ই-পেপার

SITE UNDER CONSTRUCTION
বাংলাদেশ পুলিশের মুখপত্র
অব্যাহত প্রকাশনার ৬৩ বছর

রুবাইয়াত জামান

পুলিশ সদস্যদের রক্তদানের মত মানবিক কার্যক্রমের সাথে পরিচয় করিয়ে দেবার উদ্দেশ্যে ও বিপদাপন্ন মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মহান ব্রতে উজ্জীবিত করার লক্ষ্য নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে পুলিশ ব্লাড ব্যাংক। ২০১০ সালের ১২ ডিসেম্বর প্রতিষ্ঠিত পুলিশ ব্লাড ব্যাংক প্রতিষ্ঠার এগার বছর পার করে দ্বাদশ বর্ষে পা দিচ্ছে। প্রতিষ্ঠাকালীন যে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে গড়ে উঠেছিল পুলিশ ব্লাড ব্যাংক-তার কতটুকু অর্জিত হয়েছে এবং চলমান মহামারীকালে প্রত্যাশার কতটুকু পূরণ করতে পেরেছে পুলিশ ব্লাড ব্যাংক-প্রশ্ন উঠে।

পুলিশ ব্লাড ব্যাংক তার কার্যক্রম পরিচালনা করছে কেন্দ্রিয় পুলিশ হাসপাতালের দশতলা ভবনের দোতলায়। ব্লাড ব্যাংকের প্রশিক্ষিত সদস্যরা ২৪/৭ ভিত্তিতে পুলিশ সদস্যদের পাশাপাশি সেবা প্রদান করছে সাধারণ জনগণকে। অন্যান্য ব্লাড ব্যাংকের চেয়ে স্বল্পমূল্যে এবং মানসম্মত সেবা পাওয়া যায় বিধায় বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের কাছে আস্থার জায়গায় পৌঁছেছে প্রতিষ্ঠানটি। প্রতিষ্ঠানটি চিকিৎসায় প্রয়োজনীয় সব ধরণের রক্তসেবা প্রদান করছে। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির নিবন্ধিত রক্তদাতার সংখ্যা ৩১,৩৯০ জন, যাদের মধ্যে পুলিশ সদস্য ৪,৭৩২ জন এবং সাধারণ ব্যক্তি ২৬,৬৫৮ জন। রক্তদাতাদের স্বেচ্ছায় প্রদান করা রক্ত, ইভেন্ট, দিবস বা প্রতিষ্ঠানভিত্তিক ক্যাম্পেইন রক্ত সংগ্রহের মূল উৎস।

চিকিৎসকদের মতে, একজন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির শরীরে ৪-৬ লিটার রক্ত থাকে। প্রতিবার রক্তদানের মাধ্যমে একজন ব্যক্তি ৪৫০ মিলিলিটার রক্ত প্রদান করে থাকেন বিধায় এতে তার শারীরিক সমস্যা দেখা দেয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। ১৮-৬০ বছর বয়সী ও সর্বনিম্ন ৫০ কেজি ওজনের শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ যে কোন ব্যক্তি ৩-৪ মাস পর পর রক্ত প্রদান করতে পারেন। রক্তবাহিত বা শ্বাস-প্রশ্বাসজনিত কোন রোগে ভুগছেন অথবা ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, টাইফয়েড, বাতজ্বর, চর্মরোগ আছে, হিমোগ্লোবিন কম এমন ব্যক্তির রক্ত প্রদান সমীচীন নয়। এছাড়া, অ্যান্টিবায়োটিক সেবনকালে অথবা ক্যান্সার আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে যারা কেমোথেরাপি, হরমোনথেরাপি গ্রহণ করছেন- তাদের থেরাপি চলাকালীন রক্ত প্রদানে বাঁধা আছে। বড় ধরণের অস্ত্রোপচারের ৬ মাসের মধ্যে ও নারীদের ক্ষেত্রে সন্তান জন্ম দেয়ার ১ বছরের মধ্যে রক্ত প্রদান না করাই ভাল। রক্ত প্রদানকালীন রক্তদাতার রক্তচাপ, পালস ও শরীরের তাপমাত্রা স্বাভাবিক থাকতে হবে।

