ই-পেপার

আমির মুহম্মদ খসরু

‘তোমাকে যারা রচনা করে, কবি

ওই তো তারা রয়েছে তরুতলে

এসেছে ঠিক যতোই হোক খরা

আগুনমুখী উঠুক মাটি জ্বলে।

তোমাকে যারা রচনা করে, কবি

হ্রদের জলে বিছিয়ে রাখে কাব্য

পাথর হয়ে ফিরেছে মাথা কুটে

স্বরলিপির মেঘলা রঙে দ্রাব্য।

তাদের সাথে নাইতে নেমো তুমি

তাদের সাথে লোকাল ট্রেনে ফিরো

তোমাকে যারা রচনা করে, কবি

ধুলোর মতো হয়েছে তারা জড়ো।।’

এম ভি হাসান। ঢাকা-চাঁদপুর। বেশ বড় লঞ্চ। ছোটখাটো একটি স্টিমার যেন। ডেকের প্রবেশপথ পেরিয়ে বাঁ দিকটায় টিকিট কাউন্টার। কাউন্টারের ছোট্ট ঘরটিতে বসে দু’জন লোক টিকিট বিক্রি করছে। ফিকে হলদে দেয়ালের গায়ে নীল রঙে লেখা টিকিটের মূল্যতালিকা :

ভ্রমণসঙ্গী নারী না হলে আমি কেবিন এড়িয়ে চলি। আর একা হলে তো কথাই নেই। উন্মুক্ত পাটাতনে দাঁড়িয়ে ভ্রমণপথের নানা দৃশ্যানুষঙ্গে নিজেকে জড়িয়ে নিতে আমার পছন্দ। ঢাকা-চাঁদপুর মাত্র তিন ঘণ্টার ভ্রমণ। এই ঘণ্টা তিনেক ডেকের বিভিন্ন অবস্থানে দাঁড়িয়ে দেখতে থাকি ভেতর ও বাইরের দৃশ্য। বদ্ধ কেবিনে থেকে এটা সম্ভব নয়। লঞ্চ ছাড়ার ২০ মিনিট আগে এসে পৌঁছেছি। ডেক ইতোমধ্যেই মোটামুটি যাত্রীবোঝাই। একটা মোটা সুতি কাপড়ের জামা আর গ্যাভারডিনের প্যান্ট পরে চলে এসেছিলাম। সস্তা লোকের সস্তা পোশাক। গায়ে আর কোনও শীতপোশাক নেই। স্নান সেরে ঘর থেকে যখন বেরোলাম, তখন ঠাণ্ডা অনুভব করি নি। ভেঁপু বাজিয়ে লঞ্চ ছেড়ে দেবার পর নৌযানের গতি বাড়তে থাকলে বিপরীত দিক থেকে বয়ে আসা নদীবুকের ঠাণ্ডা বাতাস গায়ে হিম ধরাতে লাগল। ঘোষণামতো সকাল ঠিক আটটায় লঞ্চ ছেড়েছে। ইতোমধ্যে আধা ঘণ্টা অতিক্রান্ত। প্রবহমান শীতবাতাসের হিমস্পর্শ এখন শরীরে সয়ে গেছে। কিংবা বলা যায়, আমার ভোঁতা স্নায়ুতন্ত্রীর ওপর আর দাঁত বসাতে পারছে না। হা হা! মাঝে মাঝে সকৌতুকে ভাবি, ভোঁতা হবার অনেক সুবিধা।

