ই-পেপার

SITE UNDER CONSTRUCTION
বাংলাদেশ পুলিশের মুখপত্র
অব্যাহত প্রকাশনার ৬৩ বছর

সুমন পালিত

বাংলাদেশ নামের স্বাধীন রাষ্ট্র এবং বাঙালির স্বাধীন জাতি হিসেবে আত্মপ্রকাশের পেছনে বঙ্গবন্ধুর যেসব অনুগামীর অবদান অনস্বীকার্য, জননেতা আবদুর রাজ্জাক তাদেরই একজন। রাজ্জাক ভাই আজ নেই। ২০০০ সালে এক বন্ধুর সঙ্গে গিয়েছিলাম তাঁর মিন্টু রোডের সরকারি বাসভবনে। সে সময়ের পানিসম্পদ মন্ত্রী আবদুর রাজ্জাক গল্পছলে বলেছিলেন, রাজনীতিতে আসবেন এমন কোনো ইচ্ছাই তার ছিল না। ইচ্ছা ছিল কুস্তিগীর হবেন। কিশোর বেলা থেকেই শরীর গঠনে যত্নবান ছিলেন তিনি। এমনকি মি. ইস্ট পাকিস্তানও হয়েছিলেন একবার। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর প্রতি ভালোবাসা তাকে নিয়ে আসে রাজনীতিতে। কুস্তিগীরের বদলে আপাদমস্তক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বে পরিণত হন তিনি।

মানুষের চিন্তার রাজ্যে প্রতিনিয়ত পরিবর্তন ঘটে। এ প্রতিক্রিয়ার কারণে আজ যিনি চিন্তার রাজ্যের উত্তর মেরুতে অবস্থান করছেন কাল তিনি দক্ষিণ মেরুর বাসিন্দা হবেন না- তার নিশ্চয়তা নেই। কিউবার নেতা ফিদেল ক্যাস্ত্রো মার্কিনবিরোধী ব্যক্তিত্ব হিসেবে সারা দুনিয়ায় পরিচিত। কিন্তু ছোটবেলায় এহেন ক্যাস্ত্রো ১৪ বছর বয়সে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন ডি রুজভেল্টের কাছে ১০ ডলার চেয়ে চিঠি লিখেছিলেন। রোমান ক্যাথলিক মিশন পরিচালিত মাধ্যমিক স্কুলের ছাত্র ছিলেন ক্যাস্ত্রো। সেখান থেকে তিনি চিঠি লিখেছিলেন ১৯৪০ সালের ২৫ নভেম্বর। ছোট-বড় অসংলগ্ন অক্ষরে লেখা চিঠির নিচে নিজের নাম লিখতে গিয়ে কিশোর ক্যাস্ত্রো লিখেন আপনার বন্ধু’। কিশোর বয়সে আক্ষরিক অর্থেই ক্যাস্ত্রো ছিলেন রুজভেল্টের প্রতি বিস্ময়কর রকমের শ্রদ্ধাশীল। রুজভেল্টের কথা উঠলেই প্রশংসা ঝরে পড়ত তার কণ্ঠে। তার প্রমাণ মেলে ওই চিঠিতেই। তিনি লিখেন, আমি রেডিও শুনতে খুব ভালোবাসি। রেডিওতে আপনি প্রেসিডেন্ট হতে যাচ্ছেন শুনে আমি ভীষণ খুশি হয়েছি। এরপর রুজভেল্টের কাছে ১০ ডলার চাইতে গিয়ে তিনি লেখেন, আমি কখনো ১০ ডলারের নোট দেখিনি এবং আমি ওসব নোটের একটি পেতে চাই। অথচ ১৯৫৯ সালে কিউবার বিপ্লবের পর থেকে এ ক্যাস্ত্রোই পরিণত হন যুক্তরাষ্ট্রের চিরশত্রুতে। অন্তত ৯ জন মার্কিন প্রেসিডেন্ট তাকে সেভাবেই দেখেছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় রেকর্ডস দফতরের কর্মকর্তা সারডিন রাসেল এ ব্যাপারে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেন, ক্যাস্ত্রো যখন চিঠি লিখেছিলেন তখন তিনি কিশোর। কিন্তু বড় হয়ে যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে তিনি যে ধারণা পোষণ করেছেন, তা কিশোর বয়সের একবারে উল্টো। যা রীতিমতো বিস্ময়কর। তিনি বলেন, ১৯৭০-এর দশকের নথিপত্র বাছাই করতে গিয়ে আকস্মিকভাবে ক্যাস্ত্রোর লেখা চিঠিটি পাওয়া যায়। আবিষ্কৃত হয় ক্যাস্ত্রোর জীবনের না জানা এক অধ্যায়। দার্শনিকরা বলেন, মানুষের মন সদা পরিবর্তনশীল। বিশেষত মানুষের চিন্তার জগতে পরিবর্তন এক অনিবার্য সত্য। কিশোর বয়সে ফিদেল ক্যাস্ত্রো ছিলেন ক্যাথলিক স্কুলের ছাত্র। গোঁড়া ধর্ম বিশ্বাসীদের মধ্যেই কেটেছে তার কৈশোর। কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তার মনন জগতেও পরিবর্তন ঘটে। বাস্তবতা থেকে শিক্ষা নেন ফিদেল ক্যাস্ত্রো। এ শিক্ষাই তাকে সমাজতন্ত্রী হতে উদ্বুদ্ধ করে। একসময় আমেরিকাকে স্বপ্নের দেশ বলে ভাবতেন তিনি। সে দেশের রাষ্ট্রনায়কদের দেখতেন শ্রদ্ধার চোখে। কিন্তু শিগগিরই সে ভুলের অবসান ঘটে। নিজ দেশের জনগণকে রক্ষা করতে গড়ে তোলেন জনগণের গেরিলা বাহিনী। ক্যাস্ত্রোর এ মুক্তির লড়াইয়ে যোগ দেন লাতিন আমেরিকার অন্যান্য দেশের বেশকিছু বিপ্লবী। যাদের অন্যতম আর্জেন্টিনার তরুণ চিকিৎসক চে গুয়েভারা। ক্যাস্ত্রোর নেতৃত্বে বিপ্লবীরা বাতিস্তা সরকারকে উৎখাত করে। প্রতিষ্ঠিত হয় বিপ্লবী সরকার।

