ই-পেপার

SITE UNDER CONSTRUCTION
বাংলাদেশ পুলিশের মুখপত্র
অব্যাহত প্রকাশনার ৬৩ বছর

মোহাম্মাদ আনিসুর রহমান

মাদকের বিস্তৃতি সমাজ, রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রের নাগরিকদের জন্য এক ধরনের মানবসৃষ্ট দুর্যোগ। নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয় ও তার ভয়াবহ পরিণতির সঙ্গে মাদকের তাৎপর্যপূর্ণ সহ-সম্পর্ক রয়েছে। ১৯৮৭ সালে ৪২তম অধিবেশনে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ মাদকের বিরুদ্ধে প্রথম পদক্ষেপ নিলেও মাদকের ভয়াল পরিণতি থেকে তাৎপর্যপূর্ণভাবে পৃথিবীকে রক্ষা করা সম্ভবপর হয়ে উঠছে না। সাম্প্রতিক সময়ে মাদকাসক্তি দাবানলের মতো আশঙ্কাজনকভাবে ছড়িয়ে পড়ায় দেশের কিশোর, তরুণ ও যুব সমাজের মধ্যে সামাজিক ও নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয় প্রত্যক্ষ করা যায়। মাদকাসক্ত ও মেধাশূন্য যুব সমাজ রাষ্ট্রের জন্য কল্যাণকর নয়। বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক এই ভেবে যে, মাদক উৎপাদনকারী দেশ না হয়েও ভৌগোলিক কারণে দুর্ভাগ্যজনকভাবে বাংলাদেশে মাদক ব্যবসা ছড়িয়ে পড়েছে। তার যৌক্তিক কারণ হলো, বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমে ‘গোল্ডেন ক্রিসেন্ট’ (পাকিস্তান, আফগানিস্তান ও ইরান) এবং দক্ষিণ-পূর্বে ‘গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেল’ (মিয়ানমার, থাইল্যান্ড ও লাওস)। এই অঞ্চলগুলোতে গাঁজা, চরস, কোকেন, হেরোইন, আফিম (পপি গাছ) উৎপাদন ও বাজারজাত করা হয়, যা বাংলাদেশকে প্রভাবিত করার পাশাপাশি ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিয়েছে। সামাজিক ও নৈতিক মূল্যবোধের ক্রমহ্রাসমান অবক্ষয় সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য কল্যাণ বয়ে আনতে পারে না, বরং বিপর্যস্ত হতে পারে মানবতা। সেই প্রেক্ষিতে বাংলাদেশ পুলিশ, ঢাকা রেঞ্জের মাননীয় ডিআইজি জনাব হাবিবুর রহমানের মহৎ উদ্যোগে গবেষণার মাধ্যমে রেঞ্জাধীন বিভিন্ন জেলার মাদক মামলা সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহের (১ জানুয়ারি, ২০১৯ থেকে ৩১ ডিসেম্বর, ২০১৯) কাজ অত্যন্ত প্রশংসাযোগ্য, যা পর্যালোচনা করে প্রাপ্ত ফলাফল নিম্নে তুলে ধরা হলো :

ঢাকা জেলায় ১ জানুয়ারি ২০১৯ পর্যন্ত বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ছিল পাঁচ হাজার ৭০৮টি এবং ২০১৯ সালে সারা বছরে সর্বমোট বিচার ফাইলে মামলার সংখ্যা ছিল দুই হাজার ৩৯২টি এবং ২০১৯ সালের ৩১শে ডিসেম্বর পর্যন্ত বিচার ফাইলে প্রেরিত মামলা ছিল সর্বমোট আট হাজার ১০০টি। মাদক মামলার ক্ষেত্রে ঢাকা জেলায় বিচার নিষ্পত্তিকৃত মামলার সংখ্যা ছিল ১৬০টি (১.৯৮%) যেখানে সাজা হয়েছিল ৬৫টিতে (৪০.৬৩%) এবং খালাস হয়েছিল ৯৫টিতে (৫৯.৩৮%)।

