ই-পেপার

SITE UNDER CONSTRUCTION
বাংলাদেশ পুলিশের মুখপত্র
অব্যাহত প্রকাশনার ৬৩ বছর

সুমন পালিত

পবিত্র কোরআনে মানুষকে ‘আশরাফুল মাখলুকাত’ বা সৃষ্টির সেরা জীব হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। ইসলাম শুধু মানুষকে সৃষ্টির সেরা জীব হিসেবে অভিহিত করেনি, জাতিভেদ, কৌলীন্য প্রথা ও ভুয়া মর্যাদাবোধের হীনম্মন্যতা থেকেও মুক্ত থাকার নির্দেশ দিয়েছে। খ্যাতনামা চিন্তাবিদ ও মানবদরদি সাহিত্যিক ডা. লুৎফর রহমান মানুষের মর্যাদা সম্পর্কে তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য করেছেন। বলেছেন, ‘বংশ মর্যাদা বা বাপ-দাদার শ্রেষ্ঠত্বে কৃতিত্ব জাহির করার অবকাশ নেই। মানুষের মর্যাদা ব্যক্তিগত কৃতিত্ব ও অবদানের ওপর নির্ভরশীল।’ বাবার উজির-নাজির, লাট-ব্যারিস্টার, কোটিপতি, শিল্পপতি পরিচয় জাহির করার মধ্যে কোনো কৃতিত্ব নেই। এ হীনম্মন্যতা নিজেকে হাস্যকর করে তোলার পাশাপাশি জনক-জননীর সুনামের জন্যও বিড়ম্বনা ডেকে আনে।

দুনিয়ার ইতিহাসে অনেক নামিদামি মানুষ অতি সামান্য অবস্থা থেকে শীর্ষপদে পৌঁছেছেন। বিশ্ব ইতিহাসের বড় বড় নায়ক-নায়িকাদের সবাই নিজ যোগ্যতা ও প্রতিভাগুণে বড় হয়েছেন। এদের কেউ হয়তো উঠে এসেছেন বস্তি থেকে, কেউবা ছিলেন পথের মানুষ। মুচি, দিনমজুর থেকে জীবন শুরু করলেও তারা জীবন জয়ের পাশাপাশি বিশ্বজয়ের কৃতিত্বও দেখিয়েছেন।

২০১১ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর জাম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট পদে শপথ নেন মাইকেল সাতা। পরিচ্ছন্নতা কর্মী বা সুইপার বলে যাদের অভিহিত করা হয় সাতা ছিলেন তাদেরই একজন। লন্ডনের ভিক্টোরিয়া স্টেশনে অন্যসব পরিচ্ছন্নতা কর্মীর মতো তিনিও ঝাড়ামোছার কাজ করতেন। পরে কাজ করেছেন কুলি হিসেবে। কাজের ফাঁকে খণ্ডকালীন পড়াশোনাও করেছেন। সুইপারের কাজ করলেও মাইকেল সাতার চোখে ছিল বড় হওয়ার স্বপ্ন। দেশের মানুষের কল্যাণ চিন্তা তাকে সারাক্ষণ আচ্ছন্ন করে রাখত। সেই মাইকেল সাতা জাম্বিয়ার সাধারণ নির্বাচনে জয়ী হয়ে প্রেসিডেন্ট পদে অধিষ্ঠিত হন। খনিজসম্পদে ভরপুর জাম্বিয়ার মানুষ দুর্নীতি আর অব্যবস্থাপনার কারণে দুনিয়ার অন্যতম গরিব দেশ। সাতা দেশের প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেওয়ার পর বলেন, লন্ডনের রেলস্টেশনের চেয়েও তিনি তার মাতৃভূমিকে বেশি পরিচ্ছন্ন রাখবেন। বলেন দুর্নীতিকে ঝেটিয়ে দূর করাই হবে তার প্রথম কাজ।

একজন ঝাড়ুদারের দেশের প্রেসিডেন্ট হওয়ার ঘটনায় জাম্বিয়ার অভিজাতরা নাক ছিটকিয়েছেন। কিন্তু এ অর্বাচীনরা বুঝতে চান না মাইকেল সাতা কারো দয়া নয়, নিজের যোগ্যতায় দেশের সর্বোচ্চ পদে পৌঁছেছেন। কাজের মাধ্যমে দেশের মানুষের মনজয়ে সামর্থ্য হয়েছেন। দুনিয়ায় যারা সেরাদের সেরা তাদের অনেকেরই ইতিহাস মাইকেল সাতার মতো।

