত অর্থের ভাগ স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি ও অন্যান্য নিয়ামক গোষ্ঠীকে প্রদান; প্রযোজ্য ক্ষেত্রে আইনজীবী নিয়োগ ও ভিকটিমের সাথে অল্প অর্থের বিনিময়ে (যেমন ৫০ লক্ষ টাকার স্থলে পাঁচ লক্ষ টাকা দিয়ে) সমঝোতার চেষ্টা।

এসব ঘটনায় সাধারণত খুব কমই মামলা দায়ের হয়ে থাকে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীরা মামলা দায়েরের বদলে ঘটনা চেপে যেতেই পছন্দ করেন। তাছাড়া প্রয়োজনীয় তথ্যের এবং বৈজ্ঞানিক তদন্তের অভাবে এসব মামলায় অভিযুক্তরা পার পেয়ে যায়। আসুন দেখি এ ক্ষেত্রে একজন সাধারণ তদন্তকারী কর্মকর্তা কোন পদ্ধতিতে তদন্ত করেন? এবং কেন অভিযুক্তরা পার পেয়ে যায়? একটি কাল্পনিক তদন্তের চিত্রের আশ্রয় নেয়া যাক।

তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই ‘স’ মামলাটি তদন্তভার গ্রহণ করে যথাসময়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন; ঘটনাস্থলের খসড়া মানচিত্র ও সূচিপত্র পৃথক পৃথক কাগজে অঙ্কন করেন। ঘটনাস্থল হতে আলামত জব্দ করার চেষ্টা করেন। বাদী ও তার মনোনীত সাক্ষীসহ ঘটনাস্থলে আশপাশে লোকজনদের জিজ্ঞাসাবাদ করে তাদের জবানবন্দি ফৌজদারি কার্যবিধি ১৬১ ধারা মোতাবেক লিপিবদ্ধ করেন। অপরাধের সাথে জড়িত মোবাইল নম্বরগুলোর সিডিআর সংগ্রহপূর্বক পর্যালোচনা করেন। এসআই ‘স’-এর অন্য ইউনিটে বদলি হওয়ায় মামলাটির তদন্ত শেষ করার জন্য অফিসার ইনচার্জ এসআই ‘ব’-এর নামে হাওলা করেন। তিনি তদন্তভার গ্রহণ করে মামলার কেস ডকেট পর্যালোচনা করেন। সাক্ষীদের জিজ্ঞাসাবাদ করেন। বিকাশ নম্বরের মালিকানা যাচাইপূর্বক অপরাধীদের শনাক্ত করার চেষ্টা করেন। সোর্স নিয়োগপূর্বক মামলাটি সরেজমিনে গোপনে ও প্রকাশ্যে ব্যাপক তদন্ত করেন। তিনি ঘটনার সহিত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ করেন। বিকাশ নম্বরগুলোর মালিকের পরিচয় জানার জন্য সিডিআরের আবেদন করেন। সিডিআর পাওয়ার পর তিনি দেখতে পান যে, সকল মোবাইল সিমের রেজিস্ট্রেশন ফরমে একজন মহিলার ছবি। জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বরগুলো অসম্পূর্ণ। রেজিস্ট্রেশন ফরমে কোন ঠিকানা উল্লেখ নেই। পরবর্তী সময়ে বিকাশের মালিকানা যাচাইয়ের জন্য রেজিস্ট্রেশন ফরম সংগ্রহ করে জানতে পান, প্রতারকচক্র ভুয়া আইডি ব্যবহার করে বিকাশ নম্বর রেজিস্ট্রেশন করেছে। প্রতারণাকারীদের কোনো নাম-ঠিকানা পাওয়া যায়নি এবং মোবাইল ফোনগুলো বর্তমানে বন্ধ আছে। কোনো প্রতারণাকারীর নাম-ঠিকানা না পাওয়ায় বা সঠিক সাক্ষ্য-প্রমাণ না থাকায় এবং মামলার মূল রহস্য উদ্ঘাটন না হওয়ায় মামলাটি তদন্ত শেষ করে তিনি তাঁর তদন্তের বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবগত করেন। উধ্বতন কর্মকর্তারা তদন্তকারী কর্মকর্তার সাথে একমত পোষণ করে বিজ্ঞ আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন সত্য দাখিল করেন। তিনি বাদীকে তদন্তের ফলাফল অবহিত করেন।

