ই-পেপার

SITE UNDER CONSTRUCTION
বাংলাদেশ পুলিশের মুখপত্র
অব্যাহত প্রকাশনার ৬৩ বছর

জব্বার আল নাঈম

মায়ের গায়ে হলুদ মাখছে জেবা।সঙ্গে জেবার বান্ধবী জ্যোতি, জাহ্নবি ও আদিয়া।ভরাট কণ্ঠে জ্যোতি গাইছে, ’হলুদ বাঁটো, মেন্দি বাঁটো, বাঁটো ফুলের মৌ/ বিয়ার সাজে সাজবে কন্যা নরম নরম ব’রে/ সুরমা-কাজল পরাও কন্নার ডাগর নয়নে/ আলতা বিছপ রাঙা দুটি, রাঙা চরণে’।গান শুনে হাসছে জেবার মা মুশফিকা।আদিয়া বাটা মেহেদি নিয়ে ডান পাশে বসে মুশফিকার।জাবেদ বলে, আম্মাকে খেতে দিতে হবে।জেবা জানতে চায়, কী খাবেন আম্মা? রাতের খাবারের সময় হয়ে গেছে, আপাতত ফল খেতে পারেন।জাবেদ মায়ের মুখে তুলে দেয় আঙুর।ছেলেমেয়েরা বড় হয়েছে, তাদের সামনে গায়ে হলুদের অনুষ্ঠান করতে অস্বস্তি হয় মুশফিকার।কিন্তু এই দিনে ওরা কোনো কথা শুনতে চায় না। নাছোড়বান্দা হয়ে যায়, বাবা-মায়ের গায়ে হলুদ মাখতেই হবে।তারা বন্ধুদের ডেকে বাড়ি সাজায়, বাসর সাজায়, ভলিউম বাড়িয়ে গান বাজায়, তালে তালে নাচে জাবা ও জাবেদ।সতেরোতম বিয়ে বার্ষিকী মুশফিকা ও মামুন মাহমুদের।ছেলেমেয়েদের আবদারে বাধ্য হয়ে গায়ে হলুদের মঞ্চে বসে মুশফিকা।

মুশফিকার ভেতর অস্থিরতা কাজ করছে, সবকিছুতে তাড়াহুড়ো।দ্রুত গায়ে হলুদ মাখতে বলছে, হাতে আঁকতে বলছে মেহেদির আল্পনা।খোঁজ করছে স্বামী মামুন মাহমুদকে।অথচ মামুন তখনো প্রতিদিনের মতো নিচে অফিস করছে।

জেবা ও জাবেদ ভাবছে, মায়ের সঙ্গে বাবাও গায়ে হলুদে বসবেন।না হয়, অনুষ্ঠান পূর্ণতা পাবে না।জাবেদ বলল, জেবা আপু, তুমি বাবাকে নিয়ে এসো।

-ঠিক আছে, যাচ্ছি। আদিয়া তুমি মেহেদি মাখো। কিছু প্রয়োজন হলে জাবেদকে বলবে।

রাত দশটা। ডিআইজি অফিসের নিরাপত্তাকর্মী ছাড়া কেউ নেই। মামুন মাহমুদ সাহেব পরের দিনের কর্ম-পরিকল্পনা করছেন। জরুরি প্রয়োজনে টেলিফোনে কথা বলেন। পরিবারের সঙ্গে রাতের খাবার টেবিলে বসতে চেষ্টা করেন। ছেলেমেয়েকে সময় দেন। লেখাপড়ার খোঁজ খবর নেন। আত্মীয়-স্বজনদের সঙ্গেও যোগাযোগ রক্ষা করেন। মামুন মাহমুদ প্রায়ই বলেন, আত্মীয়তার সম্পর্ক টিকে থাকে যোগাযোগের মাধ্যমে। এরপর রাতের বিছানায় যান। এই রুটিন তার নিয়মে পরিণত হয়েছে। অথচ একটা সময় গেছে মামুন সাহেব নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা করতেন না। ঢাকার মাঠে দাপিয়ে বেড়াতেন ফুটবল খেলে। সুঠাম দেহের মানুষটির ফুটবল শৈলী দেখেই প্রেমে পড়েন মুশফিকা। বিশ^বিদ্যালয়ের মেয়ের ওই চোখের দিকে তাকিয়ে খুন হতো। সেই মানুষটি এখন দিনের বিশ ঘণ্টা কাজে নিমজ্জিত থাকে। 

