ই-পেপার

SITE UNDER CONSTRUCTION
বাংলাদেশ পুলিশের মুখপত্র
অব্যাহত প্রকাশনার ৬৩ বছর

সেলিনা হোসেন

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ গ্রন্থে জেলে অবস্থানকালে ভাষা আন্দোলন প্রসঙ্গে লিখেছেন : ‘আমাদের এক জায়গায় রাখা হয়েছিল জেলের ভিতর। যে ওয়ার্ডে আমাদের রাখা হয়েছিল, তার নাম চার নম্বর ওয়ার্ড। তিনতলা দালান। দেওয়ালের বাইরেই মুসলিম গার্লস স্কুল। যে পাঁচ দিন আমরা জেলে ছিলাম সকাল দশটায় স্কুলের মেয়েরা ছাদে ওঠে স্লোগান দিতে শুরু করতো, আর চারটায় শেষ করতো। ছ্ট্টো ছোট্ট মেয়েরা একটুও ক্লান্তও হতো না। ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’, ‘বন্দী ভাইদের মুক্তি চাই’, ‘পুলিশি জুলুম চলবে না’- নানা ধরনের স্লোগান। এই সময়ে শামসুল হক সাহেবকে আমি বললাম, “হক সাহেব ঐ দেখুন, আমাদের বোনেরা বেরিয়ে এসেছে। আর বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা না করে পারবে না।” হক সাহেব আমাকে বললেন, “তুমি ঠিকই বলেছ, মুজিব।”

বঙ্গবন্ধু তাঁর রাজনৈতিক প্রজ্ঞায় ভাষা আন্দোলনে নারীর অবদানকে মূল্যায়ন করেছিলেন। নারীর ভূমিকাকে তিনি মূল্যায়ন করেছিলেন দ্বিধাহীনভাবে – স্পষ্ট কন্ঠস্বরে এবং বড় পরিসরে। লক্ষ্য অর্জনে নারী-পুরুষের সমতার জায়গা থেকে। অথচ আজ পর্যন্ত এটি একটি অবধারিত সত্য যে, ইতিহাসের মূলধারায় নারীর অবদান যথাযথভাবে স্বীকৃত হয় না। ইতিহাসবিদরা অধিকাংশ ক্ষেত্রে নারীর অবদানকে পাশ কাটিয়ে যান কিংবা খানিকটুকু স্বীকার করলেও স্বীকারের মাত্রা বিস্তৃত বিশ্লেষণ পায় না। ফলে নামমাত্র উল্লেখে পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি ইতিহাসকে একরৈখিক করে রাখে। বায়ান্নোর ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসও নারীকে প্রকৃত মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করেনি। অথচ এই আন্দোলনে নারীর ভূমিকা গৃহিণী থেকে শুরু করে গণপরিষদের সদস্য পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। প্রতিটি ক্ষেত্রেই নারী তার ভূমিকাকে সক্রিয় রেখেছে।

১৯৪৭ সালে ধর্মের ভিত্তিতে ভাগ হওয়া নতুন রাষ্ট্র পাকিস্তান একটি রক্ষণশীল রাষ্ট্র কাঠামোর অধীনে নারীর সর্বত্র অভিগম্যতা সহজ বিষয় ছিল না। তার পরও ১৯৪৭ সালের ডিসেম্বর মাস থেকে সূচিত রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে নারী ধর্মের ধুয়া তুলে নিষ্ক্রিয় থাকেনি। সভায়-মিছিলে অংশগ্রহণ করেছে। এমনকি স্কুলের ছাত্রীরাও মিছিলে যোগ দেওয়ার জন্য রাস্তায় নেমে এসেছে।

রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীদের ওপর দায়িত্ব পড়েছিল আন্দোলন পরিচালনার জন্য অর্থ সংগ্রহ করার। তাঁরা কাজটি করার সঙ্গে সঙ্গে নিজেদের সচেতনতা বোধ থেকে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছিলেন। ভাষা আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী রওশন আরা বাচ্চু তাঁর স্মৃতিচারণায় বলেছেন, ‘আমরা সেই সময়ে ঘরে ঘরে গিয়েছি। বেশির ভাগ নারী তো চাকরিজীবী ছিলেন না। তারা তাদের একটি গয়না দিয়েছেন, কিংবা যিনি পেরেছেন তিনি টাকা দিয়েছেন। আমরা তাদের মাতৃভাষার মর্যাদার কথা বোঝাতাম। আমাদের আত্মমর্যাদা রক্ষার জন্য বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করা কেন জরুরি সে কথা বলতাম। এভাবে আমরা ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ স্লোগানের পক্ষে সচেতনতা গড়ে তুলেছিলাম। মানুষ যে স্বতঃস্ফূর্তভাবে এই আন্দোলনে যোগ দিয়েছিল, এটিও ছিল তার অন্যতম কারণ।’ তিনি আরও বলেছেন, ‘পরিবারের বাধার কারণে মেয়েরা অনেক সময় বোরকা পরে মিছিলে আসত। একবার বাংলাবাজার স্কুলের এক ছাত্রীকে মা মিছিলে আসতে দেবে না বলে চুল কেটে দিয়েছিল। মেয়েটি মাথায় ওড়না পেঁচিয়ে মিছিলে এসেছিল। এভাবে মেয়েরা সাধ্যমতো সহযোগিতা করেছে।’ রওশন আরা বাচ্চুর স্মৃতিচারণায় দুটি বড় জিনিস ওঠে আসে। একটি নারীদের গায়ের গয়না খুলে দেওয়ার বিষয়। অন্যটি পরিবারের বাধা উপেক্ষা করে মিছিলে অংশগ্রহণ। নারীরা প্রথমটায় নেপথ্য কর্মী-অর্থ দিয়ে আন্দোলন পরিচালনার কাজটি করেছে। আন্দোলনের ধারাটি বেগবান রাখার জন্য সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করেছে। দ্বিতীয়টি ছিল সরাসরি অংশগ্রহণ। ছেলেদের ক্ষেত্রে পারিবারিক বাধা কম থাকে। বাড়ি থেকে বের হওয়ার কাজটি ছেলেদের জন্য বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা নয়। তারপরও মেয়েদের অবস্থান ছিল ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ-সামাজিক এবং রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে। কারণ, মেয়েদের বেড়ি ভেঙে এগোতে হয়েছিল। এই কঠিন কাজটি মেয়েরা করেছিল সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের বিবেচনা থেকে। অস্তিত্বের সঙ্কট থেকে পরিত্রাণ লাভের প্রবল তাড়নায়। ইতিহাস এভাবেই এগোয়। ইতিহাস এভাবে নারী-পুরুষের সম্মিলিত চেষ্টায় অর্জন করে গৌরব। নারীকে বাদ রেখে ইতিহাসের কোনো বড় অর্জন কখনোই সম্ভব হয়নি। বরং বড় অর্জনের দুর্ভোগের দায়ভাগও নারীকে প্রবলভাবে সইতে হয়।

বলছিলাম ভাষা আন্দোলনে নারীর অংশগ্রহণের কথা। দেশ ভাগের পরে পার হয়ে যায় সাড়ে চার বছর। বিভিন্ন সময়ে ভাষার দাবিতে আন্দোলন অব্যাহত রেখেছে ছাত্রসমাজ। শাসক গোষ্ঠীর হুঙ্কার ছিল, উর্দু, উর্দুই হবে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা। ছাত্ররা প্রতিবাদে-প্রতিরোধে ফেটে পড়েছিল। ১৯৫২ সালের ৩১ জানুয়ারি ঢাকার লাইব্রেরি হলে গঠিত হয় ‘সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ।’ পরিষদ ২১ ফেব্রুয়ারি সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানে সভা, হরতাল, বিক্ষোভ মিছিল ইত্যাদি কর্মসূচির ঘোষণা দেয়। ২১ ফেব্রুয়ারি বিকেল  ৩টায় ছিল গণপরিষদের অধিবেশন। বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার জন্য স্মারকলিপি প্রদানের উদ্দেশ্যে গণপরিষদের দিকে মিছিল নিয়ে যাওয়ার কর্মসূচিও ছিল। ছাত্রসমাজের এমন কর্মসূচিতে বিচলিত বোধ করে সরকার। তখন পূর্ব পাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন নূরুল আমীন। তার সরকার ২০ ফেব্রুয়ারি থেকে এক মাসের জন্য ১৪৪ ধারা জারি করে আন্দোলন দমন করার চেষ্টা করে।