মানুষের মনন জগতের এ পরিবর্তন কোনো বিচিত্র ঘটনা নয়। সোভিয়েত ইউনিয়নের ডাকসাইটে নেতা জোসেফ স্তালিন ছোটবেলায় পড়তেন গির্জার স্কুলে। তার মায়ের ইচ্ছা ছিল স্তালিন বড় হয়ে ধর্মযাজক হবেন। কিন্তু স্তালিন পরবর্তীতে কমিউনিস্ট নেতা হিসেবে আবির্ভূত হন। ১৯১৭ সালের রুশ বিপ্লবের তিনি ছিলেন অন্যতম কান্ডারি। দুনিয়ার প্রথম সমাজতান্ত্রিক দেশের প্রতিষ্ঠাতা ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিনের ঘনিষ্ঠ সহকর্মী। লেনিনের মৃত্যুর পর স্তালিন সোভিয়েত ইউনিয়নের হাল ধরেন। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে জার্মানির পরাজয় ও মিত্রশক্তির জয়ের মহানায়কও ছিলেন তিনি। আফ্রিকার দেশে জিম্বাবুয়ের রাষ্ট্রপিতা প্রয়াত প্রেসিডেন্ট রবার্ট মুগাবে। মুগাবেও একসময় ছিলেন ধর্মযাজক। শ্বেতাঙ্গদের হাত থেকে দেশকে মুক্ত করতে তিনি গড়ে তোলেন মুক্তি আন্দোলন। ধর্মযাজক থেকে পরিণত হন সমাজতান্ত্রিক নেতা। মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিতে যে কতটা পরিবর্তন ঘটতে পারে- তার প্রমাণ ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারি বাজপেয়ি। যুবক বয়সে বাজপেয়ি যোগ দেন কমিউনিস্ট আন্দোলনে। পরবর্তীতে তিনিই বিপরীত ধারার দল রাষ্ট্রীয় সেবকসংঘের সদস্য হন। অসাম্প্রদায়িক চেতনা থেকে আত্মসমর্পণ করেন ধর্মীয় চেতনার কাছে।  বাজপেয়ি সরকারের মন্ত্রী জর্জ ফার্নান্দেজ বিজেপির অন্যতম নেতা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। অথচ একসময় তিনি ছিলেন বিপরীত চেতনায় বিশ্বাসী। ভারতের সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের সামনের কাতারের নেতা ছিলেন তিনি। ফার্নান্দেজ কিন্তু শ্বশুরবাড়ি সূত্রে বাংলাদেশিদেরও আত্মীয়। তিনি বিয়ে করেন নেহরুর মন্ত্রী ও ঘনিষ্ঠ সঙ্গী ফরিদপুরের সন্তান খ্যাতনামা কবি হুমায়ুন কবীরের কন্যাকে।

ভারতের কমিউনিস্টপন্থি তাত্ত্বিক লেখক রাহুল সাংস্কৃতিয়ান একসময় ছিলেন সাধু! আধ্যাত্মিক সাধনায় তিনি হিমালয়ের দুর্গম এলাকায় মাসের পর মাস কাটিয়েছেন। শেষ পর্যন্ত এই সাধক পুরুষ কমিউনিস্ট আন্দোলনের দীক্ষা নেন। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনের নিবেদিত প্রাণপুরুষ কমরেড আব্দুল হকের জীবনও প্রায় অভিন্ন। পীরপুত্র আব্দুল হক ধর্মীয় গন্ডি ছেড়ে এক সময় নিরশ্বরবাদী কমিউনিস্টদের সঙ্গে একাত্ম হন। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি ছিলেন তার বিশ্বাসে অটল।