আমেরিকার ‘মহান প্রেসিডেন্ট’ আব্রাহাম লিংকন প্রথম জীবনে ছিলেন কাঠুরিয়া। অসামান্য মেধা ও কর্তব্যপরায়ণতা তাকে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট পদে উন্নীত করে। মার্কিনিদের মতে লিংকন শুধু প্রেসিডেন্টই নন, এক আদর্শেরও নাম। আমেরিকায় বহু প্রেসিডেন্ট দেশ শাসন করেছেন ও করবেন। তাদের কেউই লিংকনকে কখনও অতিক্রম করতে পারবেন কিনা সন্দেহ। এ দেশেরই আরেক প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট ছিলেন পঙ্গু। দেশের অর্থনীতি যখন বিধ্বস্ত, সে অবস্থায় তিনি হাল ধরেন। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে মিত্রশক্তির পক্ষে আমেরিকার যোগদান যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। শারীরিকভাবে অক্ষম হলেও প্রবল ইচ্ছাশক্তি রুজভেল্টকে একজন সফল রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে তুলে ধরে।

নয়া চীনের প্রতিষ্ঠাতা মাও সেতুং ছিলেন গরিব মুদি দোকানির ছেলে। সীমাহীন দারিদ্র্যের মধ্যে বড় হয়েছেন এই বিপ্লবী নেতা। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার দিক থেকেও তিনি ছিলেন পিছিয়ে। স্কুল পর্যন্ত পড়াশোনা করেই তাকে ক্ষান্ত দিতে হয়েছে। কিন্তু রাজনীতি, সমাজতত্ত্ব ও দর্শন শাস্ত্রের ক্ষেত্রে মাওয়ের কৃতিত্ব তার সমালোচকরাও স্বীকার করেন। মাওয়ের এ শ্রেষ্ঠত্ব পৈতৃক পরিচয়ের সূত্রে আসেনি। অর্জিত হয়েছে নিজের কৃতিত্ব ও অধ্যবসায়ের গুণে।

বিশ্ব ইতিহাসের আরেক বিতর্কিত নায়ক স্টালিনের জন্মের মধ্যেও কোনো আভিজাত্যের ছাপ ছিল না। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের ভাগ্য নির্ধারিত হয়েছে মূলত এ সোভিয়েত নেতার ভূমিকায়। অথচ স্টালিন ছিলেন সামান্য এক মুচির ছেলে। ভিয়েতনামের নেতা হোচিমিন এক সময় বাসন মাজার কাজও করতেন।

আমাদের এই উপমহাদেশে একসময় ক্রীতদাস বা হাবসীদের শাসন ছিল। যাদের অনেকেই প্রথম জীবনে ক্রীতদাস হিসেবে মানবেতর জীবনযাপন করেছেন। আপন যোগ্যতাবলে পরবর্তীতে নিজেকে মেলে ধরতে সক্ষম হন। এদের মধ্যে সুলতান ইলতুতমিস, কুতুবউদ্দিন আইবেক শাসক হিসেবে ইতিহাসে যথেষ্ট মর্যাদার অধিকারী।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী লাল বাহাদুর শাস্ত্রী ছিলেন গরিব ঘরের সন্তান। কতটা গরিব ছিল শাস্ত্রীজির পরিবার? ছোটবেলায় তাকে স্কুলে যেতে হতো বাড়ি থেকে বহু দূরে। পথে ছিল ছোট্ট একটি নদী। নৌকায় নদী পার হতে মাত্র এক পয়সা লাগতো। এ সামান্য পয়সাও তার দেওয়ার সামর্থ্য ছিল না। তাই তিনি নদী সাঁতরে পার হতেন। জামা, প্যান্ট ও বই হাতে নিয়ে নামতেন পানিতে। তারপর সাঁতার কেটে পার হতেন নদী। ছোটবেলায় দারিদ্র্যের মধ্যে তিনি যে মানুষ হয়েছেন, তা প্রতিষ্ঠার শীর্ষে উঠেও ভুলে যাননি। লাল বাহাদুর শাস্ত্রী যখন প্রধানমন্ত্রী তখনও তার জীবনযাপন ছিল একজন দরিদ্র মানুষের মতোই।

