ই-পেপার

SITE UNDER CONSTRUCTION
বাংলাদেশ পুলিশের মুখপত্র
অব্যাহত প্রকাশনার ৬৩ বছর

মোঃ মনিরুজ্জামান বিপিএম (বার), পিপিএম (বার)

রোজার দশ কি এগারো, সকালে ঘুমিয়ে আছি, সকাল ৮টা সাড়ে আটটা বাজে। মোবাইলের রিঙে ঘুম ভাঙল। ফোন করেছে এএসআই সবুজ, র্বুমানে ডিএমপিতে একটি থানায় কর্মরত। জেগে দেখি আমার দুইটি নাম্বারে ওর ৬/৭ টি রিং। একটু অবাকই হলাম। রোজার দিনে সকাল ৮টায় গুরুতর কিছু না হলে আমার দুই নাম্বারে ৭/৮ বার রিং দিবেনা। সবুজ দীর্ঘ দিন ধরেই আমার পার্সোনাল স্টাফ ছিল, পুলিশী ভাষায় যাকে বলে অর্ডারলি, তাও সব মিলিয়ে বছর পাঁচেক হবে। বলতে গেলে আমার সবই তার জানা।

জয়পুরহাটের এ্যাডিশনাল এসপি হিসাবে ঢাকা থেকে যেদিন জয়পুরহাট গিয়ে জয়েন করলাম ঐদিন সন্ধ্যায়ই সবুজের সাথে আমার প্রথম দেখা। হ্যাংলা, পাতলা, সাদাসিধে ছেলেটি। এমনিতেই উত্তরবঙ্গের মানুষ সহজ সরল, সবুজ আরও। ব্যক্তিগণ জীবনের একটি চরম দুঃসময়ে এই ব্যস্ত জনপদ আর পরিচিত মুখগুলো থেকে দূরে থাকার জন্যই আমি অনেকটা ইচ্ছে করেই আমার একেবারেই অপরিচিত আত্মীয় পরিজনহীন উত্তর জনপদের এ জেলায় পোস্টিং নিই। সেই দুর্দিনে ও ছিল অনেকটাই ছায়া সংগী। সরকারী কোয়ার্টারে সবুজ আমার দেখাশোনা, রান্নাবান্না, খাওয়া দাওয়া সব কিছুরই দায়িত্বই একা নিয়েছিল। এমনকি রাতে সে আমার বাসাতেই থাকতো।

মাস খানেকের মধ্যেই সবুজ বুঝে গিয়েছিল আমি গাছ ভালবাসি, প্রকৃতি ভালবাসি, আমার নিস্তরঙ্গ জীবনে একটু বৈচিত্র্য আনার জন্য আমার ছাদে টবে, বালতিতে, ড্রামে ফুল ও সব্জি চাষ শুরু করল। দোতলা যে ভবনটিতে আমি থাকতাম তার একপাশে ফ্লাট আর একপাশের প্রায় দেড় দু হাজার স্কয়ার ফিট ছাদ ফাঁকা ছিল। কৃষকের ছেলে সবুজ এখানে তার ক্যারিশমা ফলাতে শুরু করল। আমি তো সারাদিনই অফিসে থাকি। বাসা খালি। সকালে ১০ টার আগে অফিসে যাই আর সন্ধ্যা গড়িয়ে রাতে ফিরি। নামাজ, ডিনার শেষে খোলা ছাদে গিয়ে ওয়ারলেস সসেট আর ফোন নিয়ে রেলিঙ্গে পা লাগিয়ে বসে থাকি, ঘন্টার পর ঘন্টা। সবুজ কিছুক্ষণ পর পর চা, কফি, পানি দেয়, কয়েল জ্বালিয়ে দেয়, আশেপাশে ঘুরঘুর করে। টুকটাক করে সারা দিনের জমানো কথা বলে।

সকালে ঘুম ভাঙলেই ছাদে গিয়ে পায়চারি করি। দেখি সবুজের হাতের ছোঁয়ায় গোলাপ, পাতাবাহার, থুজা বেলি, রঙ্গনের পাশাপাশি লক লকিয়ে বাড়ছে পুঁই, ঢেড়ষ, ডাটার কচি কচি শাখা। ভাল লাগতে শুরু করে, আমিও হাত লাগাই, সবুজ আরো উৎসাহিত হয়। সারাদিনই বলতে গেলে ওর ছাদে কাটতে থাকে। পানি দেয়, গোবর দেয়, গাছের যত্ন করে, গাছগুলোও বাড়তে থাকে।

