ই-পেপার

SITE UNDER CONSTRUCTION
বাংলাদেশ পুলিশের মুখপত্র
অব্যাহত প্রকাশনার ৬৩ বছর

বাকী বিল্লাহ

পুলিশের অনুসন্ধান তদন্তে গোপালগঞ্জে দুটি আলোচিত হত্যাকান্ডের রহস্য উদঘাটন হয়েছে। এর মধ্যে গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায় দীর্ঘ ২০ বছর পর ক্লুলেস হত্যা মামলার রহস্য উদঘাটন করা হয়েছে। অপরদিকে গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায়  হাসি রানী পান্ডে নামে একজন অসুস্থ মাকে তার কিশোর ছেলে মাথায় আঘাত করে  হত্যা করেছে। হত্যার পর লাশ গুম করতে কিশোর ছেলে নানা কাহিনি সাজিয়েছে। এক পর্যায়ে মায়ের লাশ আগুনে পুড়ে ছাইও পানিতে ভাসিয়েছে। দুটি ঘটনা জেলা পুলিশ তদন্ত করে রহস্য উদঘাটন করে আসামিকে গ্রেফতার করে আইনি প্রক্রিয়ায় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়াও সম্প্রতি গোপালগঞ্জ থেকে অপহৃত এক শিশুকে পাবনা থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। আসামিরা পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে নিজেদেরকে জড়িয়ে স্বীকারোক্তি দিয়েছে। গোপালগঞ্জ জেলা এসপি অফিস থেকে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ছানোয়ার হোসেন এ সব তথ্য জানিয়েছেন।

তুচ্ছ ঘটনা নিয়ে মাকে হত্যা

গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায়  হাসি রানী পান্ডে নামে একজন অসুস্থ মাকে তার কিশোর ছেলে মাথায় আঘাত করে  হত্যা করেছে। গত ২৭ জুন রাত ১০টার পর এ নির্মম ঘটনা ঘটে। হত্যার পর লাশ গুম করতে কিশোর ছেলে নানা কাহিনি সাজিয়েছে। এক পর্যায়ে মায়ের লাশ গুম করতে আগুনে পুড়ে ফেলেছে। শুধু তাই নয় নিখোঁজ মাকে খুঁজতে বাবার সঙ্গে বিভিন্ন স্থানে গিয়ে খোঁজ খবর নেয়। থানায় গিয়ে মা নিখোঁজের বিষয় ৪ জনকে অভিযুক্ত করে প্রথমে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করে।  পুলিশের তদন্তের এক পর্যায়ে কিশোর ছেলের আচরণ সন্দেহ হলে তাকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করলে বেরিয়ে আসে চাঞ্চল্যকর কাহিনি। সে মাকে হত্যা ও লাশ গুমের দায় স্বীকার করে। গোপালগঞ্জ জেলা এসপি অফিস থেকে  এ কাহিনি জানা গেছে।

গোপালগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ছানোয়ার হোসেন জানান, মা হাসি রানী পান্ডেকে হত্যার দায়ে তদন্তের এক পর্যায়ে ছেলে আকাশ পান্ডেকে  গ্রেফতার করা হয়েছে। সে নিজেকে জড়িয়ে আদালতে ১৬৪ ধারায় দোষ স্বীকার করে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে।

ঘটনার পর কোটালীপাড়া ভাংগারহাটসহ বিভিন্ন স্থানে  টানা অভিযান চালানো হয়। অবশেষে গত ২৪  সেপ্টেম্বর রাতে  হত্যাকান্ডে ব্যবহৃত কেরোসিনের বোতলসহ একমাত্র হত্যাকারী  আকাশ পান্ডেকে গ্রেফতার করা হয়। সে জিজ্ঞাসাবাদে ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে।  এর পর বিজ্ঞ আদালতে তার জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়।