স্থির দৃষ্টি মেলে তাকিয়ে আছি বুড়িগঙ্গাজলের দিকে। বহুক্ষণ একইভাবে অবাক দৃষ্টিতে দেখছি। টের পেলাম, একটা গভীর বিষাদে ছেয়ে যাচ্ছে মন। ইশকুল-কলেজে পড়ার সময় বেশ ক’বার বুড়িগঙ্গাপথে ঢাকা-চাঁদপুর আর চাঁদপুর-ঢাকা করেছি। নদীর এমন দুর্দশা হবে, তখন কল্পনাতেও আসে নি। নদীর কেন বলছি! শেষ পর্যন্ত এ দুর্দশা তো আমাদেরই। কুচকুচে কালো হয়ে গেছে জল। দূষিত জলের ভেতর থেকে একটা বিশ্রী গন্ধ মুখের ওপরকার মাস্কের ত্রিস্তর আবরণ ভেদ করে নাসাগহ্বরে প্রবেশ করছে। মাথাটা কেমন গুলিয়ে যাচ্ছে। তবু নদীর বুক থেকে আমার দৃষ্টি সরছে না। প্রায় এক ঘণ্টা চলার পর জলের রং ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে এল। লঞ্চের ইঞ্জিনকক্ষের দেয়ালে Mission Save Burigonga নামের এক সংগঠন চাররঙা একটি পোস্টার সেঁটেছে। সেখানে লেখা : ‘নদীদূষণ রোধ করুন। নদীতে প্লাস্টিক বর্জ্য ফেলবেন না। রাসায়নিক বর্জ্য ফেলবেন না। নদী আমাদের জীবনরেখা।’ পোস্টার দিয়ে কি আর নদীরক্ষা হয়! আমাদের নদীগুলোর মৃত্যুর জন্য বাইরের শক্তি যতোটা, তার চেয়ে ঢের বেশি দায়ী আমরা নিজেরাই। আমাদেরই হঠকারী হন্তারক হাত প্রকৃতির আদিম শুদ্ধতা ও সৌন্দর্যের বুকে মুহুর্মুহু নির্দয় কুঠারাঘাত করে চলেছে। জনগণের সীমাহীন মূর্খতা, বিধ্বংসী কর্মকা-, সেইসঙ্গে সরকারের নির্লিপ্ত ঔদাসীন্য ও নিষ্ক্রিয়তা বছরের পর বছর ধরে ব্যাপ্ত আর গভীর করেছে নদী, মাটি, জল আর বায়ুদূষণের মাত্রা।

নিজের অজান্তেই একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো ভেতর থেকে। অতঃপর দৃষ্টি ঘুরিয়ে নিলাম দুই পারের দিকে। সারি সারি ইটভাঁটার চিমনির মুখ দিয়ে আকাশ কালো করে ধোঁয়া উঠছে। কোথাও বা সিমেন্ট কারখানা। কোল্ড স্টোরেজ। ফতুল্লা পার হলে ক্রমশ নদীর প্রশস্ততা বাড়তে লাগল। নদীর দুই পাড় সরে গেল আরও দূরে। বাঁ দিকের পাড়ে দিগন্তরেখার কাছাকাছি চোখে পড়ছে গা-ঘেঁষাঘেঁষি করে দাঁড়িয়ে-থাকা কুহেলিঘেরা বৃক্ষরাজির আবছায়া। ডানদিকটায় ধোঁয়া কি কুয়াশা ছাড়া কিছুই চোখে পড়ছে না। বরিশালগামী ‘গ্রীনলাইন’ পেছন থেকে দ্রুতগতিতে এগিয়ে এসে আমাদের ছাড়িয়ে গেল। অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই দৃষ্টিসীমা থেকে অপসৃত হয়ে গেল লঞ্চটি। দূরে আরও কয়েকটি লঞ্চ স্থির থেমে আছে। কিন্তু ভালো করে তাকালে বোঝা যায়, ওগুলো বিপরীত দিকে এগোচ্ছে। লঞ্চগুলোর পেছনদিকে সফেন সাদা জলের মৃদু আলোড়ন দেখেই তা নিশ্চিত করে বলা যায়। গতি বিপরীতমুখী বলেই ওদের চলমানতা সহসা বোঝা যায় না।

চা খাওয়ার জন্য ডেকের পেছনদিকটায় ক্যান্টিনের সামনে এসে দাঁড়ালাম। প্রতি কাপ চা পনেরো টাকা। মেশিনের চা; বাইরের স্টলগুলোতে যার দাম ১০ টাকা। দু’টুকরো পাউরুটির সঙ্গে একটি ওমলেটের দাম ৪০। ৩০ টাকা হলেও আধাআধি লাভ থাকার কথা। পিজা, স্যান্ডউইচ, ভেজিট্যাবল রোলের দামও বাইরের দোকানগুলোর চেয়ে দেড়গুণ বেশি।

চা-নাশতা ঝটপট যাত্রীদের হাতে তুলে দিচ্ছে যে ছেলেটি, তাকে জিজ্ঞেস করি, ‘বেচাকেনা কেমন?’