গাছের পরে সবুজ শুরু করে কাঠের ঘরে মুরগি পালন। পুলিশ লাইনস্-এ মধ্যেই বাসা, চারিদিকে প্রচুর খোলামেলা জায়গা। জয়পুরহাটে প্রচুর মুরগির ফার্ম। একটা ফার্ম থেকে ফোর্সের জন্য রেগুলার মুরগি কেনা হত। তাদের সাথে যোগাযোগ করে সবুজ মুরগি পালনের প্রাথমিক প্রশিক্ষণ নেয়। আমার কাছ থেকে টাকা নিয়ে মুরগী কেনে গোটা বিশেক। শুরু করে ছোট সেই ফার্মটিও। আমিও বিষন্নতা ভুলতে থাকি, মন বসে যায়, ভাল লাগতে থাকে উত্তর জনপদের এই অসম্ভব সুন্দর প্রকৃতিকে, আমার কাজকে এবং এক পাশে খোলা ছাদের বাসা টিকেও।

বছর খানেক পর জয়পুরহাটের পাট চুকিয়ে ঢাকা আসলাম। সাথে আসল সবুজ। যথারীতি দায়ীত্ব নিল আমার সংসারের। আমি তো সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত কামলা খাটি। বাসা, সংসার, বাজার সদাই, ছেলে মেয়েদের স্কুল, খাওয়া দাওয়া বলতে গেলে কোন কিছুরই খোঁজ রাখিনা। ওয়াইফের অবস্থাও তাই। তার তখন পোস্টিং জগন্নাথ কলেজ, হালের জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, পুরান ঢাকার জ্যাম ছাড়িয়ে রাজারবাগের সরকারী বাসায় আসতে আসতে দুপুর গড়িয়ে পড়ন্ত বিকেল। বাসা এমনকি বাচ্চার দুপুরের খাওয়ানোর তত্তাবধানেও সবুজ।

কোন দিন আমি সবুজকে বিরক্ত দেখিনি। সব সময় হাসিমুখ, সব সময়ই বিশ্বস্ত। অফিসারদের সাথে পার্সোনাল স্টাফ হিসাবে যারা থাকে তারা বরাবরই একটু চালু এবং কিছুটা সুযোগ সন্ধানীও হয়। ছুটি ছাটা, পোস্টিং, ভাই ভাতিজার চাকরির তদবির এগুলো নিয়ে সারাক্ষণ অফিসারকে ত্যক্ত বিরক্ত করে এবং মনে করে এগুলো তার রাইট। সবুজ ঠিক তার উল্টো। প্রায়ই সহকর্মীরা কনস্টেবল থেকে প্রমোশন পেয়ে এএসআই হয়। বাসায় মিষ্টি নিয়ে দোয়া চাইতে আসে। আমার ওয়াইফ একদিন জিজ্ঞেস করল সবুজ তুমি প্রমোশনের পরীক্ষা দাও না কেন? সবুজের লাজুক উত্তর “ম্যাডাম আমার মাথা (ব্রেইন) ভালনা, মনে রাখতে পারিনা আইনের ধারা, হাতের লেখাও ভালনা, প্রমোশন হবে না, পরীক্ষা দিয়ে লাভ কি? “আমি শুনি, দেখি ওর মধ্যে কোন উচ্চাশা তো নেই ই এমন কি হতাশাও নেই। বললাম পড়াশুনা শুরু কর। পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে থাকো। কনস্টেবল থেকে এএসআই পরীক্ষার প্রস্তুতিতে সাহায্য করে এমন একজন ওস্তাদকে বলে দেই আমার সোজা সরল সবুজকে একটু দেখিয়ে দেয়ার জন্য।