পুলিশ জানায়, অভিযুক্ত আকাশ পান্ডে কোটালীপাড়া স্থানীয় একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নবম শ্রেণির ছাত্র। তার মা হাসি রানী পান্ডে একজন মানসিক রোগী।  গত ২৭ জুন  রাত সাড়ে ১০টার দিকে  অভিযুক্ত ছেলে আকাশ পান্ডে বাসায় ঢুকে মায়ের কাছে   রাতের খাবার চাইলে  মা হঠাৎ খাবারের প্লেট ছুড়ে মারে এবং ভাত ফেলে দেয়। আকাশ কারণ জিজ্ঞাস করে থামাতে গেলে মা তাকে বটি দিয়ে আঘাত করতে চায়। তখন আকাশ রান্না করার কাঠ দিয়ে মায়ের মাথার আঘাত করলে তা মাথার পেছনে লাগে। মারাত্মক অবস্থায় মা মাটিতে লুটে পড়ে মারা যান। মা মারা যাওয়ার পর আকাশ প্রথমে বাসার (ঘরের) বাহিরে গিয়ে  চারপাশে কেউ আছে কিনা দেখে। এরপর পাটখড়ি ও ঘর থেকে কেরোসিন এবং গ্যাসলাইট নিয়ে ঘর থেকে ৩০ -৪০ ফিট দূরে  মায়ের লাশ কোলে করে নৌকাযোগে ৫শ থেকে ৬শ মিটার দূরে নিয়ে যায়। সেখানে শুকনো কাঠের লাকড়ির ওপর মায়ের লাশ  রেখে কেরোসিন ঢেলে  পুড়িয়ে দেয়।  লাশ পুড়ে ছাই হয়ে গেলে নৌকার পানি সেচের সেচনি দিয়ে উক্ত ছাই পানিতে ফেলে বাড়ি  গিয়ে গোসল করে  ঘুমিয়ে পড়ে।

পরের দিন আকাশের বাবা মা সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করলে আকাশ বলে, তার নানা হয়ত মাকে নানাবাড়ি নিয়ে গেছেন। কিংবা মা কোথায়ও চলে গেছে আবার ফিরে আসবে। কারণ এর আগে আকাশের মা  দুই থেকে তিনবার  বাসা থেকে বাহিরে চলে গেছে। আবার ফিরে আসবে। এরপর আকাশ তার বাবার সঙ্গে বিভিন্ন জায়গায় মাকে খুঁজতে যায়। আবার

থানায় গিয়ে মা নিখোঁজের বিষয় বাবাকে গিয়ে ৪ জনের  বিরুদ্ধে প্রথমে অভিযোগ ও পরে জিডি করে। এ নিয়ে দুই পরিবারের মধ্যে সন্দেহ ও বিতর্কের সৃষ্টি হয়। এরপর আকাশের নানা জুয়ান বাড়ৈ ক্ষুব্ধ হয়ে যৌতুকের জন্য মারপিট করে হত্যা করা হয়েছে বলে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে আদালতে মামলা দায়ের করেন। পুলিশকে মামলার তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়। পুলিশ মাঠ পর্যায়ে ব্যাপক তদন্ত করেন। তারা পৃথকভাবে বাদী, বিবাদীসহ বিভিন্নজনকে নানা কৌশলে জিজ্ঞাসাবাদ করে। পৃথক জিজ্ঞাসাবাদের এক পর্যায়ে পুলিশ ভিকটিম হাসি রানীর ছেলে আকাশের আচরণ সন্দেহ হলে  তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে সে মাকে খুন,লাশ ঘুম ও পুড়িয়ে ফেলার লোমহর্ষক কাহিনি বেরিয়ে আসে। এ সম্পর্কে জানতে চাইলে জেলা পুলিশ কর্মকর্তারা বলেন, অভিযুক্ত কিশোর তার বাবার সঙ্গে শ্মশান ঘাটে মরদেহ দাহ রাতে তার বাবাকে সহযোগিতা করত। এ কারণে কিশোর ছেলে লাশ পোড়ানোর আগাম অভিজ্ঞতা থেকে নিজের মাকে হত্যার পর পুড়িয়ে ফেলছে। শুধু তাই নয় পুড়িয়ে ফেলার পর ছাই পানিতে ভাসিয়ে দিয়েছে।

২০ বছর পর ক্লু উদঘাটন

গোপালগঞ্জের জেলা এসপি অফিস থেকে  জানা গেছে, ২০০১ সালে ১৫ মার্চ কোটালীপাড়া সিকিব বাজারস্থ বাংলাদেশ মেডিকেল হল নামক ওষুধের দোকানের কর্মচারী প্রভাংশু বিশ্বাসকে দোকানের ভিতরে  হত্যা করা হয়। এ নিয়ে কোটালীপাড়া থানায় মামলা (নং ৬ তারিখ-১৬-৩-২০০১)  দায়ের করা হয়। প্রায় ২০ বছর ধরে  আইন শৃঙ্খলা বাহিনী টানা তদন্ত করেন। তদন্তে ৭ জন  তদন্ত কর্মকর্তা মামলাটি তদন্ত করেন।  কিন্তু কোনো ক্লু উদঘাটন করতে পারেননি। অবশেষে  জেলা পুলিশ সুপার  সাইদুর রহমান খানের নিবিড় তদারকিতে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ছানোয়ার হোসেনের নেতৃত্বে একটি টিম অনুসন্ধান তদন্ত চালিয়ে প্রায় ২০ বছর পর দুই আসামিকে গ্রেফতার করে।  আসামিরা আদালতে ১৬৪ ধারায় নিজেদেরকে জড়িয়ে জবানবন্দি দিয়েছেন। ঘটনা সাক্ষ্য প্রমাণের ভিত্তিতে  মামলার রহস্য  উদঘাটন ৩ আসামির বিরুদ্ধে আদালতে  অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করা হয়।