একই মামলার ক্ষেত্রে নারায়ণগঞ্জের মাদক মামলার ঘটনা ছিল অনেক বেশি (মোট = ১৪ হাজার ২১৩টি)। প্রাপ্ত উপাত্ত থেকে আমরা জানতে পারি যে, পহেলা জানুয়ারি ২০১৯ পর্যন্ত বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ছিল ১১২৯২টি। শুধু ২০১৯ সালে সারা বছরে সর্বমোট বিচার ফাইলে মামলার সংখ্যা ছিল দুই হাজার ৯২১টি এবং ২০১৯ সালের ৩১শে ডিসেম্বর পর্যন্ত সর্বমোট বিচার ফাইলে প্রেরিত মামলার সংখ্যা ১৪ হাজার ২১৩টি। এর মধ্যে বিচার নিষ্পত্তিকৃত মামলার সংখ্যা ছিল ২৪৩টি (১.৭১%) যেখানে সাজা হয়েছিল ৫১টিতে (২০.৯৯%) এবং খালাস হয়েছিল ১৯২টিতে (৭৯.০১%)। নারায়ণগঞ্জ জেলায় মাদক মামলা ২০১৯ সাল পর্যন্ত মামলার সংখ্যা (১৪ হাজার ২১৩টি) যেমন বেশি, তেমনি মামলায় খালাসের সংখ্যা ও হার বেশি ১৯২টিতে (৭৯.০১%)।

মুন্সীগঞ্জে ২০১৯ সাল পর্যন্ত বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ছিল চার হাজার ১৬১টি। ২০১৯ সালে ছিল এক হাজার ১৪০টি। বিচার নিস্পত্তিকৃত মামলার সংখ্যা ছিল ৯৩৪টি (১৭.৬২%)। এর মধ্যে সাজা হয়েছিল ৩৬৭টিতে (৩৯.২৯%) এবং খালাস হয়েছে ৫৬৭টিতে (৬০.৭১%)।

মানিকগঞ্জে ২০১৯ সাল পর্যন্ত বিচারাধীন মামলার সংখ্যা চার হাজার ৭১৫টি। শুধু ২০১৯ সালে বিচার ফাইলে পাঠানো মামলার সংখ্যা ছিল পাঁচ হাজার ৯৩৬টি। এর মধ্যে বিচার নিস্পত্তি হয়েছিল ৬৫৫টি (১১.০৩%)। যেখানে সাজা পেয়েছে ৩৬৪টিতে (৫৫.৫৭%) এবং খালাস পেয়েছে ২৯১টিতে (৪৪.৪৩%)।

নরসিংদী জেলায় ২০১৯ সাল পর্যন্ত পূর্বের মাদক মামলা ছিল তিন হাজার ১৩৫টি। ২০১৯ সালে বিচার প্রক্রিয়ায় প্রেরিত মামলার সংখ্যা ছিল ১৫৬৭টিসহ সর্বমোট চার হাজার ৭০২টি। এর মধ্যে বিচার নিস্পত্তি হয়েছে ৪৩০টি (৯.১৫%) মামলার, যেখানে সাজা হয়েছে ২৬০টিতে (৬০.৪৭%) এবং খালাস পেয়েছে ১৭০টিতে (৩৯.৫৩%)।

গাজীপুরে মাদক মামলা তুলনামূলকভাবে বেশি যেটি নারায়ণগঞ্জের পরেই অবস্থান করছে। প্রাপ্ত তথ্যমতে, ২০১৯ সালে ডিসেম্বর পর্যন্ত সর্বমোট বিচারাধীন মাদক মামলার সংখ্যা ছিল ১২ হাজার ১৬৬টি। এর মধ্যে বিচার নিস্পত্তি হয়েছে ২৩৬টি (১.৯৪%)। বিচারে সাজা হয়েছে ২০টিতে (০৮.৪৭%) এবং খালাস পেয়েছে ২১৬টিতে (৯১.৫৩%)। গাজীপুরে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ মামলার সংখ্যা (১২ হাজার ১৬৬) হলেও নিস্পত্তিকৃত মামলার সংখ্যা যেমন কম, তেমনি সাজাপ্রাপ্ত মামলার সংখ্যাও কম। ঠিক বিপরীতভাবে খালাস প্রাপ্ত মামলার সংখ্যা বেশি। অপরাধবিজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণে সারণীকৃত তথ্য অনুযায়ি গাজীপুরের মাদক সংক্রান্ত মামলার বিষয়গুলো উদ্বেগজনক ও সমস্যাসংকুল বলে প্রতীয়মান হয়, যা অধিক গবেষণার দাবি রাখে।