বিশাল ভারতের প্রধানমন্ত্রী পদে অধিষ্ঠিত হন ড. মনমোহন সিং। পশ্চাৎপদ ভারত বিশ্বের অন্যতম অর্থনৈতিক পরাশক্তি হওয়ার পথে দ্রুত ছুটে চলছে মনমোহন সিংয়ের প্রদর্শিত পথে। ফেরিওয়ালার ছেলে মনমোহন ছোটবেলায় পড়াশোনা করতেন লাইট পোস্টের নিচে বসে। বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, অর্থমন্ত্রী এমনকি প্রধানমন্ত্রী পদে বসেও বিলাসিতা তাকে স্পর্শ করতে পারেনি।

মানুষের মতো মানুষ হিসেবে যারা বিশ্ব ইতিহাসে নন্দিত- তাদেরই একজন ভারতের একাদশ প্রেসিডেন্ট এপিজে আবদুল কালাম। পেশায় যিনি একজন বিজ্ঞানী। পরমাণু ও মহাশূন্য গবেষণায় তার সাফল্য প্রায় আকাশ ছোঁয়ার মতো। ভারতীয় এটম বোমার জনক ভাবা হয় এই বিজ্ঞানীকে।

দেশবরেণ্য বিজ্ঞানী ও রাষ্ট্রপ্রধান পদে অধিষ্ঠিত হওয়ার কৃতিত্ব দেখিয়েছেন যিনি- সেই এপিজে আবদুল কালামের জন্ম দক্ষিণ ভারতের এক সাধারণ পরিবারে। বাবা ছিলেন মৎস্যজীবী। নৌকা তৈরির কারিগর হিসেবেও কাজ করতেন তিনি।

দরিদ্র পরিবারে জন্মগ্রহণকারী আবদুল কালামকে তার বাবা স্কুলে ভর্তি করেন বুকভরা আশা নিয়ে। কিন্তু মাত্র ১০ বছর বয়সেই পড়াশোনার পাশাপাশি জীবনযুদ্ধেও জড়িত হয়ে পড়েন। পড়াশোনা চালানোর খরচ মেটানো ও বাবা-মাকে সংসার চালাতে সাহায্য করার জন্য হকারির কাজ শুরু করেন তিনি। ভোরে লোকের বাড়ি বাড়ি গিয়ে পত্রিকা পৌঁছে দিতেন। এহেন আবদুল কলাম তার যোগ্যতাগুণে ভারতের সর্বজন শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব হিসেবে আবির্ভূত হন। বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, আণবিক শক্তি কমিশনের চেয়ারম্যান ও প্রেসিডেন্ট- যখন যে পদ তিনি গ্রহণ করেছেন, সে পদকেই মহিমান্বিত করেছেন।

গরিব ঘরের সন্তান এপিজে আবদুল কালাম যখন পারমাণবিক কমিশনের চেয়ারম্যান তখন বাস করতেন দুকক্ষবিশিষ্ট এক সাধারণ বাসায়। প্রেসিডেন্ট হিসেবে প্রেসিডেন্ট প্রাসাদে বাস করতে বাধ্য হলেও তার জীবনমান ছিল একেবারে নিরাভরণ।

বাংলাদেশের গা-লাগোয়া ভারতীয় রাজ্য ত্রিপুরা। এ রাজ্যের পাঁচবারের নির্বাচিত মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন মানিক সরকার। বাবা ছিলেন পেশায় দর্জি। শ্রমজীবী পরিবারের সন্তান মানিক সরকার যুক্ত হন সিপিএমের রাজনীতির সঙ্গে। ১৯৬৭ সালে এ দলের ত্রিপুরা শাখার সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পান। ১৯৯৮ সালে তিনি ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রীর আসনে বসেন। টানা ২০ বছর অর্থাৎ ২০১৮ সাল পর্যন্ত তার নেতৃত্বে পর পর পাঁচবার সিপিএম ত্রিপুরায় সরকার গঠন করে।

মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে তিনি সরকারের কাছ থেকে মাসে মাত্র ছয় হাজার ৫০০ রুপি বেতন নিতেন। ভারতে একজন প্রাথমিক শিক্ষকের বেতনও এর চেয়ে অনেক বেশি। এ টাকাও তিনি জমা দিতেন দলীয় তহবিলে। দলের পক্ষ থেকে তাকে অবশ্য মাসে পাঁচ হাজার টাকা ভাতা দেওয়া হয়।