ছেলেটা তার ভাষায় অত মেধাবী না হলেও পরিশ্রমী এবং প্রত্যয়ী। পরীক্ষা দেয়। প্রমোশনও পেয়ে যায়। আমিই অনুরোধ করে ওকে এএসআই হিসাবে ডিএমপিতে পোস্টিং করাই। ওর বাচ্চাটা রাজারবাগ পুলিশ লাইনস্ স্কুলের মেধাবী ছাত্রী, বরাবরই ফাস্ট হয়। বৃত্তিও পেয়েছে ট্যানেল্ট পুলে। সেই খুশীর খবর দিতে এসে সবুজের কি হাউমাউ কান্না।

তো সেই সবুজ আমাকে ৭/৮ বার কল দিয়েছে, নিশ্চয়ই ব্যাপার গুরুতর। দ্রুত ফোন করলাম। ও প্রান্তে সবুজের হাউমাউ কান্না। স্যার আমার মেয়েটার কি হবে? ওর তো অনেক পড়াশুনার শখ, ওকে কে দেখবে? কিছুই বুঝতে পারিনা। সবুজ হাউমাউ করে কাঁদতেই থাকে। অনেকক্ষণ পর বুঝতে পারি ওর করোনা হয়েছে। ও ওর জীবন নিয়ে শংকিত। তার চেয়েও বেশী শংকিত ওর পরিবার বিশেষ করে মেধাবী মেয়েটিকে নিয়ে। মা আছে, ছোট ভাই বোন আছে, একটা বোন ফিজিক্যালি ডিজেবলড। সবুজই এ পরিবারের বলতে গেলে একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। বাবার অল্প কিছু জমি জিরেত আছে। সবুজ সেখানে ফসল ফলায়, ছুটিতে গিয়ে নিজের সামান্য জমিতে চাষ বাস করে, মা ভাই বোনদের অন্ন জোগায়।

এক রুমের একটি বাসায় বউ বাচ্চা নিয়ে থাকে। বউটিও খুব লক্ষী, কোন কিছুতেই কোন অভিযোগ নেই। বিয়ের আগে পাড়াপড়শিদের কাছে শুনেছে পুলিশের টাকা পয়সার কোন অভাব নেই। চারিদিকে উপচে পড়া সুখ আর সুখ। অথচ বিয়ের পর থেকেই দেখছে অভাব, অনটন আর টানা পোড়েন। খালি নিজের ছোট সংসারটুকু নিয়ে ভাবলে হয়তো এতো সমস্যা হতনা, মা ভাই বোনদের কথাও সবুজ সারাক্ষণ ভাবে। বউটা প্রথম প্রথম একটু আধটু ঝামেলা যে করেনি এমন নয়। দিনে দিনে বুঝেছে তার রাজ্যের ভালমানুষ স্বামীটির এই মা ভাই বোনদের জন্য টান ছাড়া আর কোন দোষ নেই। নিজে একটা বিড়ি সিগারেটও খায়না। না বললে নিজের জন্য একটা প্যান্ট বা শার্ট ও কিনেনা। এক জোড়া জুতোয় কাটিয়ে দেয় বছরের পর বছর।

আমি চেষ্টা করে ওকে একটা সরকারি বাসা বরাদ্দ করিয়ে দিয়েছি। সে বাসারও একটি রুম ওরই এক সহকর্মীকে সাবলেট দিয়েছে বাসা ভাড়া সাশ্রয়ের জন্য। তো এমন স্বামীর উপর কি বেজার থাকা যায়? ধীরে ধীরে বউটিও মানিয়ে নিয়েছে সবুজের অভাবের আটপৌরে সংসারে।

কোন দুঃখই এদের কাছে দুঃখ থাকেনা যখন মেয়েটি কোন টিচার বা কোচিং ছাড়াই ক্লাশে ফার্স্ট হয়, বৃত্তি পায়। সত্যিকারের অর্থেই হীরার টুকরো মেয়েটি ওদের জোড়াতালির সংসারের আন্ধারমানিক।