সিঁড়ি বেয়ে নামছে জেবা। তার বাবা মামুন মাহমুদ। পুলিশের ডিআইজি। বেশ রাত পর্যন্ত অফিসে থাকতে হয়। পুলিশের চাকরি যারা করেন, তাদের চব্বিশ ঘণ্টা ডিউটি করতে হয়। এই অঞ্চলের মানুষের সুখ-দুঃখের দায়িত্ব তার ওপর। তাই ঘুমাতে গেলেও কান সজাগ রাখতে হয়, সমস্যা হলে তাৎক্ষনিক সমাধানেরও চেষ্টা করেন।

দরজা ঠেলে প্রবেশ করে জেবা। মেয়েকে দেখেই দাঁড়িয়ে যান মামুন। এই যে আম্মাজান চলে এসেছে, আজকে আর কাজ নয়। সব বন্ধ করলাম। হেসে ওঠে জেবা। কাজ এখনো শেষ হয়নি বাবা!

-কি বলো, আম্মাজান?

-আজ যে তোমাদের বিশেষ দিন তা ভুলে গেছ? এইদিনে গায়ে হলুদ দিতে হয়। আমরা আনন্দ ফুর্তি করব।

-আম্মাজান, বুড়ো বয়সে কেউ গায়ে হলুদ দেয়? তাছাড়া দেশের অবস্থা ভালো না। পশ্চিম পাকিস্তানিরা বাঙালিদের ওপর যে কোনো মুহূর্তে আক্রমণ করতে পারে। এ নিয়ে চিন্তিত আছি, এখন আনন্দ অনুষ্ঠান করা ঠিক হবে না।

-বাবা, তুমি সব সময় ফাঁকি দাও, ব্যস্ততা না থাকলেও দাও। তাছাড়া তোমার ব্যস্ততা কখনই শেষ হবে না। আমাদেরকেও তো একটু-আধটু সময় দিবে। নাকি?

-আম্মাজান, এটাকে ফাঁকি বলে না- বলতে পারো, দায়িত্ব। দেশের অবস্থা যেখানে অস্থির সেখানে অনুষ্ঠান, ফাঁকি, আনন্দ শব্দগুলো অপ্রয়োজনীয়। চোখ ও কান সজাগ রাখতে হবে। কখন কোথায় কি ঘটে বলা যায় না। সাবধানে থাকতে হবে। পাকিস্তানিরা আমাদের ওপর জোর দম ফেলছে। যার উত্তাপে পূর্ব পাকিস্তানের অবস্থা থমথমে। যে কোনো মুহূর্তে আগুন লাগতে পারে। এদিকে পাকিস্তানকে আর মানতে চাইছে না বাঙালি, পাকিস্তানিরাও চাইছে না ছেড়ে যেতে। অথচ আমাদের হাতে শত যুক্তি আছে পাকিস্তানের বিপক্ষে। 

কথা শেষ করে নিরাপত্তারক্ষীদের ডাকেন মামুন। কারো সাড়া-শব্দ নেই। কেউ ছুটেও আসছে না। এমনটা হওয়ার কথা না, গেলো কোথায় ওরা? আসছে না কেনো? জোরে ডাক দেন- কাউসার, আলামিন, নাসির ও জাবেদ। নাহ্, কেউ আসছে না। এত রাতে ওরা গেলো কোথায়? কেউ আসছে না কেনো?

দরজায় ঠকঠক শব্দ। মামুন মাহমুদের চোখ গেল দরজায়। এই যে আসছে, কাজের সময় পাওয়া যায় না। কোথায় থাকে, কী করে জবাব দিতে হবে। না হয় ছাড়ছি না। জেবাও তাকায়। আসতে পারি, স্যার?

অপরিচিত কণ্ঠ। বিস্মিত চোখে তাকিয়ে আছেন মামুন মাহমুদ। দারোয়ান, নিরাপত্তা বাহিনী, ব্যক্তিগত দেহরক্ষী কেউ নেই, অথচ অপরিচিত কণ্ঠ এখানে আসে কীভাবে? জোরে ডাক দেন কাউসার, আলামিন, নাসির ও জাবেদ। নাহ্, শব্দ নেই।

-আপনার প্রয়োজন আমাকে বলতে পারেন। ওরা কেউ আসবে না। সেই কণ্ঠ বলল।

-কে বলছেন আপনি?

-রাজশাহী সেনানিবাস থেকে এসেছি, স্যার।

-এত রাতে! এখানে কেনো?