এ অর্থ ও স্ত্রীর পেনশনে গরিবি হালে চলত তাদের সংসার। অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের সাবেক ওই মুখ্যমন্ত্রীর নিজস্ব কোনো গাড়ি ছিল না। তিনি চলাচল করতেন দলীয় গাড়িতে চড়ে। তার স্ত্রী চলাচল করতেন রিকশায়। ভারতের এই বরেণ্য রাজনীতিকের কোনো ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ছিল না। কম দামি পাজামা-পাঞ্জাবি পরে অফিস করতেন তিনি। ২০০৮ সালে নিঃসন্তান মুখ্যমন্ত্রীর নগদ ও ব্যাংক ব্যালেন্স মিলে সঞ্চয় ছিল ১৬ হাজার ১২০ রুপি। পাঁচ বছর পর তা কমে দাঁড়ায় ১০ হাজার ৮০০ রুপিতে। তার স্ত্রীর সম্পদের পরিমাণ ২২ হাজার ১৫ রুপি। পাঁচ বছর আগে যার পরিমাণ ছিল আরও বেশি।

শ্রীলঙ্কার পরলোকগত প্রেসিডেন্ট প্রেমাদাসা ছিলেন বস্তির সন্তান। বাবা ছিলেন ধোপা। অত্যন্ত গরিবি অবস্থায় কেটেছে তার ছোটবেলা। প্রাথমিক শিক্ষা শেষে প্রেমাদাসা ভর্তি হতে যান মিশনারি হাইস্কুলে। স্কুলের রেক্টর বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী প্রেমাদাসাকে ভর্তি করতে আপত্তি জানান। বলেন, এ স্কুলে শুধু খ্রিস্টান ছাত্রদের ভর্তি করা হয়। কিন্তু প্রেমাদাসা ছিলেন নাছোড়বান্দা। তিনি রেক্টরকে বললেন, ‘স্যার, আমাকে তো অনেক বড় হতে হবে। পড়াশোনার সুযোগ না পেলে বড় হবো কীভাবে?’ রেক্টর প্রেমাদাসার কথায় মুগ্ধ হয়ে তাকে স্কুলে ভর্তি করেন। ভর্তি ফরমের মন্তব্য স্থানে লেখেনÑ ‘এ ছেলে যে কত বড় হবে তা একমাত্র ঈশ্বরই জানেন।’ ইতিহাস প্রমাণ করেছে প্রেমাদাসা সত্যিই বড় হয়েছিলেন। এ শ্রীলঙ্কারই এক মন্ত্রী প্রথম জীবনে ছিলেন অফিস পিয়ন। অধ্যবসায় ও প্রতিদিন নিজেকে অতিক্রম করার মানসিকতা তাকে মন্ত্রীর মতো সম্মানজনক পদ পর্যন্ত দিয়ে যায়।

ব্রাজিল এক সময় ছিল দেনার ভারে ন্যূব্জ হয়ে পড়া দেশ। লুলা ডি সিলভা সে দেশের প্রেসিডেন্ট হয়ে দেশের মানুষের ভাগ্যের চাকাকে ঘুরিয়ে দেন। বলা হয় চলতি শতাব্দীর প্রথমার্ধেই ব্রাজিল হবে বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত পাঁচ-ছয়টি দেশের একটি। কে ছিলেন এই লুলা? ছোট বেলায় তিনি জুতো পালিসের কাজ করতেন। একটু বয়স বাড়তেই কারখানার শ্রমিকের কাজ নেন। মেশিনে তার দুটি আঙুল কেটে যায়। প্রাইমারি স্কুল ডিঙানোর সৌভাগ্য না হলেও ব্রাজিলের মতো একটি বৃহৎ দেশের সফল প্রেসিডেন্ট হওয়ার যোগ্যতা তিনি দেখিয়েছেন। দেশকে সমৃদ্ধির পথে নিয়ে যাওয়ার জাদুকর হিসেবে প্রতিষ্ঠাও পেয়েছেন।