সাহসী, পরিশ্রমী আত্ম প্রত্যয়ী সবুজ তাই আজ ভীষণ বিষন্ন। ও জানে ও মারা গেলে ওর বউ বাচ্চা, মা, বোন কে দেখার আর আল্লাহ ছাড়া কেউ নেই। অন্ধকারের আশংকায় সবুজ তাই দিশেহারা। কেন জানিনা ওর সব বল ভরসা আমার উপরেই। সবুজ আমাদের সাথে ছিল তাও প্রায় বছর দশেক হয়। কনস্টেবল পর্যায়ের একজন সহকর্মীর সাথে এতো দীর্ঘদিন সম্পর্ক থাকার কথা না। সবুজের ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। কথাবার্তা বা যোগাযোগ যে খুব একটা বেশী হয় এমন না। বাড়ীতে গেলেই আমার বা ওর ম্যাডামের পছন্দের এটা সেটা নিয়ে আসে। আমার ছেলেমেয়ে দুটিকেও নিজের সন্তানের মতোই ভালবাসে। ডিউটি থাক নাই থাক যখনি সুযোগ পায় ছেলেমেয়ের জন্মদিনে কিছু একটা নিয়ে হাজির হয়, ও জানে ঈদে, উৎসবে, পার্বনে, বাচ্চাদের জন্মদিনে ম্যাডামের হাতের এক প্লেট খাবার ওর জন্য বাধা বরাদ্দ। কোন দাওয়াত লাগেনা ওর। সবুজকে বোঝালাম- “গাধা, করোনা হলেই মারা যাবে কে বলল?” ওর সেই একই কথা স্যার মেয়েটার কি হবে, প্রতিবন্ধী বোনটার কি হবে, তরুনী বউটির কথা ভাবলেও হয়তো লজ্জায় বললোনা।

ওর চিকিৎসার ব্যবস্থা করলাম। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সাথে কথা বললাম, প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিলাম। হাসপাতালে থাকতেও প্রায় প্রতিদিনই ওর সাথে কথা হত, সাহস দিতাম আমি, আমার স্ত্রী। বাচ্চারাও শুনে খুব মন খারাপ করল। সবুজ আংকেল ওদেরও খুব প্রিয়। আল্লার রহমতে সবুজ সুস্থ্য হল দিন পনেরোর মধ্যেই।

সংসারের প্রতি ভীষণ কেয়ারিং দেখে, করোনার শুরুতেই স্ত্রী সন্তানের নিরাপত্তার কথা ভেবে এদেরকে গ্রামের বাড়ীতে পাঠিয়ে দিয়েছে। ডিউটি পড়েছে সবচেয়ে করোনা ভালনারেবল এরিয়া মুগদা বাসাবো এরিয়ায়, থাকেও করোনার হটস্পট রাজারবাগে। চিন্তিত হওয়াটাই অত্যন্ত স্বাভাবিক।

রোজার মাস, সেহরী করতে উঠে সবুজের খোঁজ নিই, ইফতারের আগে সবুজের জন্য আল্লার কাছে কাঁদি। ও আমার দুঃসময়ের সাথী। তার ও তার পরিবারের দিকে তুমি তাকিও হে পরোয়ার দিগার। ওর বৃদ্ধা মাও, স্ত্রী ও নিশ্চয়ই সবুজের জন্য কাঁদে। আল্লাহ্ ওর দিকে মুখ তুলে চান। ও সুস্থ্য হয়। টেস্ট করে, রেজাল্ট নেগেটিভ আসে। হাসপাতাল থেকে আমাকে আগেই জানিয়েছে, তারপরও সবুজকে বলিনা, অপেক্ষা করতে থাকি ওর ফোনের। পছন্দের মানুষকে নিজের বিষয়ে নিজে জানানোর একটা আলাদা আনন্দ আছে। আমিই ওকে সংবাদটি জানিয়ে আনন্দটুকু নিতে পারতাম। তা করিনা, সুযোগ দেই ওকেই। এ দু:সময়ে ওরই দরকার আনন্দের। সবুজ কাঁদতে কাঁদতেই আমাকে সুসংবাদটি দেয়, মুখে বলি আলহামদুলিল্লাহ্। ওর কান্না শুনে আমারো চোখের কোনে জল আসে। ও আমার দীর্ঘ দিনের সহচর। আমার হাঁচি, কাশির সিগনালও বোঝে। ও বুঝতে পারে আমার আদ্রতা। ফোন রেখে দেয়।

সহকর্মীদের প্রায় সাড়ে তিন হাজার আক্রান্ত। সবার জীবনের গল্প সবুজের মতো না হলেও কম বেশী একই রকম। সরকার, কর্তৃপক্ষ প্রাণান্ত চেষ্টা করলেও আক্রান্তের তালিকা দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। মৃত্যুর মিছিলও থামছেনা।