ততক্ষণে পাঁচ-ছয় জন সেনা কর্মকর্তা ভেতরে প্রবেশ করে। তিনজন মামুন মাহমুদের পরিচিত। তাদের উদ্দেশ্যে বলেন, এত রাতে আপনারা?

-উপরের নির্দেশে এসেছি।

-কিসের নির্দেশ?

-আপনাকে নিয়ে যেতে এসেছি।

-কোনো সমস্যা হলে জানাতে পারেন, সমাধানের চেষ্টা করব।

-সমাধানের জন্যই আমাদের সঙ্গে যাবেন।

-এত রাতে?

-হ্যাঁ।

-পারিবারিক অনুষ্ঠান আছে, যেতে পারব না। সকালে আসব।

– সময় দেওয়া যাবে না। কেন্দ্র থেকে অর্ডার এসেছে, রাতের মধ্যে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

-কিসের সিদ্ধান্ত?

-গেলে বুঝতে পারবেন।

বিমূঢ় দাঁড়িয়ে আছেন মামুন মাহমুদ। বিষয়টা তাকে ভাবনায় ফেলে দিয়েছে। যেতে চাচ্ছেন না তিনি। সেনা অফিসাররা বলছেন, জোর প্রয়োগের বাধ্য করবেন না। তাহলে সেটা করব। 

-আসলে আমি এখন যেতে চাচ্ছি না। ইচ্ছে হলে জোর করে নিয়ে যেতে পারেন।

মামুন মাহমুদের টেলিফোন বেজে উঠল। ফোন তুলে কথা বললেন। কথা শেষে রাজ্যের অন্ধকার নামল মুখে। শরতের আকাশ হঠাৎ করেই মেঘে পরিপূর্ণ হয়ে গেলো। বিস্তীর্ণ মাঠের কাশবন অসুস্থের মতোই বাতাসে দুলছে। যেন এখনই রাগে-ক্ষোভে মাঠে গড়াগড়ি খাবে।

সেনাবাহিনীর একজন বললেন, সিদ্ধান্তহীনতায় আছেন আপনি। ভাবছেন কী করা যায়। এখানে দাঁড়িয়ে ভাবার চেয়ে আমাদের সঙ্গে গাড়িতে চলেন। ওখানে বসে ভাবনাটা ভালো হবে।

মামুন মাহমুদ চুপ থাকলেও এদিক-সেদিক তাকাচ্ছেন। নিরাপত্তারক্ষী কারো দেখা নেই। কাউকে দেখতে না পেয়ে বিরক্ত। সেনা কর্মকর্তাদের বসার অনুরোধ করেন, চা খেতে খেতে কথা বলা যেতে পারে। সেনারা জানিয়ে দেয়, বসতে নয়, চিলের মতো ছোঁ মেরে নিয়ে যেতে এসেছি। রাতে অনেক কাজ আমাদের।

নিজেকে কিছুটা অসহায় ভাবেন মামুন মাহমুদ। কয়েক মিনিট আগেও এমনটা ভাবেননি। তাহলে সঙ্গীদের ধরে নিয়ে গেছে! এতটুকু বুঝতে আর অসুবিধা হলো না।

০২

-জাবেদ, গায়ে হলুদে আসবেন বলে মনে হচ্ছে না তোমার বাবা। দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি শঙ্কিত। দেখতে পারছ, প্রতিদিন নিজ হাতে কালো পতাকা উত্তোলন করছেন।

-আম্মা, মন বলে বাবা ঠিক কাজটা করছেন। একদিন আমরা স্বাধীনতা লাভ করব। বাবার উচিত সামনে থেকে নেতৃত্ব দেওয়া। তিনি তাই করছেন।

-তুমি ছোট, এত বুঝতে যেও না। বেশিরভাগ মানুষ পশ্চিম পাকিস্তানিদের পক্ষে, সামরিক শাসক ইয়াহিয়ার পক্ষে।

-এজন্যই বাবা সত্যের পক্ষে থাকবেন।

-ঠিক বলেছ, তোমার বাবা সবসময়ই প্রতিবাদী। অন্যায় সহ্য করতে পারেন না। ভাষা আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটে ১৯৪৮ সালে। মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা ঘোষণা করলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের নিয়ে বিবাদে জড়ান মামুন। কারাভোগও করেন। বিশ্বাস করতেন, মায়ের মুখের ভাষা কেড়ে নেওয়া অন্যায়। সে সময় বাঙালি জাতীয়তাবাদী মতাদর্শের ওপর দৃঢ় অবস্থানে ছিলেন মামুন।

অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান সবাই নিতে পারে না। মামুন পেরেছেন পারিবারিক কারণে। তার শিকড় ছিল শক্ত। বাবা- মা ও মামাদের পরিবারের এদেশের রাজনীতিতে অনেক অবদান। মামুন ছোট থেকেই বিখ্যাত মানুষের সাহচর্যে এসেছিলেন। পাঁচ বছর বয়সে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে চিঠি লিখেছিলেন। সে চিঠির জবাব পেয়েছিলেন। যা পরবর্তীতে পত্রিকায় ছাপাও হয়েছিল। জন্মলগ্নে কবি কাজী নজরুল ইসলাম তাকে শিশু যাদুকর কবিতা দিয়ে আশীর্বাদ জানিয়েছিলেন। নজরুল ছিলেন মামুনের মামা হাবিবুল্লাহ বাহার চৌধুরীর বন্ধু। মামুনের জন্মের দুই বছর আগে আমার শাশুড়ি শামসুন নাহার মাহমুদকে কবি চিঠি লিখেছিলেন, যা ইতিহাসের অকাট্য দলিল হিসেবে বিখ্যাত হয়ে আছে। নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়া মামুন মাহমুদকে কোলে নিয়ে আর্শীবাদ করেছিলেন। তোমার বাবা আরো সাহচর্য পেয়েছেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, আবুল কাশেম ফজলুল হক, আবদুল হামিদ খান ভাসানী ও শেখ মুজিবুর রহমানের মতো প্রবাদ পুরুষদের।

-আম্মা, সেই মানুষটা অন্যায়ের প্রতিবাদ করবেন সেটাই স্বাভাবিক।

-অবশ্যই প্রতিবাদ করবেন। তোমরা এখনো ছোট। তাই ভয়ে থাকি আমি, যদি কিছু হয়ে যায়। তোমাদের নিয়ে কার কাছে আশ্রয় চাইব। তোমার বাবা গণ-আন্দোলনের সহায়তা করার চেষ্টায় কয়েকজন রাজনৈতিক নেতা, কর্মী ও বাঙালি কর্মকর্তাকে নিয়ে গোপন বৈঠকে মিলিত হয়েছেন, তা-ও কয়েকবার। কিন্তু সবকিছু গোপন থাকেনি, বাবা। খুব ভয় হয় আমার, পশ্চিম পাকিস্তানিরা তাকে এভাবে ছেড়ে দেবে না।

আম্মা, আমি বয়সে বড় না হলেও কিছু অন্তত বুঝি। কেউ যখন রাষ্ট্রের হয়ে যায়, রাষ্ট্র তখন তার হয়ে যায়, তখন পরিবারের উচিত তাকে তার মতো কাজ করতে দেওয়া, সহযোগিতা করা। বাবাকে ফেরানো যাবে না, বরং আমাদের উচিত বাবার কাজে সহযোগিতা করা।

-তুমিও বাপের চেয়ে কম না।

-বাবাকে সাধারণ মানুষ অনেক ভালোবাসেন, আম্মা। বিনিময়ে তাদেরকে সঠিক পথ দেখানো উচিত।

-তুমিও বাবার দলে যোগ দাও।

-আম্মা, যেতে না চাইলেও পূর্বপুরুষের রক্ত ঠিকই যুক্ত করার পথ দেখাবে। বাবা যে পথে হেঁটে যাবেন, সে পথ ধরেই খুঁজতে যাব বাবাকে। যে পথে বিজয় ছিনিয়ে আনবেন, সে পথেই বিজয়োল্লাস করতে যাব। তবুও একটা স্বাধীন দেশ দরকার। ক্লাসে গেলে মেজর, কর্নেলের ছেলেদের দাপটে বাঁচা যায় না। ওরা দেশ চালায়, আমাদের মুখে খাবার তুলে দেয়, দেশটা নাকি ওদের। প্রতিদিন জোর করে সামনের টেবিলে বসে, আমার বাবা পুলিশের ডিআইজি, অথচ সেই আমাকেও পেছনের টেবিল নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে হয়। অন্যদের বেলায় এই সমস্যা আরো প্রকট। এটা চরম বৈষম্য। মেনে নেওয়া যায় না।

-শিক্ষকদের অভিযোগ করো।

-তারাও তাদের পক্ষে।

-একজনও তোমার পক্ষে নেই?