২১ তারিখ সকাল থেকে ছাত্রছাত্রীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায় জমায়েত হয়। কারণ, ১৪৪ ধারা ভাঙার সিদ্ধান্ত নিয়েছে তারা। ভাষা আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী ড. সুফিয়া আহমদ স্মৃতিচারণায় বলেছিলেন, তার ওপর দায়িত্ব পড়েছিল আনন্দময়ী ও বাংলাবাজার স্কুলের মেয়েদের জড়ো করে বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায় নিয়ে আসার। তিনি কাজটি করেছিলেন। সিদ্ধান্ত হয়েছিল, ছেলেরা দশ জন করে এবং মেয়েরা চার জন করে বের হয়ে পুলিশের ব্যারিকেড পার হয়ে এগিয়ে যাবে। তিনি আরও বলেন, প্রথমে ছাত্রদের দুটি দল মিছিল নিয়ে বের হলে পুলিশ তাদের গ্রেফতার করে ট্রাকে তোলে। তৃতীয় দল নিয়ে বের হয় মেয়েরা। কিছুদূর যাওয়ার পর শুরু হয় পুলিশের লাঠিচার্জ। টিয়ার গ্যাস ছোড়া হয়। তিনি সামান্য আহত হয়েছিলেন। তারপরও গণপরিষদ ভবনের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করেন। একদিকে ছিল পুলিশের হামলা, অন্যদিকে ছাত্ররা পুলিশের ওপর ইট-পাটকেলের টুকরো ছুড়ছিল। তিনি বলেন, তাঁর মনে হয়েছিল তারা বুঝি কোনো যুদ্ধক্ষেত্রে আছেন। পরমুহূর্তে পরিস্থিতি আয়ত্তে আনার জন্য পুলিশ গুলিবর্ষণ করে। শহীদ হন শান্তিপূর্ণ মিছিলে অংশগ্রহণকারী সালাম, রফিক, বরকত, জব্বারসহ অনেকে। তারা সন্ধ্যা পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ছিলেন। সন্ধ্যার পর পরিস্থিতি খানিকটা শান্ত হলে তিনি বাড়ি ফেরেন।

ড. সুফিয়া আহমেদ স্মৃতিচারণায় স্পষ্টই বোঝা যায়, নারী হিসেবে পরিস্থিতি মোকাবিলা করার জন্য তারা ভীত ছিলেন না। টিয়ারগ্যাস, লাঠিচার্জ ও গুলি মাথায় নিয়ে আন্দোলনকে সফল করার জন্য তাঁরা ছিলেন অবিচল। এই অবিচল নিষ্ঠা নিয়ে নারী ইতিহাসের প্রথম সারির মানুষ।

ড. হালিমা খাতুন ছিলেন ভাষা আন্দোলনের অংশগ্রহণকারীদেরই একজন। তাঁর স্মৃতিচারণায় বলেন, ১৪৪ ধারা ভাঙা নিয়ে তুমুল উত্তেজনা ছিল তাঁদের। তাঁর ওপর দায়িত্ব ছিল মুসলিম গার্লস স্কুল এবং বাংলাবাজার গার্লস স্কুল থেকে মেয়েদের নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায় আসা। ১৪৪ ধারা ভাঙার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তাঁর দল ছিল মেয়েদের প্রথম দল। পুলিশ পথ আটকালে তারা পুলিশের রাইফেল ঠেলে স্লোগান দিতে দিতে এগিয়ে যান। পুলিশ লাঠিচার্জ করে এবং টিয়ারগ্যাস ছোড়ে। তাঁরা বিন্দুমাত্র দমে না গিয়ে ঢাকা মেডিকেলের ইমার্জেন্সি থেকে প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে আবার রাস্তায় নেমে আসেন এবং গণপরিষদ ভবনের দিকে এগোতে থাকেন। কিন্তু বেশিদূর যেতে পারেননি তাঁরা। শুরু হয় পুলিশের গুলিবর্ষণ। গুলিতে রফিকের মাথার খুলি উড়ে যায়। সেই রাতে রফিকের ছবির একটি ব্লক তৈরি করা হয়। ব্লকটি রাখা হয় সলিমুল্লাহ হলে। তাঁদের বন্ধু সাবেক অর্থমন্ত্রী প্রয়াত শাহ কিবরিয়ার রুমে। পুলিশ হল তল্লাশি শুরু করলে সবাই সেখান থেকে সরে পড়েন। হল পুলিশের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। এ অবস্থায় রফিকের ছবির ব্লকটি নিয়ে আসার জন্য তাঁকে হলে পাঠানো হয়। তিনি বলেন, ভীষণ ঝুঁকির মুখে জীবন হাতে নিয়ে ব্লকটি উদ্ধার করেছিলাম। এখন পর্যন্ত রফিকের যে ছবিটি দেখা যায়, সেটি ওই ব্লক থেকে তৈরি।