২৬ শে এপ্রিল করোনায় আক্রান্ত হয়ে প্রথম শহীদ হয় ২ ছেলে ১ মেয়ের জনক কনস্টেবল জসিম। এরপর এপ্রিলে ২৮ তারিখে এএসআই মালেক, ২৯ এপ্রিল কনস্টেবল আশোক মাহমুদ। মে মাসে এ পর্য্যন্ত একে একে শহীদ হয়েছেন সাব-ইন্সপেক্টর নাজির, এএসআই সুলতানুল আরেফিন, এএসআই রঘুনাথ, কনস্টেবল জালাল, কনস্টেবল নাইমুল, এসআই মজিবুর, কনস্টেবল মোখলেসুর, নায়েক আল মামুন, এসআই মোশাররফ, ইন্সপেক্টর রাজু, কনস্টেবল নেকবার এবং সর্বশেষ গণকাল ২৮ মে তরুন সাব-ইন্সপেক্টর রাসেল। আমরা কেউ জানিনা আগামীকাল কি হবে, বুঝতে যদিও পারছি মৃত্যুর মিছিল লম্বা হচ্ছে, হতেই থাকবে হয়তোবা। আল্লাহ রহম করুন।

শহীদ ১৫ জনের সর্বনিম্ন বয়স ৩৫, সর্বোচ্চ ৫৬। এদের গড় বয়স ৪৪ বৎসর। ভদ্রতার কারণে মুখে না বললেও অনেকে মনে মনে ভাবছেন যারা মারা গেছে তারা করোনায় মারা গেছে ঠিকই কিন্তু তাদের আগে থেকে অসুখ বিসুখ ছিল ইত্যাদি ইত্যাদি।

পেশাগত কারণেই আমি ছোটখাটো একজন এনালিস্ট সে অভিজ্ঞতা থেকেই বলছি। এদের গড় বয়স ৪৪ বছর। প্রত্যেকেই পুলিশের মাঠ কর্মী। মেডিকেল রিপোর্ট এরা আগে থেকেই দুরারোগ্য কোন ব্যধিতে আক্রান্ত, এমনটি জানা যায়নি। এরা প্রত্যেকেই শিক্ষিত এবং প্রশিক্ষিত। এরা জানে কিভাবে করোনা হয়, করোনা হলে কি হয় ইত্যাদি। এরা সবাই জানতো যে তারা এ সময়ে নিজ দায়িত্ব পালন করতে গেলে করোনা আক্রান্ত হতে পারে এবং করোনা আক্রান্ত হলে এমন কি মৃত্যুও হতে পারে। তারা জেনেশুনে এই ঝুঁকি নিয়েছে। এমনকি আত্মোৎসর্গীকৃত হতে পারে জেনেও তারা তাদের কর্তব্যকর্ম থেকে বিচ্যুত হয়নি।

যেসব সহকর্মীরা শহীদ হহয়েছেন তাদের প্রত্যেকেয়ই জীবনের খেরোখাতা প্রায় একই রকম। সবাই মধ্যবিত্ত বা নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান। প্রায় সবাই ই পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি, তাদের উপর তাদের নিজের পরিবার তো বটেই এমনকি তাদের বর্ধিত পরিবারও নির্ভরশীল। প্রায় সবারই ছোট ছোট ছেলে মেয়ে আছে। এরা সকলেই জানে এরা মারা গেলে বা রোজগারে অক্ষম হলে এদের সাথে এদের পরিবারও বলতে গেলে মারা পড়বে, পথে বসবে। ছেলেমেয়েদের শিক্ষা জীবন বিপন্ন হবে।

জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাস দমন বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষার্থে প্রতি বছরই উল্লেখযোগ্য সংখ্যক পুলিশ সদস্য শহীদ হয়। এদের লাশ পুলিশই বহন করে, তাদের শোকাহত পরিবারকে আবার ঘুরে দাঁড়াতে সাহায্য করতে হয় পুলিশ সদস্যদেরকেই। এটি পুলিশের জীবনে নতুন নয়।