-হয়তো আছেন। তবে, প্রকাশ্যে না। শিক্ষকদের মুখের ওই তালা খুলে দিতে লড়াই করছেন আমার বাবা।

-আমিও চাই দেশ থেকে পাকিস্তানি আপদ চলে যাক।

মুশফিকার চোখ যায় ওয়ারড্রবের ওপর। সেখানে একটি প্যাকেটের মতো। জাবেদের দিকে ইশারা করে বলেন, দেখো তো কিসের প্যাকেট।

-দেখছি।

-আম্মা, তোমার জন্য গিফট, নিশ্চয়ই বাবা এনেছেন।

-বইয়ের চেয়ে ভালো বন্ধু হয় না। আমি সারাক্ষণ বইয়ের ভেতর ডুবে থাকি।

-তা দেখতে পাচ্ছি। তবে, এই বইটা জেবা আপুর জন্য। কার্ল মার্ক্সের শর্ট বায়োগ্রাফি ও লেনিনের বই। এই যে দেখো, বাবার হাতে লেখা, জেবাকে লিখেছেন লেনিনের বইটিতে, জেবা, দিস ইজ অ্যাবাউট এ ডেভোটেড লিডার অব এ ভ্যালিয়ান্ট পিপল হু ওয়ানস স্ট্রাগলড ফর ইম্যানসিপেশন ফ্রম এক্সপ্লইটেশন লাইক দ্য পিপল অব বাংলাদেশ টুডে। পাপা/আম্মা- ২৬ মার্চ ১৯৭১। লেখাটা পড়ে জাবেদ অবাক হয়! মায়ের দিকে তাকায়।

-তোমার বাবা সত্য বলেছেন। মেয়েরা এসো, দ্রুত হাতে মেহেদি দিয়ে শেষ করো। বাসায় অনেক কাজ। তোমাদের খেতে দিতে হবে। রাত অনেক হয়েছে। 

০৩

জেবাকে কাছে টেনে নেন মামুন সাহেব, মাথায় রাখেন ভরসার হাত। ভয় পেয়ো না মামণি। ওরা কিছু করতে পারবে না। আমি পথভ্রষ্ট না, সত্যের ওপর থাকলে বিপদ আসবেই। দুইজন সেনা কর্মকর্তা মামুন মাহমুদের দুহাত ধরে হাঁটতে শুরু করেন। জেবা কিছুটা রাগতস্বরে বলে, একজন পুলিশ কর্মকর্তার সঙ্গে এ ধরনের আচরণ করা অসৌজন্য। কে পাঠিয়েছে আপনাদের? তা না বলে বাবাকে এখানে থেকে নিয়ে যেতে পারবেন না। বাবা তো কোনো অন্যায় করেননি। একজন নিবেদিত পুলিশ কর্মকর্তা। বিপদে-আপদে সব সময় সামনে থাকেন। লড়াই করেন। বেতনের টাকা থেকে সাধারণ পুলিশদের সহযোগিতা করেন, গরিবদের সহযোগিতা করেন। আশ্রয়হীনকে আশ্রয়ের ব্যবস্থা করেন। সেই তাকে এভাবে অপমান করে নিয়ে যেতে পারেন না আপনারা।

জেবার কথার জবাব না দিয়ে মামুন মাহমুদকে নিয়ে বাইরে আসে তারা। মামুন মাহমুদ চুপ করে আছেন। জেবা দৌড়ে বাবার হাত ধরে, সেনারা হাত ছাড়িয়ে নেয়। বাইরে চারটি গাড়ি নিয়ে আরো সেনা অপেক্ষা করছেন। মামুন মাহমুদ বুঝতে পারেন, ভালো কিছুর ইঙ্গিত না। হতে পারে শেষ যাত্রা। পরিবারের লোকদের কাছ থেকে বিদায় নিতে হবে। সেনাদের থামার অনুরোধ করলেন। মেয়েকে কিছু কথা বলার আছে।

একজন ডিআইজির সাদাসিধে বিদায় কাম্য হতে পারে না। পরিবার থেকে বিদায় নেওয়ার সময় ও সুযোগ দেওয়া দরকার। এমন ভাবনা থেকে সেনা কর্মকর্তারা অনুমতি দেন।

-বেশি সময় নেওয়া যাবে না। সৈনিকরা প্রস্তুত। কোনোরকম চালাকি করা যাবে না, পরিবারের ওপর নামবে অত্যাচার।

-আমি নিশ্চয়তা দিচ্ছি এরকম কিছু হবে না।

-ডিআইজি সাহেব, আপনার ওপর সেই বিশ্বাস আছে। আপনার কোনো ক্ষতি করতে চাই না আমরা। হুকুম পালনের সুযোগ দিন।