নারীদের ভাষা আন্দোলনে অংশগ্রহণের এটি আরেকটি ভিন্ন দিক। আন্দোলনের ভিন্ন মাত্রা বাড়িয়ে তোলায় নারীদের চেষ্টার কমতি ছিল না। তাঁরা ঝুঁকি নিয়েছিলেন জীবনের পরোয়া না করে। শহীদ রফিকের ছবি আজকে ইতিহাসের দলিল। এই গুরুত্বপূর্ণ জায়গাটি ধরে রেখেছিলেন একজন নারী।

রওশন আরা বাচ্চু সেদিনের স্মৃতিচারণায় বলেছেন, তিনি দেখতে পান, ছাত্রদের দুটো দল পুলিশের ব্যারিকেড টপকে চলে যায়। এর পরই তিনি অন্যদের নিয়ে সামনে গিয়ে দাঁড়ান। তাকে সামনে পেয়ে পুলিশের লাঠিচার্জের আঘাত এসে পড়ে তার ওপরে। তিনি পুলিশের এলোপাতাড়ি লাঠিপেটায় আঘাতপ্রাপ্ত হন। গুলিবর্ষণ শুরু হলে রাস্তার পাশের একটি পুরনো রিকশার গ্যারেজে লুকিয়ে থাকেন। অনেকক্ষণ সেখানে থেকে সন্ধ্যায় ছাত্রী হোস্টেলে ফিরে যান।

লক্ষণীয় যে, তিনজন নারীর স্মৃতিচারণায় বোঝা যায়, সেদিনের পরিস্থিতিতে তারা রাস্তার রণক্ষেত্রে উপস্থিত ছিলেন। পুলিশের নানামুখী আক্রমণের শিকার হয়েছেন। নারী বলে পুলিশ তাদের ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখেনি। কোনো ধরনের সৌজন্যমূলক আচরণ করেনি এবং এটি নির্মম সত্য, সেদিন তাদের কেউ শহীদ হয়ে যেতে পারতেন। হননি এটা নেহায়েতই একটি দৈব ঘটনা মাত্র। কিন্তু তারা পরিস্থিতির ঝুঁকির সামনে ছিলেন।

সাহসী নারী নাদেরা বেগম তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী। তিনি কমিউ্যনিস্ট পার্টির ছাত্রী সংগঠনে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। মেয়েদেরকে ভাষা আন্দোলনে উদ্বুদ্ধ করতেন। মিছিলে – মিটিংয়ে সক্রিয় ছিলেন।

মিছিলে গুলিবর্ষণের সময় গণপরিষদের অধিবেশন চলছিল। অধিবেশন চলাকালেই গুলিবর্ষণের খবর পৌঁছায় সেখানে। মওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ প্রথম দাবি উত্থাপন করেন এই বলে, আগে গুলিবর্ষণের তদন্ত হোক, তারপর অধিবেশন চলবে। গণপরিষদ সদস্য আনোয়ারা খাতুন জোরালো ভাষায় বক্তব্য রাখেন। স্পিকার আবদুল করিমের সঙ্গে তীব্র ভাষায় তর্কবিতর্কের পর আনোয়ারা খাতুনসহ ৩৫ জন সদস্য পরিষদ কক্ষ থেকে বের হয়ে আসেন। গণপরিষদ অধিবেশনেও নারীর পিছিয়ে থাকার অবমাননাকর ঘটনা সেদিন ঘটেনি।