কিশোরগঞ্জে ২০২০ সালে পূর্ব পর্যন্ত বিচার ফাইলে প্রেরিত সর্বমোট মাদকের মামলার সংখ্যা ছিল পাঁচ হাজার দুটি। যার মধ্যে সর্বমোট নিষ্পত্তিকৃত মামলার সংখ্যা ছিল ১০৫টি (২.১০%)। বিচারে ৪৮টিতে সাজা (৪৫.৭১%) এবং খালাস পেয়েছে ৫৭টিতে (৫৪.২৯%)।

টাঙ্গাইলে ২০১৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বিচার প্রক্রিয়াধীন মাদক মামলার সংখ্যা ছিল ১০ হাজার ৫৩১টি। যার মধ্যে সর্বমোট নিষ্পত্তিকৃত মামলার সংখ্যা ছিল ৩২৬টি (৩.১০%)। বিচারে ৭৪টিতে সাজা (২২.৭%) এবং খালাস পেয়েছে ২৫২টিতে (৭৭.৩০%)।

ফরিদপুরে ২০১৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বিচার প্রক্রিয়াধীন মাদক মামলার সংখ্যা ছিল চার হাজার ৫৭৫টি। যার মধ্যে সর্বমোট নিষ্পত্তিকৃত মামলার সংখ্যা ছিল ৭৫৪টি (১৬.৪৮%)। বিচারে ২৪৬টিতে সাজা (৩২.৬৩%) এবং খালাস পেয়েছে ৫০৮টিতে (৬৭.৩৭%)।

রাজবাড়ী জেলায় ২০১৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বিচার প্রক্রিয়াধীন মাদক মামলার সংখ্যা ছিল পাঁচ হাজার ৭২৬টি। এর মধ্যে নিষ্পত্তিকৃত মামলার সংখ্যা ছিল ১৬২টি (২.৮৩%)। বিচারে ১০১টিতে সাজা (৬২.৩৫%) এবং খালাস পেয়েছে ৬১টিতে (৬৭.৩৭%)।

গোপালগঞ্জ জেলায় ২০১৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সর্বমোট বিচারাধীন মাদকের মামলা ছিল দুই হাজার ৭৫০টি। যার মধ্যে সর্বমোট নিস্পত্তিকৃত মামলার সংখ্যা ছিল ১৬২টি (৫.৮৯%)। বিচারে ১৫৬টি সাজা (৯৬.৩%) এবং খালাস পেয়েছে ৬টি (০৩.৭০%)। গোপালগঞ্জ জেলার মাদক সংক্রান্ত মামলার তথ্য অনুযায়ি, মাদক মামলা গুরুত্বের সঙ্গে আমলে নেওয়া, আসামি গ্রেফতার ও আদালতে পাঠানো, আলামত জব্দ এবং মাদক মামলার বিরুদ্ধে যথোপযুক্ত সাক্ষ্য-প্রমাণ সময়মত আদালতে উপস্থাপন সবকিছুর মধ্যে এক ধরনের সঙ্গতি রয়েছে। যার কারণে মামলা রুজু, চার্জশিট ও আদালতের বিচার পর্যন্ত এক ধরনের সঙ্গতি দেখা যায়। ফলে গোপালগঞ্জ জেলার মাদক মামলার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব এবং তাৎপর্যপূর্ণ বিচার ব্যবস্থা বাংলাদেশের সব এলাকার জন্য আশার আলো জাগানিয়া একটি রোল মডেল হতে পারে, যা রাষ্ট্র, রাষ্ট্রের নাগরিক এবং সর্বোপরি সমাজের জন্য ইতিবাচক ফলাফল বয়ে আনতে পারে বলে প্রতীয়মান হয়।