‘আসা-যাওয়া দুই ট্রিপ মিলায়া, এই ধরেন, ডেইলি ত্রিশ-পঁয়ত্রিশ হাজার। আগে আরও বেশি অইত। করোনার কারণে বিক্রি-বাট্টা এহন কম।’

‘ক্যান্টিন ভাড়া কত?’

‘ডেইলি চাইর হাজার।’

তার মানে, মাসিক ভাড়া গুণতে হয় এক লাখ বিশ। আমি কিছুটা অবাক। তবে, আধাআধি লাভ ধরেও ভাড়া পরিশোধ শেষে প্রতিদিন লাভ কমপক্ষে হাজার টাকা। মাসান্তে সাড়ে তিন লাখের বেশি। কথাপ্রসঙ্গে আরও জানলাম, ক্যান্টিন ব্যবসার জন্য লঞ্চ মালিককে জামানত হিসেবে অগ্রীম দিতে হয়েছে ২৫ লাখ টাকা; ব্যবসা ছেড়ে দিতে চাইলে যা ১০ দিনের নোটিসের শর্তে ফেরত দেবে কর্তৃপক্ষ। ‘পঁচিশ লাখ?’ এই প্রশ্নে ছেলেটি সরাসরি আমার মুখের দিকে তাকায়। ‘আফনের মনে অয় বিশ্বাস অইতেছে না। ত্রিশ-পঁয়ত্রিশ-চল্লিশ লাখ পকেটে লইয়া খাড়ায়া রইছে চইদ্দ জন। আমি ছাইড়া দিলেই খপ কইরা ধইরা ফালাইব।’ বড় বড় চোখ করে ঝাঁঝালো গলায় কিছুটা ক্রুদ্ধ অভিযোগের ভঙ্গিতে জবাব দেয় ছেলেটি। এরপর কণ্ঠ খাদে নামিয়ে বিড়বিড় করে কী যেন বলে। মনে হলো, গালাগাল করছে দৃশ্যপটের আড়ালে থাকা সেই চক্রান্তকারীদের যারা ওর ব্যবসাটা কেড়ে নেবার জন্য একপায়ে দাঁড়িয়ে।

চা খাওয়া শেষে ফিরে আসি ডেকের সামনের দিকটায়। দেখি, যাত্রীদের মাঝে ভোজবাজির মতো কোত্থেকে এসে হাজির হয়েছে জনৈক ছোলা-মটর বিক্রেতা। পাকা চাঁপাকলার আস্ত এক কাঁদি হাতে একজন কলাবিক্রেতাও সঙ্গে হাজির। ত্রস্তব্যস্ত হয়ে ওরা হাঁকডাক শুরু করেছে। অথচ একটু আগে ওদের টিকিটিও দেখা যায় নি কোথাও। কোত্থেকে এলো ওরা? লঞ্চের একজন কর্মচারীকে জিজ্ঞেস করে জানলাম, ওরা নদীপাড় থেকে নৌকা করে আসে। চলমান লঞ্চের গা ঘেঁষে নৌকা ভিড়ানোর সঙ্গে সঙ্গেই দ্রুত লঞ্চে উঠে পড়ে। বেচাকেনা শেষ করে অন্য কোনও ফিরতি লঞ্চে চড়ে একইভাবে ভিড়ানো কোনও নৌকায় নেমে ফিরে যায় নিজ গন্তব্যে। মাঝনদীপথে লঞ্চের চলমান অবস্থায় ওদের এই আরোহণ ও অবতরণের বিরল দৃশ্য দেখার সুযোগ হয় নি বলে আফসোস হলো।

শীতের দিনে ঝাল-মসলা সহযোগে নুনে-সেদ্ধ ছোলা, কি মটর অনেকেরই পছন্দ। বিশেষ করে শিশু ও তরুণীদের মধ্যে ঝালমুড়ির পাশাপাশি চলতি ভ্রমণের অন্যতম জনপ্রিয় খাবার এটি। কয়েকটি শিশু দৌড়ে এলো ছোলা-মটর কেনার জন্য। যোগ দিল তরুণ-যুবা আর মধ্যবয়স্ক নারী-পুরুষরাও। ঘণ্টাখানের মধ্যেই বিক্রেতার বড়সড় ভা-টি প্রায় খালি হয়ে এলো। দেখলাম, খদ্দেরদের দেওয়া টাকাগুলো লম্বাটে ভাঁজ করে আঙুলের ফাঁকে ফাঁকে গুঁজে রাখছে ও। কাজটি করছে ও বেশ অভ্যস্ত হাতে। অতিদ্রুত লয়ে।

লোকটির সঙ্গে আলাপ জমানোর উদ্দেশ্যে আমিও খদ্দের হয়ে গেলাম। ওর হাত থেকে সেদ্ধ মটর নিতে গিয়ে প্রশ্ন করি, ‘লাভ কেমন হয়?’