কৃষ্ণ-আফ্রিকার মুক্তি আন্দোলনের এক মহান নাম শ্যাম নাজোমা। আফ্রিকার মুক্তিদূত হিসেবে নেলসন ম্যান্ডেলার পাশাপাশি উচ্চারিত হয় তার নাম। স্বাধীন নামিবিয়ার রাষ্ট্রপিতা ও প্রেসিডেন্ট নাজোমা একসময় ছিলেন সামান্য নাপিত। সেলুনে চুল-দাড়ি কাটতে কেউ আসলে তিনি তাদের সঙ্গে কীভাবে দেশের স্বাধীনতা অর্জন করা যায় এ নিয়ে মতবিনিময় করতেন। অবশেষে একদিন সেলুন ফেলে দেশের কাজে নেমে পড়েন। গড়ে তোলেন রাজনৈতিক দল। সশস্ত্র মুক্তি সংগ্রামও শুরু হয় তার নেতৃত্বে। অবশেষে আসে স্বাধীনতা।

দুনিয়ার অন্যতম সেরা জাতি হিসেবে ইংরেজদের পরিচিতি স্বীকৃত। এক সময় ব্রিটিশ সাম্রাজ্যে সূর্য অস্ত যেত না। এই ব্রিটেনেরই সাবেক প্রধানমন্ত্রী জন মেজর। বাবা ছিলেন সার্কাস দলের সামান্য কর্মী। অর্থাভাবে অষ্টম শ্রেণীর বেশি পড়াশোনা করতে পারেননি। কর্মজীবনের শুরুতে তিনি বাসের কন্ডাক্টর হওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু অংকে কাঁচা-এ যুক্তিতে চাকরি হয়নি। পরবর্তীতে এই জন মেজরই ব্রিটেনের অর্থমন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রী হন। যে যুবকটি অংকে পারদর্শী নয় বলে বাসের কন্ডাক্টর হতে পারেননি, তিনিই ব্রিটেনের মতো দেশে অর্থনীতির হাল ধরেন যোগ্যতার সঙ্গে। এখানেই থেমে যাননি জন মেজরের অগ্রযাত্রা। পরবর্তীতে প্রধানমন্ত্রী পদেও অধিষ্ঠিত হন তিনি।

ক্যাথলিক খ্রিস্টান জগতের অবিসংবাদিত নেতা পোপ জন পল। দুনিয়ার শতকোটি মানুষের প্রয়াত এই প্রিয় ধর্মীয় নেতা কর্মজীবন শুরু করেন পাথর ভাঙার কাজ দিয়ে। যেভাবেই জীবন শুরু হোক না কেন, পোপ জন পল পরবর্তীতে দুনিয়ার শতকোটি মানুষের শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তিত্বে পরিণত হন। বলা বাহুল্য, তার এ উত্তরণে ব্যক্তিগত যোগ্যতা ও সাধনাই ছিল নিয়ামক শক্তি।

ফুটবলের কিংবদন্তি পেলে, ম্যারাডোনা, রোনালদো তিনজনই বস্তির ছেলে। এদের ছোটবেলা কেটেছে ছেঁড়া জামা-কাপড় পরে। রোনালদোর বাবা-মা এতই গরিব ছিলেন যে, তার জন্মের পর নাম রেজিস্ট্রি করতে দু’দিন দেরি হয়। রেজিস্ট্রিকৃত জন্ম তারিখের দু’দিন আগে যে তার জন্ম, তা তিনি স্বীকার করেছেন অকপটে। শ্রীলঙ্কার বিশ্বকাপ জয়ী ক্রিকেট দলের সুপারস্টার জয়সুরিয়ার বাবা ছিলেন একজন জেলে।