একুশের প্রথম শহীদ ছিলেন রফিকউদ্দীন। তার মাথার খুলি উড়ে গিয়েছিল। ঘটনার পরপরই এই ঐতিহাসিক দৃশ্যের ছবি তোলেন আমানুল হক, কাজী ইদ্রিস মেডিকেল ছাত্রী হালিমা খাতুনের সহযোগিতায়। সেদিন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আহতদের সেবা দিতে গিয়ে ক্রোধে ফেটে পড়েছিলেন হাসপাতালের সেবিকা মেয়েরা। প্রতিরোধের জায়গাটি এভাবে তাদের সহযোগিতা, সমর্থনে দীপ্ত হয়ে উঠেছিল।

২২ ফেব্রুয়ারি ঢাকাসহ সারাদেশে হরতাল, মিছিল, বিক্ষোভ পালিত হয়। যেসব নারী মিছিলে অংশ নিতে পারেননি তারা বাড়ির ছাদ থেকে ফুল ছিটিয়েছেন মিছিলের ওপর। এটিকে খুব স্বল্প পরিসরের আয়োজন বলে ভাবার কোনো কারণ নেই। অনুপ্রেরণা প্রদানকারী ঘটনা হিসেবে মিছিলের ওপর পুষ্পবৃষ্টি করার সিদ্ধান্ত নারীরাই গ্রহণ করেছিলেন। স্মৃতিচারণায় অনেকে বলেন, রাতভর পোস্টার লিখেছেন নুরুন্নাহার কবিরসহ অনেক মেয়ে। ইতিহাসে তাদের নাম চাপা পড়ে গেছে। একজন নারীর কালো রঙের শাড়ি কেটে ব্যাজ বানানো হয়েছিল। তাকেও মনে রাখেনি কেউ। নারীরা নামের অপেক্ষায় কেউই ছিলেন না। তারা চেয়েছিলেন আন্দোলনের সাফল্য। চেয়েছিলেন মাতৃভাষার মর্যাদা।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ প্রাঙ্গণে প্রথম নির্মিত শহীদ মিনারের বেদীতে নিজের গলার সোনার চেইন রেখেছিলেন সৈয়দা খাতুন (অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের মাতা)। নিঃসন্দেহে ভাষা আন্দোলনের প্রতি এটি একটি প্রতীকী শ্রদ্ধা নিবেদন। অমর শহীদদের স্মরণ করার প্রতীক যেমন এটি, অন্যদিকে মাতৃভাষার মর্যাদা আদায় পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার আর্থিক সহযোগিতারও প্রতীক। নারীর এই দূরদৃষ্টি সব সময়ই জাগ্রত থাকে। ইতিহাসের বড় ঘটনায় এটি বারবারই প্রমাণিত হয়েছে। তারপরও পুরুষ রচিত ইতিহাস নারীর প্রাপ্য মূল্যটি সঠিকভাবে দেয়নি। সমতার জায়গায় নারীর অবস্থান নির্ধারিত না হলে ইতিহাসের সত্যে ঘাটতি থাকে, এ কথা কাউকেই স্পষ্ট করে বলার অপেক্ষা রাখে না। তবু নারীর ক্ষেত্রে এমন দুর্ভাগ্যজনক ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটতেই থাকে।

এবার আরও দুটি বিষয়ের উল্লেখ করছি। একটি আসামের ভাষা আন্দোলনের কথা। ১৯৬০ সালে আসাম ভাষা আইন পাশ হয়। এই আইনে অসমীয়া ভাষাকে আসামের রাজ্য ভাষা করা হয়। প্রতিবাদে সোচ্চার হয়ে ওঠে বরাক উপত্যকার বাঙালিরা। ১৯৬১ সালের ১৯ মে শিলচর রেল স্টেশনে পুলিশের গুলিতে শহীদ হন এগারো জন। একজনের লাশ গুম করার জন্য পুলিশ পাশের পুকুরে ফেলে দিয়েছিল। ভাষা আন্দোলনের কর্মীরা সেই লাশ খুঁজে বের করে। এই আন্দোলনের পর আসাম সরকার ভাষা আইন সংশোধন করে এবং বরাক উপত্যকার জন্য সরকারি ভাষা হিসেবে বাংলা বহাল থাকে।

১৯ মে বরাক উপত্যকার শহীদ দিবস। যে এগারো জন শহীদ হয়েছিলেন তাদের মধ্যে একজন ছিলেন নারী। তার নাম কমলা ভট্টাচার্য।