‘পুরা বেচা হইলে হাজার-বারোশো থাহে।’

‘প্রত্যেকদিন বিক্রি করো?’

‘হুঁ!’

ভাবলাম, মন্দ নয়। দৈনিক দু’তিন ঘণ্টা কাজ করে মাসিক ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকা আয়। একই সময়ে কলাওয়ালার দৈনিক লাভ চারশো-সাড়ে চারশো। দিনের অবশিষ্ট সময় তো ওদের হাতে থাকছেই। এই যুযুধান জীবনসৈনিকদের নিত্যযুদ্ধের সরল সৌন্দর্যের প্রতি আমার অনেক শ্রদ্ধা। জ্ঞাত আয়-বহির্ভূত অবৈধ টাকার চেয়ে ওদের রোজগারকৃত টাকার স্বাদ অনেক গাঢ়। অনেক বেশি তৃপ্তিকর। এই সদোপার্জনে আমি ওদের মুখে সেই তৃপ্তির ছবি দেখেছি। ওরা তো চাইলেই সেই গোপন অন্ধকার জগতে পা ফেলতে পারত, যে-আঁধারে বিহার করছে সমাজের বহু ‘নামজাদা’ লোক।

ডেক-ফটকের বাইরে এসে দাঁড়িয়ে নদীবুকে দৃষ্টি ফেরাই ফের। ক্রম অগ্রসরমান লঞ্চের তলদেশ থেকে একরাশ সফেন সাদা ফেনায় সশব্দে ছিটকে পড়ছে জল। আমি সেই ছলছল দুধসাদা ফেনরাশির দিকে অপলক চেয়ে থাকি কিছুক্ষণ। অতঃপর নজর ঘুরিয়ে আনি ডানদিকে। দেখি, দূরে ফিনফিনে কুয়াশার পর্দা ভেদ করে জেগে উঠেছে নদীতটরেখা।

টিকিট ঘরের পাশ ঘেঁষে যে-সিঁড়িটি দোতলায় উঠে গেছে, তার বাঁ দিকে বেশ বড় করে লেখা : ‘ডেকের যাত্রীরা ওপরে উঠবেন না’। দোতলার কেবিনের যাত্রীদের অনায়াস চলাফেরা ও আনন্দ উপভোগে যাতে বিঘ্ন না ঘটে, সেজন্যই এ নিষেধাজ্ঞা। তবে ওপরের যাত্রীদের নিচে নামতে কোনও বাধা নেই। বাবার হাত ধরে কেবিন থেকে ডেকে নেমে এলো ১১-১২ বছরের একটি মেয়ে শিশু। নাদুস নুদুস থলথলে দেহ। আঁটসাঁট শর্টস ও স্লিভলেস গেঞ্জি-পরা। চোখে-মুখে দারুণ উচ্ছলতা। বাবা-মার উপচানো আদর আর অভাবহীন স্বাচ্ছন্দ্যে বেড়ে-ওঠা সানন্দ শৈশবের চিহ্ন আঁকা ওর গোটা অবয়বে, নিঃসঙ্কোচ দৃষ্টি ও অনাড়ষ্ট চলনে, লাফিয়ে-চলা চঞ্চল হাঁটার ভঙ্গিতে। দুঃখী শিশুদের এমনটি থাকে না। ওদের মুখে না-পাওয়ার কষ্ট, চোখে কেমন এক ভীতি, পোশাকে লেপ্টে থাকে দুঃখ, ওদের সকরুণ চলনে ঘন হয়ে বেজে ওঠে বিষাদক্লিষ্ট বায়ুর দীর্ঘনিঃশ্বাস।

মেয়েটিকে নির্দেশ করে আমার পাশে দাঁড়ানো এক মধ্যবয়েসী লোক হঠাৎ বলে ওঠে, ‘দেইখছেন নি, বাই। মাইয়াডারে কী হরাইয়া রাখছে?’ স্পষ্টতই মেয়ে শিশুটির পোশাক নিয়ে এই মন্তব্য। কাছ থেকে আরেকজন যাত্রী মন্তব্য জুড়ে দেয়, ‘বড়লোকের মাইয়া ত!’ বেঞ্চে-বসা এক তরুণ রাগত স্বরে বলে, ‘তাতে আপনার কী সমস্যা?’