এবার বলুন, হোয়াট ইজ দ্য মোরাল অব দিস স্টোরি? এ তদন্তে আমার বা আপনার জন্য শিক্ষণীয় কী আছে? (সংকেতÑ আধুনিক ঈশপের বাণী : ‘কেবল মোটা দাগে কমন সেন্স প্রযুক্তিভিত্তিক তদন্ত জ্ঞানের বিকল্প নয়’), তার আগে বলুন, তদন্তের ফলাফলে আপনি সন্তুষ্ট তো?

না?

কেন সন্তুষ্ট না? এবার দেখা যাক, মামলার তদন্তে তদন্তকারী কর্মকর্তা কী কী বিষয় আমলে নেন নি।

এই তদন্তটি যদি সাধারণ কোন তদন্ত না হয়ে, বিজ্ঞান ভিত্তিক তদন্ত হতো ফলাফল কী হতো? তার আগে জেনে নেয়া যাক, বিজ্ঞানভিত্তিক তদন্ত কী? বিজ্ঞান ভিত্তিক তদন্ত হচ্ছে সাক্ষ্য-প্রমাণ সংগ্রহ; আরো সুনির্দিষ্টভাবে বললে আদালতগ্রাহ্য সাক্ষ্য-প্রমাণ সংগ্রহ। আইনশৃঙ্খলা রক্ষার পাশাপাশি অপরাধের তদন্ত পুলিশের অন্যতম একটি দায়িত্ব। তো, ভালো তদন্ত বা বিজ্ঞানভিত্তিক তদন্তের বিষয়ে কথা বলার আগে আমরা দেখি, দুর্বল বা বাজে তদন্ত আমরা কাকে বলব? মামলার তদন্তে, বিশেষ করে সংঘবদ্ধ অপরাধের মামলার তদন্তে অপরাধের মূল উৎস খোঁজার চেষ্টা না করা দুর্বল তদন্তের নামান্তর। দুর্বল তদন্তের কয়েকটি দৃষ্টান্ত হচ্ছে : অপরাধস্থলে বিলম্বে পৌঁছানো; অপরাধস্থল সংরক্ষণ না করা; অপরাধস্থল থেকে বস্তুগত সাক্ষ্য সংগ্রহ না করা; অপরাধস্থলের ছবি তুলে না রাখা; একাধিক অপরাধস্থল বিবেচনায় না রাখা। ঘটনার পরপরই অপরাধীকে খোঁজার চেষ্টা না করা; এজাহারনামীয় আসামির বাইরে কোনো অপরাধীকে চিহ্নিত করার চেষ্টা না করা, গ্রেপ্তারের কার্যকর চেষ্টা না করে আসামিকে পলাতক দেখিয়ে অভিযোগপত্র দাখিল করা, আসামিদের বিরুদ্ধে পর্যাপ্ত সাক্ষ্য-প্রমাণাদি সংগ্রহ না করে মামলার তদন্ত শেষ করা; সাক্ষীদের সাক্ষ্যের মধ্যে সমন্বয় না থাকা; সাক্ষীর উপস্থিতির বিশ্বাসযোগ্যতা না থাকা; চান্স সাক্ষী খোঁজার চেষ্টা না করা; কার্যবিধি ১৬১ ধারার জবানবন্দি যেনতেনভাবে লিপিবদ্ধ করা; জব্দ তালিকা প্রস্তুতকালে নিরপেক্ষ সাক্ষী রাখার চেষ্টা না করা; জব্দতালিকা, সুরতহাল প্রতিবেদন প্রভৃতি সঠিকভাবে তৈরি না করা। আসামিকে সাক্ষী হিসেবে উপস্থাপন করা; সাক্ষীদের বক্তব্যের পারস্পরিক সামঞ্জস্যতা কিংবা এজাহারের সাথে সামঞ্জস্যতা বিষয়টি বিবেচনায় না রাখা; প্রযোজ্য ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ মতামত, ময়নাতদন্ত বা চিকিৎসা সনদের সাথে তদন্তে প্রাপ্ত অসামঞ্জস্যতার ব্যাখ্যা না দেওয়া; যথাসময়ে সিডিআর, আইপি তথ্য, ব্যাংক হিসাব বিবরণী প্রভৃতি সংগ্রহের জন্য বিভিন্ন সংস্থা বা ব্যক্তির সাথে যোগাযোগ বা পত্রালাপ না করা; প্রযোজ্য ক্ষেত্রে স্থিরচিত্র, ভিডিও বা অডিও সাক্ষ্য সংগ্রহ বা সংরক্ষণের বিষয়টি গুরুত্ব না দেওয়া; প্রযোজ্য ক্ষেত্রে আইটি ফরেনসিক বা অন্যান্য ফরেনসিক বিশেষজ্ঞের মতামত বা সহায়তা না নেওয়া; উদ্দেশ্যমূলকভাবে প্রস্তুতকৃত ও অসামঞ্জস্যপূর্ণ তথ্য ও মতামত সংবলিত ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন, মেডিক্যাল সার্টিফিকেট কিংবা অন্যান্য বিশেষজ্ঞ প্রতিবেদনকে বিনা প্রশ্নে চূড়ান্ত ধরে নিয়ে অত্যন্ত ত্রুটিপূর্ণভাবে যেনতেন করে মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করা।টিভি জিনসংক্রান্ত মামলায় সাইবার পুলিশ সেন্টার সিআইডির তদন্ত পরিকল্পনা সংক্ষেপে, নিম্নরূপ: অর্থপ্রবাহ অনুসরণ; প্রতারণার অর্থ সংগ্রহকারী (মোবাইলও) নিয়মিত ব্যাংক হিসাবধারীকে গ্রেপ্তার, ভুয়া নামে সিম বিক্রেতা, সিম অ্যাক্টিভেটর, সিমের রেজিস্টার্ড ব্যবহারকারী ও প্রকৃত ব্যবহারকারী (জিন কিংবা পীর বা সন্ন্যাসী)-কে গ্রেপ্তার; এদের মাধ্যমে জিনের স্থানীয় ব্যবস্থাপক, মুখ্য নিয়ন্ত্রণকারী ও বিজ্ঞাপন নির্মাতা ও মিডিয়ায় প্রচার সমন্বয়কারীকে শনাক্তকরণ ও গ্রেপ্তার; মিডিয়ায় প্রচারকারী, মোবাইল বা নিয়মিত ব্যাংকিংয়ের ডিস্ট্রিবিউটরসহ অন্যান্য নিয়ামক গোষ্ঠীর দায়-দায়িত্ব নির্ধারণ ও প্রশাসনিক/আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ; প্রযোজ্য ক্ষেত্রে অপরাধলব্ধ আয়/সম্পদ ক্রোককরণ ও ব্যাংক হিসাব জব্দকরণ।

টিভি জিনের কর্মকা- সংঘবদ্ধ অপরাধের শামিল। সংঘবদ্ধ অপরাধে মুখ্য আয়ভোগী বা মূল হোতাকে দেখা যায় না। সংঘবদ্ধ অপরাধচক্রের শিকার অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মামলা রুজু করতে অনীহা প্রকাশ করেন। তাই পুলিশের কাজ হচ্ছে, ভিকটিমকে অভয় দিয়ে মামলা রুজু করানো এবং অর্থ তথা অপরাধলব্ধ আয়কে অনুসরণ করে তদন্ত শুরু করা।