বিশ্বসাহিত্যের কৃতী পুরুষ ম্যাক্সিম গোর্কি কামারশালা এমনকি জুতার দোকানেও কাজ করেছেন। কিন্তু এ আভিজাত্যহীনতা আপন প্রতিভাকে তুলে ধরার ক্ষেত্রে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়নি। দুনিয়ার দেশে দেশে গোর্কি সাহিত্যরসিকদের কাছে প্রাতঃস্মরণীয় নাম। আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামও রুটির দোকানে এমনকি লোকের বাড়িতে কাজ করেছেন। মুসলিম বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ দার্শনিক আল-ফারাবী ছিলেন বাগানের মালি। শেখ সাদী এক সময় ক্রীতদাস হয়ে অমানবিক জীবনযাপন করেন। দার্শনিক ব্রাউন তাঁতি হিসেবে জীবিকা নির্বাহ করতেন। চিকিৎসা বিজ্ঞানী ড. লিভিং স্টোন, ফোর্ড মোটর গাড়ি কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা বিশ্বের অন্যতম ধনী হেনরি ফোর্ড কারখানার মজুর হিসেবে জীবন শুরু করেন। উনবিংশ শতাব্দীর অন্যতম সেরা ভারতীয় মনীষী মহামতি গোখেল ছিলেন গরিব ঘরের ছেলে। ফিলিপাইনের জনপ্রিয় সাবেক প্রেসিডেন্ট মিসেস আরোয়ার বাবাও একসময় সে দেশের প্রেসিডেন্ট ছিলেন। বিরোধীরা আরোয়াকে প্রায়ই ধোপানীর নাতনি বলে বিদ্রুপ করতেন। অবশ্য এই বিদ্রুপকে গর্বের ব্যাপার বলে ভাবতেন এই সাবেক ফিলিপিনো প্রেসিডেন্ট। তিনি নিঃসংকোচে স্বীকার করতেন তার দাদি ছিলেন একজন গরিব ধোপানী। বলতেন এ পরিচয়ে তিনি কুণ্ঠিত নন। বিশ্ব ইতিহাসের নায়কদের সবাই নিজ যোগ্যতা ও প্রতিভাগুণে বড় হয়েছেন। এদের কেউ উঠে এসেছেন বস্তি থেকে। কেউবা ছিলেন পথের মানুষ। মুচি, দিনমজুর প্রভৃতি নীচু অবস্থান থেকে জীবন শুরু করলেও তারা জীবন জয়ের পাশাপাশি বিশ্বজয়ের কৃতিত্বও দেখিয়েছেন।

গরিব ঘরে জন্ম নিয়ে যারা নিজ যোগ্যতায় শীর্ষ পদে উঠেছেন তাদেরই একজন ল্যাতিন আমেরিকার দেশ উরুগুয়ের প্রেসিডেন্ট জোসে মুজিকো। প্রেসিডেন্ট পদে অধিষ্ঠিত হওয়ার পরও যিনি নিজেকে কৃষক বলে পরিচয় দিতে গর্ববোধ করেন। দেশের সর্বোচ্চ পদে থাকা অবস্থায়ও যার জীবনযাপন অন্য সব কৃষকের মতো। জোসে মুজিকোর জন্ম এক গরিব কৃষক পরিবারে। যুবক বয়সে তিনি জড়িয়ে পড়েন মার্কসবাদী রাজনীতির সঙ্গে। উরুগুয়ের গরিব মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনে গড়ে তোলেন গেরিলা সংগঠনে। উরুগুয়েতে সমাজতন্ত্র কায়েমে বছরের পর বছর ধরে সশস্ত্র সংগ্রামে ভূমিকা রেখেছেন তিনি। গেরিলা নেতা হিসেবে ছয়বার গুলিবিদ্ধ হয়েছেন জোসে মুজিকো। ১৪ বছর নিষ্ঠুর কারা নির্যাতন ভোগ করতে হয়েছে তাকে। ১৯৮৫ সালে উরুগুয়েতে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। স্বৈরশাসনের জাঁতাকল থেকে মুক্তি পায় ল্যাতিন আমেরিকার এই দেশটি। সে বছরই জেল থেকে মুক্তি পান জোসে মুজিকো। শুরু করেন নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতি। ২০০৯ সালে বিপুল ভোটে দেশের প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচিত হন এই সাবেক গেরিলা নেতা।

প্রেসিডেন্ট পদে অধিষ্ঠিত হওয়ার পরও মুজিকো থেকে যান সেই আগের মানুষ। সিদ্ধান্ত নেন প্রেসিডেন্ট হিসেবে তিনি যে বেতন পাবেন তার ৯০ শতাংশই জমা দেবেন রাষ্ট্রীয় কোষাগারে। এছাড়া প্রেসিডেন্ট হিসেবে তিনি প্রেসিডেন্ট ভবন নয় শহরতলীর খামারবাড়িতে বসবাস করবেন। এ খামার বাড়িটিও জোসে মুজিকোর নিজের নয়। স্ত্রীর মালিকানাধীন এ বাড়িতে প্রেসিডেন্ট পদে অধিষ্ঠিত হওয়ার পরও স্ত্রীকে নিয়ে কৃষি কাজ করতেন তিনি। প্রেসিডেন্টের জন্যে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তার ব্যবস্থা থাকলেও তিনি তা অগ্রাহ্য করে দুজন পুলিশকে তার প্রহরায় নিয়োজিত থাকার অনুমতি দেন।