আসামিদের জবানবন্দি ও সাক্ষ্য প্রমাণে জানা যায়, অভিযুক্ত সুধীর কুমার গৌতম, সুশীল দাস ও দেবাশিষ  বিশারদ  (সবাই গোপালগঞ্জ)  ৩ জন মিলে দোকান কর্মচারী  প্রভাংশু বিশ্বাসকে  মারপিট ও শ্বাসরোধ করে হত্যা করে। গত ১৮ নভেম্বর ৩ আসামিকে অভিযুক্ত করে আদালতে চার্জিশিট দাখিল করা হয়েছে।

গোপালগঞ্জের পুলিশ সুপার মুহাম্মদ সাইদুর রহমান খানের নির্দেশনায়  অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোহাম্মদ ছানোয়ার হোসেনের তদারকিতে  অভিযান চালিয়ে আসামিদেরকে গ্রেফতার করা হয়েছে। কিন্তু  প্রায় ২০ বছর আগের এই হত্যাকা- হওয়ায় মামলার বাদী ও সাক্ষীরা অনেকেই হতাশ হয়ে গেছে। অনেকেই এখন আর মামলা চালাতে বা সাক্ষী দিতে গড়িমসি করছেন। এরপরও জেলা পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন, এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে এবং আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় আসামিদের চিহ্নিত ও গ্রেফতার করে। তবে দীর্ঘ প্রায় ২০ বছর হয়ে যাওয়ায় মামলাটি নিয়ে বাদী পক্ষ আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে। সাক্ষীরা এখন আর বিরোধে জড়াতে চায় না বলে ধারণা করা হচ্ছে।    

শিশু অপহরণ ও উদ্ধার

গত ১৪ নভেম্বর গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার  গোবরা ইউনিয়নের মাদ্রাসাপাড়ার বাড়িওয়ালা  মোঃ নজরুল শেখের  ৯ বছরের শিশু হাফিজুর শেখকে বাড়ির ভাড়াটে মাইক্রোবাসযোগে অপহরণ করে নিয়ে যায়।  এরপর অপহরণকারীরা পরিবারের কাছে মুক্তিপণ দাবি করেন।  এ ঘটনায়  গোপালগঞ্জ সদর থানায়  নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা রুজু করা হয়। পুলিশ আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে রাজবাড়ী, সিরাজগঞ্জ, গোপালগঞ্জ ও পাবনার বিভিন্ন স্থানে টানা অভিযান চালায়। এক পর্যায়ে পাবনার  সুজানগর  উপজেলার তাতিকান্দা ইউনিয়নের  তাতিবন্দ  গ্রামে অভিযুক্ত বাবুল হোসেনের বাড়ি থেকে  শিশু হাফিজুরকে  উদ্ধার করে।  ঘটনায় জড়িত অন্য আসামিদেরকে  গ্রেফতারে  অভিযান অব্যাহত আছে। অভিযানে পুলিশ সদর দপ্তর, পিবিআই গোপালগঞ্জের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা সহযোগিতা করেছেন বলে জেলা পুলিশ জানিয়েছেন।

আলোচিত দুটি হত্যাকা- ও শিশু অপহরণের বিষয়  পুলিশের ঢাকা রেঞ্জ অফিস থেকে মনিটরিং করা হয়েছে। তাদের তদারকি ও গাইডলাইন অনুসরণ করে ২০ বছরের পুরনো মামলাসহ দুটি হত্যা মামলার রহস্য জেলা পুলিশই উদঘাটন করেছে।

লেখক : সাংবাদিক

ভালো লাগলে শেয়ার করে দিন :)

0 Comments

Leave a Reply

Avatar placeholder

Your email address will not be published. Required fields are marked *