পরবর্তী বিষয়টি ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’। কানাডা প্রবাসী রফিকুল ইসলাম ও আবদুল সালাম অমর ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। বিভিন্ন ভাষাভাষীর দশ জন ব্যক্তিকে নিয়ে তারা যে সংগঠনটি করেছিলেন তার নাম ‘ইন্টারন্যাশনাল মাদার ল্যাঙ্গুয়েজ লাভারস অব দ্য ওয়ার্ল্ড।’ এই দশ জনের মধ্যে ছয় জন ছিলেন নারী।

১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর ইউনেস্কো ২১ ফেব্রুয়ারিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করে। ইউনেস্কোর ভাষা বিভাগের প্রোগ্রাম স্পেশালিস্ট হিসেবে কর্মরত ছিলেন একজন নারী। তার নাম Anna Maria Mailof. তিনি বিষয়টিকে আন্তরিকতা ও নিষ্ঠার সঙ্গে গ্রহণ করেন। রফিকুল ইসলামের সঙ্গে অনবরত যোগাযোগ করেন এবং রফিকুল ইসলামের টেলিফোন ও পত্রের উত্তর দিতে থাকেন। তার ধৈর্য, সহনশীলতা এবং বিবেচনা অনেক বেশি আন্তরিক ছিল একটি দিবসকে মাতৃভাষা দিবস করার পক্ষে। এমনকি হাঙ্গেরির ইউনেস্কো ন্যাশনাল কমিশন যে এই প্রস্তাবটি সমর্থন জানানোর প্রথম কমিশন, সে খবরটিও আনা মারিয়া রফিকুল ইসলামকে জানাতে ভোলেননি।

আনা রফিকুল ইসলামকে আরও জানিয়েছিলেন, এ রকম একটি প্রস্তাব যারা করছে, সে প্রস্তাবটি তাদের নিজ দেশের সরকারের কাছ থেকে আসতে হবে। সে অনুযায়ী রফিকুল ইসলাম বাংলাদেশের ইউনেস্কো কমিশনের সঙ্গে যোগাযোগ করেন।

সেই সময়ে দেশের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন শেখ হাসিনা। তিনি দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে বিষয়টি কার্যকর করার নির্দেশ দেন। বাংলাদেশ ইউনেস্কো জাতীয় কমিশন শিক্ষামন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনক্রমে প্রস্তাবটি ইউনেস্কো সদর দপ্তরে যথাসময়ে পেশ করে। ইউনেস্কোর বোর্ড মিটিংয়ে প্রস্তাবটি উত্থাপিত হয়। ২৮টি সদস্যরাষ্ট্র বাংলাদেশের প্রস্তাব সমর্থন করে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর সচেতন বিবেচনায় বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করেছিলেন এবং শহীদ দিবসকে আন্তর্জাতিক মাত্রা দেওয়ার জন্য তড়িৎ সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। ভাষা আন্দোলন ছিল তাঁর শৈশবের সময়। বঙ্গবন্ধু তাঁর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ গ্রন্থে লিখেছিলেন : ‘হাচু আমার গলা ধরে প্রথমেই বলল, ‘‘আব্বা, রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই, রাজবন্দিদের মুক্তি চাই।’’ ২১শে ফেব্রুয়ারি ওরা ঢাকায় ছিল, যা শুনেছে তাই বলে চলেছে।’ পাঁচ বছর বয়সে যে শিশু এই স্লোগান উচ্চারণ করেছিল পরিণত বয়সে তাঁর হাতেই ভাষা-দিবসটি আন্তর্জাতিক মর্যাদা লাভ করে।

বলতে চাই ঘর-রাস্তা-গণপরিষদ ছিল নারীর জন্য এক সফল বাস্তবতা। অন্যদিকে ভ্যাঙকুভার, প্যারিস এবং বাংলাদেশ সরকার প্রধানের অফিস ছিল নারীর জন্য আরেক সফল বাস্তবতা। সব জাযগায় নারী তার পদক্ষেপটি দৃঢ়ভাবে ফেলেছেন।

লেখক : বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক ও গবেষক

ভালো লাগলে শেয়ার করে দিন :)

0 Comments

Leave a Reply

Avatar placeholder

Your email address will not be published. Required fields are marked *