১ নং চিত্রে একটি টিভি জিনের মাত্র এক দিনের কলচার্টটি দেখুন। টিভি জিনের সাথে দ্বিতীয় বা তৃতীয়বার যাঁরা কথা বলেছেন, আমাদের পর্যবেক্ষণে তাঁদের অধিকাংশই সম্ভাব্য শিকার হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন (চিত্রে বৃত্ত চিহ্নিত মোবাইল নম্বরগুলো সম্ভাব্য শিকারের নম্বর)। অবশ্য মাত্র একবার কথা বলেও কেউ কেউ ভিকটিম হতে পারেন। দেখতেই পাচ্ছেন, এমন অনেকেই আছে যাঁরা একবারের বেশি কথিত ‘জিনের’ কল রিসিভ করেননি; অর্থাৎ আপনি মানুষকে যেমন দেখতে চান তাঁরা তেমনটাই চালাক। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত অনেক মানুষই আছে, যাঁরা খবরের কাগজ, টেলিভিশন, ইন্টারনেট কিংবা ছাপার কাগজে লেখা যেকোনো কিছুকেই সত্য বলে বিশ্বাস করেন। আর এতেই তাদের, মানে ‘জিন’দের, মানে কিনা প্রতারকদের দিন চলে যায়!

তো, দেখুন, একজন টিভি জিন সারা দেশে প্রতিদিন অসংখ্য ভিকটিম তৈরি করছে। কিন্তু সারা দেশে তার বিরুদ্ধে অসংখ্য মামলা রুজু হচ্ছে না।

এবার আবার ওসি বোরহানউদ্দিন কিংবা ওসি গোবিন্দগঞ্জের কথা ভেবে দেখুন। তাঁর চারপাশে হয়তো অসংখ্য ‘জিনের বাদশাহ’ উনি দেখতে পান; কিন্তু মামলা নেই বলে উনি কোনো ব্যবস্থা নিতে পারেন না। পুলিশ ভিকটিমকে দিয়ে মামলা রুজু করে ক্যাশ-আউট পয়েন্ট ধরে বোরহানউদ্দিন (টিভি জিনের ক্ষেত্রে) বা গোবিন্দগঞ্জে (মোবাইল জিনের ক্ষেত্রে ‘মোবাইল জিন’ গভীর রাতে ‘জিনের বাদশাহ’ পরিচয়ে ফোন করে সম্ভাব্য ‘শিকার’কে বড়শিবিদ্ধ করার চেষ্টা করে) হাজির হলে ওসি বোরহানউদ্দিন বা ওসি গোবিন্দগঞ্জের কাজ সহজতর হয়। যে ‘জিনের’ সাথে সারা দেশে প্রতিদিন ধরা যাক, ১০০টি কল হয় এবং এর ধারাবাহিকতায় অন্তত ১০টি ভিকটিম তৈরি হয়, তাকে প্রতিদিন ১০ বা পাঁচটি মামলায় আসামি করা হলে (এবং একবার গ্রেপ্তার হয়ে) ১০ বা পাঁচ মামলায় shown arrest হতে থাকলে অপরাধটি তার কাছে এত লাভজনক মনে নাও হতে পারে। সর্বোপরি প্রযোজ্য ক্ষেত্রে দ-বিধি ৭৫ ধারা যোগ করে বর্ধিত শাস্তির (enhanced punishment) ব্যবস্থা করা হলে এবং অপরাধলব্ধ আয় ভোগকারীদের অপরাধলব্ধ আয় ও সম্পত্তি জব্দ করে মানি লন্ডারিং আইনে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলে আশা করা যায় সংঘবদ্ধ অপরাধচক্রের কাছে একটি দৃষ্টান্তমূলক বার্তা পৌঁছানো সম্ভব হবে। জি? কী বলছেন? জিন ফোন করলেই মানুষ টাকা দেয় কেন? কেন? হুম, আপনিই বলুন, মানুষ এত বোকা হয় কেন? আচ্ছা, এ গল্প আরেক দিন হবে।

লেখক : ডিআইজি সাইবার পুলিশ সেন্টার

সিআইডি বাংলাদেশ পুলিশ

ভালো লাগলে শেয়ার করে দিন :)

0 Comments

Leave a Reply

Avatar placeholder

Your email address will not be published. Required fields are marked *