কোণের টেবিলে এক তরুণ মগ্ন হয়ে সমরেশ মজুমদারের ‘কালবেলা’ পড়ছে। একই টেবিলে উল্টোদিকে মুখ করে এক প্রৌঢ় পাঠ করছে দৈনিক ‘পত্রিকা’। খোলা ডেক-ফটকের কাছে কয়েকজনের জটলা। কাছে যেতেই ওদের কথা কানে এলো। ‘ইন্ডিয়া কি আমাগো বন্ধু নিহি?’ সেই মুহূর্তে কিছু বলার ইচ্ছে হলো। কিন্তু বললাম না। মনের পর্দায় ভেসে উঠল ৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের ছবি। তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানে পাকিসেনার বর্বরতার জবাব দিতে এবং সদ্য স্বাধীনতা-ঘোষিত বাংলাদেশের পূর্ণ মুক্তি ও বিজয়ের লক্ষ্যে গঠিত হয়েছিল মুক্তিবাহিনি। মুক্তিযোদ্ধাদের ট্রেনিং দেওয়া ছাড়াও অস্ত্রশস্ত্র জোগোন দিয়েছিল এই ইন্ডিয়া-ই। আশ্রয় দিয়েছিল ১ কোটি শরণার্থীকে। দর্পোদ্ধত পাকি জান্তা যে-মুক্তিযোদ্ধাদের শক্তিকে শুরু থেকেই অবজ্ঞা করে আসছিল, তাদের হাতে বিশ্বসেরা (!) বলে কথিত পাকিবাহিনির আসন্ন পরাজয় মেনে নিতে পারছিল না তারা। তাই ‘ভারত পূর্ব পাকিস্তানে বাঙালিদের উস্কানি ও সহায়তা দিচ্ছে’ এই অজুহাতে বাংলার মানুষের স্বাধীনতার যুদ্ধকে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ হিসেবে দেখানোর উদ্দেশ্যে পাকিস্তানের সামরিক শাসকদের নীতিনির্ধারকদের গোপন পরিকল্পনায় ভারতের পশ্চিম সীমান্তে হামলার সিদ্ধান্ত হয় যা স্বয়ং নিয়াজিও জানত না (দ্রষ্টব্য : ব্রিগেডিয়ার আব্দুল রহমান সিদ্দিকি লিখিত East Pakistan : The Endgame)।

চাঁদপুর ঘাটে যথাসময়েই লঞ্চ ভিড়ল। ফরিদগঞ্জগামী একটি অটোরিক্সায় যাত্রীভাড়া শেয়ার করে চড়ে বসলাম চারজন। চালকের পাশে একজন। বাকি তিনজন পেছনে। আমি বসি সামনে, চালকের পাশে। টার্মিনালের কিছুটা সামনে থেকে প্রায় এক কিলোমিটার রাস্তা বেশ সংকীর্ণ। ওয়ারলেস বাজার মোড়ে এসে প্রশস্ত সড়কের দেখা পাই। ধানুয়াবাজারে আসার পর দেখি, মোটামুটি চওড়া রাস্তার দু’পাশে ছায়াবিস্তারী সারিবদ্ধ গাছ। ভালো লাগল। আরো এক কিলোমিটার সামনে এগিয়ে গেলে কয়েকটি স্পিডব্রেকার। কোথাও এক হাতের ব্যবধানে পরপর তিনটি। বেশ ঝাঁকুনি খাচ্ছে অটোরিক্সা। বিরক্ত লাগছে খুব। তবে এই উপদ্রব বেশিক্ষণ রইল না। নির্বিঘ্ন দ্রুতগতি নিয়ে আবার ছুটতে শুরু করল সিএনজি অটোরিক্সা। কতক্ষণ চলেছি, জানি না। কিছুটা ডুবে ছিলাম নিজ ভাবনায়। সংবিৎ ফিরে পেলাম চালকের কথায়, ‘নামেন ভাই।’

লেখক : অনুবাদক, কবি ও গল্পকার।

ভালো লাগলে শেয়ার করে দিন :)

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x