বাংলাদেশের জন্মলগ্ন থেকেই বাংলাদেশ পুলিশ দেশের জন্য, স্বাধীনতার জন্য, মুক্তির জন্য আমাদের সাহসী সদস্যরা প্রাণ দিয়েছেন। গড়ে তুলেছেন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রথম প্রতিরোধ। একাত্তরের পঁচিশে মার্চ কালরাত্রিতে হানাদার বাহিনী যখন কামান মর্টার নিয়ে রাজারবাগ পুলিশ লাইনস্ আক্রমন করে তখন এরা পাচিল টপকে পালিয়ে যেতে পারতো। এরা সবাই প্রশিক্ষিত পুলিশ সদস্য। এরা জানতো থ্রি নট থ্রি রাইফেল দিয়ে কামান মর্টারের সাথে প্রশিক্ষিত সেনাবাহিনীর সাথে সম্মুখ যুদ্ধে বেশীক্ষণ টেকা যাবেনা। তারা যদি অতর্কিতে হামলা পর্যুদস্ত হয়েও প্রতিরোধ না করে পলায়ন করত তাহলে আমাদের ইতিহাস হতো কাপুরুষতার ইতিহাস, প্রতিরোধের বা বীরত্বের ইতিহাস নয়। তখন রাজারবাগের যুদ্ধ ৫৬ হাজার বর্গমাইলের প্রতিটি জনপদে ছড়িয়ে গিয়ে জনযুদ্ধে পরিগনিত হতনা হয়তোবা।

বঙ্গবন্ধুর উদাত্ত আহ্বানে সাড়া দিয়ে সে দিনের বীর পুলিশ সদস্যরা অসীম সাহসিকতা, বীরত্ব ও সুদূর প্রসারী চেতনার যে পরিচয় তাৎক্ষনিকভাবে দিয়েছিলেন তা বাংলাদেশ পুলিশের এখন পর্য্যন্ত সবচেয়ে বড় অর্জন।

ব্যক্তিগতভাবে রাজারবাগের যুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণ করেছিলেন তাদের শতাধিক সদস্যের সাক্ষাৎকার গ্রহণের সুযোগ আমার হয়েছিল। সে অভিজ্ঞতায় তুলনা নাই। মুক্তিযুদ্ধের পর জাতীয় জীবনের প্রতিটি ক্রিটিকাল কন্ডিশনে বাংলাদেশ পুলিশ সামনের সারিতে থেকে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেছে, আত্মাহুতি দিয়েছে অকাতরে।

নৈরাজ্য নাশকতা অগ্নি সন্ত্রাস মোকাবেলা, জঙ্গি সন্ত্রাসীদের মোকাবেলা, মাদক ব্যবসায়ী চোরাচালানী, অস্ত্রধারীদের মোকাবেলা, পেশাদার অপরাধী, ডাকাতি ছিনতাই প্রতিরোধ করতে গিয়েই প্রাণ দিয়েছেন অনেক সহকর্মী। অনেকে হাসপাতালের বেডে শুয়ে মৃত্যু যন্ত্রণা ভোগ করছেন এখনো। তাদের পরিবারে নেমে এসেছে অমানিশার ঘোর অন্ধকার। যিনি যাবার তিনি গিয়েছেন, রেখে গিয়েছেন বিধবা স্ত্রী, ছোট ছোট সন্তান, বৃদ্ধ বাবা মা। তাদের অনেকের মুখই শুকনা।

কেউ মারা গেলে সরকার বা ডিপার্টমেন্ট থেকে কিছু টাকা দেয়। পরিমানটা আগের থেকেও বাড়লেও তা পর্যাপ্ত নয়। চারিদিকে অভাব, জমা টাকা একসময় শেষ হয়ে যায় অর্থনীতির স্বাভাবিক নিয়মেই। থাকে শুধু অন্ধকার, স্মৃতিটুকু হাতড়ানোর, বুক পিঠ চাপড়ানোর।

জন্ম থেকেই শুনে আসছি পুলিশ খারাপ, ঘুষ খায়, মানুষের সাথে খারাপ ব্যবহার করে। করেও হয়তো, কেউ কেউ, অস্বীকার করিনা। কিন্তু এত পুলিশ যে মারা গেল, দেশের জন্য মানুষের জন্য, কে তার খবর রাখে?