রক্ত প্রদানের মাধ্যমে একজন রক্তদাতা কেবল অপরের জীবন বাচাচ্ছেন না বরং গবেষণা বলছে এর মাধ্যমে রক্তদাতা নিজের অস্থিমজ্জার রক্ত কণিকা উৎপাদনের হার বাড়াচ্ছেন, বেশ কয়েক ধরণের ক্যান্সারে আক্রান্ত হবার ঝুঁকি কমাচ্ছেন, রক্তে নতুন লোহিত রক্তকণিকা তৈরির হার বাড়াচ্ছেন, রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা গ্রহণযোগ্য সীমার মধ্যে রাখতে কাজ করছেন এবং রক্তে হেপাটাইটিস বি, হেপাটাইটিস সি, এইডস, সিফিলিস, এইচআইভি কিংবা ম্যালেরিয়ায় জীবাণু প্রবেশ করেছে কি না- সেই বিষয়টিও জানছেন। ক্ষেত্রেবিশেষে, রক্তে আয়রন জমার প্রবণতা থাকলে সেটি কমানোর ক্ষেত্রে এমনকি রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতেও নিয়মিত রক্ত প্রদান ভূমিকা রাখতে পারে। ধর্মীয় দিক থেকেও রক্তপ্রদানের মাধ্যমে অপরের জীবনরক্ষায় ভূমিকা রাখা বিশেষভাবে গুরুত্ববহ। অস্ট্রেলিয়ার জেমস ক্রিস্টোফার হ্যারিসনের রক্তে অতিদুর্লভ এন্টিবডি থাকায় তিনি ৬০ বছর ধরে নিয়মিতভাবে রক্ত প্রদান করেছেন। অস্ট্রেলিয়ান রেডক্রসের মতে তার রক্তের এই অতিদুর্লভ এন্টিবডি জীবন বাঁচিয়েছে ২৪ লক্ষ শিশুর। অস্ট্রেলিয়ায় রক্তদানের সর্বোচ্চ বয়সসীমা ৮১ হওয়ায় ২০১৮ সালে শেষবার রক্ত প্রদান করেছেন জেমস, যিনি Man with the Golden অৎস হিসেবে সুপরিচিত।

২০২০ সালে প্রচারিত টিভি চ্যানেলের এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, বাংলাদেশে প্রতিবছর ১৩ লক্ষ ব্যাগ রক্তের চাহিদার বিপরীতে পাওয়া যায় ১০ লক্ষ ব্যাগের কিছু বেশি পরিমাণ রক্ত। রিলেটিভ ডোনার, বিভিন্ন ব্লাড ব্যাংক, প্রফেশনাল ডোনারদের কাছ থেকেই পাওয়া গেলেও রক্ত ঘাটতির পরিমাণ কিন্তু একেবারে কম নয়। কেবলমাত্র রক্তের অভাবে প্রতিবছর দেশে প্রায় ৫৫,০০০ মানুষের প্রাণহানির বিষয়টিও উদ্বেগজনক। সুস্থ মানব শরীর ব্যতিরেকে রক্তের অন্য কোন উৎস না থাকায় সাধারণ মানুষের স্বেচ্ছায় রক্তদানই হচ্ছে এ সমস্যার সহজ ও একমাত্র সমাধান।

রক্তের গঠন বিবেচনায় রক্তকে দুইভাগে ভাগ করা যায়। রক্তরস বা প্লাজমা (জলীয় অংশ) এবং রক্তকণিকা। মানুষের রক্তে এই জলীয় অংশের পরিমান ৯০-৯২%, যা হালকা হলুদ বর্ণের হয়ে থাকে। রক্তকণিকা গুলো হচ্ছে লোহিত রক্ত কণিকা (ইরাথ্রোসাইট), শ্বেত রক্ত কণিকা (হোয়াইট ব্লাড সেল) এবং অনুচক্রিকা (প্লাটিলেট/থ্রম্বোসাইট)। রক্তের এই জলীয় অংশ বা প্লাজমা বিভিন্ন অসুস্থতায় রোগীর শরীরে প্রদান করা হয়ে থাকে। বিশ্বব্যাপী মহামারী আকার ধারণ করা কোভিড-১৯ ভাইরাসের কারণে সৃষ্ট করোনার চিকিৎসায়ও এ পদ্ধতি ব্যবহৃত হয়েছে। বাংলাদেশে করোনা আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসায় প্লাজমা থেরাপি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। গর্বের বিষয়, এই মহামারীকালে দেশে যে প্রতিষ্ঠানগুলো প্লাজমা সরবরাহে অবদান রেখেছে তার মধ্যে অগ্রণী ভূমিকা ছিল পুলিশ ব্লাড ব্যাংকের। প্লাজমা থেরাপির কার্যকারিতা নিয়ে নিশ্চিতভাবে মন্তব্য না করা গেলেও ভ্যাকসিন বা অন্যান্য প্রতিষেধক আবিষ্কারের পূর্বে প্রচলিত চিকিৎসা পদ্ধতি হিসেবে অনুসরণ করে প্লাজমা থেরাপিতে আশাপ্রদ ফল পাওয়া গেছে। বিশেষ করে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম-এমন আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এই পদ্ধতি ব্যাপকভাবে প্রয়োগ করা হয়েছে।