কবি আল মাহমুদ দেশের শীর্ষ কবির একজন। এক সময় সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে জাসদের মুখপত্র দৈনিক গণকণ্ঠের সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। আল মাহমুদের কবিতায় একসময় লেখা হয়েছে, ‘আমাদের ধর্ম হোক ফসলের সুষম বণ্টন’। শোনা জায়, জেলে থাকাবস্থায় তিনি নাকি ধর্মীয় রাজনীতির দ্বারা প্রভাবিত হন।

মানুষের মনন জগতে রাতারাতি কতটা যে পরিবর্তন ঘটতে পারে তার প্রমাণ উপমহাদেশের সংগীতজগতের অসামান্য প্রতিভা ভূপেন হাজারিকা। সরাসরি কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিলেন না এ খ্যাতনামা গায়ক। কিন্তু তার পরও তিনি ছিলেন বামপন্থিদের আপন লোক। তার লেখা ও গাওয়া গান মানুষকে উদ্বুদ্ধ করেছে সমাজ পরিবর্তনের আন্দোলনে। শোষণমুক্তির সংগ্রামকে করেছে বেগবান। ভারতের আসামে দল-মত নির্বিশেষে সব মানুষের কাছেই তিনি ছিলেন প্রিয় ও সমানভাবে গ্রহণীয়। এই ভূপেন হাজারিকাই ভারতের ২০০৫ সালের লোকসভা নির্বাচনের আগে হুট করে যোগ দেন বিজেপিতে। একজন খ্যাতনামা বাম বুদ্ধিজীবী এবং সংগীতশিল্পীর বিজেপিতে যোগদান ছিল সে দলের জন্য প্লাস পয়েন্ট। কিন্তু আসামের মানুষ আদর্শের এই জলাঞ্জলিকে মেনে নিতে পারেননি। তার প্রমাণ সে নির্বাচনে ভূপেন হাজারিকার লজ্জাজনক পরাজয়। অথচ তিনি যদি স্বতন্ত্র প্রার্থীও হতেন তবে তার জয় ছিল অনিবার্য। তার বিরুদ্ধে প্রার্থী দিতে রাজনৈতিক দলগুলো ইতঃস্ততই করত। ভূপেন হাজারিকা যেসব দলের কাছে গ্রহণযোগ্য ছিলেন তার প্রমাণ হলো একবার তাকে সর্বসম্মতভাবে রাজ্যসভার সদস্য করার প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছিল।

ডানপন্থি বলে বিবেচিত ভাষাসৈনিক অলি আহাদ ছিলেন কমিউনিস্ট পার্টির সংগঠন যুবলীগের শীর্ষ নেতা। ভাষা আন্দোলনে যোগ দেন কমিউনিস্ট পার্টিরই নির্দেশে। ফররুখ আহমদ বাংলাভাষার শ্রেষ্ঠ কবিদের একজন। তাঁর কবিতায় ইসলামি ভাবধারার প্রভাব সুবিদিত। ফররুখ আহমদও যুবক বয়সে কমিউনিস্টদের দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন। সে প্রভাব ছেড়ে তিনি সম্পর্কিত হন বিপরীত ধারার সঙ্গে। মতাদর্শগত এ পরিবর্তন সত্ত্বেও ফররুখ আহমদ সারা জীবন ছিলেন আদর্শের প্রশ্নে আপসহীন। ফিদেল ক্যাস্ত্রো কিশোর বয়সে ফ্রাঙ্কলিন রুজভেল্টকে আদর্শ পুরুষ হিসেবে ভাবতেন। তার এই ভাবের জগতে পরিবর্তন আসে যুবক বয়সেই। যে ক্যাস্ত্রো রুজভেল্টের কাছে ১০ ডলারের নোট উপহার হিসেবে চেয়েছিলেন। তিনি পরবর্তীতে মার্কিনিদের কোটি কোটি ডলার উপহারের প্রলোভনেও পা দেননি। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের পর যুক্তরাষ্ট্রের কাছে সবচেয়ে অপছন্দের মানুষটির নাম ওসামা বিন লাদেন। অথচ এ লাদেন ছিলেন একসময় তাদের প্রিয়ভাজনদেরই একজন। দার্শনিকরা মানুষের মনোজগতের পরিবর্তনকে দু’ভাগে মূল্যায়ন করেছেন। তাদের মতে, মানুষ যত বেশি অভিজ্ঞতা লাভের সুযোগ পায়। সনাতন ধারণা থেকে সে তত বেশি সরে আসে। কোনো কোনো পরিবর্তনের সঙ্গে অবশ্য অপরাধ মনস্কতাও জড়িত। লোভ ও হীনস্বার্থের কাছে মানুষ যখন নিজের বিবেককে জিম্মি করে তখন তা করে অপরাধ মনস্কতা থেকেই।

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক।

ভালো লাগলে শেয়ার করে দিন :)

0 Comments

Leave a Reply

Avatar placeholder

Your email address will not be published. Required fields are marked *