একটা মেধাবী শিক্ষার্থী মারা গেলে নাগরিকরা শোক মিছিল করে, ভাস্কর্য্য বানায়, পত্রিকায় লেখে, বড় বড় মানুষেরা টিভিতে টকশোতে কথা বলে। সব ই ঠিক আছে। একটা পুলিশ মরলে কি হয়? মাননীয় প্রধানমন্ত্রী পরম মমতায় পাশে দাঁড়ান। শোকসপ্ত পরিবারকে ডেকে নিয়ে সান্তনা দন, খোঁজ নেন, সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন। ডিপার্টমেন্ট থেকেও হয়তো সহযোগিতা করা হয়। তার ব্যাচমেট, সহকর্মী, বন্ধু বান্ধবেরাও হয়তো পাশে দাঁড়ায়। তারপর এক সময় সবাই ভুলে যায়। না ভুলেই বা কি করবে। সিস্টেমটা তো FIFO (First in first out) আগের স্মৃতি আগেই ডিলিট হবে। কারণ প্রক্রিয়াটিও চলমান মৃত্যুর মিছিলে ক্রমশই বড় হচ্ছে, যোগ হচ্ছে নতুন নতুন মুখ। কে মনে রাখে পুলিশের কথা, বিশেষ করে এই

বিস্মৃতিপরায়নতার দেশে।

সবুজের মত ইতিহাস আমার ড্রাইভার মোক্তারেরও। রাজারবাগে বসবাস, সরকার ঘোষিত সাধারণ ছুটির মধ্যেও আমাকে নিয়ে ছুটে চলা এখান থেকে ওখানে, সহকর্মীরা অনেকেই আক্রান্ত। আক্রান্ত হয় ড্রাইভার মোক্তারও। ছোট ছিমছাম পরিবারে নেমে আসে রাজ্যের হতাশা, মুখ শুকিয়ে যায় ওরও। না শুকিয়ে উপায় আছে, ঘরে এর তরুনী স্ত্রী, ছোট বাচ্চা, বৃদ্ধ বাবা মা- ভরসা তো সবার ওর উপরেই।

শুধু কি কনস্টেবল, এএসআই, সাব-ইন্সপেক্টর বা ইন্সপেক্টর। মোটেই না। আক্রান্তের কাতারে যোগ হয়েছে অতিরিক্ত ডিআইজি, এসপি, এডিশনাল এসপিসহ উর্দ্ধতন কর্মকর্তারা। ডিআইজি, এডিশনাল আইজি পদ মর্যাদার কর্মকর্তারাও অনেকে বাসায় যান না মাসের পর মাস, নিজের ঝুঁকি পরিবারে সংক্রমিত করতে চাননা। আমার ব্যাচমেট জনপ্রিয় পুলিশ কর্মকর্তা সিও র‌্যাব, মোজাম্মেল ভাই এবং করোনা সংকট মোকাবেলায় ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের অন্যতম স্তম্ভ ব্যাচমেট, দেশে বিদেশের কমরেড, সাথী বন্ধু, জয়েন্ট কমিশনার ইমাম ভাই করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। সম্মুখ যোদ্ধা কমান্ডারদের আরো অনেকেই আক্রান্ত।

গভীর মমতায় আশা করি সম্মানিত নাগরিকরা একদিন না একদিন দেশ ও জাতির জন্য পুলিশের এই আত্মত্যাগের মূল্যায়ন করতে শিখবেন। রাব্বুল আলামিন মানুষকে অনেক ক্ষমতা দিয়েছেন, সত্যিকারের ভালবাসাকে ইগনোর করার ক্ষমতা দেননি। নিজের ও নিজের পরিবারের প্রতি সীমাহীন ঝুঁকি সত্ত্বেয় শুধুমাত্র চাকরির কারণে এত আত্মত্যাগ সম্ভব নয়। এজন্য প্রয়োজন মানুষের জন্য, দেশের জন্য অকৃত্রিম ভালবাসা। আজ হয়তো মানুষ বুঝতে পারছেনা, কিন্তু একদিন বুঝবে পুলিশকে কারণে অকারণে গালি না দিলে যাদের জিহ্বায় শান্তি লাগেনা তারাও একদিন আত্মহুতি দেয়া পুলিশের জন্য কাঁদবে। সেদিন খুব বেশী দূরে নয়।