একজন ব্যক্তির শরীরের কোভিড-১৯ ভাইরাস প্রবেশ ও বংশবিস্তারে সক্ষম হলে শরীরের নিজস্ব রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ক্ষতিকর ভাইরাস ধ্বংসে কাজ শুরু করে। তৈরি হয় অ্যান্টিবডি। খুব সাধারণভাবে বলতে গেলে, এই অ্যান্টিবডি যত দ্রুত কার্যকর হয়ে যত বেশি সংখ্যক ক্ষতিকর ভাইরাস ধ্বংস করতে সক্ষম হবে, অন্য কোনো রোগ বা শারীরিক জটিলতা না থাকলে আক্রান্ত ব্যক্তি তত দ্রুত আরোগ্য লাভ করবেন। একজন করোনা আক্রান্ত ব্যক্তি সুস্থ হয়ে ওঠার পর সাধারণত তার রক্তে পর্যাপ্ত পরিমান অ্যান্টিবডি পাওয়া যায়। সুস্থ হয়ে ওঠার ২৮ দিন পর রক্ত পরীক্ষা করে রক্তে অ্যান্টিবডির উপস্থিতি নির্ধারিত মাত্রায় পাওয়া গেলে তার রক্ত থেকে রক্ত কণিকাসমূহ আলাদা করা হয়। কণিকাসমূহ আলাদা হয়ে গেলে থেকে যায় রক্তরস বা প্লাজমা। চিকিৎসকের পরামর্শক্রমে এই প্লাজমাসহ অ্যান্টিবডিগুলো একই রক্তের গ্রুপের অপর আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরে প্রবেশ করানো হলে অ্যান্টিবডিগুলো আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরেও ক্ষতিকর ভাইরাস ধ্বংসে কাজ করতে পারে।

কোভিড মহামারীকালে বিভিন্ন হাসপাতাল নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় তাদের কাছে চিকিৎসাধীন রোগীদের প্লাজমা থেরাপি প্রদান করেছে। তবে, নিজস্ব এবং স্বয়ংসম্পূর্ণ ব্লাড ব্যাংক আছে- এমন হাসপাতালের সংখ্যা নগণ্য। এ যায়গায় নিরলস সেবা প্রদান করেছে পুলিশ ব্লাড ব্যাংক। কেন্দ্রিয় পুলিশ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রোগীদের যেমন এ সেবা প্রদান করা হয়েছে, একইভাবে অন্যান্য হাসপাতাল-ক্লিনিকে গুরুতর অবস্থায় ভর্তি রোগীদেরও স্বল্পমূল্যে বিপুল পরিমাণ প্লাজমা সরবরাহ করা হয়েছে। ২০২০ সালের মাঝামাঝি দেশব্যাপী কোভিড-১৯ ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব মহামারী আকার ধারণ করলে পেশা বিবেচনায় সর্বাপেক্ষা বেশি আক্রান্ত হয়েছিলেন আমাদের বাহিনীর সদস্যরা। বাদ যাননি আমাদের পরিবারের সদস্যরাও। পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স থেকে প্রাপ্ত সর্বশেষ হিসেব অনুযায়ী, এ মহামারীতে আক্রান্ত হয়েছেন ২৬,০৭৯ জন পুলিশ সদস্য যাদের মধ্যে শাহাদাৎ বরণ করেছেন আমাদের ১০৭ জন সহকর্মী।