-মামুন মাহমুদ বললেন, সব কিছু মনে থাকবে, বেঁচে থাকলে কিংবা মরে গেলেও।

আঙুল থেকে আংটি খুলেন মামুন মাহমুদ। জেবার দিকে বাড়িয়ে দিলেন। এটা যতেœ রেখো মামণি। বড়ো হলে জাবেদকে দিও। জাবেদ অনেকটা আমার মতো। স্বাধীনচেতা। সত্যেকে সত্য এবং মিথ্যাকে মিথ্যা বলতে ঠোঁট কাঁপে না।

– ঠিক আছে, বাবা। কিন্তু এই আংটি কেনো?

আমার বাবা ডা. ওয়াহিদউদ্দীন মাহমুদ আমাকে দিয়েছেন এটি। তাকে দিয়েছেন আমার নানা মুহাম্মদ নুরুল্লাহ চৌধুরী। নানাকে আমার মা বেগম শামসুন্নাহার মাহমুদ এর নানা খান বাহাদুর আবদুল আজীজ দিয়েছেন। তাকে দিয়েছেন তার বাবা আমজাদ আলী। আমি দিয়ে যাচ্ছি তোমাকে। যার প্রকৃত মালিক হবে তোমার ভাই জাবেদ মাহমুদ। তুমি সংসারের বড়, তাদের দিকে খেয়াল রেখো। তোমার আম্মার দিকে খেয়াল রেখো। আমাকে নিয়ে ভেবো না। আমার মামা হাবিবুল্লাহ বাহার চৌধুরী পূর্ব পাকিস্তানের প্রথম স্বাস্থ্যমন্ত্রী। রাষ্ট্রের পক্ষে কাজ করতে গিয়ে অনেক জেল, জুলুম ও অত্যাচার সহ্য করেছেন। জানি কেনো নেওয়া হচ্ছে আমাকে, আমি এই রাষ্ট্রের একজন পাহারাদার। দায়িত্বের প্রতি কোনো অবহেলা নেই। বরং সঠিকভাবে দায়িত্ব পালনের করায় আমাকে নেওয়া হচ্ছে। এটাও মনে রেখো, আমার মতো একজন কর্মকর্তাকে যখন অপহরণ করে, তখন ফিরিয়ে দেওয়ার প্রশ্নই আসে না। মামার রাজনৈতিক ইতিহাসে চোখ রেখে আমার নিয়তি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি।

-বাবা, তুমি এভাবে বলো না। ওরা তোমার কিছু করতে পারবে না।

-জানি। শরীরের ক্ষতি করতে পারলেও বিশ্বাসের ক্ষতি করতে পারবে না। একদিন অন্ধকার কেটে যাবে, আলো আসবে। তখন বাস্তবায়িত হবে আমার স্বপ্ন। তোমরা দুই ভাইবোন সূর্য হয়ে আলো ছড়াবে।

০৪

মেয়েকে খুঁজতে নিচে আসেন মুশফিকা। পেছনে জাবেদ, জ্যোতি, জাহ্নবি ও আদিয়া। নিচে কেউ নেই। একবার জেবা, একবার মামুনকে ডাকেন মুশফিকা। কেউ শব্দ করছে না। দরজা ঠেলে দেখেন বাইরে, অসহায়ের মতো দাঁড়িয়ে আছেন মামুন। পাশে জেবা। মুশফিকা সেনাদের বললেন, আপনারা কারা? এখানে কেনো?

-কেউ জবাব দেয় না। মুশফিকা ডাকতে থাকেন, কাউসার, আলামিন, নাসির, জাবেদ কোথায়? দেখছি না কেনো?

-একজন সেনাকর্মকর্তা বলে, চিন্তা করবেন না, তারা সেনানিবাসে জামাই আদরে আছে। মামুন সাহেবও জামাই আদর পাবেন। আর দেরি করা ঠিক হবে না, পরিস্থিতি ঘোলা হওয়ার আগেই চলে যেতে হবে।

মুশফিকা, জাবা ও জাবেদের চিৎকার প্রকম্পিত হচ্ছে মাটি। বাড়তে থাকে চিৎকারে শব্দের সঙ্গে গাড়ির দূরত্ব।

  লেখক : কবি ও কথাসাহিত্যিক

ভালো লাগলে শেয়ার করে দিন :)

0 Comments

Leave a Reply

Avatar placeholder

Your email address will not be published. Required fields are marked *