বীর কখনো স্তুুতির জন্য আত্মহুতি দেয় না। দেশপ্রেম আর কর্তব্য কর্মের চেতনাই তার মোটিভেশন। শহীদুল্লাহ্ কায়সারের সংসপ্তকের একটা ডায়ালগ আমার খুব প্রিয়। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা মোকাবেলা করতে গিয়ে নায়ক তার প্রেয়সীকে বলে ‘‘তবুও সান্তনা থাকিবে এই অভাগা দেশ আর অভাগা মানুষের জন্য কিছু করিবার চেষ্টা তো করিয়াছি”।

কথাটি বললাম বড় কষ্টে, একটি বিশেষ দৃশ্যের প্রেক্ষিতে। ঈদের দিন দায়ীত্বের অংশ হিসাবে পূর্বাচল পুলিশ লাইনস্-এ গিয়েছিলাম। ফিরছি ৩০০ ফুট রাস্তা ধরে। একটা দৃশ্য চোখে পড়ল। একটা খোলা ট্রাকে একই ডিজাইনের পাঞ্জাবী পরা ২০/২৫ জন তরুন, ঈদের বিকালে ঘুরতে বেরিয়েছে। ইউনিফর্ম পরা বেরসিক পুলিশ তাদেরকে আটকিয়েছে।

যেখানে প্রতিদিন গড়ে ২০/২২ জন করে মারা যাচ্ছে। আক্রান্তের সংখ্যা ছাড়িয়েছে দৈনিক দুহাজার, যখন ঈদের সকল আনুষ্ঠানিকতা বন্ধ করা হয়েছে তখনো তরুনরা যদি এক কালারের পাঞ্জাবি পরে দলবেধে ঘোরে, মটর সাইকেলে প্রেমিক প্রেমিকারা যথেচ্ছ চলাফেরা করে, ফেরীতে, টার্মিনালে যদি উপচে পড়া ভীড় থাকে তাহলে পুলিশের, ডাক্তারের, চিকিৎসা কর্মীদের, সশস্ত্র বাহিনী বা মাঠ প্রশাসনের সদস্যদের এই আত্মত্যাগ সান্তনা ছাড়া আর কি?

সত্যিই বিচিত্র এ দেশ। কিইবা বলার আছে? বিধাতা এদের যদি জ্ঞান দেন তো সেটাই ভরসা। মৃত্যুর জন্যই মানুষের জন্ম। মহিমান্বিত মৃত্যু ভাগ্যবানদেরই হয়। খুব ছোট বেলায় পড়েছি “নিঃশেষে প্রাণ যে করিবে দান ক্ষয় নেই তার ক্ষয় নেই” কিংবা “এমন জীবন করিতে হইবে গঠন, মরনে হাসিবে তুমি কাঁদিবে ভুবন”।

আচ্ছা আমরা কি বলতে পারব এই যে ১৫ জন তরুন পুলিশ সদস্য, ডাক্তার, প্রশাসনের কর্মকর্তা, চিকিৎসা কর্মী মারা গেলেন এদের ক্ষয় নেই বা এদের জীবনটা এমনি যে, এদের জন্য খালি পরিবার না জাতিও একদিন কাঁদবে? হয়তো হ্যাঁ, হয়তোবা না। আশনিরাশার দোলে দোলাই জীবন, তবুও জীবনের কথা বলাই জীবন, অন্তবিহীন চলাই জীবন। পথ বেঁধে দিল বন্ধনহীন গ্রন্থি। আমাদের এই পথ চলাতেই আনন্দ।

(সংগত কারণেই সবুজ নামটি কাল্পনিক, আর সব ব্যক্তিগত অনুভুতি, কোথাও কিছুর মিল পাওয়া গেলে তা নিতান্তই কাকতালীয়)

ঢাকা ২৯ মে ২০২০

লেখক : অ্যাডিশনাল ডিআইজি,

এন্টিটেরোরিজম ইউনিট।

ভালো লাগলে শেয়ার করে দিন :)

0 Comments

Leave a Reply

Avatar placeholder

Your email address will not be published. Required fields are marked *