মাদারীপুর ২০১৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সর্বমোট বিচারাধীন মাদকের মামলা ছিল এক হাজার ৯৭১টি। যার মধ্যে সর্বমোট নিষ্পত্তিকৃত মামলার সংখ্যা ছিল ৫০২টি (২৫.৪৭%)। বিচারে ২৬৪টিতে সাজা (৫২.৫৯%) এবং খালাস পেয়েছে ২৩৮টি মামলায় (৪৭.৪১%)।

শরীয়তপুরে ২০১৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সর্বমোট বিচারাধীন মাদকের মামলা ছিল দুই হাজার ৩৭৬টি। যার মধ্যে নিষ্পত্তি হয়েছে ১০৪টি (৪.৩৮%)। বিচারে ৩০টি মামলায় সাজা (২৮.৮৫%) এবং খালাস পেয়েছে ৭৪টি মামলায় (৭১.১৫%)।

ঢাকা রেঞ্জের আওতাধীন ১৩টি জেলায় ২০১৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সর্বমোট বিচারাধীন মাদকের মামলার সংখ্যা ৮৩ হাজার ৩৪৯টি। যার মধ্যে নিষ্পত্তি হয়েছে চার হাজার ৭৭৩টি (৫.৭৩%)। মোট সাজা হয়েছে দুই হাজার ০৪৬টি (৪২.৮৭%) মামলায় এবং খালাস পেয়েছে দুই হাজার ৭২৭টি (৫৭.১৩%) মামলায়। ঢাকা রেঞ্জের আওতাধীন ১৩টি জেলায় মাদক মামলায় সাজা হওয়ার মোট গড় ৪৩.৫৮% এবং খালাস হওয়ার মোট গড় ৫৬.৪২%। ১০টি জেলার মাদক মামলায় খালাসের হার সাজার হারের চেয়ে বেশি। সমাজবিজ্ঞান ও অপরাধবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে মাদক অনেক অপরাধমূলক কর্মকা-, সামাজিক সমস্যা এবং দেশের অর্থনৈতিক সংকটের জন্য দায়ী। মানুষ শুধু মাদকের চালান ধরা পড়তে দেখে। কিন্তু কোটি কোটি টাকার মাদকের বাণিজ্যের পেছনে অবৈধ হুণ্ডির মাধ্যমে লেনদেনের বিষয়টি অধরায় থেকে যায়। শুধু মাদক নির্মূল করা সম্ভব হলে মাদকের সঙ্গে শৃঙ্খলিত অপরাধমূলক কর্মকা- যেমন কমে যাবে, ঠিক তেমনি কমে যাবে মাদক কারবারি ও অপরাধীর দৌরাত্ম্য। আমাদের চারপাশের পরিবেশকে মাদকের বিষমুক্ত করার জন্য সবাইকে সচেতন এবং প্রতিকার ও প্রতিরোধের জন্য যার যার অবস্থান থেকে জেগে উঠতে হবে। এই কাজে বাংলাদেশ পুলিশ সম্মুখে থেকে নেতৃত্ব দিতে পারে। কেননা মাদক সংক্রান্ত অপরাধ দমন, প্রতিকার ও প্রতিরোধের জন্য পুলিশও যে সমাজের অন্যতম নায়ক।

লেখক : পি.এইচ.ডি. গবেষক, আন্তজাতিক সম্পর্ক ও বৈশ্বিক সুশাসন, জেঝিয়াং ইউনিভার্সিটি, চীন এবং সাবেক চেয়ারম্যান ও শিক্ষক (শিক্ষাছুটি) সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, বশেমুরবিপ্রবি, গোপালগঞ্জ।

ভালো লাগলে শেয়ার করে দিন :)

0 Comments

Leave a Reply

Avatar placeholder

Your email address will not be published. Required fields are marked *