জোসে মুজিকো বলেছেন, লোকে তাকে দরিদ্রতম প্রেসিডেন্ট বলে অভিহিত করে। কিন্তু তিনি আদৌ দরিদ্র নন। দরিদ্র তারা যারা সারাটা জীবন কেবল ভোগের জন্য খাটে। অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি, উরুগুয়ের এই প্রেসিডেন্টের কোনো সঞ্চয় ছিল না। উরুগুয়ের নিঃসন্তান সাবেক প্রেসিডেন্ট এবং তার সিনেটর স্ত্রীর সবচেয়ে দামি সম্পত্তি হলো ১৯৮৭ সালে কেনা এক হাজার ৯০০ ডলার দামের একটি ভক্সওয়াগন গাড়ি।

দুনিয়ার কৃতী পুরুষের সংখ্যা কম হলেও চেহারাসর্বস্ব মাকালদের সংখ্যা কম নয়। পোশাকি চেহারা বা কৃত্রিম আভিজাত্যের প্রতি মোহগ্রস্তদের জন্য শেখ সাদীর সেই গল্পটি স্মরণীয়। ‘শেখ সাদী একবার রাজদরবারে যাচ্ছিলেন। যেতে যেতে পথে সন্ধ্যা নামল। বাধ্য হয়ে তিনি আশ্রয় নিলেন এক আমিরের বাড়িতে। তার পরনে ছিল অতি সাধারণ পোশাক। আমিরের লোকজন তাকে তেমন পাত্তাই দিল না। কোনো আদর-যত্নও মিলল না সেখানে। রাতটা কোনোরকমে কাটিয়ে ভোর হতেই শেখ সাদী যাত্রা শুরু করলেন। মনে তার একরাশ ক্ষোভ। কদিন পর রাজদরবার থেকে বাড়ি ফেরার পথে একই আমিরের প্রাসাদে তিনি আশ্রয় নেন। তার পরনে ছিল রাজার দেওয়া মূল্যবান পোশাক। সম্মানিত অতিথিকে দেখে আমির হাঁকডাক শুরু করেন। নিজের পাশে বসিয়ে খানাপিনার ব্যবস্থা হয়। ভৃত্যরা নিয়ে আসে পোলাও, কোরমা, কাবাব আরও কত কিছু। শেখ সাদী খেতে বসলেন। কিন্তু তাজ্জব ব্যাপার। তিনি খাবার মুখে না দিয়ে জামার পকেটে ভরতে লাগলেন। মেহমানের আচরণে আমিরের চোখ তো ছানাবড়া। তিনি বিনীতভাবে এ আচরণের কারণ জানতে চাইলেন। জবাবে সাদী বললেন, জনাব এ খাবার তো আমার পোশাকেরই প্রাপ্য। আমির পূর্বাপর শুনে লজ্জিত হন। বারবার ক্ষমা চান শেখ সাদীর কাছে।’

পোশাকি আচরণের মধ্যে কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই। শ্রেষ্ঠত্ব অর্জিত হয় মনুষ্যত্বের উৎকর্ষে। লেখাটির শুরুতে বলেছি মনুষ্য সত্তা ও পশু সত্তার কথা। পশু তা সে বাঘ হোক শিয়াল হোক আর সিংহ হোক জন্মের পরই বাঘ, শিয়াল অথবা সিংহ হিসেবে বিবেচিত হয়। একজন মানব সন্তানকে মানুষ হয়ে ওঠার জন্য প্রতিনিয়ত চেষ্টা করতে হয়। মানুষের মতো মানুষ হতে হলে প্রতিদিন নিজেকে অতিক্রম করতে হয়। মনুষ্যত্বের শিক্ষায় নিজেকে দীক্ষিত করতে হয়। আত্মার সংকীর্ণতায় যারা ভোগেন, তারা আর যা-ই হোক, মানুষ হয়ে উঠতে পারেন না। যারা অপরকে হেয় করার মধ্যে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব খোঁজেন- তারা আসলে মানসিক প্রতিবন্ধী। পোশাকি শ্রেষ্ঠত্বে যাদের আস্থা, শেখ সাদীর গল্পটি তাদের জন্য শিক্ষণীয় হতে পারে।

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক।

ভালো লাগলে শেয়ার করে দিন :)

0 Comments

Leave a Reply

Avatar placeholder

Your email address will not be published. Required fields are marked *