করোনাকালে পুলিশের নিয়মিত কার্যক্রমগুলো যেমন স্বাভাবিক সময়কালের মত সচল ছিল, তেমনি এর সাথে যোগ হয়েছিল করোনা মহামারী বিষয়ে জনগণকে সচেতন করা, কর্মহীন শ্রেণির মাঝে খাদ্য/মানবিক সহায়তা বিতরণের মত বেশকিছু কার্যক্রম। বাহিনীর সদস্যরা যেমন বিভিন্ন মানবিক সহায়তা প্রদানে সমাজে অগ্রণী ভূমিকা রেখেছেন, তেমনি দায়িত্বপালনকালীন করোনা আক্রান্ত হয়েও তারা মানুষের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা অব্যহত রেখেছেন।

দেশের বিভিন্ন জেলায় করোনা আক্রান্ত পুলিশ সদস্যরা রোগমুক্ত হবার নির্দিষ্ট সময় পর তাদের শরীরে থাকা অ্যান্টিবডিসমৃদ্ধ প্লাজমা পুলিশ ব্লাড ব্যাংকের মাধ্যমে প্রদান করেছেন। স্বেচ্ছায় প্রদান করা এই কোভিড প্লাজমায় নতুন জীবন লাভ করেছেন অসংখ্য মানুষ। পুলিশ ব্লাড ব্যাংক থেকে পাওয়া তথ্য অনুসারে, ৩৯৮৭ ব্যাগ কোভিড প্লাজমা তারা বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রোগীদের জন্য প্রদান করেন- একক প্রতিষ্ঠান হিসেবে যা দেশে সর্বোচ্চ। এই মাইলফলক পুলিশ ব্লাড ব্যাংকের একদিনের অর্জন নয় বরং এক দশকেরও বেশি সময় ধরে প্রতিষ্ঠানটির প্রতি গড়ে ওঠা আস্থার প্রতিফলন।

সম্প্রতি রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় মশাবাহিত রোগ ডেঙ্গু জ্বরের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর ক্ষেত্রে যে সকল শারীরিক জটিলতা দেখা দিতে পারে তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে রক্তের প্লাটিলেট কমে যাওয়া। রক্তে প্লাটিলেটের মাত্রা বিপদজনক সীমায় চলে আসলে চিকিৎসকেরা অনেক সময় প্লাটিলেট প্রদানের পরামর্শ দিয়ে থাকেন। চলতি বছরে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত গুরুতর অসুস্থ রোগীদের সহায়তায় এ পর্যন্ত পুলিশ ব্লাড ব্যাংক ৪৪৯ ব্যাগ প্লাটিলেট প্রদান করেছে, যা এখনও চলমান। এছাড়া বিভিন্ন দুরারোগ্য রোগ, আগুনে পুড়ে যাওয়া, রক্তসল্পতা, সার্জারির ক্ষেত্রে প্রতিনিয়ত সংকটাপন্ন রোগীকে নিভৃতে সেবা প্রদান করে যাচ্ছে পুলিশ ব্লাড ব্যাংকের প্রশিক্ষিত কর্মীবৃন্দ।

স্বেচ্ছায় রক্তদান কেবলমাত্র জীবন বাঁচায় না, পরিচিত-অপরিচিতকে আবদ্ধ করে রক্তের বন্ধনে। রক্তদাতা হয়ত জানলেনই না তার শরীরে প্রবহমান রক্তের সামান্য অংশ জীবন ফিরিয়ে দিচ্ছে পরিচিত-অপরিচিত কত মানুষের! নিত্ত-নৈমিত্তিক কাজের পাশাপাশি পুলিশ সদস্যদের জন্য এটি হতে পারে নিরবে অসহায় মানুষের পাশে থাকার এক অনন্য মাধ্যম। প্রিয় মুখটিকে একটু স্বস্তি দিতে প্রতিদিন বহু মানুষ ভীড় করেন ব্লাড ব্যাংকের দরজায়। তাদের গল্পগুলো ভিন্ন হলেও, চাওয়া কিন্তু এক। প্রতিনিয়ত জীবন বাঁচানোর এমন শত-সহ¯্র মানবিক গল্পের প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠুক পুলিশ ব্লাড ব্যাংক, এক যুগে পদার্পণের প্রাক্কালে এ প্রত্যাশা আমাদের সবার।

লেখক : অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (তেজগাঁও জোন), ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ।

ভালো লাগলে শেয়ার করে দিন :)

0 Comments

Leave a Reply

Avatar placeholder

Your email address will not be published. Required fields are marked *